📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 ঈমান ভিত্তিক ইবাদাত

📄 ঈমান ভিত্তিক ইবাদাত


অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের যে ভূমিকার বিবরণ উপরে প্রদত্ত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান। এই ঈমানই এসব ইবাদত ফরয করেছে। আর ঈমানের প্রকৃত তাৎপর্য হচ্ছে তা মানুষের মন-মানসিকতা সংশোধন ও সুসংবদ্ধকরণের সুদৃঢ় স্তম্ভ। মানুষের আচার-আচরণকে সুদৃঢ় ও সুশোভন করে গড়ে তোলে এই ঈমান মানুষের জীবন্ত মনকে লালন করে এই ঈমান। এই ঈমানই হচ্ছে মানুষের মান-মর্যাদা সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরী। ঈমান ছাড়া অপর কোন জিনিস-কোন প্রক্রিয়াই এই কাজ করতে পারে না।
তা সত্ত্বেও ঈমানদার লোকদের সমাজে অপরাধ প্রবণতার এত ব্যাপক বিস্তৃতি কেন, তা একটা প্রবল জিজ্ঞাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই লোকেরা ইবাদতের প্রায় সব অনুষ্ঠানই পালন করে থাকে। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাব, ইবাদত তো হচ্ছে, কিন্তু তা ইবাদতের প্রকৃত প্রাণশক্তি শূন্য। আল্লাহ্র যতটুকু ভয় মানব মনে জাগ্রত থাকলে সেই প্রাণশক্তি লাভ করা সম্ভব, তার অভাব অত্যন্ত প্রকট। সেই সাথে জাতীয় জীবনে অন্ধ অনুসরণের যে ব্যাপক অভ্যাস, তা-ও উক্তরূপ প্রাণশক্তির পরিপন্থী। বস্তুত মুসলিমের ইবাদতের পরম লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর নৈকট্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়া। এ জিনিস প্রবল থাকলেই ঈমানের কথিত কার্যকরতা অবশ্যই লক্ষণীয় হবে।
ঈমান মানুষের জীবনে তার বাঞ্ছিত সুফল দিতে পারে, যদি তাতে নির্ভুল আকিদা ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে এবং কথার সহিত কাজের পূর্ণ সামঞ্জস্য স্থাপিত হয়। যেসব লোক মুখে ঈমান প্রকাশ করে, কিন্তু সেই ঈমানের সাথে অন্তরের গভীর সম্পর্ক ও সাযুজ্য নেই, এই কারণে তা নিতান্তই দেখানোপনা বা প্রতারণায় পরিণত হয়। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন :
وَ مِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَ بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَ مَا هُمْ بُمُؤْمِنِينَ - يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَ الَّذِينَ آمَنُوا وَ مَا يَخْدَعُونَ إِلَّا انْفُسَهُمْ وَ مَا يَشْعُرُونَ -
এমন লোকও রয়েছে যারা মুখে বলে যে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা মু'মিন গণ্য হওয়ার অধিকারী নয়। তারা আল্লাহ্ ও ঈমানদার লোকদের ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু আসলে সে ধোঁকাটি তাদের উপরই প্রতিফলিত হয়-যদিও তারা তা বুঝে উঠতে পারে না। -সূরা বাকারা: ৮-৯
আরো বলেছেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمْ وَ إِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلوةِ قَامُوْا كُسَالَى يُرَاؤُنَ النَّاسَ وَ لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً -
মুনাফিকরা আল্লাহর সহিত ধোঁকাবাজি করে; কিন্তু আসলে এই ধোঁকা তাদের নিজেদেরই উপর পড়ে। তারা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় নিতান্তই অনিচ্ছুকভাবে। তারা লোকদের দেখায় যে, তারা সালাত আদায় করছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে তারা খুব কম-ই স্মরণ করে। -সূরা নিসা : ১৪২
অনুরূপভাবে এমন লোকও রয়েছে যারা প্রকৃত সত্যকে চিনে; কিন্তু সে সত্য ও সে সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ ঈমানের মাঝে তাদের অহংকারই বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
وَ إِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَ هُمْ يَعْلَمُونَ
একদল লোক প্রকৃত সত্যকে গোপন করে রাখতে চায়, অথচ সে সত্যকে তারা জানে। -সূরা বাকারা : ১৪৬
প্রকৃত ঈমান হচ্ছে সত্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে সে সত্যকে স্বীকার করা এবং সে সত্য অনুযায়ী কাজ করা। সত্য বলে বিশ্বাস করা আল্লাহকে রাসূলকে এবং পরকালকে, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ না থাকা। তা' হলেই সে ঈমানের মিষ্টতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। আর তা না করা পর্যন্ত সে কিছুতেই শান্ত ও আশ্বস্ত হতে পারে না।
কথা মুখে জিহ্বার সাহায্যে উচ্চারিত হয়। অন্তরের স্থিত ও সুদৃঢ় বিশ্বাস ভাষার পোশাকে প্রকাশিত হয়। তা মুসলিম ব্যক্তির প্রতি রক্তবিন্দুর সহিত মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। তার আচার-আচরণ ও কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়েই তা প্রতিফলিত হয়।
আর আমল উৎসারিত হয় সত্যিকার ঈমানের বাস্তব ফলস্বরূপ। তাতে কল্যাণের দিকে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। আল্লাহ্র প্রতি ঐকান্তিক বিশ্বাস সহকারেই শরীয়ত পালন ও অনুসরণ করা হয়। তখন ঈমান জীবন্ত ও বাস্তব হয়ে দেখা দেয়। এই ঈমানেরই দাবি হচ্ছে, ইসলামকে বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে প্রত্যক্ষভাবে জিহাদ করা। চূড়ান্ত মাত্রার ত্যাগ স্বীকার করা।
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَ انْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - أَوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ
প্রকৃত মু'মিন সেসব লোক' যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। পরে তারা কখনই সন্দেহের আবর্তে নিমজ্জিত হয়নি। তারা আল্লাহ্ পথে জিহাদ করে তাদের ধন-মাল দিয়ে ও তাঁদের জান-প্রাণ দিয়ে। বস্তুত তারাই সত্যিকার ঈমানদার। -সূরা হুজুরাত : ১৫
এই ঈমানই মানুষকে এক নবতর সৃষ্টি বানিয়ে দেয়। এ ঈমান প্রথমে অন্তরের গভীর সূক্ষ্ম পরতে দানা বাঁধে। পরে বাহ্যিকভাবে সত্যিকার মু'মিনের রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্র প্রভুত্ব সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তারই আনুগত্য করে। তখন তার যাবতীয় তৎপরতা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচারিত হয় আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْ فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمَا
তোমার খোদার কসম, 'লোকেরা প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার হতে পারবে কেবল তখন, যখন তারা তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে তোমাকেই বিচারক ও মীমাংসাকারী-বিধানদাতারূপে গ্রহণ করতে পারবে এবং তোমার বিচার ফয়সালার প্রতি তাদের মনে একবিন্দু কুণ্ঠা বা দ্বিধা জেগে উঠবে না, বরং পুরাপুরিভাবেই মেনে নেবে। -সূরা নিসা: ৬৫
অতএব আল্লাহ্ ও রাসূলের আদেশ-নিষেধ অমান্য করার কোন ইখতিয়ার থাকতে পারে না কোন ঈমানদার মানুষের।
وَ مَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَ لَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যখন লোকদের কোন বিষয়ে ফয়সালা করে ফেলেন, তখন তা মেনে নেওয়া ও না-মেনে নেওয়ার কোন ইখতিয়ারই থাকতে পারে না। -সূরা আহযাব: ৩৬
এইরূপ ঈমানই মানুষের জীবন ও বাহ্যিক আচার-আচরণকেও সুন্দর করে গড়ে তোলে, সুষ্ঠু ও সুপরিচ্ছন্ন করে। সুবিচার ও ন্যায়পরতার মৌল নিয়ম ও বিধান কার্যকর হয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করে। অরাজকতা, বিপর্যয়, অশান্তি ও অর্নিষ্ট সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয়। পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা, সহৃদয়তা ও সহানুভূতির বন্ধনে ঈমানদার লোকদের জড়িত করে। এ বন্ধনের কোন বিকল্প নেই। ভাষা, বর্ণ, শ্রেণী জাতীয়তা, সম-স্বার্থ ইত্যাদি কোন একটি ভিত্তিও মানুষকে অতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না, যতটা পারে এই ঈমান। এই ঈমান যে জনসমষ্টির নিকট প্রাধান্য পাবে, তথায় অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসাবে ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তির সাথে সাথে সামষ্টিক জীবনেও পরিপূর্ণ শান্তি ও স্বস্তি বাস্তবায়িত হবে। আর কোন জনসমষ্টি যদি এই ঈমান হারিয়ে ফেলে তাহলে তথায় ব্যাপক বিপর্যয়, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং মারাত্মক ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা-অরাজকতা দেখা দেওয়া অবধারিত। আর আজকের দিনের এটাই হচ্ছে রূঢ় বাস্তবতা।
বর্তমানে সভ্যতা বৃক্ষ শাখা-প্রশাখা পত্র-পল্লব ও ফুলে-ফলে সুশোভিত জীবন-যাত্রার উচ্চতর মান এবং বৈষয়িক ও বস্তুগত উন্নতির সর্বোচ্চতা মানুষের করায়ত্ত। কিন্তু চরম অনিশ্চয়তার প্রচণ্ডতা, অপরাধের হতাশাগ্রস্ততা ও ভয়-ভীতির ব্যাপকতা বর্তমানে গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে। যা পূর্বে কোন দিনই দেখা যায়নি।
সন্দেহ নেই, মনুষ্য সভ্যতা দ্রুত সম্মুখের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রকৃতি বিজ্ঞান, বাস্তব পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিবিদ্যা অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছে। কিন্তু এই উন্নতি ও অগ্রগতি মানবজীবনের মৌলিক সমস্যাসমূহের সমাধানে-মানুষকে এক বিন্দু শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ প্রদানে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
একালের মনস্তত্ত্ব অধ্যয়নের ক্ষেত্র খুবই প্রশস্ত এবং বিশাল। মানবীয় বিবর্তন ও প্রগতির সকল পর্যায় ও স্তরই এক্ষণে তার আওতাভুক্ত। প্রত্যেক স্তরের মনস্তাত্ত্বিক কারণ সমূহও আজ আলোচিত। এর প্রতিটি শাখা এক্ষণে এক-একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানে পরিণত। যথা শিশু মনস্তত্ত্ব, কিশোর মনস্তত্ত্ব, শিক্ষা মনস্তত্ত্ব, অপরাধ সংক্রান্ত মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। এছাড়া পরিবেশ, উত্তরাধিকার, অনুকরণপ্রিয়তা এবং পরিবার, সমাজ, গ্রাম, শহর, মরুভূমি ইত্যাদি পর্যায়ে জ্ঞান-গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপকতা আজ বাস্তব সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
কিন্তু এসব অধ্যয়ন অন্যায় ও দুষ্কৃতি দমনে মানুষের সম্মুখে কোন সফল পরিকল্পনা বা কর্মকাণ্ডের কোন সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপিত করতে পারেনি। সক্ষম হয়নি অপরাধকে মূলোৎপাটিত করতে। বরং বিশ্বের চতুর্দিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে শুধু অশান্তি-অরাজকতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে। বিপর্যয় ক্রমবৃদ্ধিমান, আইন লংঘনের ধারা তীব্র গতিতে অগ্রসর। রাষ্ট্র সরকারসমূহ কোন কোন অপরাধ দমনে রূঢ় ও প্রচণ্ড কার্যক্রম গ্রহণ করেও-আর্থিক পাইকারী জরিমানা এবং গ্রেফতার, কারারুদ্ধকরণ ইত্যাদির আশ্রয় নিয়েও চলমান ঘটনাবলীর উপর একবিন্দু সীমারেখা টানতেও সক্ষম হচ্ছে না, ব্যর্থতার পর ব্যর্থতাই শুধু কুড়াচ্ছে।
বর্তমান সময় মানবীয় সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উড্ডীন। এই সময়ও বিশ্বমানবতার এই চরম দুরবস্থা ও ব্যর্থতার সঠিক কারণ আঁচ করতে পারছে না কোন ক্রমেই। মানব মনের গভীর গহনে যে সূক্ষ্ম রোগজীবাণু তাকে তিলে তিলে কুরে কুরে খাচ্ছে, তাকে আয়ত্ত করতে সম্পূর্ণ অক্ষমই থেকে যাচ্ছে।
বস্তুত মানুষের মনই হচ্ছে মানব প্রকৃতি এবং ভালো-সত্য ও কল্যাণ প্রীতির মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের কোন বাস্তব ক্ষেত্রে একবিন্দু পরিবর্তন আনতে হলে সেজন্য সর্বাগ্রে পরিবর্তন সূচিত করতে হবে মানুষের মনে, এই কথা আধুনিক বস্তু-বিজ্ঞানে পারদর্শী জগতের সুধীজনগণ আদৌ উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। এরা অন্যায় ও দুষ্কৃতি দমনে শরনিক্ষেপ করে সম্পূর্ণ ভুল লক্ষ্যে। ফলে সব চেষ্টা-প্রচেষ্টাই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায় অতীব বাস্তব কারণে। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ চিন্তা-বিবেচনা গবেষণা মানব মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থানে পৌঁছতে পারছে না। মানুষের অন্তরকে এসব অন্যায়, বিপর্যয় ও দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে সজাগ ও সক্রিয় করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে না। মানুষের হৃদয় মনকে সেসব থেকে রক্ষা করার অতন্দ্র প্রহরী। বানাতে পারছে না। ফলে অন্যায়, দুষ্কৃতি ও অরাজকতা বন্ধ করতেও সক্ষম হতে পারছে না। মানবীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টার ইতিহাসে মানুষের জীবনের কোন ক্ষেত্রেই বোধ হয় এতটা ব্যর্থতা কুড়াতে হয়নি, যতটা ব্যর্থতা কুড়াতে হয়েছে এই ক্ষেত্রে। সভ্যতা সংস্কৃতির সব উন্নতি উৎকর্ষ আজ ম্লান হয়ে গেছে এই ব্যর্থতার কারণে।
মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, এটা মানব প্রকৃতি নিহিত এক মহাসত্য। মানুষ লক্ষ্য করে যে, তার কর্মতৎপরতাকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য তারই মত কিছু সংখ্যক লোক প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে, কৌশলের পর কৌশল আঁটছে, আইনের পর আইন রচনা করে চলেছে, অথচ সে-ও তাদেরই মত মানুষ। সে কেন মানুষের মনগড়া কৌশল জালে পা জড়িয়ে নিজেকে বন্দী করবে, সে কেন অনুগত হবে তারই মত মানুষের মনগড়া সব আইন-বিধানের? এটা মানুষের গভীর প্রকৃতিতে নিহিত মনস্তত্ত্ব। একটা মৌলিক প্রশ্ন। আধুনিক কালের আইন-দার্শনিক, আইন ও মনস্তত্ত্ব বিশারদদের নিকট এই মনস্তত্ত্বের কোন ইতিবাচক বিশ্লেষণ আছে কি? পারেন কি এই প্রশ্নের সঠিক ও সান্ত্বনাদায়ক কোন জওয়াব দিতে?
মানুষকে কোন বৈষয়িক বঞ্চনা বা বৈষয়িক শাস্তির ভয় কি মানুষকে মানুষের রচিত আইন ও কলাকৌশল লংঘন করা থেকে বিরত রাখতে পারে?
মানুষ মানুষের রচিত আইন-কানুন ও কলা-কৌশল লংঘন করবে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই, আইনের প্রহরী ও শান্তি নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের চোখে ধূলি দিয়ে তাদের অসতর্ক মুহুর্তের সুযোগ নিয়ে আইনের গোটা প্রাসাদের ইট এক একখানা খুলে ফেলবে, তা ঠেকাবার সাধ্য কারুর আছে কি?
মানব রচিত আইন-বিধান ভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থা ঠিক এই কারণেই সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল প্রমাণিত হয়েছে। অদৃশ্যের পর্দা উন্মোচন করা এবং লোকচক্ষুর আড়ালে নিত্য সংঘটিত অপরাধসমূহ প্রতিরোধ বা দমন করা একালের প্রচলিত প্রশাসন কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার।
পরকালীন জীবনের সমগ্র ব্যাপারও এই প্রশাসন কর্তৃপক্ষের আয়ত্তের সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থিত। সেখানে কোন অপরাধীকে ধরা ও তার জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা যেমন তার সাধ্যায়ও নয়, তেমনি সেই ভয় দেখিয়ে অথবা পরকালীন কোন সওয়াবের আশ্বাস দিয়েও কাউকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তার অধিকারও কারুর নেই।
কিন্তু আসমানী আইন-বিধান-মানুষের জন্য মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ আইন-বিধানের ব্যাপারটি এ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সমস্ত মানুষই জানে, বুঝে ও বিশ্বাস করে যে, সে আইন একান্তভাবে আল্লাহ্র রচিত। আর আল্লাহ্ সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ। তাঁর কর্তৃত্ব কেবল ইহজীবনের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত নয়, পরকালীন জীবনে সর্বাত্মক কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। এই দুনিয়ার জীবনে কোন অপরাধের শাস্তিকে ফাঁকি দিয়ে তার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারলেও পরকালীন জীবনে তাঁর কর্তৃত্বের আওতার বাইরে যাওয়া কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। তা ছাড়া ইহজীবনে ইসলামী প্রশাসনিক আইন লংঘন করলে পরকালীন জীবনে তাকে আরও কঠিন শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে। তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না। ফলে আইন ফাঁকি দেওয়া বা প্রশাসনের অগোচরে আইন লংঘনের কোন প্রবণতা মানব মনে বাসা বাঁধতে পারে না। এটা যদিও বিশ্বাসের ব্যাপার, কিন্তু এই বিশ্বাস যে মানুষের জন্মগত ও মজ্জাগত, তাই এর কার্যকরতা আমোঘ ও অবশ্যম্ভাবী।
ইসলাম এই বিশ্বাস ও ভাবনা-চিন্তা দিয়েই মানুষের মনকে লালন করে। বানিয়ে তোলে অকৃত্রিম বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসী মনের তাকীদে মানুষের গোটা কর্মজীবন যখন গড়ে উঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করতে হয় যে, এই মন কখনই বিদ্রোহী হবে না, আইন লংঘনে উদ্যত হবে না।
ঠিক এই কারণে ইসলাম সর্বপ্রথম মানুষকে গায়বের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী বানাতে সচেষ্ট হয়। ইসলামের আহ্বান হচ্ছে:
أَنْ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ كُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَ بِالْقَدْرِ خَيْرِهِ وَ شَرِّهِ
তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর নাযিল করা কিতাবসমূহ, তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ, পরকালীন জীবন এবং তকদীরের ভালো-মন্দ আল্লাহ্ থেকে নির্ধারিত হওয়াকে। -বুখারী
অতএব কেবলমাত্র বাহ্যিকভাবেই কুরআন ও সুন্নাহর আইন অনুসৃত ও পালিত হয় না, তার পূর্বে মনের নিভৃত গহনে তার প্রতি জাগে অকৃত্রিম বিশ্বাস ও সুদৃঢ় ঈমান। এই ঈমানই মানবমনকে করে গভীরভাবে প্রশান্ত, আশ্বস্ত ও দৃঢ় নিশ্চিত। সে আইনের অনুসরণ ও পালন করে মনের দৃঢ় প্রত্যয় দিয়ে, অন্তরের সুষমামণ্ডিত ভক্তি শ্রদ্ধা দিয়ে কেননা আল্লাহ্ তো সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। বৈষয়িক জীবনে শাস্তি এড়াতে পারলেও পরকালীন জীবনে তা সম্ভব হবে না বলে এই জীবনেই অপরাধের দণ্ড গ্রহণ করে দোষমুক্ত হওয়াই অধিকতর বাঞ্ছনীয় হয়ে দাঁড়ায় প্রত্যেকটি ঈমানদার ব্যক্তির নিকট।
আল্লাহ্ই মানুষের স্রষ্টা। তাই তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব, মন-মানসিকতার আবর্তন-পরিবর্তন, স্থিতি-অস্থিরতা সব কিছুই প্রত্যক্ষভাবে জানেন। তাঁর এই যথার্থ পরিচিতিই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল্লাহ্র সমস্ত আইন পালন করতে, তাঁর আইন পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের সৌভাগ্যে নিজেকে ভাগ্যবান বানাতে চেষ্টা করে। তাই আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذَا أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَ إِذَا انْتُمْ أَجنَّةُ فِي بُطُونِ أَمْمَاتِكُمْ فَلَا تُزَكَّوْا انْفُسَكُمْ وَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
আল্লাহ্ যখন তোমাদের উন্মেষ ঘটাচ্ছিলেন মাটির মৌল উপাদান থেকে এবং তোমরা যখন তোমাদের মায়েদের গর্ভে ভ্রূণ আকারে ছিলে, তখনও তিনি তোমাদের জানতেন। অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্র-পরিশুদ্ধ মনে করার অহমিকায় পড়বে না। প্রকৃতপক্ষে কে আল্লাহকে ভয় করার নীতি অবলম্বন করেছে, সে বিষয়ে তিনি সবচাইতে অধিক অবহিত। -সূরা নাজম: ৩২
বস্তুত স্রষ্টা সৃষ্টিকুলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অবহিত হবেন- এটাই তো স্বাভাবিক:
الا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
জেনে রাখ, যিনি স্রষ্টা তিনি জানেন। তিনি তো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানী এবং সর্ববিষয়ে অবহিত। -সূরা মুলক: ১৪
তাঁর নিকট গোপন ও প্রকাশ্য কোনই পার্থক্য নেই। সব সমান-একাকার:
يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوتِ وَ الأَرْضِ وَ يَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَ مَا تُعْلِنُوْنَ ، وَ اللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
আসমানসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তিনি বুঝেন, তিনি সেসব কিছুই জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর। বস্তুত আল্লাহ্ তো মানুষের গোপন হৃদয়ে নিহিত সব তত্ত্ব ও তথ্যই জানেন খুব ভালোভাবে। -সূরা তাগাবুন: ৪
মানুষের মনস্তত্ত্ব মনের পটে আবর্তিত ভাবধারা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে যা বাস্তবায়িত হয় তা-ও আল্লাহ্ই জ্ঞানের আওতাভুক্ত। কিছুই তার অজানা নেই:
وَ لَقَدْ خَلَقْنَا الإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَ نَحْنُ اقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
সন্দেহ নেই, মানুষকে আমরাই সৃষ্টি করেছি এবং তার মনে যেসব খারাপ চিন্তা-ভাবনা জাগে তা আমরা জানি। আসলে আমরা তার বক্ষশিরা অপেক্ষাও অতি নিকটে। -সূরা কাফ: ১৬
বান্দার যাবতীয় কার্য-ছোট বা বড়-সংরক্ষিত, রেকর্ডকৃত, লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। কোন কিছুই হারিয়ে যায় না, মুছে যায় না।
وَ كُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ وَ كُلُّ صَغِيرٍ وَ كَبِيرٍ مُّسْتَطْرُ
তারা যা কিছুই করেছে কিতাবে সংরক্ষিত, ছোট বড় সবই লিপিবদ্ধ। -সূরা কামার: ৫২-৫৩
প্রকৃত ঈমানদার লোকদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা আল্লাহ্র নিকট আনত, চির অবনত। না-দেখেই তারা ভয় করে সেই মহান আল্লাহকে:
مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَ جَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيبٍ
যে ভয় করেছে আল্লাহকে এবং অবনত একনিষ্ঠ মন নিয়ে হাজির হয়েছে ..... -সূরা কাফ: ৩৩
এসব কারণে ইসলামী শরীয়তের আইন বিধানে প্রত্যেকটি কাজের বৈষয়িক প্রতিফলের সাথে পরকালীন প্রতিফলকেও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যেন কেউ যদি ইহকালীন শাস্তি থেকে কোনভাবে এড়িয়েও যায়, তবু পরকালীন শাস্তি এড়ানো কারোর পক্ষেই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হবে না।
হত্যা, আল্লাহ্ ওর মূলের সহিত শত্রুতা বা যুদ্ধ, শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, চুরি, ডাকাতি, সুদ খাওয়া, সুদী কারবার করা, ইসলামী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া-প্রভৃতি প্রত্যেকটি অপরাধের বৈষয়িক শান্তির সাথে সাথে পরকালীন শাস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রমাণ বলিষ্ঠভাবে।.
হত্যা কাণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُه جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَ لَعَنَهُ وَاعَدْ لَهِ عَذَابًا عَظِيمًا
যে লোক কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে সংকল্প করে হত্যা করবে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, তথায় সে চিরদিনই থাকবে। আল্লাহ্র ক্রোধ তার উপর পড়বে, আল্লাহ্ তায় উপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং তার জন্য খুব বড় আযাব নির্দিষ্ট ও প্রস্তুত করে রেখেছেন। -সূরা নিসা: ৯৩
আল্লাহ্-রাসূলের সহিত শত্রুতা, যুদ্ধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ পর্যায়ে বলা হয়েছে:
إِنَّمَا جَزَا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَ لَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلِّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ، ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ . إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ : فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
যেসব লোক আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের সহিত শত্রুতা ও যুদ্ধ করে এবং দেশের মধ্যে ফাসাদ ও বিপর্যয়-অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হবে, অথবা গুলিবিদ্ধ করা হবে, কিংবা তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক দিয়ে কেটে ফেলা হবে। অথবা সে দেশ থেকে তাদের নির্বাসিত করা হবে। এটা হচ্ছে তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনে শাস্তির লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে আরও বড় আযাব। -সূরা মায়িদা: ৩৩-৩৪
'তবে যারা ধরা পড়ার পূর্বেই তওবা করবে, তাদের কথা স্বতন্ত্র। জেনে রাখ, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই খুব বেশি ক্ষমাশীল এবং অতিশয় দয়াবান।'
চুরির শাস্তি পর্যায়ে বলা হয়েছে:
وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَ لَا مِّنَ اللَّهِ ، وَ اللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ فَمَنْ تَابَ مِنْ بَعْدِ ظُلْمِهِ وَ أَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوْبُ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
চোর-স্ত্রী বা পুরুষ-যে-ই হোক, উভয়ের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি এবং আল্লাহ্র নিকট থেকে শিক্ষামূলক দণ্ড। আল্লাহ্ সর্বজয়ী শক্তির অধিকারী, সুবিজ্ঞানী। অতঃপর যে লোক যুলুম করার পর তওবা করবে এবং নিজের সংশোধন করে নেবে, তার প্রতি আল্লাহ্র দয়ার দৃষ্টি পুনরায় পড়বে। আল্লাহ্ তো খুব বেশি ক্ষমাশীল, এবং অতীব দয়াবান। -সূরা মায়িদা: ৩৮-৩৯
সুদ খাওয়া ও সুদী কারবার সম্পর্কে বলার পর ইরশাদ হয়েছে:
فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّهِ فَانْتَهَى فَلَه مَا سَلَفَ وَ أَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَ مَنْ عَادَ فَأُولئِكَ اصْحَابُ النَّارِهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
যে লোকের নিকট তার রব-এর পক্ষ থেকে উপদেশ আমল এবং অতঃপর যে বিরত হলো, তার জন্য পূর্বে সে যা করেছে তা বৈধ হবে, তবে এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর নিকট সোপর্দ থাকবে। আর যে লোক তা পুনরায় শুরু করবে, তারা জাহান্নামী এবং চিরদিন তথায় থাকবে। -সূরা বাকারা: ২৭৫
ইসলামী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধ পর্যায়ে বলা হয়েছে:
وَ مَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَه إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالَ أَوْ مُتَحَيّزًا إلى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَ مَاؤُهُ جَهَنَّمُ وَ بِئْسَ الْمَصِيرُ
যুদ্ধের ময়দান থেকে যুদ্ধের কৌশল বা স্বতন্ত্র কোন বাহিনীর সহিত মিলিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনভাবে যে পশ্চাদপসরণ করবে, সে আল্লাহ্র গজবে পরিবেষ্টিত হবে। তার স্থান হবে জাহান্নাম এবং তা খুবই খারাপ পরিণতি। -সূরা আনফালঃ ১৬
মানবীয় কর্মপদ্ধতিসমূহ আইনরূপে বিধিবদ্ধ হওয়ার পরও অপরাধ প্রবন মন এমন সব কলা-কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়ে থাকে, যদ্বারা আইনের শৃঙ্খল অতি সহজেই চূর্ণ করা সম্ভব হয়, আইনকে ফাঁকি দিয়ে অথবা আইনের আশ্রয় নিয়েই আইনকে অতি সহজেই লংঘন করা যায় এবং এভাবেই আইনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ার সর্বত্র। তাছাড়া রাতের অন্ধকারে অপরাধ আপনিই গোপন থেকে যায়। আইনের প্রহরীদের অসতর্কতায় অথবা তাদের নীরব সমর্থনে অপরাধের কালো হাত যত্রতত্র সঞ্চালিত হয়। যে গোপন পিপীলিকাকে দমন বা নিষ্পিষ্ট করার কোন সাধ্যই আইনের নেই। তা'ছাড়া আইন নিজেই কোন কাজ করে না, করার সাধ্য নেই। মানুষই আইনকে কার্যকর করে। কিন্তু সেই মানুষ-আইন কার্যকরকরণের দায়িত্বে নিযুক্ত মানুষই যদি আইন লংঘন করে বা লংঘিত হতে দেয়, তা'হলে বেচারা আইনের ধুলায় গড়াগড়ি করা কান্নাকাটি করা ছাড়া তো কোনই উপায় থাকে না।
এরূপ অবস্থায় ইসলাম ঈমানদার ব্যক্তির মন-মানসিকতাকেই এক তীক্ষ্ণ শাণিত তরবারিরূপে গড়ে তুলতে চায়, যা অন্যায়-পাপ-দৃষ্কৃতি অরাজকতার জীবানুকে তার পক্ষ বিস্তারের পূর্বেই হত্যা করবে। আর মু'মিনের মনের আধিপত্য অন্য সকল প্রকারের আধিপত্যের তুলনায় যে অনেক বেশি শক্তিশালী, তা বলে বোঝাবার প্রয়োজন করে না। রাসূলে করীম (সা) এই দিকে ইঙ্গিত করেই পাপের সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ
وَ الإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَ كَرِهْتَ أَنْ يُطْلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
যে কাজ তোমার মনে কুণ্ঠা জাগায় এবং লোকেরা জানুক তুমি তা পছন্দ কর না, তা-ই হচ্ছে পাপ কাজ। -বুখারী, মুসলিম
ঈমানদার ব্যক্তিরএই জীবন্ত অন্তরই হয় ইসলামী আইন প্রণয়নের আসল দিগদর্শন। যে অন্তরকে সকল প্রকার পাপ-পংকিলতা-মলিনতা থেকে পবিত্র রাখাই সে আইনের প্রথম লক্ষ্য। ফলে ধরা পড়লেও কোন শান্তি হবে না, অথবা অপরাধ করলে কেউ-ই দেখতে পাবে না-যে পরিস্থিতিতে মানুষ এই ধরনের চিন্তা করার সুযোগ পায় সেই পরিস্থিতিতেও, সে ঈমানদার ব্যক্তি কোন পাপ করতে উদ্যত হয় না। এতদসত্ত্বেও কোন অসতর্ক মুহুর্তে শয়তানী প্ররোচনায় পড়ে সে যদি পাপ করেও বসে, কেউ তা দেখতে না পেলেও সে নিজেই নিজের ঈমানের প্রহরী হয়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে স্বীয় অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করে নিতে ও সেজন্য নির্দিষ্ট শাস্তি-তা যত কঠিন ও নির্মমই হোক-গ্রহণ করতে দ্বিধা করবে না। ইসলামের প্রশাসনিক ইতিহাসে দুইটি ঘটনা চির অম্লান হয়ে থাকবে। একটি গামেদীয়ার, আর দ্বিতীয়টি মায়েঞ্জ-এর। উভয়ই নিজ নিজ ঈমানের তাকীদে রাসূলে করীমের সমীপে উপস্থিত হয়ে কঠোরতম শাস্তি গ্রহণের প্রস্তাব করেছিল। কোন ব্যক্তি বা পুলিশের কোন লোক তাদের ধরে আনেনি। রাসূলে করীম (সা) গামেদীয়াকে সন্তান প্রসব ও সন্তান বড় হওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন তাও কোন পুলিশের প্রহরায় নয়।
অনুরূপভাবে যেখানেই মানবীয় অধিকার লংঘিত হয়েছে, সেখানেই অধিকার লংঘনকারী ব্যক্তি নিজে অগ্রসর হয়ে সে অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দিতে অকপটে প্রস্তুত হয়েছে, এরূপ ইতিহাস কেবলমাত্র ইসলামেরই অবদান। আর এরূপ না হলে মানুষের অধিকার কিছুতেই সংরক্ষিত হতে পারে না। কেননা অপরাধ প্রতিরোধ বা দমনের জন্য শুধু আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের উপর নির্ভর করা হলে এই কয়টির ব্যর্থতা তো সকলেরই সম্মুখে প্রকট। বিচারক অদৃশ্যকে জানে না। বাহ্যিক ও উপস্থাপিত দলীল-প্রমাণই বিচারের একমাত্র ভিত্তি-অবশ্য তা যদি উপস্থিত করা হয়, তবে। আর বিচার কখনোই হালালকে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করতে পারে না। এই সুযোগে যেসব লোক মিষ্ট ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলতে পারদর্শী তারা তার মাধ্যমে আইনকে ফাঁকি দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করতে চাইলে তাকে ঠেকাতে পারে। এরূপ অবস্থায় ইসলাম মুখের মিষ্টতা ও আইনের মারপ্যাচের সাহায্যে লব্ধ স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধাতে জ্বলন্ত অঙ্গার ও জাহান্নামের টুকরা নামে অভিহিত করে তা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। রাসূলে করীম (সা) বাস্তব অবস্থার ব্যাখ্যাস্বরূপ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَ إِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصَمُ فَلَعَلَّ بَعْضُكُمْ أَنْ يَكُونَ الْحَنَ بِحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ فَأَحْسِبُ أَنَّهُ صَدَقَ فَاقْضِي لَهُ بِذلِكَ فَمَنْ فَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَأَنَّمَا هِيَ قَطِعَتْ مِنْ النَّارِ فَلْيَأْخُذُ هَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا
আমি একজন মানুষ। আমার নিকট বিবদমান পক্ষগুলি আসে বিচার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। অবস্থা এই হয় যে, তোমাদের কেউ হয়ত অন্য লোকের তুলনায় অধিক বাকপটু, তখন আমি মনে করি, সে সত্য কথাই বলেছে। তখন সেই প্রেক্ষিতে তার পক্ষে রায় দিয়ে দিই। এক্ষণে আমি যদি অন্য কোন মুসলমানের হক কাউকে দেওয়ার রায় দিই, তা'হলে মনে রাখতে হবে, তা আগুনেরই একটি টুকরা, ইচ্ছা হয় গ্রহণ কর, অন্যথায় পরিহার কর।
অপরাধ দমনে বা অপরাধ প্রতিরোধে ইসলামের অনুসৃত পন্থার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হ'ল। এই আলোচনায় তা সকলের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলেই মনে করি। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পর্যায়ে কোন মানবীয় চেষ্টা প্রচেষ্টা কি ততটা উচ্চতর মান পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে?
সত্যি কথা হচ্ছে, কোন সমাজ-সমষ্টিই কল্যাণময় হতে পারে না ঈমান ছাড়া। আর ঈমান তো স্থান লাভ করে-দানা বেঁধে উঠে মানুষের মনে, অন্তরে, হৃদয়ে, চেতনায় এবং এই মন ও চেতনা ইসলামকে বাদ দিয়ে কখনই জীবন্ত হতে পারে না। এই ঈমান ও ইসলামকে হারিয়েই আধুনিক সমাজ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, বিশ্বমানবতার জীবনে চরম দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছে। তাদের মন-অন্তর-চেতনা মরে গেছে। অতএব এখনও কি আল্লাহ্ দিকে ফিরে আসার, কুরআন ও সুন্নাহকে জীবনাদর্শের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করার এবং ইসলামী শরীয়তকে বাস্তবায়িত করার সময় উপস্থিত হয়নি? আল্লাহ্র নির্দেশ তো এইঃ
وَ أَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللهُ وَ لَا تَتَّبِعْ أَهْوَاهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَّفْتِنُوْكَ عَنْ بَعْضِ مَا اَنْزَلَ اللهُ اِلَيْكَ ، فَاِنْ تَوَلَّوْ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيْدُ اللهُ اَنْ يُصِيْبَهُمْ بِبَعْضٍ ذُنُوْبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيْرًا مِّنَ النَّاسِ لَفَاسِقُوْنَ . أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ وَ مَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُوْنَ
তুমি লোকদের মাঝে প্রশাসন কায়েম কর আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে এবং ওদের কামনা-বাসনা-ইচ্ছার অনুসরণ করো না। তুমি ওদের ভয় কর এজন্য যে, ওরা আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানের কিছু অংশে তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে। ওরা পিঠ ফিরিয়ে গেলে কোন ভয় নেই, জেনে রাখ, আল্লাহ্ ওদের কোন কোন গুনাহের দরুন ওদের বিপদে ফেলতে পারেন। আর অনেক লোকই তো সীমালংঘনকারী। ওরা কি এখনও জাহিলিয়াতের বিধান কার্যকর দেখতে চায়? অথচ আল্লাহ্র চাইতে উত্তম বিধানদাতা দৃঢ় প্রত্যয়শীল লোকদের জন্য আর কেউ হতে পারে না। -সূরা মায়িদা: ৪৯-৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00