📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 আইন কার্যকরকরণের পদ্ধতি

📄 আইন কার্যকরকরণের পদ্ধতি


অপরাধ প্রমাণ করা এবং শরীয়তের আইন কার্যকর করার পদ্ধতি পর্যায়ে মূল আলোচনা শুরু করার পূর্বে একটি কথা বলে রাখা আবশ্যক মনে করছি। তা এই যে, মানবতার জন্য এমন একটি নেতৃত্ব একান্তই অপরিহার্য, যা হবে সর্বতোভাবে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য। যার অন্তরে থাকবে মানবতার প্রকৃত কল্যাণ কামনা, দয়া-অনুগ্রহ এবং জনগণের অপরাধ প্রবণতার রোগ চিকিৎসার জন্য সাহসিকতা ও নির্ভীকতা। তার এক হাতে যেমন থাকবে রোগের ঔষধ, তেমনি অন্য হাতে থাকবে অপমানকর অপরাধ নির্মূল করার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এরূপ ব্যবস্থা হতে পারে যদি মুসলমান সমাজ সুসংবদ্ধ ও দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি একান্ত নিবেদিত হয় এবং তাদের আনুগত্য সম্পূর্ণ-রূপে নিবদ্ধ হয় আল্লাহ্ জন্য। তাঁর কিতাবে ও রাসূলের সুন্নাতে বিধৃত জীবন বিধানকে পুরাপুরি অনসুরণ করে চলতে শুরু করে। তাতে সামাজিক রোগ নিরাময় ও অপরাধ প্রতিরোধের যে বিধান রয়েছে, নাস্তিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিদ'আত, নৈতিক অপরাধ, জান-মাল-ধন-সম্পদে অগ্রাসন প্রতিহত করার মত দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতা থাকে।

বস্তুত অপরাধ বিভিন্ন, রূপ তার বিচিত্র, ব্যাপারটি দুরূহ, তার বিপদটা ভয়াবহ। এরূপ অবস্থায় তার প্রতিবিধান আল্লাহ্র দীনের একাংশের প্রতি ঈমান ও অপর অংশের প্রতি কুফরী-এই নীতি দ্বারা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তার ফলে অপরাধ দমন ও মূলোৎপাটন কখনই সম্ভবপর হবে না, তার মাত্রাও কম করা যাবে না। বরং তার পরিণাম হবে অবর্ণনীয় ক্ষতি ও বিপর্যয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাই এই ধরনের মনোবৃত্তিকে লক্ষ্য করে বলেছেন: "তোমরা কি আল্লাহ্ কিতাবের বিধানের কিছু অংশের প্রতি ঈমানদার আর কিছু অংশের প্রতি কুফরী কর ?.... জেনে রাখো, এই নীতি অবলম্বনকারীদের দুনিয়ায় চরম লাঞ্ছনা অবমাননা ছাড়া আর কিছু পরিণতি বা শাস্তি হতে পারে না।"

ধন-মাল ও জান প্রাণের উপর ব্যক্তিগণের সীমালংঘনমূলক আচরণে যে বিপদ ঘটে, তার চাইতে অনেক বেশি, ভয়াবহ ও ব্যাপক বিপদ ঘটে নাস্তিকতা, আল্লাহ্র শরীয়ত বাদ দিয়ে শাসন কার্য পরিচালনা এবং জান-মাল-ধনে মানব রচিত আইন-বিচার প্রয়োগ করায়। কেননা প্রথমোক্ত অপরাধসমূহ ব্যক্তি পর্যায়ের, সমাজ সমষ্টির নিকট থেকে তার সমর্থন পাওয়া যায় না। কিন্তু এই শেষোক্ত ধরনের কার্যকলাপ তো প্রায় দেশেই বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক আইন বিধান পূর্ণোদ্যমে ও নির্ভীকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় মুসলমান সামজ যে ব্যাপক বিপর্যয় ও কঠিন সমস্যাবলীর মধ্যে নিমজ্জিত, তার প্রতিবিধান কি করে সম্ভবপর হতে পারে?.... অথচ আল্লাহ্র পূর্ণাঙ্গ কিতাবের প্রতি ঈমান গ্রহণ ও তাকে পুরামাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করতেও তারা রাযি নয়।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সকলেই চান অপরাধ পুরামাত্রায় দমন হোক, যেন জনগণ পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে জীবন যাপন করতে পারে। চান, তাদের সর্বপ্রকারের সমস্যাবলীর সঠিক ও সুষ্ঠু সমাধান হোক। সর্বমুখী বিপদ ও বিপর্যয় থেকে তারা মুক্তি পাক, সে জন্য তারা নিত্য নতুন পথা, উদ্ভাবিত তত্ত্ব ও তথ্য এবং রচিত আইন কানুন তথা প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রক্রিয়ারও আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কিন্তু সর্বত্রই চরম ব্যর্থতা ও নৈরাশ্য হতাশা ছাড়া তাদের ভাগ্যে আর কিছুই জোটে না। তা সত্ত্বেও এই সবের সার্থাক প্রতিবিধানের লক্ষ্যে ইসলামী শরীয়ত যেসব কার্যকর আইন বিধান পেশ করেছে, তাকে পুরাপুরি গ্রহণ ও বাস্তবায়নেও তারা রাযি হচ্ছে না।

বস্তুত বর্তমান দুনিয়ার সাধারণভাবে মুসলিম সামজ দুর্বল অক্ষম, শত্রুদের পদলেহনে অভ্যস্ত-যে শত্রুরা প্রতি মুহূর্তে তাদের ধ্বংস সাধনের জন্য পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, তারা তাদের নিকট থেকেই তাদের সমস্যাবলীর সমাধান পাবে বলে আশা করছে। ভরসা করে আছে, তাদের উপর নিত্যকার আগ্রাসন থেকে ওরাই তাদের রক্ষা করবে। অথচ তা কোন দিনই সম্ভব নয়, সম্ভব বলে মনে করাও চরম নির্বুদ্ধিতা বৈ কিছু নয়।

বর্তমান দুনিয়ায় মুসলমানদের প্রশাসনে, বিচারে, নৈতিকতায়, অনুসরণে, শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে জীবনের সকল দিকে ও বিভাগে ইসলামী জীবন বিধানের অনুপস্থিতিই শুধু নয়, মারাত্মক ধরনের অবহেলাও লংঘন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আসলে এটাই একটা বড় অপরাধ, যার অবিলম্বে চিকিৎসা হওয়া বাঞ্ছনীয়। চিকিৎসা হওয়া আবশ্যক আল্লাহ্র নিকট থেকে সর্বাত্মক আযাব ও মহাবিপর্যয় আসার পূর্বেই। কেননা আল্লাহ্র স্পষ্ট অকাট্য নিষিদ্ধ কার্যাবলী যখন পূর্ণ ধৃষ্টতা সহকারে ঘটতে শুরু করে। তাঁর দেয়া জীবন-বিধানের প্রতি উপেক্ষা ও পদদলন ব্যাপক হয়ে উঠে, তখন আল্লাহ্ও সত্য-সহনশীলতা একটা চূড়ান্ত পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, যদিও আযাবটা তিনি সঙ্গে-সঙ্গেই দিয়ে দেন না। কেননা তিনি তাঁর বান্দাদের 'তওবা' করার ও ভুল-সংশোধনের সুযোগ দেন তাঁর অপার দয়া ও অনুগ্রহরে কারণে। কিন্তু তাদের প্রত্যাবর্তনের সকল সম্ভাবনাই যখন নিঃশেষ হয়ে যায়, আল্লাহ্ সীমালংঘন থেকে তারা বিরত থাকতে প্রস্তুত হয় না-তওবা করে না, তখন এই কঠিন অপরাধের ইহকালীন শাস্তি স্বরূপ ভয়-ত্রাস জীবন-ধন-মানের কঠিন অবক্ষয়, অভাব-অনটন-দুর্ভিক্ষের রাহুগ্রাস তাদের গিলে ফেলে। এ-ই হচ্ছে মহান আল্লাহ্র স্থায়ী নিয়ম তাঁর বান্দাদের প্রতি।

এ কথা সকল সংশয়ের ঊর্ধ্বে যে, মহান ইসলামী শরীয়ত মহান সৃষ্টিকর্তারই দেয়া বিধান। তিনি তাঁর নিজের সৃষ্ট বান্দাদের সার্বিক জীবনকে কল্যাণময় করার লক্ষ্যেই এই বিধান নাযিল করেছেন। তাদের ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবন কেবলমাত্র এই বিধান গ্রহণ অনুসরণ ও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ধন্য হতে পারে, সর্ব সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারে, সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ হতে পারে-বলিষ্ঠ হতে পারে আল্লাহ্র সহিত বান্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক। আল্লাহর কালেমা-দ্বীন এভাবেই সর্বোচ্চ ও বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং কুফর ও গুমরাহী হতে পারে পরাজিত, পরাভূত। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত মহান সৃষ্টিকর্তার পূর্ণ দাসত্ব স্বীকার করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কোন কল্যাণের একবিন্দু আশা করা যায় না। কেননা এটাই মানুষের সৃষ্টির মূলে নিহিত মহান স্রষ্টার ইচ্ছা ও লক্ষ্য। একথা আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন: "আমি মানুষ ও জীনকে সৃষ্টি করেছি কেবল মাত্র এ উদ্দেশ্যে যে, তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেরাই আমার দাসত্ব করবে।"

আল্লাহ্ প্রেরিত নবী-রাসূলগণও আবহমানকাল ধরে মানুষের সম্মুখে এই দাওয়াতই পেশ করেছেন: "প্রতিটি জনসমষ্টিতেই আমি নবী-রাসূল পাঠিয়েছি এই দাওয়াত নিয়ে যে, তোমরা কেবলমাত্র এক আল্লাহ্র দাসত্ব স্বীকার কর এবং যে সব শক্তি ও ব্যক্তি তোমাদেরকে আল্লাহ্র বান্দা হতে দেয় না, নিজেদের বান্দা বানিয়ে রাখতে সচেষ্ট, তাদের বাদ দিয়ে চল।"

কিন্তু একান্তভাবে আল্লাহ্ ইবাদত ও সম্পূর্ণ আনুগত্য-অধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না-হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে না, যতক্ষণ না মানুষ এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনে তাঁরই দেয়া বিধান মুতাবিক পূর্ণ শান্তি সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে জীবন যাপন করতে শুরু করছে। আর তাও বাস্তব হতে পারে কেবলমাত্র তখনই, যখন অপরাধ প্রবণ লোকদের জন্য ভয় প্রদর্শনকারী শাস্তি ও দণ্ডসমূহ পুরাপুরি কার্যকর হবে। এই শাস্তি ও দণ্ড অপরাধকারীদের যথার্থ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে পারে, আর যাদের মনে তার প্রবণতা রয়েছে তারাও দমিত হতে পারে অপরাধের শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর হতে দেখতে পেলে। প্রকৃত সুবিচার ও ন্যায়পরতার প্রতিষ্ঠা ইসলামী সমাজের জন্য একান্তই অপরিহার্য এবং এই সুবিচার ও ন্যায়পরতা কেবল মাত্র আল্লাহর বিধান কার্যকর হলেই বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব। এই কথাই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন কুরআন মজীদের এ আয়াতে: "আল্লাহ্ই তোমাদের আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপক বা উপযুক্ত লোকদের নিকট পৌছিয়ে দাও এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করবে, তখন অবশ্যই সুবিচার ও ন্যায়পরতা সহকারে তা করবে।" এই আদেশ অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে তারাই মুসলমান। যারা করে না তারা প্রকৃত মুসলিম নয়-কাফির: "যারাই আল্লাহ্ নাযিল করা বিধান অনুযায়ী বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই কাফির।"

অতএব আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে বিচার ফয়সালা ও শাসন কার্য পরিচালনা সম্পূর্ণ কুফরি এবং আল্লাহর বান্দাদের কঠিন বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছু পরিণতি নিয়ে আসে না। বিচার-ফয়সালার জন্য প্রথমে অপরাধ প্রমাণ করা আবশ্যক। অপরাধ প্রমাণিত না করে শাস্তি বা দণ্ড কার্যকর করা নিতান্তই যুলুম, অবিচার ও আল্লাহদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছু নয়। আর যুলুম ও অবিচারের যে শাসন তা কখনই স্থিতিশীল হতে পারে না আল্লাহর সৃষ্ট এই যমীনে।

আল্লাহর এই মহান শরীয়ত দুনিয়ায় নাযিল হয়েছে আল্লাহর বান্দাদের সর্ব প্রকারের রোগের একমাত্র চিকিৎসা হয়ে। এই চিকিৎসা প্রয়োগের পর কোন রোগের নাম চিহ্নও থাকেত পারে না, যদি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ ও কার্যকর করা হয় এবং তা হয় এমন ব্যক্তি বা জনসমষ্টির হাতে, যার ঐকান্তিক ঈমান রয়েছে মহান আল্লাহর প্রতি, আল্লাহর নিকট থেকে আসা এই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-বিধানের প্রতি। শরীয়তকে কায়েম করার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে, থাকতে হবে সার্বিকভাবে সমগ্র মানবতার কল্যাণ কামনা।

সত্যিকথা, জীবনে যে অপরাধই সংঘটিত হোক, তার প্রতিবিধান ও শান্তি প্রদানের ব্যবস্থা ইসলামী শরীয়ত করেছে। কিভাবে কখন সেই প্রতিবিধান কার্যকর করতে হবে তা-ও স্পষ্ট কর জানিয়ে দিয়েছে। অপরাধ প্রমাণের উপায় ও পন্থা কি হতে পারে, সে বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের বক্তব্য সুস্পষ্ট। এসব ব্যাপার লোকদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরং অপরাধ প্রমাণের ব্যাপারটি কয়েকটি ব্যাপার ও আলামতের সাথে যুক্ত করে দিয়েছে। অতএব একজনকে অপরাধী হওয়ার ফয়সালা দেওয়া কেবল তখনই সম্ভব, যখন তার অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিস আয়ত্ত ও উপস্থাপিত হবে এবং সেসবের ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে যে, সে বাস্তবিকই অপরাধ করেছে। কুরআন মজীদে এই সবের মৌলনীতি বিধৃত এবং রাসূলে করীমের সুন্নাত তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে।

এই পর্যায়ের আলোচনায় প্রথম বক্তব্য এই যে, অপরাধ প্রমাণের জন্য প্রয়োজন - الْبَيِّنَةُ অকাট্য দলীল ও প্রমাণ। নবী করীম (সা) ঘোষণা করেছেন: "লোকেরা যা দাবি করে তা-ই যদি তাদের দেওয়া হতো, তাহলে লোকেরা নিশ্চয়ই অন্য লোকদের রক্ত ও ধন-মালের দাবি করে বসত। তাই যার উপর দাবি করা হয়েছে কিরা করার সুযোগ তাকে দিতে হবে।"

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে: বিবাদীর কিরা-কসমের ভিত্তিতেও রাসূলে করীম (সা) ফয়সালা ও বিচার করেছেন। বাদীর নিকট যদি কোন প্রমাণ না থাকে তার দাবির পক্ষে, তা'হলে বিবাদী বা অভিযুক্তকে নির্দোষিতার হলফ করে মুক্তি ও নিষ্কৃতি দিতে হবে।

হাদীসের এই الْبَيِّنَةُ -এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে: 'আল-বায়্যিনাহ' শব্দের অর্থ সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং এমন নিদর্শন বা চিহ্ন, যা লক্ষ্যের দিকে পথ নির্দেশ করে ও জানিয়ে দেয় যে, এটাই হচ্ছে লক্ষ্যে পৌছার পথ। তা যেমন বিবেক-বুদ্ধিসম্মত হতে পারে, অথবা হতে পারে অনুভবযোগ্য কিছু। এর নাম 'বায়্যিনাহ্' রাখার কারণ হচ্ছে, তা লক্ষ্য উদ্‌ঘাটিত ও প্রকাশ করে।

ফিকাহ্র দার্শনিকদের মতে البينة হচ্ছে: যা-ই প্রকৃত সত্যকে প্রকাশ ও প্রকট করবে, তা-ই 'বায়্যিনাহ্'। সত্যের এই প্রকাশ স্বরূপে হোক, লক্ষণাদির দ্বারা হোক, সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা হোক, স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হোক, কিংবা হোক কিরা-কসমের সাহায্যে, তাতে কোন পার্থক্য নেই। তা সবই 'বায়্যিনাহ্'।

এই 'বায়্যিনাহ্' বা অকাট্য প্রমাণ কখনও হতে পারে সাক্ষ্য, কখনও অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিও হতে পারে। আবার কখনও বাদী বা অভিযোগকারীর কিরা-কসম এবং কখনও অভিযুক্তের নিজের সাক্ষ্যও হতে পারে'-যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার 'লেয়ান'। অবস্থার লক্ষণাদি এবং পরিস্থিতির রূপ দ্বারাও অপরাধের সহিত অভিযুক্তের সম্পর্ক বোঝা যেতে পারে। 'শাহাদাত' বা 'সাক্ষ্য' বলতে বোঝায়, সাক্ষী যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছে, নিজ চক্ষে দেখতে পেয়েছে অথবা জানতে পেরেছে তার তা জানিয়ে দেয়া। এই সাক্ষ্য বলিষ্ঠ ও যথেষ্ট মাত্রার হলে দাবির বিষয়টি প্রমাণিত হতে পারে। যেমন (দুই পক্ষের কোন একজনের) স্বীকৃতি-স্বীকারোক্তি (Confession)। সে যা করেছে সে বিষয়ে অথবা যে বিষয়ে তাকে অভিযুক্ত হতে হয়েছে, সেই বিষয়ে জানিয়ে দেয়া- তা সত্য কি অসত্য। স্বীকারোক্তির সময়ের পূর্ববর্তী ব্যাপার প্রকাশ করা, তার অস্তিত্বের ঘোষণা দেয়া।

'আল-য়ামীন' অর্থ হলফ বা শপথ (Oath) করা, কিরা-কসম খাওয়া। 'য়ামীন' নাম রাখা হয়েছে এজন্য যে, দুইজন পরস্পর বিরোধী ব্যক্তির একজন তার ডান হাত অপরজনের ডান হাতের উপর লাগিয়ে তালি দিয়ে থাকে।

লক্ষণ বলতে চিহ্ন বা নিদর্শন বোঝায়, যা অভিযোগকারী বা বাদীর গোটা ব্যাপারের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে, তার দ্বারা বোঝা যায় প্রকৃত ঘটনা কি ছিল। এই লক্ষণের বর্তমানতা মূল ঘটনার বাস্তবতার প্রদর্শক।

মানুষের সমস্যাবলীর পরিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইসলামী শরীয়ত যে বিশেষ ভূমিকা পালন করে তা এই যে, শরীয়ত মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে-মানুষের সুস্থ চেতনা অনুভূতি ও সংবেদনশীলতাকে আহ্বান করে, উদ্বুদ্ধ করে। মন-মানসিকতাকে জাগ্রত করে এবং এই দুনিয়ায় অপরাধের নির্ধারিত শাস্তির কথা জানিয়ে দিয়ে মানুষকে সন্ত্রস্ত ও সচেতন করে। স্মরণ করিয়ে দেয় অপরাধের পরকালীন হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দানের নিশ্চিত ব্যবস্থার কথা। ফলে কোন সুস্থ মানুষই পাপ বা অপরাধের দিকে অগ্রসর হতে সাহস পায় না। তেমন কোন ব্যাপার সম্মুখবর্তী হলে তার অন্তরে কম্পন শুরু হয়ে যায়, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে পরকালীন আযাবের কথা স্মরণ করে। এরূপ অবস্থায় কেউ যদি কারুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তা'হলে সে সাক্ষ্য দেবে কেবলমাত্র পরকালীন হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফলের ভয়ে। মানুষ তখন নিজের সম্পর্কে এমন কোন স্বীকারোক্তিও করে না, যার ফলে তাকে কঠিন শাস্তি ও ধ্বংসের পরিণতি লাভ করতে বাধ্য হতে হবে। সাক্ষ্যদাতাও কোন মিথ্যা সাক্ষ্য দানে উদ্যত হতে পারে না। পক্ষান্তরে সাক্ষ্যদাতা সত্যকে গোপন করারও সাহস পায় না। কেননা আল্লাহ্ ঘোষণানুযায়ী সাক্ষ্য গোপনকারীও মিথ্যাবাদী গণ্য হবে। তাই তাকে সাক্ষ্য দিতে হবে ঠিক ততটুকুর, যতটুকু সে নিজে জানে। না জেনেও কেউ সাক্ষ্য দিলে সে তো নিজেকেই ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে। সাক্ষীকে অবশ্যই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে, যার সে সাক্ষ্য দিচ্ছে। কুরআন মজীদে তাই বলা হয়েছে: "তবে কেউ যদি জ্ঞানের ভিত্তিতে সত্যের সাক্ষ্য দেয়..." এ আয়াতাংশ অনুযায়ী সাক্ষ্যদানের প্রথম শর্ত, তা সত্যের সাক্ষ্য এবং সত্যতা সহকারে হতে হবে। আর দ্বিতীয় শর্ত, সে সাক্ষ্য হতে হবে জ্ঞানের ভিত্তিতে, জানা-শুনা বিষয়ের জন্য। না-জানা বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার অধিকার কারুর নেই। আর শুধু জানলেই হবে না, জানা বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে হবে পরম সততা ও যথার্থতা সহকারে। অপর একটি আয়াতের অংশ হচ্ছে: "যা কিছু আমরা জানতে পেরেছি, আমরা শুধু তা-ই বর্ণনা করছি-শুধু তারই সাক্ষ্য দিচ্ছি।"

এখানেও সাক্ষ্য দানের ব্যাপারটি জানা-শুনার আওতার মধ্যে সীমিত। শরীয়ত এই বিধানও দিয়েছে যে, যে লোক কোন গুনাহ্ বা অপরাধ করবে সে প্রকাশ্যভাবে তা থেকে তওবা করবে-তওবা করেছে তা প্রকাশ্য ভাবে বলতে হবে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: "যে লোক কোন খারাপ-পাপ বা অপরাধের কাজ করবে কিংবা নিজের উপর যুলুম করবে, পরে সে আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে অতীব ক্ষমাশীল ও নিরতিশয় দয়াবান পাবে।"

একটি স্ত্রীলোক যিনা করার পর সে তা স্বীকার করলে নবী করীম (সা) তার এই স্বীকারোক্তির জন্য তার প্রশংসা করেছিলেন। অনুরূপভাবে সাক্ষ্যদান ও সত্য গোপন করা থেকে বিরত থাকার জন্য উৎসাহ দান করেছেন তিনি। কেননা সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত আরোপ করা হয়েছে যে, সাক্ষ্যদাতাকে অবশ্যই মুসলিম, সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানবান এবং সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী হতে হবে। তাকে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ ও চারিত্রিক দোষে অ-অভিযুক্ত। তাই মুসলমানের বিরুদ্ধে কাফির ব্যক্তির সাক্ষ্য, অবিবেকসম্পন্ন এবং সাক্ষ্য বিষয়ে না-জানা লোক এবং ফাসিক-সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে নিজের বা নিজের বংশধরদের বা পিতার জন্য ফায়দা পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। অবশ্য অমুসলিমদের জন্য অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে-যদি অন্যান্য শর্ত পুরাপুরি পাওয়া যায়।

বালকদের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে তা তাদের পারস্পরিক আঘাত যখম ইত্যাদির ব্যাপারে, যতক্ষণ তাদের সাথে তাদের বড়রা মিলিত না হচ্ছে এবং স্বতন্ত্রভাবে থাকা অবস্থায় তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হবে। কেননা বড়রা তাদেরকে আসল ঘটনা থেকে ভিন্নতর কিছু শিখিয়ে-পড়িয়ে দিতে পারে।

প্রমাণিত হওয়া ও সাক্ষ্য গ্রহণের দিক দিয়ে অপরাধসমূহ পারস্পরিক বিভিন্ন। কোন কোন অপরাধ প্রমাণের জন্য মাত্র দুইজন সাক্ষী-ই যথেষ্ট হতে পারে। আবার কোন অপরাধে সাক্ষীদের সংখ্যা চার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যেমন যিনা, ব্যভিচার ও লাওয়াতাত (পুংমৈথুন) অপরাধ প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের নিম্নতম সংখ্যা চার। তবে শেষোক্ত অপরাধ প্রমাণেও চারজন সাক্ষীর প্রয়োজনের বেলা শরীয়ত-অভিজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারো-কারো মতে সেজন্য দু'জন সাক্ষী-ই যথেষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন, সে অপরাধের শাস্তিও ঠিক তাই, যা যিনার শাস্তি। ফলে তাঁরা যিনা প্রমাণের যে শর্ত, লাওয়াতাত প্রমাণেও সেই শর্তই আরোপ করেছেন।

কোন কোন অপরাধের প্রমাণ শুধু কিরা-কসম। যেমন হত্যা।

কোন কোন অপরাধ প্রমাণিত হয় শুধু বাদীর সাক্ষ্যে। 'লেয়ান' হচ্ছে সেই অপরাধ। স্বামী যদি স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপরাধে অভিযুক্ত করে এবং সেখানে অন্য সাক্ষী কেউ না থাকে, তবে এই সাক্ষ্যটা উপস্থাপনে বহু কয়টি শর্ত রয়েছে। সাক্ষীকে পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে। তাকে পর পর চারবার সাক্ষ্য দিতে হবে যে, তার স্ত্রী যিনা করেছে এবং পঞ্চমবারে বলতে হবে, সে যদি মিথ্যা বলে থাকে তা'হলে তার উপর যেন খোদার লা'নত বর্ষিত হয়। কুরআন মজীদের আয়াতে এই কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে: "যেসব স্বামী নিজেদের স্ত্রীদের যিনার অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং তাদের নিকট নিজে ছাড়া আর কোন সাক্ষী না থাকে, তাহলে তাদের এক-একজন চার-চারবার আল্লাহর নামে কসম করে সাক্ষ্য দেবে যে, সে সত্যবাদী।"

কোন কোন অপরাধ স্বতঃই অপরাধীর স্বীকারোক্তির দ্বারা প্রমাণিত হয়। তবে এই স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হচ্ছে স্বীকারোক্তিকারীর যোগ্যতা। তা থাকলেই সে স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অবশ্য স্বীকারোক্তি অপরাধ প্রমাণের লক্ষ্যে সাক্ষ্যের তুলনায় অধিক শক্তিশালী। কেননা তাকে কেউ মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে তার কোন আশংকা থাকে না। উপরন্তু কোন সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির লোক কোন মিথ্যা অভিযোগ স্বীকার করে নিজের ক্ষতি সাধন করতে প্রস্তুত হবে-এমন কথা চিন্তা করা যায় না। তাই সেই সাথে এই শর্তও রয়েছে যে, স্বীকারোক্তিটা মিথ্যা প্রমাণিত হবার আশংকা থেকে মুক্ত হতে হবে।

ঘটনা বা অপরাধ সংশ্লিষ্ট লক্ষণাদিও যে প্রমাণ হিসাবে বিবেচ্য হতে পারে এবং তা অপরাধের সত্যাসত্য প্রমাণে প্রত্যক্ষ সহায়তা করতে পারে। কুরআন মজীদে উদ্ধৃত ইউসুফ (আ) সংক্রান্ত কিস্সা তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। হযরত ইউসুফ যার ঘরে অবস্থান করতেন, সেই মহিলা-ই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু তিনি তার ডাকে সাড়া দিতে অস্বীকার করেন ও তার ঘর থেকে পালিয়ে যেতে চান। এই সময় সেই মহিলা তাঁকে ধরে ফেলে জামার কোণ ধরে টান দেয়। তাতে পিছন দিক থেকে জামা ছিঁড়ে যায়। ঠিক এই সময়ই ঘরের কর্তা দরজার মুখে উপস্থিত হয়, আর অমনি মহিলাটি বলতে শুরু করে, আমার কোন দোষ নেই, ও-ই আমার প্রতি খারাপ ইচ্ছা নিয়ে এসেছিল। হযরত ইউসুফ (আ) তার প্রতিবাদ করে বললেন, ওর কথা সত্য নয়। ও নিজেই আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তখন দুইজনের বক্তব্যের মধ্যে কোন্টি সত্য, তা প্রমাণের জন্য মহিলার ঘরেরই একজন লোক লক্ষণাদিকে ভিত্তি করে বিশ্লেষণমূলক সাক্ষ্য দিল। বলল, ইউসুফের জামা সম্মুখের দিক দিয়ে ছেঁড়া হলে বুঝতে হবে মহিলা সত্য বলছে। আর পিছন দিকে থেকে ছেঁড়া হলে ইউসুফ-ই সত্যবাদী হবে। এই ফর্মুলার ভিত্তিতে যখন তদন্ত করা হলো, তখন ইউসূফেরই সত্যতা প্রমাণিত হলো এবং মহিলাই যে এই অপরাধের জন্য দায়ী তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো।

এই দীর্ঘ কাহিনী জানিয়ে দিচ্ছে যে, অবস্থার লক্ষণাদিও সাক্ষ্যের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে এবং সে লক্ষণাদি থেকেই প্রকৃত সত্য জানা যেতে পারে, প্রমাণিত হতে পারে আসল অপরাধী কে বা কার অপরাধ কতটুকু। কাজেই অবস্থা সংশ্লিষ্ট লক্ষণাদিকে উপেক্ষা করা ঠিক হবেনা এবং সাক্ষী নেই বলে অপরাধের বিচার হবে না, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হবে না-তা হতেই পারে না। বিশেষত এজন্য যে, অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সর্বক্ষেত্রে থাকতেই হবে, এমন কথা যুক্তিসঙ্গত নয়। অপরাধীরা যথাসম্ভব লুকিয়ে ও লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেই অপরাধ করে থাকে, কাউকে দেখিয়ে অপরাধ করার ব্যাপারটি চিন্তনীয় নয়।

বহু সংখ্যক অপরাধ প্রমাণে ঘটনার লক্ষণাদির গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে, তা রাসূলের সুন্নাত থেকেও প্রমাণিত। কেননা ঘটনার লক্ষণাদি ও তার আশ-পাশ বা পার্শ্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করা হলে এবং সে সবের প্রেক্ষিতে প্রকৃত ঘটনার স্বরূপ জানতে চেষ্টা করা না হলে কঠিন ও ব্যাপক বিপর্যয় এবং মারাত্মক ক্ষতি ও বিপদের সৃষ্টি হওয়ার খুব সম্ভাবনা। অথচ মহান সুদৃঢ় শরীয়ত সর্বপ্রকার বিপদ ক্ষতি, অন্যায় ও বিপর্যয়ের পথ সমূলে রুদ্ধ ও উৎপাটিত করার জন্যই এসেছে। আর শরীয়তের লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার প্রতিবিধান এবং তার সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জনগণকে সাহায্য দান। মুসলিম উম্মতের আবহমানকালীন নেতৃবৃন্দও অবস্থার লক্ষণাদির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছেন-বিশেষত বিচারের ক্ষেত্রে। তাঁদের রেখে যাওয়া জ্ঞানেও অবস্থার লক্ষণাদির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপের কথা জানা যায়।

হযরত সুলায়মান ও দাউদ (আ)-এর একটি ঘটনা স্বয়ং নবী করীম (সা) বর্ণনা করেছেন। তা এই দুইজন স্ত্রীলোক একটি বাচ্চাকে নিয়ে দাবি তুলেছে যে, এ আমার সন্তান। চূড়ান্ত বিচারের জন্য তারা হযরত দাউদের নিকট উপস্থিত হলো। তখন তিনি বাচ্চাটিকে বেশি বয়সের স্ত্রীলোকটিকে দিয়ে দিলেন। এই সময় সুলায়মান (আ) উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন: আপনি এ কি বিচার করলেন? ব্যাপারটি আমার কাছে ছেড়ে দিন, আমিই সঠিক বিচার করব। তখন সুলায়মান (আ) বললেন, তোমরা একটা ছুরি নিয়ে আস। বেশি বয়সের মেয়েলোকটি জিজ্ঞেস করল, কি জন্য? বললেন: আমি ছুরি দিয়ে বাচ্চাটিকে দুই খণ্ডে বিভক্ত করে তোমাদের দুই জনকে দেব। সেই বেশি বয়সের স্ত্রীলোকটি খুব তাড়াহুড়া করে একটা ছুরি নিয়ে উপস্থিত হলো। এতেই হযরত সুলায়মান বুঝতে পারলেন যে, এ বাচ্চা তার সন্তান নয়। কেননা কোন মা-ই তার সন্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার জন্য নিজেই ছুরি এনে দিতে পারে না। তখন তিনি সন্তানটি ছোট বয়সের মেয়েলোকটিকে দিয়ে দিলেন। এই মেয়েলোকটিই যে বাচ্চাটির মা এবং বাচ্চাটির যে তারই সন্তান, বেশি বয়সের মেয়েলোকটির সন্তান নয়, তা অবস্থার লক্ষণ থেকেই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

হযরত আলী (রা)-এর জীবদ্দশার একটি ঘটনা। একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক হযরত আলী (রা)-এর দিকে এগিকে গেল এবং বলল: হে আমীরুল মু'মিনীন! এই মহিলা আমার মা। কিন্তু সে তা অস্বীকার করছে। হযতর আলী (রা) মেয়েলোকটি দেখলেন। সে কৃষ্ণাঙ্গিনী নয়, সে শ্বেতাঙ্গিনী। জিজ্ঞেস করলেন: এই যুবকের এই দাবি সম্পর্কে তুমি কি বলতে চাও? বললো, 'না-ও আমার সন্তান নয়, আমি ওকে চিনিও না।' তখন হযরত আলী (রা) মহিলাটির অভিভাবকদের লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমরা কি তোমাদের এই মেয়েলোকটির ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই। তখন হযরত আলী তাঁর খাদেমকে দিয়ে ঘর থেকে কিছু নগদ অর্থ আনিয়ে উক্ত যুবকটিকে বললেন: নাও, এই মেয়েলোকটিকে তোমার দেয় মহরানা। আমি তোমাকে ওর সাথে বিয়ে দেব। আর তুমি ওর হাত ধর, আর কাল যখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে তোমার শরীরে বিয়ের হলুদ দেখতে চাই'। এই কথা শুনে মেয়েলোকটি চিৎকার করে উঠল। বলল-এ তো জাহান্নামে যাবার ব্যবস্থা। এ হতে পারে না, হে আমীরুল মু'মিনীর! এ যুবক তো আমারই সন্তান'। তা হলে সে প্রথম তা অস্বীকার করেছিল কেন, জিজ্ঞেসা করা হলে এক দীর্ঘ কাহিনীর অবতারণা করল। বলল, ওর বাবা হাবশা থেকে হিজরত করে মদীনায় এসেছিল। তাকে দেখে আমার বাবা-মা খুশি হয়ে তার সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। অতঃপর খুব শীঘ্রই ওর বাবা যুদ্ধে চলে গেল, আমাকে বিয়ের কনে হিসাবে রেখে গেল। আর সেই যুদ্ধেই সে শহীদ হয়ে গেল। পরে আমি অনুভব করলাম যে আমি অন্তঃসত্ত্বা; কিন্তু ব্যাপারটি প্রকাশ হতে দিলাম না। ওকে প্রসব করার পর এক মরুচারীকে দিয়ে দিলাম এবং তাকিদ করে বলে দিলাম যে, আমার সাথে ওর কোন পরিচয় দিতে পারবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি গোপন থাকেনি।

এই ঘটনাও অবস্থার লক্ষণের ভিত্তিতে প্রকৃত ব্যাপার জানার একটা পন্থা উদ্ভাবনে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত, যদিও খুব কম লোকই অবস্থার লক্ষণ থেকে এত বড় দিকদর্শন লাভ করতে পারে। এজন্য তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন প্রতিভার একান্ত প্রয়োজন। মনস্তত্ত্ববিদ্যা একজনকে এতটা দক্ষ বানাতে পারে যে, সে একজনের প্রতি তাকিয়ে তার ভিতরে-মনে-কি আছে তা বলে দিতে পারবে। আরও অনেক ব্যাপারে তা থেকে অনেক প্রকারের কল্যাণ লাভ করা সম্ভব। ইসলামী আদালতে বিচারের ক্ষেত্রেও প্রকৃত ব্যাপার জানার পর এবং আসল অপরাধীকে চিহ্নিত বা পাকড়াও করার জন্য এই পন্থা ব্যবহৃত হতে পারে। তবে ব্যাপারটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, সব বিচারকই তা করতে সক্ষম না-ও হতে পারে।

টিকাঃ
১. এই প্রশংসাটা শুধু স্বীকারোক্তির জন্য ছিল না, সে যে স্বেচ্ছায় অপরাধ স্বীকার করেছে এবং শরীয়তের নির্দিষ্ট শাস্তি-প্রস্তর নিক্ষেপে প্রাণ সংহার গ্রহণ করে পবিত্র হয়ে খোদার নিকট উপস্থিত হওয়ার সংকল্প করেছিল, প্রশংসা ছিল এই আত্মাৎসর্গী কৃত ঈমানের জন্য।
২. কোন কোন ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য কাফিরের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কুরআনে বলা হয়েছে: يَا يُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا شَهَادَةُ بَيْنَكُمْ أَوْ احْضَرُ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ حِيْنَ الْوَصِيَّةِ হে ঈমানদারগণ তোমাদের কারুর সত্য উপস্থিত হলে তখন যেন অছীয়ত করা হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px