📄 ঈমান ও পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা
কুরআন-পরিকল্পিত সমাজে পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক। সমাজে ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার সুসম্পর্ক এরই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আর তার মূলে ঈমানের ভূমিকা সদা কার্যকর। তাই বলা হয়েছেঃ
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ -
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা পারস্পরিক ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি পুরাপুরিভাবে পূর্ণ কর, রক্ষা কর। -সূরা মায়িদা: ১
একটি জিনিসকে অপর একটি জিনিসের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বেঁধে দেয়াকেই বলা হয় (عقد) সোজা কথায় বলা হয়া গিরা লাগানো-এখানে তার আরও অর্থ হলো, ইসলামী শরীয়তের সে সব আইন বিধান এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত যা পালন করা বান্দাদের জন্য একান্ত জরুরী ও বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। একজন অপর জনের কাছে যে আমানত রাখে এবং পারস্পরিক কাজ-কর্মে একজন অপরজনের কাছে যে ওয়াদা করে, যা পূরণ করা একান্তই কর্তব্য যা পূরণ না হলে কেউ-ই কারুর উপর বিশ্বাস রাখতে ও সাময়িক ক্ষতি বা বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে না এবং লোকদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা না থাকলে সমাজ-ই গড়ে উঠতে ও রক্ষা পেতে পারে না-সেইসবও এর মধ্যে শামিল রয়েছে। এতে যেমন আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা প্রতিশ্রুতি-যেমন এক আল্লাহ্ আনুগত্য করার এবং তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালন করে চলার ওয়াদা শামিল রয়েছে, তেমনি জনগণের পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতিও এর অন্তর্ভুক্ত। তা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত কিংবা জাতীয় পর্যায়েই করা হোক না কেন। কাজেই এই উভয় দিকের ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হলেই কুরআন-পরিকল্পিত আদর্শ সমাজ গঠিত হতে পারে এবং মানুষও পেতে পারে সত্যিকার শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা।
অপরাধমুক্ত ইসলামী সমাজের ভিত্তি যে ঈমানের উপর রক্ষিত, কুরআনে তার উপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। সেই সাথে ঈমানের প্রশস্ত রূপকেও তুলে ধরা হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটি আয়াতের উল্লেখই যথেষ্ট:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي انْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَ مَنْ يَكْfُرْ بِاللهِ وَ مَلئِكَتِهِ وَكُتُبه و رُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلاً بَعِيدًا
হে সেসব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, সেই কিতাবের প্রতি যা নাযিল করেছেন তাঁর রাসূলের উপর এবং সেই কিতাবের প্রতিও যা এর পূর্বে তিনি নাযিল করেছেন। আর যে লোক আল্লাহ্, তাঁর ফেরেস্তা, তাঁর কিতাবসমূহ ও পরকারের প্রতি কুফরী করবে, সে গুমরাহীতে অনেক দূরে চলে যাবে। -সূরা নিসা: ১৩৬
ইসলামে উপস্থাপিত মৌলিক ঈমানসমূহ এ আয়াতে বিধৃত হয়েছে। তা হচ্ছেঃ আল্লাহ্, ফেরেস্তা, কুরআন ও অন্যান্য আসমানী কিতাব, তাঁর রাসূল-হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং অন্যান্য সব নবী-রাসূল এবং পরকাল-এই কয়টির প্রতি ঈমান গ্রহণ। বিচ্ছিন্নভাবে এর এক-একটির প্রতি ঈমানের সমন্বয়েই গড়ে উঠে পূর্ণাঙ্গ ঈমান। এ ঈমানসমূহ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, যারা ঈমানদার বলে পরিচিত বা তাঁর দাবিদার, তাদেরকেই নতুন করে ঈমান আনতে বলা হয়েছে এ আয়াতে।
তাই একথা বলিষ্ঠভাবে বলা যায় যে, কুরআন মজীদ যে ঈমান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে, যে ঈমানের দাওয়াত প্রচারের জন্য আল্লাহ্ নবী-রাসূলগণ প্রাণপাত জিহাদ করে গেছেন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) যে ঈমানের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ গঠন করেছিলেন, সে ঈমান হচ্ছে অপরাধ পরিপন্থী একটি তুলনাহীন শক্তি। এই শক্তি চির নতুন, শাশ্বত-যে ঈমানের ভিত্তিতে আজও ব্যক্তি ও সমাজ-তথা রাষ্ট্র ও অর্থনীতি-এক কথায় পূর্ণাঙ্গ সমাজ গঠন করা হলো তা-ও একটি আদর্শ সমাজ হবে এবং তাতে অপরাধ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে না গেলেও তার মাত্রা, সংখ্যা ও প্রকোপ অনেক অনেক কম হবে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই।