📄 অপরাধ প্রতিরোধে ঈমানের ভূমিকা
ইসলামে ঈমানের স্থান সর্বপ্রথম। তার পরই ইসলাম। ঈমান বীজ সদৃশ আর ইসলাম হচ্ছে সেই বীজ থেকে অংকুরিত বৃক্ষ। বীজ না হলে যেমন বৃক্ষের অস্তিত্ব অসম্ভব, তেমনি ঈমান ব্যতীত ইসলাম অবাস্তব। ইসলাম একটা দেহ সংস্থা, ঈমান তার মধ্যে অবস্থিত প্রাণ-সদৃশ। প্রাণহীন দেহ মূল্যহীন। তাই দীন ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব সর্বাধিক।
ইসলাম মানুষকে সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণেরই আহ্বান জানায়। কেননা ঈমান হচ্ছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রাসাদের ভিত্তি। ঈমান দানা বেঁধে উঠলে ইসলাম তথা ইসলামী বিধান কার্যত অনুসৃত হবে বলে প্রত্যয় জন্মে। ঈমান হলে ইসলাম পালিত হওয়ার যেমন সম্ভাবনা থাকে, তেমনি ঈমানবিহীন ইসলাম আল্লাহর আনুগত্যের ব্যবস্থা হিসাবে তাঁর নিকট গৃহীত হয় না।
মূলত 'ঈমান' শব্দের অর্থ হচ্ছে সত্য বলে মেনে নেওয়া, সত্য বলে স্বীকার করা। কেউ কোন বিষয়ে কাউকে কোন সংবাদ দিলে সেই সংবাদকে সত্য বলে মেনে নেওয়া বা স্বীকার করাই হচ্ছে ঈমান। সে 'ঈমানে' শুধু মৌখিক স্বীকৃতির কথা নেই, তা মানতে প্রস্তুত হওয়ার কথাটিও শামিল রয়েছে এবং খবরদাতার দেওয়া শুধু খবরটুকুকে সত্য বলে মেনে নেওয়াই ঈমানের জন্য যথেষ্ট নয়, সেই সাথে খবরদাতাকে সাচ্চা বা সত্যবাদী-সত্য সংবাদদাতা বলে বিশ্বাস করাও তার অন্তর্ভুক্ত।
সংশয়মুক্ত ঈমান:
সংশয়মুক্ত ঈমানই ইসলামে কাম্য; বরং সত্যি কথা, সংশয়হীন বিশ্বাসই ইসলামে ঈমান নামে পরিচিত ও অভিহিত। যে ঈমান সংশয়মুক্ত নয়, তা মানুষকে প্রকৃত মু'মিন বানায় না। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: প্রকৃত মু'মিন তারাই যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। অতঃপর কোনরূপ সংশয়াচ্ছন্ন হয়নি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তাদের জান-মাল দিয়ে। তারাই সত্যিকার ঈমানদার।
ঈমান ও কুফর:
বিশ্বাসের চরম বলিষ্ঠতা না থাকলে কারো পক্ষেই চরম মাত্রার আত্মত্যাগে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব হয় না। যে লোক কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, সে তার মন-মেজাজ ও যাবতীয় তৎপরতা সেই অনুরূপই গড়ে তুলবে। আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি চরম মাত্রার শত্রুতা মনের মধ্যে স্থান দেবে। পক্ষান্তরে যে লোক ঈমান আনবে সে হবে আল্লাহ্ ও রাসূলের একনিষ্ঠ অনুগত।
ঈমান ও আমল:
ঈমানের পরে পরেই এবং সাথে সাথেই তদনুযায়ী আমল একান্তই জরুরী। অন্যথায় ঈমানের যথার্থতাই অপ্রমাণিত থেকে যায়। আর ঈমান অনুযায়ী আমল হচ্ছে, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং সেইসব কাজ করা, যা তিনি ফরয বা কর্তব্যরূপে ঘোষণা করেছেন।
ঈমান ও রাষ্ট্র:
ঈমানদার লোকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন কাফির লোকদের আনুগত্য ও অনুসরণ না করে। ঈমানই মানুষকে সমাজ-বিরোধী ও সাধারণভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখে। ঈমানদার লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন বিনাশর্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানতে রাযি হয়।
ঈমান ও সামাজিক রীতিনীতি:
ঈমানদার লোকদের সমাজ হবে নিয়ম-শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ। এখানে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম-বিধির অমান্যতা এবং নেতৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা চলতে পারে না। কেননা, তা ঈমানেরই পরিপন্থী।
ঈমান ও অর্থ ব্যবস্থা:
ঈমানের ঘোষণা হচ্ছে, এই দুনিয়ার কোন কিছুরই মালিক মানুষ নয়। সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহই হচ্ছেন সবকিছুর একমাত্র নিরংকুশ মালিক আর সব মানুষ হচ্ছে সেই আল্লাহ্ই সৃষ্ট এবং বান্দা। অতএব সবকিছুই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলবে। ঈমানই মানুষকে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস, অপচয়, লুটপাট, বঞ্চনা-গঞ্জনা থেকে বিরত রাখে।
ঈমান ও পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা:
কুরআন-পরিকল্পিত সমাজে পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক। সমাজে ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার সুসম্পর্ক এরই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আর তার মূলে ঈমানের ভূমিকা সদা কার্যকর।
📄 অপরাধ দমনে ইবাদাতের প্রভাব
অপরাধ দমনে বা প্রতিরোধে ইবাদাতের প্রভাব বুঝবার জন্য শুরুতেই ইবাদাতের অর্থ এবং ইসলামে তার সাধারণ, ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যের আলোচনা করা আবশ্যক। আরবী অভিধান অনুযায়ী 'ইবাদাত' অর্থ আনুগত্য, বিনয় ও বাধ্যতা। ইবাদাত এমন এক ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আনুগত্য, যা জীবন, বুঝ-সমঝ, শ্রবণ-দৃষ্টি ইত্যাদির দাতা ছাড়া আর কেউ পাওয়ার অধিকারী নয়।
ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্য:
ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্যে সম্পূর্ণ ‘দীন’ই অন্তর্ভুক্ত। যে কথা, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যে কাজই আল্লাহ পছন্দ করেন, যা'তে তিনি খুশি ও সন্তুষ্ট হন, যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, সত্য কথা বলা, আমানতের সংরক্ষণ, ওয়াদাপূরণ, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ—এই সবকিছুই ইবাদাতরূপে গণ্য।
অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক তাৎপর্যসম্পন্ন ইবাদাতের প্রভাব:
সাধারণ ও বিস্তৃত তাৎপর্যের দৃষ্টিতে আদেশ-নিষেধ সমন্বিত আল্লাহ্ গোটা দীন পালন করাই ইবাদাত। ইসলাম নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সকল প্রকার পাপ, সীমালংঘন ও যুলুম হারাম করে দিয়েছে। গণমানুষের মৌলিক ও সর্বপ্রকারের অধিকারকে ইসলাম পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষিত করেছে। এই অধিকার হরণ বা তার উপর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বড় গুনাহ্।
মানুষের চরিত্রে ও আচার-আচরণে ইবাদাতের প্রভাব:
সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ—এর প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপিত করেছে। সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। সিয়াম মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির উপর শক্ত লাগাম লাগিয়ে দেয়। যাকাত লোভ-লালসা, কার্পণ্য ও হিংসা থেকে মানব মনকে পবিত্র করে। হজ্জ মুসলিম ব্যক্তিকে সকল প্রকার পাপ ও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার আত্মিক শক্তি জোগায়।
ঈমান ভিত্তিক ইবাদাত:
অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের যে ভূমিকার বিবরণ উপরে প্রদত্ত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান। ঈমান মানুষের জীবন ও বাহ্যিক আচার-আচরণকেও সুন্দর করে গড়ে তোলে। একনিষ্ঠ ঈমানই মানুষের মান-মর্যাদা সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরী। ঈমানদার ব্যক্তির জীবন্ত অন্তরই হয় ইসলামী আইন প্রণয়নের আসল দিগদর্শন।
টিকাঃ
১. বুখারী, মুসলিম।
📄 অপরাধ দমনে ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব
ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ বিধান। এই বিধানের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব এবং বিরাটত্বের কারণ হচ্ছে, তা জীবনের প্রত্যেক বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় পরিব্যাপ্ত। মানুষ যে পরিবেশে বসবাস ও জীবন ধারণ করে, অপরাধ এবং অপরাধের শাস্তি সেই পরিবেশের সহিত গভীরভাবে সম্পৃক্ত ব্যাপার। সেক্ষেত্রে ইসলামের অবদান পূর্ণমাত্রায় অনুধাবনীয়।
সম্ভবত মানুষের জানা-পরিচিত জীবন বিধানের মধ্যে ইসলামই একক ও অতুলনীয়, যা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ করে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার শাস্তি বিধান করেই ক্ষান্ত হয় না। অবশ্য দুনিয়ার অপরাপর মানবীয় বিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার শাস্তির ব্যবস্থা করা মাত্র।
এই কারণেই কুরআনে সেই অপরাপর বিধানসমূহের নামকরণ হয়েছে 'জাহিলিয়ত'- অজ্ঞতা ও বর্বরতাই তার আসল পরিচিতি। বলা হয়েছে: "ওরা কি জাহিলিয়তের বিধান ও প্রশাসন চায়? আসলে দৃঢ় প্রত্যয়শীল লোকদের জন্য আল্লাহর চাইতে উত্তম বিধানদাতা ও প্রশাসক আর কে-ই বা হতে পারে।" এ আয়াতের দৃষ্টিতে আইন-বিধান ও শাসন-প্রশাসন দু'ভাবে বিভক্ত ধরা যায়। একটি হচ্ছে আল্লাহর বিধান ও প্রশাসন এবং দ্বিতীয় হচ্ছে জাহিলিয়তের বিধান ও প্রশাসন।
মানুষ আল্লাহ্ নাযিল করা বিধান-পদ্ধতি বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে যে সব আইন-বিধান ও প্রশাসন পদ্ধতি রচনা করে, কুরআনে তার নামকরণ হয়েছে জাহিলিয়তের বিধান বা প্রশাসন-সংস্থা। এই প্রশাসন সংস্থা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যত না প্রতিরোধ ও নিষেধমূলক বিধি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তার চাইতে অনেক বেশি করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা হিসাবে। ইসলামও শাস্তির ব্যবস্থা করেছে বটে; কিন্তু আসলে ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তা সংঘটিত না হওয়া বা সংঘটিত হতে না দেওয়ার উপর কিংবা তার ক্ষেত্রকে সংকীর্ণতর করে দেওয়ার উপর। আর সে জন্য ইসলাম বহু প্রকারের উপায় অবলম্বন করেছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান ব্যাপকতরকরণ ইসলাম অবলম্বিত উপায়-পন্থাসমূহের মধ্যে সর্বাধিক প্রাধান্যের অধিকারী।
তবে ইসলাম ব্যাপারটিকে সর্বদিক দিয়ে এবং সর্বাত্মকভাবে গ্রহণ করেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চৈন্তিক, আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ প্রভৃতির মধ্যে কোন একটি দিককে ইসলামেও বাদ দেওয়া হয়নি। যে যে ছিদ্র পথে অপরাধ অনুপ্রবেশ করতে পারে ও করার সুযোগ পায়, তার প্রত্যেকটিই বন্ধ করে দিতে ইসলাম আগ্রহী এবং সচেষ্ট। এই কারনেই এ ঐতিহাসিক সত্য কেউ-ই অস্বীকার করতে পারবে না যে, মানব সমাজের মধ্যে অপরাধের সর্বনিম্ন মাত্রার দিক দিয়ে এখনও- এই চরম পতন যুগেও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান হিসাবে গৃহীত ও অনুসৃত না হওয়া সত্ত্বেও-ইসলামী সমাজ অনন্য ও তুলনাহীন। আর তার কারণ হচ্ছে, ইসলাম চতুর্দিক দিয়েই এই লক্ষ্যে অগ্রসর হয় এবং অপরাধ নির্মূল কিংবা তার ক্ষেত্র সংকীর্ণতরকরণে বাস্তব কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
দৃষ্টান্তস্বরূপ চুরি অপরাধের উল্লেখ করা যেতে পারে। ইসলাম সে অপরাধ থেকে লোকদের দূরে রাখার জন্য হাত কাটাকে দণ্ড হিসাবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু হাত কাটার দণ্ড তো একমাত্র বা সূচনাকালীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নয়, তা হচ্ছে চরম ব্যবস্থা। এই পর্যায়ে সূচনাকালীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা হচ্ছে, ইসলাম সর্বপ্রথম মানুষকে ইসলামী জীবন-বিধানে বিশ্বাসী ও তার বাস্তব অনুসরণকারী বানাতে চায়, যেন চৌর্য কাজটিকে মুসলিম মাত্রই অন্তর থেকে ঘৃণা করে। সেই সাথে ইসলাম যে অর্থ ব্যবস্থা কার্যকর করে, তার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে, সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। এ জন্য ইসলাম দু'টি পন্থা গ্রহণ করেছে। প্রথমত, সমাজের প্রত্যেকটি কর্মক্ষম পুরুষের জন্য হালাল পবিত্র রিযক উপার্জন করার সুষ্ঠু ব্যবস্থা এবং দ্বিতীয়, সাধারণভাবে সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (Social security system) ব্যবস্থা। এ দু'টি বাস্তব ব্যবস্থা কার্যকর হলে কোন একটি ব্যক্তির পক্ষেও চুরি কার্যে নিযুক্ত হওয়ার কোন যৌক্তিকতা বা কারণই থাকতে পারে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন লোক যদি (চারিত্রিক দোষের কারণে বা লোভের বশবর্তী হয়ে) চুরি কাজে লিপ্ত হয়, তা'হলে অপরাধের শাস্তি হিসাবে শরীয়তে নির্ধারিত দণ্ড (হাত কাটা) অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। কেননা নাগরিকদের জীবনের সাথে সাথে ধন-মালের নিরাপত্তা দানও ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
কিন্তু তা সত্বেও-চুরি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রতিবন্ধক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর ও এই অপরাধ সংঘটিত হলে খুব দ্রুততা সহকারে হস্ত কর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ ইসলামের বিচারনীতির পরিপন্থী। ইসলাম প্রত্যেকটি অপরাধকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করে। অপরাধী কেন অপরাধ করল, কোন জিনিস তাকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করেছে, তা বিস্তারিত ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনা করা অপরিহার্য হবে। এ ভাবে পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনায় এই অপরাধকরণে কোন বৈষয়িক কারণ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে 'সন্দেহ-সুবিধা' অবশ্যই দেওয়া হবে এবং দণ্ড কার্যকরকরণ থেকে তাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে।
তা ছাড়া ক্ষমা দান করে ভুল করা শাস্তি দানে ভুল করা-অর্থাৎ ভুল করে নিরপরাধীকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দণ্ডদান করা অপেক্ষা অনেক বেশি উত্তম, ইসলামের দণ্ড বিধানে এক নির্গুণ সর্বজনগৃহীত মৌলনীতি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার প্রতি ইসলামের গৃহীত এ একটি বিশেষ কর্মপদ্ধতি। ব্যভিচার সংঘটিত হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্যও ইসলাম অনেকগুলি পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। এই কারণে কন্যার পূর্ণ বয়স্কা হওয়ার সাথে সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষ উৎসাহ-বরং তাকিদ প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে একটি নীতিগত বা মতাদর্শগত দাওয়াত বানিয়েই রাখা হয়নি। সে জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিবার নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বায়তুল মালই হয়ে থাকে সে জন্য প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে তার পক্ষে কারণ বিশ্লেষণও করা হয়েছে। যুবক-যুবতীদের কোন রূপ যৌন অপরাধে জড়িত হওয়ার পূর্বেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরী। এ ভাবে শরীয়তসম্মত পন্থায় যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার সুযোগ থাকলে অন্তত যৌন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পথ অনেকখানি রুদ্ধ হয়ে যাবে, তা সহজেই বুঝতে পারা যায়। যাদের অস্বাভাবিক যৌন উত্তেজনার ধারক হওয়ার কারণে একজন মাত্র স্ত্রী যথেষ্ট হয় না, তাদের জন্য একাধিক-চারজন পর্যন্ত স্ত্রী এক সময় গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বদিক দিয়ে ব্যভিচারের পথ বন্ধ করাই এই সব ব্যবস্থার লক্ষ্য। কেননা আধুনিক ইউরোপ-আমেরিকায় একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে যতই ঘৃণা করা বা লজ্জাকর ও সামাজিকভাবে ভয়ানক আপত্তিকর মনে করা হোক, বহু সংখ্যক বিয়েহীন 'স্ত্রী'-রক্ষিতা, মেয়ে বান্ধবী গ্রহণে ও তাদের সহিত প্রকাশ্যে ও গোপনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে কোনদিক দিয়েই একবিন্দু বাধা বা অসুবিধা নেই।
কিন্তু ইসলামের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম তার তওহীদী আকীদার কারণে পবিত্র এক দীন। মানুষকেও আল্লাহর পবিত্র সৃষ্টি হিসাবে গড়ে তোলা এবং জীবন যাপনে অভ্যস্ত করাই ইসলামের লক্ষ্য। ইসলাম বিশেষ করে পুরুষদের বিভিন্ন ও বিচিত্র ধরনের স্বভাব প্রকৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম লক্ষ্য করেছে যে, এমন পুরুষ রয়েছে যারা একজন মাত্র স্ত্রীর দ্বারা নিজেদের যৌন তৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে না, তাদের একের অধিক স্ত্রীর প্রয়োজন। তাই এই স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে একসাথে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি তাদের দিয়েছে। কিন্তু তাকে অসীম ও বাধা-বন্ধনহীন করে দেওয়া ও পুরুষের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার দিক দিয়ে উচিত নয়। সে কারণে একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে চার পর্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, এক সাথে বড়জোর চারজন স্ত্রী রাখতে পারবে, তার বেশি নয়। যেন এই চারজনের বাইরে তাদের যৌন পরিতৃপ্তির ক্ষেত্র গ্রহণ করে অপরাধী হতে না হয়। দ্বিতীয়ত সে একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়পরতা ইনসাফ ও সমান আবরণ গ্রহণের শর্ত করা হয়েছে।
এক কথায়, ইসলাম অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই সম্ভাব্য অপরাধের দ্বার রুদ্ধ করে দিতে বদ্ধ পরিকর। তারপরও যদি অপরাধ সংঘটিত হয়, এবং তা হয় কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত, তা'হলে সে জন্য অপরাধীকে কঠিন ও কঠোর শাস্তি দেওয়া ইসলামের সিদ্ধান্ত এবং তার যৌক্তিকতাও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। যে সব অপরাধের জন্য ইসলামে 'হদ্দ'-সুনির্দিষ্ট শাস্তি ঘোষিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই এই কথার সত্যতা অনস্বীকার্য। অবশ্য কোনরূপ সন্দেহ সৃষ্টি হলে অভিযুক্তকে সেই সুযোগ দিতে হবে।
এই প্রেক্ষিতেই অপরাধ দমনে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রভাব কি, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। এই পর্যায়ে আমাদের প্রথম কথা হচ্ছে, ইসলাম মূলতই একটি শিক্ষা প্রশিক্ষণমূলক দীন। ইসলামের মৌল ভাবধারা-ঈমান, আকীদা, মূল্যমান ও জীবন-বিধানের ব্যাপক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সেই অনুযায়ী সমাজ-ব্যক্তিদের তৈরি করা ইসলামের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। তখন কুরআন ও সুন্নাতের উপস্থাপিত জীবন বিধানই হয় তাদের জীবনের অনুসরণীয় একমাত্র বিধান। কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে যা সত্য, যা কল্যাণকর, তা-ই হয় তাদের নিজ নিজ জীবনে একমাত্র সত্য ও কল্যাণকর। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে যা মিথ্যা, বাতিল, অন্যায় ও পাপ, তাদের মন-মানসিকতা ও জীবনের কর্মতৎপরতায় তা-ই হয় সম্পূর্ণরূপে বর্জিত ও প্রত্যাখ্যাত। এ ভাবে তৈরি করা লোকেরা প্রথমোক্ত জিনিসকে অগ্রাহ্য করতে এবং শেষোক্ত কার্যাবলী গ্রহণ ও অবলম্বন করতে কখনই-কোন অবস্থাতেই প্রস্তুত হয় না। এ ভাবেই ইসলাম তার যাবতীয় মূল্যমান ও নিয়ম-বিধানসহ উক্ত ব্যক্তিদের জীবনে এবং সেই ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজের ক্ষেত্রে পুরাপুরিভাবে বাস্তবায়িত হয়।
বস্তুত ইসলামের এই বাস্তবায়ন সম্ভব হয় কেবলমাত্র শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। নবী করীম (সা) প্রথমে মক্কায় এবং পরে মদীনায় এই কাজে প্রাণপণ চেষ্টা সাধনা ও সংগ্রাম করেছেন। দিন-রাত অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁর দীনী দাওয়াত ছিল ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচার-মাধ্যমে এবং সেই অনুযায়ী সাহাবীগণকে চলতে অভ্যস্ত করে দিয়ে তিনি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পূরণ করতেন, নাযিল হওয়া মাত্রই তিনি কুরআন পাঠ করে তাদের শোনাতেন। সেই অনুযায়ী নিজে কাজ করে ও সাহাবীগণ দ্বারা তা করিয়ে তবে ক্ষান্ত হতেন। রাসূলে করীম (সা) কর্তৃক দীন-ইসলাম এভাবেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
অতএব ইসলামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান-ই ছিল ইসলামকে বাস্তবায়িত করার প্রধান ও প্রকৃষ্ট উপায়, তা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য। এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টাও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য ছিল আর্দশ চরিত্রের ব্যক্তি গড়ে তোলা, সেই আদর্শ শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রশিক্ষিত চরিত্রবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আদর্শ সমাজ গঠন করা।
এই দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে যে, দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও জীবন বিধানের সহিত ইসলামের কোন তুলনাই করা যায় না। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও জীবন-বিধানকে জাহিলিয়ত বলে অভিহিত করেছেন। কেননা সে মনে দীন শিক্ষাকে জীবন ও চরিত্র গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়া হিসাবে গৃহীত হয়নি।
দুনিয়ার অপরাপর ধর্ম ও জীবনাদর্শের লক্ষ্য হচ্ছে 'আর্দশ নাগরিক' তৈরি করা। কিন্তু ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে 'আর্দশ মানুষ' গড়ে তোলা।
