📄 দ্বিতীয় : ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতার মৌলনীতি
এই পর্যায়ে আলোচিতব্য হচ্ছে অপরাধকারীর সহিত অপরাধ কার্যের সম্পর্ক প্রমাণ। অর্থাৎ আইন যে কাজটিকে অপরাধ গণ্য করেছে সেই কাজটি যে করল, তার সহিত সেই কাজটির সম্পর্ক বিবেচনা ও প্রমাণ করা। কেননা এই সম্পর্ক প্রমাণিত হলেই না সে তার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি পাওয়ার অধিকারী বা উপযুক্ত হবে। ফৌজদারী অপরাধ কাজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণের জন্য জরুরী হচ্ছে, কাজটি ও অপরাধীর মধ্যকার সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ। এই সম্পর্কটি দু'টি দিক দিয়ে বিবেচ্য: ১. বাস্তবতার দৃষ্টিতে অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য ঘটনার মধ্যকার বস্তুগত সম্পর্ক। এই সম্পর্কটির নামকরণ হবে বস্তুগত সম্পর্কের দিক দিয়ে। ২. ভাবগত বা তাৎপর্যগত সম্পর্ক। অপরাধীর তাৎপর্যগত তৎপরতা ও মূল ঘটনাটির মধ্যকার সম্পর্ক। তাৎপর্যগত তৎপরতা বলতে বোঝায় অপরাধীর ভুল ও গুনাহ্ (একে 'তাৎপর্যগত সম্পর্ক স্থাপন'ও বলা যেতে পারে)। ইসলামী শরীয়ত এবং প্রধান অপরাধ আইনসমূহ বস্তুগত সম্পর্কের পাশাপাশি তাৎপর্যগত সম্পর্কের ব্যাপারটিও বিবেচনা করা পক্ষপাতী।
ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতা পর্যায়ে যে কয়টি মত প্রকাশিত হয়েছে, তন্মধ্যে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মতসমূহ এখানে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে:
১. বস্তুগত মত তাতে দেখা হয় যে, অপরাধকারী অপরাধ করার কারণে অপরাধ ক্রিয়া সঞ্জাত পরিণতি ও যাবতীয় ফলাফলের জন্য দায়ী কিনা।
২. ইচ্ছার স্বাধীনতার মত অপরাধটি ইচ্ছামূলকভাবে গৃহীত একটি পন্থা, যা গুনাহ্ রূপ পরিগ্রহ করে এবং অপরাধজনিত দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্বর করে তোলে। আর এই কারণেই অপরাধজনিত দায়িত্বশীলতা ভিত্তিগতভাবে নৈতিক দায়িত্বশীলতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়-যতক্ষণ পর্যন্ত তা কোন নৈতিক তাৎপর্যের উপর ভিত্তিশীল থাকবে। তা গুনাহ হোক বা ভুল হোক। আর এই মতটি সমসাময়িক বস্তুগত ও বিজ্ঞানসম্মত সংস্কৃতির ছায়াতলে মনের উপর প্রভাবশীল হয়ে থাকবে চিরকাল।
৩. অনিবার্যতার মত এই মতটি মনে করে যে, যে কাজটি কোন ক্ষতির কারণ হয় এবং কোন বিপদ ঘটায়, সেই কাজটি যে করে, তাকে সমাজ সমষ্টির দিক থেকে প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়ার জন্য অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।
৪. সমন্বয়মূলক মত শেষ পর্যন্ত এমন একটা দিকের নির্দেশনা পাওয়া গেল, যা ইচ্ছার স্বাধীনতা ও অনিবার্যতা-এই দুইটি মতকে সমন্বিত করে এবং শাস্তি দানের চিন্তা ও রক্ষামূলক ব্যবস্থাপনা এবং ইচ্ছা-স্বাধীনতার বাধ্যবাধকতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এই মতের লোকেরা বলেছেন: আসল হচ্ছে ইচ্ছার স্বাধীনতা' তবে এই স্বাধীনতা নিরংকুশ নয়, সকলের নিকট সমান মানেরও নয়। তা নিরংকুশ নয় এইজন্য যে, মানুষ ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতার উপর বাধা নিষেধ আরোপ করে থাকে। তা উত্তরাধিকারে পরিণত হয় অথবা পরিণত হয় স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা নিহিত পরিবেশে। তা সমান মানের নয় এই কারণে যে, তা ঝোঁকা-প্রবণতার দিক দিয়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পার্থক্য সম্পন্ন হয়ে থাকে ; পার্থক্য সম্পন্ন হয়ে থাকে কাল ও ক্ষেত্রের পার্থক্যের কারণেও। এ জন্য শরীয়তদাতার কর্তব্য হয়ে পড়ে ব্যক্তিগণের অপরাধ থেকে সমাজ-সমষ্টিকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। এসব ব্যক্তি হচ্ছে তারা, যারা অনুভূতি না থাকা বা তাদের অবস্থার সহিত সামঞ্জস্যশীল পদক্ষেপসমূহ গ্রহণে অক্ষম হওয়ার দরুন শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।
আধুনিক আইনে ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্র হচ্ছে জীবন্ত মানুষ, অন্য কেউ নয়। কেননা রাষ্ট্র তার অধিকার সরাসরি শাস্তিদানে নিহিত বলে মনে করে। এই শাস্তিদানই রাষ্ট্রের প্রকৃতির (Nature) সংরক্ষক, তা শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদানকারী। এ কারণে অপরাধের কাজ যে-ই করবে, তারই উপর শাস্তি কার্যকর করতে হবে। এই কারণেই শাস্তিটা ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। আর যার বিবেক-বুদ্ধি এখনো পরিপক্ক হয়নি, যার অনুভূতি বিলুপ্ত এবং যার উপর জোর প্রয়োগ হয়েছে, এদের উপর থেকে অপরাধের দায়িত্বশীলতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন বালক অপরাধী হলে তার জন্য হালকা ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন মৌলিকভাবেই ঘোষিত হয়েছে যে, কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা ও শাস্তিদান শরীয়তের অকাট্য দলীল ছাড়া হতে পারে না এবং অপরাধের প্রতিক্রিয়া কি তা বিবেচনা ব্যতীতও হয় না। আর জীবন্ত মানুষ যার ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীল হওয়ার যোগ্যতা পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হয়েছে-ফৌজদারী অপরাধের জন্য কেবল মাত্র তাকেই দায়িত্বশীল মনে করা যেতে পারে। এই যোগ্যতা না থাকলে দায়িত্বশীলতা (Responsibility) চাপানো যায় না। যেমন ফৌজদারী কাজের অপরাধী যদি পাগল হয় বা বিবেক-বুদ্ধিতে অসুস্থতা দেখা দিয়েছে-এমন ব্যক্তি হয় অথবা এমন বালক হয়, যার কাণ্ডজ্ঞান এখনো হয়নি কিংবা যার ইচ্ছা প্রতিভায় কোন ত্রুটি দেখা দিয়েছে যেমন খুব বেশি প্রয়োজনের সময় বা অদৃশ্যভাবে জোর করা হয়েছে এমন সময় অপরাধটা করা হয়েছে, অথবা মাদক দ্রব্য পানের কারণে সেই প্রতিভা বিলুপ্ত থাকা অবস্থায় অপরাধ করা হয়েছে, তাহলে তার উপর শাস্তি প্রযোজ্য হবে না-কার্যকর করা যাবে না।
ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতা সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণের সমস্ত নিদর্শন ইসলামী শরীয়তের আওতাধীন। এই দৃষ্টিকোণটি সম্পূর্ণরূপে নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআনের ঘোষণায় ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতা ও শাস্তির ব্যাপারে ইচ্ছা-ইখতিয়ার ও গুনাহের মৌল নীতি বিধৃত। ইরশাদ হয়েছে:
اَ تَرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ اُخْرٰى وَاَنْ لَّيْسَ لِلْاِنْسَانِ الَّا مَا سَعَى وَاَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرٰى ثُمَّ يُجْزٰاهُ الْجَزَآءَ الْاَوْفٰى ( النجم ٣٨ - ٤٠ )
কোন বোঝা বহনকারীই অপরাধের বোঝা বহন করবে না এবং মানুষের জন্য শুধু তা-ই যার জন্য সে শ্রম করবে এবং তার শ্রম অবশ্যই দেখা যাবে ও তাঁর পূর্ণমাত্রার প্রতিফল তাকে দেওয়া হবে।
এখানে 'বোঝা' গুনাহের সমার্থক এবং শ্রম বা চেষ্টা ইচ্ছামূলক কাজ বোঝায়। আর প্রতিফল অর্থ অপরাধের শাস্তি।
এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, অপরাধের দায়িত্বশীলতায় নৈতিক ভিত্তির উপর আইন রচনা করার নীতি গ্রহণে মানবরচিত আইনের তুলনায় ইসলামী আইন অগ্রবর্তী রয়েছে। অকাট্য আইন লংঘন করে মানুষ ইচ্ছামূলকভাবে যে সব কার্যকলাপ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার পরিণতি গ্রহণ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক। অতএব আইন লংঘনে শাস্তি দানের ভয় প্রদর্শন 'শরীয়ত পালনে বাধ্য ব্যক্তির' নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল থাকছে। প্রত্যেক ব্যক্তিই স্ব-ইচ্ছায় করা কাজের বিচারের ফল ভোগকারী হবে, একথা অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হচ্ছে। এর পক্ষের সমর্থনে দলীল হিসাবে এই আয়াতটি দ্রষ্টব্য:
مَنِ اهْتَدٰى فَاِنَّمَا يَهْتَدِى لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَاِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتّٰى نَبْعَثَ رَسُوْلًا ( الاسرأ - ۱۵ )
যে লোক হিদায়ত অবলম্বন করল, সে হিদায়ত গ্রহণ করে নিজেরই কল্যাণ করল। আর যে লোক গুমরাহী অবলম্বন করল, তার এই গুমরাহীর ফল তাকেই ভোগ করতে হবে এবং কোন বোঝা বহনকারীই অন্য কারোর বোঝা বহন করবে না। চূড়ান্ত কথা, আমরা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকেই আযাব দেই না।
অতএব শরীয়ত যদিও দায়িত্বশীলতার ভিক্তি বানিয়েছে অনুভূতি ও হ এবং যার অনুভূতি ও ইচ্ছা-ক্ষমতা নেই, তাঁরদায়িত্বশীলতাও নেই বলেছে, তা সত্ত্বেও এইবিবেচনায় দায়িত্বহীন ব্যক্তিও যদি কোন অন্যায় করে, তাহলে তার এই দুষ্কৃতির প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে। কেননা সমাজকে রক্ষা করার জন্য শাস্তিদান একটা সামষ্টিক প্রয়োজন।
ইসলামে কাজের দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্র হচ্ছে সেই মানুষ, যার অনুভূতি সুস্থ, যে লোক স্বাধীন বিবেক-বুদ্ধি ও ইচ্ছা-ক্ষমতা সম্পন্ন এবং এ কারণে শীরয়ত পালনে বাধ্য। কেননা শরীয়ত পালনের যোগ্যতা আছে, সুস্থ অনুভূতি বহাল এবং ইচ্ছা প্রয়োগের অধিকারী-কোন ব্যক্তি সম্পর্কে একথা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার উপর ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্ব চাপানো যেতে পারে না। একথা আল্লাহ্ নিম্নোদ্ধৃত বাণী থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالإِيمَان - ( النحل - ١٠٦ )
তবে যদি কেউ (নিপীড়ন বা হত্যার হুমকিতে) (কুফরি কাজে) বাধ্য হয় কিন্তু তার দিল ঈমানের সহিত দৃঢ়স্থিত, (তাহলে তার এই কুফরি ধর্তব্য হবে না-সে ক্ষমা পেয়ে যাবে)।
এ আয়াতের ভিত্তিতে (০১৩) 'জোর-জবরদস্তি-নিপীড়ন ও হত্যার ভয়' দেখানোর কারণে কেউ কুফরি করলে ইসলামী শরীয়তে তাকে সে জন্য দোষী সাব্যস্ত করা ও পাকড়াও করা হবে না। ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ একে শরীয়তের একটা মৌল নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ জোর-জবরদস্ত বা অত্যাচার-নিপীড়নে পড়ে মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ার কারণে যদি কেউ কোন কুফরি কাজ করে, তাহলে তাকে কাফির গণ্য করা হবে না, এ জন্য তাকে শাস্তিও দেওয়া হবে না, শরীয়তের কোন হুকুম তার উপর কার্যকর হবে না।
( الجامع لا مكام القرآن - ج ১০ ص ۱۸২ ) - আল্লাহ্ আরও বলেছেন:
فَمَنِ اضْطُرُ غَيْرَ بَاغٍ وَ لَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ( البقره - ١٧٣ )
যে লোক কঠিনভাবে বাধ্য হয়ে পড়বে-কিন্তু সে নিজে বিদ্রোহী নয়, সীমা- লংঘনকারীও নয় (এ রূপ অবস্থায় গুনাহ করা হলে) তার উপর কোন গুনাহ্ চাপানো হবে না।
এই প্রেক্ষিতেই নবী করীম (সা)-এর ইরশাদ হচ্ছে:
رُفِعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَاءُ وَ النَّسْيَانُ وَ مَا اسْتَكْرَهُوا عَلَيْهِ -
এর থেকে 'তুলান্তি, বিস্মৃতি এবং যে কাজে তাদের জোরপূর্বক , তা ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।'¹
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম লিখেছেন: আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের সৃষ্টি করেছেন এবং ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সব কিছুকে তার সৌন্দর্যের অলংকারস্বরূপ বানিয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে তার বান্দাদের পরীক্ষা করা, তাদের যাচাই-পরখ করা এবং তাদের মধ্যে কে উত্তম কাজ করে তা বের করা। তাদের নিজেদের মধ্যেই পরীক্ষার উপায়-উপকরণসমূহ প্রস্তুত ও সজ্জিত করে রেখেছেন। তাদেরকে বিবেক বুদ্ধি, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি, ইচ্ছা-সংকল্প-কামনা- বাসনা-লালসা ও নৈতিকতার অনুভূতি দান করেছেন। এ নৈতিকতা উপরিউক্ত উপকরণের অনিবার্য দাবি। যেমন তাদের জন্য বাইরের দিক দিয়েও অনেক কারণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বৈষয়িক মুনাফা লাভ ও আন্তরিক সুখানুভূতিও সৃষ্টি করেছেন। এগুলি ব্যক্তিকে আমল বা কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তার লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তাকে প্রেরণা দেয়। যেমন এমন কিছু ভাবধারা ও কার্যকারণ তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন যা তাদের মন ঘৃণা করে এবং তা দূর করার জন্য কাজ করে। মানুষকে তাদের মনে আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে অবাধ করে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং তাদের প্রকৃতিতে ও বিবেক-বুদ্ধিতে ভাল-মন্দ ও সেসবের কারণ-উপকরণ চিনবার যোগ্যতা পুঞ্জীভূত করে রেখেছেন এবং রাসূলের জবানীতে এ বিষয়ের বিস্তারিত জ্ঞান দান করা হয়েছে। ভাল ওয়াদা, মন্দ ওয়াদা, আগ্রহ সৃষ্টির পথ ও পন্থাও তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং যে কাজের আদেশ তাদের দেওয়া হয়েছে তা পালন করার এবং যা করতে নিষেধ করা হয়েছে তা বর্জন করার ক্ষমতাও তাদের দেওয়া হয়েছে। তাদের মেজাজ-প্রকৃতিকে দমন করার ক্ষমতাও তাদের করায়ত্ত রয়েছে। কোন কোন যৌক্তিকতা এই ছিল যে, মানুষের জন্য সেই জিনিস হারাম করা হয়েছে, যা তাদের বিবেক-বুদ্ধি, শরীর-দেহ ও ধন-মালের জন্য ক্ষতিকর, যা তাদের ব্যক্তি, সমষ্টি ও সামষ্টিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক। এসব কাজের দরুন তাদের জন্য শাস্তির বিধান করেছেন। এই শাস্তি তাদের লোভ-লালসার পথ বন্ধ করে এবং তাদের সীমালংঘন প্রতিরুদ্ধ করে।'²
এ কথা স্পষ্ট যে, অপরাধীকে পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিমান হতে হবে। কেননা সুস্থ-বিবেক-বুদ্ধিহীন ব্যক্তি সুস্থ অনুভূতি সম্পন্ন নয়। তার ইচ্ছা-ক্ষমতা আছে বলেও মনে করা যায় না। নাবালেগ ব্যক্তিও তারই মত। কেননা পূর্ণবয়স্কতা সেই বিবেক-বুদ্ধির ধারক, যা শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার জন্য জরুরী। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন:
وَ إِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ( النور - ٥٩ )
তোমাদের বালকগণ যখন পূর্ণবয়স্কতায় উপনীত হবে, তখন যেন তারা অনুমতি চায় যেমন অনুমতি চেয়েছে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেন:
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلاثَةٍ - الصبى حَتَّى يَحْتَلِمَ وَ النَّائِمُ حَتَّى يَصُحُوا وَ الْمَجْنُونُ حَتَّى يَفِيقَ
তিনজনের অপরাধ ধরা হয় না: বালক-যতক্ষণ না পূর্ণবয়স্ক হয়, নিদ্রিত ব্যক্তি-যতক্ষণ না নিদ্রামুক্ত হয় এবং পাগল-যতক্ষণ না সম্পূর্ণ সুস্থ হয়।
আল্লামা আ-মদী লিখেছেন: বিবেকবান লোকেরা সম্পূর্ণ একমত যে, শরীয়ত পালনে বাধ্য হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে-তাকে সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে, শরীয়ত পালনের দায়িত্ব অনুভবকারী হতে হবে। সচেতন বালক হয়ত তা বুঝে যা বুঝে অ-সচেতন বালক কিন্তু তার বোধশক্তি সংকীর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ। শরীয়তদাতা পূর্ণবয়স্কতাকে তার বুঝ-সমঝে পূর্ণত্বের মানদণ্ড বানিয়েছেন।
আল্লামা আ-মদী উপরক্ত মৌল নীতির ভিত্তিতে বলেছেন: অ-বুদ্ধিমান ও মাতাল সচেতন বালকের অপেক্ষা-ও খুব বেশি খারাপ অবস্থায় অবস্থিত শরীয়তদাতার আদেশ-নিষেধ বোঝার দিক দিয়ে এবং কোন কাজের দরুন যেসব দায়-দায়িত্ব গ্রহণ কর্তব্য হয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে। যেমন জোর-জবরদস্তি করার দরুন একটি লোক চূড়ান্তভাবে ঠেকায় পড়ে বাধ্য হয়ে যায় কোন নিষিদ্ধ কাজ করতে, যার ফলে তার দায়িত্বশীলতা বিলুপ্ত হয় কিন্তু তার চাইতে কম মাত্রার বাধ্যবাধকতায় ব্যক্তি ইচ্ছা প্রয়োগের অধিকারী থাকে.... ( الاحكام في اصول الاحكام ج اضر - ٢١٥ )
এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামী শরীয়তে অপরাধের দায়িত্বশীলতা দু'টি ভিত্তির উপর স্থাপিত:
প্রথম, অপরাধের শাস্তি একটা সামষ্টিক প্রয়োজন, সমাজ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই তা ফরয করা হয়েছে। আর প্রয়োজনের মূল্যায়ন হবে তার মূল্যে ও পরিমাণে।
এবং দ্বিতীয়, বস্তুগত শাস্তি গ্রহণের উপযুক্ত বিবেচিত হবে কেবল সেই ব্যক্তি, যার অনুভূতি আছে, যে ইচ্ছা প্রয়োগে সক্ষম।
