📄 অধিকারের নিরাপত্তা
মানব প্রকৃতিতে বিদ্রোহের প্রবণতা পূঞ্জীভূত হয়ে আছে। এই কারণে স্বীয় সংকীর্ণ দৃষ্টির শিকারে পরিণত হয়ে মানব প্রকৃতি ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধার লক্ষ্যে অন্যদের কর্মসীমাকে লংঘন করে তার অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে বসে। তখন অনিবার্যভাবে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং এই সংঘর্ষের ফলে বৃহত্তর মানব গোষ্ঠীর জীবনে চরম বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তখন সামষ্টিক জীবনের প্রাণ-সম্পদ নিয়মতান্ত্রিকতা চূর্ণ- বিচূর্ণ ও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে। এই কারনে অধিকারসমূহ সংরক্ষণার্থে একটা কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করা একান্তই আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। এই পদ্ধতি যথাযথভাবে ও মাত্রায় কার্যকর হলে মানব প্রকৃতি নিহিত বিদ্রোহ প্রবণতা-যা অন্যদের অধিকারের সহিত সংঘর্ষ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়-স্বতঃই মৃত্যুবরণ করে।
ইসলাম এই উদ্দেশ্যে দ্বৈত পন্থা অবলম্বন করেছে : মানুষের মন-মানসিকতার সংশোধন পরিশুদ্ধিকরণ এবং বাহ্যিক সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণ। প্রথম পন্থার কার্যকরতা বলিষ্ঠ হয়ে উঠে আল্লাহ্, রাসূল ও পরকাল বিশ্বাসের সাহায্যে এবং দ্বিতীয় পন্থা কার্যকর হয় প্রকাশ্য সরকার শক্তির বলে প্রতিরোধমূলক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। ইসলামের এই দ্বৈত পন্থা অবিচ্ছিন্ন। কেবল একটা পন্থা-ই তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিছু মাত্র যথেষ্ট হতে পারে না। সর্বক্ষেত্রে মন ও মানসিকতার বিশ্বাসগত ওপরিবর্তন ও সংশোধন ব্যতীত নিছক বাহ্যিক আইন প্রয়োগ দ্বারাই বিদ্রোহ প্রবণতা দমন করা সম্ভব হয় না যেমন, তেমনি বাহ্যিক আইন প্রয়োগ শিকেয় তুলে রেখে শুধু মন-মানসিকতার পরিশুদ্ধি সাধন ইন্সিত লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে বাধ্য। বস্তুত সমাজকে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার জন্য এক সাথে উভয় পন্থার প্রয়োগ একান্তই অপরিহার্য, আর এই দু'টিই দীন ইসলামের এপিঠ-ওপিঠ মাত্র। নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও আইনগত- এই উভয়বিধ সংশোধনী প্রক্রিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় ঘটেছে দীন-ইসলামে। যেখানে যেখানে পূর্ণ ভারসাম্য সহকারে এই উভয় পন্থার প্রয়োগ হয়েছে, সেখানে- সেখানে ব্যক্তি মানুষ ও সামাজিক মানুষ পূর্ণ ইনসাফ সহকারে জীবন যাপন করার সৌভাগ্যে ধন্য হয়েছে।
وَ اَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَ اَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيْدٌ وَ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ
....এবং আমরা নাযিল করেছি সেই নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে 'আল-কিতাব ও আল-মীযান'-যেন জনগণ সুবিচার ও ইনসাফ সহকারে জীবন যাপন করতে পারে এবং নাযিল করেছি 'লৌহ'-জবরদস্ত (প্রচণ্ড) শক্তি তথা সার্বভৌমত্ব, তাতে নিহিত রয়েছে বিরাট শক্তি, জনগণের জন্য বিপুল কল্যাণ। -সূরা হাদীদ : ৬
📄 সুবিচার ব্যবস্থার ভিত্তি
প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়সঙ্গত ও স্বভাবসম্মত অধিকার যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দেওয়াই হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব। মানুষের এই অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই হচ্ছে এই ব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভিত্তিটিকে কোন্ শক্তিবলে প্রতিষ্ঠিত রাখা সম্ভবপর হতে পারে। বিশ্বমানবতার আদ্যোপান্ত ইতিহাস এবং আধুনিক কালের সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থা উদাত্ত কণ্ঠে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, জনগণের অধিকার যথাযথ সংরক্ষণের অনন্য উপায় হচ্ছে এই অধিকার ক্ষুন্ন করাকে অপরাধ গণ্য করা এবং অধিকার ক্ষুন্ন হওয়ার মাত্রানুযায়ী অপরাধীকে ক্ষমাহীন পন্থায় শাস্তি প্রদান করা। এই শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া জনগণের অধিকার রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এ ব্যাপারে কোন সমাজ ব্যবস্থারই ভিন্নতর কোন দৃষ্টিভঙ্গী থাকতে পারে না। যদিও কোন বিশেষ অপরাধে কোন্ শাস্তিটা কত মাত্রায় প্রয়োগ করা হবে কিংবা শাস্তিসমূহের স্বরূপ কি হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। এই কারণে বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ইনসাফ পদ্ধতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু শাস্তি কার্যকর করা ছাড়া যে ইনসাফ হতে পারে না, তদ্বিষয়ে কোথাও কোন মতভেদ নেই।
📄 শিক্ষামূলক শাস্তি
'শাস্তি সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে-বিদ্রোহী মন-মানসিকতায় যে বিদ্রোহ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তা সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তিটা দেখে যেন শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে। ইংরেজী পরিভাষায় এই শাস্তিকে Ratterent বলা হয়। ইতিহাস সাক্ষী, এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দৃষ্টান্তমূলক বা শিক্ষা কিংবা উপদেশমূলক শাস্তিসমূহ চিরদিন অপরাধের সংখ্যা হ্রাস করার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। যখনই কঠোর কঠিন শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, সমাজে অপরাধের সংখ্যা দ্রুততার সহিত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আবার যখনই শাস্তির কঠোরতার মাত্রা কম করা হয়েছে, অপরাধের সংখ্যা তখনই হু হু করে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। এ থেকে এই মূলনীতি পাওয়া যায় যে, শাস্তির কঠোরতা-নমনীয়তার সহিত অপরাধের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। এই মৌলনীতিটি সর্বাবস্থায় এবং সকল দেশের অবস্থার প্রেক্ষিতেই অনুধাবনীয়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে মানুষ অপরাধ করার জন্য একটা উদ্বোধন নিজের অভ্যন্তর থেকে লাভ করে। এই উদ্বোধন এবং তার পরবর্তী ফলশ্রুতির মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবেই একটা দ্বন্দ্ব চলে। সে দ্বন্দ্বে উদ্বোধন উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী ফলশ্রুতি অর্থাৎ সে অপরাধের অনিবার্য শাস্তি সংক্রান্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সে উদ্বোধনকে দমন বা পরাজিত করতে ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে, শাস্তির কঠোরতায় শিক্ষা বা উপদেশ গ্রহণের মাত্রা অত্যন্ত দুর্বল রয়েছে। তখন ব্যক্তি অপরাধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কার্যত অপরাধ করে বসবে। কিন্তু অপরাধের পরবর্তী ফলশ্রুতি বা তৎসংক্রান্ত শাস্তিতে উপদেশ বা শিক্ষার মাত্রা প্রবল থাকলে ব্যক্তি অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। অন্য কথায়, শাস্তিকে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালনের যোগ্য বানাবার লক্ষ্যে শাস্তিকে শিক্ষামূলক বানানোর মতাদর্শটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে। তখন এই শিক্ষামূলক বা অপরাধ প্রতিরোধক শাস্তি সময়ের অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করে এমনভাবে কার্যকর করতে হবে, যার ফলে শাস্তিটা অপরাধের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধনের চূড়ান্ত মাত্রার প্রতিরোধক হয়ে থাকবে চিরকালের জন্য।
📄 শাস্তির ভয়াবহতা
শাস্তিকে ভয়াবহ করে অপরাধীর মনে একটা তীব্র ভীতির উদ্রেক করা এবং তার সাহায্যে ব্যক্তিকে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত রাখা শাস্তি সংক্রান্ত দ্বিতীয় ধরনের মতাদর্শের লক্ষ্য। এই মতাদর্শ অনুযায়ী ব্যক্তির মধ্যে অপরাধের উদ্বোধন হওয়া মাত্রই তার চোখের সম্মুখে শাস্তির ভয়াবহ রূপ এতই স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠবে যে, তা দেখা মাত্রই উদ্বোধন কম্পিত ও অবদমিত হয়ে যাবে। অন্য কথায়, এই মতাদর্শ অনুযায়ী শাস্তিটাকে অবশ্যই এতটা ভয়াবহ হতে হবে যে, খুব প্রচণ্ড ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বোধনও কাউকে অপরাধ করার দিকে অগ্রসর হতে দিবে না। অর্থাৎ অপরাধীর ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য আতংক সৃষ্টিকারী শাস্তির ব্যবস্থা থাকা এবং তার যথাযথ কার্যকর হওয়াটা সুনিশ্চিত হওয়া একান্তই আবশ্যক। শুধু ঘোষিত শাস্তির ভয়াবহতাই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট হয় না। তার কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তাও অবধারিত ও একান্তই অপরিহার্য। কেননা এটা পরীক্ষিত যে, চোরাচালানের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ 'ফায়ারিং স্কোয়াডে' দাঁড় করানোর ঘোষণা বারবার দেওয়া সত্ত্বেও চোরাচালানের অপরাধ থেকে অপরাধীদের বিরত রাখা কিংবা তার মাত্রা একবিন্দু হ্রাস করা সম্ভব হয়নি শুধু এই কারণে যে, এই অনুযায়ী অপরাধীদের অবশ্যই ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানোর কোন নিশ্চয়তা ছিল না। ঘোষণাকারীদের প্রতিও আস্থা ছিল না যে, এই ঘোষণাকে তারা অবশ্যই কার্যকর করবে। বস্তুত শাস্তি যতই ভয়াবহ হবে এবং তার 'কার্যকরতা যতই সুনিশ্চিত ও অবধারিত হবে অপরাধীরা সেই অনুপাতেই অপরাধ থেকে বিরত থাকবে-থাকতে বাধ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক।