📄 ইবাদাত-এর অর্থ
আরবী অভিধান অনুযায়ী 'ইবাদাত' অর্থ الخضوع Submission বশ্যতা, আনুগত্য, বিনয় ও বাধ্যতা, وَالتَّدْلُّل -অবনত, আত্মসমর্পণ। আরবী ব্যবহার طریق معبد লাঞ্ছিত পদদলিত পথ'। المخصص গ্রন্থে বলা হয়েছে العبادة الخضوع والتذلل الاستكانة -এই শব্দগুলির অর্থ অভিন্ন। যে বিনয় ও আত্মসমর্পণ-আনুগত্যের ঊর্ধ্বে কিছু নেই, তাই ইবাদাত। আনুগত্য-তা মা'বুদের জন্য হোক, কি অন্য কারুর জন্য। বিনয়-অধীনতা-আনুগত্যের ভিত্তিতে আল্লাহ্ যে আইন পালন, তা-ই ইবাদাত।
ইবাদাত এমন এক ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আনুগত্য, যা জীবন, বুঝ-সমঝ, শ্রবণ-দৃষ্টি ইত্যাদির দাতা ছাড়া আর কেউ পাওয়ার অধিকারী নয়-হতে পারেনা। ইমাম রাগিব তার 'লুগাত' গ্রন্থে লিখেছেনঃ العبودية اظهار التذلل و العبادة و ابلغ منها لا نها غاية التذيل ولا يستحقما الا من له غاية الافضال وهو الله تعالى
'উবুদিয়াত' অর্থ বিনয়-নম্রতা-অধীনতা প্রকাশ করা। আর ইবাদাত হচ্ছে তারই সর্বোচ্চ ও চূড়ান্তমাত্রা; কেননা ইবাদাত অর্থ সর্বশেষ মাত্রার আনুগত্য-অধীনতা-আত্মসমর্পণ। তা কেবল সেই মহান সত্তা-ই পাওয়ার অধিকারী যিনি চূড়ান্ত মান ও পরিমাণের দাতা। আর তিনিই আল্লাহ্।
অভিধানে শব্দটির ব্যবহারে উবুদিয়াত ও ইবাদাতের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। কেননা ইবাদাত শুধুমাত্র বিনয় বোঝায় না-'উবুদিয়াত' তাই বোঝায়। ইবাদাত বলতে এক বিশেষ ধরন ও মানের বিনয়-অধীনতা বোঝায়, যা মা'বুদকে বড় মহানকরণে আনুগত্য ও বিনয়ের দিক দিয়ে চরম মাত্রাকে আয়ত্ত করে। 'লিসানুল আরব' অভিধান গ্রন্থে বলা হয়েছে: উবুদিয়াত-এর মূল অর্থ হচ্ছে বিনয়, আনুগত্য ও অধীনতা। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে-
لَا يَقُلْ أَحَدُكُمْ لِمَمْلُوكِهِ عَبْدِي وَ امَتِي وَ لِيَقُلْ فَتَاى فَتَاتِي
তোমাদের কেউ যেন তার ক্রীতদাস-দাসীকে আমার দাস আমার দাসী না বলে, বরং যেন বলে; আমার ছেলে, আমার মেয়ে। তাদের উপর স্বীয় বড়ত্ব জাহির করার জন্যই ঐরূপ বলা হয়। তাদের উচিত দাস-দাসীকে নিজের বংশোদ্ভূত প্রকাশ করা। কেননা এই শব্দদ্বয় যে ভাবধারা ও তাৎপর্য প্রকাশ করে তা কেবলমাত্র আল্লাহ্ রব্বুল ইবাদতই পাওয়ার অধিকারী। ইমাম ইবনে তায়মিয়া তার 'রিসালাতুল উবুদীয়া' গ্রন্থে উক্ত আভিধানিক অর্থের বাড়তি তাৎপর্য উপস্থাপিত করেছেন। তা আল্লাহ্ ইবাদাতে এক অনুভূতিক ও সংবেদনশীল চেতনার সংমিশ্রণ করে। ফলে ইবাদাতের প্রচলিত অর্থের সাথে অধিকতর তাৎপর্য সংযোজিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: ইবাদাতের আসল অর্থ বিনয় আনুগত্য। যে পথ সর্বসাধারণের চলাচলের দরুন পথিকদের পায়ের তলে দলিত মথিত হয়, তাকেই বলা হয় معيد الطريق কিন্তু যে ইবাদাত করার আদেশ করা হয়েছে, তাতে বিনয়-অধীনতার সাথে ভালবাসাও শামিল। তাতে আল্লাহর জন্য যেমন চরম মাত্রার বিনয়-অধীনতা স্বীকার্য তেমনি চরম মাত্রার প্রেম-ভালবাসাও আল্লাহ্রই জন্য উৎসর্গীত। ভালোবাসার সর্বশেষ পর্যায় হৃদয়ের চূড়ান্ত সমর্পণ প্রিয়তমের সাথে। পরে তাতে অন্তরকে উজাড় করে ঢেলে দেওয়া ভাবধারা থাকে। সে হচ্ছে সর্বক্ষণ লেগে থাকা অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। ইমাম ইবনে তায়মিয়া আরও বলেছেন: ইবাদাত শব্দের তাৎপর্য দু'টি দিক দিয়ে প্রতিভাত হয়। একটি সংবেদনশীল বিনয় ও ভালবাসা-যা আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউই পেতে পারে না। কোন লোক যদি কারোর কাছে বিনীত-অনুগত হয়, কিন্তু অন্তরে তার প্রতি থাকে ঘৃণা ও ক্রোধ, তাহলে সে নিশ্চয়ই তার ইবাদাতকারী নয়। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন জিনিসকে ভালোবাসে কিন্তু তার বিনীত-অনুগত না হয়, তাহলেও সে তার ইবাদাতকারী নয়। কাজেই দু'টির কোন একটি মাত্র গুণ আল্লাহ্ ইবাদাতের জন্য কিছুমাত্র যথেষ্ট নয়। সে জন্য প্রয়োজন, আল্লাহই হবেন ব্যক্তির কাছে সর্বাধিক- সবকিছুর তুলনায় অনেক বেশি প্রিয়; সবকিছুর তুলনায় অনেক বেশি বড়, সম্মানার্হ। বস্তুত ভালবাসা ও পূর্ণাঙ্গ বিনয় আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউই বান্দাহ্র কাছে পেতে পারে না। আল্লাহ্ ছাড়া আর যাকেই অধিক ভালোবাসুক, তার এই ভালোবাসা তার জন্য বিপর্যয়কারী হবে। আল্লাহর নির্দেশ ভিন্ন কোন কিছুকে বড় মনে করা, অধিক সম্মান প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ বাতিল নীতি, তার অধিকার নেই কারোর। আল্লাহ্ তা'আলা নিজেই ঘোষণা করেছেন:
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَ ابْنَاؤُكُمْ وَ إِخْوَانُكُمْ وَازْوَاجُكُمْ وَ عَشِيْرَتُكُمْ وَ امْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَ تِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبُّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَ رَسُولِهِ وَ جَهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبِّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ -
হে নবী! বলে দিন, তোমাদের পিতা ও সন্তান, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, বংশ-পরিবার-গোত্র, 'অর্জিত ধন-সম্পদ ও ব্যবসায়-যার মন্দাভাবকে তোমরা খুবই ভয় পাও-এবং পছন্দনীয় ঘর-বাড়ি তোমাদের কাছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের এবং তাঁর পথে জিহাদ করার তুলনায় যদি অধিক প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র হয়, তাহলে তোমরা অপেক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ্র চূড়ান্ত ফয়সালা আসছে। .... -সূরা তাওবা: ২৪
রাসূলে করীম (সা)-এর হাদীসে উবুদিয়াতের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং তার অনিবার্য দাবিস্বরূপ আল্লাহ্ শরীয়াত পালন এবং ভালোবাসা ও সন্তুষ্ট সহকারে আল্লাহ্র অধীন-অনুগত হওয়ার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কয়েকটি হাদীস:
مَنْ أَحَبَّ اللَّهِ وَ ابْغَضَ اللَّهِ وَ اعْطى اللهِ مَنَعَ اللَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيْمَانَ
যে লোক আল্লাহ্ জন্য ভালোবাসলো, আল্লাহ্ জন্যই অপছন্দ করলো, দিল আল্লাহ্ জন্য, দেয়া বন্ধ করল আল্লাহ্র জন্য, তার ঈমান পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। -আবূ দাউদ
أوْثَقَ عُرَ الإِيْمَانِ الْحَبُّ فِي اللَّهِ وَ الْبَغْضُ فِي اللَّه
আল্লাহতেই ভালোবাসা ও আল্লাহর কারণেই অ-ভালোবাসা-অপছন্দ হওয়ায় ঈমানের দৃঢ়তর রজ্জু। -আহমদ, তিবরানী
ثَلاثَ مَنْ كُنْ فِيهِ وَجَدَ حَلاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَ أَنْ يُحِبُّ الْمَرْءُ لَا يَحِبُّهُ إِلَّا اللهُ وَ أَنْ يُكْرَهُ أَنْ يُرْجِعَ إِلَى الْكُفْرَ بَعْدَ أَنْ انْقَدْهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقِيَ فِي النَّارِ
তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের মিষ্টতা ও স্বাদ লাভ করেছে বলে মনে করা যাবে: তারা হচ্ছে-আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই হবেন তার কাছে অন্য সবকিছু অপেক্ষা অধিক প্রিয়। -তিবরানী
ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসবে তো কেবলমাত্র আল্লাহ্রই জন্য, এবং আল্লাহই তাকে কুফর থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন, অতঃপর সে তাতে ফিরে যাওয়াকে তেমনই অপছন্দ করবে যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।
📄 ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্য
ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্যে সম্পূর্ণ ‘দীন’ই অন্তর্ভুক্ত। কেননা তার শরীয়াত সম্মত নিগূঢ় তত্ত্ব-ঈমান ইবনে তায়মিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী-পরিপূর্ণ বিনয়-আনুগত্য এবং বাহ্যিক ও আন্তরিক ভালোবাসা মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট ও উৎসর্গীত করা। আর তা সমগ্র জীবন পরিব্যাপ্ত গোটা জীবন-জীবনের সকল কাজেই আল্লাহর শরীয়ত পালন-অনুসরণ, কেবলমাত্র তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ এবং শুধু তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা ইসলামী ইবাদাতের মর্মবাণী।
ইমাম ইবনে তায়মিয়া লিখেছেন : ‘ইবাদাত’ একটা ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ পারিভাষিক শব্দ। যে কথা, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যে কাজই তিনি পছন্দ করেন, যা'তে তিনি খুশি ও সন্তুষ্ট হন, যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, সত্য কথা বলা, আমানতের সংরক্ষণ ও ফেরত দান, পিতা-মাতার কল্যাণ সাধন, সেলায়ে রেহমী রক্ষা, ওয়াদাপূরণ, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ, কাফির-মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার, ইয়াতীম-মিসকীন-নিঃস্ব পথিক-অধীন মানুষ ও পশুদের হক আদায়, দোয়া, যিক্র, কুরআন তিলাওয়াত এইগুলি এবং এই ধরনের আরও বহু কাজই ইবাদাতরূপে গণ্য। আল্লাহ্ও রাসূলের ভালোবাসা, আল্লাহকে ভয় করা, তাঁরই কাছে আত্মসমর্পিত হওয়া, তাঁরইজন্য আনুগত্য খালেস করা, ধৈর্য সহকারে তাঁর হুকুম-বিধান পালন, তাঁর নিয়ামতের শোকর, তাঁর ফরসালায় রাযি থাকা, তারই উপর তাওয়াক্কুল, তাঁর রহমত পাওয়ার আশা-বাসনা পোষণ এবং তাঁর আযাবকে ভয় করা প্রভৃতি ইবাদাতের অপরিহার্য গুণাবলী। এতে করে দেখা যাচ্ছে যে ইবাদাতের তাৎপর্যে আল্লাহর আনুগত্য এবং সমস্ত দীনী ব্যাপারে তাঁর প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় অনিবার্য।
তাতে ফরয, নফল এবং দিলের কাজ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ ও সাধারণ আচার-আচরণ-যাকে নৈতিক চরিত্র, মর্যাদাপূর্ণ কাজ, নফল এবং দীনের যাবতীয় আদেশ-নিষেধ; রাষ্ট্র ও প্রশাসন ব্যবস্থা, মুসলমানদের পারস্পরিক অমুসলমানদের সাথে সম্পর্ক-শান্তি ও যুদ্ধ-এই সবকিছু সমান গুরুত্ব সহকারে ইবাদাতের মধ্যে শামিল রয়েছে। এই সম্যক অর্থেই ইবাদাত আল্লাহ্র পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও দাসত্ব-অধীনতা। আদেশ পালন, নিষেধ অনুসরণ-বিশ্বাস, কথা ও কাজ-সর্বক্ষেত্রে কার্যকর। ফলে মানুষ আল্লাহ্ আবেদ হতে পারে কেবল তখনই যখন তার গোটা জীবন শরীয়াতের অনুসারী ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ্ যা হালাল করেছেন তা-ই তার কাছে হালাল, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তাই হবে তাঁর কাছে হারাম। নিজের ইচ্ছা-প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা-লালসার অনুসরণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে কেবল মাত্র আল্লাহ্র হিদায়েত অনুযায়ী জীবনের আচরণ গ্রহণ।
বস্তুত কতিপয় সুনির্দিষ্ট ইবাদাতের কাজ আঞ্জাম দেয়ার মধ্যেই ইবাদাতের তাৎপর্য নিহিত নয় এবং ইবাদাতের কতিপয় পরিচিত-প্রচলিত অনুষ্ঠান পালনের মধ্যেও তা সীমাবদ্ধ নয়। লোকদের ধারণা, নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত, কুরআন তিলাওয়াত, যিক্র-দোয়া-ইস্তিগফার-এই কয়েকটি অনুষ্ঠান পালন করলেই বুঝি ইবাদাত পালিত হলো এবং আল্লাহ্র মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল ও সার্থক হলো। কিন্তু তা ঠিক নয়। কেননা ইবাদাতের পরিধি অনেক অনেক বিস্তীর্ণ ও বিশাল, ব্যাপক। তাই যে লোক দুনিয়ার বিপুল কর্মকান্ডের মধ্যে মুবাহ্ কাজগুলি নিরন্তর করতে থাকে, সে-ও আল্লাহ্র আবেদ গণ্য হতে পারে, যদি তার নিয়ত সঠিক ও শুভ হয়, তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয় শরীয়াতসম্মত। যে মুসলিম জমি চাষাবাদ করে আল্লাহ্র রিস্ক পাওয়ার আশায়, শরীয়াতসম্মত পন্থায় রোজগার পাওয়ার চেষ্টাস্বরূপ, যার দ্বারা সে নিজের রুজি ও পরিবার-পরিজনের জন্যও রুজির ব্যবস্থা করতে পারবে, সেও আল্লাহ্র আবেদ গণ্য হতে পারবে। এই তত্ত্ব বহু সংখ্যক হাদীস থেকেও প্রতিভাত। তন্মধ্যে কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে-
এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (সা)-এর কাছে উপস্থিত হলো। রাসূলের সাহাবীগণ লোকটির অবয়ব ও তৎপরতা লক্ষ্য করলেন। তাঁরা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এই লোকটি যদি আল্লাহর পথেযুদ্ধে চলে আসত।' তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ 'লোকটি যদি তার ছোট ছোট সন্তানের জন্য শ্রম করে উপার্জনের লক্ষ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে থাকে, তাহলে তো সে আল্লাহর পথে লেগেই আছে। আর যদি তার দুই বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য উপার্জনে শ্রম করার জন্য এসে থাকে, তা হলেও সে নিঃসন্দেহে আল্লাহর পথেই নিয়োজিত। সে যদি কেবল নিজের প্রয়োজন পূরণে শ্রম করার জন্য বের হয়ে এসে থাকে, তা' হলেও সে আল্লাহ্র পথে চলমান। কিন্তু যদি লোক দেখানো ও গৌরব কিংবা অহংকার প্রকাশার্থে বেরিয়ে থাকে, তা'হলে সে শয়তানের পথের পথিক।'
কৃষিকাজ ও বৃক্ষ রোপণের মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
ما من مسلم يغرس غرسا او يزرع زرعا فيأكل منه طير او انسان او بهيمة الا كان له به هدقة
যে মুসলমানই গাছ রোপণ করবে বা কৃষির ফসল বুনবে, ফলে তাতে ফল বা ফসল ফলবে, তা' থেকে পাখি, মানুষ বা জন্তু-জানোয়ার ভক্ষণ করবে, তা'হলে তাতে তার সদকার সওয়াব হবে। -বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ
আল্লাহ্ তা'আলাই রিস্ক সন্ধানকারীদের আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সমপর্যায়ের লোক বলে ঘোষণা করেছেন। বলেছেন:
وَ اخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللهِ وَ اخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ .
অন্য লোকেরা পৃথিবীতে চলাফিরা করে আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান করে বেড়ায় এবং আরও অন্যরা আল্লাহ্র পথে যুদ্ধকার্যে লিপ্ত। -সূরা মুয্যাম্মিল: ২০
মানুষ স্বীয় যৌন প্রবৃত্তি ও লালসা কামনার চরিতার্থতার জন্য, স্ত্রীর অধিকার আদায়, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষা ও মানব বংশের স্থিতি রক্ষার লক্ষ্যে স্ত্রী সঙ্গম করেও আল্লাহ্ কাছ থেকে বিপুল সওয়াবের অধিকারী হতে পারে। রাসূলে করীম (সা) সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তোমাদের যে কারুর যৌনাঙ্গেও সদ্স্কার সওয়াব রয়েছে।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে রাসূল, একজন লোক তার যৌন কামনা চরিতার্থ করলেও কি তার জন্য সওয়াব হবে? তিনি বললেন: 'ভেবে দেখ, সে যদি হারামভাবে যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতো তা'হলে তাতে কি তার গুনাহ হতো? বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। ঠিক সেইভাবেই কেউ যদি হালাল পথে তা চরিতার্থ করে তা'হলে তাতে সে অবশ্যই সওয়াব পাবে।' -মুসলিম, তিরমিযী
অকাট্যভাবে প্রতিভাত হলো, ইসলামে 'ইবাদাত' মানব জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের রকমারি কর্মতৎপরতা পরিব্যাপ্ত। মুসলিম ব্যক্তি যেখানেই আল্লাহর আনুগত্যকে জীবনের লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করবে, সে জন্যই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে, সেই লক্ষ্যকেই সে জীবনের চরমতম ও সর্বোচ্চ লক্ষ্যরূপে নির্দিষ্ট করে নিবে, তার সমস্ত কাজ ও তৎপরতাই 'ইবাদাত' গণ্য হবে। এ-ই হচ্ছে আল্লাহর এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণার ব্যাখ্যাঃ
وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون -
আমি মানুষ ও জ্বিনকে কেবল আমারই দাসত্ব করার লক্ষ্যে সৃষ্টি করেছি। -সূরা যারিয়াত: ৫৬
যারা মানব মন ও বিবেককে তার উপর প্রভাব ও কর্তৃত্বশালী যে কোন আধিপত্যবাদীর প্রভাব ও কর্তৃত্ব থেকে মুক্তিলাভের আহ্বান জানায়-যেন শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত 'উবুদিয়াত' এক ও একক মহান আল্লাহ্ জন্যই একান্ত হয়ে যাবে, আল্লাহ্ প্রেরিত সব নবী-রাসূলেরই ছিল এই দাওয়াত ও আহ্বান। কুরআনের আয়াতের ভাষায়:
يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلهِ غَيْرُه -
হে জনগণ, তোমরা এক আল্লাহ্র দাস হয়ে জীবন যাপন কর, তিনি ছাড়া তোমাদের মা'বুদ আর কেউই নেই। -সূরা আরাফ: ৫৯
এভাবে প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ্র একত্ব এবং কেবলমাত্র আল্লাহ্র দাসত্ব কবুল করার দাওয়াত প্রচার করেছেন।
وَ لَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَ اجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
প্রতিটি জনগোষ্ঠীতেই আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই দাওয়াত লয়ে যে, তোমরা বন্দেগী কবুল কর এক আল্লাহ্ এবং তাগূতসমূহকে (আল্লাহদ্রোহী শক্তিসমূহ- যারা নিজেরা আল্লাহ্র দাসত্ব করে না, মানুষকে নিজেদের দাস বানায়) অস্বীকার কর, এড়িয়ে চল। -সূরা নাহল: ৩৬
وَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ إِنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ .
হে নবী! তোমার পূর্বে যে রাসূলই আমি পাঠিয়েছি, তারই প্রতি ওহী পাঠিয়েছি এই কথার যে, আমি ব্যতিরেকে ইলাহ কেউই নেই। অতএব তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর। -সূরা আম্বিয়া: ২৫
ফিকাহবিদগণ শরীয়তের বিধানাবলীকে দু'ভাবে বিভক্ত করেছেন। একভাগ ইবাদাত এবং দ্বিতীয় ভাগ মুয়ামালাত। এ বিভক্তিটি জ্ঞানচর্চা অধ্যয়ন ও গ্রন্থ প্রণয়নকালীন সুবিধার লক্ষ্যে। আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধসমূহকে দু'টি ভাগে বিভক্ত করে দেখা গেছে- এক পর্যায়ের আহ্কাম, ইবাদাতমূলক ( تغیدی ) শরীয়তের বিধানদাতা নিজে তার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তার সীমাসমূহও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ফলে সে পর্যায়ে কারুরই নতুন কিছু ব্যবস্থার প্রবর্তন বা সংযোজনের একবিন্দু অধিকারই থাকতে পারে না; করা হলে তা হবে বিদ্আত। কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত তার পরিধি বিস্তৃত না হবে, ততক্ষণ ভাবধারা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা যাবে না। এই জিনিসেরই নাম ইবাদাত। অতএব ইবাদাতের মূল কথা হচ্ছে ঝুঁকি, পণ, কৃত সংকল্প এবং ঐকান্তিকতা। আর একটি ধারা রয়েছে যা মানুষের জীবনে পারস্পরিক সম্পর্ককে সুষ্ঠু করে গড়ে তোলে শরীয়তের মৌলনীতি সমূহের ভিত্তিতে। তার রূপ কাল-বিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হয়। এই অংশেরই নাম মুয়ামালাত। এই পর্যায়ের মূল কথা হচ্ছে 'আল-ইবাহাত'-সবই মুবাহ, কোন জিনিস বা কাজই মূলত হারাম বা নিষিদ্ধ নয়।' এই দু'টি ধারাই ইবাদাতরূপে গণ্য।
কিন্তু এই পারিভাষিক বিভক্তিই বহু মানুষকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করে রেখেছে। তারা মনে করেছে, জীবনের 'মুয়ামালাত' অংশের সবকিছু বাদ দিলে যা থাকে, কেবল তা-ই ইবাদাত, অন্যটা নয়। অথচ এই উভয় ধারার সমষ্টিরই নাম দীন। এই দীন পালনেরই নাম ইবাদাত। শরীয়ত মুতাবিক ইবাদাতসহ 'মুয়ামালাতের' সমস্ত কাজ আঞ্জাম দেয়াই হ'ল প্রকৃত দীন পালন এবং এরই নাম 'ইবাদাত'। আর এইসব ক্ষেত্রেই বান্দাহ যদি নিজেকে একমাত্র আল্লাহ্র অনুগত-বিনীত বান্দাহ্ মনে করে শরীয়তের বিধান পালন করে এবং তা করে কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মুহাব্বত পেতে চায়, তা'হলেই তা ইবাদাত হবে। সে হতে পারবে আল্লাহ্র একনিষ্ঠ বান্দাহ্।
📄 অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক তাৎপর্যসম্পন্ন ইবাদাতের প্রভাব
সাধারণ ও বিস্তৃত তাৎপর্যের দৃষ্টিতে আদেশ-নিষেধ সমন্বিত আল্লাহ্ গোটা দীন পালন করাই ইবাদাত। জীবনের প্রতিক্ষেত্রে আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ যথাযথ পালন করা অপরিহার্য। তা'হলেই উবুদিয়াতের তাৎপর্য আল্লাহ্র জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়ে দাঁড়াবে। যে কাজেই মানুষের নৈতিক বা দৈহিক ক্ষতি বা কষ্টের দিক নিহিত, ইসলাম তা করতে নিষেধ করেছে। তা সগীরা হোক, কি কবীরাহ্। এর ফলে আজ পর্যন্ত যত রকমের ধরনের প্রকারের অপরাধ জানতে পারা গেছে তা সবই শরীয়তের আওতাভুক্ত। কুরআন মজীদে বর্ণনা ভঙ্গীর স্টাইল হিসাবে গৃহীত বিভিন্ন রূপ ও আঙ্গিকে তা মওজুদ রয়েছে। আর সহীহ হাদীসে কখনও তা এজমালীভাবে বলে দেয়া হয়েছে। আবার কখনও বলা হয়েছে সবিস্তারে।
ইসলাম নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, তা প্রকাশ্য হোক, কি গোপনে। ইরশাদ হয়েছে:
وَ لَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
তোমরা নির্লজ্জতা, নগ্নতা, অশ্লীলতার নিকটেও যেও না-তা প্রকাশ্য হোক, কি গোপনীয়। -সূরা আনআম: ১৫১
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ
বল হে নবী! আমার রব হারাম করেছেন সমস্ত নির্লজ্জতা-নগ্নতা-অশ্লীলতা, তা প্রকাশমান হোক কি গোপন। -সূরা আরাফ: ৩৩
যে কাজ বা কথা জঘন্য, কুৎসিত, নির্লজ্জতাময়, কুরআনের ভাষায় তা-ই (এক বচনে) ফাহেশা (আর বহু বচনে) ফাওয়াহিশ।
সমাজকে এই নির্লজ্জতা-অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করারও তাকিদ রয়েছে ইসলামে। সমাজের লোকদের চক্ষু ও কর্ণ যাতে করে নির্লজ্জতার শব্দ ও দৃশ্য থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য বিশেষ সতর্কতাবলম্বন ইসলামেকাম্য। এই কারণে কুরআনে নির্লজ্জতা অশ্লীলতার প্রকাশ ঘটানোকে কঠিন অপরাধের কাজ বলে ঘোষিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ إِنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا و الآخِرَةِ - وَ اللَّهُ يَعْلَمُ وَ انْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
যে সব লোক ঈমানদার লোকদের সমাজে নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচার প্রকাশিত হোক তা পছন্দ করে, ভালবাসে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই পীড়াদায়ক আযাব নির্দিষ্ট রয়েছে। তা আল্লাহই ভালো জানেন, তোমরা জানো না। -সূরা নূর: ১৯
সকল প্রকার পাপ, সীমালংঘন, বিদ্রোহ-স্বেচ্ছাচারিতা ও ঘৃণ্য কাজ নিষেধ করা হয়েছে। যে সব কাজে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হন, তা-ই পাপ, তা-ই গুনাহ্। সত্যের সীমালংঘন করে বাতিলের মধ্যে পড়ে যাওয়াই সীমালংঘন ও বিদ্রোহ। কার্যকলাপে সুবিচার ও ন্যায়পরতার বিপরীত আচরণ গ্রহণই স্বেচ্ছাচারিতা। আর সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি ও শরীয়তের বিধানের পরিপন্থি যা কিছু তা-ই ঘৃণ্য, তা-ই পরিহার্য। ইসলামী সমাজে তা-ই অপরিচিত যেন।
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَ الإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرَ الْحَقِّ
বল, আমার রব যেসব জিনিস হারাম করেছে, তাতো এই নির্লজ্জতার কাজ-প্রকাশ্য বা গোপনীয় এবং গুনাহর কাজ ও সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি ও বিদ্রোহমূলক কাজ। -সূরা আরাফ: ৩৩
এই পর্যায়ে কুরআন মজীদে বেশ কয়েকটি আয়াত সন্নিবেশিত হয়েছে। তন্মধ্যে আরও চারটি আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে।
إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ
যারা পাপের কাজ করে, তাদের প্রতিফল দেয়া হবে তারই যা তারা করেছিল। -সূরা আনআম: ১২০
وَ يَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرِ وَالْبَغْى
আল্লাহ্ নিষেধ করেন সর্বপ্রকারের নির্লজ্জতার কাজ, ঘৃণ্য, অপছন্দনীয় এবং সত্যবিরোধী বাড়াবাড়ি কাজকে। -সূরা নাহল: ৯০
وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
তোমরা সীমালংঘন করো না। কেননা আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। -সূরা বাকারা: ১৯০
وَ لَا تَعَاوَانُوْا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
এবং পাপ ও সীমালংঘনমূলক কাজে পরস্পরের সাহায্য সহযোগিতা করো না। -সূরা মায়িদা: ২
ইসলাম সকল রূপের ও প্রকারের যুলুম হারাম করে দিয়েছে। তার কঠিন ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার কথাও স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে। ইসলামের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এইসব নির্লজ্জতা, নাফরমানী, আল্লাহদ্রোহিতা ও পাপ কাজের ফলে এক একটা জাতি, জনসমষ্টি ধ্বংস হয়ে যায় অনিবার্যভাবে এবং যুলুমকারীদের উপর আল্লাহ্র কঠিন শাস্তি নেমে আসে। যুলুম হচ্ছে: প্রত্যেক জিনিসকে তার নিজস্ব বা উপযুক্ত স্থানের পরিবর্তে অন্যত্র রাখা এবং সীমালংঘন করা। ইমাম রাগিবের বর্ণনানুযায়ী যুলুম তিন প্রকারের:
প্রথম: যুলুম আল্লাহ্ ও মানুষের পারস্পরিক ক্ষেত্রে। এই পর্যায়ের বড় যুলুম হচ্ছে বান্দাহ্ কুফরী করা, আল্লাহ্র সাথে শির্ক করা এবং মুনাফিকী করা।
দ্বিতীয়: মানুষের পারস্পরিক ক্ষেত্রে যুলুম করা।
আর তৃতীয় হচ্ছে, ব্যক্তির নিজের প্রতি নিজের যুলুম। সকল প্রকারের যুলুম-ই এর অন্তর্ভুক্ত।
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُونَ - إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ
যালিম লোকেরা যা কিছু করে, তোমরা মনে করো না আল্লাহ্ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না বা সে বিষয়ে জানেন না। তিনি তো তাদেরকে আযাব দেওয়ার কাজ সেই দিনের জন্য বিলম্বিত করেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ চড়কগাছ হবে। (কিয়ামতের দিন) -সূরা ইব্রাহীমঃ ৪২
وَ لَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا
তোমাদের পূর্বের বহু যুগের মানুষকে তাদের যুলুম করার দরুন ধ্বংস করে দিয়েছে। -সূরা ঘৃনুস: ১৩
وَ لَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ
তোমরা যালিমদের উপর নির্ভরশীল হবে না, তাহলে আগুন তোমাদেরকেও দমন ও ধ্বংস করে দিবে। -সূরা হুদ: ১১৩
وَ تِلْكَ الْقُرَى أَهْلَكْنَاهُمُ لَمَّا ظَلَمُوا وَ جَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِمْ مَّوْعِدًا .
এই জনপদবাসিদের আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদের যুলুমের কারণে এবং তাদের ধ্বংস করার জন্য একটা সময় নির্দিষ্ট ওয়াদাভুক্ত ছিল। -সূরা কাহাফ: ৫৯
গণমানুষের মৌলিক ও সর্বপ্রকারের অধিকারকে ইসলাম পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষিত করেছে। এই অধিকারসমূহের মর্যাদা ও সম্ভ্রম রক্ষার প্রবল তাকিদ জানিয়েছে। এ অধিকার হরণ করার অপরাধের শাস্তিও স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছে এবং নির্ধারণ করেছে। এই অধিকার পর্যায়ে পাঁচটি সমগ্রের উল্লেখ হয়েছে আসমানী দীনের গ্রন্থে। এগুলি সংরক্ষিত হলেই গোটা দীনও সংরক্ষিত হয়। সে পাঁচটি অধিকার হচ্ছে: দীন, মান-সম্মান, জান-প্রাণ, ধন-মাল ও বিবেক-বুদ্ধির সংরক্ষণ। এ কয়টি সংরক্ষণের তাকিদ কুরআন মজীদের আয়াতে স্পষ্ট, অকাট্য ও বলিষ্ঠ ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে। আয়াতসমূহ এখানে উল্লিখিত হচ্ছে:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
তোমরা প্রাণ হত্যা করো না। আল্লাহ্ তাকে সম্মানার্হ করেছেন। তবে বিচারের জন্য তা করা হলে সে কথা স্বতন্ত্র। -সূরা ইসরা: ৩৩
وَمَنْ يَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيْهَا
যে লোক সংকল্প গ্রহণ করে কোন মু'মিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম, তথায় সে চিরদিন থাকবে। -সূরা নিসা: ৯৩
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنٰى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَآءَ سَبِيْلًا
তোমরা যিনার নিকটেও যেও না। তা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও (যৌন তৃপ্তি লাভের জন্য তা) নিতান্তই খারাপ উপায়। -সূরা ইসরা: ৩২
وَ أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا
আল্লাহ্ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। -সূরা বাকারা: ২৭৫
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبٰوا لَا يَقُوْمُونَ إِلَّا كَمَا يَقُوْمُ الَّذِيْ يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطٰنُ مِنَ الْمَسِّ
যারা সুদ খায় তারা যেন শয়তানের স্পর্শে পাগলপারা হয়ে চলাফিরা করে। -সূরা বাকারা: ২৭৫
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
তোমরা পরস্পরের মাল বাতিল উপায়ে ভক্ষণ করো না। -সূরা বাকারা: ১৮৮
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِيْ فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ
ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী উভয়কে একশতটি দোরা মারো। -সূরা নূরঃ ২
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً
যেসব পুরুষ চরিত্রবর্তী মেয়েলোকদের উপর যিনার মিথ্যা অভিযোগ তোলে, কিন্তু তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থাপিত করতে পারে না, তাদের আশি দোরা মারো। -সূরা নূর: ৪
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلٰى
হে ঈমানদারগণ; হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। -সূরা বাকারা: ১৭৮
إِنَّمَا جَزَاؤُا الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَ أَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ -
যারা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সমাজে অশান্তি ও রিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে চেষ্টা পায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে-হয় তাদের হত্যা করা হবে, না হয় শূলবিদ্ধ করা হবে। অথবা হাত ও পা বিপরীতভাবে কেটে দেয়া হবে, কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। -সূরা মায়িদা: ৩৩
إِنَّهَذَا الْخَمْرُ وَ الْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَ الْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ -
নিঃসন্দেহে মদ্য, জুয়া, বলিদানের বেদীসমূহ এবং গণনার মাধ্যমে ভাগ্য জানতে চেষ্টা করা শয়তানী কাজের অপবিত্রতা। অতএব তোমরা এর প্রত্যেকটিই পরিহার কর। -সূরা মায়িদা: ৯০
وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ -
চোর-স্ত্রী বা পুরুষ উভয়ের হাত কেটে দাও। তারা যা করেছে এটা তার ফল এবং আল্লাহ্র তরফ থেকে নির্ধারিত শাস্তি। -সূরা মায়িদা: ৩৮
বহুসংখ্যক হাদীসে এসব কুরআনী আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে রাসূলের সুন্নাতের অবদান। একজন মুসলমানের কাছে তার ভাই অপর মুসলিমের কি মর্যাদা ও জান-মালের নিরাপত্তা প্রাপ্য, এ থেকে তা জানতে পারা যায়। মানুষের অধিকার রক্ষা করা হয়েছে এসব বিধানের মাধ্যমে। এ অধিকার হরণ বা তার উপর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বড় গুনাহ্-তা কথার মাধ্যমে হোক বা কাজের মাধ্যমে করা হোক। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন-
مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا وَ مَنْ غَشَانَا فَلَيْسَ مِنَّا
যে লোক আমাদের উপর অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করবে, সে আমাদের (মুসলিম সমাজের) লোক নয় এবং যে আমাদিগকে প্রতারিত করবে সে-ও আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবে না।
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ وَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُقَالُ هَذِهِ غَدْرَةُ فَلَان
প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকেরই একটা পতাকা হবে কিয়ামতের দিন। ডাকা হবে এই বলে যে, এটি অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংকারী কার্য থেকে দূরে সরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞসা করলেন, সে সাতটি কার্য কি কি? জওয়াবে রাসূলে করীম (সা) বললেন, আল্লাহ্র সাথে শির্ক করা, যাদু করা, আল্লাহ্ হারাম করা নর হত্যা করা-তবে আইনের জন্য করা হলে আলাদা কথা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ, কাফির শত্রুর সাথে যুদ্ধকালে পালিয়ে যাওয়া, অসতর্ক বা জানে না এমন সচ্চরিত্রবতী মহিলাদের উপর ব্যভিচারের মিথ্যা দোষারোপ। -বুখারী, মুসলিম
রাসূলে করীম (সা) সুদখোর ও যে সুদ খাওয়ায়-উভয়ের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন।
তিনি বলেছেন, কথায় খোঁচাদানকারী, অভিশাপ বর্ষণকারী, বাজে ও নির্লজ্জ কথা-বার্তার বকবককারী ব্যক্তি মুসলিম নয়।
مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
যে লোক স্বীয় দীন বদলে দিল, ইসলাম ত্যাগ করে তদস্থলে অন্য ধর্মমত গ্রহণ করল, তাকে হত্যা কর। (মুসলিম ছাড়া অন্যান্য সব কয়খানি হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত)
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন 'তোমরা আমার নিকট থেকে বিধান গ্রহণ কর। আল্লাহ্ ওদের পথ বানিয়ে দিয়েছেন। অবিবাহিত-অবিবাহিতার যিনায় প্রত্যেককে একশ'টি দোরা এবং এক বছর কালের জন্য নির্বাসনের শাস্তি দিতে হবে। আর বিবাহিত-বিবাহিতার যিনার শাস্তি একশ'টি দোরা এবং রজম। (বুখারী ও নাসায়ী বাদে সব কয়খানি হাদীস গ্রন্থ)
যায়ের ইবনে ইয়াজীদ (রা) বলেছেনঃ
كُنَّا نَأْتِي بِالشَّارِبِ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ فِي أَمَرَةِ أَبِي بَكْرٍ فَتَقُوْمُ إِلَيْهِ نَضْرِبُهُ بِأَيْدِينَا وَ نَعَالِنَا وَ ارْدِيَتِنَا حَتَّى كَانَ صَدْرًا مِنْ أَمْرَةِ عُمَرَ مُجَلَّدَ ارْبَعِينَ حَتَّى إِذَا عَتَوْا فِيْهَا وَ فَسَقُوْا جُلْدَ ثَمَانِينَ .
আমরা রাসূলে করীম (সা)-এর এবং হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতের আমলে মদ্যপায়ীকে আমাদের হাতে জুতা ও চাদর দ্বারা মারপিট করতাম। হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে চল্লিশ দোরা মারা হতো। কিন্তু পরে দেখা গেল মদ্যপায়ীরা খুব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং সীমালংঘন করে যাচ্ছে, তাই তখন আশি দোরা মারার বিধান কার্যকর করা হয়।
مَنْ ظَلَمَ قَيْدَ شِبْرٍ مِنْ أَرْضِ طَوَّقَهُ مِنْ سَبْعَ أَرْضِينَ .
যে লোক এক বিঘত পরিমাণ জমি যুলুম করে দখল করে নিবে তার গলায় সাত তবক যমীনের মালা ঝুলিয়ে দেয়া হবে।
যে লোক নিতান্ত মূর্খতাবশত আত্মহত্যা করবে, সে চিরদিন জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে। যেলোক কোন লোহার অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে, সে সেই অস্ত্র দ্বারা নিজের পেট কাটতে থাকবে জাহান্নামে বসে। চিনদিনই তাকে তথায় থাকতে হবে। এটিও রাসূলেরই হাদীস।
কুরআন ও সুন্নাতের এইসব অকাট্য দলীল অবশ্যই পালনীয়। যে মুসলিমই এক আল্লাহ্ বন্দেগী গ্রহণ করবে, তার পক্ষে এগুলি যথাযথভাবে পালন করা একান্তই কর্তব্য। আর বাস্তবিকই কেউ যদি উপরোক্ত দলীলসমূহ নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করতে পারে, তার মনে, চরিত্রে অপরাধ প্রবণতা কোন স্থান পেতে পারে না। আর থাকলেও এই বিধানাবলী পালনের মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন অবশ্যম্ভাবী।
📄 মানুষের চরিত্রে ও আচার-আচরণে ইবাদাতের প্রভাব
ইসলামের চারটি ইবাদাত সর্বজনপরিচিত, মৌলিক এবং ইসলামী জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বের অধিকারী। সে চারটি ইবাদাত হচ্ছে—সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ। মূলত এর প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপিত করেছে। প্রত্যেকটিরই চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সকল প্রকার হীনতা-নীচতা থেকে মুক্ত করে কেবলমাত্র এক আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্ বানানো। মানব জীবনকে সকল প্রকার পাপ, না-ফরমানী ও পংকিলতা থেকে মুক্ত করা গেলেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব। তখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সকল প্রকার অন্যায় ও অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে। এই ইবাদাতসমূহের প্রত্যেকটিই মানুষকে সেই লক্ষ্যে প্রস্তুত করে। ইবাদাতসমূহের সেই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কিভাবে সম্ভব হয়, এখানে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
১. সালাত : সালাত মূলত মহান আল্লাহ্র সাথে তাঁর বান্দাহ্র এবং বান্দাহর সাথে তার মা'বুদের গভীর পবিত্র সম্পর্ক স্থাপন করে, মনে-হৃদয়ে আল্লাহ্র ভয় এবং আল্লাহ্র কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণের ভাবধারার সৃষ্টি করে। সালাতে মানবদেহের প্রায় সবকয়টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়োজিত হয়। দিন-রাত্রির চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচবারের সালাত আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ণবয়স্ক সব মানুষের উপর ফরয করেছেন। এরই মাধ্যমে বান্দাহ ও আল্লাহ্ মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দুনিয়ার কোন ফিতনাই সে সম্পর্ককে দুর্বল বা ছিন্ন করতে পারে না। বান্দাহ্ তখন ভুলে যায় না যে, তার উপর আল্লাহ্ হক সর্বাগ্রে এবং তাঁর ফরমানসমূহ কাজে পরিণত করেই তাঁর সে অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম হতে পারে।
আল্লাহর বান্দাহ্ দিনের সূচনা করে ফজরের সালাত আদায়ের মাধ্যমে। দাঁড়িয়ে রুকু সিজদা দিয়ে তার হাম্দও সানা পাঠ করে প্রমাণ করে যে, সে একমাত্র আল্লাহ্ বান্দাহ্। তাঁর বন্দেগীতে তার হৃদয় যেন স্বচ্ছ ও পবিত্র রয়েছে। এভাবে সে সকল প্রকার পাপ থেকে দূরে থেকে সারাদিনব্যাপী কার্যকলাপের মধ্যে পবিত্র থাকার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। অতঃপর সে তার নিরলস কর্মতৎপরতায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে একান্তভাবে আল্লাহ্র বান্দাহ্ থাকার জন্য যে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অবলম্বনের প্রয়োজন, তা-ই নামাযের মাধ্যমেই সে তা সংগ্রহ করে নেয়। তার কর্মব্যস্ততার মধ্যেই উপস্থিত হয় জোহরের সালাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়। তারপরে আসরের সালাতের সময়ও তার কর্ম ব্যস্ততার একবিন্দুও ভাটা পড়ে না। মাগরিবের সালাতের মাধ্যমে তার দিনের অবিশ্রান্ত কর্মব্যস্ততার পরিসমাপ্তি ঘটে। সে যেমন ফজরের সালাতে আল্লাহর সমুখে উপস্থিত হয়েও তাঁর সাথেও গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে দিনের যাত্রা শুরু করেছিল, ইশা ও বিত্রের সালাতে হাযির হয়ে সে সর্বশেষবারের তরে প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহর বান্দাহ্ হিসাবে দিনের তৎপরতা শুরু করেছিল ও নানা ব্যস্ততায় ডুবে গিয়েছিল, এখনও সে সেই আল্লাহরই একনিষ্ঠ বান্দাহই রয়েছে। সারাদিনে বিচিত্র ধরনের কর্মতৎপরতায় মশগুল হয়েও সে আল্লাহ্র বন্দেগীর সীমালংঘন করেনি।
সারাদিনের কোন মুহূর্তেও মহান আল্লাহকে ভুলে না যাওয়াই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বড় সুফল, মহামূল্য প্রাপ্তি। এরূপ অবস্থায় কোনরূপ অপরাধজনক কাজে অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। এই কারণে সালাত সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলার ঘোষণা হচ্ছে:
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرِ -
নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। -সূরা আনকাবুত : ৪৫
নবী করীম (সা) একটি উদাহরণের মাধ্যমে সালাতের উক্ত শুভফলের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন: তোমাদের কেউ যদি তার ঘরের সমুখে প্রবাহিত ঝর্ণায় প্রতিদিন পাঁচ বার গোসল করে, তা'হলে তার দেহে কোনরূপ মলিনতা অবশিষ্ট থাকবে বলে কি তোমরা ধারণা করতে পার? সাহাবীগণ বললেন 'না'। তিনি বললেন:
كَذلِكَ مِثْلُ الصَّلوتِ الْخَمْسَ يَمْحُو اللَّهُ بِهَا الْخَطَايَا
ঠিক এমনিভাবেই পাঁচ বারের সালাত দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাহর যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ও দোষ-ত্রুটি নিশ্চিহ্ন করে দিতে থাকেন।
সালাত মসজিদে জামায়াতের সাথে আদায় করা বাঞ্ছনীয়। সেখানে সে অন্যান্য মুসল্লী মুসলিম ভাইর সাথে সাক্ষাত লাভ করে। তারা একই কাতারে দাঁড়িয়ে একই ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে আল্লাহ্ ইবাদাত সম্পন্ন করে এবং তারই সন্তুষ্টি লাভ করে। প্রত্যেকেই তার অপর ভাইয়ের হাল-অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অবহিত লাভ করে। নিয়মিত মসজিদে আসা কোন লোক কখনও অনুপস্থিত হলে তার বিষয়ে খবর জানার তাকিদ লোক অনুভব করে। এভাবেই মুসল্লীদের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামষ্টিকতার উদ্রেক ঘটে। ফলে তারা সকলেই প্রত্যেকের পরিপূরক হয়ে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা ও নিরাপত্তাবোধ সহকারে জীবন যাপন করার সুযোগ পায়। এভাবে দৈহিক দিক দিয়ে পরস্পর নিকটস্থ লোকেরা অন্তরের দিক দিয়ে গভীরভাবে একাত্ম হয়ে উঠে। তারা সকলে একই ইমামের পিছনে একই কেবলামুখী হয়ে একই ইবাদাত পালন করে, একই আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে ঐক্যবদ্ধ এক জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। এভাবেই মুসলিম উম্মতের একত্ব গড়ে তোলা ও পরস্পরকে পরস্পরের ভাই বানিয়ে দেয়াই আল্লাহ্র ইচ্ছা ও বাসনা। বলেছেন: اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةُ। সব মু'মিনরাই পরস্পরের ভাই।
মুসলমান যখন একদিনের পাঁচবারের সালাতের মাধ্যমে অভিন্ন উম্মত হয়ে গড়ে উঠে, তখন তারা পবিত্র হৃদয়, নিষ্কলুষ পবিত্র মানুষ হয়ে দাঁড়ায়। তখন প্রত্যেক মুসলিম তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে পছন্দ করে নিজের জন্য। আল্লাহকে সে ভয় করতে থাকে গোপনে ও প্রকাশ্যে। তাই তার পক্ষে কোন অপরাধ করা সম্ভব হয় না। কেননা তার অকৃত্রিম বিশ্বাস রয়েছে, অপরাধ বা নাফরমানি করলে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
২. সিয়াম (রোযা): রমযানের একমাসকালীন সিয়ামের প্রশিক্ষণমূলক অবদান অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ব্যাপক ও গভীর। সিয়াম মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির উপর শক্ত লাগাম লাগিয়ে দেয় এবং রোযাদারকে যাবতীয় নাফরমানীর কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। অপরাধ যে ধরনের ও যে প্রকৃতিরই হোক, তা নক্সের খায়েশ, কামনা, বাসনা, লোভ ও লালসা থেকেই উৎসারিত হয়। আর তার গোড়াতে তিনটি প্রবল শক্তি-উৎস নিহিত থাকে। প্রথম, লোভ-লালসার শক্তি; দ্বিতীয় যৌন স্পৃহা ও কু-প্রবৃত্তি এবং তৃতীয় হচ্ছে অহমিকতা-দাম্ভীকতা বোধ। সিয়ামের প্রবল প্রশিক্ষণমূলক প্রভাব রয়েছে এই তিনটি শক্তি-উৎসের উপর।
আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র রিস্কসমূহ হালাল করেছেন এবং সকল প্রকার অপচয়-অপব্যবহারমুক্ত পানাহারকে মুবাহ ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ করেছেনঃ
وَ كُلُوا وَاشْرَبُوا وَ لَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ - قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي اخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَ الطَّيِّبَتِ مِنَ الرِّزْقِ - قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
............আর খাও, পান কর, কিন্তু সীমালংঘন করো না। আল্লাহ্ তা'আলা সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। হে নবী, এই লোকদের বল, আল্লাহ্র সেসব সৌন্দর্য অলংকারকে হারাম করেছে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের জন্য বের করে এনেছেন এবং আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসসমূহকে নিষিদ্ধ করেছে? বল, এই সমস্ত জিনিস দুনিয়ার জীবনেও ঈমানদার লোকদের জন্যই বরং কিয়ামতের দিন তো একান্তভাবে তাদের জন্যই নির্দিষ্ট থাকবে।
-সূরা আ'রাফ : ৩১-৩২
মানুষ সাধারণত দিন-রাতে তিনবার পানাহারে অভ্যস্ত-সকাল, দুপুর এবং রাতে। আর যখনই পিপাসা লাগে পান করে এবং যখনই ইচ্ছা হয় পানাহার করে। কিন্তু রমযান মাসে এই পানাহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। ছুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তা সবই বন্ধ থাকে। এই সময় ক্ষুধা তাকে যন্ত্রণা দেয়, পিপাসা তার বক্ষদেশ জ্বালায়-যদিও তার সম্মুখে সুমিষ্ট ও সুস্বাদু আহার্য সবই বর্তমান থাকে। আর তার জন্য আল্লাহ্ তা হালাল-ও করেছেন। কিন্তু সিয়ামের এই সময় সে সেইসব কিছু পান ও গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। তার অর্থ, যে আল্লাহ্ তার জন্য এ সব পানাহার হালাল করে দিয়েছেন, এই সময়টায় তারই আদেশে তা থেকে বিরত থেকে মানুষ এই কথাই প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করে দেয় যে, সে আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কিছু করে না। সে সেই কাজ করে এবং সেই সময় করে, যখন আল্লাহ্ যা করার অনুমতি দান করেন। বছরের বারোটি মাসের মধ্যে একটি মাসকাল ধরে যে নিজেকে এভাবে চালিত করতে অভ্যস্ত হয়, তার এ অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী বলে পরবর্তী এগারোটি মাস সে আল্লাহ্ নিষিদ্ধ পানাহার ও ধন-মাল থেকে নিজেকে বিরত রাখতে খুবই সাফল্য সহকারে সক্ষম হয়।
আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার জন্য বিয়ে ও স্ত্রী সঙ্গম হালাল করেছেন। বলেছেন:
فَانْكِحُوْ مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنى وَثُلث وَ رُبعَ طَ فَإِنْ خِفْتُمْ الَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
অতএব তোমরা স্ত্রীরূপে গ্রহণ কর, দু'জন তিন জন, চারজন যা তোমার ইচ্ছা। আর নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে না বলে ভয় হলে মাত্র একজন। - সূরা নিসাঃ ৩
ফলে বান্দা দিনে-রাতে যখন ইচ্ছা স্ত্রীর সহিত সঙ্গম করতে ও আসল ক্ষেতে বীজ বপন করতে পারে, কোন বাধা-নিষেধ নেই-কেবলমাত্র স্ত্রীর হায়েয অবস্থা ছাড়া। বলেছেনঃ
نِسَاءُ كُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের ক্ষেত সমতুল্য। অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেতে গমন কর যখন যেভাবে ইচ্ছা। -সূরা বাকারা : ২২৩
কিন্তু রমযান মাসে এই মুসলিম ব্যক্তির জীবনে এই অবাধ স্বাধীনতা সীমিত হয়ে আসে। তখন এই কাজ কেবলমাত্র রাত্রিকালেই সম্পন্ন হতে পারে; দিনের বেলা নয়। ইরশাদ হয়েছে:
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامَ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ - هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَ أَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ - عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ انْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَ عَفَا عَنْكُمْ - فَالْئِنَ بَاشِرُوهُنَّ وَ ابْتَغُوْا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ -
রমযানের রাত্রিকালে তোমাদের স্ত্রীদের সহিত যৌন মিলন হালাল ও সঙ্গত ঘোষণা করা হয়েছে। ওরা তোমাদের পোশাক, তোমরা ওদের পোশাক। আল্লাহ্ জানতে পেরেছেন, তোমরা নিজেদের উপর বিশ্বাস রক্ষা করতে অসমর্থ হচ্ছ। এই কারণে আল্লাহ্ তোমাদের তওবা কবুল করেছেন, ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইতঃপূর্বে ভুল-ত্রুটি। এক্ষণে তোমরা তাদের সহিত (রাত্রিকালে) সঙ্গম করতে পার এবং তোমাদের জন্য আল্লাহ্ যা লিখে দিয়েছেন তার সন্ধান করতে পার। -সূরা বাকারা : ১৮৭
রোযাদার মুসলিম একমাসকাল ধরে দিনের বেলা স্বীয় যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকতে যখন সক্ষম হচ্ছে, অথচ স্ত্রীসঙ্গম তার জন্য সম্পূর্ণ হালাল-তখন স্বভাবতই আশা করা যায় যে, বছরের পরবর্তী মাসগুলিতে নিষিদ্ধ যৌন সঙ্গম থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে অতীব যোগ্যতা সহকারে।
সিয়াম মুসলিমকে অশ্লীল, বাজে ও অর্থহীন কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত রাখে। এই কাজ মুসলিম ব্যক্তির জন্য সাধারণভাবেও হারাম বটে; কিন্তু রমযান মাসে এইগুলির হারাম তো আরও তীব্র ও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেন :
مَنْ لَّمْ يَدَعُ قَوْلَ الزَّوْرِ وَ الْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ اللَّهِ حَاجَةً فِي أَنْ يُدَعْ طَعَامَهُ وَ شَرَابَهُ -
যে লোক মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আমল ত্যাগ করল না, তার খাদ্য-পানীয় পরিত্যাগ করে চলায় আল্লাহ্র কোন প্রয়োজন নেই। -বুখারী, মুসলিম
অপর হাদীসে বলা হয়েছে:
كُمْ مَنْ صَائِمٍ لَيْسَ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَ الْعَطْسُ -
বেশ সংখ্যক রোযাদার এমন হয়ে থাকে, যাদের রোযায় ক্ষুধা, পিপাসার কষ্ট সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না। -বুখারী, মুসলিম
কুরআনে যদিও অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সকলকেই দেওয়া হয়েছে- যেমন বলা হয়েছে:
جَزَءُ اسَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مَثْلُهَا
'অন্যায়ের প্রতিফল অনুরূপ অন্যায়ই হয়।'
কিন্তু রোযাদারকে এক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে হয়। কারুর পক্ষ থেকে অন্যায় হলেই সেও তার জওয়াবে অন্যায় করবে এইরূপ স্বাধীনতা তাকে দেওয়া হয়নি। কেউ তাকে গাল-মন্দ বললে সেও অনুরূপ গাল-মন্দ তাকে শুনিয়ে দেবে, তা রোযাদারের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। এরূপ অবস্থা দেখা দিলে সিয়ামই তাকে ঢাল স্বরূপ আড়াল করে রাখবে। হাদীসে এই কথাই বলা হয়েছে এই ভাষায়:
الصِّيَامُ جُنَّةً فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمٍ أَحَدُكُمْ فَلَا يَرْفَتْ وَلَا يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي أَمْرَؤُ صَائِمٌ -
সওম (রোযা) ঢাল বিশেষ। রোযার দিনে কারুরই স্ত্রীসঙ্গম করা উচিত নয়, উচিত নয় হল্লা চিৎকার ও গোলমাল করা। কেউ যদি তাকে গাল-মন্দ বলে বা তার সহিত মারামারি করতে আসে, তা হলে তার বলা উচিত: আমি একজন রোযাদার ব্যক্তি। -বুখারী, মুসলিম
এভাবে একজন লোক যদি সারা মাস ধরে ক্রোধ-আক্রোশ এড়িয়ে চলার অভ্যাস করে, অন্যদের উপর বাড়াবাড়ি করা থেকেও বিরত থাকে, তা হলে পরবর্তী এগারো মাসকাল এই অভ্যাসের শক্তি দিয়ে সকল প্রকার অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিতে ওসব এড়িয়ে চলতে সক্ষম হবে-এটাই তো আশা করা যায়।
মানুষের উপর সর্বাধিক প্রভাব ও কর্তৃত্ব খাটায় মানুষের ইচ্ছাশক্তি। সেই ইচ্ছাশক্তিই যদি একমাসকাল ধরে উক্তরূপ নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে সে তার ঈমানী শক্তিকে প্রবল ও অনমনীয় ইচ্ছাশক্তির উপর বিজয়ী করে ও তাকে শরীয়তের বিধানের আওতায় নিয়ন্ত্রিত রাখতে সক্ষম হবে। এই উদ্দেশ্যেই রোযার এই সুমহান ব্যবস্থা ইসলামী শরীয়তে গ্রহণ করা হয়েছে।
৩. যাকাত: যাকাত মুসলিম ব্যক্তির সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ইবাদত। লোভ-লালসা, কার্পণ্য, সংকীর্ণতা, হিংসা, দ্বেষ, ধন-সম্পদের প্রেম-মায়া ইত্যাদি থেকে মানব মনকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে এই যাকাত। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে:
وَ مَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
যেসব লোক তাদের মধ্যকার কৃপণতা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে, তারাই সফলকাম। -সূরা তাগাবুন: ১৬
বহুলোক শুধু ধন-মালের লোভে পারস্পরিক শত্রুতায় লিপ্ত হয়। একদল অন্য দলের ধন-সম্পদ কেড়ে নেয় শুধু এই জন্য যে, ওদের আছে, আর এদের নেই। মানুষকে 'আছে ও নেই' এই দুই ভাগে বিভক্ত করে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। যাকাত এইসব বিপদ-আপদকে দূর থেকেই প্রতিরোধ করে। যে মুসলিম যথারীতি যাকাত আদায় করে এবং এই যাকাতের সাহায্যে দারিদ্র্য পীড়িত জনগণকে দারিদ্র্য ও অভাবমুক্ত করেছে, সে কখনও অন্য লোকের ধন-মালকে কোনরূপ মূল্য বা বিনিময় না দিয়ে হরণ করতে পারে না। লোভ-লালসাও কখনও তাকে অন্যায় কাজে উদ্বুদ্ধ করবে না।
দরিদ্র ব্যক্তি যদি শান্তিপূর্ণভাবে ও সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে ধন-সম্পদ থেকে নিজের ন্যায্য অংশ লাভ করে, তখন তার মনে কোন হিংসা-দ্বেষ থাকতে পারে না। 'আছে' ও 'নাই'র মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ঠিক তখনই সংঘটিত হয়েছে, যখন 'আছে'রা সব ধন-সম্পদ আঁকড়ে ধরে আছে। 'নাই'দের এক পয়সা দিতেও প্রস্তুত হয় না। এরূপ অবস্থায় 'আছে' ও 'নাই'র মধ্যে সর্বাত্মক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সৃষ্টি হওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠে। যাকাত এই ভুল বিভক্তিকে যেমন মিথ্যা করে দেয়, তেমনি তা ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব ও বিভেদ-পার্থক্য চিরতরে খতম করে পরস্পর ভাই ভাই বানিয়ে দেয়। দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের অভাব মোচন করে সচ্ছলতার দিকে যাওয়ার অবাধ সুযোগ করে দেয়। এইরূপ সমাজেই মানুষ পারস্পরিক প্রেম-ভালবাসার বন্ধনে বন্দী হতে পারে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا .
তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর। তাছাড়া তুমি তাদের পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ কর। -সূরা তাওবা: ১০৩
বস্তুত যাকাতের যে সামষ্টিক ভূমিকা রয়েছে, তাতে দারিদ্র্যের প্রতিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত মানুষের মধ্যকার দূরত্ব দূর হয়ে গিয়ে তারা সচ্ছলতার দিক দিয়ে অতি নিকটে এসে যায়। ফলে কোন শ্রেণী পার্থক্য থাকে না যেমন, তেমনি লোকদের অন্তরে নিহিত হিংসা-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা দূরীভূত হয়। তার দরুণ শ্রেণী-সংগ্রামের আগুন কখনই জ্বলে উঠে না। মানুষ পরস্পরের ভাই হয়ে পরম একাত্মতার মধ্যে জীবন যাপন করার সুযোগ পায়। সমাজের অভাবগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের অভাব মোচনের লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হয়। যাকাতের বণ্টন খাতসমূহ দেখলেই তা স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়।
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَ الْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَلْمُؤَالُفَةِ قُلُوبُهُمْ وَ فِي الرِّقَابِ وَ الْغَارِمِينَ وَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَ ابْنُ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ - وَ اللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ -
যাকাতের সম্পদ ফকীর, মিসকীন, সেই কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের মন রক্ষার প্রয়োজন, যারা দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহ্র পথে এবং নিঃস্ব পথিকের জন্য-আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত কর্তব্য। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ সুবিজ্ঞানী। -সূরা তাওবা: ৬০
বস্তুত ধনীদের ধন-মালে গরীব-মিসকীনদের হক রয়েছে। এই চেতনাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণের প্রাণ-শক্তি। এই চেতনা মুসলমানদের শোষণ-পীড়ন ও যুলুম-সীমালংঘনের জ্বালায় জর্জরিতকরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে ইসলামী সমাজে এই ধরনের কোন অপরাধ অনুষ্ঠিত হওয়া সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।
৪. হজ্জ : হজ্জ মুসলিম ব্যক্তির দেহ-আত্মা-হৃদয়-মন সহকারে আল্লাহর ঘরের দিকে এক মহাযাত্রা। তথায় সে আল্লাহ্র ঘরের তওয়াফ করে, সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে 'সায়ী' করে, মিনা ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করে। পালন করে অন্যান্য যাবতীয় জরুরী অনুষ্ঠানাদি।
হজ্জের ক্ষেত্রে প্রত্যেক এলাকার হজ্জযাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘মীকাত’ থেকে ইহরাম বাঁধতে হয়। তখন সে তার মন ও দেহ—দেহ ও মন উভয়কেই সম্পূর্ণরূপে পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ করে নেয়, পবিত্র থাকে তার পরনের দীনাতিদীন ব্যক্তির উপযোগী পোশাক। এভাবে হজ্জ পালন করে সে গুনাহ্ মুক্ত হয়, নিষ্পাপ হয়ে যায় মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিসাৎ হওয়ার দিনের মতই।
হজ্জের সমগ্র সফরে ‘তালবিয়া’—লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা—পাঠ করতে হয়। তা পাঠ করে হজ্জযাত্রী ঘোষণা করে, ‘হে রব! আমি তোমার ডাকে হাজির হয়েছি। আমি তোমার নিকটে হাজির হয়ে আছি।”
বস্তুত হজ্জ এক সাথে বিপুল সংখ্যক ইবাদতের সমন্বয়। হাজী যখন বায়তুল্লাহ্র তওয়াফ করে, তখন তার দিল সালাতের সেই কিবলার সাথে সংযুক্ত ও সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যে দিকে মুখ করে সে নিজের ঘরে থেকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। কা’বার তওয়াফকারী সব মানুষ যদিও বিভিন্ন দেশের, বর্ণের, আকার-আকৃতির, পোশাক-পরিচ্ছদের, তবুও তারা এক ও অভিন্ন এই দিক দিয়ে যে, তারা সকলে এক আল্লাহর প্রতি ঈমানদার এবং এক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই তাদের প্রত্যেকেরই এবং সকলেরই চরমতম লক্ষ্য। এ কারণে তারা এক ও সম্পূর্ণ একাত্ম। এই গোটা অনুষ্ঠানই আর একটা বিরাট ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তহীন আত্মদানের মর্মস্পর্শী দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ফলে তাদের অন্তর গভীরভাবে ভারাক্রান্ত ও অবনত হয়ে উঠে মহান আল্লাহ্র অসীম অনুকম্পায়। আরাফাতের বিশাল ময়দানে প্রায় একটি দিন সে অতিবাহিত করে মহান আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি ও দোয়া-প্রার্থনা করে। দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে সম্প্রসারিত করে আল্লাহ্র নিকট মাগফিরাত রহমত কামনা করে। অন্তর দিয়ে স্মরণ করে সেই দিনের কথা:
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا وَمَا عَمِلَتْ مِنْ سُوْءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
যেদিন প্রত্যেকটি মানুষ তার কৃত ভালো কাজের সুফল সম্মুখে উপস্থিত পাবে। আর যে খারাপ কাজ সে করেছে, সে বিষয়ে তার মনে এই কামনা জাগবে যে, কতই ভালো হতো যদি তার সাথে সে জিনিসের অনেক বেশি দূরত্ব হতো। -সূরা আল-ইমরান: ৩০
হাজী হজ্জ করে এই আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করে এবং সেই পাথেয় নিয়ে সে নিজের দেশে ফিরে আসে। এই শক্তিই তার পরবর্তী সমগ্র জীবনে সর্বপ্রকারের পাপ ও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য ঢালের কাজ করে।
مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُتْ وَ لَمْ يَفْسُقُ رَجَعَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمٍ وَ لَدَتْهُ أُمَّهُ -
যে হজ্জ করল এবং তাতে সে স্ত্রী সঙ্গম করল না, কোনরূপ পাপের কাজও করল না, সে ফিরে এল মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতই সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে। -বুখারী, মুসলিম
টিকাঃ
১. বখারী, মুসলিম।