📄 ঈমান ও অর্থ ব্যবস্থা
امِنُوا بِاللَّهِ وَ رَسُولِهِ وَ انْفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُسْتَخْلِفِينَ فِيْهِ - فَالَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ انْفَقُوا لَهُمْ أَجْرٌ كَبِيرٌ - ( الحديد : ٧ )
তোমরা ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং ব্যয় কর সেই ধন-মাল থেকে যাতে তিনি তোমাদের খলীফার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। অতএব তোমাদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনবে ও অর্থ ব্যয় করবে, তাদের জন্য বিরাট শুভ ফল বর্তমান। -সূরা হাদীদ: ৭
এ আয়াতে ঈমান গ্রহণের দাওয়াত অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সেই সাথে ঈমানী অর্থ ব্যবস্থার মৌলতত্ত্বও ব্যক্ত করা হয়েছে। দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ মানুষের-ঈমানদার লোকদের মর্যাদা কি, তাদের কর্তৃত্ব ও অধিকার কতটা এবং তাদের দায়িত্ব কি, তা এ আয়াতে বলা হয়েছে। এ আয়াতের দৃষ্টিতে যাবতীয় ধন-সম্পদে মানুষ আল্লাহ্ খলীফা-প্রতিনিধি বা নায়েব। মানুষ তার প্রকৃত মালিক নয়। সবকিছুর প্রকৃত মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ্ তা'আলা। তাঁরই খলীফা হিসাবে মানুষ ধন-মাল, আয়-উৎপাদন ও ব্যয়-বণ্টন করবে। আয়, ভোগ বণ্টন ও ব্যয় সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা যে পূর্ণাঙ্গ ও মৌলিক বিধান দিয়েছেন, সেই বিধানই হবে তাদের অর্থ-বিধান। বস্তুত, ধন-মালকে ব্যক্তির কিংবা রাষ্ট্রের নিরংকুশ মালিকানা মনে করাই যত অনর্থের মূল। ব্যক্তির নিরংকুশ মালিকানা দুনিয়ায় পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরংকুশ মালিকানার ধারণা সৃষ্টি করেছে সমাজবাদের। একদিকে ব্যক্তি পর্যায়ের শোষণ লুণ্ঠন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বঞ্চনা ও নির্যাতন আজকের বিশ্বব্যাপী উক্ত দু'ধরনের অর্থ ব্যবস্থার ফল। কুরআন যে ঈমানের আহ্বান নিয়ে এসেছে, তাতে এই উভয় ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করা হয়েছে। ঈমানের ঘোষণা হচ্ছে, এই দুনিয়ার কোন কিছুরই মালিক মানুষ নয়, নয় মানব-সৃষ্ট সমাজ বা রাষ্ট্র। সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহই হচ্ছেন সবকিছুর একমাত্র নিরংকুশ মালিক আর সব মানুষ হচ্ছে সেই আল্লাহ্ই সৃষ্ট এবং বান্দা। অতএব সবকিছুই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলবে। তা'হলেই মানুষ দুনিয়ায় বেঁচে সুখ পাবে। ঈমানই মানুষকে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস, অপচয়, লুটপাট, বঞ্চনা-গঞ্জনা থেকে বিরত রাখে। ঈমানই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে অকাতরে অর্থ দান করতে, বঞ্চিতকে তার ন্যায় হিস্সা যথাযথভাবে দিয়ে দিতে, সম্পদ সমান অধিকারের ভিত্তিতে ভাগ করে নিতে ও দিতে।
ঈমানদার ও বেঈমানদের বৈষয়িক জীবন পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত বলে তা কখন এক এক ও অভিন্ন হয় না। পরিণতি সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিকোণও এক হয় না।
اللَّهُ الَّذِ انْزَلَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ وَ الْمِيزَانَ وَ مَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ قَرِيبٌ يَسْتَعْجِلُ بهَا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِهَا - وَ الَّذِينَ آمَنُوا مُشْفِقُونَ مِنْهَا وَ يَعْلَمُوْنَ أَنَّهَا الْحَقُّ - إِلَّا إِنَّ الَّذِينَ يُمَارُونَ فِي السَّاعَةِ لَفِي ضَلَل بَعِيدٍ - ( الشورى : ۱۸ - ۱۷ )
আল্লাহ্ তিনিই আমাদের পরম সততা সহকারে কিতাব ও সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মানদণ্ড [শরীয়ত] নাযিল করেছেন। আর কোন্ জিনিস তোমাকে জানিয়ে দেবে, সম্ভবত কিয়ামতের দিনটি নিকটবর্তী। যারা তার প্রতি ঈমানদার নয়, তারা তাকে খুব তাড়াতাড়ি পেতে চায়। আর যারা তার প্রতি ঈমান এনেছে, তারা তাদের জন্য ভীত-সন্ত্রস্থ এবং তারা জানে যে, তা নিঃস্বন্দেহে সত্য। জেনে রাখ, কিয়ামতের বিষয়ে যারা সন্দেহের প্রশ্রয় দেয়, তারা অবশ্যই সুস্পষ্ট ও গভীর গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত। -সূরা শূরা: ১৭-১৮
পরকাল একটি বাস্তব সত্য। বর্তমানের এই বস্তু জগত ধ্বংস হয়ে যাবে। তা'ই হচ্ছে কিয়ামত। তা ঈমানের অন্যতম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দুনিয়ায় দু'ধরনের লোক রয়েছে। এখানে কিয়ামতের প্রতি যেমন ঈমানদার লোক রয়েছে, তেমনি বহু লোকই তা স্পষ্টভাবে অবিশ্বাস করছে। মনে করছে, মৃত্যুনিদ্রা কোনদিনই ভাঙবে না। এই দুই শ্রেণীর লোকের বৈষয়িক জীবন এই ধারায় প্রবহমান। কারণ, যারা পরকাল অবিশ্বাস করে, তারা তাকে একটা ঠাট্টা ও বিদ্রুপের বিষয় ধরে নিয়েছে এবং বলছে আরে কিয়ামত নাকি হবে! যদি হয়-ই, তা হলে তা শীগগীরই হয়ে যাক। তা হ'তে দেরী হচ্ছে কেন। কিয়ামতকে তারা একটুও ভয় পায় না। আর তা বিচিত্র কিছু নয়। হামাগুড়ি দিয়ে চলা শিশু জ্বলন্ত আগুনের প্রদীপকে রাঙা চক্চকে খেলনা মনে করে তাতে হাত দেয়। কেননা ওরা আগুনের দাহিকা শক্তি সম্পর্কে আদৌ অবহিত নয়। কিন্তু যারা তা জানে, তারা নিশ্চয়ই সুস্থ জ্ঞানে কখনই তাতে হাত দিয়ে ধরতে যাবে না। কিয়ামতের ব্যাপারটিও ঠিক তাই। কাফির বেঈমানরা তা বিশ্বাস করে না। তার বাস্তবতা ও স্বাভাবিকতা সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর সেই জন্যই ওরা বিদ্রূপচ্ছলে তা তাড়াতাড়ি হোক বলে উক্তি ঝাড়ে। কিন্তু ঈমানদার লোকেরা তার সত্যতা বাস্তবতা সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞানের অধিকারী। সেই কারণেই তারা তাকে ভয় পায়। কেননা সেদিন তো মানুষের ইহজীবন শেষ হয়ে গিয়ে চূড়ান্ত হিসাব নিকাশের মুহুত উপস্থিত হবে। যদি নেক আমলের জোরে উতরে যায়, তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। নতুবা জাহান্নামের দুর্ভাগ্যই হবে ললাট লিখন। তাই তারা এ জীবন এমনভাবে যাপন করতে চেষ্টা করে, যেন পরকালের সেই কঠিন দিনে উত্তীর্ণ হওয়া যায়।
বস্তুত এ ব্যাপারে ঈমানই হচ্ছে আসল চালিকা শক্তি। এই শক্তি যার হৃদয়-মনে জাগরূক, সক্রিয়, সে কখনই আল্লাহ্র আদেশ অমান্য করতে পারে না, লংঘন করতে পারে না আল্লাহ্র নিষেধকে। সে হবে প্রকৃত শরীয়ত অনুসারী ইসলামী সমাজের সৎ নাগরিক। আর এই ঈমানদার লোকেরাই ইহকাল পরকাল, উভয় ক্ষেত্রে, পরম সাফল্যের অধিকারী হবে।
يَايُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدً - يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ - وَ مَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا - ( الا حذاب : ۷۱ ৭০ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের আমলসমূহকে সংশোধিত করে দেবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। আর যে লোকই আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করল সে-ই পরম সাফল্য লাভে ধন্য হলো। -সূরা আহযাব: ৭০-৭১
এই জীবনের যাবতীয় কাজ কর্ম ঠিক ঠিক ভাবে সম্পন্ন হওয়া, গুনাহর মাগফিরাত লাভ এবং এই ঈমান সহকারেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা হলেই ইহ ও পরকালে পরম সাফল্য লাভ সম্ভব। তা ছাড়া এর কোনোটিই অর্জিত হতে পারে না। এই ঈমান থাকলেই আল্লাহ্ ভয় হৃদয় মনে জেগে উঠবে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলা সম্ভব হবে। ঈমান না হলে এই সবকিছুই নিষ্ফল ও ব্যর্থ হতে বাধ্য।
يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَظِرِينَ إِنهُ وَ لكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا ( الاحزاب : ٥٣ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নবীর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করবে না এবং খাওয়ার সময় হলেই সে ঘরে পৌঁছে যেয়ো না। তবে যদি খাবার খাওয়ার জন্য ডাকা হয়, তাহলে প্রবেশ করতে পার। -সূরা আহযাব: ৫৩
কারুর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা একটি সামাজিক অপরাধ বিশেষ। এতে কোনো ব্যক্তিরই নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষা পেতে পারে না। তাছাড়া এর ফলে নানা প্রকারের নৈতিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অপরাধ হওয়ারও আশংকা থাকে। এই কারণে প্রথমে নবীর ঘরে এবং পরে সব মুসলিম ব্যক্তির ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই নিষেধেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানই মানুষকে এই নিষেধ মেনে চলতে প্রস্তুত করে। যার ঈমান নেই, সে এই নিষেধ অমান্য করবে এবং আত্মীয় ও অনাত্মীয় কারুর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে নানাবিধ অপরাধ সৃষ্টির কারণ বা সুযোগ ঘটাবে। কিন্তু ইসলামী সমাজে তা আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়।
বিনা অনুমতিতে কারও ঘরে প্রবেশ করা একটি সাধারণ অপরাধ। এই অপরাধ এড়িয়ে চলার জন্য সাধারণভাবে সব ঈমানদার ব্যক্তির প্রতিই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে একই ঘরের অভ্যন্তরে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য এ ব্যাপারে কিছুটা প্রশস্ততা ও স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। যদিও তার মধ্যেও বিশেষ বিশেষ সময় এমন, যখন এই স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ণ বা সংকীর্ণ করে সময় বেঁধে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাই ঈমানদার লোকদের বলা হয়েছে:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَثَ مَرَّت - مِنْ قَبْلِ صَلوةِ الْفَجْرِ وَ حِيْنَ تَضَعُوْنَ ثِيَبَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَ مِنْ بَعْدِ صَلوةِ الْعِشَاءِ - ثلث عَوْرَاتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَ لَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَ هُنَّ - ( النور : ٥٨ )
হে লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ! এ নির্দেশ অবশ্যই পালনীয় যে, তোমাদের মালিকানাধীন (ক্রীতদাস-দাসী) এবং পূর্ণ বয়স্কতা পায়নি তোমাদের এমন বাচ্চারা তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে যেন তোমাদের ঘরে প্রবেশ করে: তা হচ্ছে, ফজরের সালাতের পূর্বে, দ্বিপ্রহরে যখন তোমরা পরিধেয় বস্ত্র খুলে রাখ এবং এশার সালাতের পর। কেননা এই তিনটি হচ্ছে তোমাদের জন্য পর্দার সময়। এই সময় ছাড়া অন্যান্য সময় এরা বিনানুমতিতে তোমাদের ঘরে প্রবেশ করলে, না তোমাদের কোন গুনাহ্ হবে, না ওদের। -সূরা নূর: ৫৮
বস্তুত নারী-পুরুষ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই জীবনে কিছুটা নির্দিষ্ট স্থান থাকা আবশ্যক, যেখানে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পূর্ণ নির্বিঘ্নতায় জীবন কাটাতে পারবে এবং এজন্য এমন একটা নির্দিষ্ট সময় থাকাও একান্তই আবশ্যক, যখন সেখানে অন্য কারুরই ঢুকে পড়ার সুযোগ বা আশংকা থাকবে না। এই নিরাপত্তা প্রয়োজন যেমন ঘরের বাইরের লোকদের থেকে, তেমনি ঘরের লোকদের থেকেও। সাধারণত ঘরে যেসব দাস-দাসী বা চাকর-চাকরানী থাকে; কিংবা থাকে পূর্ণবয়স্ক ছেলে-মেয়ে, ভাই-বাপ, এদের থেকেও নির্জনতার নিশ্চয়তা থাকা আবশ্যক-বিশেষ করে মেয়েদের জন্য।
ঘরের দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী-এমনকি পূর্ণবয়স্ক হয়নি এমন বালক-বালিকার জন্য ঘরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যক্তির শয়ন কক্ষে প্রবেশের ব্যাপারে একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। অন্যথায় ব্যক্তিরা যেমন বিভিন্ন সময় অপ্রস্তুত বা বিব্রত হয়ে পড়তে পারে, তেমনি আকস্মিকভাবে নানা অদ্রষ্টব্য ব্যাপার দেখতে পেয়ে নৈতিকতার দিক দিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু তা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। এই কারণেই এই বিধান পেশ করা হয়েছে। এই বিধানেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমান যে কি কি ভাবে মানুষকে নৈতিক অপরাধ থেকে রক্ষা করে এই বিধান তার একটি প্রকৃষ্ট ও স্পষ্ট নিদর্শন।
ঘরের বালক-বালিকরাই ভবিষ্যৎ বংশধর, ভবিষ্যৎ সমাজের নাগরিক। তাদের আদর্শ চরিত্রের অধিকারী বানিয়ে তোলার ব্যবস্থাও অনুকূল পরিবেশসম্পন্ন ঘরের অভ্যন্তরেই হতে হবে। কেননা এখানেই যদি তারা চরিত্র হারানোর মত অবস্থায় পড়ে যায়, তাহ'লে তারা বড় হয়ে বড় মাত্রার অপরাধী হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর তা হলে অপরাধমুক্ত মানুষ ও সমাজ গড়া কোনক্রমেই সম্ভব হবে না। অথচ ঈমান অপরাধমুক্ত ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া বলিষ্ঠভাবে কার্যকর করার পক্ষপাতী। তাই ঈমানদার লোকদের প্রতি এই নির্দেশ পালন করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষেই একান্ত জরুরী।
এই পর্যায়ে সমস্ত ঈমানদার লোকের জন্য যে সাধারণ বিধান জারি করা হয়েছে তা এইঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدْخُلُواْ بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ -
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যদের ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা ঘরের লোকদের সহিত পরিচিত গড়ে তুলবে ও তাদের প্রতি সালাম করবে। এই নীতি তোমাদের জন্য অতীব উত্তম। আশা করা যায়, তোমরা এই নির্দেশের তাৎপর্য অনুধাবন করবে ও স্মরণে রাখবে।
-সূরা নূর: ২৭
বস্তুত ঘরের লোকদের সাথে পরিচিতি লাভ এবং তাদের সাথে একাত্মতা সৃষ্টি না করে হঠাৎ করে ভিতরে প্রবেশ করা আধুনিক পাশ্চাত্য ধর্মহীন সভ্যতার আওতায় নিষিদ্ধ না হলেও ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। ইসলামে সামাজিক জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব হচ্ছে ব্যক্তির নিজস্ব স্বতন্ত্র নির্জনতার (Privacy) এবং নৈতিক চরিত্রের। এ দু'টি ক্ষুণ্ণ হতে পারে যে যে কাজে ও আচরণে ইসলামে তা শুধু অপছন্দ করা হয়েছে তা-ই নয়, শিষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধও হয়েছে। আলোচ্য আয়াতেও এই নিষেধের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানই মানুষকে লোকদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত নির্জনতা ক্ষুণ্ণ করা ও চরিত্র হননের সব কাজ থেকে বিরত রাখে।
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَن - وَ مَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَنِ فَإِنَّه يَاْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرَ - وَ لَوْلاً فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُه مَازَكَى مِنْكُمْ مَنْ أَحَدٍ أَبَدًا ولَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ - وَ اللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ -
হে সেসব লোক, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে চলো না। কেননা যে লোকই শয়তানের পদাংক অনুসরণের নীতি গ্রহণ করবে, শয়তান তো তাকে নির্লজ্জতা ও পাপ-অপরাধজনক কাজেরই আদেশ করবে। বস্তুত আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও দয়া-অনুকম্পা যদি তোমাদের প্রতি না থাকতো তা'হলে তোমাদের কোন একজন লোকও কখনো পবিত্র হতে পারতো না। বরং আল্লাহই যাকে চান পবিত্র পরিশুদ্ধ করেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। -সূরা নূর: ২১
ঈমানের পরিপন্থী যে কুফর, তারই অগ্রনেতা হচ্ছে শয়তান। ঈমান যেমন মানুষকে আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুগত বানায়, তেমনি কুফর বানায় শয়তানের অনুসারী। অতএব যারাই নিজেকে শয়তানের অনুসারীতে পরিণত করবে, তারাই শয়তানের নির্দেশ ও কু-পরামর্শ অনুযায়ী সকল প্রকার পাপ, পংকিলতা ও অপরাধজনক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হবে। এক কথায় বলা যায়, দুনিয়ায় যত পাপ, যুলুম, শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা ও নৈতিক বিচ্যুতি, পদস্খলনজনিত অপরাধ, তা সবই একমাত্র শয়তানের আনুগত্যের ফলশ্রুতির। একমাত্র ঈমানই মানুষকে এই অবাঞ্ছনীয় পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই ঈমানদার লোকদের প্রতি কুরআনের এই উদাত্ত আহ্বান।
এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারাই ঈমান গ্রহণ করবে, তারা কখনই ব্যভিচারের ন্যায় জঘন্য অপরাধ করতে পারে না। যদি কেউ সে অপরাধ করেই বসে, তা'হলে তার জন্য কুরআন-নির্দিষ্ট শাস্তি অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এই শাস্তি কার্যকর করা ও তা প্রত্যক্ষ করাও ঈমানদার লোকদেরই দায়িত্ব।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةٍ وَ لا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ - وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ -
(অবিবাহিত) ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী দু'জনের প্রত্যেককেই একশটি করে দোরা মার এবং দু'জনের প্রতি মহানুভবতা যেন আল্লাহ্র বিধান কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদের পেয়ে না বসে, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক এবং এই দু'জনকে দেয়া শাস্তি যেন ঈমানদার লোকদেরই কিছুসংখ্যক প্রত্যক্ষ করে। -সূরা নূর: ২
ব্যভিচারীকে শাস্তিদান আল্লাহ্র বিধান। এ বিধান বা আইন অবশ্যই কার্যকর হতে হবে। তার কার্যকরতার দু'টি দিক। একটি হলো: অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তার উপর ঘোষিত শাস্তিটা কার্যকর করা। আর দ্বিতীয়টি হলো: শাস্তিদানটা যেহেতু প্রকাশ্যভাবে অনুষ্ঠিত হতে হবে, এজন্য তা বহু লোকের সম্মুখে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং বহু লোকের উপস্থিত হয়ে তা প্রত্যক্ষ করা। কিন্তু এ দু'টি দিকই নির্ভর করে ঈমানের উপর। এ কারণে আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে শাস্তি কার্যকর করতে এবং তাতে কোনরূপ দয়া-সহানুভূতি যেন তার কার্যকরতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়, এই কারণে শর্ত দেওয়া হয়েছে এই বলে, যদি তোমরা ঈমানদার হও এবং দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, তা প্রত্যক্ষ করবে ঈমানদার লোকেরাই। কেননা এ শাস্তিটা শিক্ষাপ্রদ। কেবলমাত্র ঈমানদার লোকেরাই তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
বস্তুত ঈমানই হচ্ছে সর্বপ্রকার অপরাধ প্রতিরোধক, অপরাধ হলে তার নির্দিষ্ট শাস্তির বিধায়ক। ঈমান না হলে এর কোনটাই বাস্তবায়িত হতে পারে না। আর ঈমান থাকলে প্রথমত অপরাধই হবে না। অপরাধ হলেও তার শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর হবে। ফলে তা প্রত্যক্ষকারী জনতা কখনই অনুরূপ অপরাধ করতে সাহসী হবে না। এরই প্রভাবে গোটা পরিবেশ ব্যভিচার তথা অপরাধ-বিরোধী হয়ে উঠবে। অপরাধ প্রতিরোধে এরূপ কার্যকর শক্তি দ্বিতীয় কিছুই নেই, হতে পারে না।
এই ঈমানের ভিত্তিতেই মদ্যপান, জুয়া খেলা ইত্যাদি অপরাধ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَ الْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ -
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَ عَنِ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ -
হে ঈমানদার লোকেরা, চূড়ান্তভাবে জেনে নেবে, যাবতীয় মাদকদ্রব্য, জুয়া, অ-খোদার উদ্দেশে বলিদানের স্থানসমূহ এবং ভাগ্য জানার পন্থাসমূহ শয়তানী কাজের জঘন্য মলিনতা মাত্র। অতএব তোমরা সকলে তা পরিহার কর। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে। এর পেছনে মূল ব্যাপার হ'ল, এই মাদক ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি করতে চায় এবং চায় তোমাদেরকে সালাত ও আল্লাহ্ যিক্র থেকে বিরত রাখতে। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য, তোমরা এসব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে?
-সূরা মায়িদা : ৯০-৯১
সর্বপ্রকারের মাদক ও জুয়া এবং শিরকের কার্যাবলী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া পর্যায়ে এ আয়াতে চূড়ান্ত কথা ঘোষিত হয়েছে, হয়েছে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে। তার অর্থ-যার মধ্যে ঈমান রয়েছে, সে কখনই এ সব কাজ এবং এর মধ্যে কোন একটিও করতে পারেন না। ঈমানই মানুষকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখে। আর এ সবকয়টি কাজই যেহেতু যাবতীয় অন্যায়, পাপ ও অপরাধের মৌল উৎস; তাই যে লোক এ সব কাজ থেকে বিরত থাকবে, খুবই আশা করা যায়, সে অন্যান্য সকল প্রকার অন্যায়, পাপ ও অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। কুরআন ঈমানের হাতিয়ার দিয়ে বাকি পাপ ও অপরাধের প্রতিরোধ করতেও ইচ্ছুক। অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনও এই ঈমানের দ্বারাই সম্ভব। কুরআনের এই ইচ্ছা যে নিঃসন্দেহে যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক, একদিকে তদানীন্তন মদীনার সমাজ ও অন্যদিকে একালের পাশ্চাত্য সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে পারে।
এ ঈমানই মানুষকে সকল প্রকার উত্তম উপাদেয় পবিত্র খাদ্য গ্রহণে এবং মৃত জীব, রক্ত, শূকর এবং আল্লাহ্ নামে জবেহ করা হয়নি এমন সব জন্তুর গোস্ত খাওয়া বর্জন করে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ এই শেষোক্ত জিনিসগুলি অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও হীন চরিত্র সৃষ্টিকারী খাদ্য। খাদ্যবস্তু যে মানুষের চরিত্রে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে-ভাল, উৎকৃষ্ট পবিত্র খাদ্য পবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্র সৃষ্টি করে এবং নিকৃষ্ট ও জঘন্য খাদ্য মানুষের চরিত্রকে পংকিল করে দেয়, কুরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গী আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেও যথার্থ বলে প্রমাণিত করেছে। অপরাধমুক্ত ব্যক্তি ও সামজ গঠনে নিকৃষ্ট জঘন্য খাদ্য পানীয় থেকে সমাজকে মুক্ত করা এবং ভালো, উপাদেয় ও উত্তম-উৎকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণে মানুষকে আগ্রহী বানানো একান্তই কর্তব্য। আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানও এ তত্ত্বকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে। তাই কুরআন মজীদে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَكُمْ وَاشْكُرُو اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ -
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَ الدَّمَ وَ لَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَ مَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ -
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা খাও আমার দেয়া উৎকৃষ্ট-পবিত্র খাদ্যসমূহ এবং তোমরা আল্লাহর শোকর কর যদি তোমরা কেবল তাঁরই বন্দেগীতে রত হয়েই থাক। তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন শুধুমাত্র মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারুর নামে বলি দেয়া জন্তুর মাংস। -সূরা বাকারা : ১৭২-১৭৩
এ আয়াতে ঈমানদার লোকদের প্রতি একদিকে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর এবং আল্লাহ্র নামে নয়-অন্য কারুর নামে বলি দেয়া জন্তুর মাংস খাওয়া হারাম করে দেয়া হয়েছে। অপর দিকে আল্লাহ্ দেয়া উৎকৃষ্ট পবিত্র খাদ্যসমূহ খাওয়ার অনুমতি ঘোষিত হয়েছে। এই নিষেধ এবং অনুমতি, অন্য কথায় হালাল ও হারাম নির্ধারণের এই ঘোষণাটি উপস্থাপিত করা হয়েছে ঈমানের উপর ভিত্তি করে। ফলে যাদের ঈমান আছে, তারা আল্লাহ্র নিকট থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত খাদ্যসমূহকে হালাল মনে করে নিতে এবং যে সব দ্রব্য খেতে নিষেধ করা হয়েছে তাকে হারাম মেনে নিয়ে সম্পূর্ণ পরিহার করে চলতে একবিন্দু দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করতে পারে না।
📄 ঈমান ও পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা
কুরআন-পরিকল্পিত সমাজে পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক। সমাজে ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার সুসম্পর্ক এরই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আর তার মূলে ঈমানের ভূমিকা সদা কার্যকর। তাই বলা হয়েছেঃ
