📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 সুবিচার ব্যবস্থার ভিত্তি

📄 সুবিচার ব্যবস্থার ভিত্তি


প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়সঙ্গত ও স্বভাবসম্মত অধিকার যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দেওয়াই হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব। মানুষের এই অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই হচ্ছে এই ব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভিত্তিটিকে কোন্ শক্তিবলে প্রতিষ্ঠিত রাখা সম্ভবপর হতে পারে। বিশ্বমানবতার আদ্যোপান্ত ইতিহাস এবং আধুনিক কালের সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থা উদাত্ত কণ্ঠে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, জনগণের অধিকার যথাযথ সংরক্ষণের অনন্য উপায় হচ্ছে এই অধিকার ক্ষুন্ন করাকে অপরাধ গণ্য করা এবং অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার মাত্রানুযায়ী অপরাধীকে ক্ষমাহীন পন্থায় শাস্তি প্রদান করা। এই শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া জনগণের অধিকার রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এ ব্যাপারে কোন সমাজ ব্যবস্থারই ভিন্নতর কোন দৃষ্টিভঙ্গী থাকতে পারে না। যদিও কোন বিশেষ অপরাধে কোন্ শাস্তিটা কত মাত্রায় প্রয়োগ করা হবে কিংবা শাস্তিসমূহের স্বরূপ কি হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। এই কারণে বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ইনসাফ পদ্ধতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু শাস্তি কার্যকর করা ছাড়া যে ইনসাফ হতে পারে না, তদ্বিষয়ে কোথাও কোন মতভেদ নেই।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শিক্ষামূলক শাস্তি

📄 শিক্ষামূলক শাস্তি


'শাস্তি সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে-বিদ্রোহী মন-মানসিকতায় যে বিদ্রোহ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তা সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তিটা দেখে যেন শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে। ইংরেজী পরিভাষায় এই শাস্তিকে Ratterent বলা হয়। ইতিহাস সাক্ষী, এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দৃষ্টান্তমূলক বা শিক্ষা কিংবা উপদেশমূলক শাস্তিসমূহ চিরদিন অপরাধের সংখ্যা হ্রাস করার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। যখনই কঠোর কঠিন শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, সমাজে অপরাধের সংখ্যা দ্রুততার সহিত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আবার যখনই শাস্তির কঠোরতার মাত্রা কম করা হয়েছে, অপরাধের সংখ্যা তখনই হু হু করে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। এ থেকে এই মূলনীতি পাওয়া যায় যে, শাস্তির কঠোরতা-নমনীয়তার সহিত অপরাধের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। এই মৌলনীতিটি সর্বাবস্থায় এবং সকল দেশের অবস্থার প্রেক্ষিতেই অনুধাবনীয়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে মানুষ অপরাধ করার জন্য একটা উদ্বোধন নিজের অভ্যন্তর থেকে লাভ করে। এই উদ্বোধন এবং তার পরবর্তী ফলশ্রুতির মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবেই একটা দ্বন্দ্ব চলে। সে দ্বন্দ্বে উদ্বোধন উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী ফলশ্রুতি অর্থাৎ সে অপরাধের অনিবার্য শাস্তি সংক্রান্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সে উদ্বোধনকে দমন বা পরাজিত করতে ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে, শাস্তির কঠোরতায় শিক্ষা বা উপদেশ গ্রহণের মাত্রা অত্যন্ত দুর্বল রয়েছে। তখন ব্যক্তি অপরাধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কার্যত অপরাধ করে বসবে। কিন্তু অপরাধের পরবর্তী ফলশ্রুতি বা তৎসংক্রান্ত শাস্তিতে উপদেশ বা শিক্ষার মাত্রা প্রবল থাকলে ব্যক্তি অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। অন্য কথায়, শাস্তিকে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালনের যোগ্য বানাবার লক্ষ্যে শাস্তিকে শিক্ষামূলক বানানোর মতাদর্শটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে। তখন এই শিক্ষামূলক বা অপরাধ প্রতিরোধক শাস্তি সময়ের অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করে এমনভাবে কার্যকর করতে হবে, যার ফলে শাস্তিটা অপরাধের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধনের চূড়ান্ত মাত্রার প্রতিরোধক হয়ে থাকবে চিরকালের জন্য।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 শাস্তির ভয়াবহতা

📄 শাস্তির ভয়াবহতা


শাস্তিকে ভয়াবহ করে অপরাধীর মনে একটা তীব্র ভীতির উদ্রেক করা এবং তার সাহায্যে ব্যক্তিকে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত রাখা শাস্তি সংক্রান্ত দ্বিতীয় ধরনের মতাদর্শের লক্ষ্য। এই মতাদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তির মধ্যে অপরাধের উদ্বোধন হওয়া মাত্রই তার চোখের সম্মুখে শাস্তির ভয়াবহ রূপ এতই স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠবে যে, তা দেখা মাত্রই উদ্বোধন কম্পিত ও অবদমিত হয়ে যাবে। অন্য কথায়, এই মতাদর্শ অনুযায়ী শাস্তিটাকে অবশ্যই এতটা ভয়াবহ হতে হবে যে, খুব প্রচণ্ড ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধনও কাউকে অপরাধ করার দিকে অগ্রসর হতে দিবে না। অর্থাৎ অপরাধীর ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য আতংক সৃষ্টিকারী শাস্তির ব্যবস্থা থাকা এবং তার যথাযথ কার্যকর হওয়াটা সুনিশ্চিত হওয়া একান্তই আবশ্যক। শুধু ঘোষিত শাস্তির ভয়াবহতাই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট হয় না। তার কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তাও অবধারিত ও একান্তই অপরিহার্য। কেননা এটা পরীক্ষিত যে, চোরাচালানের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'ফায়ারিং স্কোয়াডে' দাঁড় করানোর ঘোষণা বারবার দেওয়া সত্ত্বেও চোরাচালানের অপরাধ থেকে অপরাধীদের বিরত রাখা কিংবা তার মাত্রা একবিন্দু হ্রাস করা সম্ভব হয়নি শুধু এই কারণে যে, এই অনুযায়ী অপরাধীদের অবশ্যই ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানোর কোন নিশ্চয়তা ছিল না। ঘোষণাকারীদের প্রতিও আস্থা ছিল না যে, এই ঘোষণাকে তারা অবশ্যই কার্যকর করবে। বস্তুত শাস্তি যতই ভয়াবহ হবে এবং তার 'কার্যকরতা যতই সুনিশ্চিত ও অবধারিত হবে অপরাধীরা সেই অনুপাতেই অপরাধ থেকে বিরত থাকবে-থাকতে বাধ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থকরণে দৃষ্টিকোণ

📄 প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থকরণে দৃষ্টিকোণ


বিশেষ কোন অপরাধে যারাই প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের মনে অতি স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠে। সুপ্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে মজলুমের মনে জেগে উঠা সেই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার পরিবেশও বাস্তব কারণে সৃষ্টি করে। কেননা অপরাধের দরুন কোন বিশেষ ব্যক্তির স্বার্থ ও অধিকারের উপর হামলা হওয়ার কারণে তার মনে প্রতিশোধের আগুন গলিত উত্তপ্ত লাভার মত তরঙ্গায়িত হয়ে উঠে। প্রাচীনতম কালে প্রত্যেক ব্যক্তিরই নিজস্বভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের স্বাধীনতা বা অনুমতি ছিল। বর্তমান কালেও ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের ঘটনাবলী নিত্য সংঘটিত হতে যত্রতত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল ও ক্রমবিকাশমান সমাজের পক্ষে এই পদ্ধতি শত রকমের সমস্যা সৃষ্টিকারী হয়ে দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা আইনের বিচারের তোয়াক্কা না করে 'আইন'কে নিজ হস্তে গ্রহণ করে। ফলে প্রতিশোধ স্পৃহা চরম প্রতিহিংসার রূপ পরিগ্রহ করে ব্যাপকভাবে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। কোন সুশৃঙ্খল সমাজ ও প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এইরূপ অবস্থাকে মুহূর্তের তরেও চলতে দিতে পারে না। এই কারণে রাষ্ট্র সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিভাবক হিসাবে প্রতিশোধ গ্রহণের সুষ্ঠু ও আইনসম্মত পন্থা বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে শাস্তিটাকে অবশ্যই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার জন্য যথেষ্ট ও তার মাধ্যম হওয়া একান্তই আবশ্যক। অন্যথায় ব্যক্তির মধ্যে জ্বলে উঠা প্রতিশোধ স্পৃহার আগুনের লেলিহান শিখা গোটা সমাজকে ভস্মীভূত করে দিবে। একটি প্রতিশোধ আরও অধিক মাত্রার এবং অনেক বেশি সংখ্যার অপরাধ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফল কথা সমান মাত্রার অবস্থায় শাস্তিটা প্রতিশোধ স্পৃহাকে যত বেশি চরিতার্থ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, ততই তৎপরবর্তী কালে সম্ভাব্য অপরাধের সংখ্যা ও মাত্রা হ্রাস করতে সাহায্য করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00