📄 ঈমান ও আমল
মোটকথা, ঈমানের পরে পরেই এবং সাথে সাথেই তদনুযায়ী আমল একান্তই জরুরী। অন্যথায় ঈমানের যথার্থতাই অপ্রমাণিত থেকে যায়। আর ঈমান অনুযায়ী আমল হচ্ছে, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং সেইসব কাজ করা, যা তিনি ফরয বা কর্তব্যরূপে ঘোষণা করেছেন। এই আমল-ই ঈমানদারকে প্রকৃত মু'মিন বানিয়ে দেয়। কুরআন মজীদের বহুসংখ্যক আয়াতেই এই কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বলা হয়েছে। এখানে এই পর্যায়ের কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা যাচ্ছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَى اللهِ وَرَسُولِهِ وَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٍ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالَكُمْ وَ انْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ - ( الحجرات - ١ - ٢ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অগ্রে চলে যেও না। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মু'মিনেরা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপরে তোমাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর অধিকতর উচ্চ করবে না এবং তোমরা পরস্পর যেভাবে জোরে জোরে কথা বলো, নবীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সেরূপ জোরে বলো না। কেননা তোমাদের অজ্ঞাতসারেই তোমাদের সব নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে।
দু'টি আয়াতেই ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে কথা বলা হয়েছে। সে কথা হচ্ছে-তিনটি কাজের নিষেধ ও একটি কাজের আদেশ। আল্লাহ্ ও রাসূলের অগ্রে যেতে, রাসূলের কণ্ঠস্বরের তুলনায় স্বীয় কণ্ঠস্বর উচ্চ করতে এবং রাসূলের সাথে জোরে জোরে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে' এবং আদেশ করা হয়েছে আল্লাহকে ভয় করতে। এ আদেশ ও নিষেধ কাজ বিশেষ। এ কাজের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এ ঈমান যাদের আছে, তাদেরকেই কাজের আদেশ করা হয়েছে এবং কয়েকটি কাজ করতে তাদেরই নিষেধ করা হয়েছে।
অতএব যাদের ঈমান আছে, তারা অবশ্যই এ আদেশ ও নিষেধ মান্য করবে। আর যাদের ঈমান নেই, তারা এ আদেশ-নিষেধকে গ্রাহ্য মাত্রও করবে না। তা হলে ঈমান-ই আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ পালনের মূলে আসল প্রাণশক্তি। ইসলাম মানুষের মধ্যে এই প্রাণশক্তিকেই জাগিয়ে দিতে চায় সর্বপ্রথম। তা'হলেই আল্লাহ্র আদেশ- নিষেধ বাস্তবায়িত হবে, বাস্তবে অনুসৃত হবে বলে আশা করা যায়। এই ঈমানের ভিত্তিতেই এসেছে আল্লাহ্ যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ। একটি আয়াত:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ (البقرة - ১০৮ )
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে পূর্ণ মাত্রায় প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। কেননা সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।
দ্বিতীয় আয়াত:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ - ( ال عمران - ১৪৯ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা যদি কাফির লোকদের আনুগত্য ও অনুসরণ কর, তাহলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের অতীতের (সেই জাহিলিয়াতের) যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আর তাহলে তোমরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
টিকাঃ
১. এই কথাটির অর্থ অনেক ব্যাপক। তন্মধ্যে এগুলো রয়েছে: আল্লাহ্ ও রাসূলকে কোন বিষয়ে প্রস্তাব দিও না-এই কাজ করুন বলে। কোন বিষয়ে আল্লাহ্ ও রাসূলের বলার পূর্বে তোমরা কিছু বলো না। আল্লাহ্ ও রাসূল যা বলেন নি, তোমরা তা বলো না। আল্লাহ্ ও রাসূল যে কথা যতটুকু বলেছেন, তোমরা তার উপর বাড়িয়ে কিছু বলো না-এই সব অর্থই হতে পারে। হযরত ইবনে আরকাম বলেছেন : لا تقولوا خلاف الكتاب والسنة "কুরআন ও সুন্নাতের বিরুদ্ধে কিছু বলো না।"
📄 ঈমান ও রাষ্ট্র
পূর্বোল্লিখিত আয়াতে ঈমানদার লোকদিগকে কাফিরদের অনুসরণ ও আনুগত্য গ্রহণ করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে এবং পুরোপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ করার ও ইসলাম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বস্তুত যাদের অন্তরে ঈমানের অস্তিত্ব বিদ্যমান, তারা এ নিষেধ অমান্য ও এই আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারে না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَ كُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ - ( الحجرات - ٦ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের নিকট কোন কাফির ব্যক্তি যদি কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তার সত্যাসত্য যাচাই কর, যেন মূর্খতা বা অজ্ঞতাবশত কোনো জনসমষ্টির উপর বিপদ টেনে না আন। তা'হলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।
আয়াতের সম্বোধন সেসব ঈমানদার লোকদের প্রতি, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এই নির্দেশ অনুযায়ী তারা সর্বপ্রকারের সংবাদাদির উৎসের যথার্থতা সন্ধান করতে বাধ্য। যে রাষ্ট্র পরিচালকগণ ঈমানদার তারা এই আদেশ পালনে বাধ্য। তাদের ঈমানের তাকীদেই তারা তা করবে। এর বিপরীত কিছু করতে তারা প্রস্তুত হবে না তাদের ঈমানেরই কারণে। অন্যথায় তারা এমন কাজ করে বসতে পারে যার দরুন তারা লজ্জিত বা দুঃখিত হবে।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مَنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَ لَا نِسَاءٌ مِّمْ نِّسَاءِ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَ لَا تُلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ - ( الحجرات - ١١ )
হে ঈমানদারগণ, কোন জনগোষ্ঠী যেন অপর কোন জনগোষ্ঠীকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে। অসম্ভব নয় যে, তারা তাদের তুলনায় অনেক উত্তম হবে। অনুরূপভাবে কোন মেয়েলোক যেন অপর মেয়েলোকদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে; অসম্ভব নয় যে, তারা এদের অপেক্ষা অনেক ভালো হবে এবং তোমরা পরস্পরকে নানাবিধ খারাপ উপাধি দিয়ে সম্বোধন করবে না।
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের দৃষ্টিতে এ আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে যে সব কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে তা কোন ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষেই করা সম্ভব নয়। বস্তুত যার মধ্যে প্রকৃত ঈমান রয়েছে, সে এর কোন একটি কাজও করতে পারে না। ঈমানই তাকে এই নিষিদ্ধ কাজগুলি করতে বাধা দেবে, এ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, একে এই কারণেই ঈমানের অবদান বলতে হবে। আয়াতের নিষিদ্ধ কাজগুলি সমাজে কত যে অশান্তি এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহের সৃষ্টি করতে পারে, তা সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারেন না। আয়াত অনুযায়ী সেই অশান্তি ও বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার মৌলিক উপায় হচ্ছে সত্যিকারের ঈমান। ঈমান থাকলেই তা থেকে বাঁচা সম্ভব হবে।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا - أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللهَ - ( الحجرات - ۱۲ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা বহু সংখ্যক খারাপ ধারণা পরিহার করে চলো। কেননা কোনো কোনো ধারণা গুনাহ্। আর তোমরা লোকদের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না এবং তোমরা পরস্পরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাই'র গোস্ত ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? অতঃপর তোমরা তা ঘৃণাই করলে!