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ -
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা পারস্পরিক ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি পুরাপুরিভাবে পূর্ণ কর, রক্ষা কর। -সূরা মায়িদা: ১
একটি জিনিসকে অপর একটি জিনিসের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বেঁধে দেয়াকেই বলা হয় (عقد) সোজা কথায় বলা হয়া গিরা লাগানো-এখানে তার আরও অর্থ হলো, ইসলামী শরীয়তের সে সব আইন বিধান এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত যা পালন করা বান্দাদের জন্য একান্ত জরুরী ও বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। একজন অপর জনের কাছে যে আমানত রাখে এবং পারস্পরিক কাজ-কর্মে একজন অপরজনের কাছে যে ওয়াদা করে, যা পূরণ করা একান্তই কর্তব্য যা পূরণ না হলে কেউ-ই কারুর উপর বিশ্বাস রাখতে ও সাময়িক ক্ষতি বা বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে না এবং লোকদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা না থাকলে সমাজ-ই গড়ে উঠতে ও রক্ষা পেতে পারে না-সেইসবও এর মধ্যে শামিল রয়েছে। এতে যেমন আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা প্রতিশ্রুতি-যেমন এক আল্লাহ্ আনুগত্য করার এবং তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালন করে চলার ওয়াদা শামিল রয়েছে, তেমনি জনগণের পারস্পরিক ওয়াদা-প্রতিশ্রুতিও এর অন্তর্ভুক্ত। তা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত কিংবা জাতীয় পর্যায়েই করা হোক না কেন। কাজেই এই উভয় দিকের ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হলেই কুরআন-পরিকল্পিত আদর্শ সমাজ গঠিত হতে পারে এবং মানুষও পেতে পারে সত্যিকার শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা।
অপরাধমুক্ত ইসলামী সমাজের ভিত্তি যে ঈমানের উপর রক্ষিত, কুরআনে তার উপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। সেই সাথে ঈমানের প্রশস্ত রূপকেও তুলে ধরা হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটি আয়াতের উল্লেখই যথেষ্ট:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي انْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَ مَنْ يَكْfُرْ بِاللهِ وَ مَلئِكَتِهِ وَكُتُبه و رُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلاً بَعِيدًا
হে সেসব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, সেই কিতাবের প্রতি যা নাযিল করেছেন তাঁর রাসূলের উপর এবং সেই কিতাবের প্রতিও যা এর পূর্বে তিনি নাযিল করেছেন। আর যে লোক আল্লাহ্, তাঁর ফেরেস্তা, তাঁর কিতাবসমূহ ও পরকারের প্রতি কুফরী করবে, সে গুমরাহীতে অনেক দূরে চলে যাবে। -সূরা নিসা: ১৩৬
ইসলামে উপস্থাপিত মৌলিক ঈমানসমূহ এ আয়াতে বিধৃত হয়েছে। তা হচ্ছেঃ আল্লাহ্, ফেরেস্তা, কুরআন ও অন্যান্য আসমানী কিতাব, তাঁর রাসূল-হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং অন্যান্য সব নবী-রাসূল এবং পরকাল-এই কয়টির প্রতি ঈমান গ্রহণ। বিচ্ছিন্নভাবে এর এক-একটির প্রতি ঈমানের সমন্বয়েই গড়ে উঠে পূর্ণাঙ্গ ঈমান। এ ঈমানসমূহ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, যারা ঈমানদার বলে পরিচিত বা তাঁর দাবিদার, তাদেরকেই নতুন করে ঈমান আনতে বলা হয়েছে এ আয়াতে।
তাই একথা বলিষ্ঠভাবে বলা যায় যে, কুরআন মজীদ যে ঈমান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে, যে ঈমানের দাওয়াত প্রচারের জন্য আল্লাহ্ নবী-রাসূলগণ প্রাণপাত জিহাদ করে গেছেন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) যে ঈমানের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ গঠন করেছিলেন, সে ঈমান হচ্ছে অপরাধ পরিপন্থী একটি তুলনাহীন শক্তি। এই শক্তি চির নতুন, শাশ্বত-যে ঈমানের ভিত্তিতে আজও ব্যক্তি ও সমাজ-তথা রাষ্ট্র ও অর্থনীতি-এক কথায় পূর্ণাঙ্গ সমাজ গঠন করা হলো তা-ও একটি আদর্শ সমাজ হবে এবং তাতে অপরাধ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে না গেলেও তার মাত্রা, সংখ্যা ও প্রকোপ অনেক অনেক কম হবে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই।