📄 অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক তাৎপর্যসম্পন্ন ইবাদাতের প্রভাব
সাধারণ ও বিস্তৃত তাৎপর্যের দৃষ্টিতে আদেশ-নিষেধ সমন্বিত আল্লাহ্ গোটা দীন পালন করাই ইবাদাত। জীবনের প্রতিক্ষেত্রে আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ যথাযথ পালন করা অপরিহার্য। তা'হলেই উবুদিয়াতের তাৎপর্য আল্লাহ্র জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়ে দাঁড়াবে। যে কাজেই মানুষের নৈতিক বা দৈহিক ক্ষতি বা কষ্টের দিক নিহিত, ইসলাম তা করতে নিষেধ করেছে। তা সগীরা হোক, কি কবীরাহ্। এর ফলে আজ পর্যন্ত যত রকমের ধরনের প্রকারের অপরাধ জানতে পারা গেছে তা সবই শরীয়তের আওতাভুক্ত। কুরআন মজীদে বর্ণনা ভঙ্গীর স্টাইল হিসাবে গৃহীত বিভিন্ন রূপ ও আঙ্গিকে তা মওজুদ রয়েছে। আর সহীহ হাদীসে কখনও তা এজমালীভাবে বলে দেয়া হয়েছে। আবার কখনও বলা হয়েছে সবিস্তারে।
ইসলাম নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, তা প্রকাশ্য হোক, কি গোপনে। ইরশাদ হয়েছে:
وَ لَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
তোমরা নির্লজ্জতা, নগ্নতা, অশ্লীলতার নিকটেও যেও না-তা প্রকাশ্য হোক, কি গোপনীয়। -সূরা আনআম: ১৫১
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ
বল হে নবী! আমার রব হারাম করেছেন সমস্ত নির্লজ্জতা-নগ্নতা-অশ্লীলতা, তা প্রকাশমান হোক কি গোপন। -সূরা আরাফ: ৩৩
যে কাজ বা কথা জঘন্য, কুৎসিত, নির্লজ্জতাময়, কুরআনের ভাষায় তা-ই (এক বচনে) ফাহেশা (আর বহু বচনে) ফাওয়াহিশ।
সমাজকে এই নির্লজ্জতা-অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করারও তাকিদ রয়েছে ইসলামে। সমাজের লোকদের চক্ষু ও কর্ণ যাতে করে নির্লজ্জতার শব্দ ও দৃশ্য থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য বিশেষ সতর্কতাবলম্বন ইসলামেকাম্য। এই কারণে কুরআনে নির্লজ্জতা অশ্লীলতার প্রকাশ ঘটানোকে কঠিন অপরাধের কাজ বলে ঘোষিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ إِنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا و الآخِرَةِ - وَ اللَّهُ يَعْلَمُ وَ انْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
যে সব লোক ঈমানদার লোকদের সমাজে নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচার প্রকাশিত হোক তা পছন্দ করে, ভালবাসে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই পীড়াদায়ক আযাব নির্দিষ্ট রয়েছে। তা আল্লাহই ভালো জানেন, তোমরা জানো না। -সূরা নূর: ১৯
সকল প্রকার পাপ, সীমালংঘন, বিদ্রোহ-স্বেচ্ছাচারিতা ও ঘৃণ্য কাজ নিষেধ করা হয়েছে। যে সব কাজে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হন, তা-ই পাপ, তা-ই গুনাহ্। সত্যের সীমালংঘন করে বাতিলের মধ্যে পড়ে যাওয়াই সীমালংঘন ও বিদ্রোহ। কার্যকলাপে সুবিচার ও ন্যায়পরতার বিপরীত আচরণ গ্রহণই স্বেচ্ছাচারিতা। আর সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি ও শরীয়তের বিধানের পরিপন্থি যা কিছু তা-ই ঘৃণ্য, তা-ই পরিহার্য। ইসলামী সমাজে তা-ই অপরিচিত যেন।
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَ الإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرَ الْحَقِّ
বল, আমার রব যেসব জিনিস হারাম করেছে, তাতো এই নির্লজ্জতার কাজ-প্রকাশ্য বা গোপনীয় এবং গুনাহর কাজ ও সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি ও বিদ্রোহমূলক কাজ। -সূরা আরাফ: ৩৩
এই পর্যায়ে কুরআন মজীদে বেশ কয়েকটি আয়াত সন্নিবেশিত হয়েছে। তন্মধ্যে আরও চারটি আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে।
إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ
যারা পাপের কাজ করে, তাদের প্রতিফল দেয়া হবে তারই যা তারা করেছিল। -সূরা আনআম: ১২০
وَ يَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرِ وَالْبَغْى
আল্লাহ্ নিষেধ করেন সর্বপ্রকারের নির্লজ্জতার কাজ, ঘৃণ্য, অপছন্দনীয় এবং সত্যবিরোধী বাড়াবাড়ি কাজকে। -সূরা নাহল: ৯০
وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
তোমরা সীমালংঘন করো না। কেননা আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। -সূরা বাকারা: ১৯০
وَ لَا تَعَاوَانُوْا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
এবং পাপ ও সীমালংঘনমূলক কাজে পরস্পরের সাহায্য সহযোগিতা করো না। -সূরা মায়িদা: ২
ইসলাম সকল রূপের ও প্রকারের যুলুম হারাম করে দিয়েছে। তার কঠিন ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার কথাও স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে। ইসলামের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এইসব নির্লজ্জতা, নাফরমানী, আল্লাহদ্রোহিতা ও পাপ কাজের ফলে এক একটা জাতি, জনসমষ্টি ধ্বংস হয়ে যায় অনিবার্যভাবে এবং যুলুমকারীদের উপর আল্লাহ্র কঠিন শাস্তি নেমে আসে। যুলুম হচ্ছে: প্রত্যেক জিনিসকে তার নিজস্ব বা উপযুক্ত স্থানের পরিবর্তে অন্যত্র রাখা এবং সীমালংঘন করা। ইমাম রাগিবের বর্ণনানুযায়ী যুলুম তিন প্রকারের:
প্রথম: যুলুম আল্লাহ্ ও মানুষের পারস্পরিক ক্ষেত্রে। এই পর্যায়ের বড় যুলুম হচ্ছে বান্দাহ্ কুফরী করা, আল্লাহ্র সাথে শির্ক করা এবং মুনাফিকী করা।
দ্বিতীয়: মানুষের পারস্পরিক ক্ষেত্রে যুলুম করা।
আর তৃতীয় হচ্ছে, ব্যক্তির নিজের প্রতি নিজের যুলুম। সকল প্রকারের যুলুম-ই এর অন্তর্ভুক্ত।
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُونَ - إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ
যালিম লোকেরা যা কিছু করে, তোমরা মনে করো না আল্লাহ্ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না বা সে বিষয়ে জানেন না। তিনি তো তাদেরকে আযাব দেওয়ার কাজ সেই দিনের জন্য বিলম্বিত করেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ চড়কগাছ হবে। (কিয়ামতের দিন) -সূরা ইব্রাহীমঃ ৪২
وَ لَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا
তোমাদের পূর্বের বহু যুগের মানুষকে তাদের যুলুম করার দরুন ধ্বংস করে দিয়েছে। -সূরা ঘৃনুস: ১৩
وَ لَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ
তোমরা যালিমদের উপর নির্ভরশীল হবে না, তাহলে আগুন তোমাদেরকেও দমন ও ধ্বংস করে দিবে। -সূরা হুদ: ১১৩
وَ تِلْكَ الْقُرَى أَهْلَكْنَاهُمُ لَمَّا ظَلَمُوا وَ جَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِمْ مَّوْعِدًا .
এই জনপদবাসিদের আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদের যুলুমের কারণে এবং তাদের ধ্বংস করার জন্য একটা সময় নির্দিষ্ট ওয়াদাভুক্ত ছিল। -সূরা কাহাফ: ৫৯
গণমানুষের মৌলিক ও সর্বপ্রকারের অধিকারকে ইসলাম পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষিত করেছে। এই অধিকারসমূহের মর্যাদা ও সম্ভ্রম রক্ষার প্রবল তাকিদ জানিয়েছে। এ অধিকার হরণ করার অপরাধের শাস্তিও স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছে এবং নির্ধারণ করেছে। এই অধিকার পর্যায়ে পাঁচটি সমগ্রের উল্লেখ হয়েছে আসমানী দীনের গ্রন্থে। এগুলি সংরক্ষিত হলেই গোটা দীনও সংরক্ষিত হয়। সে পাঁচটি অধিকার হচ্ছে: দীন, মান-সম্মান, জান-প্রাণ, ধন-মাল ও বিবেক-বুদ্ধির সংরক্ষণ। এ কয়টি সংরক্ষণের তাকিদ কুরআন মজীদের আয়াতে স্পষ্ট, অকাট্য ও বলিষ্ঠ ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে। আয়াতসমূহ এখানে উল্লিখিত হচ্ছে:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
তোমরা প্রাণ হত্যা করো না। আল্লাহ্ তাকে সম্মানার্হ করেছেন। তবে বিচারের জন্য তা করা হলে সে কথা স্বতন্ত্র। -সূরা ইসরা: ৩৩
وَمَنْ يَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيْهَا
যে লোক সংকল্প গ্রহণ করে কোন মু'মিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম, তথায় সে চিরদিন থাকবে। -সূরা নিসা: ৯৩
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنٰى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَآءَ سَبِيْلًا
তোমরা যিনার নিকটেও যেও না। তা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও (যৌন তৃপ্তি লাভের জন্য তা) নিতান্তই খারাপ উপায়। -সূরা ইসরা: ৩২
وَ أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا
আল্লাহ্ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। -সূরা বাকারা: ২৭৫
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبٰوا لَا يَقُوْمُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِيْ يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطٰنُ مِنَ الْمَسِّ
যারা সুদ খায় তারা যেন শয়তানের স্পর্শে পাগলপারা হয়ে চলাফিরা করে। -সূরা বাকারা: ২৭৫
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
তোমরা পরস্পরের মাল বাতিল উপায়ে ভক্ষণ করো না। -সূরা বাকারা: ১৮৮
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِيْ فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ
ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী উভয়কে একশতটি দোরা মারো। -সূরা নূরঃ ২
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً
যেসব পুরুষ চরিত্রবর্তী মেয়েলোকদের উপর যিনার মিথ্যা অভিযোগ তোলে, কিন্তু তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থাপিত করতে পারে না, তাদের আশি দোরা মারো। -সূরা নূর: ৪
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلٰى
হে ঈমানদারগণ; হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। -সূরা বাকারা: ১৭৮
إِنَّمَا جَزَاؤُا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَ أَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ -
যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সমাজে অশান্তি ও রিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে চেষ্টা পায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে-হয় তাদের হত্যা করা হবে, না হয় শূলবিদ্ধ করা হবে। অথবা হাত ও পা বিপরীতভাবে কেটে দেয়া হবে, কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। -সূরা মায়িদা: ৩৩
إِنَّهَذَا الْخَمْرُ وَ الْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَ الْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ -
নিঃসন্দেহে মদ্য, জুয়া, বলিদানের বেদীসমূহ এবং গণনার মাধ্যমে ভাগ্য জানতে চেষ্টা করা শয়তানী কাজের অপবিত্রতা। অতএব তোমরা এর প্রত্যেকটিই পরিহার কর। -সূরা মায়িদা: ৯০
وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ -
চোর-স্ত্রী বা পুরুষ উভয়ের হাত কেটে দাও। তারা যা করেছে এটা তার ফল এবং আল্লাহ্র তরফ থেকে নির্ধারিত শাস্তি। -সূরা মায়িদা: ৩৮
বহুসংখ্যক হাদীসে এসব কুরআনী আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে রাসূলের সুন্নাতের অবদান। একজন মুসলমানের কাছে তার ভাই অপর মুসলিমের কি মর্যাদা ও জান-মালের নিরাপত্তা প্রাপ্য, এ থেকে তা জানতে পারা যায়। মানুষের অধিকার রক্ষা করা হয়েছে এসব বিধানের মাধ্যমে। এ অধিকার হরণ বা তার উপর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বড় গুনাহ্-তা কথার মাধ্যমে হোক বা কাজের মাধ্যমে করা হোক। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন-
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا وَ مَنْ غَشَانَا فَلَيْسَ مِنَّا
যে লোক আমাদের উপর অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করবে, সে আমাদের (মুসলিম সমাজের) লোক নয় এবং যে আমাদিগকে প্রতারিত করবে সে-ও আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবে না।
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ وَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُقَالُ هَذِهِ غَدْرَةُ فَلَان
প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকেরই একটা পতাকা হবে কিয়ামতের দিন। ডাকা হবে এই বলে যে, এটি অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংকারী কার্য থেকে দূরে সরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞসা করলেন, সে সাতটি কার্য কি কি? জওয়াবে রাসূলে করীম (সা) বললেন, আল্লাহ্র সাথে শির্ক করা, যাদু করা, আল্লাহ্ হারাম করা নর হত্যা করা-তবে আইনের জন্য করা হলে আলাদা কথা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ, কাফির শত্রুর সাথে যুদ্ধকালে পালিয়ে যাওয়া, অসতর্ক বা জানে না এমন সচ্চরিত্রবতী মহিলাদের উপর ব্যভিচারের মিথ্যা দোষারোপ। -বুখারী, মুসলিম
রাসূলে করীম (সা) সুদখোর ও যে সুদ খাওয়ায়-উভয়ের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন।
তিনি বলেছেন, কথায় খোঁচাদানকারী, অভিশাপ বর্ষণকারী, বাজে ও নির্লজ্জ কথা-বার্তার বকবককারী ব্যক্তি মুসলিম নয়।
مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
যে লোক স্বীয় দীন বদলে দিল, ইসলাম ত্যাগ করে তদস্থলে অন্য ধর্মমত গ্রহণ করল, তাকে হত্যা কর। (মুসলিম ছাড়া অন্যান্য সব কয়খানি হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত)
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন 'তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান গ্রহণ কর। আল্লাহ্ ওদের পথ বানিয়ে দিয়েছেন। অবিবাহিত-অবিবাহিতার যিনায় প্রত্যেককে একশ'টি দোরা এবং এক বছর কালের জন্য নির্বাসনের শাস্তি দিতে হবে। আর বিবাহিত-বিবাহিতার যিনার শাস্তি একশ'টি দোরা এবং রজম। (বুখারী ও নাসায়ী বাদে সব কয়খানি হাদীস গ্রন্থ)
যায়ের ইবনে ইয়াজীদ (রা) বলেছেনঃ
كُنَّا نَأْتِي بِالشَّارِبِ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ فِي أَمَرَةِ أَبِي بَكْرٍ فَتَقُوْمُ إِلَيْهِ نَضْرِبُهُ بِأَيْدِينَا وَ نَعَالِنَا وَ ارْدِيَتِنَا حَتَّى كَانَ صَدْرًا مِنْ أَمْرَةِ عُمَرَ مُجَلَّدَ ارْبَعِينَ حَتَّى إِذَا عَتَوْا فِيْهَا وَ فَسَقُوْا جُلْدَ ثَمَانِينَ .
আমরা রাসূলে করীম (সা)-এর এবং হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতের আমলে মদ্যপায়ীকে আমাদের হাতে জুতা ও চাদর দ্বারা মারপিট করতাম। হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে চল্লিশ দোরা মারা হতো। কিন্তু পরে দেখা গেল মদ্যপায়ীরা খুব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং সীমালংঘন করে যাচ্ছে, তাই তখন আশি দোরা মারার বিধান কার্যকর করা হয়।
مَنْ ظَلَمَ قَيْدَ شِبْرٍ مِنْ أَرْضِ طَوَّقَهُ مِنْ سَبْعَ أَرْضِينَ .
যে লোক এক বিঘত পরিমাণ জমি যুলুম করে দখল করে নিবে তার গলায় সাত তবক যমীনের মালা ঝুলিয়ে দেয়া হবে।
যে লোক নিতান্ত মূর্খতাবশত আত্মহত্যা করবে, সে চিরদিন জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে। যেলোক কোন লোহার অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে সেই অস্ত্র দ্বারা নিজের পেট কাটতে থাকবে জাহান্নামে বসে। চিনদিনই তাকে তথায় থাকতে হবে। এটিও রাসূলেরই হাদীস।
কুরআন ও সুন্নাতের এইসব অকাট্য দলীল অবশ্যই পালনীয়। যে মুসলিমই এক আল্লাহ্ বন্দেগী গ্রহণ করবে, তার পক্ষে এগুলি যথাযথভাবে পালন করা একান্তই কর্তব্য। আর বাস্তবিকই কেউ যদি উপরোক্ত দলীলসমূহ নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করতে পারে, তার মনে, চরিত্রে অপরাধ প্রবণতা কোন স্থান পেতে পারে না। আর থাকলেও এই বিধানাবলী পালনের মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন অবশ্যম্ভাবী।
📄 মানুষের চরিত্রে ও আচার-আচরণে ইবাদাতের প্রভাব
ইসলামের চারটি ইবাদাত সর্বজনপরিচিত, মৌলিক এবং ইসলামী জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বের অধিকারী। সে চারটি ইবাদাত হচ্ছে—সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ। মূলত এর প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপিত করেছে। প্রত্যেকটিরই চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সকল প্রকার হীনতা-নীচতা থেকে মুক্ত করে কেবলমাত্র এক আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্ বানানো। মানব জীবনকে সকল প্রকার পাপ, না-ফরমানী ও পংকিলতা থেকে মুক্ত করা গেলেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব। তখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সকল প্রকার অন্যায় ও অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে। এই ইবাদাতসমূহের প্রত্যেকটিই মানুষকে সেই লক্ষ্যে প্রস্তুত করে। ইবাদাতসমূহের সেই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কিভাবে সম্ভব হয়, এখানে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
১. সালাত : সালাত মূলত মহান আল্লাহ্র সাথে তাঁর বান্দাহ্র এবং বান্দাহর সাথে তার মা'বুদের গভীর পবিত্র সম্পর্ক স্থাপন করে, মনে-হৃদয়ে আল্লাহ্র ভয় এবং আল্লাহ্র কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণের ভাবধারার সৃষ্টি করে। সালাতে মানবদেহের প্রায় সবকয়টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়োজিত হয়। দিন-রাত্রির চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচবারের সালাত আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ণবয়স্ক সব মানুষের উপর ফরয করেছেন। এরই মাধ্যমে বান্দাহ ও আল্লাহ্ মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দুনিয়ার কোন ফিতনাই সে সম্পর্ককে দুর্বল বা ছিন্ন করতে পারে না। বান্দাহ্ তখন ভুলে যায় না যে, তার উপর আল্লাহ্ হক সর্বাগ্রে এবং তাঁর ফরমানসমূহ কাজে পরিণত করেই তাঁর সে অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম হতে পারে।
আল্লাহর বান্দাহ্ দিনের সূচনা করে ফজরের সালাত আদায়ের মাধ্যমে। দাঁড়িয়ে রুকু সিজদা দিয়ে তার হাম্দও সানা পাঠ করে প্রমাণ করে যে, সে একমাত্র আল্লাহ্ বান্দাহ্। তাঁর বন্দেগীতে তার হৃদয় যেন স্বচ্ছ ও পবিত্র রয়েছে। এভাবে সে সকল প্রকার পাপ থেকে দূরে থেকে সারাদিনব্যাপী কার্যকলাপের মধ্যে পবিত্র থাকার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। অতঃপর সে তার নিরলস কর্মতৎপরতায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে একান্তভাবে আল্লাহ্র বান্দাহ্ থাকার জন্য যে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অবলম্বনের প্রয়োজন, তা-ই নামাযের মাধ্যমেই সে তা সংগ্রহ করে নেয়। তার কর্মব্যস্ততার মধ্যেই উপস্থিত হয় জোহরের সালাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়। তারপরে আসরের সালাতের সময়ও তার কর্ম ব্যস্ততার একবিন্দুও ভাটা পড়ে না। মাগরিবের সালাতের মাধ্যমে তার দিনের অবিশ্রান্ত কর্মব্যস্ততার পরিসমাপ্তি ঘটে। সে যেমন ফজরের সালাতে আল্লাহর সমুখে উপস্থিত হয়েও তাঁর সাথেও গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে দিনের যাত্রা শুরু করেছিল, ইশা ও বিত্রের সালাতে হাযির হয়ে সে সর্বশেষবারের তরে প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহর বান্দাহ্ হিসাবে দিনের তৎপরতা শুরু করেছিল ও নানা ব্যস্ততায় ডুবে গিয়েছিল, এখনও সে সেই আল্লাহরই একনিষ্ঠ বান্দাহই রয়েছে। সারাদিনে বিচিত্র ধরনের কর্মতৎপরতায় মশগুল হয়েও সে আল্লাহ্র বন্দেগীর সীমালংঘন করেনি।
সারাদিনের কোন মুহূর্তেও মহান আল্লাহকে ভুলে না যাওয়াই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বড় সুফল, মহামূল্য প্রাপ্তি। এরূপ অবস্থায় কোনরূপ অপরাধজনক কাজে অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। এই কারণে সালাত সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলার ঘোষণা হচ্ছে:
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرِ -
নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। -সূরা আনকাবুত : ৪৫
নবী করীম (সা) একটি উদাহরণের মাধ্যমে সালাতের উক্ত শুভফলের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন: তোমাদের কেউ যদি তার ঘরের সমুখে প্রবাহিত ঝর্ণায় প্রতিদিন পাঁচ বার গোসল করে, তা'হলে তার দেহে কোনরূপ মলিনতা অবশিষ্ট থাকবে বলে কি তোমরা ধারণা করতে পার? সাহাবীগণ বললেন 'না'। তিনি বললেন:
كَذلِكَ مِثْلُ الصَّلوتِ الْخَمْسَ يَمْحُو اللَّهُ بِهَا الْخَطَايَا
ঠিক এমনিভাবেই পাঁচ বারের সালাত দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাহর যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ও দোষ-ত্রুটি নিশ্চিহ্ন করে দিতে থাকেন।
সালাত মসজিদে জামায়াতের সাথে আদায় করা বাঞ্ছনীয়। সেখানে সে অন্যান্য মুসল্লী মুসলিম ভাইর সাথে সাক্ষাত লাভ করে। তারা একই কাতারে দাঁড়িয়ে একই ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে আল্লাহ্ ইবাদাত সম্পন্ন করে এবং তারই সন্তুষ্টি লাভ করে। প্রত্যেকেই তার অপর ভাইয়ের হাল-অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অবহিত লাভ করে। নিয়মিত মসজিদে আসা কোন লোক কখনও অনুপস্থিত হলে তার বিষয়ে খবর জানার তাকিদ লোক অনুভব করে। এভাবেই মুসল্লীদের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামষ্টিকতার উদ্রেক ঘটে। ফলে তারা সকলেই প্রত্যেকের পরিপূরক হয়ে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা ও নিরাপত্তাবোধ সহকারে জীবন যাপন করার সুযোগ পায়। এভাবে দৈহিক দিক দিয়ে পরস্পর নিকটস্থ লোকেরা অন্তরের দিক দিয়ে গভীরভাবে একাত্ম হয়ে উঠে। তারা সকলে একই ইমামের পিছনে একই কেবলামুখী হয়ে একই ইবাদাত পালন করে, একই আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে ঐক্যবদ্ধ এক জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। এভাবেই মুসলিম উম্মতের একত্ব গড়ে তোলা ও পরস্পরকে পরস্পরের ভাই বানিয়ে দেয়াই আল্লাহ্র ইচ্ছা ও বাসনা। বলেছেন: اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةُ। সব মু'মিনরাই পরস্পরের ভাই।
মুসলমান যখন একদিনের পাঁচবারের সালাতের মাধ্যমে অভিন্ন উম্মত হয়ে গড়ে উঠে, তখন তারা পবিত্র হৃদয়, নিষ্কলুষ পবিত্র মানুষ হয়ে দাঁড়ায়। তখন প্রত্যেক মুসলিম তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে পছন্দ করে নিজের জন্য। আল্লাহকে সে ভয় করতে থাকে গোপনে ও প্রকাশ্যে। তাই তার পক্ষে কোন অপরাধ করা সম্ভব হয় না। কেননা তার অকৃত্রিম বিশ্বাস রয়েছে, অপরাধ বা নাফরমানি করলে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
২. সিয়াম (রোযা): রমযানের একমাসকালীন সিয়ামের প্রশিক্ষণমূলক অবদান অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ব্যাপক ও গভীর। সিয়াম মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির উপর শক্ত লাগাম লাগিয়ে দেয় এবং রোযাদারকে যাবতীয় নাফরমানীর কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। অপরাধ যে ধরনের ও যে প্রকৃতিরই হোক, তা নক্সের খায়েশ, কামনা, বাসনা, লোভ ও লালসা থেকেই উৎসারিত হয়। আর তার গোড়াতে তিনটি প্রবল শক্তি-উৎস নিহিত থাকে। প্রথম, লোভ-লালসার শক্তি; দ্বিতীয় যৌন স্পৃহা ও কু-প্রবৃত্তি এবং তৃতীয় হচ্ছে অহমিকতা-দাম্ভীকতা বোধ। সিয়ামের প্রবল প্রশিক্ষণমূলক প্রভাব রয়েছে এই তিনটি শক্তি-উৎসের উপর।
আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র রিস্কসমূহ হালাল করেছেন এবং সকল প্রকার অপচয়-অপব্যবহারমুক্ত পানাহারকে মুবাহ ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ করেছেনঃ
وَ كُلُوا وَاشْرَبُوا وَ لَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ - قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي اخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَ الطَّيِّبَتِ مِنَ الرِّزْقِ - قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
............আর খাও, পান কর, কিন্তু সীমালংঘন করো না। আল্লাহ্ তা'আলা সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। হে নবী, এই লোকদের বল, আল্লাহ্র সেসব সৌন্দর্য অলংকারকে হারাম করেছে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের জন্য বের করে এনেছেন এবং আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসসমূহকে নিষিদ্ধ করেছে? বল, এই সমস্ত জিনিস দুনিয়ার জীবনেও ঈমানদার লোকদের জন্যই বরং কিয়ামতের দিন তো একান্তভাবে তাদের জন্যই নির্দিষ্ট থাকবে।
-সূরা আ'রাফ : ৩১-৩২
মানুষ সাধারণত দিন-রাতে তিনবার পানাহারে অভ্যস্ত-সকাল, দুপুর এবং রাতে। আর যখনই পিপাসা লাগে পান করে এবং যখনই ইচ্ছা হয় পানাহার করে। কিন্তু রমযান মাসে এই পানাহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। ছুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তা সবই বন্ধ থাকে। এই সময় ক্ষুধা তাকে যন্ত্রণা দেয়, পিপাসা তার বক্ষদেশ জ্বালায়-যদিও তার সম্মুখে সুমিষ্ট ও সুস্বাদু আহার্য সবই বর্তমান থাকে। আর তার জন্য আল্লাহ্ তা হালাল-ও করেছেন। কিন্তু সিয়ামের এই সময় সে সেইসব কিছু পান ও গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। তার অর্থ, যে আল্লাহ্ তার জন্য এ সব পানাহার হালাল করে দিয়েছেন, এই সময়টায় তারই আদেশে তা থেকে বিরত থেকে মানুষ এই কথাই প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করে দেয় যে, সে আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কিছু করে না। সে সেই কাজ করে এবং সেই সময় করে, যখন আল্লাহ্ যা করার অনুমতি দান করেন। বছরের বারোটি মাসের মধ্যে একটি মাসকাল ধরে যে নিজেকে এভাবে চালিত করতে অভ্যস্ত হয়, তার এ অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী বলে পরবর্তী এগারোটি মাস সে আল্লাহ্ নিষিদ্ধ পানাহার ও ধন-মাল থেকে নিজেকে বিরত রাখতে খুবই সাফল্য সহকারে সক্ষম হয়।
আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার জন্য বিয়ে ও স্ত্রী সঙ্গম হালাল করেছেন। বলেছেন:
فَانْكِحُوْ مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنى وَثُلث وَ رُبعَ طَ فَإِنْ خِفْتُمْ الَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
অতএব তোমরা স্ত্রীরূপে গ্রহণ কর, দু'জন তিন জন, চারজন যা তোমার ইচ্ছা। আর নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে না বলে ভয় হলে মাত্র একজন। - সূরা নিসাঃ ৩
ফলে বান্দা দিনে-রাতে যখন ইচ্ছা স্ত্রীর সহিত সঙ্গম করতে ও আসল ক্ষেতে বীজ বপন করতে পারে, কোন বাধা-নিষেধ নেই-কেবলমাত্র স্ত্রীর হায়েয অবস্থা ছাড়া। বলেছেনঃ
نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের ক্ষেত সমতুল্য। অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেতে গমন কর যখন যেভাবে ইচ্ছা। -সূরা বাকারা : ২২৩
কিন্তু রমযান মাসে এই মুসলিম ব্যক্তির জীবনে এই অবাধ স্বাধীনতা সীমিত হয়ে আসে। তখন এই কাজ কেবলমাত্র রাত্রিকালেই সম্পন্ন হতে পারে; দিনের বেলা নয়। ইরশাদ হয়েছে:
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامَ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ - هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَ أَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ - عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ انْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَ عَفَا عَنْكُمْ - فَالْئِنَ بَاشِرُوهُنَّ وَ ابْتَغُوْا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ -
রমযানের রাত্রিকালে তোমাদের স্ত্রীদের সহিত যৌন মিলন হালাল ও সঙ্গত ঘোষণা করা হয়েছে। ওরা তোমাদের পোশাক, তোমরা ওদের পোশাক। আল্লাহ্ জানতে পেরেছেন, তোমরা নিজেদের উপর বিশ্বাস রক্ষা করতে অসমর্থ হচ্ছ। এই কারণে আল্লাহ্ তোমাদের তওবা কবুল করেছেন, ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইতঃপূর্বে ভুল-ত্রুটি। এক্ষণে তোমরা তাদের সহিত (রাত্রিকালে) সঙ্গম করতে পার এবং তোমাদের জন্য আল্লাহ্ যা লিখে দিয়েছেন তার সন্ধান করতে পার। -সূরা বাকারা : ১৮৭
রোযাদার মুসলিম একমাসকাল ধরে দিনের বেলা স্বীয় যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকতে যখন সক্ষম হচ্ছে, অথচ স্ত্রীসঙ্গম তার জন্য সম্পূর্ণ হালাল-তখন স্বভাবতই আশা করা যায় যে, বছরের পরবর্তী মাসগুলিতে নিষিদ্ধ যৌন সঙ্গম থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে অতীব যোগ্যতা সহকারে।
সিয়াম মুসলিমকে অশ্লীল, বাজে ও অর্থহীন কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত রাখে। এই কাজ মুসলিম ব্যক্তির জন্য সাধারণভাবেও হারাম বটে; কিন্তু রমযান মাসে এইগুলির হারাম তো আরও তীব্র ও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন :
مَنْ لَّمْ يَدَعُ قَوْلَ الزَّوْرِ وَ الْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ اللَّهِ حَاجَةً فِي أَنْ يُدَعْ طَعَامَهُ وَ شَرَابَهُ -
যে লোক মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আমল ত্যাগ করল না, তার খাদ্য-পানীয় পরিত্যাগ করে চলায় আল্লাহ্র কোন প্রয়োজন নেই। -বুখারী, মুসলিম
অপর হাদীসে বলা হয়েছে:
كُمْ مَنْ صَائِمٍ لَيْسَ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَ الْعَطْسُ -
বেশ সংখ্যক রোযাদার এমন হয়ে থাকে, যাদের রোযায় ক্ষুধা, পিপাসার কষ্ট সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না। -বুখারী, মুসলিম
কুরআনে যদিও অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সকলকেই দেওয়া হয়েছে- যেমন বলা হয়েছে:
جَزَءُ اسَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مَثْلُهَا
'অন্যায়ের প্রতিফল অনুরূপ অন্যায়ই হয়।'
কিন্তু রোযাদারকে এক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে হয়। কারুর পক্ষ থেকে অন্যায় হলেই সেও তার জওয়াবে অন্যায় করবে এইরূপ স্বাধীনতা তাকে দেওয়া হয়নি। কেউ তাকে গাল-মন্দ বললে সেও অনুরূপ গাল-মন্দ তাকে শুনিয়ে দেবে, তা রোযাদারের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। এরূপ অবস্থা দেখা দিলে সিয়ামই তাকে ঢাল স্বরূপ আড়াল করে রাখবে। হাদীসে এই কথাই বলা হয়েছে এই ভাষায়:
الصِّيَامُ جُنَّةً فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمٍ أَحَدُكُمْ فَلَا يَرْفَتْ وَلَا يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي أَمْرَؤُ صَائِمٌ -
সওম (রোযা) ঢাল বিশেষ। রোযার দিনে কারুরই স্ত্রীসঙ্গম করা উচিত নয়, উচিত নয় হল্লা চিৎকার ও গোলমাল করা। কেউ যদি তাকে গাল-মন্দ বলে বা তার সহিত মারামারি করতে আসে, তা হলে তার বলা উচিত: আমি একজন রোযাদার ব্যক্তি। -বুখারী, মুসলিম
এভাবে একজন লোক যদি সারা মাস ধরে ক্রোধ-আক্রোশ এড়িয়ে চলার অভ্যাস করে, অন্যদের উপর বাড়াবাড়ি করা থেকেও বিরত থাকে, তা হলে পরবর্তী এগারো মাসকাল এই অভ্যাসের শক্তি দিয়ে সকল প্রকার অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিতে ওসব এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে-এটাই তো আশা করা যায়।
মানুষের উপর সর্বাধিক প্রভাব ও কর্তৃত্ব খাটায় মানুষের ইচ্ছাশক্তি। সেই ইচ্ছাশক্তিই যদি একমাসকাল ধরে উক্তরূপ নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে সে তার ঈমানী শক্তিকে প্রবল ও অনমনীয় ইচ্ছাশক্তির উপর বিজয়ী করে ও তাকে শরীয়তের বিধানের আওতায় নিয়ন্ত্রিত রাখতে সক্ষম হবে। এই উদ্দেশ্যেই রোযার এই সুমহান ব্যবস্থা ইসলামী শরীয়তে গ্রহণ করা হয়েছে।
৩. যাকাত: যাকাত মুসলিম ব্যক্তির সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ইবাদত। লোভ-লালসা, কার্পণ্য, সংকীর্ণতা, হিংসা, দ্বেষ, ধন-সম্পদের প্রেম-মায়া ইত্যাদি থেকে মানব মনকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে এই যাকাত। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে:
وَ مَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
যেসব লোক তাদের মধ্যকার কৃপণতা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে, তারাই সফলকাম। -সূরা তাগাবুন: ১৬
বহুলোক শুধু ধন-মালের লোভে পারস্পরিক শত্রুতায় লিপ্ত হয়। একদল অন্য দলের ধন-সম্পদ কেড়ে নেয় শুধু এই জন্য যে, ওদের আছে, আর এদের নেই। মানুষকে 'আছে ও নেই' এই দুই ভাগে বিভক্ত করে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। যাকাত এইসব বিপদ-আপদকে দূর থেকেই প্রতিরোধ করে। যে মুসলিম যথারীতি যাকাত আদায় করে এবং এই যাকাতের সাহায্যে দারিদ্র্য পীড়িত জনগণকে দারিদ্র্য ও অভাবমুক্ত করেছে, সে কখনও অন্য লোকের ধন-মালকে কোনরূপ মূল্য বা বিনিময় না দিয়ে হরণ করতে পারে না। লোভ-লালসাও কখনও তাকে অন্যায় কাজে উদ্বুদ্ধ করবে না।
দরিদ্র ব্যক্তি যদি শান্তিপূর্ণভাবে ও সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে ধন-সম্পদ থেকে নিজের ন্যায্য অংশ লাভ করে, তখন তার মনে কোন হিংসা-দ্বেষ থাকতে পারে না। 'আছে' ও 'নাই'র মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ঠিক তখনই সংঘটিত হয়েছে, যখন 'আছে'রা সব ধন-সম্পদ আঁকড়ে ধরে আছে। 'নাই'দের এক পয়সা দিতেও প্রস্তুত হয় না। এরূপ অবস্থায় 'আছে' ও 'নাই'র মধ্যে সর্বাত্মক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সৃষ্টি হওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠে। যাকাত এই ভুল বিভক্তিকে যেমন মিথ্যা করে দেয়, তেমনি তা ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব ও বিভেদ-পার্থক্য চিরতরে খতম করে পরস্পর ভাই ভাই বানিয়ে দেয়। দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের অভাব মোচন করে সচ্ছলতার দিকে যাওয়ার অবাধ সুযোগ করে দেয়। এইরূপ সমাজেই মানুষ পারস্পরিক প্রেম-ভালবাসার বন্ধনে বন্দী হতে পারে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا .
তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর। তাছাড়া তুমি তাদের পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ কর। -সূরা তাওবা: ১০৩
বস্তুত যাকাতের যে সামষ্টিক ভূমিকা রয়েছে, তাতে দারিদ্র্যের প্রতিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত মানুষের মধ্যকার দূরত্ব দূর হয়ে গিয়ে তারা সচ্ছলতার দিক দিয়ে অতি নিকটে এসে যায়। ফলে কোন শ্রেণী পার্থক্য থাকে না যেমন, তেমনি লোকদের অন্তরে নিহিত হিংসা-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা দূরীভূত হয়। তার দরুণ শ্রেণী-সংগ্রামের আগুন কখনই জ্বলে উঠে না। মানুষ পরস্পরের ভাই হয়ে পরম একাত্মতার মধ্যে জীবন যাপন করার সুযোগ পায়। সমাজের অভাবগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের অভাব মোচনের লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হয়। যাকাতের বণ্টন খাতসমূহ দেখলেই তা স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়।
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَ الْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَلْمُؤَالُفَةِ قُلُوبُهُمْ وَ فِي الرِّقَابِ وَ الْغَارِمِينَ وَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَ ابْنُ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ - وَ اللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ -
যাকাতের সম্পদ ফকীর, মিসকীন, সেই কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের মন রক্ষার প্রয়োজন, যারা দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহ্র পথে এবং নিঃস্ব পথিকের জন্য-আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত কর্তব্য। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ সুবিজ্ঞানী। -সূরা তাওবা: ৬০
বস্তুত ধনীদের ধন-মালে গরীব-মিসকীনদের হক রয়েছে। এই চেতনাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণের প্রাণ-শক্তি। এই চেতনা মুসলমানদের শোষণ-পীড়ন ও যুলুম-সীমালংঘনের জ্বালায় জর্জরিতকরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে ইসলামী সমাজে এই ধরনের কোন অপরাধ অনুষ্ঠিত হওয়া সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।
৪. হজ্জ : হজ্জ মুসলিম ব্যক্তির দেহ-আত্মা-হৃদয়-মন সহকারে আল্লাহর ঘরের দিকে এক মহাযাত্রা। তথায় সে আল্লাহ্র ঘরের তওয়াফ করে, সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে 'সায়ী' করে, মিনা ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করে। পালন করে অন্যান্য যাবতীয় জরুরী অনুষ্ঠানাদি।
হজ্জের ক্ষেত্রে প্রত্যেক এলাকার হজ্জযাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘মীকাত’ থেকে ইহরাম বাঁধতে হয়। তখন সে তার মন ও দেহ—দেহ ও মন উভয়কেই সম্পূর্ণরূপে পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ করে নেয়, পবিত্র থাকে তার পরনের দীনাতিদীন ব্যক্তির উপযোগী পোশাক। এভাবে হজ্জ পালন করে সে গুনাহ্ মুক্ত হয়, নিষ্পাপ হয়ে যায় মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিসাৎ হওয়ার দিনের মতই।
হজ্জের সমগ্র সফরে ‘তালবিয়া’—লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা—পাঠ করতে হয়। তা পাঠ করে হজ্জযাত্রী ঘোষণা করে, ‘হে রব! আমি তোমার ডাকে হাজির হয়েছি। আমি তোমার নিকটে হাজির হয়ে আছি।”
বস্তুত হজ্জ এক সাথে বিপুল সংখ্যক ইবাদতের সমন্বয়। হাজী যখন বায়তুল্লাহ্র তওয়াফ করে, তখন তার দিল সালাতের সেই কিবলার সাথে সংযুক্ত ও সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যে দিকে মুখ করে সে নিজের ঘরে থেকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। কা’বার তওয়াফকারী সব মানুষ যদিও বিভিন্ন দেশের, বর্ণের, আকার-আকৃতির, পোশাক-পরিচ্ছদের, তবুও তারা এক ও অভিন্ন এই দিক দিয়ে যে, তারা সকলে এক আল্লাহর প্রতি ঈমানদার এবং এক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই তাদের প্রত্যেকেরই এবং সকলেরই চরমতম লক্ষ্য। এ কারণে তারা এক ও সম্পূর্ণ একাত্ম। এই গোটা অনুষ্ঠানই আর একটা বিরাট ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তহীন আত্মদানের মর্মস্পর্শী দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ফলে তাদের অন্তর গভীরভাবে ভারাক্রান্ত ও অবনত হয়ে উঠে মহান আল্লাহ্র অসীম অনুকম্পায়। আরাফাতের বিশাল ময়দানে প্রায় একটি দিন সে অতিবাহিত করে মহান আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি ও দোয়া-প্রার্থনা করে। দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে সম্প্রসারিত করে আল্লাহ্র নিকট মাগফিরাত রহমত কামনা করে। অন্তর দিয়ে স্মরণ করে সেই দিনের কথা:
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا وَمَا عَمِلَتْ مِنْ سُوْءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
যেদিন প্রত্যেকটি মানুষ তার কৃত ভালো কাজের সুফল সম্মুখে উপস্থিত পাবে। আর যে খারাপ কাজ সে করেছে, সে বিষয়ে তার মনে এই কামনা জাগবে যে, কতই ভালো হতো যদি তার সাথে সে জিনিসের অনেক বেশি দূরত্ব হতো। -সূরা আল-ইমরান: ৩০
হাজী হজ্জ করে এই আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করে এবং সেই পাথেয় নিয়ে সে নিজের দেশে ফিরে আসে। এই শক্তিই তার পরবর্তী সমগ্র জীবনে সর্বপ্রকারের পাপ ও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য ঢালের কাজ করে।
مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُتْ وَ لَمْ يَفْسُقُ رَجَعَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمٍ وَ لَدَتْهُ أُمَّهُ -
যে হজ্জ করল এবং তাতে সে স্ত্রী সঙ্গম করল না, কোনরূপ পাপের কাজও করল না, সে ফিরে এল মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতই সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে। -বুখারী, মুসলিম
টিকাঃ
১. বখারী, মুসলিম।
📄 ঈমান ভিত্তিক ইবাদাত
অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের যে ভূমিকার বিবরণ উপরে প্রদত্ত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান। এই ঈমানই এসব ইবাদত ফরয করেছে। আর ঈমানের প্রকৃত তাৎপর্য হচ্ছে তা মানুষের মন-মানসিকতা সংশোধন ও সুসংবদ্ধকরণের সুদৃঢ় স্তম্ভ। মানুষের আচার-আচরণকে সুদৃঢ় ও সুশোভন করে গড়ে তোলে এই ঈমান মানুষের জীবন্ত মনকে লালন করে এই ঈমান। এই ঈমানই হচ্ছে মানুষের মান-মর্যাদা সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরী। ঈমান ছাড়া অপর কোন জিনিস-কোন প্রক্রিয়াই এই কাজ করতে পারে না।
তা সত্ত্বেও ঈমানদার লোকদের সমাজে অপরাধ প্রবণতার এত ব্যাপক বিস্তৃতি কেন, তা একটা প্রবল জিজ্ঞাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই লোকেরা ইবাদতের প্রায় সব অনুষ্ঠানই পালন করে থাকে। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাব, ইবাদত তো হচ্ছে, কিন্তু তা ইবাদতের প্রকৃত প্রাণশক্তি শূন্য। আল্লাহ্র যতটুকু ভয় মানব মনে জাগ্রত থাকলে সেই প্রাণশক্তি লাভ করা সম্ভব, তার অভাব অত্যন্ত প্রকট। সেই সাথে জাতীয় জীবনে অন্ধ অনুসরণের যে ব্যাপক অভ্যাস, তা-ও উক্তরূপ প্রাণশক্তির পরিপন্থী। বস্তুত মুসলিমের ইবাদতের পরম লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর নৈকট্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি পাওয়া। এ জিনিস প্রবল থাকলেই ঈমানের কথিত কার্যকরতা অবশ্যই লক্ষণীয় হবে।
ঈমান মানুষের জীবনে তার বাঞ্ছিত সুফল দিতে পারে, যদি তাতে নির্ভুল আকিদা ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে এবং কথার সহিত কাজের পূর্ণ সামঞ্জস্য স্থাপিত হয়। যেসব লোক মুখে ঈমান প্রকাশ করে, কিন্তু সেই ঈমানের সাথে অন্তরের গভীর সম্পর্ক ও সাযুজ্য নেই, এই কারণে তা নিতান্তই দেখানোপনা বা প্রতারণায় পরিণত হয়। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন :
وَ مِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَ بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَ مَا هُمْ بُمُؤْمِنِينَ - يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَ الَّذِينَ آمَنُوا وَ مَا يَخْدَعُونَ إِلَّا انْفُسَهُمْ وَ مَا يَشْعُرُونَ -
এমন লোকও রয়েছে যারা মুখে বলে যে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা মু'মিন গণ্য হওয়ার অধিকারী নয়। তারা আল্লাহ্ ও ঈমানদার লোকদের ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু আসলে সে ধোঁকাটি তাদের উপরই প্রতিফলিত হয়-যদিও তারা তা বুঝে উঠতে পারে না। -সূরা বাকারা: ৮-৯
আরো বলেছেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمْ وَ إِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلوةِ قَامُوْا كُسَالَى يُرَاؤُنَ النَّاسَ وَ لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً -
মুনাফিকরা আল্লাহর সহিত ধোঁকাবাজি করে; কিন্তু আসলে এই ধোঁকা তাদের নিজেদেরই উপর পড়ে। তারা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় নিতান্তই অনিচ্ছুকভাবে। তারা লোকদের দেখায় যে, তারা সালাত আদায় করছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে তারা খুব কম-ই স্মরণ করে। -সূরা নিসা : ১৪২
অনুরূপভাবে এমন লোকও রয়েছে যারা প্রকৃত সত্যকে চিনে; কিন্তু সে সত্য ও সে সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ ঈমানের মাঝে তাদের অহংকারই বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
وَ إِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَ هُمْ يَعْلَمُونَ
একদল লোক প্রকৃত সত্যকে গোপন করে রাখতে চায়, অথচ সে সত্যকে তারা জানে। -সূরা বাকারা : ১৪৬
প্রকৃত ঈমান হচ্ছে সত্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে সে সত্যকে স্বীকার করা এবং সে সত্য অনুযায়ী কাজ করা। সত্য বলে বিশ্বাস করা আল্লাহকে রাসূলকে এবং পরকালকে, তাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ না থাকা। তা' হলেই সে ঈমানের মিষ্টতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। আর তা না করা পর্যন্ত সে কিছুতেই শান্ত ও আশ্বস্ত হতে পারে না।
কথা মুখে জিহ্বার সাহায্যে উচ্চারিত হয়। অন্তরের স্থিত ও সুদৃঢ় বিশ্বাস ভাষার পোশাকে প্রকাশিত হয়। তা মুসলিম ব্যক্তির প্রতি রক্তবিন্দুর সহিত মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। তার আচার-আচরণ ও কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়েই তা প্রতিফলিত হয়।
আর আমল উৎসারিত হয় সত্যিকার ঈমানের বাস্তব ফলস্বরূপ। তাতে কল্যাণের দিকে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। আল্লাহ্র প্রতি ঐকান্তিক বিশ্বাস সহকারেই শরীয়ত পালন ও অনুসরণ করা হয়। তখন ঈমান জীবন্ত ও বাস্তব হয়ে দেখা দেয়। এই ঈমানেরই দাবি হচ্ছে, ইসলামকে বিজয়ীরূপে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে প্রত্যক্ষভাবে জিহাদ করা। চূড়ান্ত মাত্রার ত্যাগ স্বীকার করা।
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَ انْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - أَوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ
প্রকৃত মু'মিন সেসব লোক' যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। পরে তারা কখনই সন্দেহের আবর্তে নিমজ্জিত হয়নি। তারা আল্লাহ্ পথে জিহাদ করে তাদের ধন-মাল দিয়ে ও তাঁদের জান-প্রাণ দিয়ে। বস্তুত তারাই সত্যিকার ঈমানদার। -সূরা হুজুরাত : ১৫
এই ঈমানই মানুষকে এক নবতর সৃষ্টি বানিয়ে দেয়। এ ঈমান প্রথমে অন্তরের গভীর সূক্ষ্ম পরতে দানা বাঁধে। পরে বাহ্যিকভাবে সত্যিকার মু'মিনের রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্র প্রভুত্ব সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তারই আনুগত্য করে। তখন তার যাবতীয় তৎপরতা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচারিত হয় আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْ فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمَا
তোমার খোদার কসম, 'লোকেরা প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার হতে পারবে কেবল তখন, যখন তারা তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে তোমাকেই বিচারক ও মীমাংসাকারী-বিধানদাতারূপে গ্রহণ করতে পারবে এবং তোমার বিচার ফয়সালার প্রতি তাদের মনে একবিন্দু কুণ্ঠা বা দ্বিধা জেগে উঠবে না, বরং পুরাপুরিভাবেই মেনে নেবে। -সূরা নিসা: ৬৫
অতএব আল্লাহ্ ও রাসূলের আদেশ-নিষেধ অমান্য করার কোন ইখতিয়ার থাকতে পারে না কোন ঈমানদার মানুষের।
وَ مَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَ لَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যখন লোকদের কোন বিষয়ে ফয়সালা করে ফেলেন, তখন তা মেনে নেওয়া ও না-মেনে নেওয়ার কোন ইখতিয়ারই থাকতে পারে না। -সূরা আহযাব: ৩৬
এইরূপ ঈমানই মানুষের জীবন ও বাহ্যিক আচার-আচরণকেও সুন্দর করে গড়ে তোলে, সুষ্ঠু ও সুপরিচ্ছন্ন করে। সুবিচার ও ন্যায়পরতার মৌল নিয়ম ও বিধান কার্যকর হয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণ করে। অরাজকতা, বিপর্যয়, অশান্তি ও অর্নিষ্ট সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয়। পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা, সহৃদয়তা ও সহানুভূতির বন্ধনে ঈমানদার লোকদের জড়িত করে। এ বন্ধনের কোন বিকল্প নেই। ভাষা, বর্ণ, শ্রেণী জাতীয়তা, সম-স্বার্থ ইত্যাদি কোন একটি ভিত্তিও মানুষকে অতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না, যতটা পারে এই ঈমান। এই ঈমান যে জনসমষ্টির নিকট প্রাধান্য পাবে, তথায় অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসাবে ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তির সাথে সাথে সামষ্টিক জীবনেও পরিপূর্ণ শান্তি ও স্বস্তি বাস্তবায়িত হবে। আর কোন জনসমষ্টি যদি এই ঈমান হারিয়ে ফেলে তাহলে তথায় ব্যাপক বিপর্যয়, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং মারাত্মক ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা-অরাজকতা দেখা দেওয়া অবধারিত। আর আজকের দিনের এটাই হচ্ছে রূঢ় বাস্তবতা।
বর্তমানে সভ্যতা বৃক্ষ শাখা-প্রশাখা পত্র-পল্লব ও ফুলে-ফলে সুশোভিত জীবন-যাত্রার উচ্চতর মান এবং বৈষয়িক ও বস্তুগত উন্নতির সর্বোচ্চতা মানুষের করায়ত্ত। কিন্তু চরম অনিশ্চয়তার প্রচণ্ডতা, অপরাধের হতাশাগ্রস্ততা ও ভয়-ভীতির ব্যাপকতা বর্তমানে গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে। যা পূর্বে কোন দিনই দেখা যায়নি।
সন্দেহ নেই, মনুষ্য সভ্যতা দ্রুত সম্মুখের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রকৃতি বিজ্ঞান, বাস্তব পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিবিদ্যা অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছে। কিন্তু এই উন্নতি ও অগ্রগতি মানবজীবনের মৌলিক সমস্যাসমূহের সমাধানে-মানুষকে এক বিন্দু শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ প্রদানে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
একালের মনস্তত্ত্ব অধ্যয়নের ক্ষেত্র খুবই প্রশস্ত এবং বিশাল। মানবীয় বিবর্তন ও প্রগতির সকল পর্যায় ও স্তরই এক্ষণে তার আওতাভুক্ত। প্রত্যেক স্তরের মনস্তাত্ত্বিক কারণ সমূহও আজ আলোচিত। এর প্রতিটি শাখা এক্ষণে এক-একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানে পরিণত। যথা শিশু মনস্তত্ত্ব, কিশোর মনস্তত্ত্ব, শিক্ষা মনস্তত্ত্ব, অপরাধ সংক্রান্ত মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। এছাড়া পরিবেশ, উত্তরাধিকার, অনুকরণপ্রিয়তা এবং পরিবার, সমাজ, গ্রাম, শহর, মরুভূমি ইত্যাদি পর্যায়ে জ্ঞান-গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপকতা আজ বাস্তব সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
কিন্তু এসব অধ্যয়ন অন্যায় ও দুষ্কৃতি দমনে মানুষের সম্মুখে কোন সফল পরিকল্পনা বা কর্মকাণ্ডের কোন সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপিত করতে পারেনি। সক্ষম হয়নি অপরাধকে মূলোৎপাটিত করতে। বরং বিশ্বের চতুর্দিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে শুধু অশান্তি-অরাজকতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে। বিপর্যয় ক্রমবৃদ্ধিমান, আইন লংঘনের ধারা তীব্র গতিতে অগ্রসর। রাষ্ট্র সরকারসমূহ কোন কোন অপরাধ দমনে রূঢ় ও প্রচণ্ড কার্যক্রম গ্রহণ করেও-আর্থিক পাইকারী জরিমানা এবং গ্রেফতার, কারারুদ্ধকরণ ইত্যাদির আশ্রয় নিয়েও চলমান ঘটনাবলীর উপর একবিন্দু সীমারেখা টানতেও সক্ষম হচ্ছে না, ব্যর্থতার পর ব্যর্থতাই শুধু কুড়াচ্ছে।
বর্তমান সময় মানবীয় সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উড্ডীন। এই সময়ও বিশ্বমানবতার এই চরম দুরবস্থা ও ব্যর্থতার সঠিক কারণ আঁচ করতে পারছে না কোন ক্রমেই। মানব মনের গভীর গহনে যে সূক্ষ্ম রোগজীবাণু তাকে তিলে তিলে কুরে কুরে খাচ্ছে, তাকে আয়ত্ত করতে সম্পূর্ণ অক্ষমই থেকে যাচ্ছে।
বস্তুত মানুষের মনই হচ্ছে মানব প্রকৃতি এবং ভালো-সত্য ও কল্যাণ প্রীতির মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের কোন বাস্তব ক্ষেত্রে একবিন্দু পরিবর্তন আনতে হলে সেজন্য সর্বাগ্রে পরিবর্তন সূচিত করতে হবে মানুষের মনে, এই কথা আধুনিক বস্তু-বিজ্ঞানে পারদর্শী জগতের সুধীজনগণ আদৌ উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। এরা অন্যায় ও দুষ্কৃতি দমনে শরনিক্ষেপ করে সম্পূর্ণ ভুল লক্ষ্যে। ফলে সব চেষ্টা-প্রচেষ্টাই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায় অতীব বাস্তব কারণে। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ চিন্তা-বিবেচনা গবেষণা মানব মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থানে পৌঁছতে পারছে না। মানুষের অন্তরকে এসব অন্যায়, বিপর্যয় ও দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে সজাগ ও সক্রিয় করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে না। মানুষের হৃদয় মনকে সেসব থেকে রক্ষা করার অতন্দ্র প্রহরী। বানাতে পারছে না। ফলে অন্যায়, দুষ্কৃতি ও অরাজকতা বন্ধ করতেও সক্ষম হতে পারছে না। মানবীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টার ইতিহাসে মানুষের জীবনের কোন ক্ষেত্রেই বোধ হয় এতটা ব্যর্থতা কুড়াতে হয়নি, যতটা ব্যর্থতা কুড়াতে হয়েছে এই ক্ষেত্রে। সভ্যতা সংস্কৃতির সব উন্নতি উৎকর্ষ আজ ম্লান হয়ে গেছে এই ব্যর্থতার কারণে।
মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, এটা মানব প্রকৃতি নিহিত এক মহাসত্য। মানুষ লক্ষ্য করে যে, তার কর্মতৎপরতাকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য তারই মত কিছু সংখ্যক লোক প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে, কৌশলের পর কৌশল আঁটছে, আইনের পর আইন রচনা করে চলেছে, অথচ সে-ও তাদেরই মত মানুষ। সে কেন মানুষের মনগড়া কৌশল জালে পা জড়িয়ে নিজেকে বন্দী করবে, সে কেন অনুগত হবে তারই মত মানুষের মনগড়া সব আইন-বিধানের? এটা মানুষের গভীর প্রকৃতিতে নিহিত মনস্তত্ত্ব। একটা মৌলিক প্রশ্ন। আধুনিক কালের আইন-দার্শনিক, আইন ও মনস্তত্ত্ব বিশারদদের নিকট এই মনস্তত্ত্বের কোন ইতিবাচক বিশ্লেষণ আছে কি? পারেন কি এই প্রশ্নের সঠিক ও সান্ত্বনাদায়ক কোন জওয়াব দিতে?
মানুষকে কোন বৈষয়িক বঞ্চনা বা বৈষয়িক শাস্তির ভয় কি মানুষকে মানুষের রচিত আইন ও কলাকৌশল লংঘন করা থেকে বিরত রাখতে পারে?
মানুষ মানুষের রচিত আইন-কানুন ও কলা-কৌশল লংঘন করবে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই, আইনের প্রহরী ও শান্তি নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের চোখে ধূলি দিয়ে তাদের অসতর্ক মুহুর্তের সুযোগ নিয়ে আইনের গোটা প্রাসাদের ইট এক একখানা খুলে ফেলবে, তা ঠেকাবার সাধ্য কারুর আছে কি?
মানব রচিত আইন-বিধান ভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থা ঠিক এই কারণেই সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল প্রমাণিত হয়েছে। অদৃশ্যের পর্দা উন্মোচন করা এবং লোকচক্ষুর আড়ালে নিত্য সংঘটিত অপরাধসমূহ প্রতিরোধ বা দমন করা একালের প্রচলিত প্রশাসন কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার।
পরকালীন জীবনের সমগ্র ব্যাপারও এই প্রশাসন কর্তৃপক্ষের আয়ত্তের সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থিত। সেখানে কোন অপরাধীকে ধরা ও তার জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা যেমন তার সাধ্যায়ও নয়, তেমনি সেই ভয় দেখিয়ে অথবা পরকালীন কোন সওয়াবের আশ্বাস দিয়েও কাউকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তার অধিকারও কারুর নেই।
কিন্তু আসমানী আইন-বিধান-মানুষের জন্য মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ আইন-বিধানের ব্যাপারটি এ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সমস্ত মানুষই জানে, বুঝে ও বিশ্বাস করে যে, সে আইন একান্তভাবে আল্লাহ্র রচিত। আর আল্লাহ্ সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ। তাঁর কর্তৃত্ব কেবল ইহজীবনের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত নয়, পরকালীন জীবনে সর্বাত্মক কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। এই দুনিয়ার জীবনে কোন অপরাধের শাস্তিকে ফাঁকি দিয়ে তার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারলেও পরকালীন জীবনে তাঁর কর্তৃত্বের আওতার বাইরে যাওয়া কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। তা ছাড়া ইহজীবনে ইসলামী প্রশাসনিক আইন লংঘন করলে পরকালীন জীবনে তাকে আরও কঠিন শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে। তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না। ফলে আইন ফাঁকি দেওয়া বা প্রশাসনের অগোচরে আইন লংঘনের কোন প্রবণতা মানব মনে বাসা বাঁধতে পারে না। এটা যদিও বিশ্বাসের ব্যাপার, কিন্তু এই বিশ্বাস যে মানুষের জন্মগত ও মজ্জাগত, তাই এর কার্যকরতা আমোঘ ও অবশ্যম্ভাবী।
ইসলাম এই বিশ্বাস ও ভাবনা-চিন্তা দিয়েই মানুষের মনকে লালন করে। বানিয়ে তোলে অকৃত্রিম বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসী মনের তাকীদে মানুষের গোটা কর্মজীবন যখন গড়ে উঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করতে হয় যে, এই মন কখনই বিদ্রোহী হবে না, আইন লংঘনে উদ্যত হবে না।
ঠিক এই কারণে ইসলাম সর্বপ্রথম মানুষকে গায়বের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী বানাতে সচেষ্ট হয়। ইসলামের আহ্বান হচ্ছে:
أَنْ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ كُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَ بِالْقَدْرِ خَيْرِهِ وَ شَرِّهِ
তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর নাযিল করা কিতাবসমূহ, তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ, পরকালীন জীবন এবং তকদীরের ভালো-মন্দ আল্লাহ্ থেকে নির্ধারিত হওয়াকে। -বুখারী
অতএব কেবলমাত্র বাহ্যিকভাবেই কুরআন ও সুন্নাহর আইন অনুসৃত ও পালিত হয় না, তার পূর্বে মনের নিভৃত গহনে তার প্রতি জাগে অকৃত্রিম বিশ্বাস ও সুদৃঢ় ঈমান। এই ঈমানই মানবমনকে করে গভীরভাবে প্রশান্ত, আশ্বস্ত ও দৃঢ় নিশ্চিত। সে আইনের অনুসরণ ও পালন করে মনের দৃঢ় প্রত্যয় দিয়ে, অন্তরের সুষমামণ্ডিত ভক্তি শ্রদ্ধা দিয়ে কেননা আল্লাহ্ তো সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। বৈষয়িক জীবনে শাস্তি এড়াতে পারলেও পরকালীন জীবনে তা সম্ভব হবে না বলে এই জীবনেই অপরাধের দণ্ড গ্রহণ করে দোষমুক্ত হওয়াই অধিকতর বাঞ্ছনীয় হয়ে দাঁড়ায় প্রত্যেকটি ঈমানদার ব্যক্তির নিকট।
আল্লাহ্ই মানুষের স্রষ্টা। তাই তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব, মন-মানসিকতার আবর্তন-পরিবর্তন, স্থিতি-অস্থিরতা সব কিছুই প্রত্যক্ষভাবে জানেন। তাঁর এই যথার্থ পরিচিতিই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল্লাহ্র সমস্ত আইন পালন করতে, তাঁর আইন পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের সৌভাগ্যে নিজেকে ভাগ্যবান বানাতে চেষ্টা করে। তাই আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ
هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذَا أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَ إِذَا انْتُمْ أَجنَّةُ فِي بُطُونِ أَمْمَاتِكُمْ فَلَا تُزَكَّوْا انْفُسَكُمْ وَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
আল্লাহ্ যখন তোমাদের উন্মেষ ঘটাচ্ছিলেন মাটির মৌল উপাদান থেকে এবং তোমরা যখন তোমাদের মায়েদের গর্ভে ভ্রূণ আকারে ছিলে, তখনও তিনি তোমাদের জানতেন। অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্র-পরিশুদ্ধ মনে করার অহমিকায় পড়বে না। প্রকৃতপক্ষে কে আল্লাহকে ভয় করার নীতি অবলম্বন করেছে, সে বিষয়ে তিনি সবচাইতে অধিক অবহিত। -সূরা নাজম: ৩২
বস্তুত স্রষ্টা সৃষ্টিকুলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অবহিত হবেন- এটাই তো স্বাভাবিক:
الا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
জেনে রাখ, যিনি স্রষ্টা তিনি জানেন। তিনি তো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানী এবং সর্ববিষয়ে অবহিত। -সূরা মুলক: ১৪
তাঁর নিকট গোপন ও প্রকাশ্য কোনই পার্থক্য নেই। সব সমান-একাকার:
يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوتِ وَ الأَرْضِ وَ يَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَ مَا تُعْلِنُوْنَ ، وَ اللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
আসমানসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই তিনি বুঝেন, তিনি সেসব কিছুই জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর। বস্তুত আল্লাহ্ তো মানুষের গোপন হৃদয়ে নিহিত সব তত্ত্ব ও তথ্যই জানেন খুব ভালোভাবে। -সূরা তাগাবুন: ৪
মানুষের মনস্তত্ত্ব মনের পটে আবর্তিত ভাবধারা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে যা বাস্তবায়িত হয় তা-ও আল্লাহ্ই জ্ঞানের আওতাভুক্ত। কিছুই তার অজানা নেই:
وَ لَقَدْ خَلَقْنَا الإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَ نَحْنُ اقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
সন্দেহ নেই, মানুষকে আমরাই সৃষ্টি করেছি এবং তার মনে যেসব খারাপ চিন্তা-ভাবনা জাগে তা আমরা জানি। আসলে আমরা তার বক্ষশিরা অপেক্ষাও অতি নিকটে। -সূরা কাফ: ১৬
বান্দার যাবতীয় কার্য-ছোট বা বড়-সংরক্ষিত, রেকর্ডকৃত, লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। কোন কিছুই হারিয়ে যায় না, মুছে যায় না।
وَ كُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ وَ كُلُّ صَغِيرٍ وَ كَبِيرٍ مُّسْتَطْرُ
তারা যা কিছুই করেছে কিতাবে সংরক্ষিত, ছোট বড় সবই লিপিবদ্ধ। -সূরা কামার: ৫২-৫৩
প্রকৃত ঈমানদার লোকদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা আল্লাহ্র নিকট আনত, চির অবনত। না-দেখেই তারা ভয় করে সেই মহান আল্লাহকে:
مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَ جَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيبٍ
যে ভয় করেছে আল্লাহকে এবং অবনত একনিষ্ঠ মন নিয়ে হাজির হয়েছে ..... -সূরা কাফ: ৩৩
এসব কারণে ইসলামী শরীয়তের আইন বিধানে প্রত্যেকটি কাজের বৈষয়িক প্রতিফলের সাথে পরকালীন প্রতিফলকেও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যেন কেউ যদি ইহকালীন শাস্তি থেকে কোনভাবে এড়িয়েও যায়, তবু পরকালীন শাস্তি এড়ানো কারোর পক্ষেই এবং কোনক্রমেই সম্ভব হবে না।
হত্যা, আল্লাহ্ ওর মূলের সহিত শত্রুতা বা যুদ্ধ, শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, চুরি, ডাকাতি, সুদ খাওয়া, সুদী কারবার করা, ইসলামী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া-প্রভৃতি প্রত্যেকটি অপরাধের বৈষয়িক শান্তির সাথে সাথে পরকালীন শাস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রমাণ বলিষ্ঠভাবে।.
হত্যা কাণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে:
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُه جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَ لَعَنَهُ وَاعَدْ لَهِ عَذَابًا عَظِيمًا
যে লোক কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে সংকল্প করে হত্যা করবে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, তথায় সে চিরদিনই থাকবে। আল্লাহ্র ক্রোধ তার উপর পড়বে, আল্লাহ্ তায় উপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং তার জন্য খুব বড় আযাব নির্দিষ্ট ও প্রস্তুত করে রেখেছেন। -সূরা নিসা: ৯৩
আল্লাহ্-রাসূলের সহিত শত্রুতা, যুদ্ধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ পর্যায়ে বলা হয়েছে:
إِنَّمَا جَزَا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَ لَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلِّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ، ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ . إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ : فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
যেসব লোক আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের সহিত শত্রুতা ও যুদ্ধ করে এবং দেশের মধ্যে ফাসাদ ও বিপর্যয়-অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হবে, অথবা গুলিবিদ্ধ করা হবে, কিংবা তাদের হাত ও পা বিপরীত দিক দিয়ে কেটে ফেলা হবে। অথবা সে দেশ থেকে তাদের নির্বাসিত করা হবে। এটা হচ্ছে তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনে শাস্তির লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে আরও বড় আযাব। -সূরা মায়িদা: ৩৩-৩৪
'তবে যারা ধরা পড়ার পূর্বেই তওবা করবে, তাদের কথা স্বতন্ত্র। জেনে রাখ, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই খুব বেশি ক্ষমাশীল এবং অতিশয় দয়াবান।'
চুরির শাস্তি পর্যায়ে বলা হয়েছে:
وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَ لَا مِّنَ اللَّهِ ، وَ اللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ فَمَنْ تَابَ مِنْ بَعْدِ ظُلْمِهِ وَ أَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوْبُ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
চোর-স্ত্রী বা পুরুষ-যে-ই হোক, উভয়ের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি এবং আল্লাহ্র নিকট থেকে শিক্ষামূলক দণ্ড। আল্লাহ্ সর্বজয়ী শক্তির অধিকারী, সুবিজ্ঞানী। অতঃপর যে লোক যুলুম করার পর তওবা করবে এবং নিজের সংশোধন করে নেবে, তার প্রতি আল্লাহ্র দয়ার দৃষ্টি পুনরায় পড়বে। আল্লাহ্ তো খুব বেশি ক্ষমাশীল, এবং অতীব দয়াবান। -সূরা মায়িদা: ৩৮-৩৯
সুদ খাওয়া ও সুদী কারবার সম্পর্কে বলার পর ইরশাদ হয়েছে:
فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّهِ فَانْتَهَى فَلَه مَا سَلَفَ وَ أَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَ مَنْ عَادَ فَأُولئِكَ اصْحَابُ النَّارِهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
যে লোকের নিকট তার রব-এর পক্ষ থেকে উপদেশ আমল এবং অতঃপর যে বিরত হলো, তার জন্য পূর্বে সে যা করেছে তা বৈধ হবে, তবে এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর নিকট সোপর্দ থাকবে। আর যে লোক তা পুনরায় শুরু করবে, তারা জাহান্নামী এবং চিরদিন তথায় থাকবে। -সূরা বাকারা: ২৭৫
ইসলামী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধ পর্যায়ে বলা হয়েছে:
وَ مَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَه إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالَ أَوْ مُتَحَيّزًا إلى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَ مَاؤُهُ جَهَنَّمُ وَ بِئْسَ الْمَصِيرُ
যুদ্ধের ময়দান থেকে যুদ্ধের কৌশল বা স্বতন্ত্র কোন বাহিনীর সহিত মিলিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনভাবে যে পশ্চাদপসরণ করবে, সে আল্লাহ্র গজবে পরিবেষ্টিত হবে। তার স্থান হবে জাহান্নাম এবং তা খুবই খারাপ পরিণতি। -সূরা আনফালঃ ১৬
মানবীয় কর্মপদ্ধতিসমূহ আইনরূপে বিধিবদ্ধ হওয়ার পরও অপরাধ প্রবন মন এমন সব কলা-কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়ে থাকে, যদ্বারা আইনের শৃঙ্খল অতি সহজেই চূর্ণ করা সম্ভব হয়, আইনকে ফাঁকি দিয়ে অথবা আইনের আশ্রয় নিয়েই আইনকে অতি সহজেই লংঘন করা যায় এবং এভাবেই আইনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ার সর্বত্র। তাছাড়া রাতের অন্ধকারে অপরাধ আপনিই গোপন থেকে যায়। আইনের প্রহরীদের অসতর্কতায় অথবা তাদের নীরব সমর্থনে অপরাধের কালো হাত যত্রতত্র সঞ্চালিত হয়। যে গোপন পিপীলিকাকে দমন বা নিষ্পিষ্ট করার কোন সাধ্যই আইনের নেই। তা'ছাড়া আইন নিজেই কোন কাজ করে না, করার সাধ্য নেই। মানুষই আইনকে কার্যকর করে। কিন্তু সেই মানুষ-আইন কার্যকরকরণের দায়িত্বে নিযুক্ত মানুষই যদি আইন লংঘন করে বা লংঘিত হতে দেয়, তা'হলে বেচারা আইনের ধুলায় গড়াগড়ি করা কান্নাকাটি করা ছাড়া তো কোনই উপায় থাকে না।
এরূপ অবস্থায় ইসলাম ঈমানদার ব্যক্তির মন-মানসিকতাকেই এক তীক্ষ্ণ শাণিত তরবারিরূপে গড়ে তুলতে চায়, যা অন্যায়-পাপ-দৃষ্কৃতি অরাজকতার জীবানুকে তার পক্ষ বিস্তারের পূর্বেই হত্যা করবে। আর মু'মিনের মনের আধিপত্য অন্য সকল প্রকারের আধিপত্যের তুলনায় যে অনেক বেশি শক্তিশালী, তা বলে বোঝাবার প্রয়োজন করে না। রাসূলে করীম (সা) এই দিকে ইঙ্গিত করেই পাপের সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ
وَ الإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَ كَرِهْتَ أَنْ يُطْلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
যে কাজ তোমার মনে কুণ্ঠা জাগায় এবং লোকেরা জানুক তুমি তা পছন্দ কর না, তা-ই হচ্ছে পাপ কাজ। -বুখারী, মুসলিম
ঈমানদার ব্যক্তিরএই জীবন্ত অন্তরই হয় ইসলামী আইন প্রণয়নের আসল দিগদর্শন। যে অন্তরকে সকল প্রকার পাপ-পংকিলতা-মলিনতা থেকে পবিত্র রাখাই সে আইনের প্রথম লক্ষ্য। ফলে ধরা পড়লেও কোন শান্তি হবে না, অথবা অপরাধ করলে কেউ-ই দেখতে পাবে না-যে পরিস্থিতিতে মানুষ এই ধরনের চিন্তা করার সুযোগ পায় সেই পরিস্থিতিতেও, সে ঈমানদার ব্যক্তি কোন পাপ করতে উদ্যত হয় না। এতদসত্ত্বেও কোন অসতর্ক মুহুর্তে শয়তানী প্ররোচনায় পড়ে সে যদি পাপ করেও বসে, কেউ তা দেখতে না পেলেও সে নিজেই নিজের ঈমানের প্রহরী হয়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে স্বীয় অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করে নিতে ও সেজন্য নির্দিষ্ট শাস্তি-তা যত কঠিন ও নির্মমই হোক-গ্রহণ করতে দ্বিধা করবে না। ইসলামের প্রশাসনিক ইতিহাসে দুইটি ঘটনা চির অম্লান হয়ে থাকবে। একটি গামেদীয়ার, আর দ্বিতীয়টি মায়েঞ্জ-এর। উভয়ই নিজ নিজ ঈমানের তাকীদে রাসূলে করীমের সমীপে উপস্থিত হয়ে কঠোরতম শাস্তি গ্রহণের প্রস্তাব করেছিল। কোন ব্যক্তি বা পুলিশের কোন লোক তাদের ধরে আনেনি। রাসূলে করীম (সা) গামেদীয়াকে সন্তান প্রসব ও সন্তান বড় হওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন তাও কোন পুলিশের প্রহরায় নয়।
অনুরূপভাবে যেখানেই মানবীয় অধিকার লংঘিত হয়েছে, সেখানেই অধিকার লংঘনকারী ব্যক্তি নিজে অগ্রসর হয়ে সে অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দিতে অকপটে প্রস্তুত হয়েছে, এরূপ ইতিহাস কেবলমাত্র ইসলামেরই অবদান। আর এরূপ না হলে মানুষের অধিকার কিছুতেই সংরক্ষিত হতে পারে না। কেননা অপরাধ প্রতিরোধ বা দমনের জন্য শুধু আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের উপর নির্ভর করা হলে এই কয়টির ব্যর্থতা তো সকলেরই সম্মুখে প্রকট। বিচারক অদৃশ্যকে জানে না। বাহ্যিক ও উপস্থাপিত দলীল-প্রমাণই বিচারের একমাত্র ভিত্তি-অবশ্য তা যদি উপস্থিত করা হয়, তবে। আর বিচার কখনোই হালালকে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করতে পারে না। এই সুযোগে যেসব লোক মিষ্ট ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলতে পারদর্শী তারা তার মাধ্যমে আইনকে ফাঁকি দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করতে চাইলে তাকে ঠেকাতে পারে। এরূপ অবস্থায় ইসলাম মুখের মিষ্টতা ও আইনের মারপ্যাচের সাহায্যে লব্ধ স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধাতে জ্বলন্ত অঙ্গার ও জাহান্নামের টুকরা নামে অভিহিত করে তা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। রাসূলে করীম (সা) বাস্তব অবস্থার ব্যাখ্যাস্বরূপ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَ إِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصَمُ فَلَعَلَّ بَعْضُكُمْ أَنْ يَكُونَ الْحَنَ بِحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ فَأَحْسِبُ أَنَّهُ صَدَقَ فَاقْضِي لَهُ بِذلِكَ فَمَنْ فَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَأَنَّمَا هِيَ قَطِعَتْ مِنْ النَّارِ فَلْيَأْخُذُ هَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا
আমি একজন মানুষ। আমার নিকট বিবদমান পক্ষগুলি আসে বিচার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। অবস্থা এই হয় যে, তোমাদের কেউ হয়ত অন্য লোকের তুলনায় অধিক বাকপটু, তখন আমি মনে করি, সে সত্য কথাই বলেছে। তখন সেই প্রেক্ষিতে তার পক্ষে রায় দিয়ে দিই। এক্ষণে আমি যদি অন্য কোন মুসলমানের হক কাউকে দেওয়ার রায় দিই, তা'হলে মনে রাখতে হবে, তা আগুনেরই একটি টুকরা, ইচ্ছা হয় গ্রহণ কর, অন্যথায় পরিহার কর।
অপরাধ দমনে বা অপরাধ প্রতিরোধে ইসলামের অনুসৃত পন্থার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হ'ল। এই আলোচনায় তা সকলের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলেই মনে করি। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পর্যায়ে কোন মানবীয় চেষ্টা প্রচেষ্টা কি ততটা উচ্চতর মান পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে?
সত্যি কথা হচ্ছে, কোন সমাজ-সমষ্টিই কল্যাণময় হতে পারে না ঈমান ছাড়া। আর ঈমান তো স্থান লাভ করে-দানা বেঁধে উঠে মানুষের মনে, অন্তরে, হৃদয়ে, চেতনায় এবং এই মন ও চেতনা ইসলামকে বাদ দিয়ে কখনই জীবন্ত হতে পারে না। এই ঈমান ও ইসলামকে হারিয়েই আধুনিক সমাজ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, বিশ্বমানবতার জীবনে চরম দুর্ভাগ্য নিয়ে এসেছে। তাদের মন-অন্তর-চেতনা মরে গেছে। অতএব এখনও কি আল্লাহ্ দিকে ফিরে আসার, কুরআন ও সুন্নাহকে জীবনাদর্শের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করার এবং ইসলামী শরীয়তকে বাস্তবায়িত করার সময় উপস্থিত হয়নি? আল্লাহ্র নির্দেশ তো এইঃ
وَ أَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللهُ وَ لَا تَتَّبِعْ أَهْوَاهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَّفْتِنُوْكَ عَنْ بَعْضِ مَا اَنْزَلَ اللهُ اِلَيْكَ ، فَاِنْ تَوَلَّوْ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيْدُ اللهُ اَنْ يُصِيْبَهُمْ بِبَعْضٍ ذُنُوْبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيْرًا مِّنَ النَّاسِ لَفَاسِقُوْنَ . أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ وَ مَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُوْنَ
তুমি লোকদের মাঝে প্রশাসন কায়েম কর আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানের ভিত্তিতে এবং ওদের কামনা-বাসনা-ইচ্ছার অনুসরণ করো না। তুমি ওদের ভয় কর এজন্য যে, ওরা আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানের কিছু অংশে তোমাকে বিপদে ফেলতে পারে। ওরা পিঠ ফিরিয়ে গেলে কোন ভয় নেই, জেনে রাখ, আল্লাহ্ ওদের কোন কোন গুনাহের দরুন ওদের বিপদে ফেলতে পারেন। আর অনেক লোকই তো সীমালংঘনকারী। ওরা কি এখনও জাহিলিয়াতের বিধান কার্যকর দেখতে চায়? অথচ আল্লাহ্র চাইতে উত্তম বিধানদাতা দৃঢ় প্রত্যয়শীল লোকদের জন্য আর কেউ হতে পারে না। -সূরা মায়িদা: ৪৯-৫০