এ আয়াতে কিছু কিছু অমূলক খারাপ ধারণা পোষণ, পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং পরস্পরের গীবত-দোষ গেয়ে বেড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এই নিষিদ্ধ ঘোষণা ঈমানদার লোকদের প্রতি। কেননা এই কাজগুলি ঈমানের পরিপন্থী। বস্তুত যার ঈমান আছে, সে কখনই এই নিষিদ্ধ কাজগুলি করতে পারে না। ঈমানই তাকে এই সব সমাজ-বিরোধী ও সাধারণভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখে। এখানেও ঈমানের ভূমিকাই প্রবল এবং এসব সমাজ-বিধ্বংসী কার্যাবলী থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ঈমান। ঈমানের তাকীদেই এসব কাজ থেকে মানুষ স্বতঃই বিরত থাকবে।
বস্তুত নবী প্রেরণও হয়েছে লোকদের মধ্যে ঈমান সৃষ্টির লক্ষ্যে। আল্লাহর বাণী :
إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَاهِدًا وَ مُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لِتُؤْمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَ تُوَقِّرُوهُ وَ تُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَ اصيلاً - ( الفتح - ٨ - ٩ )
হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শকরূপে, যেন তোমরা-হে জনগণ, ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং যেন তোমরা তাঁর সাহায্য করো, তাঁকে অন্তর দিয়ে সম্মান করো এবং সকাল ও সন্ধ্যায় যেন তোমরা তাঁর তস্বীহ কর।
আয়াতটিতে রাসূল পাঠাবার মূল উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে এবং তা হচ্ছে 'যেন তোমরা ঈমান গ্রহণ কর'। তাই রাসূলের সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে ঈমান গ্রহণের জন্য লোকদের দাওয়াত দেওয়া। কেননা রাসূলের রিসালতের দায়িত্ব পালন, আল্লাহ্র দীনের বিজয় সাধন, আল্লাহকে অন্তর দিয়ে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভয় করা এবং সকাল-সন্ধ্যা কেবল তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করা-যা মানুষকে সৃষ্টি করার মূল লক্ষ্য, তার বাস্তবায়নে প্রস্তুত করবে, সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে এই ঈমান গ্রহণ করার উপর মানুষ ঈমান গ্রহণ করলেই আল্লাহ্র প্রতি ভয় ও সম্ভ্রমবোধ জাগবে, তারই তাকীদে মানুষ আল্লাহ্ সেই সব কাজ সম্পাদনে ও আল্লাহর সাহায্যে সর্বান্তঃকরণে এগিয়ে আসবে, যেসব কাজ আল্লাহ্ নিজে না করে তা করার দায়িত্ব মানুষের উপর অর্পণ করেছেন, সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা ও ঘোষণা করবে। আর তাতেই রাসূলে করীমের আগমনের সার্থকতা ও সাফল্য নিহিত। এগুলিই হচ্ছে ঈমানের ফলশ্রুতি, যা কেবলমাত্র ঈমানদার লোকদের কাছেই আশা করা যায়। বেঈমান-কাফির লোকেরা তো উক্ত কাজগুলির মধ্যে কোন একটিও করবে না, তাদের প্রতি সেই আশাও পোষণ করা যায় না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَالَا تَفْعَلُونَ - كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَالَا تَفْعَلُونَ - ( الصف - ٢ - ٣ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মুখে কেন বল তা, যা তোমরা কার্যত কর না? আল্লাহ্র নিকট তা অতি বড় অপরাধ-অসন্তুষ্টির কারণ যে, তোমরা যা কার্যত কর না তাই বলবে।
মুখে একটা বলা, কিন্তু কাজে তা না করা কিংবা তার বিপরীত কাজ করাকে কুরআনী পরিভাষায় নিফাক্ বা মুনাফিকী বলা হয়। এই মুনাফিকী কার্যকলাপেরই প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে উপরোক্ত আয়াতে। এই পর্যায়ে অত্যন্ত তীব্র ও অকাট্য ভাষায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং তা বলা হয়েছে, 'হে ঈমানদার লোকেরা' এই সম্বোধন করে। তার অর্থ, ঈমানদার লোকের কাজ এ নয় যে মুখে বলা এক, কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা স্পষ্টত ঈমানের পরিপন্থী, ঈমানদার লোক কখনো এইরূপ কাজ করতে পারে না। যার প্রকৃত ঈমান রয়েছে তার কাছে এইরূপ আচরণের আশা করা যায় না। যার ঈমান নেই, তার নিকট এই নীতি-মুখে যা বলা কাজে তা না করা, কোনো দোষের ব্যাপার নয়। এতে সে কোনো দোষই মনে করবে না। কিন্তু যার অন্তরে প্রকৃত ঈমান রয়েছে সে তো এই নীতি কখনো অবলম্বন করবে না। শুধু তা-ই নয়, এই নীতি-যেখানেই অবলম্বিত হতে দেখবে সেখানেই সে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে। এটাই স্বাভাবিক। বস্তুত কেবলমাত্র ঈমানই মানুষকে এই দ্বৈত চরিত্র থেকে দূরে রাখতে পারে।
এ ঈমানই হচ্ছে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতার একমাত্র ভিত্তি। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুগত্যই হচ্ছে মূল কথা। আনুগত্য ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্র কোনটিই গড়ে উঠতে বা গড়ে উঠে চলতে পারে না। কিন্তু এই পর্যায়ে মৌলিক প্রশ্ন, মানুষ আনুগত্য করবে কার? যারই আনুগত্য করতে মানুষকে বলা হবে, সেখানে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন উঠবে-মানুষ কেন তার আনুগত্য করবে? আনুগত্য পাওয়ার তার কি অধিকার আছে? মানুষ যারই আনুগত্য করবে, তা কি শর্তহীন হবে, না শর্তভিত্তিক? মানুষের শর্তহীন আনুগত্য পাওয়ার বা তার দাবি করার কোন অধিকার কোন মানুষের থাকতে পারে না। এই শর্তহীন আনুগত্য মানুষ করতে বাধ্য কেবল মাত্র বিশ্বস্রষ্টা ও পরিচালক নিয়ন্ত্রক আল্লাহর-অন্য কারোরই নয়।
কিন্তু সমাজে সাধারণত লক্ষ্য করা যায় কিছু সংখ্যক লোক মানুষের মধ্য থেকেই বেরিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দখল করে এবং সাধারণ মানুষের নিরংকুশ ও শর্তহীন আনুগত্য লাভ করতে চায়। এ আনুগত্য না পেলে তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার ও নিপীড়ন চালাতে এক বিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। ফলে এই অসহায় জনগণ ভয়ে ও আতংকে তাদের নিরংকুশ ও শর্তহীন আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অথচ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার এবং তাঁরই অনুমতি ও আদেশক্রমে আল্লাহ্র রাসূলের। রাসূলের অনুপস্থিতি বা অবর্তমানে এই আনুগত্য পেতে পারেন সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালকরা-এই শর্তের অধীন যে, তাঁরা নিজেরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন নিজেদের ইচ্ছামত আইন রচনা করে নয়, আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন ও বিধানের ভিত্তিতে। অন্যথায় এই আনুগত্য পাওয়ার তাদের কোন অধিকার স্বীকৃতব্য নয়। এই কথাই বলা হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُو الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ - فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَ الرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ – ذلِكَ خَيْرٌ و احْسَنُ تَأْوِيلاً - ( النساء - ٥٩ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার 'সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন লোকদের'ও। অতঃপর তোমরা যদি পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে তার চূড়ান্ত মীমাংসার ব্যাপারটি প্রত্যার্পিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট-যদি তোমরা ঈমানদার হও আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি। এই নীতিই সর্বোত্তম এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বাধিক কল্যাণকর। -সূরা নিসা: ৫৯
এ আয়াতে সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল আনুগত্যের কথা বলার সাথে সাথে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সুবিচার লাভের পন্থাও নির্দেশ করা হয়েছে এবং সেজন্য শর্ত করা হয়েছে ঈমানের-ঈমান আল্লাহ্র প্রতি, ঈমান পরকালের প্রতি। কেননা আল্লাহ্র বিধান কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহভিত্তিক সুবিচার পাওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে এই ঈমান। এ ঈমানই আল্লাহ্ ও রাসূলকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের নেতৃত্বভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রকে এবং তাঁর জারি করা আল্লাহ্ ও রাসূলের আইন বিধান মেনে চলতে মানুষকে প্রস্তুত করে। নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে এই কথাই বলা হয়েছে একটু ভিন্নতর ভঙ্গীতে:
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَ أَطَعْنَا - وَ أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ - ( النور - ٥١ )
ঈমানদার লোকদের যখন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান জানানো হয়, তাদের পারস্পরিক ব্যাপারে ফয়সালা দানের ও প্রশাসন চালানোর উদ্দেশ্যে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠে: আমরা শুনলাম ও মানলাম। আর বস্তুত এরাই সফলকাম লোক। [ 'শুনলাম ও মানলাম' অর্থ আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের যে কোন নির্দেশ মেনে চলতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলাম। ] -সূরা নূর: ৫১
অর্থাৎ ঈমানদার লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন বিনাশর্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানতে রাযি হয়। পক্ষান্তরে যে বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক নয়, তা তারা মানতে কোনক্রমেই প্রস্তুত হতে পারে না।
ফলত যারা নিজেরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করতে প্রস্তুত নয়, প্রস্তুত নয় আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করতে ও প্রশাসন চালাতে, তারা বাস্তবে আল্লাহ্ ও রাসূলের বিদ্রোহী, কার্যত আল্লাহ্র দীন, কুরআন ও সুন্নাহ্ অপমানকারী। তারা মুখে মুসলিম হওয়ার যত দাবিই করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের ও কাফিরদের মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। এই শ্রেণীর লোকদেরকে নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে দেওয়া কোন ঈমানদার লোকেরই কাজ হতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, তাদেরকে সমাজনেতা ও রাষ্ট্রকর্তারূপে মেনে নিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَ لَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبِ مِنْ قَبْلِكُمْ وَ الْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ - وَ اتَّقُوا اللهَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ - ( المائده - ٥٧ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের পূর্বে কিতাবপ্রাপ্ত লোকদের মধ্য থেকে যারাই তোমাদের দীনকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকারে ও খেলার বস্তুতে পরিণত করে এবং যারা কাফির তাদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্রনেতা বা বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তোমরা যদি প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক, তা'হলে আল্লাহকে ভয় করেই উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকবে। -সূরা মায়িদা: ৫৭
এই অকাট্য ও সুস্পষ্ট নির্দেশের পর উক্তরূপ লোকদের নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব মেনে নেওয়া কোন ঈমানদার ব্যক্তিরই কাজ হতে পারে না। উক্ত ধরনের লোক যদি ক্ষমতাসীন হয়ে ঈমানদার লোকদের নিকট আনুগত্যের দাবি করে, তাহলে তাদের আনুগত্য করা তো দূরের কথা, তাদের উৎখাত করতে এবং তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমানদার ও অনুগত লোকদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো ঈমানদার লোক মাত্রেরই কর্তব্য। কুরআনের পরিভাষায় এই প্রচেষ্টারই নাম হচ্ছে জিহাদ।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابِ الِيْمٍ - تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ وَ تُجَاهِدُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَ انْفُسِكُمْ - ذلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - ( الصف : ۱۰ - ۱۱ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের কি এমন এক ব্যবসায়ের পথ দেখাব যা তোমাদের পীড়াদায়ক আযাব থেকে মুক্তি দেবে? তা হচ্ছে তোমরা ঈমান আনবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে তোমাদের জান-মাল সহকারে। -সূরা সাফ : ১০-১১
পরকালীন আযাব থেকে মুক্তি লাভের জন্য যে পথ এ আয়াতে প্রদর্শিত হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং আল্লাহর পথে জান-মাল নিয়ে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া। এ কথাটি বলা হয়েছে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে। তার অর্থ, এই কাজটি তারাই করবে-করতে পারবে বলে আশা করা যায়, যাদের ঈমান আছে। যাদের ঈমান নেই-যারা কাফির তারা নিশ্চয়ই এই কাজটি করবে না। আর যে কাজটির কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনে আল্লাহর পথে জিহাদ করা। তার অর্থ, ঈমানদার লোকেরা যখন নিজেদের জান-মালসহ জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে, ঠিক সেই সময়-সেই মুহূর্তেও তাদের ঈমানদার থাকতে হবে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি। যদি তা না থাকে, তা'হলে তাদের এই ধন-মাল ও জান-প্রাণের কুরবানী নিরর্থক ও নিষ্ফল হয়ে যাবে। তা আল্লাহ্র নিকট গৃহীতও হবে না, তার সওয়াবও পরকালে কিছুই পাওয়া যাবে না। ঈমান যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। পরে বলা হয়েছে:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ - ( الصف - ١٤ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহ্ (দীনের) সাহায্যকারী হও। -সূরা সাফ : ১৪
