📄 বড় বড় অপরাধ
অপরাধের স্বরূপের উপর শাস্তির মান নির্ভরশীল। অপরাধসমূহকে আমরা তিনটি বড় বড় অংশে ভাগ করতে পারি:
১. রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধ: ওজনে কমবেশি করা, ঠকবাজি, মিথ্যা সাক্ষ্যদান বা সত্য সাক্ষ্য গোপন করা, সরকারী কর্মচারীদের আইনসম্মত ক্ষমতার অপমান করা প্রভৃতি এই ভাগে পড়ে।
২. সামাজিক সামষ্টিক জীবনের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ: সাধারণ শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, সন্তান হত্যা, আত্মহত্যা, নারী বা শিশু হরণ, ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, আমানতে খিয়ানত, প্রতারণা প্রভৃতি এই অংশের অন্তর্ভুক্ত।
৩. ব্যক্তির জীবনের বিরুদ্ধে করা কার্যাবলী: ইচ্ছামূলক হত্যা, দৈহিক যখম, মানহানি পর্যায়ের অপরাধসমূহ এই ভাগে গণ্য।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ:
ইসলামী আদর্শের দৃষ্টিতে বিচার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অনাবিল হওয়া বাঞ্ছনীয়। অপরাধ যদি ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয় তবে সেই ব্যক্তি বিচার বিভাগকে ডাকার অধিকার রাখে। আর যদি সমাজ সমষ্টির বিরুদ্ধে হয় তবে সরকারকেই অনতিবিলম্বে সক্রিয় হতে হবে।
📄 ইসলামী দণ্ড বিধান
ইসলামী শরীয়তে কাউকে আযাব বা কষ্টদানের লক্ষ্যে দণ্ডদানের ব্যবস্থা করা হয়নি। এ ব্যবস্থা করা হয়েছে সুচরিত্রবান ব্যক্তি গঠন এবং সমাজকে পরিশুদ্ধ নির্দোষ বানানোর লক্ষ্যে।
কিসাস:
'হত্যার শাস্তিস্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করাকে' কুরআন বলেছে কিসাস। 'কিসাস' শব্দটি সুবিচার, সমান সমান ও অনুরূপতা বোঝায়।
দণ্ড বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণ:
শরীয়ত দণ্ড ইসলামী সমাজ গঠনের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। অপরাধীর উপর দণ্ড কার্যকর করার পর তাকে অপরাধের দোষ থেকে মুক্ত মনে করে সমাজ তাকে পুনরায় আপন করে নেয়।
মুসলিম অপরাধ করে কেন:
মুসলিম ব্যক্তির ঈমান যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তাতে বিভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করে এবং তার দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হওয়া সহজ হয়ে পড়ে।
শরীয়ত অবিভাজ্য:
ইসলামী শরীয়ত একটি সমগ্র, একটা সমষ্টি। এর কোনো একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ পরিত্যক্ত হলেও একে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না। শরীয়তই প্রথমে ব্যক্তিদের আদর্শবাদী ব্যক্তিরূপে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে।
📄 হত্যার অপরাধ
মানুষের অপরাধের মধ্যে মানুষ হত্যার অপরাধ সবচাইতে বড় ও মারাত্মক। কুরআন মজিদে আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কাহিনীর মাধ্যমে এই অপরাধের বীভৎসতা বর্ণনা করা হয়েছে। হিংসাই ছিল প্রথম হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।
এই অপরাধের কারণ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ:
হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীর মনে অপরাধের তীক্ষ্ণ অনুভূতি ও ভুলের লাঞ্ছনা তাকে অস্থির করে তোলে। ইসলাম এই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে যাতে করে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
কুরআনে কিসাস শব্দের প্রয়োগ:
কুরআন 'কিসাস' শব্দ ব্যবহার করেছে কারণ এই শব্দটি সুবিচার ও অনুরূপতা বোঝায়। 'কিসাসে নিহিত জীবন'—এর তাৎপর্য হলো কিসাস কার্যকর করার ফলে নিহতের আত্মীয়দের প্রতিশোধের আগুন নির্বাপিত হয় এবং সমাজ ধ্বংসাত্মক হানাহানি থেকে রক্ষা পায়।
ইচ্ছামূলক হত্যা-অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলী:
হত্যাকারীকে পূর্ণ বয়স্ক ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে এবং নিহতের অভিভাবকের পক্ষ থেকে কিসাস দাবি করতে হবে। ভুলবশত হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস নেই, সেখানে 'দীয়াত' বা রক্তমূল্য এবং 'কাফ্ফারা'র বিধান রয়েছে।
ইসলামী শরীয়তে ‘দীয়াত’ ব্যবস্থা:
নিহত ব্যক্তির অভিভাবক যদি হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয় তবে রক্তমূল্য বা দীয়াত গ্রহণ করা যায়। এটি ইসলামের এক বিশেষ দয়াপূর্ণ ব্যবস্থা।
কাফ্ফারা:
ভুলবশত হত্যার ক্ষেত্রে অপরাধীকে একজন মুমিন ক্রীতদাস মুক্ত করতে হবে অথবা একাধারে দুই মাস রোজা রাখতে হবে।
📄 ইসলামী দণ্ড বিধানের বিস্তারিত রূপ
ইসলামী শরীয়তে তিন প্রকারের অপরাধ বিভক্তির ভিত্তিতে শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে:
প্রথম প্রকার: যেসব অপরাধের জন্য 'হদ্দ' ঘোষিত হয়েছে। এগুলো হলো ব্যভিচার, চুরিবৃত্তি, ডাকাতি, মদ্যপান ও কযফ।
দ্বিতীয় প্রকার: হত্যা পর্যায়ের অপরাধ, যার জন্য 'কিসাস' বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।
তৃতীয় প্রকার: তা'যীর পর্যায়ের অপরাধ, যার কোনো সুনির্দিষ্ট দণ্ড শরীয়তে নেই এবং তা নির্ধারণের দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের।
‘হজ্জ’ ও তা’যীরের মধ্যে পার্থক্য:
'হদ্দ' ক্ষমার অযোগ্য কিন্তু 'কিসাস' নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করতে পারে। 'হদ্দ' কার্যকর করা রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব। 'হদ্দ' কারোর মামলা দায়ের করার উপর নির্ভরশীল নয় কিন্তু কিসাসের ক্ষেত্রে অভিযোগ জরুরি।
শাস্তিদানের চূড়ান্ত লক্ষ্য:
আল্লাহ্ তা'আলা শাস্তির বিধান করেছেন পাঁচটি মৌলিক বিষয় সংরক্ষণের জন্য: দীন, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, বংশ ও ধন-মান রক্ষা।