📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শাস্তি কিরূপ হওয়া উচিত

📄 শাস্তি কিরূপ হওয়া উচিত


অপরাধের স্বরূপের উপর শাস্তির মান নির্ভরশীল। আদালতি কার্যবিধি বা নিয়মতন্ত্র (Procedure) প্রত্যেকটি দেশে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। কিন্তু একটি জিনিস সব দেশের নিয়মতন্ত্রে সমানভাবে লক্ষণীয়। তা হচ্ছে, অপরাধসমূহ সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে সেসব অপরাধ গণ্য, যা ব্যক্তির অধিকারের সহিত সাংঘর্ষিক হওয়ার দরুন করা হয় এবং যেসব অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছে। আর দ্বিতীয় ভাগে সেসব অপরাধ গণ্য, যা স্বয়ং সরকারেরই বিরুদ্ধে করা হয়। ব্যক্তি হিসাবে ও ব্যক্তিগতভাবে যে কোন জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হরণ করার দরুন যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, তা তৃতীয় এক পর্যায়ে গণ্য। প্রথম ভাগের অপরাধের বেলা দণ্ড-বিধানের জন্য সরকার যন্ত্রস্বতই সক্রিয় ও তৎপর হয়ে উঠে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের অপরাধের বেলা সরকার শক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত সক্রিয় হয় না- কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত মজলুম ব্যক্তি নিজে ফরিয়াদ না করবে। একালে বিভিন্ন দেশে এই উভয় প্রকারের অপরাধের বিভক্তি বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। যেমন, কোন কোন দেশে একটি বিশেষ অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অন্য একটি দেশের ব্যবস্থানুযায়ী সেই অধিকারটি ব্যক্তির তহবিলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অপরাধের এই বিভক্তির ব্যাপারে ও প্রতিশোধ গ্রহণ স্পৃহা চরিতার্থতার জন্য কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা একান্তই জরুরী। অপরাধের প্রকৃতি সংক্রামক কি অন্তর্মুখি, এই ব্যাপারটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন যে অপরাধের প্রতিক্রিয়া সমাজের উপর যত গভীর হয়ে দেখা দেবে, সেই অনুপাতে অপরাধের বিভক্তিতে একটা মান স্থির করা আবশ্যক। কোন অপরাধের খারাপ প্রতিক্রিয়া গোটা সমাজের জন্য দেখা গেলে তার শাস্তি বিধানের জন্য রাষ্ট্র, সরকারের স্বতঃই এগিয়ে আসা ও সক্রিয় হয়ে উঠা জরুরী মনে হবে। অপর দিকে যে অপরাধের প্রতিক্রিয়া বেশির ভাগ মজলুম ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, অপরাধীকে তার শাস্তি প্রদানের জন্য সরকার যন্ত্র সক্রিয় হবে তখন, যখন মজলুম ব্যক্তি নিজে চিৎকার করবে ও প্রশাসনের বদ্ধ দুয়ারে করাঘাত হানবে।
আমরাও মনে কি, অপরাধসমূহকে উপরোক্ত দুইটি ভাগে বিভক্ত করা আবশ্যক। অবশ্য আমাদের দৃষ্টিতে বিভক্তির মানদণ্ড ভিন্নতর। আমাদের বিবেচনায় ব্যক্তিগত ধরনের অপরাধে ব্যক্তি একটা সিদ্ধান্তকারী মর্যাদার অধিকারী। সে সরকার যন্ত্রকে নিজের সাহায্যের জন্য ডাকবে, কি ডাকবে না, তার সিদ্ধান্ত সে নিজেই গ্রহণ করবে। আর ডাকলেও 'কিসাস' মতাদর্শের ভিত্তিতে ডাকবে, না দীয়াত-এর মতাদর্শের ভিত্তিতে সাহায্য প্রার্থনা করবে, এ বিষয়েও সে-ই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী। কিন্তু সামষ্টিক পর্যায়ের অপরাধে রাষ্ট্র-যন্ত্রকে অনতিবিলম্বে সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে এবং এই ধরনের অপরাধে 'কিসাস' মতাদর্শ-ই চূড়ান্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা সরকার 'দীয়াত' গ্রহণ করে অপরাধের ব্যবসায়ে নামতে পারে না। তবে ব্যক্তি ইচ্ছা করলে অপরাধীকে কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে-এ অধিকার তার আছে।
অপরাধসমূহের বিভক্তিতে ভাবতে হবে, কোন্ কোন্ অপরাধ সমাজসমষ্টির বিরুদ্ধে এবং কোন্ কোন্টি ব্যক্তির বিরুদ্ধে পড়ে। আধুনিক আইন ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয় মানের (Standard) বিভক্তি উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণে উচ্ছৃঙ্খলতা ও নির্লজ্জতাজনক কার্যাবলী সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যায়নি। তাই প্রস্তাবিত বিভক্তিতে সমাজ থেকে নির্লজ্জতাজনক ও উচ্ছৃঙ্খলতাপূর্ণ কার্যাবলী সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্যকে সম্মুখে রাখতে হবে গুরুত্ব সহকারে। আমাদের মতে নির্লজ্জতাজনক ও উচ্ছৃঙ্খলতার অপরাধসমূহ-যা গোটা সমাজকে বিপর্যস্ত ও কলুষিত করে দেয়-সরকারী তহবিলে সমর্পিত হওয়া আবশ্যক। সরকার এসব অপরাধের জন্য কঠিন ও কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করে এসব মারাত্মক ব্যাধির মাত্রা বা সংখ্যা হ্রাস করে আনবে। আর অবশিষ্ট অপরাধসমূহ ব্যক্তির তহবিলেই গণ্য হতে থাকবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00