আল্লাহর দীনের বিজয়ে অংশগ্রহণ যেমন ঈমানের তাকীদে, তেমনি আল্লাহ্ সাহায্যকারী হওয়াও ঈমানেরই তাকীদে সম্ভবপর। ঈমান না থাকলে আল্লাহ্ সাহায্যকারী হওয়ার সুযোগ কেউ পাবে না। অথচ আল্লাহ্র সাহায্যকারী হওয়া মানুষের জন্য খুব বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوّى وَ عَدُوِّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوا بمَا جَاءَ كُمْ مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُوْلَ وَ إِيَّا كُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে এমন বন্ধু (বা পৃষ্ঠপোষক) -রূপে গ্রহণ কর না যে, তাদের প্রতি বন্ধুত্ব পোষণ করে তাদের নিকট গোপন কথা বলে দেবে। অথচ ওরা তোমাদের নিকট আগত মহাসত্যকে অমান্য ও অগ্রাহ্য করেছে। ওরা রাসূল এবং তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করে শুধু এই অপরাধে যে, তোমরা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনেছ। -সূরা মুমতাহীনা: ১
এ আয়াতে শত্রুদের প্রতি বন্ধুত্ব পোষণ করতে এবং তাদের নিকট গোপন তথ্য ফাঁস করে দিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। আর শত্রুদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের কার্যাবলীর দৃষ্টিতে। সে কার্যাবলীর মধ্যে প্রথম, তারা আল্লাহ্র নিকট থেকে আসা সত্য দীনকে অমান্য ও অগ্রাহ্য করেছে এবং দ্বিতীয়, 'তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ-শুধু এই অপরাধে তারা রাসূল এবং তোমাদের-ঈমানদার লোকদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে।' যদিও হিজরতের পরে মক্কার লোকদের এই অপরাধের কারণে তাদের আল্লাহ্ ও ঈমানদার লোকদের শত্রু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ করে তাদের নিকট গোপন তথ্য ফাঁস করতে নিষেধ করা হয়েছে; কিন্তু এ একটি চিরন্তন বিধান। সর্বকালের মু'মিনরাই এ বিধান মেনে চলতে বাধ্য। কেননা এ বিধানের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানের কারণেই কাফিররা মু'মিনদের প্রতি শত্রুতা করে চিরকাল। তাই সেই ঈমানের ভিত্তিতেই তাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ না করতে। বস্তুত ওরা যেমন কুফরী অবলম্বনের দরুন ঈমানকে বরদাস্ত করতে রাযি নয়, ঈমানদার লোকদের সাথে চরম শত্রুতা করতে কিছুমাত্র পিছপা নয়, তেমনি ঈমানদার লোকেরা এই ঈমানের কারণেই ওদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারে না। কেননা ঈমান চিরকালই কুফরীর বিপরীত। ঈমান ও কুফরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা চিরন্তন। এই দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা অনিবার্য, একান্ত অপরিহার্যও। এই দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা যেদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে, সেদিন ঈমানের নাম চিহ্নও থাকবে না। কিন্তু তা কোনক্রমেই সত্য হতে পারে না। তাই ঈমানকে তার স্বমর্যাদায় চিরকালই ভাস্বর ও সক্রিয় হয়ে থাকতে হবে। আর এই ঈমানের ভাস্বরতা ও সক্রিয়তার ফলেই শত্রুকে চিনতে ও চিহ্নিত করতে বিলম্ব হবে না-কোনরূপ অসুবিধাও হবে না এবং ঈমানদার লোকেরা তাদেরকে বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে কখনই গ্রহণ করবে না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য ফাঁসও করে দেবে না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ - ( النساء - ١٤٤ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মু'মিনদের পরিবর্তে কাফির লোকদিগকে বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে নিও না। -সূরা নিসা : ১৪৪
এ আয়াতে উপরোদ্ধৃত আয়াতের বক্তব্যই ভিন্নভাবে পেশ করা হয়েছে। ঈমানের এই কার্যকারিতা চিরকালই অনস্বীকার্য।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَ كُمُ الْمُؤْمِنتُ مُهَجَرَاتِ فَامْتَحِنُوْ هُنَّ - اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِهِنَّ - ( الممتحنه : ١٠ )
হে ঈমানদার লোকেরা ! তোমাদের নিকট যখন হিজরতকারী মু'মিন মহিলারা আসবে, তখন তোমরা তাদের যাচাই কর। আল্লাহই তাদের ঈমানের বিষয়ে অধিক অবহিত। -সূরা মুমতাহেনা: ১০
মুসলমানদের মদীনায় হিজরত করে যাওয়ার পর বিপুল সংখ্যক ঈমানদার মহিলাও হিজরত করে মদীনায় উপস্থিত হতে শুরু করেন। এই সুযোগে অ-ঈমানদার তথা কাফির মেয়েলোকেরা যাতে মদীনায় প্রবেশ করতে না পারে, তা সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করা মদীনাবাসীদের জন্য একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছিল। তাই এই নির্দেশ। এ নির্দেশেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। কেননা মদীনা ঈমানের ভিত্তিতে গড়া সমাজের অধিবাস। এখানে শত্রুপক্ষের কাফির নারীরা প্রবেশ করে ঈমানদার সমাজের ঈমানী ভিত্তিকে বিনষ্ট করে দেবার ষড়ষন্ত্র করতে পারে, তা অসম্ভব বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এজন্য এই নির্দেশ:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَ مَعْصِيَتِ الرَّسُوْلِ وَ تَنَاجَوْ بِالْبَرِّ وَ التَّقْوى - وَ اتَّقُوا اللهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ - ( المجادله : ٩ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা যখন পরস্পর গোপন পরামর্শ করবে, তখন অবশ্যই গুনাহ্, সীমালংঘনমূলক কাজ ও রাসূলের অমান্যতার পরামর্শ করবে না; বরং গোপন পরামর্শ করবে পুণ্যময় ও তাকওয়ামূলক বিষয়ে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, যাঁর নিকট হাশরের দিনে তোমাদের একত্রিত হতে হবে। -সূরা মুজাদালা: ৯
এ আয়াতেও সম্বোধন ঈমানদার লোকদের প্রতি এবং তারও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এই ঈমানের কাক্ষণেই আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের ন্যায় গুনাহ, সীমালংঘনমূলক ও নবীর না-ফরমানীর কার্যাবলী বিষয়ে পরস্পর পরামর্শ করতে নিষেধ করেছেন। ঈমানদার লোকদের বরং তাদের তাকওয়া ও পুণ্যময় কার্যাবলী নিয়ে সলা-পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, প্রথম ধরনের পরামর্শ একটা শয়তানী কাজ। এই কাজ কখনই ঈমানদার লোকদের জন্য শোভনীয় নয়। উপরন্তু এই ধরনের সলা-পরামর্শ ঈমানদার লোকদের সমন্বয়ে ঈমানের ভিত্তিতে গড়া সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাতে সমাজ-সংস্থা দৃঢ় হয় না, বিশ্লিষ্ট হয়; শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠে না, দুর্বল হয়ে থাকে। অথচ ঈমানভিত্তিক সমাজের জন্য সেই অবস্থা কোনক্রমেই কাম্য হতে পারে না।
📄 ঈমান ও সামাজিক রীতিনীতি
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجْلِسِ فَافْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ - وَ إِذَا قِيلَ نُشُزُوا فَانْشُزُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ - ( المجادله : ١١ )
হে ঈমানদার লোকেরা। তোমাদের যখন বলা হবে যে, মজলিসে একটু খোলামেলাভাবে বস, তখন তোমরা অবশ্যই খোলামেলাভাবে বসবে। তা'হলে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা এনে দেবেন। আর যখন বলা হবে, তোমরা উঠে দাঁড়াও, তখন অবশ্যই উঠে দাঁড়াবে। তা'হলে তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার, আল্লাহ্ তাদের উচ্চ মর্যাদা দেবেন। -সূরা মুজাদালা : ১১
এ আয়াতে ঈমানদার লোকদের সামাজিক রীতি-নীতি ও বৈঠকী নিয়মাদির কথা বলা হয়েছে। কথার সার হ'ল, ঈমানদার লোকদের সমাজ হবে নিয়ম-শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ। এখানে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম-বিধির অমান্যতা এবং নেতৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা চলতে পারে না। কেননা, তা ঈমানেরই পরিপন্থী। এই সমাজের লোকদের মজলিসে এতটা প্রশস্ততা-থাকা আবশ্যক যে, প্রয়োজনে যেন সেখানে বেশি বেশি লোকের সংস্থান করা যায় এবং কোন প্রয়োজনে সকলকে উঠতে বললেও যেন সকলে উঠে দাঁড়ায়। মজলিসে প্রয়োজনাধীনে দেওয়া এ ধরনের আদেশ অমান্য করা হলে সামাজিক শৃঙ্খলাই বিনষ্ট হয়ে যায়। এরূপ নির্দেশ নিশ্চয়ই সমাজ নেতার পক্ষ থেকে আসবে। আর সমাজ-নেতার প্রয়োজনবোধে দেওয়া এসব ছোটো-খাটো ব্যাপার সম্পর্কিত আদেশই যদি অমান্য করা হয়, তা'হলে সুসংবদ্ধ ইসলামী সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। কেননা ইসলামী সমাজ তো ঈমানদার লোকদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ। সেই সমাজে যদি এতটুকু আদেশেরও মান্যতা না থাকে, তা'হলে সে সমাজের লোকদের ঈমান আছে-তার কোন প্রমাণই পাওয়া যাবে না। আল্লাহ্ এই নির্দেশ শুধুমাত্র মজলিসী নিয়ম হয়েই থাকবে না, বৃহত্তর সমাজ জীবনেও বাইরে থেকে মুসলমানদের জন্য স্থান বানাবার মত উদারতা ও সেজন্য নিজের ঘর-বাড়ি, জমি-জায়গা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রশস্ততা সৃষ্টি করতে রাযি থাকা ঈমানদার সমাজের লোকদের কর্তব্য-ঈমানের পরিচায়ক।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ آمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْن - مِنْ رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَلْ لَكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ - وَ اللهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - ( الحديد ٢٧ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। তাহলে তিনি তাঁর রহমতের দ্বিগুণ অংশ তোমাদের দেবেন এবং তোমাদের জন্য এমন 'নূর' বানিয়ে দেবেন যার আলোকে তোমরা চলবে এবং তোমাদের মাগফিরাত দান করবেন। বস্তুত আল্লাহ্ বড়ই ক্ষমাশীল ও অতীব দয়াবান। -সূরা হাদীদ : ২৮
আল্লাহ্ দ্বিগুণ অংশের রহমত, আল্লাহ্র নিকট থেকে নূর লাভ করা। যার আলোকে নির্বিঘ্নে জীবনের পথ অতিক্রম করা যাবে এবং তাঁর মাগফিরাত লাভ মানুষ মাত্রেরই ইহকালে ও পরকালে পরম কাম্য হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তা লাভ করার জন্য ঈমান প্রথম শর্ত। ঈমান হলেই এইসব পাওয়া সম্ভব। এই ঈমানই মানুষের মনে আল্লাহ্র ভয় জাগ্রত করে, যে ভয় মানুষকে আল্লাহ্ না-ফরমানী থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশাবলী যথাযথ পালনে উদ্বুদ্ধ করে।
📄 ঈমান ও অর্থ ব্যবস্থা
امِنُوا بِاللَّهِ وَ رَسُولِهِ وَ انْفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُسْتَخْلِفِينَ فِيْهِ - فَالَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ انْفَقُوا لَهُمْ أَجْرٌ كَبِيرٌ - ( الحديد : ٧ )
তোমরা ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং ব্যয় কর সেই ধন-মাল থেকে যাতে তিনি তোমাদের খলীফার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। অতএব তোমাদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনবে ও অর্থ ব্যয় করবে, তাদের জন্য বিরাট শুভ ফল বর্তমান। -সূরা হাদীদ: ৭
এ আয়াতে ঈমান গ্রহণের দাওয়াত অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সেই সাথে ঈমানী অর্থ ব্যবস্থার মৌলতত্ত্বও ব্যক্ত করা হয়েছে। দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ মানুষের-ঈমানদার লোকদের মর্যাদা কি, তাদের কর্তৃত্ব ও অধিকার কতটা এবং তাদের দায়িত্ব কি, তা এ আয়াতে বলা হয়েছে। এ আয়াতের দৃষ্টিতে যাবতীয় ধন-সম্পদে মানুষ আল্লাহ্ খলীফা-প্রতিনিধি বা নায়েব। মানুষ তার প্রকৃত মালিক নয়। সবকিছুর প্রকৃত মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ্ তা'আলা। তাঁরই খলীফা হিসাবে মানুষ ধন-মাল, আয়-উৎপাদন ও ব্যয়-বণ্টন করবে। আয়, ভোগ বণ্টন ও ব্যয় সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা যে পূর্ণাঙ্গ ও মৌলিক বিধান দিয়েছেন, সেই বিধানই হবে তাদের অর্থ-বিধান। বস্তুত, ধন-মালকে ব্যক্তির কিংবা রাষ্ট্রের নিরংকুশ মালিকানা মনে করাই যত অনর্থের মূল। ব্যক্তির নিরংকুশ মালিকানা দুনিয়ায় পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরংকুশ মালিকানার ধারণা সৃষ্টি করেছে সমাজবাদের। একদিকে ব্যক্তি পর্যায়ের শোষণ লুণ্ঠন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বঞ্চনা ও নির্যাতন আজকের বিশ্বব্যাপী উক্ত দু'ধরনের অর্থ ব্যবস্থার ফল। কুরআন যে ঈমানের আহ্বান নিয়ে এসেছে, তাতে এই উভয় ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করা হয়েছে। ঈমানের ঘোষণা হচ্ছে, এই দুনিয়ার কোন কিছুরই মালিক মানুষ নয়, নয় মানব-সৃষ্ট সমাজ বা রাষ্ট্র। সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহই হচ্ছেন সবকিছুর একমাত্র নিরংকুশ মালিক আর সব মানুষ হচ্ছে সেই আল্লাহ্ই সৃষ্ট এবং বান্দা। অতএব সবকিছুই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলবে। তা'হলেই মানুষ দুনিয়ায় বেঁচে সুখ পাবে। ঈমানই মানুষকে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস, অপচয়, লুটপাট, বঞ্চনা-গঞ্জনা থেকে বিরত রাখে। ঈমানই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে অকাতরে অর্থ দান করতে, বঞ্চিতকে তার ন্যায় হিস্সা যথাযথভাবে দিয়ে দিতে, সম্পদ সমান অধিকারের ভিত্তিতে ভাগ করে নিতে ও দিতে।
ঈমানদার ও বেঈমানদের বৈষয়িক জীবন পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত বলে তা কখন এক এক ও অভিন্ন হয় না। পরিণতি সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিকোণও এক হয় না।
اللَّهُ الَّذِ انْزَلَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ وَ الْمِيزَانَ وَ مَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ قَرِيبٌ يَسْتَعْجِلُ بهَا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِهَا - وَ الَّذِينَ آمَنُوا مُشْفِقُونَ مِنْهَا وَ يَعْلَمُوْنَ أَنَّهَا الْحَقُّ - إِلَّا إِنَّ الَّذِينَ يُمَارُونَ فِي السَّاعَةِ لَفِي ضَلَل بَعِيدٍ - ( الشورى : ۱۸ - ۱۷ )
আল্লাহ্ তিনিই আমাদের পরম সততা সহকারে কিতাব ও সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মানদণ্ড [শরীয়ত] নাযিল করেছেন। আর কোন্ জিনিস তোমাকে জানিয়ে দেবে, সম্ভবত কিয়ামতের দিনটি নিকটবর্তী। যারা তার প্রতি ঈমানদার নয়, তারা তাকে খুব তাড়াতাড়ি পেতে চায়। আর যারা তার প্রতি ঈমান এনেছে, তারা তাদের জন্য ভীত-সন্ত্রস্থ এবং তারা জানে যে, তা নিঃস্বন্দেহে সত্য। জেনে রাখ, কিয়ামতের বিষয়ে যারা সন্দেহের প্রশ্রয় দেয়, তারা অবশ্যই সুস্পষ্ট ও গভীর গুমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত। -সূরা শূরা: ১৭-১৮
পরকাল একটি বাস্তব সত্য। বর্তমানের এই বস্তু জগত ধ্বংস হয়ে যাবে। তা'ই হচ্ছে কিয়ামত। তা ঈমানের অন্যতম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দুনিয়ায় দু'ধরনের লোক রয়েছে। এখানে কিয়ামতের প্রতি যেমন ঈমানদার লোক রয়েছে, তেমনি বহু লোকই তা স্পষ্টভাবে অবিশ্বাস করছে। মনে করছে, মৃত্যুনিদ্রা কোনদিনই ভাঙবে না। এই দুই শ্রেণীর লোকের বৈষয়িক জীবন এই ধারায় প্রবহমান। কারণ, যারা পরকাল অবিশ্বাস করে, তারা তাকে একটা ঠাট্টা ও বিদ্রুপের বিষয় ধরে নিয়েছে এবং বলছে আরে কিয়ামত নাকি হবে! যদি হয়-ই, তা হলে তা শীগগীরই হয়ে যাক। তা হ'তে দেরী হচ্ছে কেন। কিয়ামতকে তারা একটুও ভয় পায় না। আর তা বিচিত্র কিছু নয়। হামাগুড়ি দিয়ে চলা শিশু জ্বলন্ত আগুনের প্রদীপকে রাঙা চক্চকে খেলনা মনে করে তাতে হাত দেয়। কেননা ওরা আগুনের দাহিকা শক্তি সম্পর্কে আদৌ অবহিত নয়। কিন্তু যারা তা জানে, তারা নিশ্চয়ই সুস্থ জ্ঞানে কখনই তাতে হাত দিয়ে ধরতে যাবে না। কিয়ামতের ব্যাপারটিও ঠিক তাই। কাফির বেঈমানরা তা বিশ্বাস করে না। তার বাস্তবতা ও স্বাভাবিকতা সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর সেই জন্যই ওরা বিদ্রূপচ্ছলে তা তাড়াতাড়ি হোক বলে উক্তি ঝাড়ে। কিন্তু ঈমানদার লোকেরা তার সত্যতা বাস্তবতা সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞানের অধিকারী। সেই কারণেই তারা তাকে ভয় পায়। কেননা সেদিন তো মানুষের ইহজীবন শেষ হয়ে গিয়ে চূড়ান্ত হিসাব নিকাশের মুহুত উপস্থিত হবে। যদি নেক আমলের জোরে উতরে যায়, তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। নতুবা জাহান্নামের দুর্ভাগ্যই হবে ললাট লিখন। তাই তারা এ জীবন এমনভাবে যাপন করতে চেষ্টা করে, যেন পরকালের সেই কঠিন দিনে উত্তীর্ণ হওয়া যায়।
বস্তুত এ ব্যাপারে ঈমানই হচ্ছে আসল চালিকা শক্তি। এই শক্তি যার হৃদয়-মনে জাগরূক, সক্রিয়, সে কখনই আল্লাহ্র আদেশ অমান্য করতে পারে না, লংঘন করতে পারে না আল্লাহ্র নিষেধকে। সে হবে প্রকৃত শরীয়ত অনুসারী ইসলামী সমাজের সৎ নাগরিক। আর এই ঈমানদার লোকেরাই ইহকাল পরকাল, উভয় ক্ষেত্রে, পরম সাফল্যের অধিকারী হবে।
يَايُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدً - يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ - وَ مَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا - ( الا حذاب : ۷۱ ৭০ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের আমলসমূহকে সংশোধিত করে দেবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। আর যে লোকই আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করল সে-ই পরম সাফল্য লাভে ধন্য হলো। -সূরা আহযাব: ৭০-৭১
এই জীবনের যাবতীয় কাজ কর্ম ঠিক ঠিক ভাবে সম্পন্ন হওয়া, গুনাহর মাগফিরাত লাভ এবং এই ঈমান সহকারেই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা হলেই ইহ ও পরকালে পরম সাফল্য লাভ সম্ভব। তা ছাড়া এর কোনোটিই অর্জিত হতে পারে না। এই ঈমান থাকলেই আল্লাহ্ ভয় হৃদয় মনে জেগে উঠবে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলা সম্ভব হবে। ঈমান না হলে এই সবকিছুই নিষ্ফল ও ব্যর্থ হতে বাধ্য।
يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَظِرِينَ إِنهُ وَ لكِنْ إِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوا ( الاحزاب : ٥٣ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নবীর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করবে না এবং খাওয়ার সময় হলেই সে ঘরে পৌঁছে যেয়ো না। তবে যদি খাবার খাওয়ার জন্য ডাকা হয়, তাহলে প্রবেশ করতে পার। -সূরা আহযাব: ৫৩
কারুর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা একটি সামাজিক অপরাধ বিশেষ। এতে কোনো ব্যক্তিরই নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষা পেতে পারে না। তাছাড়া এর ফলে নানা প্রকারের নৈতিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অপরাধ হওয়ারও আশংকা থাকে। এই কারণে প্রথমে নবীর ঘরে এবং পরে সব মুসলিম ব্যক্তির ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই নিষেধেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানই মানুষকে এই নিষেধ মেনে চলতে প্রস্তুত করে। যার ঈমান নেই, সে এই নিষেধ অমান্য করবে এবং আত্মীয় ও অনাত্মীয় কারুর ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে নানাবিধ অপরাধ সৃষ্টির কারণ বা সুযোগ ঘটাবে। কিন্তু ইসলামী সমাজে তা আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়।
বিনা অনুমতিতে কারও ঘরে প্রবেশ করা একটি সাধারণ অপরাধ। এই অপরাধ এড়িয়ে চলার জন্য সাধারণভাবে সব ঈমানদার ব্যক্তির প্রতিই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে একই ঘরের অভ্যন্তরে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য এ ব্যাপারে কিছুটা প্রশস্ততা ও স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। যদিও তার মধ্যেও বিশেষ বিশেষ সময় এমন, যখন এই স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ণ বা সংকীর্ণ করে সময় বেঁধে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাই ঈমানদার লোকদের বলা হয়েছে:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَثَ مَرَّت - مِنْ قَبْلِ صَلوةِ الْفَجْرِ وَ حِيْنَ تَضَعُوْنَ ثِيَبَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَ مِنْ بَعْدِ صَلوةِ الْعِشَاءِ - ثلث عَوْرَاتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَ لَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَ هُنَّ - ( النور : ٥٨ )
হে লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ! এ নির্দেশ অবশ্যই পালনীয় যে, তোমাদের মালিকানাধীন (ক্রীতদাস-দাসী) এবং পূর্ণ বয়স্কতা পায়নি তোমাদের এমন বাচ্চারা তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে যেন তোমাদের ঘরে প্রবেশ করে: তা হচ্ছে, ফজরের সালাতের পূর্বে, দ্বিপ্রহরে যখন তোমরা পরিধেয় বস্ত্র খুলে রাখ এবং এশার সালাতের পর। কেননা এই তিনটি হচ্ছে তোমাদের জন্য পর্দার সময়। এই সময় ছাড়া অন্যান্য সময় এরা বিনানুমতিতে তোমাদের ঘরে প্রবেশ করলে, না তোমাদের কোন গুনাহ্ হবে, না ওদের। -সূরা নূর: ৫৮
বস্তুত নারী-পুরুষ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই জীবনে কিছুটা নির্দিষ্ট স্থান থাকা আবশ্যক, যেখানে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পূর্ণ নির্বিঘ্নতায় জীবন কাটাতে পারবে এবং এজন্য এমন একটা নির্দিষ্ট সময় থাকাও একান্তই আবশ্যক, যখন সেখানে অন্য কারুরই ঢুকে পড়ার সুযোগ বা আশংকা থাকবে না। এই নিরাপত্তা প্রয়োজন যেমন ঘরের বাইরের লোকদের থেকে, তেমনি ঘরের লোকদের থেকেও। সাধারণত ঘরে যেসব দাস-দাসী বা চাকর-চাকরানী থাকে; কিংবা থাকে পূর্ণবয়স্ক ছেলে-মেয়ে, ভাই-বাপ, এদের থেকেও নির্জনতার নিশ্চয়তা থাকা আবশ্যক-বিশেষ করে মেয়েদের জন্য।
ঘরের দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী-এমনকি পূর্ণবয়স্ক হয়নি এমন বালক-বালিকার জন্য ঘরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যক্তির শয়ন কক্ষে প্রবেশের ব্যাপারে একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। অন্যথায় ব্যক্তিরা যেমন বিভিন্ন সময় অপ্রস্তুত বা বিব্রত হয়ে পড়তে পারে, তেমনি আকস্মিকভাবে নানা অদ্রষ্টব্য ব্যাপার দেখতে পেয়ে নৈতিকতার দিক দিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু তা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। এই কারণেই এই বিধান পেশ করা হয়েছে। এই বিধানেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমান যে কি কি ভাবে মানুষকে নৈতিক অপরাধ থেকে রক্ষা করে এই বিধান তার একটি প্রকৃষ্ট ও স্পষ্ট নিদর্শন।
ঘরের বালক-বালিকরাই ভবিষ্যৎ বংশধর, ভবিষ্যৎ সমাজের নাগরিক। তাদের আদর্শ চরিত্রের অধিকারী বানিয়ে তোলার ব্যবস্থাও অনুকূল পরিবেশসম্পন্ন ঘরের অভ্যন্তরেই হতে হবে। কেননা এখানেই যদি তারা চরিত্র হারানোর মত অবস্থায় পড়ে যায়, তাহ'লে তারা বড় হয়ে বড় মাত্রার অপরাধী হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর তা হলে অপরাধমুক্ত মানুষ ও সমাজ গড়া কোনক্রমেই সম্ভব হবে না। অথচ ঈমান অপরাধমুক্ত ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া বলিষ্ঠভাবে কার্যকর করার পক্ষপাতী। তাই ঈমানদার লোকদের প্রতি এই নির্দেশ পালন করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষেই একান্ত জরুরী।
এই পর্যায়ে সমস্ত ঈমানদার লোকের জন্য যে সাধারণ বিধান জারি করা হয়েছে তা এইঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدْخُلُواْ بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ -
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যদের ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা ঘরের লোকদের সহিত পরিচিত গড়ে তুলবে ও তাদের প্রতি সালাম করবে। এই নীতি তোমাদের জন্য অতীব উত্তম। আশা করা যায়, তোমরা এই নির্দেশের তাৎপর্য অনুধাবন করবে ও স্মরণে রাখবে।
-সূরা নূর: ২৭
বস্তুত ঘরের লোকদের সাথে পরিচিতি লাভ এবং তাদের সাথে একাত্মতা সৃষ্টি না করে হঠাৎ করে ভিতরে প্রবেশ করা আধুনিক পাশ্চাত্য ধর্মহীন সভ্যতার আওতায় নিষিদ্ধ না হলেও ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়। ইসলামে সামাজিক জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব হচ্ছে ব্যক্তির নিজস্ব স্বতন্ত্র নির্জনতার (Privacy) এবং নৈতিক চরিত্রের। এ দু'টি ক্ষুণ্ণ হতে পারে যে যে কাজে ও আচরণে ইসলামে তা শুধু অপছন্দ করা হয়েছে তা-ই নয়, শিষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধও হয়েছে। আলোচ্য আয়াতেও এই নিষেধের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানই মানুষকে লোকদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত নির্জনতা ক্ষুণ্ণ করা ও চরিত্র হননের সব কাজ থেকে বিরত রাখে।
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَن - وَ مَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَنِ فَإِنَّه يَاْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَ الْمُنْكَرَ - وَ لَوْلاً فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُه مَازَكَى مِنْكُمْ مَنْ أَحَدٍ أَبَدًا ولَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ - وَ اللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ -
হে সেসব লোক, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে চলো না। কেননা যে লোকই শয়তানের পদাংক অনুসরণের নীতি গ্রহণ করবে, শয়তান তো তাকে নির্লজ্জতা ও পাপ-অপরাধজনক কাজেরই আদেশ করবে। বস্তুত আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও দয়া-অনুকম্পা যদি তোমাদের প্রতি না থাকতো তা'হলে তোমাদের কোন একজন লোকও কখনো পবিত্র হতে পারতো না। বরং আল্লাহই যাকে চান পবিত্র পরিশুদ্ধ করেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। -সূরা নূর: ২১
ঈমানের পরিপন্থী যে কুফর, তারই অগ্রনেতা হচ্ছে শয়তান। ঈমান যেমন মানুষকে আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুগত বানায়, তেমনি কুফর বানায় শয়তানের অনুসারী। অতএব যারাই নিজেকে শয়তানের অনুসারীতে পরিণত করবে, তারাই শয়তানের নির্দেশ ও কু-পরামর্শ অনুযায়ী সকল প্রকার পাপ, পংকিলতা ও অপরাধজনক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হবে। এক কথায় বলা যায়, দুনিয়ায় যত পাপ, যুলুম, শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা ও নৈতিক বিচ্যুতি, পদস্খলনজনিত অপরাধ, তা সবই একমাত্র শয়তানের আনুগত্যের ফলশ্রুতির। একমাত্র ঈমানই মানুষকে এই অবাঞ্ছনীয় পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই ঈমানদার লোকদের প্রতি কুরআনের এই উদাত্ত আহ্বান।
এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারাই ঈমান গ্রহণ করবে, তারা কখনই ব্যভিচারের ন্যায় জঘন্য অপরাধ করতে পারে না। যদি কেউ সে অপরাধ করেই বসে, তা'হলে তার জন্য কুরআন-নির্দিষ্ট শাস্তি অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এই শাস্তি কার্যকর করা ও তা প্রত্যক্ষ করাও ঈমানদার লোকদেরই দায়িত্ব।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةٍ وَ لا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ - وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ -
(অবিবাহিত) ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী দু'জনের প্রত্যেককেই একশটি করে দোরা মার এবং দু'জনের প্রতি মহানুভবতা যেন আল্লাহ্র বিধান কার্যকর করার ব্যাপারে তোমাদের পেয়ে না বসে, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক এবং এই দু'জনকে দেয়া শাস্তি যেন ঈমানদার লোকদেরই কিছুসংখ্যক প্রত্যক্ষ করে। -সূরা নূর: ২
ব্যভিচারীকে শাস্তিদান আল্লাহ্র বিধান। এ বিধান বা আইন অবশ্যই কার্যকর হতে হবে। তার কার্যকরতার দু'টি দিক। একটি হলো: অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তার উপর ঘোষিত শাস্তিটা কার্যকর করা। আর দ্বিতীয়টি হলো: শাস্তিদানটা যেহেতু প্রকাশ্যভাবে অনুষ্ঠিত হতে হবে, এজন্য তা বহু লোকের সম্মুখে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং বহু লোকের উপস্থিত হয়ে তা প্রত্যক্ষ করা। কিন্তু এ দু'টি দিকই নির্ভর করে ঈমানের উপর। এ কারণে আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে শাস্তি কার্যকর করতে এবং তাতে কোনরূপ দয়া-সহানুভূতি যেন তার কার্যকরতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়, এই কারণে শর্ত দেওয়া হয়েছে এই বলে, যদি তোমরা ঈমানদার হও এবং দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, তা প্রত্যক্ষ করবে ঈমানদার লোকেরাই। কেননা এ শাস্তিটা শিক্ষাপ্রদ। কেবলমাত্র ঈমানদার লোকেরাই তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
বস্তুত ঈমানই হচ্ছে সর্বপ্রকার অপরাধ প্রতিরোধক, অপরাধ হলে তার নির্দিষ্ট শাস্তির বিধায়ক। ঈমান না হলে এর কোনটাই বাস্তবায়িত হতে পারে না। আর ঈমান থাকলে প্রথমত অপরাধই হবে না। অপরাধ হলেও তার শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর হবে। ফলে তা প্রত্যক্ষকারী জনতা কখনই অনুরূপ অপরাধ করতে সাহসী হবে না। এরই প্রভাবে গোটা পরিবেশ ব্যভিচার তথা অপরাধ-বিরোধী হয়ে উঠবে। অপরাধ প্রতিরোধে এরূপ কার্যকর শক্তি দ্বিতীয় কিছুই নেই, হতে পারে না।
এই ঈমানের ভিত্তিতেই মদ্যপান, জুয়া খেলা ইত্যাদি অপরাধ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَ الْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ -
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَ عَنِ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ -
হে ঈমানদার লোকেরা, চূড়ান্তভাবে জেনে নেবে, যাবতীয় মাদকদ্রব্য, জুয়া, অ-খোদার উদ্দেশে বলিদানের স্থানসমূহ এবং ভাগ্য জানার পন্থাসমূহ শয়তানী কাজের জঘন্য মলিনতা মাত্র। অতএব তোমরা সকলে তা পরিহার কর। আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে। এর পেছনে মূল ব্যাপার হ'ল, এই মাদক ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি করতে চায় এবং চায় তোমাদেরকে সালাত ও আল্লাহ্ যিক্র থেকে বিরত রাখতে। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য, তোমরা এসব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে?
-সূরা মায়িদা : ৯০-৯১
সর্বপ্রকারের মাদক ও জুয়া এবং শিরকের কার্যাবলী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া পর্যায়ে এ আয়াতে চূড়ান্ত কথা ঘোষিত হয়েছে, হয়েছে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে। তার অর্থ-যার মধ্যে ঈমান রয়েছে, সে কখনই এ সব কাজ এবং এর মধ্যে কোন একটিও করতে পারেন না। ঈমানই মানুষকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখে। আর এ সবকয়টি কাজই যেহেতু যাবতীয় অন্যায়, পাপ ও অপরাধের মৌল উৎস; তাই যে লোক এ সব কাজ থেকে বিরত থাকবে, খুবই আশা করা যায়, সে অন্যান্য সকল প্রকার অন্যায়, পাপ ও অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। কুরআন ঈমানের হাতিয়ার দিয়ে বাকি পাপ ও অপরাধের প্রতিরোধ করতেও ইচ্ছুক। অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনও এই ঈমানের দ্বারাই সম্ভব। কুরআনের এই ইচ্ছা যে নিঃসন্দেহে যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক, একদিকে তদানীন্তন মদীনার সমাজ ও অন্যদিকে একালের পাশ্চাত্য সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে পারে।
এ ঈমানই মানুষকে সকল প্রকার উত্তম উপাদেয় পবিত্র খাদ্য গ্রহণে এবং মৃত জীব, রক্ত, শূকর এবং আল্লাহ্ নামে জবেহ করা হয়নি এমন সব জন্তুর গোস্ত খাওয়া বর্জন করে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ এই শেষোক্ত জিনিসগুলি অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও হীন চরিত্র সৃষ্টিকারী খাদ্য। খাদ্যবস্তু যে মানুষের চরিত্রে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে-ভাল, উৎকৃষ্ট পবিত্র খাদ্য পবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্র সৃষ্টি করে এবং নিকৃষ্ট ও জঘন্য খাদ্য মানুষের চরিত্রকে পংকিল করে দেয়, কুরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গী আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেও যথার্থ বলে প্রমাণিত করেছে। অপরাধমুক্ত ব্যক্তি ও সামজ গঠনে নিকৃষ্ট জঘন্য খাদ্য পানীয় থেকে সমাজকে মুক্ত করা এবং ভালো, উপাদেয় ও উত্তম-উৎকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণে মানুষকে আগ্রহী বানানো একান্তই কর্তব্য। আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানও এ তত্ত্বকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে। তাই কুরআন মজীদে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে:
يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَكُمْ وَاشْكُرُو اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ -
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَ الدَّمَ وَ لَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَ مَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ -
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা খাও আমার দেয়া উৎকৃষ্ট-পবিত্র খাদ্যসমূহ এবং তোমরা আল্লাহর শোকর কর যদি তোমরা কেবল তাঁরই বন্দেগীতে রত হয়েই থাক। তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন শুধুমাত্র মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারুর নামে বলি দেয়া জন্তুর মাংস। -সূরা বাকারা : ১৭২-১৭৩
এ আয়াতে ঈমানদার লোকদের প্রতি একদিকে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর এবং আল্লাহ্র নামে নয়-অন্য কারুর নামে বলি দেয়া জন্তুর মাংস খাওয়া হারাম করে দেয়া হয়েছে। অপর দিকে আল্লাহ্ দেয়া উৎকৃষ্ট পবিত্র খাদ্যসমূহ খাওয়ার অনুমতি ঘোষিত হয়েছে। এই নিষেধ এবং অনুমতি, অন্য কথায় হালাল ও হারাম নির্ধারণের এই ঘোষণাটি উপস্থাপিত করা হয়েছে ঈমানের উপর ভিত্তি করে। ফলে যাদের ঈমান আছে, তারা আল্লাহ্র নিকট থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত খাদ্যসমূহকে হালাল মনে করে নিতে এবং যে সব দ্রব্য খেতে নিষেধ করা হয়েছে তাকে হারাম মেনে নিয়ে সম্পূর্ণ পরিহার করে চলতে একবিন্দু দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করতে পারে না।