'আদর্শ নাগরিক' ও 'আদর্শ মানুষ' এ দু'য়ের মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে? উপরোক্ত কথার প্রেক্ষিতে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। কিন্তু বাহ্যত এ দুইয়ের মাঝে কোন পার্থক্য আছে বা হতে পারে-তা মনে হয় না। কেননা আদর্শ নাগরিকই তো আদর্শ মানুষ কিংবা আদর্শ মানুষই তো আদর্শ নাগরিক হতে পারে বলে স্পষ্ট মনে হয়।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা একটা ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। এর সত্যতার কোন ভিত্তিই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আধুনিককালের এবং ইতিহাসের যে কোন সময়ের জাহিলিয়তের প্রতি তীক্ষ্ণ ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে ইংরেজদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই দুনিয়ায় আদর্শ রূপে গণ্য হতো। কেননা তা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল, যা ইসলামেরও লক্ষ্য। কিন্তু সে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ আদর্শ বা দৃষ্টান্তমূলক ছিল জাহিলিয়তের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দৃষ্টিতে এবং তার লক্ষ্য ছিল উপযুক্ত আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলা। আমরা যদি সেই আদর্শ নাগরিককে ইসলামের তুলাদণ্ডে ওযন করি, তা হলে আমরা অবশ্যই দেখতে পাব যে, 'আদর্শ নাগরিক', 'আদর্শ মানুষ' থেকে অনেক-অনেক দূরে অবস্থিত। আমরা বিশেষভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বকালীন বৃটিশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কথা বলছি এ জন্য যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ইউরোপীয় সমাজের মূল গ্রন্থিকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে, তথায় নিয়ে এসেছে চরম বিপর্যয়। সেখানকার অনেক ভালো ভালো মূল্যমান ও শুভ ব্যবস্থাপনাকেও সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে দিয়েছে। ফলে অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে সেখানকার সমাজ পরিবেশ ও ব্যক্তি-চরিত্র, যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে দৃষ্টিগোচর হতো না। আমরা সেই সময়কার বৃটিশ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করছি এই কারণে যে, তখন তা বাস্তবিকই অনেক ভালো ছিল এবং তাতে যে আদর্শ নাগরিক গড়ে উঠত, তারা বিশ্বমানবতার নিকট আদর্শ ও দৃষ্টান্তরূপে গণ্য হতো। কিন্তু যখন এই গ্রেট বৃটেনের সুনাগরিকরা যখন বিশ্বের নানা দেশ দখল করে তার উপর কর্তৃত্ব করতে বের হয়ে আসত, তখন তারাই সর্বত্র চরম নির্মমতা, অমানুষিকতা ও চরিত্রহীনতার প্রত্যক্ষ পরিচয় দিত। বৃটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষ, সুদান ও মিসরে তাদের যে রূপ দেখা গিয়েছে, তা 'আদর্শ নাগরিকের' রূপ হলেও হতে পারে; কিন্তু 'সাধারণ মানুষের রূপ'-ও ছিল না। এমনকি তাদের নিজ দেশের অভ্যন্তরে আচরিত সমস্ত ভদ্রতা ও সুনাগরিকত্ব তাদের অধিকৃত ভূ-খণ্ডসমূহে চরম হিংস্র পাশবিকতার রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করত। তথায় তাদের আদর্শ নাগরিকত্ব ও বিশ্বাস পরায়ণতার নাম চিহ্ন-ও খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা তো নিজেদের দেশে উন্নত চরিত্র ও আদর্শ নাগরিক রূপেই গড়ে উঠেছিল? কিন্তু তাদের দখলিকৃত জনপদসমূহে তা কোথায় উঠে যেত? তবে তারা তথায় গিয়ে কি সম্পূর্ণ বদলে যেত? না, বদলে যেত না। আসলে তাদের সেই রূপ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়েছিল। তাদের মানবিক রীতি-নীতিতে, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারীরূপে আদপেই গড়ে তোলা হয়নি। মানুষ হিসাবে দুনিয়ায় অন্যান্য মানুষের সহিত মানবিক আচার-আচরণ গ্রহণের শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করা হয়নি।
মহান আল্লাহর বান্দা হিসাবে জীবন যাপনেরও কোন শিক্ষা তাদের দেওয়া হয়নি। আসলে তাদের তৈরি করা হয়েছিল 'গ্রেট বৃটেন' নামক দেবতার পূজারীরূপে। তারা দেশের অভ্যন্তরে সেই দেবতার কল্যাণে যা কিছু ভালো, তারই অনুসরণ করত। আর যখন তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত দেশসমূহ শাসনের দায়িত্ব নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসত, তখনও সেই দেবতার কল্যাণই হতো তাদের একমাত্র কাম্য। যদিও পদ্ধতি হতো ভিন্নতর। তখন ব্যাপক লুটতরাজ, চুরি-ডাকাতি, অপহরণ, নিরীহ অক্ষম মানুষের রক্তের বন্যা প্রবাহিত করা, মানুষের ইজ্জত-আবরু বিনষ্ট ও ধন-মাল আত্মসাৎ করাই হতো সেই দেবতার পূজার নৈবেদ্য। অথচ দেশের অভ্যন্তরে তারা হতো অত্যন্ত সৎ, সাধু বিশ্বাস্য, মানবতার দরদী ও নিরতিশয় ভদ্র মানুষ।
তাহলে বোঝা গেল, গ্রেট বৃটেনের বাইরে এসে তারা ঠিক বদলে যেত না। দেশে তারা যে 'আদর্শ নাগরিক', বাইরের দেশসমূহে সেই নাগরিক আদর্শত্ব কিংবা আদর্শ নাগরিকত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটত, যদিও তার রূপ ভিন্নতর। তাদের দেশের অভ্যন্তরে অনুসৃত নিয়ম-নীতি ও সাম্রাজ্যসমূহে গৃহীত আচরণে কোন স্ববিরোধিতা ছিল না। ছিল পূর্ণমাত্রায় সামঞ্জস্য। এ ছিল একই মানুষের দুই রূপ। পরিবর্তিত সাম্রাজ্যের রূপ নয়। এই কথাটির আরও ব্যাখ্যার জন্য আমি এখানে দুইটি দৃষ্টান্ত দিতে চাই। তাতে জাহিলিয়তের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বৈশিষ্ট্য বিশেষত্ব এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে আশা করি।
প্রথম ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল সাহারা মরুভূমিতে বৃটিশ বা মিত্রবাহিনী এবং আলমানীয়দের মধ্যে। এ এক দীর্ঘ প্রাণান্তকর যুদ্ধ ছিল। তবরুকে অবস্থিত রোমানদের উপর মন্টোগোমারীর বিজয় লাভে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল। আলমানীয়রা তবরককের চতুর্দিকে অবস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রে ডিনামাইট বসিয়ে সুরক্ষিত করে রেখেছিল। একবার সাময়িকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল আলমানীয়দের তবরক ত্যাগ করে চলে যাওয়ার এবং বৃটিশদের তথায় প্রবেশ করার ফলে। কিন্তু শেষবারে আলমানীয়দের তবরক ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পূর্বে তারা চতুর্দিকে ডিনামাইট বসিয়ে রেখে চলে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, তবরক দখলকারীরা যেন তা দখলে আনবার সময়ে ভীষণ-ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মরু অঞ্চলে সাধারণত প্রথমে উট ও গাধা পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যেন ওদের পায়ের আঘাতে ডিনামাইট ফেটে যায় এবং মানুষের ক্ষয়-ক্ষতি খুব সামান্যই হয়। কিন্তু বৃটিশ সেনাবাহিনীর চরম নির্মমতা এই দেখা গেল যে, তারা উট ও গাধার পরিবর্তে বৃটিশ সাম্রাজ্যাধীন ভারতীয় বাহিনীকে সেই ডিনামাইট বসানো প্রান্তরে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। তারা সামরিক বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী সেনাধ্যক্ষের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। তারা জানত যে, এ প্রান্তরটি ডিনামাইটে ভরে আছে এবং তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার অর্থ নির্ঘাত মৃত্যু। তা সত্ত্বেও গোটা বাহিনী তাতে প্রবেশ করে ডিনামাইট ফাটিয়ে নিজেরা ধ্বংস হয়ে গিয়ে বৃটিশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার পথ বিপদমুক্ত করে দিল। এর পরই মিত্রবাহিনী তথায় প্রবেশ করে এবং পরের দিন সামরিক ইশতেহারে তবরক দখল ও যুদ্ধ জয়ের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, এ যুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতি খুব সামান্যই হয়েছে।
এ-ই হচ্ছে বৃটিশের আদর্শ নাগরিকদের বিশেষ চরিত্রের নমুনা। আসলে ওদের তৈরিই করা হয়েছিল গ্রেট বৃটেন দেবতার উপযুক্ত পূজারী রূপে এবং জন্তু-জানোয়ারের পরিবর্তে মানুষকে নিরীহ অক্ষম মানুষকে ধ্বংস করে গ্রেট বৃটেনের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল পৃথিবী ব্যাপী। ভেতরে অত্যন্ত উদার মানবিক চরিত্র এবং বাইরে নিতান্ত হীন মানব দুশমন চরিত্রের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে তারা খুবই দক্ষ ও পারঙ্গম।
দ্বিতীয় ঘটনাটি জনৈক বৃটিশ সামরিক ব্যক্তির ভারতবর্ষে অবস্থানকালীন একটি আলোকচিত্র। চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে, সে তার জন্য নির্দিষ্ট অশ্বের পৃষ্ঠে জিনের (Saddle) সাহায্যে আরোহণ করছে না, আরোহণ করছে তারই মত একজন ভারতবর্ষীয় মানুষের কাঁধের উপর পা রেখে। এইরূপ আচরণ যে আদৌ মানবিক নয় এবং যে মানুষকে মানুষ মনে করে, জন্তু-জানোয়ার নয়, এমন কোন লোকের পক্ষে এরূপ আচরণ করা সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য।
এখানে বৃটেনের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আদর্শ নাগরিকের যে জঘন্য ও বীভৎস ঘটনাদ্বয়ের উল্লেখ করা হলো, 'আদর্শ নাগরিক' ও আদর্শ মানুষের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য প্রকট করার জন্য তা সর্বতোভাবে যথেষ্ট। ইসলাম মানুষকে শুধু আদর্শ নাগরিক রূপেই বিবেচনা করে না, গড়ে তুলতেও চেষ্টা চালায় না, বরং আদর্শ মানুষ বা প্রকৃত মানুষের আওতায় তার লালন পালন করতে বদ্ধপরিকর। মানুষের সাথে ইসলামের আচরণ মানুষ হিসাবে। ইসলাম চায়, মানুষ তার সেই আসল প্রকৃতি ও চরিত্রে প্রতিভাত হোক, যে প্রকৃতি ও চরিত্রে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন: "আমরা মানুষকে অতীব উত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করেছি। পরে আমরা তাকে উল্টা ফিরিয়ে সর্বনিম্নে পৌঁছে দিয়েছি-সেই লোকদের ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে।"
এই ঈমান-ই মানুষকে তার সেই আসল রূপে ও গুণে বিভূষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, যাতে মহান আল্লাহ তা'আলা তাকে মূলতই সৃষ্টি করেছেন। আর তা-ই হচ্ছে আদর্শ মানুষ, 'শুভ মানুষ'-ইনসানে সালেহ্'। এই আদর্শ মানুষ গড়াই ইসলামের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের লক্ষ্য।
ইসলাম যে 'ইনসানে সালেহ্'-আদর্শ-উন্নত মানুষ' তৈরি করে, তা কোন কৃত্রিম মানুষ নয়, নয় বিশেষ বিন্দুতে ও নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের মধ্যে উন্নত চরিত্রের অধিকারী বা আদর্শ মানুষ। সে তো পৃথিবীর সর্বত্র যেখানেই তার পদধূলি পড়বে, মুসলিম সমাজের মধ্যে কিংবা তার বাইরে-সকল ক্ষেত্রেই তার উন্নত মানবিক চরিত্রের সংরক্ষক। তার সম্পর্ক ও যোগাযোগ কেবল মুসলিমদের সাথেই নয়, অমুসলিম যিম্মীদের সাথে তার যোগাযোগ থাকবে। অর্থাৎ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষেরই সাথে তাঁর যোগাযোগ সম্পর্ক ও আদান-প্রদান থাকবে। এই সত্যেকে সমুদ্ভাসিত করে তোলার জন্য এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা যাচ্ছে।
ইসলাম আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ সীমারেখা বরাবর অর্থাৎ মধ্য আফ্রিফার সম্পূর্ণ অঞ্চল এবং এশিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমের সর্বত্র কোনরূপ যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত ব্যতীতই ব্যাপক প্রচার লাভ করে। কিন্তু তা কিভাবে প্রচারিত হলো, কে প্রচার করল?..... বলা হয়, মুসলিম প্রচারকগণই তা করেছেন। .....এ কথা অসত্য নয়। ইসলামের প্রচারকদের খুব বড় এবং বেশি তৎপরতা ছিল এই বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী ইসলামের ব্যাপক প্রচার লাভের মূলে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু আসলে এ ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যবসায়ীদের ভূমিকাই ছিল সর্বাধিক প্রবল। আর তাদের অধিকাংশ ছিল আরব উপদ্বীপের অধিবাসী হাদরামী বংশের লোক। তাঁরা পৃথিবীর দিকে দিকে সফর করেছেন-দীনের দাওয়াত প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে নয়, শুধু ব্যবসায়ের লক্ষ্যে। কিন্তু নিছক ব্যবসায়ী অভিযাত্রীদের দ্বারা ইসলাম কি করে এতটা প্রসারতা লাভ করতে পারলো, অথচ তারা ইসলাম প্রচারের জন্য এই বিদেশ যাত্রা করেন নি?.....তা কি করে সম্ভব হলো, সে একটা বড় প্রশ্ন বটে।
এ সব এলাকার অধিবাসীরা যখন আরব মুসলিম ব্যবসায়ীদের অতীব উত্তম চরিত্র দেখতে পেয়েছিল, যখন দেখল ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ফলে এই লোকগুলির চরিত্র কত উন্নত, মধুর ও মানবিক; প্রত্যক্ষ করলো তাদের নৈতিক পরিচ্ছন্নতা, পরি শুদ্ধতা, আনুভূতিক, আত্মিক, নৈতিক, পারস্পরিক লেনদেন ও সম্পর্ক-সমবন্ধ সংক্রান্ত যাবতীয় আচার-আচরণের পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও নিষ্কলুষতা, তখনই তারা ইসলামের সত্যতার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠলো। তারা বলল, এ-ই যদি ইসলাম হয়, তা হলে সে ইসলামের জন্যই আমরা প্রতি মুহুর্তে অপেক্ষা করছি এবং পাওয়া মাত্রই তারা তা গ্রহণ করে নিল। কেননা যে দীন এরূপ আদর্শ মানুষ তৈরি করতে পারে, তার মত আর দীন হতে পারে না। তা অবশ্যই সত্য ও অনন্য হতে বাধ্য। তা হলে বলা যায়, আরব-মুসলিম ব্যবসায়ীদের আচার-আচরণই ইসলামের ব্যাপক প্রচারের জন্য প্রধানত দায়ী এবং এটা তাদেরই বিশেষ অবদান, সন্দেহ নেই।
আর ইসলাম মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালিয়েছে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ভিত্তিতে। তা সেই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, যার সাক্ষ্য ও ঘোষণা স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) দিয়েছেন। তা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত। আমরা মুখে যতটা উচ্চারণ করি, কালেমা আসলে ঠিক ততটাই নয়। মূলত তা এক বিরাট বিপ্লব। উপরন্ত মুখে কালেমার শব্দসমূহ উচ্চারণ করার নাম-ই ইসলাম নয়। ইসলাম হচ্ছে এই কালেমাকে বাস্তবায়িত করা, কালেমা অনুযায়ী যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা। ইসলাম এই কালেমার ভিত্তিতেই মানুষকে তৈরি করেছে, তৈরি করতে চাচ্ছে, কেননা এই কালেমাই তো ঈমান, ঈমানের মর্মবাণী। ইসলামে যে ঈমান, তার কতিপয় শর্ত ও লক্ষ্য রয়েছে, রয়েছে কতগুলি নৈতিক দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য। নিম্নোদৃত আয়াতটি লক্ষ্যণীয়:
"মু'মিনরা কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু মু'মিন কারা, তাদের গুণ-পরিচিতি কি? কোন্ সব গুণের কারণে তারা মু'মিন নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছে? তার পরিচয়: মু'মিন তারা, যারা তাদের সালাতে বিনয়ী-বিনম্র-অবনত মন, যারা বেহুদা ও অর্থহীন কাজ থেকে বিরত, যারা যাকাতের কাজ সম্পন্নকারী বা নিজেদের চরিত্র পরিশুদ্ধ পরিবর্ধিতকারী, যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের সংরক্ষণকারী (নিজেদের স্ত্রী বা ক্রীতদাসী ছাড়া-তাতে তারা তিরস্কৃত নয়, যারা এর বাইরে নিজেদের স্পৃহা চরিতার্থ করতে চাইবে, তারা সীমালংঘনকারী) আর যারা তাদের আমানত ও ওয়াদা সমূহ পরিপূরণকারী, যারা নিজেদের নামাযের হিফাজতকারী-তারাই উত্তরাধিকারী, যারা ফিরদাউস জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবে এবং তথায় চিরদিন থাকবে।"
অর্থাৎ শুধু কালেমার প্রতি বিশ্বাসী বা মুখের দাবিদার হওয়ার কারণেই মু'মিন নামে অভিহিত হতে পারে না। সেই ঈমান অনুযায়ী তাদের জীবন যাপন করতে হবে, এরই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে, তা-ই হবে তাদের বাস্তব জীবনের কর্মধারা। এই সঙ্গেই কুরআনের আরও একটি আয়াত বিবেচ্য। আয়াতটি এই: যারা জানলো যে, তোমার নিকট যা নাযিল হয়েছে তা বরহক, তারা কি তার মত যে অন্ধ। সেই বুদ্ধিমানরাই নসীহত কবুল করে, যারা আল্লাহর ওয়াদা পূরণ করে এবং পাকা-পোস্ত করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। আর যারা সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষা করে, যা স্থাপন ও রক্ষা করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন এবং ভয় পায় তাদের রবকে, ভয় করে অত্যন্ত খারাপ হিসাব লওয়াকে। আর যারা ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার লক্ষ্যে এবং নামায কায়েম করে ও ব্যয় করে তা থেকে যা আমরা তাদের দিয়েছি রিযিক হিসাবে গোপনে ও প্রকাশ্যে এবং অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করে, তাদের জন্যই রয়েছে পরিণতির ঘর হিসাবে সদাপ্রস্তুত জান্নাত।
আল্লাহর নিকট থেকে রাসূলে করীম (সা)-এর প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা যারা জানতে পারে এবং এই জানার ফলশ্রুতিতে তাদের আচরণ এই হবে যে, আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করবে, আল্লাহ্ যা পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন তা পূরণ করবে, নামায কায়েম করবে, অর্থদান করবে, অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করবে, বস্তুত কুরআনের দৃষ্টিতে তারাই মু'মিন। তার অর্থ কালেমা'র একটা পূর্ণাঙ্গ নৈতিক বিধান রয়েছে, শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের মন-মগজেও এই কালেমা প্রতিষ্ঠিত হবে সুদৃঢ়ভাবে।
যখন বলি যে, ইসলাম লোকদের প্রশিক্ষণ করে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্র ভিত্তিতে, তখন তার অর্থ এই হয় না যে, লোকদের শুধু এই কালেমার ওয়াজ শোনাতে হবে-ওয়াজ-নসীহত ও কালেমা বাস্তবায়নের একটি পন্থা সন্দেহ নেই-বরং এই কালেমা অনুযায়ী বাস্তব জীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও ব্যয় করতে হবে-এই কথাও তার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রাসূলে করীম (সা) ছিলেন মুসলমানদের আদর্শ নেতা, গোটা বিশ্বমানবতার অনুসরণীয় আদর্শ। বলা হয়েছে: "তোমাদের জন্য রাসূলে রয়েছে অতীব উত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও পরকালের মুক্তির আশা করে ও আল্লাহকে খুব বেশি করে স্মরণ করে।" তাঁর পরে সাহাবায়ে কিরামের স্থান ও মর্যাদা এবং তাঁদের পরে তাবেয়ীনরা প্রত্যেকটি ইসলামী সমাজের নিকট আদর্শ। এ জন্য প্রত্যক্ষ আদর্শের প্রয়োজন, আর তা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দীন ইসলাম। এই কারণেই ইসলাম ফরয করেছে যে, প্রতিটি পরিবার মুসলিম বাবা ও মা সমন্বিত হতে হবে। তারা হবে ইসলামী নৈতিকতার ধারক ও বাহক। কেননা যে পরিবার ইসলামী আদর্শ অনুসারী নয়, সে পরিবারের শিশুদের ইসলামী চরিত্রে ভূষিত হওয়া সম্ভব নয়।
এমতাবস্থায় ইসলামী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের সূচনা কেন্দ্র হচ্ছে ইসলামী পরিবার। এই পরিবারই অপরাধ প্রতিরোধ করবে-তার সীমা সংরক্ষিত করবে সূতিকাগার থেকেই। এই পরিবারে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হচ্ছে পিতা-স্বাভাবিকভাবেই যদিও তা পালন করবে বাবা ও মা মিলিতভাবে। কিন্তু কর্তা ও পরিচালক হবে পুরুষ-পিতা। কুরআনের ঘোষণাঃ "মেয়েদের উপর পুরুষরাই কর্তৃত্বশীল হবে।"
অতএব নারী ও পুরুষ সমন্বিত একটি পরিবারে পুরুষই হবে প্রথম দায়িত্বশীল। দায়িত্বশীল পরিবারের সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে, তাদের ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যাপারে।
দীন-ইসলামের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে কুরআন মজীদের আক্ষরিক পাঠও ইবাদত বলে গণ্য। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা চান যে, মুসলিম মাত্রেরই হৃদয়মন এই কিতাবের শাব্দিক ঝংকারেও মুখরিত হয়ে থাক। তার ফলে এই কিতাব তার অতীব নিকটবর্তী সাথী হবে, সে নিজেও হবে তার চিরন্তনের সঙ্গী।
এভাবে প্রথম আদর্শ রাসূলে করীম (সা)। তারপরে প্রথম মুসলিম সমাজ-সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীনের জীবন চরিত। তারপরই আমাদের সম্মুখে আসছে এই মহান কিতাব। আমাদের যাবতীয় তৎপরতা চলবে তাকেই ভিত্তি করে। আমাদের চিন্তা চরিত্র ও কর্মকাণ্ড এরই আলোকে পরিচালিত হবে। আর এভাবেই ইসলামী সমাজের প্রথম বীজ হবে মুসলিম পরিবার। এই পরিবার তার সন্তানদের ইসলামের নৈতিক বিধানের উপর গড়ে তুলবে। তাদের প্রথম শিক্ষা হবে বাস্তব আদর্শের আলোকে। তার পরে আসবে উপদেশ-নসীহত। তবে তাই একমাত্র এবং সার্বক্ষণিক ব্যাপার হবে না। কেননা অনেক ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক উপদেশ-নসীহত বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই কারণে স্বয়ং রাসূলে করীম (সা)-ও প্রতিদিনই উপদেশ-নসীহত প্রদান করতেন না। আসলে শিশু সন্তানরা মৌখিক উপদেশ নসীহতের পরিবর্তে বাস্তব আদর্শে বেশি করে অনুপ্রাণিত হয়। বিশেষ করে পিতা-মাতার নিকট সন্তানরা বাস্তবে যা দেখতে পায়, তারা তারই অনুসরণ করে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সন্তানদের উপর পিতা-মাতার একটা স্বাভাবিক কর্তৃত্বও থাকে। ফলে তাদের চারিত্রিক আদর্শ সন্তানদের মন-মগজে বেশি করে প্রতিফলিত হয়। অনুরূপভাবে শিক্ষকদের চরিত্রেরও প্রবল প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের উপর। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের নিকট থেকে বালক-বালিকা ও যুবক-যুবতীরা যা কিছুই শেখে, তা তাদের মন ও মগজে দৃঢ়মূল-বদ্ধমূল হয়ে থাকে। কাজেই পরিবারের প্রাথমিক ও সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গণের শুরু থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ বংশধরদের যদি প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও লালনে ভূষিত করা যায়, তাহলে মুসলিম সমাজে অপরাধ বলতে কোন কিছুর অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। আর মানবীয় দুর্বলতা ও শয়তানের অব্যাহত প্ররোচনার দরুন কখনও কোন কিছু সংঘটিত হলে একে তো তা হবে সাময়িক দুর্বলতার এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং চেতনার উদ্রেকের সাথে সাথে অপরাধী নিজেই তওবা করে তা থেকে বিরত হবে। এ ধরনের অপরাধ কখনই ব্যাপক ও সামাজিক ব্যাধির রূপ পরিগ্রহ করতে পারবে না。
ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ বিধান। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ করে। ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার উপর। আর সে জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান ব্যাপকতরকরণ ইসলাম অবলম্বিত উপায়-পন্থাসমূহের মধ্যে সর্বাধিক প্রাধান্যের অধিকারী।
ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান-ই ছিল ইসলামকে বাস্তবায়িত করার প্রধান ও প্রকৃষ্ট উপায়। নবী করীম (সা)-এর দীনী দাওয়াত ছিল ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচার-মাধ্যমে এবং সেই অনুযায়ী সাহাবীগণকে চলতে অভ্যস্ত করে দেওয়া। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে 'আদর্শ মানুষ' গড়ে তোলা। ইসলাম যে 'আদর্শ মানুষ' তৈরি করে, সে পৃথিবীর সর্বত্র তার উন্নত মানবিক চরিত্রের সংরক্ষণ করে।
ইসলাম মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালিয়েছে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ভিত্তিতে। এই কালেমা অনুযায়ী বাস্তব জীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের সূচনা কেন্দ্র হচ্ছে ইসলামী পরিবার। পরিবার তার সন্তানদের ইসলামের নৈতিক বিধানের উপর গড়ে তুলবে। পরিবারের প্রাথমিক ও সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গণের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ বংশধরদের যদি প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও লালনে ভূষিত করা যায়, তাহলে মুসলিম সমাজে অপরাধ প্রবণতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।
📄 অপরাধ দমনে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ-এর অবদান
দুনিয়ার জাতিসমূহ অপরাধ প্রতিরোধে প্রাণপণ চেষ্টা ও সংগ্রাম করে থাকে এবং সেজন্য তারা নানাবিধ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেও এক বিন্দু দ্বিধা বোধ করে না। কেননা নিত্য সংঘটিত অপরাধ মানুষের নিরাপত্তা বোধকে ধ্বংস করে, মানুষকে প্রতি মুহুর্ত রাখে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে। নিরাপত্তাহীন সমাজে মানুষের মনে সব সময়ই একটা আতংক বিরাজ করে। কি জানি, কোন্ মুহুর্তে কি অঘটন সংঘটিত হয়ে পড়ে।
বস্তুত অপরাধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। তা সমাজ জীবনে টেনে আনে চরম মাত্রায় দুর্ভাগ্য ও হতাশা। কেননা অপরাধ শান্তি ও নিরাপত্তাকে নির্মূল করে দেয়। অথচ এই শান্তি ও নিরাপত্তা বোধই হচ্ছে সামাজিক জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। এই প্রশান্ত সমাজ জীবন সংরক্ষণের লক্ষ্যে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য জাতিসমূহ নানা উপায় ও পন্থার উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। এজন্য নানা প্রকারের আইন-কানুন ও বিধি বিধান রচনা করে। সে সব আইন বিধানে তারা নানা প্রকারের ধারা-উপধারা সংযোজিত করে। সে জন্য প্রশাসনিক ও পুলিশী পাহারাদারীর বাস্তব ব্যবস্থাপনাও গ্রহণ করে। এই সব কিছুর মূলে লক্ষ্য থাকে অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে প্রবল প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করা যেন অপরাধ আদপেই সংঘটিত হতে না পারে।
অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজে সাধারণভাবে গৃহীত উপরোক্ত কর্মপন্থা সম্পর্কে একটু গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিচার-বিবেচনা করলেই একটি মাত্র সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। আর তা হচ্ছে, এই সব আইন-বিধান এবং সেজন্য গৃহীত প্রশাসনিক কর্মপন্থাসমূহের লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধ হতে না দেওয়া। বলা হয়, কোন একটা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হলে তা ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকের কাজ করে। কিন্তু বাস্তব ঘটনায় এই কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুদীর্ঘ কাল ধরে বারবার সংঘটিত একই ধরনের ঘটনাবলীর বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, অপরাধের শুধু শাস্তি বিধান অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু অপরাধীকে শাস্তি প্রদানই অপরাধ বিস্তার ও পুনরাবৃত্তি সাধনকে রুখতে পারে না, তেমনি অন্যদেরকেও শুধু তা-ই অপরাধ সংঘটন থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয় না।
অপরাধী অপরাধ সংঘটনের জন্য যেমন একটা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করে নেয়, তেমনি তার অনিবার্য শাস্তি এড়ানোর জন্যও অনেক সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। অপরাধ তদন্তকারীরা যাতে করে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পেতে না পারে এবং এই অপরাধের বিচার করাও যাতে করে অপরাধীর উপর দণ্ডারোপ ও কার্যকর করতে সক্ষম না হয়, সেজন্য সম্ভাব্য সর্ব প্রকারের কৌশল গ্রহণেও এক বিন্দু পিছ পা হয় না। ধরা পড়ে গেলেও যাতে করে আইনের মারপ্যাঁচ ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম আইনের বিশ্লেষণের সাহায্যে সে দণ্ড থেকে রক্ষা পেয়ে যেতে পারে, তার জন্য একালে কলাকৌশলের এক বিন্দু কম নেই। রকমারি অপরাধের উদ্ভাবন যেমন একালের বৈশিষ্ট্য, তেমনি আইনের চোখে ধূলি দিয়ে দণ্ড এড়ানোর উপায় উদ্ভাবনেও এ কালের অবদান বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এটা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি এবং এই দিকে ইঙ্গিত করেই মানুষের স্রষ্টা ঘোষণা করেছেন: "কিন্তু মানুষ খুব বেশি ঝগড়াটে ও বিতর্ককারী হয়ে দাঁড়িয়েছে।" "ওরা এসব দৃষ্টান্ত তোমার সম্মুখে নিয়ে এসেছে নিছক কুটতর্কের উদ্দেশ্যে। আসলে ওরা লোক খুব ঝগড়াটে।"
এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অপরাধ প্রতিরোধে সফল এমন অনেক উপায় ও পন্থাই রয়েছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক মানব সমাজ সে বিষয়ে বিন্দুমাত্রও অবহিত নয়। এই কারণে তারা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র করছে না। আর এ পর্যায়ে চেষ্টা-প্রচেষ্টা যতই তারা চালাচ্ছে, সবই একের পর এক ব্যর্থই হয়ে যাচ্ছে। অপরাধ দমনের জন্য অতীব সফল ও অধিকতর কার্যকর যে পন্থার দিকে এই মাত্র ইঙ্গিত করা হলো তা হচ্ছে অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার কার্যক্রম। এমন উপায় অবলম্বন যার দরুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশংকাই থাকে না। অথবা খুবই কম আশংকা থাকবে এবং অপরাধের মাত্রা খুবই কম হয়ে দাঁড়াবে। এমনকি, অপরাধ সংঘটিত হলেও সাধারণ নিরাপত্তাহীনতা ও আতংক সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া নিঃশেষ হয়ে যাবে। বস্তুত শুধুমাত্র মানবীয় চিন্তা-গবেষণা উদ্ভাবন এমন সম্যক আইন বিধান রচনায় সম্পূর্ণ অক্ষম, যা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে মানবতার জন্য একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনে দীর্ঘাতিদীর্ঘ কাল অতিবাহিত হয়ে গেছে মানুষের উপর দিয়ে কিন্তু মানুষ অপরাধ দমন প্রচেষ্টায় এক বিন্দু সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। এরূপ অবস্থায় মানবতার জন্য একমাত্র করণীয় হচ্ছে মহান আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। কেননা ভাল-মন্দ সমন্বিত এই মানুষের তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। মানুষ তার যাবতীয় সমস্যার সমাধান এবং কল্যাণ পথের দিশা একমাত্র তাঁরই নিকট থেকে লাভ করতে পারে। অপরাধ দমনে তাঁর ঐকান্তিক সাহায্য মানুষের জন্য একান্তই অপরিহার্য। আগেই বলেছি, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই-এমনকি তার পরেও দমন করতে মানবীয় আইন রচনা ও কার্যকর ভিত্তিক যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে গেছে। মানুষ অপরাধের শাস্তি বিধানের আইন অনেক রচনা করেছে কিন্তু তা অপরাধ প্রবণ লোকদের মধ্যে অপরাধ বিমুখতা-অপরাধের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। তার প্রমাণ এত সব আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যকর থাকা সত্ত্বেও অপরাধের মাত্রা নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যাওয়া। এমনকি যারা একবার অপরাধ করে আইনের বিচারে দণ্ডিত হয়েছে, তারাও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে না। প্রচলিত আইনে অপরাধের দণ্ড সাধারণত জেল-হাজতই হয়ে থাকে। কিন্তু একথা সকলেরই মুখে মুখে যে, চোর-ডাকাত খুনী জেল থেকে ফিরে আসতে পারলে সে হয় বড় চোর, ভয়ানক ডাকাত এবং অধিকতর নির্মম খুনী। কেননা অপরাধ করার পর আইনের বিচারে তারা যে শাস্তি ভোগ করেছে, তা তাদের মন-মগজে ও মেজাজের উপর একবিন্দু দাগ কাটতে পারেনি। মূল প্রকৃতিতে নিহিত অপরাধ প্রবণতা নির্মূল হয়নি। শুধু তা-ই নয়। তা সতেজ বৃক্ষের মত শক্ত কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে।
আসলে মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলা। মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে তা তাঁর মত আর কেই-ই জানে না, জানতে পারে না। তাই তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে নিজেই আইন প্রণয়ন করে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে নাযিল করেছেন। এই পর্যায়ে দু'টি দৃষ্টান্ত দিয়ে বক্তব্যকে স্পষ্ট করে তুলতে চাই।
একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে চোরের হাত কাটার ব্যাপার। শরীয়ত আরোপিত শর্তসমূহের ভিত্তিতে চুরি প্রমাণিত হলে অবশ্যই চোরের হাত কাটতে হবে। আল্লাহ্ অন্য যে কোন সৃষ্টির তুলনায় মানুষের প্রতি অধিকতর দয়াশীল। তিনি চোরের জন্য যে শাস্তি বিধান করেছেন, তাতে মানুষের সার্বিক কল্যাণই বিধৃত, অকল্যাণের লেশমাত্র নেই এ'তে। কিন্তু একালের আইন রচয়িতাগণ চুরি অপরাধের জন্য এই দণ্ড অগ্রাহ্য করেছে। তার পরিবর্তে তারা যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে, তা মানুষকে সংশোধন করতে ও চৌর্যবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়নি। সে শাস্তি এই অপরাধের অবসান ঘটাতেও পারে নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের একবিন্দু বোধোদয় হচ্ছে না।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ফৌজদারী অপরাধের শাস্তি অনুরূপ ঘটনা ঘটানো। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: "তোমরা যুলুম করবে না, তোমাদের প্রতিও যুলুম করা হবে না।" অর্থাৎ ফৌজদারী অপরাধের শাস্তি হবে অপরাধের সমান। অপরাধ যা, তার শাস্তিও তাই। তাতে কোনরূপ যুলুম হওয়ার আশংকা বা অবকাশ থাকবে না।
সন্দেহ নেই, এমন বহু লোকই রয়েছে যারা চুরি ও দেহের ক্ষতিসাধনের অপরাধ থেকে বিরত থাকতে পারে বলে মনে করা যায় কেবল মাত্র তখন, যদি তারা তাদেরও অনুরূপ অঙ্গহানি বা কিসাস হওয়ার ভয়ে ভীত হয়।
মানুষ আল্লাহ্র নিকট অতীব সম্মানার্হ সৃষ্টি। তাই তাদের সভ্য করে তোলার এবং তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসার ব্যাপারটি এত কম সংখ্যক লোকের উপর ন্যস্ত করা কিছুতেই যুক্তিযুক্ত মনে করা যায় না, যারা তাদের বিশেষ অবস্থার সংশোধন সফল করতে সক্ষম হবে না। তাদের যাচাই করলে তাদের বিশেষ জীবনেই বহু সংখ্যক স্ব-বিরোধিতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নানা জটিল সমস্যা দেখা যাবে। এরূপ অবস্থায় মানুষের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের উপর কিছুতেই অর্পণ করা যেতে পারে না।
এই প্রেক্ষিতেই মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে তাঁরই সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর নিকট যে মহামূল্য গ্রন্থ কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে, তার গুরুত্ব বিবেচ্য। মানুষের উপর দিয়ে বহু আবর্তন-বিবর্তন অতিবাহিত হওয়ার পরই সর্বশেষ পর্যায়ে এই মহান গ্রন্থখানি অবতীর্ণ হয়েছে। এর পূর্বে আরও যে সব গ্রন্থ নাযিল হয়েছিল তা যেমন বিশেষ লোকদের জন্য বিশেষ সময়ের মধ্যে সীমিতভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যে, সেই লোক ও কালের অবর্তমানে সে সব অপ্রয়োজনীয় যুগ-অনুপযোগী ও মানব সমস্যার সমাধানে অক্ষম প্রমাণিত হওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। অবশ্য তাতে যে সব স্থায়ী অক্ষয় ও সর্বকালীন মূল্যমান (Values) সম্বলিত নীতি আদর্শ ছিল এবং যা মানব প্রকৃতির বিবর্তনশীল প্রবণতার সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন ছিল তা সর্বশেষ গ্রন্থে স্ব-মর্যাদা সহকারে সংযোজিত হয়ে শাশ্বত হয়ে রয়ে গেছে। এখনও তা অমোঘ ও চিরন্তন, যেমন অন্য নতুন বিধানসমূহ চিরন্তন ও অমোঘ। আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিম্নোদ্ধৃত দুইটি আয়াতে তা ঘোষণা করেছেন:
"মহা দয়াবান ও অতিশয় মেহেরবানের নিকট থেকে অবতীর্ণ এই কিতাব। এর আয়াতসমূহ আলাদা আলাদা করে পেশ করা হয়েছে আরবী ভাষায় পঠনীয় করে সেই লোকদের জন্য যারা জানে, সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদাতা হিসাবে। এ এমন এক গ্রন্থ যার আয়াতসমূহ সুদৃঢ় ও পরিপক্ক করা হয়েছে এবং পরে ভিন্ন ভিন্ন করা হয়েছে সুবিজ্ঞানী ও সর্ববিষয়ে অবহিত (মহান আল্লাহ্) নিকট থেকে।"
বস্তুত কুরআনের আয়াত এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকারী সুন্নাতের মূলের অকাট্য দলীলসমূহে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ও পরে তার প্রতিরোধের সমস্ত দিক সম্পর্কে বিপুল উপাদান সঞ্চিত হয়ে আছে। বিপুল সংখ্যক ইসলামী গ্রন্থেও রকমারি অপরাধমূলক ঘটনাবলীর সুবিন্যস্ত আলোচনা-পর্যালোচনার ও ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ভান্ডার পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। এখানে সেই সবকিছুর পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। আমি এখানে যে দিক নিয়ে আলোচনার অবতারণা করেছি, তা হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নিজের উপস্থাপিত 'আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুনকার'-এর বিষয়। মুসলিম উম্মাতকে লক্ষ্য করে তিনি ইরশাদ করেছেন:
"তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল অবশ্যই এমন হতে হবে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাতে, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করণের কাজে সব সময়ই ব্যাপৃত থাকবে। তোমরাই হচ্ছ উত্তম জনসমষ্টি। তোমরা ভালো কাজের আদেশ কর মন্দ কাজ করতে নিষেধ কর এবং সর্বাবস্থায়ই ঈমান রাখো আল্লাহর প্রতি।"
আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ রয়েছে: "তোমরা পরস্পরের সাহায্য কর পূণ্যময় কল্যাণ ও আল্লাহর ভয়সম্মত কাজে-কর্মে এবং কোনরূপ পারস্পরিক সাহায্যে এগিয়ে আসবে না গুনাহ, পাপ অন্যায় ও সীমালংঘনমূলক কার্যাদিতে। তোমরা ভয় কর আল্লাহকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কঠিন আযাব প্রদাতা।"
ইসলামী ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত অধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে বায়'আতে আকাবা। তাতেও 'ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ' এর উপর অকাট্য দলীলের উল্লেখ হয়েছে। বলা হয়েছে: আমরা বললাম, হে রাসূল; আমরা আপনার হাতে কি বিষয়ের উপর বায়'আত করব? বললেন: "তোমরা আমার হাতে বায়'আত করবে শ্রবণ ও আনুগত্য করার জন্য খুশি ও অখুশি সকল অবস্থায়ই। এবং ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজ নিষেধকরণের বিষয়ে।"
আমর বিল মারূফ-এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জনসাধারণের হৃদয়-মনে এই বিশ্বাস দৃঢ়প্রত্যয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করা যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ইহকালীন কার্যকলাপের প্রতিদান দেওয়ার জন্য জান্নাত, জাহান্নাম, কবর জীবনের আযাব বা নিয়ামতসমূহের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহর রোষ-অসন্তোষ কিংবা তাঁর সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করেই নির্ণীত হয় বান্দার পরকালীন সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য। এই বিশ্বাসকে দৃঢ়মূল করে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে 'আমর বিল মারূফ' ও নিহী আনিল মুনকার'-এর ভূমিকা অত্যন্ত প্রকট ও প্রবল। ফলে অপরাধ পরিহার করে চলার প্রবণতা এই বিশ্বাস থেকেই উৎসারিত হয়। অপরাধ করার ইচ্ছা কারুর মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই এই বিশ্বাস ও প্রত্যয় তার পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। সেদিকে এক পা অগ্রসর হওয়াও আর সম্ভব থাকে না। বস্তুত অপরাধ দমন-অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার ব্যাপারে এ এক কার্যকর ও সফল প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক, সন্দেহ নেই। অতএব অপরাধের পথে এই প্রত্যয় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার সাথে মানব রচিত আইনের প্রতিবন্ধকতার কোন তুলনা-ই করা চলে না।
অবশ্য একথা স্বীকার্য যে, আল্লাহ্ তা'আলাও তাঁর কর্মফল প্রদান ব্যবস্থার প্রতি বর্ণিত বিশ্বাস সব মানুষের মনে সমানভাবে প্রবল হয়ে থাকে না। কোন কোন লোক অত্যন্ত দুর্বল ঈমানের ধারক হয়ে থাকে। ফলে যে প্রবল অপরাধ প্রবণতার কাছে অনেক সময় পরাজিত হয়ে অপরাধ ঘটিয়ে থাকে। অথবা এমন সব কার্যকলাপের মধ্যে জড়িত হয়ে পড়ে যার পরিণতিতে অপরাধ করাটা অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই তত্ত্বটি প্রকট করে তোলার জন্য এখানে একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছে:
মদ্যপানের পরিণতি অত্যন্ত খারাপ-একথা সর্বজনস্বীকৃত। হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা) তা একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের পূর্বের এক সমাজের একটি লোককে বলা হলো, তুমি এই যুবককে হত্যা কর, না হয় এই মেয়েলোকটির সাথে যিনা কর। আর তা-ও করতে রাযি না হলে তোমার সম্মুখস্থ এই মদ্য পান কর। লোকটি ভাবল, যুবকটিকে শুধু শুধুই হত্যা করতে বলা হচ্ছে। অথচ সে তো কাউকে হত্যা করেনি। এমতাবস্থায় তাকে হত্যা করা মহা গুনাহের কাজ হবে। আর যিনা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু তা খুবই লজ্জাকর ও নির্লজ্জ চরিত্রহীনতার কাজ হবে। তার তুলনায় বরং মদ্যপান অনেক সহজ কাজ। অতঃপর সে মদ্যপান করল। তাতে সে মাতাল হলো ও বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলল। ফলে সে যুবকটিতে হত্যা করল প্রথমে এবং পরে মেয়েলোকটির সাথে যিনাতেও লিপ্ত হল। এই কারণে মদ্যকে 'উম্মুল খাবায়েছ'-সকল অন্যায় ও পাপ কার্যের মৌল উৎস বলা হয়। আর সকল প্রকার অন্যায়, দুর্নীতি ও পাপ কাজ বন্ধ করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম এই মদ্য পানকেই নিষিদ্ধ করতে হবে।
বস্তুত আমর বিল-মারূফ ও নিহী আনিল মুনকার' এই মদ্যপান, মদ্য উৎপাদন বা আমদানী, মদ্য উৎপাদকের সহিত সহযোগিতা-সাহচর্য, মদ্য ব্যবসায়, মদ্য বিক্রয় ইত্যাদি সবই বন্ধ করে দেয়। ইসলামী শরীয়তে এসব কাজকে চূড়ান্তভাবেই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যেসব উচ্চতর মূল্যবোধের ফলে সমস্ত প্রকারের অপরাধ দমিত হতে পারে, আমর বিল্-মা'রূফ ও 'নিহী আনিল মুনকার' সেই মুল্যবোধকেই মানুষের মনে জাগ্রত ও সক্রিয় করে তুলে। কিন্তু মানব রচিত আইন সেই মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে কখনই পারে না। অপরাধ প্রতিরোধে আল্লাহর শরীয়তের মহান অবদান হচ্ছে এই ব্যবস্থা। 'আমর বিল্ মা'রূফ ও 'নিহী আনিলী মুন্কার'-এর চরিত্র ও মান-সম্মান সংরক্ষণ পর্যায়ের বড় কাজ হচ্ছে মূলতই কোন অপরাধ যেন সংঘটিত হতে না পারে, অপরাধ হওয়ার কারণসমূহই যেন নির্মূল হয়ে যায় এবং তার ফলে যেন মান-মর্যাদা বিনষ্ট হওয়ার মত ঘটনাও সংঘটিত না হয়।
ভিন্ পুরুষের সম্মুখে স্ত্রীলোকদের নগ্নতা-উলঙ্গতা সহকারে বের হতো নিষেধ করা হয়েছে। এই নিষেধটিও উপরোল্লিখিত দৃষ্টিকোণে বিবেচ্য। বলা হয়েছে: "আকর্ষণীয় সাজে সজ্জিত হয়ে তোমরা ভিন্ পুরুষের সামনে বেরোবে না, যেমন করে জাহিলিয়তের যুগে মেয়েরা বের হতো।" আরও বলা হয়েছে: "এবং তাদের স্বামী, পিতা, স্বামীর পিতা, পুত্র-সন্তান, স্বামীর পুত্র-সন্তান, তাদের ভাই, ভাই পুত্র, তাদের বোনের পুত্র বা তাদেরই মত স্ত্রীলোক অথবা তাদের ক্রীতদাস, কিংবা অধীন যৌন তাকীদহীন পুরুষ বা স্ত্রীলোকদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে ধারণাহীন বালকদের ছাড়া অপর কারুর সামনে যেন তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। সেই সাথে তাদের পা যেন এমনভাবে নিক্ষেপ না করে, যার ফলে তাদের গোপন সৌন্দর্য লোকদের নিকট প্রকাশমান হয়ে পড়ে।" বলেছেন : "(মেয়েলোকরা চলাফিরা করবে) নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশিত না করে।"
নারী দেহের সৌন্দর্য গোপন করে রাখার ও চলার এই নির্দেশ এবং তা ভিন্- গায়ের মুহরিম পুরুষদের সম্মুখে প্রকাশ করার এই নিষেধও ঠিক এই লক্ষ্যেই ঘোষিত হয়েছে, যেন তা দেখে পুরুষরা অপরাধের কাজে প্রবৃত্ত হয়ে না উঠে।
বস্তুত মুসলমানরা যদি এই উন্নতমানের নিষেধ ও নির্দেশসমূহ যথাযথভাবে পালন করে বলে-নারী-পুরুষের মাঝে শরীয়তসম্মত পর্দা পুরাপুরি পালন করা হয়, তা'হলে স্বাভাবিকভাবেই এই পর্যায়ের অপরাধ খুবই বিরল হয়ে যাবে। যদি কোথাও এই বিধান লংঘিত হতে থাকে, তা'হলে 'আমর বিল্ মারূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার' বিভাগীয় লোকজন তা কঠোর হস্তে দমন করবে, তা হতে দেবে না। তাদের এই কার্যক্রম ও প্রকারান্তরে অপরাধ দমনের কাজকে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও কার্যকর করে তুলবে।
গায়র মুহরিম স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিক অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করে ইসলামে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন : "তোমরা ভিন্ মেয়েলোকদের মধ্যে ঢুকে পড়া থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখবে।" সাহাবীগণ বললেন, হে রাসূল, দেবরকে দেখা দেওয়ার ব্যাপারে আপনার রায় কি? বললেন : "দেবর তো মৃত্যু।" অর্থাৎ দেবর নৈতিক দিক দিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। অতএব তাকে মৃত্যুবৎ ভয় করতে হবে এবং তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। তার সাথে অবাধে বা নিরিবিলিতে দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশা করা চলবে না।
হাদীসে ব্যবহৃত الخنز শব্দটির আসল অর্থ 'স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে কেউ। স্বামীর ভাই, বন্ধু, খালাতো-চাচাতো, মামাতো-ফুফাতো ভাইরাও এর মধ্যে গণ্য। তাই এদের 'মৃত্যু' সমতুল্য মনে করে এদের সহিত অবাধ মেলামেশা করা থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ ও পরকালের উপর কোন ঈমানদার কোন মহিলার পক্ষেই মুহারিম পুরুষ সঙ্গে ছাড়া বিদেশ সফরে যাওয়া কিছুতেই জায়েয নয়।"
একজন সাহাবী বললেন, আমার স্ত্রী একাকিনী হজ্জ করতে চলে গেছে; আমি যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলাম বলে আমি তার সঙ্গে যেতে পারিনি। এই কথা শুনে নবী করীম (সা) বললেন: "তুমি এক্ষুণি চলে যাও, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে থেকে হজ্জ পালন কর।" অতঃপর তিনি বললেন: "কোন ভিন্ পুরুষ নারী নিভৃতে একাকীত্বে মিলিত হলে শয়তান তথায় তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে ওয়াসওয়াসা দিবার জন্য উপস্থিত হয়।"
হযরত উমর (রা) এক ব্যক্তিকে দেখলেন নিরিবিলিতে এক মহিলার সাথে কথা বলছে। তিনি তখনই তাকে দোরা মেরে শায়েস্তা করে দিলেন। এ করে তিনি প্রকৃতপক্ষে 'আমর বিল্ মা'রূফ এবং 'নিহী আনিল মুন্কার'-এরই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নারী পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নীচু করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কুরআন মজীদে এর মূলে নিহিত কারণ পর্যায়ে জনৈক আরব কবির একটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট: "প্রথমে দৃষ্টি বিনিময়, পরে মুচকি-মিষ্টি হাসির প্রকাশ, পরে অভিবাদন, তারপরে কথাবার্তা, ওয়াদা তথা প্রতিশ্রুতি, আর শেষ কালে সাক্ষাতকার।"
বস্তুব যে সমাজেই চরিত্রহীনতার কাজ ব্যাপক, তথায় আল্লাহ্র নিকট থেকে কঠিন আযাবসমূহ ক্রমাগত অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত। হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই নির্লজ্জতা প্রকাশমান, পরে তারা তারই ব্যাপক প্রচারেরও ব্যবস্থা করে, তথায় তার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারি, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হয়ে দেখা দেবে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনই দেখা যায়নি।"
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের একটি অংশ: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ব্যভিচার ব্যাপক হবে, তথায় মৃত্যুর আধিক্য ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে।" রাসূলে করীম (সা) আরও বলেছেন: "কোন জনপদে ব্যভিচার ও সূদী কারবার ব্যাপক হলে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আযাব টেনে আনবে।" হযরত আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ব্যভিচার ব্যাপক ও প্রকাশমান হবে, তারা নিজেরাই ধ্বংস হতে শুরু করবে।" হযরত বুরায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই নির্লজ্জতা প্রকাশমান হয়ে পড়বে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরই উপর মৃত্যু অবধারিত করে দেবেন।" হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন: "আমার উম্মতের লোকদের মধ্যে অবৈধ সন্তানের প্রকোপ না হওয়া পর্যন্ত তারা মহা কল্যাণের মধ্যেই থাকবে। তাদের মধ্যে অবৈধ সন্তান যদি ব্যাপক হয়ে পড়ে তাহলে আল্লাহ্ তাদেরকে ব্যাপক আযাবে পরিবেষ্টিত করে দেবেন, তা অসম্ভব নয়।"
উপরোদ্ধৃত হাদীসমূহে যেসব নির্লজ্জতার কাজ সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে, তার ব্যাপকতার অর্থ সেসব ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণসমূহের ব্যাপকতা। অর্থাৎ আসল ঘটনার পূর্বে এমন সব অগ্রবর্তী ঘটনাবলী অবশ্যই সংঘটিত হবে, যার ফলে উক্ত নিষিদ্ধ ঘটনাবলী সংঘটিত হবে। আর তা হচ্ছে নারীদের উলঙ্গ ও সুসজ্জিত হয়ে অবাধ উন্মুক্তভাবে ভিন্ পুরুষদের মধ্যে চলাফেরা করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ধরাধরি, ইশারা-ইঙ্গিত, চুম্বন-মর্দন ইত্যাদি। আর এগুলি অতীব অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজ। 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুন্কার' বিভাগের কাজই হচ্ছে, এইগুলির প্রচলন হতে না দেওয়া, এসব সম্পর্কে জনতাকে সতর্ক করা। কেননা এগুলি হতে দেওয়ার পরিণতি চূড়ান্তভাবে পাশবিকতার সমর্থন এবং লোকদের সম্মুখে তা প্রকট হয়ে দেখা দেওয়া।
আমরা মানুষের দুই ধরনের সমাজের কল্পনা করতে পারি। এক ধরনের সমাজ তা যেখানে মহান শরীয়তের বিধান পুরাপুরি কার্যকর। আর দ্বিতীয় ধরনের সমাজ তা, যেখানে তা হয়নি। যে সমাজে শরীয়তের অনুশাসন কার্যকর নয়, তথায় অপরাধ প্রবণতা যে কত প্রচণ্ড তা সহজেই অনুমেয়। পক্ষান্তরে যে সমাজে ইসলামী অনুশাসনসমূহ পুরাপুরি বাস্তবায়িত, সে সমাজ কতইনা পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং সকল প্রকারের চরিত্রহীনতা থেকে মুক্ত। এক কথায় তা-ই হচ্ছে অপরাধ মুক্ত সমাজ।
উপরোক্ত বিধানগুলো হচ্ছে ইসলামের নেতিবাচক, নিবর্তনমূলক বা Preventive আইন, যা 'নিহী আনিল মুন্কার' পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামের ইতিবাচক ও উৎসাহ প্রদানমূলক বিধান এ থেকেও অধিক গুরুত্বের অধিকারী। এসব আইনের শিরোনাম হচ্ছে 'আল-আমর বিল মা'রূফ-ন্যায় সত্য ও সুন্দরতম কার্যাবলীর নির্দেশ ও উৎসাহ দান। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ইতিবাচক বিধানের গুরুত্ব নেতিবাচক বিধানের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এর উল্লেখও প্রথম।
ইসলামের এ পর্যায়ের কাজ হচ্ছে, জনগণের মধ্যে উত্তম পবিত্র চরিত্রের প্রবণতা সৃষ্টি ও সেজন্য ব্যাপকভাবে উৎসাহ দান এবং সেই সাথে সকল প্রকার হীনতা-নীচতা নির্লজ্জতা পরিহার করার উদাত্ত আহ্বান। এই পথে লোকদের অনুপ্রাণিত ও পরিচালিত করার জন্য উভয় দিকের ধারক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ, যেন মানুষ কোনক্রমেই অপরাধের মধ্যে পড়ে না যায়। কেননা একথা জানা-ই আছে যে, এই ব্যাপারটি যদি তাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হতো, তাহলে তারা নিঃসন্দেহে নিজেদের বড় ক্ষতি সাধান করত। গোট জাতি বা জনসমষ্টি তাদের কৃত অপরাধে জর্জরিত হয়ে পড়ত। এই কথা বোঝাবার লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা'আলা অতীতকালের একটি জনসমষ্টি সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, যারা আমর বিল মা'রূফ-এর কাজ সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল, প্রত্যাহার ও প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর তারই ফলে তাদের উপর অভিসম্পাত এসেছিল। এই সংবাদ দানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাদের মত কার্যপদ্ধতি ও আচার-আচরণ গ্রহণের স্পষ্ট নিষেধ।
ইরশাদ হয়েছে: "বনী ইসরাঈল বংশের যেসব লোক কুফরী অবলম্বন করেছিল, তাদের উপর দাউদ ও মরিয়ম-পুত্র ঈসার মুখে অভিশাপ বর্ষণ করানো হয়েছে। তার কারণ ছিল এই যে, তারা নাফরমানী করেছিল এবং তারা প্রায়ই সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ করতে থাকত। আর তার আসল কারণ এই ছিল যে, তাদের লোকেরা যেসব অন্যায় কাজ করত, তা থেকে তারা পরস্পরকে বিরত রাখতে চেষ্টা করত না-কেউ কাউকে নিষেধ করত না। আসলে তাদের এই কাজটিই ছিল অত্যন্ত খারাপ পরিণতির উদ্ভাবক।"
রাসূলে করীম (সা) যখন এই আয়াতটি পাঠ করে সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে শুনিয়েছিলেন এক-একটি বাক্য করে, তখন তিনি সাথে সাথে এই কথাও বলেছিলেনঃ "না, না, এটা ভালো নয়। আল্লাহর শপথ, তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে লোকদের নিষেধ করবে-বিরত রাখবে নির্বোধের হাত ধরে ফেলবে এবং তাকে সত্য নীতির উপর শক্তভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে। নতুবা অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদেরকে আযাবে পরিবেষ্টিত করে ফেলবেন। পরে হাজার ডাকলেও তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না।"
মূলত 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার'-এর কাজটি একটি ঢাল বিশেষ। তা বড় বড় অপরাধ সংঘটনের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক ও প্রতিরোধক। রাসূলে করীমের (সা) নিম্নোক্ত রূপক ও উপমামূলক ঘটনা থেকেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। কথাটি এই: আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমাসমূহ রক্ষা করে যে চলে এবং যে তা লংঘন করে এই দুই-জনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, অনেক গুলো লোক একত্রে একটি দ্বিতল নৌকাযোগে সমুদ্র যাত্রা করেছিল। তাদের কিছু লোক ছিল নিচের তলায় এবং অপর কিছু লোক বসেছিল উপর তলায়। পানির ভাণ্ডার ছিল উপর তলায়। নিচের তলার লোকেরা পানির প্রয়োজনে উপর তলায় আসা-যাওয়া করত। তাতে উপর তলার লোকেরা খুবই উত্ত্যক্ত ও অস্বস্তি বোধ করল। তা দেখে নিচ তলার লোকেরা বলল, হ্যা আমরা যদি নৌকার তলায় ছিদ্র করে পানি গ্রহণ করি, তা'হলে আর আমাদের কারুর উপর তলায় যাতায়াতের প্রয়োজন পড়বে না। এক্ষণে উপর তলার লোকেরা যদি নিচতলার লোকদিগকে নৌকার তলায় ছিদ্র করা থেকে শক্তভাবে বিরত রাখতে পারে, তা'হলে সকলেই বেঁচে যাবে। আর তারা যদি ওদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেয় ব্যাপারটি, তা'হলে নৌকারোহী সকলেই ডুবে মরবে।
ইসলামের এই প্রতিরোধমূলক ও উৎসাহদানমূলক বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসলাম ঘোষিত ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকারের সহিত এ আইনের কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য নেই। মুসলিম জাহানের অনেকেই ইসলাম প্রদত্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকারের ভুল অর্থ বুঝেছেন। আর তার এই ভুল অর্থ বোঝানোর দরুন তারা 'আমর বিল মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকারের'-কাজটি প্রত্যাহার করেছে, আসলে ইসলাম ঘোষিত ব্যক্তি স্বাধীনতার অর্থ সমষ্টিকে ধ্বংসের আয়োজন করার অধিকার নয়। সে অধিকার কখনই এবং কাউকেই দেওয়া হয়নি।
'ভালো'র আদেশ' ও 'মন্দের নিষেধ' সংক্রান্ত উপরোক্ত বিধান মুসলিম সমাজে সদ্য কার্যকর রয়েছে। ফলে সে সমাজ চিরন্তন শান্তি ও নিরাপত্তায় ধন্য হয়ে রয়েছে চিরকাল। 'ভালো'র আদেশ' ও 'মন্দের নিষেধ'-এর শুভ ফল ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে- একথা স্বয়ং রাসূলে করীম (সা)-ই বলেছেন। তাঁর ইসলামী দাওয়াতের সেই শুভ সূচনাকাল, সাহাবীদের সংখ্যা তখনও খুবই অল্প। তাঁদের উপর কাফিরদের অত্যাচার নিপীড়নের করুণ কাহিনী রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট বর্ণনা করেছিলেন। তখন তিনি ইরশাদ করেছিলেন: "আল্লাহর নামে শপথ! আমার আরদ্ধ এই ইসলামী বিপ্লবের কাজটিকে তিনি অবশ্যই পূর্ণপরিণত ও সম্পূর্ণ করবেন। ফলে এমন নিরাপত্তা সর্বত্র বাস্তবায়িত হবে যে, একজন পথিক 'সামা' থেকে হাজারা মাউত পর্যন্ত একাকী চলে যাবে; কিন্তু তাতে সে কিছু মাত্র ভয় পাবে না-আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকেই তাকে ভয় করতে হবে না। অবস্থা এমন হবে যে, বাঘে-শৃগালে এক সাথে বিচরণ করবে।" হাতেম তাই পুত্র আদী (রা) ইসলাম কবুল করলে নবী করীম (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হয়ত তুমি ইসলাম কবুল করতে বিলম্ব করেছ শুধু এই কারণে যে, তুমি দেখতে পাচ্ছিলে, ইসলামের দুশমনদের সংখ্যা অনেক বেশি, আর ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা অনেক কম? "আল্লাহ্ নামের শপথ করে বলছি, খুব শীঘ্রই তুমি শুনতে পাবে, একটি মেয়েলোক কাদেসিয়া থেকে তার উষ্ট্রযানে সাওয়ার হয়ে মদীনার এই ঘর পর্যন্ত চলে আসবে; কিন্তু এই দীর্ঘ পথের মধ্যে সে তার সওয়ারীর চুরির ভয় করবে না।" আদী বলেন: এই কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তা-ই যদি হয়, তাহলে তখন 'তাই' গোত্রের চোরদের অবস্থা কি দাঁড়াবে?
এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, মুসলিম উম্মত 'আমর বিল মা'রূফ-এর দায়িত্বের প্রতি যখনই উপেক্ষা প্রদর্শন করেছে, আল্লাহর শরীয়তকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবায়িতকরণের দায়িত্ব পালনে অনীহা বা অবজ্ঞা দেখিয়েছে, তখনই সমাজ ক্ষেত্রে নানাবিধ অপরাধ প্রচণ্ড হয়ে দেখা দিয়েছে। আর তা খুবই স্বাভাবিক ও সামঞ্জস্যশীল পরিণতি তাতে একবিন্দু সন্দেহ নেই। আল্লাহ্ তা'আলার এই ইরশাদ ও ঘোষণা কতই না সত্য! "নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা কোন জনসমষ্টির অবস্থা পরিবর্তন করে দেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করছে।"
বস্তুত যখনই ঈমান শক্তিশালী হবে এবং ইসলামী শরীয়ত সাধারণভাবে বাস্তবায়িত হবে আর তার ফলে সমাজের ক্ষেত্রে আমর বিল-মা'রূফ-এর কাজ পুরাপুরি কার্যকর হলো, তখনই মানুষ সর্বপ্রকারের শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে এবং যাবতীয় অপরাধের উৎপাত ও নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা নিজেই এই কথার ঘোষণা দিয়েছেন কুরআন মজীদে: "আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের মধ্যকার ঈমানদার, নেক আমলকারীদের পৃথিবীতে খলীফা বানাবার ওয়াদা করেছেন যেমন তাদের পূর্ববর্তী লোকদের খলীফা বানিয়েছেন, এ-ও ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদের সেই দীন সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং এ-ও ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদের ভয়-ভীতি পরিবর্তন করে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করবেন, তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সহিত কোন একবিন্দু জিনিসও শরীক করবে না। অতঃপর যারাই কুফরী নীতি অবলম্বন করবে তারা নিঃসন্দেহে সীমালংঘনকারী।"
আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, মুসলিম উম্মাতের যে সমাজটিতে আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার প্রধান্য পাবে-অধিকতর গুরুত্ব সহকারে সদা কার্যকর হয়ে থাকবে, সে সমাজে শান্তি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যথাযথভাবে বর্তমান থাকবে। এই কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য অকাট্য দলীলপত্র খুব বেশি নিয়ে আসলে এ আলোচনাটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, দুনিয়ার যে দেশেই ইসলামী শরীয়ত পুরাপুরি বাস্তবায়িত হবে, তথায় সকল প্রকারের অপরাধ-ই হয় নির্মূল হবে, কম পক্ষে হ্রাস পাবে।
কিন্তু সেই সাথে দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, দুনিয়ায় ধর্ম হিসাবে ইসলামে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা কিছু মাত্র কম নয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও রয়েছে বহু কয়টি দেশে। কিন্তু ইসলামকে তারা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে গ্রহণ করছে না। ফলে সেসব দেশে ও দুনিয়ার অন্যান্য অনৈসলামী দেশের মতই অপরাধের মাত্রা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এসব দেশ ও দেশের মুসলিম জনতা কার্যত এই কথাই দুনিয়াবাসীদের সামনে পেশ করেছেন যে, ইসলাম শুধু একটা ধর্ম হিসাবেই ভালো বটে; কিন্তু তা মানুষের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অক্ষম। আর মুসলিমদের দ্বারা ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান। আসলে ইসলামের কিছু অংশ গ্রহণ এবং অপর অংশ বর্জন নিজের ইচ্ছা-কামনা-বাসনারই অনুসরণ মাত্র। আর স্বীয় ইচ্ছা-বাসনা-কামনা-ধারণা এমন একটা বৃত্ত, যার পূজা দুনিয়ার প্রায় সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: "আল্লাহর নিকট থেকে আসা হিদায়েতকে বাদ দিয়ে যারা স্বীয় ইচ্ছা-বাসনার অনুসরণ করবে, তাদের চাইতে অধিক গুমরাহ আর কে হতে পারে? এরা আসলে যালিম। আর আল্লাহ যালিম লোকদের হিদায়েত করেন না।"
ইয়াহুদীরা আল্লাহ কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান রেখে তদনুযায়ী কাজ করত। আর অপর অংশকে অবিশ্বাস করত। আল্লাহর নিকট এটা ছিল একটা কঠিন অপরাধ। তাই অপরাধের দরুন তারা ধর্মত্যাগী রূপেই চিহ্নিত হয়েছে আল্লাহর কালামে। বলা হয়েছে: "তোমরা কি আল্লাহ্র কিতাবের কিছু অংশের প্রতি ঈমান রাখো, আর কিছু অংশকে কর অবিশ্বাস? জেনে রাখো, তোমাদের মধ্যে যারাই এরূপ নীতি অবলম্বন করবে, তাদের নিশ্চিত শাস্তি হচ্ছে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এবং কিয়ামতের দিন তদের নিক্ষেপ করা হবে কঠিন আযাবের দিকে। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ্ সে বিষয়ে গাফিল নন।"
এই প্রেক্ষিতে ইসলামী শরীয়ত বাস্তবায়নে দুনিয়ার মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যে কত বেশি তা আমাদের স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। পরকালে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের জন্য যেসব অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় নিয়ামত ও সুখ-শান্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, তা তারা কেবল তখনই পাওয়ার অধিকারী হতে পারে। আর তা'হলে এই দুনিয়ার জীবনে তারা মহা সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততা লাভ করতে পারে। দূর হতে পারে যাবতীয় ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা।
টিকাঃ
১. মদীনার আউস ও খাজরায বংশের লোকেরা হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় এসে রাসূলের হাতে দীন ইসলাম কবুলের বায়'আত করেছিলো মিনার দিকের এক পর্বত গুহায় হিজরতের পূর্বে এই বায়'আত দুইবার অনুষ্ঠিত হয়।
১. কেননা Wine and Woman-মদ ও নারী অবিচ্ছেদ্য। যেখানে একটি আসবে সেখানে অপরটি অবশ্যই আসবে।
অপরাধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। অপরাধ দমনের জন্য সার্থক প্রতিবিধানের লক্ষ্যে ইসলামী শরীয়ত যেসব কার্যকর আইন বিধান পেশ করেছে, তার মধ্যে 'আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার' অন্যতম। এর অর্থ ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ।
আমর বিল মারূফ-এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জনসাধারণের হৃদয়-মনে এই বিশ্বাস দৃঢ়প্রত্যয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করা যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের ইহকালীন কার্যকলাপের প্রতিদান দেবেন। অপরাধ করার ইচ্ছা কারুর মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই এই বিশ্বাস ও প্রত্যয় তার পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।
'আমর বিল্ মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার'-এর বড় দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের চরিত্র ও ইজ্জত রক্ষা করা। ইসলামে গায়র মুহরিম স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিক অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নিচু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজকে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করা।
'ভালো'র আদেশ ও 'মন্দ'র নিষেধ সংক্রান্ত বিধান কার্যকর থাকলে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বাস্তবায়িত হয়। যখনই ঈমান শক্তিশালী হবে এবং ইসলামী শরীয়ত সাধারণভাবেই বাস্তবায়িত হবে, তখনই মানুষ সর্বপ্রকারের অপরাধের উৎপাত থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। মুসলিম উম্মাহর যে সমাজটিতে আমর বিল মা'রূফ ও নিহী আনিল মুন্কার প্রাধান্য পাবে, সে সমাজে শান্তি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যথাযথভাবে বর্তমান থাকবে।