📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 সংশয়মুক্ত ঈমান

📄 সংশয়মুক্ত ঈমান


সংশয়মুক্ত ঈমানই ইসলামে কাম্য; বরং সত্যি কথা, সংশয়হীন বিশ্বাসই ইসলামে ঈমান নামে পরিচিত ও অভিহিত। যে ঈমান সংশয়মুক্ত নয়, তা মানুষকে প্রকৃত মু'মিন বানায় না। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَ جَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ - أُولئِكَ هُمُ الصَّدِقُونَ - ( الحجرات - ١٥ )
প্রকৃত মু'মিন তারাই যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। অতঃপর কোনরূপ সংশয়াচ্ছন্ন হয়নি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তাদের জান-মাল দিয়ে। তারাই সত্যিকার ঈমানদার।
আয়াতের প্রথম অংশ থেকে ঈমানের সংশয়মুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশিত হয়েছে। মাঝখানের অংশে ঈমানের অনিবার্য ফলশ্রুতি আমল বাস্তব কাজের অর্থাৎ দীন কায়েমের জন্য জিহাদ করার উল্লেখ হয়েছে এবং শেষ অংশে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমানের সাথে বাস্তব কাজের সমন্বয়কে প্রকৃত সত্য ঈমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে ঈমান গ্রহণের বিন্যাস হচ্ছে-প্রথমে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তারপর তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। এবং এই ঈমানের সত্যতা প্রমাণকারী হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে নিজেদের জান-মাল বিনিয়োগ সহকারে আল্লাহর পথে আল্লাহ্ দীন কায়েমের লক্ষ্যে জিহাদ করাকে। এই ঈমান ও ঈমান অনুযায়ী আমল-এর সমন্বিত রূপকেই সত্য ঈমানের প্রতীক রূপে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ঈমান-ই যথেষ্ট নয়, সত্য ঈমান নয়। ঈমান অনুযায়ী কাজ শেষে সে ঈমানের সত্যতা প্রমাণিত হলেই সে ঈমানকে ঈমান বলে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঈমানের সত্যতার প্রমাণ স্বরূপ তদনুযায়ী আমল করার পূর্বে ঈমানের অস্তিত্ব হওয়ার অপরিহার্যতাকেও এখানে স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। আর এই কারণেই কুরআনে যেখানেই ঈমানের কথা বলা হয়েছে, সেখানেই বলা হয়েছে আমলে সালেহ্ )عمل صالح( নেক আমলের কথা। এ প্রেক্ষিতে নেক আমল তা-ই যা ঈমানের দাবি অনুযায়ী ঈমানের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্য রক্ষা করে করা হবে। যেমন বলা হয়েছে:
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَ الَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ -
যারা ঈমান এনেছে তারা যুদ্ধ করে আল্লাহ্র পথে এবং যারা কুফরী গ্রহণ করেছে তারা যুদ্ধ করে তাগূতের পথে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 ঈমান ও কুফর

📄 ঈমান ও কুফর


এ আয়াতে ‘ঈমান’ ও ‘কুফর’-এ দুইটির অনিবার্য পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'টিই মূলত মন-মানসিকতার ব্যাপার। এই মন-মানসিকতায় হয় আল্লাহ্ রাসূল ও পরকালের সত্যতার প্রতি বিশ্বাস থাকবে, অথবা থাকবে অবিশ্বাস। বিশ্বাস থাকলে তার অনিবার্য ফলশ্রুতি হচ্ছে আল্লাহ্র পথে সশস্ত্র যুদ্ধে অগ্রসর হওয়া আল্লাহর দীনের বিজয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। পক্ষান্তরে সে মন-মানসিকতায় আল্লাহ্র রাসূল ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে অনিবার্যভাবে থাকবে অবিশ্বাস। এই অবিশ্বাসই তাকে আল্লাহ্র নির্দেশ বিরোধী কার্যকলাপে উৎসাহিত করবে, নেমে পড়তে বাধ্য করবে। আর আল্লাহ্র আদেশ বিরোধী কার্যকলাপের মধ্যে চূড়ান্ত হচ্ছে আল্লাহ্ দীন নির্মূল করে আল্লাহদ্রোহী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা কল্পে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। উভয় ক্ষেত্রেই সশস্ত্র যুদ্ধের (কিতাল) কথা বলা হয়েছে। আর সশস্ত্র যুদ্ধ হচ্ছে চরম পর্যায়ের আত্মত্যাগ। এই আত্মত্যাগে প্রস্তুত হওয়া নির্ভর করে বিশ্বাসের বলিষ্ঠতার উপর।
বিশ্বাসের এই চরম বলিষ্ঠতা না থাকলে কারো পক্ষেই এই চরম মাত্রার আত্মত্যাগে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব হয় না। আর কি আল্লাহর পথে, কি তাগূতের পথে-উভয় ক্ষেত্রেরই অনিবার্য দাবি হচ্ছে এই চরম মাত্রার আত্মত্যাগের। এই চরম মাত্রার আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পূর্বে একটা প্রস্তুতি-পর্যায় অবশ্যই অতিক্রম করতে হবে। কেননা হঠাৎ করে কারো পক্ষেই সচেতনভাবে এই চরম মাত্রার আত্মত্যাগে রাযি হওয়া সম্ভব হয় না। এই প্রস্তুতি-পর্ব হচ্ছে, যে লোক কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, সে তার মন-মেজাজ ও যাবতীয় তৎপরতা সেই অনুরূপই গড়ে তুলবে। আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি চরম মাত্রার শত্রুতা মনের মধ্যে স্থান দেবে। আল্লাহ্ বিধানকে অগ্রাহ্য করবে, তাঁর অস্তিত্বেও বরদাস্ত করতে রাযি হবে না। পক্ষান্তরে যে লোক আল্লাহ্র প্রতি, রাসূলের প্রতি এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনবে সে হবে আল্লাহ্ ও রাসূলের একনিষ্ঠ অনুগত। আল্লাহ্র প্রদত্ত ও রাসূলের উপস্থাপিত বিধানকে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে পালনকারী হবে সে। সে আল্লাহ্র বিধান কোনক্রমেই বিন্দুমাত্রও অগ্রাহ্য করবে না; কেউ অগ্রাহ্য করুক তাও সে বরদাস্ত করতে রাযি হবে না। সে বিধানে যা হালাল তাকেই সে হালাল মেনে নেবে। কেউ তাকে হারাম বললে তা সে মানতে রাযি হবে না কিছুতেই। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা সে নিজে তো করবেই না-করতে কোনোক্রমে রাযিও হবে না; উপরন্তু অপর কেউ সেই হারাম কাজ করুক-তাও সে মুহূর্তের জন্য বরদাস্ত করবে না।
এভাবে তার চিন্তা-চেতনা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহত্ময় হয়ে গড়ে উঠবে। কেবলমাত্র আল্লাহ্ বিধানই বাস্তবায়িত হোক, তার বিপরীত কোন বিধান সমাজে এক বিন্দু স্থান না পাক, আল্লাহর বিধানের প্রতি বিশ্বাসী ও তার ঐকান্তিক অনুসারীরাই সমাজে নেতৃত্বে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কর্তৃত্বের আসনে আসীন হোক, রাষ্ট্র ক্ষমতা তাদেরই করায়ত্ত হোক যেন সর্বত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব পুরাপুরি বাস্তবায়িত হতে পারে-এ-ই হবে তার অন্তরের ঐকান্তিক বাসনা ও কামনা এবং এই তাকীদেই সে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো চরম মাত্রার আত্মত্যাগে সচেতনভাবে রাযি হতে পারে।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 ঈমান ও আমল

📄 ঈমান ও আমল


মোটকথা, ঈমানের পরে পরেই এবং সাথে সাথেই তদনুযায়ী আমল একান্তই জরুরী। অন্যথায় ঈমানের যথার্থতাই অপ্রমাণিত থেকে যায়। আর ঈমান অনুযায়ী আমল হচ্ছে, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং সেইসব কাজ করা, যা তিনি ফরয বা কর্তব্যরূপে ঘোষণা করেছেন। এই আমল-ই ঈমানদারকে প্রকৃত মু'মিন বানিয়ে দেয়। কুরআন মজীদের বহুসংখ্যক আয়াতেই এই কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বলা হয়েছে। এখানে এই পর্যায়ের কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা যাচ্ছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَى اللهِ وَرَسُولِهِ وَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٍ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالَكُمْ وَ انْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ - ( الحجرات - ١ - ٢ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অগ্রে চলে যেও না। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মু'মিনেরা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপরে তোমাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর অধিকতর উচ্চ করবে না এবং তোমরা পরস্পর যেভাবে জোরে জোরে কথা বলো, নবীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সেরূপ জোরে বলো না। কেননা তোমাদের অজ্ঞাতসারেই তোমাদের সব নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে।
দু'টি আয়াতেই ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে কথা বলা হয়েছে। সে কথা হচ্ছে-তিনটি কাজের নিষেধ ও একটি কাজের আদেশ। আল্লাহ্ ও রাসূলের অগ্রে যেতে, রাসূলের কণ্ঠস্বরের তুলনায় স্বীয় কণ্ঠস্বর উচ্চ করতে এবং রাসূলের সাথে জোরে জোরে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে' এবং আদেশ করা হয়েছে আল্লাহকে ভয় করতে। এ আদেশ ও নিষেধ কাজ বিশেষ। এ কাজের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এ ঈমান যাদের আছে, তাদেরকেই কাজের আদেশ করা হয়েছে এবং কয়েকটি কাজ করতে তাদেরই নিষেধ করা হয়েছে।
অতএব যাদের ঈমান আছে, তারা অবশ্যই এ আদেশ ও নিষেধ মান্য করবে। আর যাদের ঈমান নেই, তারা এ আদেশ-নিষেধকে গ্রাহ্য মাত্রও করবে না। তা হলে ঈমান-ই আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ পালনের মূলে আসল প্রাণশক্তি। ইসলাম মানুষের মধ্যে এই প্রাণশক্তিকেই জাগিয়ে দিতে চায় সর্বপ্রথম। তা'হলেই আল্লাহ্র আদেশ- নিষেধ বাস্তবায়িত হবে, বাস্তবে অনুসৃত হবে বলে আশা করা যায়। এই ঈমানের ভিত্তিতেই এসেছে আল্লাহ্ যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ। একটি আয়াত:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ (البقرة - ১০৮ )
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে পূর্ণ মাত্রায় প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। কেননা সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।
দ্বিতীয় আয়াত:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَسِرِينَ - ( ال عمران - ১৪৯ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা যদি কাফির লোকদের আনুগত্য ও অনুসরণ কর, তাহলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের অতীতের (সেই জাহিলিয়াতের) যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আর তাহলে তোমরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

টিকাঃ
১. এই কথাটির অর্থ অনেক ব্যাপক। তন্মধ্যে এগুলো রয়েছে: আল্লাহ্ ও রাসূলকে কোন বিষয়ে প্রস্তাব দিও না-এই কাজ করুন বলে। কোন বিষয়ে আল্লাহ্ ও রাসূলের বলার পূর্বে তোমরা কিছু বলো না। আল্লাহ্ ও রাসূল যা বলেন নি, তোমরা তা বলো না। আল্লাহ্ ও রাসূল যে কথা যতটুকু বলেছেন, তোমরা তার উপর বাড়িয়ে কিছু বলো না-এই সব অর্থই হতে পারে। হযরত ইবনে আরকাম বলেছেন : لا تقولوا خلاف الكتاب والسنة "কুরআন ও সুন্নাতের বিরুদ্ধে কিছু বলো না।"

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম > 📄 ঈমান ও রাষ্ট্র

📄 ঈমান ও রাষ্ট্র


পূর্বোল্লিখিত আয়াতে ঈমানদার লোকদিগকে কাফিরদের অনুসরণ ও আনুগত্য গ্রহণ করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে এবং পুরোপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ করার ও ইসলাম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বস্তুত যাদের অন্তরে ঈমানের অস্তিত্ব বিদ্যমান, তারা এ নিষেধ অমান্য ও এই আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারে না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَ كُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَدِمِينَ - ( الحجرات - ٦ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের নিকট কোন কাফির ব্যক্তি যদি কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তার সত্যাসত্য যাচাই কর, যেন মূর্খতা বা অজ্ঞতাবশত কোনো জনসমষ্টির উপর বিপদ টেনে না আন। তা'হলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।
আয়াতের সম্বোধন সেসব ঈমানদার লোকদের প্রতি, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এই নির্দেশ অনুযায়ী তারা সর্বপ্রকারের সংবাদাদির উৎসের যথার্থতা সন্ধান করতে বাধ্য। যে রাষ্ট্র পরিচালকগণ ঈমানদার তারা এই আদেশ পালনে বাধ্য। তাদের ঈমানের তাকীদেই তারা তা করবে। এর বিপরীত কিছু করতে তারা প্রস্তুত হবে না তাদের ঈমানেরই কারণে। অন্যথায় তারা এমন কাজ করে বসতে পারে যার দরুন তারা লজ্জিত বা দুঃখিত হবে।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مَنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَ لَا نِسَاءٌ مِّمْ نِّسَاءِ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَ لَا تُلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ - ( الحجرات - ١١ )
হে ঈমানদারগণ, কোন জনগোষ্ঠী যেন অপর কোন জনগোষ্ঠীকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে। অসম্ভব নয় যে, তারা তাদের তুলনায় অনেক উত্তম হবে। অনুরূপভাবে কোন মেয়েলোক যেন অপর মেয়েলোকদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে; অসম্ভব নয় যে, তারা এদের অপেক্ষা অনেক ভালো হবে এবং তোমরা পরস্পরকে নানাবিধ খারাপ উপাধি দিয়ে সম্বোধন করবে না।
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের দৃষ্টিতে এ আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে যে সব কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে তা কোন ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষেই করা সম্ভব নয়। বস্তুত যার মধ্যে প্রকৃত ঈমান রয়েছে, সে এর কোন একটি কাজও করতে পারে না। ঈমানই তাকে এই নিষিদ্ধ কাজগুলি করতে বাধা দেবে, এ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, একে এই কারণেই ঈমানের অবদান বলতে হবে। আয়াতের নিষিদ্ধ কাজগুলি সমাজে কত যে অশান্তি এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহের সৃষ্টি করতে পারে, তা সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারেন না। আয়াত অনুযায়ী সেই অশান্তি ও বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার মৌলিক উপায় হচ্ছে সত্যিকারের ঈমান। ঈমান থাকলেই তা থেকে বাঁচা সম্ভব হবে।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا - أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللهَ - ( الحجرات - ۱۲ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা বহু সংখ্যক খারাপ ধারণা পরিহার করে চলো। কেননা কোনো কোনো ধারণা গুনাহ্। আর তোমরা লোকদের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না এবং তোমরা পরস্পরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাই'র গোস্ত ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? অতঃপর তোমরা তা ঘৃণাই করলে!
এ আয়াতে কিছু কিছু অমূলক খারাপ ধারণা পোষণ, পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং পরস্পরের গীবত-দোষ গেয়ে বেড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এই নিষিদ্ধ ঘোষণা ঈমানদার লোকদের প্রতি। কেননা এই কাজগুলি ঈমানের পরিপন্থী। বস্তুত যার ঈমান আছে, সে কখনই এই নিষিদ্ধ কাজগুলি করতে পারে না। ঈমানই তাকে এই সব সমাজ-বিরোধী ও সাধারণভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখে। এখানেও ঈমানের ভূমিকাই প্রবল এবং এসব সমাজ-বিধ্বংসী কার্যাবলী থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ঈমান। ঈমানের তাকীদেই এসব কাজ থেকে মানুষ স্বতঃই বিরত থাকবে।
বস্তুত নবী প্রেরণও হয়েছে লোকদের মধ্যে ঈমান সৃষ্টির লক্ষ্যে। আল্লাহর বাণী :
إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَاهِدًا وَ مُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لِتُؤْمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَ تُوَقِّرُوهُ وَ تُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَ اصيلاً - ( الفتح - ٨ - ٩ )
হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শকরূপে, যেন তোমরা-হে জনগণ, ঈমান গ্রহণ কর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং যেন তোমরা তাঁর সাহায্য করো, তাঁকে অন্তর দিয়ে সম্মান করো এবং সকাল ও সন্ধ্যায় যেন তোমরা তাঁর তস্বীহ কর।
আয়াতটিতে রাসূল পাঠাবার মূল উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে এবং তা হচ্ছে 'যেন তোমরা ঈমান গ্রহণ কর'। তাই রাসূলের সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে ঈমান গ্রহণের জন্য লোকদের দাওয়াত দেওয়া। কেননা রাসূলের রিসালতের দায়িত্ব পালন, আল্লাহ্র দীনের বিজয় সাধন, আল্লাহকে অন্তর দিয়ে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভয় করা এবং সকাল-সন্ধ্যা কেবল তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করা-যা মানুষকে সৃষ্টি করার মূল লক্ষ্য, তার বাস্তবায়নে প্রস্তুত করবে, সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে এই ঈমান গ্রহণ করার উপর মানুষ ঈমান গ্রহণ করলেই আল্লাহ্র প্রতি ভয় ও সম্ভ্রমবোধ জাগবে, তারই তাকীদে মানুষ আল্লাহ্ সেই সব কাজ সম্পাদনে ও আল্লাহর সাহায্যে সর্বান্তঃকরণে এগিয়ে আসবে, যেসব কাজ আল্লাহ্ নিজে না করে তা করার দায়িত্ব মানুষের উপর অর্পণ করেছেন, সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা ও ঘোষণা করবে। আর তাতেই রাসূলে করীমের আগমনের সার্থকতা ও সাফল্য নিহিত। এগুলিই হচ্ছে ঈমানের ফলশ্রুতি, যা কেবলমাত্র ঈমানদার লোকদের কাছেই আশা করা যায়। বেঈমান-কাফির লোকেরা তো উক্ত কাজগুলির মধ্যে কোন একটিও করবে না, তাদের প্রতি সেই আশাও পোষণ করা যায় না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَالَا تَفْعَلُونَ - كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَالَا تَفْعَلُونَ - ( الصف - ٢ - ٣ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মুখে কেন বল তা, যা তোমরা কার্যত কর না? আল্লাহ্র নিকট তা অতি বড় অপরাধ-অসন্তুষ্টির কারণ যে, তোমরা যা কার্যত কর না তাই বলবে।
মুখে একটা বলা, কিন্তু কাজে তা না করা কিংবা তার বিপরীত কাজ করাকে কুরআনী পরিভাষায় নিফাক্ বা মুনাফিকী বলা হয়। এই মুনাফিকী কার্যকলাপেরই প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে উপরোক্ত আয়াতে। এই পর্যায়ে অত্যন্ত তীব্র ও অকাট্য ভাষায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং তা বলা হয়েছে, 'হে ঈমানদার লোকেরা' এই সম্বোধন করে। তার অর্থ, ঈমানদার লোকের কাজ এ নয় যে মুখে বলা এক, কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা স্পষ্টত ঈমানের পরিপন্থী, ঈমানদার লোক কখনো এইরূপ কাজ করতে পারে না। যার প্রকৃত ঈমান রয়েছে তার কাছে এইরূপ আচরণের আশা করা যায় না। যার ঈমান নেই, তার নিকট এই নীতি-মুখে যা বলা কাজে তা না করা, কোনো দোষের ব্যাপার নয়। এতে সে কোনো দোষই মনে করবে না। কিন্তু যার অন্তরে প্রকৃত ঈমান রয়েছে সে তো এই নীতি কখনো অবলম্বন করবে না। শুধু তা-ই নয়, এই নীতি-যেখানেই অবলম্বিত হতে দেখবে সেখানেই সে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে। এটাই স্বাভাবিক। বস্তুত কেবলমাত্র ঈমানই মানুষকে এই দ্বৈত চরিত্র থেকে দূরে রাখতে পারে।
এ ঈমানই হচ্ছে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কার্যকারিতার একমাত্র ভিত্তি। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুগত্যই হচ্ছে মূল কথা। আনুগত্য ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্র কোনটিই গড়ে উঠতে বা গড়ে উঠে চলতে পারে না। কিন্তু এই পর্যায়ে মৌলিক প্রশ্ন, মানুষ আনুগত্য করবে কার? যারই আনুগত্য করতে মানুষকে বলা হবে, সেখানে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন উঠবে-মানুষ কেন তার আনুগত্য করবে? আনুগত্য পাওয়ার তার কি অধিকার আছে? মানুষ যারই আনুগত্য করবে, তা কি শর্তহীন হবে, না শর্তভিত্তিক? মানুষের শর্তহীন আনুগত্য পাওয়ার বা তার দাবি করার কোন অধিকার কোন মানুষের থাকতে পারে না। এই শর্তহীন আনুগত্য মানুষ করতে বাধ্য কেবল মাত্র বিশ্বস্রষ্টা ও পরিচালক নিয়ন্ত্রক আল্লাহর-অন্য কারোরই নয়।
কিন্তু সমাজে সাধারণত লক্ষ্য করা যায় কিছু সংখ্যক লোক মানুষের মধ্য থেকেই বেরিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দখল করে এবং সাধারণ মানুষের নিরংকুশ ও শর্তহীন আনুগত্য লাভ করতে চায়। এ আনুগত্য না পেলে তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার ও নিপীড়ন চালাতে এক বিন্দু কুণ্ঠিত হয় না। ফলে এই অসহায় জনগণ ভয়ে ও আতংকে তাদের নিরংকুশ ও শর্তহীন আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অথচ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার এবং তাঁরই অনুমতি ও আদেশক্রমে আল্লাহ্র রাসূলের। রাসূলের অনুপস্থিতি বা অবর্তমানে এই আনুগত্য পেতে পারেন সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালকরা-এই শর্তের অধীন যে, তাঁরা নিজেরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করে চলবেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন নিজেদের ইচ্ছামত আইন রচনা করে নয়, আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন ও বিধানের ভিত্তিতে। অন্যথায় এই আনুগত্য পাওয়ার তাদের কোন অধিকার স্বীকৃতব্য নয়। এই কথাই বলা হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُو الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ - فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَ الرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ – ذلِكَ خَيْرٌ و احْسَنُ تَأْوِيلاً - ( النساء - ٥٩ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার 'সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন লোকদের'ও। অতঃপর তোমরা যদি পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে তার চূড়ান্ত মীমাংসার ব্যাপারটি প্রত্যার্পিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট-যদি তোমরা ঈমানদার হও আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি। এই নীতিই সর্বোত্তম এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বাধিক কল্যাণকর। -সূরা নিসা: ৫৯
এ আয়াতে সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল আনুগত্যের কথা বলার সাথে সাথে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সুবিচার লাভের পন্থাও নির্দেশ করা হয়েছে এবং সেজন্য শর্ত করা হয়েছে ঈমানের-ঈমান আল্লাহ্র প্রতি, ঈমান পরকালের প্রতি। কেননা আল্লাহ্র বিধান কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহভিত্তিক সুবিচার পাওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে এই ঈমান। এ ঈমানই আল্লাহ্ ও রাসূলকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের নেতৃত্বভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রকে এবং তাঁর জারি করা আল্লাহ্ ও রাসূলের আইন বিধান মেনে চলতে মানুষকে প্রস্তুত করে। নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে এই কথাই বলা হয়েছে একটু ভিন্নতর ভঙ্গীতে:
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَ أَطَعْنَا - وَ أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ - ( النور - ٥١ )
ঈমানদার লোকদের যখন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান জানানো হয়, তাদের পারস্পরিক ব্যাপারে ফয়সালা দানের ও প্রশাসন চালানোর উদ্দেশ্যে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠে: আমরা শুনলাম ও মানলাম। আর বস্তুত এরাই সফলকাম লোক। [ 'শুনলাম ও মানলাম' অর্থ আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের যে কোন নির্দেশ মেনে চলতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলাম। ] -সূরা নূর: ৫১
অর্থাৎ ঈমানদার লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন বিনাশর্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানতে রাযি হয়। পক্ষান্তরে যে বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক নয়, তা তারা মানতে কোনক্রমেই প্রস্তুত হতে পারে না।
ফলত যারা নিজেরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য করতে প্রস্তুত নয়, প্রস্তুত নয় আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করতে ও প্রশাসন চালাতে, তারা বাস্তবে আল্লাহ্ ও রাসূলের বিদ্রোহী, কার্যত আল্লাহ্র দীন, কুরআন ও সুন্নাহ্ অপমানকারী। তারা মুখে মুসলিম হওয়ার যত দাবিই করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের ও কাফিরদের মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। এই শ্রেণীর লোকদেরকে নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে দেওয়া কোন ঈমানদার লোকেরই কাজ হতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, তাদেরকে সমাজনেতা ও রাষ্ট্রকর্তারূপে মেনে নিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَ لَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبِ مِنْ قَبْلِكُمْ وَ الْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ - وَ اتَّقُوا اللهَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ - ( المائده - ٥٧ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের পূর্বে কিতাবপ্রাপ্ত লোকদের মধ্য থেকে যারাই তোমাদের দীনকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকারে ও খেলার বস্তুতে পরিণত করে এবং যারা কাফির তাদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্রনেতা বা বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তোমরা যদি প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক, তা'হলে আল্লাহকে ভয় করেই উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকবে। -সূরা মায়িদা: ৫৭
এই অকাট্য ও সুস্পষ্ট নির্দেশের পর উক্তরূপ লোকদের নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব মেনে নেওয়া কোন ঈমানদার ব্যক্তিরই কাজ হতে পারে না। উক্ত ধরনের লোক যদি ক্ষমতাসীন হয়ে ঈমানদার লোকদের নিকট আনুগত্যের দাবি করে, তাহলে তাদের আনুগত্য করা তো দূরের কথা, তাদের উৎখাত করতে এবং তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমানদার ও অনুগত লোকদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো ঈমানদার লোক মাত্রেরই কর্তব্য। কুরআনের পরিভাষায় এই প্রচেষ্টারই নাম হচ্ছে জিহাদ।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابِ الِيْمٍ - تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَ رَسُوْلِهِ وَ تُجَاهِدُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَ انْفُسِكُمْ - ذلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - ( الصف : ۱۰ - ۱۱ )
হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের কি এমন এক ব্যবসায়ের পথ দেখাব যা তোমাদের পীড়াদায়ক আযাব থেকে মুক্তি দেবে? তা হচ্ছে তোমরা ঈমান আনবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে তোমাদের জান-মাল সহকারে। -সূরা সাফ : ১০-১১
পরকালীন আযাব থেকে মুক্তি লাভের জন্য যে পথ এ আয়াতে প্রদর্শিত হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং আল্লাহর পথে জান-মাল নিয়ে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া। এ কথাটি বলা হয়েছে ঈমানদার লোকদের সম্বোধন করে। তার অর্থ, এই কাজটি তারাই করবে-করতে পারবে বলে আশা করা যায়, যাদের ঈমান আছে। যাদের ঈমান নেই-যারা কাফির তারা নিশ্চয়ই এই কাজটি করবে না। আর যে কাজটির কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনে আল্লাহর পথে জিহাদ করা। তার অর্থ, ঈমানদার লোকেরা যখন নিজেদের জান-মালসহ জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে, ঠিক সেই সময়-সেই মুহূর্তেও তাদের ঈমানদার থাকতে হবে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি। যদি তা না থাকে, তা'হলে তাদের এই ধন-মাল ও জান-প্রাণের কুরবানী নিরর্থক ও নিষ্ফল হয়ে যাবে। তা আল্লাহ্র নিকট গৃহীতও হবে না, তার সওয়াবও পরকালে কিছুই পাওয়া যাবে না। ঈমান যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। পরে বলা হয়েছে:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنْصَارَ اللهِ - ( الصف - ١٤ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহ্ (দীনের) সাহায্যকারী হও। -সূরা সাফ : ১৪
আল্লাহর দীনের বিজয়ে অংশগ্রহণ যেমন ঈমানের তাকীদে, তেমনি আল্লাহ্ সাহায্যকারী হওয়াও ঈমানেরই তাকীদে সম্ভবপর। ঈমান না থাকলে আল্লাহ্ সাহায্যকারী হওয়ার সুযোগ কেউ পাবে না। অথচ আল্লাহ্র সাহায্যকারী হওয়া মানুষের জন্য খুব বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوّى وَ عَدُوِّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوا بمَا جَاءَ كُمْ مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُوْلَ وَ إِيَّا كُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে এমন বন্ধু (বা পৃষ্ঠপোষক) -রূপে গ্রহণ কর না যে, তাদের প্রতি বন্ধুত্ব পোষণ করে তাদের নিকট গোপন কথা বলে দেবে। অথচ ওরা তোমাদের নিকট আগত মহাসত্যকে অমান্য ও অগ্রাহ্য করেছে। ওরা রাসূল এবং তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করে শুধু এই অপরাধে যে, তোমরা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনেছ। -সূরা মুমতাহীনা: ১
এ আয়াতে শত্রুদের প্রতি বন্ধুত্ব পোষণ করতে এবং তাদের নিকট গোপন তথ্য ফাঁস করে দিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। আর শত্রুদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের কার্যাবলীর দৃষ্টিতে। সে কার্যাবলীর মধ্যে প্রথম, তারা আল্লাহ্র নিকট থেকে আসা সত্য দীনকে অমান্য ও অগ্রাহ্য করেছে এবং দ্বিতীয়, 'তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ-শুধু এই অপরাধে তারা রাসূল এবং তোমাদের-ঈমানদার লোকদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে।' যদিও হিজরতের পরে মক্কার লোকদের এই অপরাধের কারণে তাদের আল্লাহ্ ও ঈমানদার লোকদের শত্রু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ করে তাদের নিকট গোপন তথ্য ফাঁস করতে নিষেধ করা হয়েছে; কিন্তু এ একটি চিরন্তন বিধান। সর্বকালের মু'মিনরাই এ বিধান মেনে চলতে বাধ্য। কেননা এ বিধানের ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমানের কারণেই কাফিররা মু'মিনদের প্রতি শত্রুতা করে চিরকাল। তাই সেই ঈমানের ভিত্তিতেই তাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে গ্রহণ না করতে। বস্তুত ওরা যেমন কুফরী অবলম্বনের দরুন ঈমানকে বরদাস্ত করতে রাযি নয়, ঈমানদার লোকদের সাথে চরম শত্রুতা করতে কিছুমাত্র পিছপা নয়, তেমনি ঈমানদার লোকেরা এই ঈমানের কারণেই ওদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারে না। কেননা ঈমান চিরকালই কুফরীর বিপরীত। ঈমান ও কুফরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা চিরন্তন। এই দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা অনিবার্য, একান্ত অপরিহার্যও। এই দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা যেদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে, সেদিন ঈমানের নাম চিহ্নও থাকবে না। কিন্তু তা কোনক্রমেই সত্য হতে পারে না। তাই ঈমানকে তার স্বমর্যাদায় চিরকালই ভাস্বর ও সক্রিয় হয়ে থাকতে হবে। আর এই ঈমানের ভাস্বরতা ও সক্রিয়তার ফলেই শত্রুকে চিনতে ও চিহ্নিত করতে বিলম্ব হবে না-কোনরূপ অসুবিধাও হবে না এবং ঈমানদার লোকেরা তাদেরকে বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকরূপে কখনই গ্রহণ করবে না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য ফাঁসও করে দেবে না।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ - ( النساء - ١٤٤ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা মু'মিনদের পরিবর্তে কাফির লোকদিগকে বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে নিও না। -সূরা নিসা : ১৪৪
এ আয়াতে উপরোদ্ধৃত আয়াতের বক্তব্যই ভিন্নভাবে পেশ করা হয়েছে। ঈমানের এই কার্যকারিতা চিরকালই অনস্বীকার্য।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَ كُمُ الْمُؤْمِنتُ مُهَجَرَاتِ فَامْتَحِنُوْ هُنَّ - اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِهِنَّ - ( الممتحنه : ١٠ )
হে ঈমানদার লোকেরা ! তোমাদের নিকট যখন হিজরতকারী মু'মিন মহিলারা আসবে, তখন তোমরা তাদের যাচাই কর। আল্লাহই তাদের ঈমানের বিষয়ে অধিক অবহিত। -সূরা মুমতাহেনা: ১০
মুসলমানদের মদীনায় হিজরত করে যাওয়ার পর বিপুল সংখ্যক ঈমানদার মহিলাও হিজরত করে মদীনায় উপস্থিত হতে শুরু করেন। এই সুযোগে অ-ঈমানদার তথা কাফির মেয়েলোকেরা যাতে মদীনায় প্রবেশ করতে না পারে, তা সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করা মদীনাবাসীদের জন্য একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছিল। তাই এই নির্দেশ। এ নির্দেশেরও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। কেননা মদীনা ঈমানের ভিত্তিতে গড়া সমাজের অধিবাস। এখানে শত্রুপক্ষের কাফির নারীরা প্রবেশ করে ঈমানদার সমাজের ঈমানী ভিত্তিকে বিনষ্ট করে দেবার ষড়ষন্ত্র করতে পারে, তা অসম্ভব বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এজন্য এই নির্দেশ:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَ مَعْصِيَتِ الرَّسُوْلِ وَ تَنَاجَوْ بِالْبَرِّ وَ التَّقْوى - وَ اتَّقُوا اللهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ - ( المجادله : ٩ )
হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা যখন পরস্পর গোপন পরামর্শ করবে, তখন অবশ্যই গুনাহ্, সীমালংঘনমূলক কাজ ও রাসূলের অমান্যতার পরামর্শ করবে না; বরং গোপন পরামর্শ করবে পুণ্যময় ও তাকওয়ামূলক বিষয়ে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, যাঁর নিকট হাশরের দিনে তোমাদের একত্রিত হতে হবে। -সূরা মুজাদালা: ৯
এ আয়াতেও সম্বোধন ঈমানদার লোকদের প্রতি এবং তারও ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এই ঈমানের কাক্ষণেই আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের ন্যায় গুনাহ, সীমালংঘনমূলক ও নবীর না-ফরমানীর কার্যাবলী বিষয়ে পরস্পর পরামর্শ করতে নিষেধ করেছেন। ঈমানদার লোকদের বরং তাদের তাকওয়া ও পুণ্যময় কার্যাবলী নিয়ে সলা-পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, প্রথম ধরনের পরামর্শ একটা শয়তানী কাজ। এই কাজ কখনই ঈমানদার লোকদের জন্য শোভনীয় নয়। উপরন্তু এই ধরনের সলা-পরামর্শ ঈমানদার লোকদের সমন্বয়ে ঈমানের ভিত্তিতে গড়া সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাতে সমাজ-সংস্থা দৃঢ় হয় না, বিশ্লিষ্ট হয়; শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠে না, দুর্বল হয়ে থাকে। অথচ ঈমানভিত্তিক সমাজের জন্য সেই অবস্থা কোনক্রমেই কাম্য হতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00