📄 শাস্তির ভয়াবহতা
শাস্তিকে ভয়াবহ করে অপরাধীর মনে একটা তীব্র ভীতির উদ্রেক করা এবং তার সাহায্যে ব্যক্তিকে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত রাখা শাস্তি সংক্রান্ত দ্বিতীয় ধরনের মতাদর্শের লক্ষ্য। এই মতাদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তির মধ্যে অপরাধের উদ্বোধন হওয়া মাত্রই তার চোখের সম্মুখে শাস্তির ভয়াবহ রূপ এতই স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠবে যে, তা দেখা মাত্রই উদ্বোধন কম্পিত ও অবদমিত হয়ে যাবে। অন্য কথায়, এই মতাদর্শ অনুযায়ী শাস্তিটাকে অবশ্যই এতটা ভয়াবহ হতে হবে যে, খুব প্রচণ্ড ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধনও কাউকে অপরাধ করার দিকে অগ্রসর হতে দিবে না। অর্থাৎ অপরাধীর ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য আতংক সৃষ্টিকারী শাস্তির ব্যবস্থা থাকা এবং তার যথাযথ কার্যকর হওয়াটা সুনিশ্চিত হওয়া একান্তই আবশ্যক। শুধু ঘোষিত শাস্তির ভয়াবহতাই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট হয় না। তার কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তাও অবধারিত ও একান্তই অপরিহার্য। কেননা এটা পরীক্ষিত যে, চোরাচালানের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'ফায়ারিং স্কোয়াডে' দাঁড় করানোর ঘোষণা বারবার দেওয়া সত্ত্বেও চোরাচালানের অপরাধ থেকে অপরাধীদের বিরত রাখা কিংবা তার মাত্রা একবিন্দু হ্রাস করা সম্ভব হয়নি শুধু এই কারণে যে, এই অনুযায়ী অপরাধীদের অবশ্যই ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানোর কোন নিশ্চয়তা ছিল না। ঘোষণাকারীদের প্রতিও আস্থা ছিল না যে, এই ঘোষণাকে তারা অবশ্যই কার্যকর করবে। বস্তুত শাস্তি যতই ভয়াবহ হবে এবং তার 'কার্যকরতা যতই সুনিশ্চিত ও অবধারিত হবে অপরাধীরা সেই অনুপাতেই অপরাধ থেকে বিরত থাকবে-থাকতে বাধ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক।
📄 প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থকরণে দৃষ্টিকোণ
বিশেষ কোন অপরাধে যারাই প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের মনে অতি স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠে। সুপ্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে মজলুমের মনে জেগে উঠা সেই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার পরিবেশও বাস্তব কারণে সৃষ্টি করে। কেননা অপরাধের দরুন কোন বিশেষ ব্যক্তির স্বার্থ ও অধিকারের উপর হামলা হওয়ার কারণে তার মনে প্রতিশোধের আগুন গলিত উত্তপ্ত লাভার মত তরঙ্গায়িত হয়ে উঠে। প্রাচীনতম কালে প্রত্যেক ব্যক্তিরই নিজস্বভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের স্বাধীনতা বা অনুমতি ছিল। বর্তমান কালেও ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের ঘটনাবলী নিত্য সংঘটিত হতে যত্রতত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল ও ক্রমবিকাশমান সমাজের পক্ষে এই পদ্ধতি শত রকমের সমস্যা সৃষ্টিকারী হয়ে দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা আইনের বিচারের তোয়াক্কা না করে 'আইন'কে নিজ হস্তে গ্রহণ করে। ফলে প্রতিশোধ স্পৃহা চরম প্রতিহিংসার রূপ পরিগ্রহ করে ব্যাপকভাবে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। কোন সুশৃঙ্খল সমাজ ও প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এইরূপ অবস্থাকে মুহূর্তের তরেও চলতে দিতে পারে না। এই কারণে রাষ্ট্র সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিভাবক হিসাবে প্রতিশোধ গ্রহণের সুষ্ঠু ও আইনসম্মত পন্থা বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে শাস্তিটাকে অবশ্যই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্য যথেষ্ট ও তার মাধ্যম হওয়া একান্তই আবশ্যক। অন্যথায় ব্যক্তির মধ্যে জ্বলে উঠা প্রতিশোধ স্পৃহার আগুনের লেলিহান শিখা গোটা সমাজকে ভস্মীভূত করে দিবে। একটি প্রতিশোধ আরও অধিক মাত্রার এবং অনেক বেশি সংখ্যার অপরাধ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফল কথা সমান মাত্রার অবস্থায় শাস্তিটা প্রতিশোধ স্পৃহাকে যত বেশি চরিতার্থ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, ততই তৎপরবর্তী কালে সম্ভাব্য অপরাধের সংখ্যা ও মাত্রা হ্রাস করতে সাহায্য করবে।
📄 সংশোধনমূলক শাস্তির দৃষ্টিকোণ
শাস্তির উদ্দেশ্য প্রতিশোধ গ্রহণ না হয়ে অপরাধীর সংশোধন হওয়া বাঞ্ছনীয় মনে করে এইরূপ শাস্তির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধীর মন-মানসিকতা থেকে অপরাধ প্রবণতার মূলোৎপাটন করা। এই মতাদর্শ উপস্থাপকদের ধারণা, মূলত অপরাধ একটা রোগ বিশেষ। সেই 'রোগে'র কারণেই ব্যক্তি অপরাধ করতে বাধ্য হয়। অতএব তাকে কোনরূপ শাস্তিদান সুবিচারমূলক পদক্ষেপ নয়। বরং উত্তম ও শোভন পন্থা হচ্ছে, অপরাধীর এই অপরাধ রোগের মূলে নিহিত কারণসমূহের সন্ধান করা এবং তা দূর করে তার মন-মানসিকতাকে সুস্থ ও রোগমুক্ত করে তোলা।
এই মতের যথার্থতা প্রশ্নাতীত নয়। অপরাধ প্রবণতাকে রোগের মত মনে করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেননা অপরাধের মূলে ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ ও সংকল্প অবশ্যম্ভাবী; কিন্তু রোগের পিছনে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসলে কোন 'রোগে'র কারণে মানুষ অপরাধ করে না। সে জন্য প্রয়োজনীয় ইচ্ছা সংকল্প ও উদ্যোগ ব্যক্তির ইচছাধীন ও স্বেচছামূলক। অবশ্য এই উদ্বোধনের কারণ বিভিন্ন হতে পারে। ফলে কার্য ও কারণের আলোকে প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র অপরাধের কারণ নির্ধারণে বহু কাজ মনস্তত্ত্ববিশারদের প্রয়োজনীয়তার সাথে সাথে সংশোধনী প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য আরও বহু কয়জনের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। আর মনস্তত্ত্ববিশারদরা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে যতই পারদর্শী বা বিশারদ হোক না কেন, মানব মনের গভীর সূক্ষ্ম জটিলতা ও বৈচিত্র্যের কারণে তার সমস্ত অবস্থা ও স্বরূপ নির্ধারণ এবং এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্ভুল হওয়ার নিশ্চয়তা লাভ কিছু মাত্র সহজ কাজ নয়। এই ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ববিদদের সাফল্যের পরিবর্তে ব্যর্থতাই অবধারিত।
উপরন্ত একবারের চিকিৎসার পর রোগী পুনরায় অপরাধ করে বসলে তখন তার সমস্ত দায়িত্ব সেই মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসকদেরই গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কোন মনস্তত্ত্ববিদই সেজন্য প্রস্তুত বলে মনে করা যুক্তিযুক্ত বিবেচিত নয়। ফলে অপরাধের উদ্বোধনের বাস্তব সম্মত চিকিৎসা সম্ভবই হবে না। তার পরিণামে অপরাধের মাত্রাতিরিক্ততা ও সংখ্যাধিক্য সম্পূর্ণ নিশ্চিত বলা যায়। তাই এই সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গীকে সম্পূর্ণরূপে গুরুত্বহীন মনে না করেও তা একটি লক্ষ্য বা একমাত্র উপায় হিসাবে গ্রহণ করা কোন রাষ্ট্র সরকারের বিচার বিভাগের পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। পূর্বোদ্ধৃত তিনটি দৃষ্টিকোণ অবলম্বনে যে শুভ ফলশ্রুতির আশা করা যায়, মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধন প্রতিরোধের জন্য সংশোধন পদ্ধতি অবলম্বনের অনুরূপ ফলশ্রুতির আশা করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেননা উদ্বোধনের আসল উৎস হচ্ছে মানুষের মধ্যে নিহিত বিদ্রোহী প্রকৃতি। আর তা কোন মনস্তাত্ত্বিক রোগের ব্যাপার নয়। অবশ্য এটা অসম্ভব নয় যে, কোন কোন অবস্থায় কোন মনস্তাত্ত্বিক রোগও অপরাধের উদ্বোধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এই পর্যায়ের অপরাধীদের প্রতি লক্ষ্য রেখে সাধারণ ও সর্বজনগ্রাহ্য দণ্ড দর্শনকে পরিবর্তন করা কোনক্রমেই উচিত হতে পারে না। খুব বেশি কিছু করা হলে পাগলদের অপরাধের ন্যায় সেই সব অপরাধেরও স্বরূপ নির্ধারণ করা যাবে, যেসবের জন্য সংশোধনমূলক শাস্তি পদ্ধতি উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন শিশু অপরাধীদের জন্য এমন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যার ফলে তাদের মনে অপরাধের প্রতি তীব্র ঘৃণা জাগিয়ে দেয়া সম্ভব হবে এবং তারা স্বতঃই পরিচ্ছন্ন ও অপরাধমুক্ত জীবন যাপনে আগ্রহী হয়ে উঠবে। কেননা সংশোধনমূলক শাস্তি দর্শনের ক্ষেত্র খুবই সীমিত। তাই সাধারণ দণ্ড দর্শন নির্ধারণের লক্ষ্যে তা পরিহার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকতে পারে না।
📄 শিক্ষামূলক শাস্তি
উপরে বলে এসেছি, শাস্তিটা শিক্ষামূলক বা দৃষ্টান্তস্থানীয় হলেই অপরাধের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাবে। কেননা, পূর্বে যেমন বলেছি, অপরাধের কারণ হচ্ছে 'উদ্বোধক'। অনুকূল পরিবেশে তা অধিক শক্তিশালী হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং প্রতিকূল পরিবেশে তা দমে যায়। বর্তমানের সভ্যতাগবী ও সংস্কৃতি ধন্য জগতে সাধারণত যে ধরনের শাস্তি প্রয়োগ করা হয়, ফাঁসি, জেলে আটক বা জরিমানা প্রভৃতিই তার রূপ। কিন্তু এই তিন প্রকারের শাস্তির প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিক্ষামূলকতা বা দৃষ্টান্তস্থানীয় হওয়ার কোন গুণই অবশিষ্ট থাকে না। ফাঁসির কথাই ধরা যাক। তা একটি শিক্ষামূলক শাস্তিহলেও যেহেতু তা কারাগারের গোপন কুঠরিতে এত গোপনীয়তা সহকারে কার্যকর করা হয় যে, সেই কারাগারের অন্যান্য কয়েদীরাও তা দেখা তো দূরের কথা, টেরও পায় না।
এক-একদিন বা এক-এক সময় হয়ত বহু কয়জনকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মারা হয়; কিন্তু সাধারণ কয়েদী বা জনজীবনে তার একবিন্দু প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না। তার অর্থ, আধুনিক কালের কঠিন-কঠোর শাস্তিসমূহ মানব-মনে প্রতিক্রিয়ার এতটুকু তরঙ্গও জাগাতে পারে না। তা কখনই শিক্ষামূলক বা দৃষ্টান্তস্থানীয়-যা দেখে অন্যরা অনুরূপ শাস্তির অপরাধ এড়িয়ে চলার সংকল্প গ্রহণ করবে-হতে পারে না। কারাগারের পাশ দিয়ে যাতায়াত কালে হয়ত মনে জাগবে যে, এর মধ্যে শত শত লোক তিল তিল করে বন্দী জীবন যাপন করছে। কিন্তু পরবর্তী মুহূর্তে তার সমস্ত প্রভাব মনের কল্পলোক থেকে তিরোহিত হয়ে যায়। ফলে এই মৃত্যুদণ্ড বা বন্দীদশা জনগণের মধ্যে অনুরূপ পরিণতির অপরাধ থেকে বিরত থাকার প্রবণতা জাগাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ জন্যে এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার যে খুব বেশি প্রয়োজন, তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
এই দৃষ্টিতে বলা যায়, এই ফাঁসির দণ্ড যদি কারাগারের অভ্যন্তরে নয়- প্রকাশ্যভাবে ও বিপুল জনতার উপস্থিতিতে কার্যকর করা হয়, তা'হলে তা নিঃসন্দেহে শিক্ষামূলক ও দৃষ্টান্তস্থানীয় হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে হত্যা অপরাধের কোন কোন উদ্বোধন থেকে থাকলে তা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলন্ত অপরাধীর কল্পনায় স্বতঃই মৃত্যুবরণ করবে।
অনুরূপভাবে কোন অপরাধের শাস্তি স্বরূপ কাউকে দ্বীপান্তরের দণ্ডে দণ্ডিত করা হলেও তা জনগণের জন্য তেমন শিক্ষামূলক হয় না। কোন অপরাধী সেখান থেকে দীর্ঘদিনের শাস্তি ভোগ করে প্রত্যাবর্তন করলেও কেউ জানতেই পারবে না যে, সে একজন অপরাধী এবং দীর্ঘমেয়াদী দ্বীপান্তরের শাস্তি ভোগ করে ফিরে এসেছে। তার জীবন কোন অপরাধের কালিমায় কলুষিত হয়ে আছে, তা কারুর পক্ষে আঁচ করাও সম্ভব হবে না। কিন্তু এর বদলে যদি তার জন্য এমন কোন শাস্তি সাব্যস্ত করা হতো, যা তাকে অন্যান্যদের থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে দিত, তা'হলে তা অবশ্যই সকলের জন্য শিক্ষামূলক ও দৃষ্টান্তস্থানীয় হতো এবং তার ফলে জনমনে অনুরূপ অপরাধ থেকে দূরে সরে থাকার একটা প্রবল ইচ্ছা ও চেষ্টা সক্রিয় হয়ে উঠত। এ থেকে স্পষ্ট মনে হয়, পাশ্চাত্য আইনের প্রস্তাবিত শাস্তিসমূহ জনগণকে অপরাধবিমুখ বানাক, প্রস্তাবকরা তা আদৌ চায়নি। ফলে তা এই দিক দিয়ে জনজীবনে কোন রেখাপাত করেনি, সমাজকে পারেনি অপরাধমুক্ত করতে। তাই একথা স্বীকার না করে কোন উপায়ই নেই যে, অপরাধের জন্য সেই শাস্তিই যথার্থ ও উপযোগী, যা জনগণকে অনুরূপ অপরাধ থেকে সযত্নে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে।