📄 অপরাধ দমনে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ-এর অবদান
দুনিয়ার জাতিসমূহ অপরাধ প্রতিরোধে প্রাণপণ চেষ্টা ও সংগ্রাম করে থাকে এবং সেজন্য তারা নানাবিধ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেও এক বিন্দু দ্বিধা বোধ করে না। কেননা নিত্য সংঘটিত অপরাধ মানুষের নিরাপত্তা বোধকে ধ্বংস করে, মানুষকে প্রতি মুহুর্ত রাখে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে। নিরাপত্তাহীন সমাজে মানুষের মনে সব সময়ই একটা আতংক বিরাজ করে। কি জানি, কোন্ মুহুর্তে কি অঘটন সংঘটিত হয়ে পড়ে।
বস্তুত অপরাধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। তা সমাজ জীবনে টেনে আনে চরম মাত্রায় দুর্ভাগ্য ও হতাশা। কেননা অপরাধ শান্তি ও নিরাপত্তাকে নির্মূল করে দেয়। অথচ এই শান্তি ও নিরাপত্তা বোধই হচ্ছে সামাজিক জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। এই প্রশান্ত সমাজ জীবন সংরক্ষণের লক্ষ্যে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য জাতিসমূহ নানা উপায় ও পন্থার উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। এজন্য নানা প্রকারের আইন-কানুন ও বিধি বিধান রচনা করে। সে সব আইন বিধানে তারা নানা প্রকারের ধারা-উপধারা সংযোজিত করে। সে জন্য প্রশাসনিক ও পুলিশী পাহারাদারীর বাস্তব ব্যবস্থাপনাও গ্রহণ করে। এই সব কিছুর মূলে লক্ষ্য থাকে অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে প্রবল প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করা যেন অপরাধ আদপেই সংঘটিত হতে না পারে।
অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজে সাধারণভাবে গৃহীত উপরোক্ত কর্মপন্থা সম্পর্কে একটু গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিচার-বিবেচনা করলেই একটি মাত্র সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। আর তা হচ্ছে, এই সব আইন-বিধান এবং সেজন্য গৃহীত প্রশাসনিক কর্মপন্থাসমূহের লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধ হতে না দেওয়া। বলা হয়, কোন একটা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হলে তা ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকের কাজ করে। কিন্তু বাস্তব ঘটনায় এই কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুদীর্ঘ কাল ধরে বারবার সংঘটিত একই ধরনের ঘটনাবলীর বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, অপরাধের শুধু শাস্তি বিধান অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু অপরাধীকে শাস্তি প্রদানই অপরাধ বিস্তার ও পুনরাবৃত্তি সাধনকে রুখতে পারে না, তেমনি অন্যদেরকেও শুধু তা-ই অপরাধ সংঘটন থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয় না।
অপরাধী অপরাধ সংঘটনের জন্য যেমন একটা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করে নেয়, তেমনি তার অনিবার্য শাস্তি এড়ানোর জন্যও অনেক সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। অপরাধ তদন্তকারীরা যাতে করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পেতে না পারে এবং এই অপরাধের বিচার করাও যাতে করে অপরাধীর উপর দণ্ডারোপ ও কার্যকর করতে সক্ষম না হয়, সেজন্য সম্ভাব্য সর্ব প্রকারের কৌশল গ্রহণেও এক বিন্দু পিছ পা হয় না। ধরা পড়ে গেলেও যাতে করে আইনের মারপ্যাঁচ ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম আইনের বিশ্লেষণের সাহায্যে সে দণ্ড থেকে রক্ষা পেয়ে যেতে পারে, তার জন্য একালে কলাকৌশলের এক বিন্দু কম নেই। রকমারি অপরাধের উদ্ভাবন যেমন একালের বৈশিষ্ট্য, তেমনি আইনের চোখে ধূলি দিয়ে দণ্ড এড়ানোর উপায় উদ্ভাবনেও এ কালের অবদান বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এটা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি এবং এই দিকে ইঙ্গিত করেই মানুষের স্রষ্টা ঘোষণা করেছেন: "কিন্তু মানুষ খুব বেশি ঝগড়াটে ও বিতর্ককারী হয়ে দাঁড়িয়েছে।" "ওরা এসব দৃষ্টান্ত তোমার সম্মুখে নিয়ে এসেছে নিছক কুটতর্কের উদ্দেশ্যে। আসলে ওরা লোক খুব ঝগড়াটে।"
এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অপরাধ প্রতিরোধে সফল এমন অনেক উপায় ও পন্থাই রয়েছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক মানব সমাজ সে বিষয়ে বিন্দুমাত্রও অবহিত নয়। এই কারণে তারা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র করছে না। আর এ পর্যায়ে চেষ্টা-প্রচেষ্টা যতই তারা চালাচ্ছে, সবই একের পর এক ব্যর্থই হয়ে যাচ্ছে। অপরাধ দমনের জন্য অতীব সফল ও অধিকতর কার্যকর যে পন্থার দিকে এই মাত্র ইঙ্গিত করা হলো তা হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার কার্যক্রম। এমন উপায় অবলম্বন যার দরুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশংকাই থাকে না। অথবা খুবই কম আশংকা থাকবে এবং অপরাধের মাত্রা খুবই কম হয়ে দাঁড়াবে। এমনকি, অপরাধ সংঘটিত হলেও সাধারণ নিরাপত্তাহীনতা ও আতংক সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া নিঃশেষ হয়ে যাবে। বস্তুত শুধুমাত্র মানবীয় চিন্তা-গবেষণা উদ্ভাবন এমন সম্যক আইন বিধান রচনায় সম্পূর্ণ অক্ষম, যা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে মানবতার জন্য একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনে দীর্ঘাতিদীর্ঘ কাল অতিবাহিত হয়ে গেছে মানুষের উপর দিয়ে কিন্তু মানুষ অপরাধ দমন প্রচেষ্টায় এক বিন্দু সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। এরূপ অবস্থায় মানবতার জন্য একমাত্র করণীয় হচ্ছে মহান আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। কেননা ভাল-মন্দ সমন্বিত এই মানুষের তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। মানুষ তার যাবতীয় সমস্যার সমাধান এবং কল্যাণ পথের দিশা একমাত্র তাঁরই নিকট থেকে লাভ করতে পারে। অপরাধ দমনে তাঁর ঐকান্তিক সাহায্য মানুষের জন্য একান্তই অপরিহার্য। আগেই বলেছি, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই-এমনকি তার পরেও দমন করতে মানবীয় আইন রচনা ও কার্যকর ভিত্তিক যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে গেছে। মানুষ অপরাধের শাস্তি বিধানের আইন অনেক রচনা করেছে কিন্তু তা অপরাধ প্রবণ লোকদের মধ্যে অপরাধ বিমুখতা-অপরাধের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। তার প্রমাণ এত সব আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যকর থাকা সত্ত্বেও অপরাধের মাত্রা নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যাওয়া। এমনকি যারা একবার অপরাধ করে আইনের বিচারে দণ্ডিত হয়েছে, তারাও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে না। প্রচলিত আইনে অপরাধের দণ্ড সাধারণত জেল-হাজতই হয়ে থাকে। কিন্তু একথা সকলেরই মুখে মুখে যে, চোর-ডাকাত খুনী জেল থেকে ফিরে আসতে পারলে সে হয় বড় চোর, ভয়ানক ডাকাত এবং অধিকতর নির্মম খুনী। কেননা অপরাধ করার পর আইনের বিচারে তারা যে শাস্তি ভোগ করেছে, তা তাদের মন-মগজে ও মেজাজের উপর একবিন্দু দাগ কাটতে পারেনি। মূল প্রকৃতিতে নিহিত অপরাধ প্রবণতা নির্মূল হয়নি। শুধু তা-ই নয়। তা সতেজ বৃক্ষের মত শক্ত কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে।
আসলে মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলা। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে তা তাঁর মত আর কেই-ই জানে না, জানতে পারে না। তাই তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে নিজেই আইন প্রণয়ন করে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে নাযিল করেছেন। এই পর্যায়ে দু'টি দৃষ্টান্ত দিয়ে বক্তব্যকে স্পষ্ট করে তুলতে চাই।
একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে চোরের হাত কাটার ব্যাপার। শরীয়ত আরোপিত শর্তসমূহের ভিত্তিতে চুরি প্রমাণিত হলে অবশ্যই চোরের হাত কাটতে হবে। আল্লাহ্ অন্য যে কোন সৃষ্টির তুলনায় মানুষের প্রতি অধিকতর দয়াশীল। তিনি চোরের জন্য যে শাস্তি বিধান করেছেন, তাতে মানুষের সার্বিক কল্যাণই বিধৃত, অকল্যাণের লেশমাত্র নেই এ'তে। কিন্তু একালের আইন রচয়িতাগণ চুরি অপরাধের জন্য এই দণ্ড অগ্রাহ্য করেছে। তার পরিবর্তে তারা যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে, তা মানুষকে সংশোধন করতে ও চৌর্যবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়নি। সে শাস্তি এই অপরাধের অবসান ঘটাতেও পারে নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের একবিন্দু বোধোদয় হচ্ছে না।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ফৌজদারী অপরাধের শাস্তি অনুরূপ ঘটনা ঘটানো। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: "তোমরা যুলুম করবে না, তোমাদের প্রতিও যুলুম করা হবে না।" অর্থাৎ ফৌজদারী অপরাধের শাস্তি হবে অপরাধের সমান। অপরাধ যা, তার শাস্তিও তাই। তাতে কোনরূপ যুলুম হওয়ার আশংকা বা অবকাশ থাকবে না।
সন্দেহ নেই, এমন বহু লোকই রয়েছে যারা চুরি ও দেহের ক্ষতিসাধনের অপরাধ থেকে বিরত থাকতে পারে বলে মনে করা যায় কেবল মাত্র তখন, যদি তারা তাদেরও অনুরূপ অঙ্গহানি বা কিসাস হওয়ার ভয়ে ভীত হয়।
মানুষ আল্লাহ্র নিকট অতীব সম্মানার্হ সৃষ্টি। তাই তাদের সভ্য করে তোলার এবং তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসার ব্যাপারটি এত কম সংখ্যক লোকের উপর ন্যস্ত করা কিছুতেই যুক্তিযুক্ত মনে করা যায় না, যারা তাদের বিশেষ অবস্থার সংশোধন সফল করতে সক্ষম হবে না। তাদের যাচাই করলে তাদের বিশেষ জীবনেই বহু সংখ্যক স্ব-বিরোধিতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নানা জটিল সমস্যা দেখা যাবে। এরূপ অবস্থায় মানুষের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের উপর কিছুতেই অর্পণ করা যেতে পারে না।
এই প্রেক্ষিতেই মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে তাঁরই সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর নিকট যে মহামূল্য গ্রন্থ কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে, তার গুরুত্ব বিবেচ্য। মানুষের উপর দিয়ে বহু আবর্তন-বিবর্তন অতিবাহিত হওয়ার পরই সর্বশেষ পর্যায়ে এই মহান গ্রন্থখানি অবতীর্ণ হয়েছে। এর পূর্বে আরও যে সব গ্রন্থ নাযিল হয়েছিল তা যেমন বিশেষ লোকদের জন্য বিশেষ সময়ের মধ্যে সীমিতভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যে, সেই লোক ও কালের অবর্তমানে সে সব অপ্রয়োজনীয় যুগ-অনুপযোগী ও মানব সমস্যার সমাধানে অক্ষম প্রমাণিত হওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। অবশ্য তাতে যে সব স্থায়ী অক্ষয় ও সর্বকালীন মূল্যমান (Values) সম্বলিত নীতি আদর্শ ছিল এবং যা মানব প্রকৃতির বিবর্তনশীল প্রবণতার সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন ছিল তা সর্বশেষ গ্রন্থে স্ব-মর্যাদা সহকারে সংযোজিত হয়ে শাশ্বত হয়ে রয়ে গেছে। এখনও তা অমোঘ ও চিরন্তন, যেমন অন্য নতুন বিধানসমূহ চিরন্তন ও অমোঘ। আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিম্নোদ্ধৃত দুইটি আয়াতে তা ঘোষণা করেছেন:
"মহা দয়াবান ও অতিশয় মেহেরবানের নিকট থেকে অবতীর্ণ এই কিতাব। এর আয়াতসমূহ আলাদা আলাদা করে পেশ করা হয়েছে আরবী ভাষায় পঠনীয় করে সেই লোকদের জন্য যারা জানে, সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদাতা হিসাবে। এ এমন এক গ্রন্থ যার আয়াতসমূহ সুদৃঢ় ও পরিপক্ক করা হয়েছে এবং পরে ভিন্ন ভিন্ন করা হয়েছে সুবিজ্ঞানী ও সর্ববিষয়ে অবহিত (মহান আল্লাহ্) নিকট থেকে।"
বস্তুত কুরআনের আয়াত এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকারী সুন্নাতের মূলের অকাট্য দলীলসমূহে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ও পরে তার প্রতিরোধের সমস্ত দিক সম্পর্কে বিপুল উপাদান সঞ্চিত হয়ে আছে। বিপুল সংখ্যক ইসলামী গ্রন্থেও রকমারি অপরাধমূলক ঘটনাবলীর সুবিন্যস্ত আলোচনা-পর্যালোচনার ও ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ভান্ডার পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। এখানে সেই সবকিছুর পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। আমি এখানে যে দিক নিয়ে আলোচনার অবতারণা করেছি, তা হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নিজের উপস্থাপিত 'আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুনকার'-এর বিষয়। মুসলিম উম্মাতকে লক্ষ্য করে তিনি ইরশাদ করেছেন:
"তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল অবশ্যই এমন হতে হবে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাতে, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করণের কাজে সব সময়ই ব্যাপৃত থাকবে। তোমরাই হচ্ছ উত্তম জনসমষ্টি। তোমরা ভালো কাজের আদেশ কর মন্দ কাজ করতে নিষেধ কর এবং সর্বাবস্থায়ই ঈমান রাখো আল্লাহর প্রতি।"
আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ রয়েছে: "তোমরা পরস্পরের সাহায্য কর পূণ্যময় কল্যাণ ও আল্লাহর ভয়সম্মত কাজে-কর্মে এবং কোনরূপ পারস্পরিক সাহায্যে এগিয়ে আসবে না গুনাহ, পাপ অন্যায় ও সীমালংঘনমূলক কার্যাদিতে। তোমরা ভয় কর আল্লাহকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কঠিন আযাব প্রদাতা।"
ইসলামী ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত অধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে বায়'আতে আকাবা। তাতেও 'ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ' এর উপর অকাট্য দলীলের উল্লেখ হয়েছে। বলা হয়েছে: আমরা বললাম, হে রাসূল; আমরা আপনার হাতে কি বিষয়ের উপর বায়'আত করব? বললেন: "তোমরা আমার হাতে বায়'আত করবে শ্রবণ ও আনুগত্য করার জন্য খুশি ও অখুশি সকল অবস্থায়ই। এবং ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজ নিষেধকরণের বিষয়ে।"
আমর বিল মারূফ-এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জনসাধারণের হৃদয়-মনে এই বিশ্বাস দৃঢ়প্রত্যয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করা যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ইহকালীন কার্যকলাপের প্রতিদান দেওয়ার জন্য জান্নাত, জাহান্নাম, কবর জীবনের আযাব বা নিয়ামতসমূহের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহর রোষ-অসন্তোষ কিংবা তাঁর সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করেই নির্ণীত হয় বান্দার পরকালীন সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য। এই বিশ্বাসকে দৃঢ়মূল করে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে 'আমর বিল মারূফ' ও নিহী আনিল মুনকার'-এর ভূমিকা অত্যন্ত প্রকট ও প্রবল। ফলে অপরাধ পরিহার করে চলার প্রবণতা এই বিশ্বাস থেকেই উৎসারিত হয়। অপরাধ করার ইচ্ছা কারুর মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই এই বিশ্বাস ও প্রত্যয় তার পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। সেদিকে এক পা অগ্রসর হওয়াও আর সম্ভব থাকে না। বস্তুত অপরাধ দমন-অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার ব্যাপারে এ এক কার্যকর ও সফল প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক, সন্দেহ নেই। অতএব অপরাধের পথে এই প্রত্যয় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার সাথে মানব রচিত আইনের প্রতিবন্ধকতার কোন তুলনা-ই করা চলে না।
অবশ্য একথা স্বীকার্য যে, আল্লাহ্ তা'আলাও তাঁর কর্মফল প্রদান ব্যবস্থার প্রতি বর্ণিত বিশ্বাস সব মানুষের মনে সমানভাবে প্রবল হয়ে থাকে না। কোন কোন লোক অত্যন্ত দুর্বল ঈমানের ধারক হয়ে থাকে। ফলে যে প্রবল অপরাধ প্রবণতার কাছে অনেক সময় পরাজিত হয়ে অপরাধ ঘটিয়ে থাকে। অথবা এমন সব কার্যকলাপের মধ্যে জড়িত হয়ে পড়ে যার পরিণতিতে অপরাধ করাটা অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই তত্ত্বটি প্রকট করে তোলার জন্য এখানে একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছে:
মদ্যপানের পরিণতি অত্যন্ত খারাপ-একথা সর্বজনস্বীকৃত। হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা) তা একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের পূর্বের এক সমাজের একটি লোককে বলা হলো, তুমি এই যুবককে হত্যা কর, না হয় এই মেয়েলোকটির সাথে যিনা কর। আর তা-ও করতে রাযি না হলে তোমার সম্মুখস্থ এই মদ্য পান কর। লোকটি ভাবল, যুবকটিকে শুধু শুধুই হত্যা করতে বলা হচ্ছে। অথচ সে তো কাউকে হত্যা করেনি। এমতাবস্থায় তাকে হত্যা করা মহা গুনাহের কাজ হবে। আর যিনা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু তা খুবই লজ্জাকর ও নির্লজ্জ চরিত্রহীনতার কাজ হবে। তার তুলনায় বরং মদ্যপান অনেক সহজ কাজ। অতঃপর সে মদ্যপান করল। তাতে সে মাতাল হলো ও বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলল। ফলে সে যুবকটিতে হত্যা করল প্রথমে এবং পরে মেয়েলোকটির সাথে যিনাতেও লিপ্ত হল। এই কারণে মদ্যকে 'উম্মুল খাবায়েছ'-সকল অন্যায় ও পাপ কার্যের মৌল উৎস বলা হয়। আর সকল প্রকার অন্যায়, দুর্নীতি ও পাপ কাজ বন্ধ করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম এই মদ্য পানকেই নিষিদ্ধ করতে হবে।
বস্তুত আমর বিল-মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার' এই মদ্যপান, মদ্য উৎপাদন বা আমদানী, মদ্য উৎপাদকের সহিত সহযোগিতা-সাহচর্য, মদ্য ব্যবসায়, মদ্য বিক্রয় ইত্যাদি সবই বন্ধ করে দেয়। ইসলামী শরীয়তে এসব কাজকে চূড়ান্তভাবেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যেসব উচ্চতর মূল্যবোধের ফলে সমস্ত প্রকারের অপরাধ দমিত হতে পারে, আমর বিল্-মা'রূফ ও 'নিহী আনিল মুনকার' সেই মুল্যবোধকেই মানুষের মনে জাগ্রত ও সক্রিয় করে তুলে। কিন্তু মানব রচিত আইন সেই মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে কখনই পারে না। অপরাধ প্রতিরোধে আল্লাহর শরীয়তের মহান অবদান হচ্ছে এই ব্যবস্থা। 'আমর বিল্ মা'রূফ ও 'নিহী আনিলী মুন্কার'-এর চরিত্র ও মান-সম্মান সংরক্ষণ পর্যায়ের বড় কাজ হচ্ছে মূলতই কোন অপরাধ যেন সংঘটিত হতে না পারে, অপরাধ হওয়ার কারণসমূহই যেন নির্মূল হয়ে যায় এবং তার ফলে যেন মান-মর্যাদা বিনষ্ট হওয়ার মত ঘটনাও সংঘটিত না হয়।
ভিন্ পুরুষের সম্মুখে স্ত্রীলোকদের নগ্নতা-উলঙ্গতা সহকারে বের হতো নিষেধ করা হয়েছে। এই নিষেধটিও উপরোল্লিখিত দৃষ্টিকোণে বিবেচ্য। বলা হয়েছে: "আকর্ষণীয় সাজে সজ্জিত হয়ে তোমরা ভিন্ পুরুষের সামনে বেরোবে না, যেমন করে জাহিলিয়তের যুগে মেয়েরা বের হতো।" আরও বলা হয়েছে: "এবং তাদের স্বামী, পিতা, স্বামীর পিতা, পুত্র-সন্তান, স্বামীর পুত্র-সন্তান, তাদের ভাই, ভাই পুত্র, তাদের বোনের পুত্র বা তাদেরই মত স্ত্রীলোক অথবা তাদের ক্রীতদাস, কিংবা অধীন যৌন তাকীদহীন পুরুষ বা স্ত্রীলোকদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে ধারণাহীন বালকদের ছাড়া অপর কারুর সামনে যেন তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। সেই সাথে তাদের পা যেন এমনভাবে নিক্ষেপ না করে, যার ফলে তাদের গোপন সৌন্দর্য লোকদের নিকট প্রকাশমান হয়ে পড়ে।" বলেছেন : "(মেয়েলোকরা চলাফিরা করবে) নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশিত না করে।"
নারী দেহের সৌন্দর্য গোপন করে রাখার ও চলার এই নির্দেশ এবং তা ভিন্- গায়ের মুহরিম পুরুষদের সম্মুখে প্রকাশ করার এই নিষেধও ঠিক এই লক্ষ্যেই ঘোষিত হয়েছে, যেন তা দেখে পুরুষরা অপরাধের কাজে প্রবৃত্ত হয়ে না উঠে।
বস্তুত মুসলমানরা যদি এই উন্নতমানের নিষেধ ও নির্দেশসমূহ যথাযথভাবে পালন করে বলে-নারী-পুরুষের মাঝে শরীয়তসম্মত পর্দা পুরাপুরি পালন করা হয়, তা'হলে স্বাভাবিকভাবেই এই পর্যায়ের অপরাধ খুবই বিরল হয়ে যাবে। যদি কোথাও এই বিধান লংঘিত হতে থাকে, তা'হলে 'আমর বিল্ মারূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার' বিভাগীয় লোকজন তা কঠোর হস্তে দমন করবে, তা হতে দেবে না। তাদের এই কার্যক্রম ও প্রকারান্তরে অপরাধ দমনের কাজকে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও কার্যকর করে তুলবে।
গায়র মুহরিম স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিক অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করে ইসলামে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন : "তোমরা ভিন্ মেয়েলোকদের মধ্যে ঢুকে পড়া থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখবে।" সাহাবীগণ বললেন, হে রাসূল, দেবরকে দেখা দেওয়ার ব্যাপারে আপনার রায় কি? বললেন : "দেবর তো মৃত্যু।" অর্থাৎ দেবর নৈতিক দিক দিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। অতএব তাকে মৃত্যুবৎ ভয় করতে হবে এবং তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। তার সাথে অবাধে বা নিরিবিলিতে দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশা করা চলবে না।
হাদীসে ব্যবহৃত الخنز শব্দটির আসল অর্থ 'স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে কেউ। স্বামীর ভাই, বন্ধু, খালাতো-চাচাতো, মামাতো-ফুফাতো ভাইরাও এর মধ্যে গণ্য। তাই এদের 'মৃত্যু' সমতুল্য মনে করে এদের সহিত অবাধ মেলামেশা করা থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ ও পরকালের উপর কোন ঈমানদার কোন মহিলার পক্ষেই মুহারিম পুরুষ সঙ্গে ছাড়া বিদেশ সফরে যাওয়া কিছুতেই জায়েয নয়।"
একজন সাহাবী বললেন, আমার স্ত্রী একাকিনী হজ্জ করতে চলে গেছে; আমি যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলাম বলে আমি তার সঙ্গে যেতে পারিনি। এই কথা শুনে নবী করীম (সা) বললেন: "তুমি এক্ষুণি চলে যাও, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে থেকে হজ্জ পালন কর।" অতঃপর তিনি বললেন: "কোন ভিন্ পুরুষ নারী নিভৃতে একাকীত্বে মিলিত হলে শয়তান তথায় তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে ওয়াসওয়াসা দিবার জন্য উপস্থিত হয়।"
হযরত উমর (রা) এক ব্যক্তিকে দেখলেন নিরিবিলিতে এক মহিলার সাথে কথা বলছে। তিনি তখনই তাকে দোরা মেরে শায়েস্তা করে দিলেন। এ করে তিনি প্রকৃতপক্ষে 'আমর বিল্ মা'রূফ এবং 'নিহী আনিল মুন্কার'-এরই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নারী পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নীচু করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কুরআন মজীদে এর মূলে নিহিত কারণ পর্যায়ে জনৈক আরব কবির একটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট: "প্রথমে দৃষ্টি বিনিময়, পরে মুচকি-মিষ্টি হাসির প্রকাশ, পরে অভিবাদন, তারপরে কথাবার্তা, ওয়াদা তথা প্রতিশ্রুতি, আর শেষ কালে সাক্ষাতকার।"
বস্তুব যে সমাজেই চরিত্রহীনতার কাজ ব্যাপক, তথায় আল্লাহ্র নিকট থেকে কঠিন আযাবসমূহ ক্রমাগত অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই নির্লজ্জতা প্রকাশমান, পরে তারা তারই ব্যাপক প্রচারেরও ব্যবস্থা করে, তথায় তার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারি, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হয়ে দেখা দেবে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনই দেখা যায়নি।"
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের একটি অংশ: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ব্যভিচার ব্যাপক হবে, তথায় মৃত্যুর আধিক্য ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে।" রাসূলে করীম (সা) আরও বলেছেন: "কোন জনপদে ব্যভিচার ও সূদী কারবার ব্যাপক হলে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আযাব টেনে আনবে।" হযরত আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ব্যভিচার ব্যাপক ও প্রকাশমান হবে, তারা নিজেরাই ধ্বংস হতে শুরু করবে।" হযরত বুরায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই নির্লজ্জতা প্রকাশমান হয়ে পড়বে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরই উপর মৃত্যু অবধারিত করে দেবেন।" হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "আমার উম্মতের লোকদের মধ্যে অবৈধ সন্তানের প্রকোপ না হওয়া পর্যন্ত তারা মহা কল্যাণের মধ্যেই থাকবে। তাদের মধ্যে অবৈধ সন্তান যদি ব্যাপক হয়ে পড়ে তাহলে আল্লাহ্ তাদেরকে ব্যাপক আযাবে পরিবেষ্টিত করে দেবেন, তা অসম্ভব নয়।"
উপরোদ্ধৃত হাদীসমূহে যেসব নির্লজ্জতার কাজ সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে, তার ব্যাপকতার অর্থ সেসব ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণসমূহের ব্যাপকতা। অর্থাৎ আসল ঘটনার পূর্বে এমন সব অগ্রবর্তী ঘটনাবলী অবশ্যই সংঘটিত হবে, যার ফলে উক্ত নিষিদ্ধ ঘটনাবলী সংঘটিত হবে। আর তা হচ্ছে নারীদের উলঙ্গ ও সুসজ্জিত হয়ে অবাধ উন্মুক্তভাবে ভিন্ পুরুষদের মধ্যে চলাফেরা করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ধরাধরি, ইশারা-ইঙ্গিত, চুম্বন-মর্দন ইত্যাদি। আর এগুলি অতীব অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজ। 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুন্কার' বিভাগের কাজই হচ্ছে, এইগুলির প্রচলন হতে না দেওয়া, এসব সম্পর্কে জনতাকে সতর্ক করা। কেননা এগুলি হতে দেওয়ার পরিণতি চূড়ান্তভাবে পাশবিকতার সমর্থন এবং লোকদের সম্মুখে তা প্রকট হয়ে দেখা দেওয়া।
আমরা মানুষের দুই ধরনের সমাজের কল্পনা করতে পারি। এক ধরনের সমাজ তা যেখানে মহান শরীয়তের বিধান পুরাপুরি কার্যকর। আর দ্বিতীয় ধরনের সমাজ তা, যেখানে তা হয়নি। যে সমাজে শরীয়তের অনুশাসন কার্যকর নয়, তথায় অপরাধ প্রবণতা যে কত প্রচণ্ড তা সহজেই অনুমেয়। পক্ষান্তরে যে সমাজে ইসলামী অনুশাসনসমূহ পুরাপুরি বাস্তবায়িত, সে সমাজ কতইনা পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং সকল প্রকারের চরিত্রহীনতা থেকে মুক্ত। এক কথায় তা-ই হচ্ছে অপরাধ মুক্ত সমাজ।
উপরোক্ত বিধানগুলো হচ্ছে ইসলামের নেতিবাচক, নিবর্তনমূলক বা Preventive আইন, যা 'নিহী আনিল মুন্কার' পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামের ইতিবাচক ও উৎসাহ প্রদানমূলক বিধান এ থেকেও অধিক গুরুত্বের অধিকারী। এসব আইনের শিরোনাম হচ্ছে 'আল-আমর বিল মা'রূফ-ন্যায় সত্য ও সুন্দরতম কার্যাবলীর নির্দেশ ও উৎসাহ দান। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ইতিবাচক বিধানের গুরুত্ব নেতিবাচক বিধানের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এর উল্লেখও প্রথম।
ইসলামের এ পর্যায়ের কাজ হচ্ছে, জনগণের মধ্যে উত্তম পবিত্র চরিত্রের প্রবণতা সৃষ্টি ও সেজন্য ব্যাপকভাবে উৎসাহ দান এবং সেই সাথে সকল প্রকার হীনতা-নীচতা নির্লজ্জতা পরিহার করার উদাত্ত আহ্বান। এই পথে লোকদের অনুপ্রাণিত ও পরিচালিত করার জন্য উভয় দিকের ধারক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ, যেন মানুষ কোনক্রমেই অপরাধের মধ্যে পড়ে না যায়। কেননা একথা জানা-ই আছে যে, এই ব্যাপারটি যদি তাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হতো, তাহলে তারা নিঃসন্দেহে নিজেদের বড় ক্ষতি সাধান করত। গোট জাতি বা জনসমষ্টি তাদের কৃত অপরাধে জর্জরিত হয়ে পড়ত। এই কথা বোঝাবার লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা'আলা অতীতকালের একটি জনসমষ্টি সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, যারা আমর বিল মা'রূফ-এর কাজ সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল, প্রত্যাহার ও প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর তারই ফলে তাদের উপর অভিসম্পাত এসেছিল। এই সংবাদ দানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাদের মত কার্যপদ্ধতি ও আচার-আচরণ গ্রহণের স্পষ্ট নিষেধ।
ইরশাদ হয়েছে: "বনী ইসরাঈল বংশের যেসব লোক কুফরী অবলম্বন করেছিল, তাদের উপর দাউদ ও মরিয়ম-পুত্র ঈসার মুখে অভিশাপ বর্ষণ করানো হয়েছে। তার কারণ ছিল এই যে, তারা নাফরমানী করেছিল এবং তারা প্রায়ই সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ করতে থাকত। আর তার আসল কারণ এই ছিল যে, তাদের লোকেরা যেসব অন্যায় কাজ করত, তা থেকে তারা পরস্পরকে বিরত রাখতে চেষ্টা করত না-কেউ কাউকে নিষেধ করত না। আসলে তাদের এই কাজটিই ছিল অত্যন্ত খারাপ পরিণতির উদ্ভাবক।"
রাসূলে করীম (সা) যখন এই আয়াতটি পাঠ করে সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে শুনিয়েছিলেন এক-একটি বাক্য করে, তখন তিনি সাথে সাথে এই কথাও বলেছিলেনঃ "না, না, এটা ভালো নয়। আল্লাহর শপথ, তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে লোকদের নিষেধ করবে-বিরত রাখবে নির্বোধের হাত ধরে ফেলবে এবং তাকে সত্য নীতির উপর শক্তভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে। নতুবা অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদেরকে আযাবে পরিবেষ্টিত করে ফেলবেন। পরে হাজার ডাকলেও তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না।"
মূলত 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার'-এর কাজটি একটি ঢাল বিশেষ। তা বড় বড় অপরাধ সংঘটনের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক ও প্রতিরোধক। রাসূলে করীমের (সা) নিম্নোক্ত রূপক ও উপমামূলক ঘটনা থেকেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। কথাটি এই: আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমাসমূহ রক্ষা করে যে চলে এবং যে তা লংঘন করে এই দুই-জনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, অনেক গুলো লোক একত্রে একটি দ্বিতল নৌকাযোগে সমুদ্র যাত্রা করেছিল। তাদের কিছু লোক ছিল নিচের তলায় এবং অপর কিছু লোক বসেছিল উপর তলায়। পানির ভাণ্ডার ছিল উপর তলায়। নিচের তলার লোকেরা পানির প্রয়োজনে উপর তলায় আসা-যাওয়া করত। তাতে উপর তলার লোকেরা খুবই উত্ত্যক্ত ও অস্বস্তি বোধ করল। তা দেখে নিচ তলার লোকেরা বলল, হ্যা আমরা যদি নৌকার তলায় ছিদ্র করে পানি গ্রহণ করি, তা'হলে আর আমাদের কারুর উপর তলায় যাতায়াতের প্রয়োজন পড়বে না। এক্ষণে উপর তলার লোকেরা যদি নিচতলার লোকদিগকে নৌকার তলায় ছিদ্র করা থেকে শক্তভাবে বিরত রাখতে পারে, তা'হলে সকলেই বেঁচে যাবে। আর তারা যদি ওদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেয় ব্যাপারটি, তা'হলে নৌকারোহী সকলেই ডুবে মরবে।
ইসলামের এই প্রতিরোধমূলক ও উৎসাহদানমূলক বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসলাম ঘোষিত ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকারের সহিত এ আইনের কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য নেই। মুসলিম জাহানের অনেকেই ইসলাম প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকারের ভুল অর্থ বুঝেছেন। আর তার এই ভুল অর্থ বোঝানোর দরুন তারা 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকারের'-কাজটি প্রত্যাহার করেছে, আসলে ইসলাম ঘোষিত ব্যক্তি স্বাধীনতার অর্থ সমষ্টিকে ধ্বংসের আয়োজন করার অধিকার নয়। সে অধিকার কখনই এবং কাউকেই দেওয়া হয়নি।
'ভালো'র আদেশ' ও 'মন্দের নিষেধ' সংক্রান্ত উপরোক্ত বিধান মুসলিম সমাজে সদ্য কার্যকর রয়েছে। ফলে সে সমাজ চিরন্তন শান্তি ও নিরাপত্তায় ধন্য হয়ে রয়েছে চিরকাল। 'ভালো'র আদেশ' ও 'মন্দের নিষেধ'-এর শুভ ফল ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে- একথা স্বয়ং রাসূলে করীম (সা)-ই বলেছেন। তাঁর ইসলামী দাওয়াতের সেই শুভ সূচনাকাল, সাহাবীদের সংখ্যা তখনও খুবই অল্প। তাঁদের উপর কাফিরদের অত্যাচার নিপীড়নের করুণ কাহিনী রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট বর্ণনা করেছিলেন। তখন তিনি ইরশাদ করেছিলেন: "আল্লাহর নামে শপথ! আমার আরদ্ধ এই ইসলামী বিপ্লবের কাজটিকে তিনি অবশ্যই পূর্ণপরিণত ও সম্পূর্ণ করবেন। ফলে এমন নিরাপত্তা সর্বত্র বাস্তবায়িত হবে যে, একজন পথিক 'সামা' থেকে হাজারা মাউত পর্যন্ত একাকী চলে যাবে; কিন্তু তাতে সে কিছু মাত্র ভয় পাবে না-আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকেই তাকে ভয় করতে হবে না। অবস্থা এমন হবে যে, বাঘে-শৃগালে এক সাথে বিচরণ করবে।" হাতেম তাই পুত্র আদী (রা) ইসলাম কবুল করলে নবী করীম (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হয়ত তুমি ইসলাম কবুল করতে বিলম্ব করেছ শুধু এই কারণে যে, তুমি দেখতে পাচ্ছিলে, ইসলামের দুশমনদের সংখ্যা অনেক বেশি, আর ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা অনেক কম? "আল্লাহ্ নামের শপথ করে বলছি, খুব শীঘ্রই তুমি শুনতে পাবে, একটি মেয়েলোক কাদেসিয়া থেকে তার উষ্ট্রযানে সাওয়ার হয়ে মদীনার এই ঘর পর্যন্ত চলে আসবে; কিন্তু এই দীর্ঘ পথের মধ্যে সে তার সওয়ারীর চুরির ভয় করবে না।" আদী বলেন: এই কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তা-ই যদি হয়, তাহলে তখন 'তাই' গোত্রের চোরদের অবস্থা কি দাঁড়াবে?
এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, মুসলিম উম্মত 'আমর বিল মা'রূফ-এর দায়িত্বের প্রতি যখনই উপেক্ষা প্রদর্শন করেছে, আল্লাহর শরীয়তকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়িতকরণের দায়িত্ব পালনে অনীহা বা অবজ্ঞা দেখিয়েছে, তখনই সমাজ ক্ষেত্রে নানাবিধ অপরাধ প্রচণ্ড হয়ে দেখা দিয়েছে। আর তা খুবই স্বাভাবিক ও সামঞ্জস্যশীল পরিণতি তাতে একবিন্দু সন্দেহ নেই। আল্লাহ্ তা'আলার এই ইরশাদ ও ঘোষণা কতই না সত্য! "নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা কোন জনসমষ্টির অবস্থা পরিবর্তন করে দেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করছে।"
বস্তুত যখনই ঈমান শক্তিশালী হবে এবং ইসলামী শরীয়ত সাধারণভাবে বাস্তবায়িত হবে আর তার ফলে সমাজের ক্ষেত্রে আমর বিল-মা'রূফ-এর কাজ পুরাপুরি কার্যকর হলো, তখনই মানুষ সর্বপ্রকারের শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে এবং যাবতীয় অপরাধের উৎপাত ও নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা নিজেই এই কথার ঘোষণা দিয়েছেন কুরআন মজীদে: "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্যকার ঈমানদার, নেক আমলকারীদের পৃথিবীতে খলীফা বানাবার ওয়াদা করেছেন যেমন তাদের পূর্ববর্তী লোকদের খলীফা বানিয়েছেন, এ-ও ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদের সেই দীন সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং এ-ও ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদের ভয়-ভীতি পরিবর্তন করে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করবেন, তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সহিত কোন একবিন্দু জিনিসও শরীক করবে না। অতঃপর যারাই কুফরী নীতি অবলম্বন করবে তারা নিঃসন্দেহে সীমালংঘনকারী।"
আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, মুসলিম উম্মাতের যে সমাজটিতে আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার প্রধান্য পাবে-অধিকতর গুরুত্ব সহকারে সদা কার্যকর হয়ে থাকবে, সে সমাজে শান্তি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যথাযথভাবে বর্তমান থাকবে। এই কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য অকাট্য দলীলপত্র খুব বেশি নিয়ে আসলে এ আলোচনাটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, দুনিয়ার যে দেশেই ইসলামী শরীয়ত পুরাপুরি বাস্তবায়িত হবে, তথায় সকল প্রকারের অপরাধ-ই হয় নির্মূল হবে, কম পক্ষে হ্রাস পাবে।
কিন্তু সেই সাথে দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, দুনিয়ায় ধর্ম হিসাবে ইসলামে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা কিছু মাত্র কম নয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও রয়েছে বহু কয়টি দেশে। কিন্তু ইসলামকে তারা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে গ্রহণ করছে না। ফলে সেসব দেশে ও দুনিয়ার অন্যান্য অনৈসলামী দেশের মতই অপরাধের মাত্রা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এসব দেশ ও দেশের মুসলিম জনতা কার্যত এই কথাই দুনিয়াবাসীদের সামনে পেশ করেছেন যে, ইসলাম শুধু একটা ধর্ম হিসাবেই ভালো বটে; কিন্তু তা মানুষের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অক্ষম। আর মুসলিমদের দ্বারা ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান। আসলে ইসলামের কিছু অংশ গ্রহণ এবং অপর অংশ বর্জন নিজের ইচ্ছা-কামনা-বাসনারই অনুসরণ মাত্র। আর স্বীয় ইচ্ছা-বাসনা-কামনা-ধারণা এমন একটা বৃত্ত, যার পূজা দুনিয়ার প্রায় সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: "আল্লাহর নিকট থেকে আসা হিদায়েতকে বাদ দিয়ে যারা স্বীয় ইচ্ছা-বাসনার অনুসরণ করবে, তাদের চাইতে অধিক গুমরাহ আর কে হতে পারে? এরা আসলে যালিম। আর আল্লাহ যালিম লোকদের হিদায়েত করেন না।"
ইয়াহুদীরা আল্লাহ কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান রেখে তদনুযায়ী কাজ করত। আর অপর অংশকে অবিশ্বাস করত। আল্লাহর নিকট এটা ছিল একটা কঠিন অপরাধ। তাই অপরাধের দরুন তারা ধর্মত্যাগী রূপেই চিহ্নিত হয়েছে আল্লাহর কালামে। বলা হয়েছে: "তোমরা কি আল্লাহ্র কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান রাখো, আর কিছু অংশকে কর অবিশ্বাস? জেনে রাখো, তোমাদের মধ্যে যারাই এরূপ নীতি অবলম্বন করবে, তাদের নিশ্চিত শাস্তি হচ্ছে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এবং কিয়ামতের দিন তদের নিক্ষেপ করা হবে কঠিন আযাবের দিকে। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ্ সে বিষয়ে গাফিল নন।"
এই প্রেক্ষিতে ইসলামী শরীয়ত বাস্তবায়নে দুনিয়ার মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে কত বেশি তা আমাদের স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। পরকালে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের জন্য যেসব অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় নিয়ামত ও সুখ-শান্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, তা তারা কেবল তখনই পাওয়ার অধিকারী হতে পারে। আর তা'হলে এই দুনিয়ার জীবনে তারা মহা সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততা লাভ করতে পারে। দূর হতে পারে যাবতীয় ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা।
টিকাঃ
১. মদীনার আউস ও খাজরায বংশের লোকেরা হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় এসে রাসূলের হাতে দীন ইসলাম কবুলের বায়'আত করেছিলো মিনার দিকের এক পর্বত গুহায় হিজরতের পূর্বে এই বায়'আত দুইবার অনুষ্ঠিত হয়।
১. কেননা Wine and Woman-মদ ও নারী অবিচ্ছেদ্য। যেখানে একটি আসবে সেখানে অপরটি অবশ্যই আসবে।
অপরাধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। অপরাধ দমনের জন্য সার্থক প্রতিবিধানের লক্ষ্যে ইসলামী শরীয়ত যেসব কার্যকর আইন বিধান পেশ করেছে, তার মধ্যে 'আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার' অন্যতম। এর অর্থ ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ।
আমর বিল মারূফ-এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জনসাধারণের হৃদয়-মনে এই বিশ্বাস দৃঢ়প্রত্যয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করা যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ইহকালীন কার্যকলাপের প্রতিদান দেবেন। অপরাধ করার ইচ্ছা কারুর মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই এই বিশ্বাস ও প্রত্যয় তার পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।
'আমর বিল্ মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার'-এর বড় দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের চরিত্র ও ইজ্জত রক্ষা করা। ইসলামে গায়র মুহরিম স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিক অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নিচু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজকে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করা।
'ভালো'র আদেশ ও 'মন্দ'র নিষেধ সংক্রান্ত বিধান কার্যকর থাকলে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বাস্তবায়িত হয়। যখনই ঈমান শক্তিশালী হবে এবং ইসলামী শরীয়ত সাধারণভাবেই বাস্তবায়িত হবে, তখনই মানুষ সর্বপ্রকারের অপরাধের উৎপাত থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। মুসলিম উম্মাহর যে সমাজটিতে আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার প্রাধান্য পাবে, সে সমাজে শান্তি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যথাযথভাবে বর্তমান থাকবে।
📄 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলামী বিধান
আল্লাহ্ সব পাক ও পবিত্র জিনিস হালাল ঘোষণা করেছেন এবং সব খারাপ ও ক্ষতিকর জিনিসকে হারাম ঘোষণা করেছেন। অপরাধ দমনে ইসলাম যুগপৎভাবে ইহকালীন শাস্তি ও পরকালীন শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।
শাস্তিই অপরাধ প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার নয়:
সমাজ সমষ্টিকে অপরাধমুক্ত করার জন্য ইসলাম নিছক বৈষয়িক বা পরকালীন শান্তিরই ব্যবস্থা করেনি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তাকে অংকুরে বিনষ্ট করার জন্য ইসলাম কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:
১. ব্যক্তির মন পবিত্র ও পরিশুদ্ধকরণ এবং তাকে সুন্দর ও নির্মল লালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা।
২. হারাম কাজ করা থেকে লোকদের দূরে রাখার জন্য পরকালীন অত্যন্ত খারাপ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করা।
৩. সকল ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সকল পাপাচার প্রতিরোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টার নির্দেশ দেওয়া।
৪. কোনো কাজ হারাম করার সাথে সাথে সেই কাজের সুযোগ করে দেয় এমন সব পথ ও উপায়ও বন্ধ করে দেওয়া।
৫. আল্লাহ্ যখন কোন জিনিস হারাম করেন, তখন তদস্থলে একটা হালাল কাজের পন্থা বৈধ করে দেন।
৬. ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের আত্মা বিশুদ্ধকরণ ও অপরাধ থেকে রক্ষা করা।
৭. চূড়ান্ত ব্যবস্থা হিসেবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বৈষয়িক শাস্তির ব্যবস্থা রাখা।
📄 ইসলামের দণ্ড দর্শন
শাস্তি বা দণ্ড এমন একটি অস্ত্র, যা সেই ব্যক্তির উপর প্রয়োগ করা হয়, যে ব্যক্তি সমাজে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত নীতিসমূহ লংঘন করেছে। মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সমাজ স্বার্থের দ্বন্দ্বই অপরাধের মৌল কারণ।
সুবিচার ব্যবস্থার ভিত্তি:
প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দেওয়াই হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব। আর এই অধিকার সংরক্ষণের অনন্য উপায় হচ্ছে অধিকার ক্ষুন্ন করাকে অপরাধ গণ্য করা এবং অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা।
শিক্ষামূলক শাস্তি:
শাস্তি সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে—বিদ্রোহী মন-মানসিকতা যেন সেই শাস্তি দেখে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে। শাস্তিকে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর করার লক্ষ্যে একে অবশ্যই শিক্ষামূলক হতে হবে।
শাস্তির ভয়াবহতা:
শাস্তিকে ভয়াবহ করে অপরাধীর মনে একটা তীব্র ভীতির উদ্রেক করা এর লক্ষ্য। শাস্তিটা অবশ্যই এতটা ভয়াবহ হতে হবে যে, কোনো প্রচণ্ড প্রলোভনও কাউকে অপরাধ করার দিকে অগ্রসর হতে দেবে না।
প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থকরণের দৃষ্টিকোণ:
সুপ্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে মযলুমের মনে জেগে উঠা সেই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সংশোধনমূলক শাস্তির দৃষ্টিকোণ:
এর লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধীর মন-মানসিকতা থেকে অপরাধ প্রবণতার মূলোৎপাটন করা। একে একটি লক্ষ্য বা একমাত্র উপায় হিসাবে গ্রহণ করা কোনো রাষ্ট্র সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
সফল ও সার্থক শাস্তি:
একটি আদর্শ শাস্তি-সংহিতায় শিক্ষামূলক, ভয়াবহ এবং প্রতিশোধমূলক—এই তিনটি ভাবধারারই সমন্বয় থাকা জরুরি। শাস্তি যত কঠিন ও কঠোর হবে, সমাজ ততই অপরাধমুক্ত হবে।
📄 বড় বড় অপরাধ
অপরাধের স্বরূপের উপর শাস্তির মান নির্ভরশীল। অপরাধসমূহকে আমরা তিনটি বড় বড় অংশে ভাগ করতে পারি:
১. রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধ: ওজনে কমবেশি করা, ঠকবাজি, মিথ্যা সাক্ষ্যদান বা সত্য সাক্ষ্য গোপন করা, সরকারী কর্মচারীদের আইনসম্মত ক্ষমতার অপমান করা প্রভৃতি এই ভাগে পড়ে।
২. সামাজিক সামষ্টিক জীবনের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ: সাধারণ শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, সন্তান হত্যা, আত্মহত্যা, নারী বা শিশু হরণ, ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, আমানতে খিয়ানত, প্রতারণা প্রভৃতি এই অংশের অন্তর্ভুক্ত।
৩. ব্যক্তির জীবনের বিরুদ্ধে করা কার্যাবলী: ইচ্ছামূলক হত্যা, দৈহিক যখম, মানহানি পর্যায়ের অপরাধসমূহ এই ভাগে গণ্য।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ:
ইসলামী আদর্শের দৃষ্টিতে বিচার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অনাবিল হওয়া বাঞ্ছনীয়। অপরাধ যদি ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয় তবে সেই ব্যক্তি বিচার বিভাগকে ডাকার অধিকার রাখে। আর যদি সমাজ সমষ্টির বিরুদ্ধে হয় তবে সরকারকেই অনতিবিলম্বে সক্রিয় হতে হবে।