এর দরুন সমাজের সংরক্ষণার্থে কোন কোন তিরস্কারমূলক প পথ বন্ধ হয়ে যায় না কিন্তু দায়িত্বশীল নয়-এমন ব্যক্তিদের কৃত দুষ্কৃ প্রযোজ্য। তা প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এই কারনেই ইসলামের প্রথম দিন থেকেই শরীয়তে অপরাধের দায়িত্ব চাপানোর ক্ষেত্র হচ্ছে সেই সুস্থ মানুষ, যার অনুভূতি ও ইচ্ছা-ক্ষমতা রয়েছে। কেননা 'শক্তি প্রয়োগে বাধ্য' (Forced) ব্যক্তি অপরাধের দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্যতা সম্পন্ন হয় না। কাজেই গণনার যোগ্য ব্যক্তিত্বের কল্যাণের জন্য দায়ী ব্যক্তির দ্বারা যদি নিষিদ্ধ কার্য সম্পাদিত হয়, তাহলে তার উপর অপরাধের দায়িত্বশীলতাও অর্পিত হবে সমষ্টির সংরক্ষণের স্বার্থে।
ইসলামী শরীয়তের মৌল নীতি হচ্ছে, কোন লোকই অন্য ব্যক্তির অপরাধের জন্য দায়ী হবে না। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার ব্যাপার এবং পূর্ণ মাত্রার ইচ্ছা- স্বাধীনতা থাকা অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজ করলে তবেই তার দায়িত্ব তার উপর বর্তাবে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَ مَنْ اسَاءَ فَعَلَيْهَا ( حم السجده - ٤٦ )
যে লোক ভালো কাজ করবে, তা তার নিজের কল্যাণে আসবে। আর যে লোক খারাপ কাজ করবে, তার কুফল তাকেই ভোগ করতে হবে।
وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وزر أخرى ( فاطر - ۱۸ )
কোন বোঝা বহনকারীই অন্যের বোঝা বহন করবে না।
রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ
لا يُؤَاخَذُ الرَّجُلُ بِجَريمَةِ أَبِيهِ وَ لَا بِجَرمَةِ أَخِيهِ .
কোন ব্যক্তিই তার পিতার বা তার ভাইয়ের অপরাধের জন্য দায়ী ও পাকড়াও হবে না।
কেউ যদি ভুল করে কোন অপরাধ করে কিংবা করে প্রায়-ইচ্ছার ভিত্তিতে তখন অপরাধী দিয়াত দিতে বাধ্য হয়। আর ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার মৌল নীতি ভিত্তিক সুবিচারের দাবি হচ্ছে, এই 'দিয়াত' সে একাকীই দেবে না, তাতে তার পৈতৃক দিক দিয়ে নিকটাত্মীয়রা অবশ্যই শরীক হবে। কেননা একাকী অপরাধীকেই তা দিতে হলে তা হবে একটি বড় যুলুম। আর ব্যক্তি ইচ্ছা করে অপরাধ করেনি বলে দিয়াত প্রদানের বোঝা বহনে তার শরীক হওয়ার দরুন তার বোঝা যেমন হালকা করা হয়, তেমনি যার উপর অপরাধ হয়েছে তার প্রাপ্যটা পাওয়ারও নিশ্চয়তা হয়।
আধুনিক কালের আইনসমূহ যদিও অপরাধের ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার মৌল নীতি গ্রহণ করেছে; কিন্তু প্রায় বহুতর অবস্থায়ই ব্যক্তি অন্যের কাজের জন্য দায়ী সাব্যস্ত হয়ে থাকে। যেমন পত্রিকায় বা কিছু লেখা হবে-সে যে-ই লিখুক না কেন, তার জন্য সম্পাদক ও মুদ্রাকর-প্রকাশকই দায়ী হবে, সে অকুস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও এবং তার অজ্ঞাতসারে ছাপা হয়ে থাকলেও।
টিকাঃ
১. ইমাম কুরতুবী লিখেছেন: হাদীসটির সনদ সহীহ না হলেও এর তাৎপর্য ও প্রতিপাদ্য সর্বসম্মতভাবে সহীহ্। কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীও এই কথাই বলেছেন। তবে আবু মুহাম্মদ আবদুল হক লিখেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ্। আবূ বকর আল-উমাইলী ও ইবনুল মুনযিরও তাই উদ্ধৃত করেছেন। ( الجامع لا حكام القرآن ১৮۲ - ج ১০ )
২. اعلام الموقعين ج - ٢ ص ٢١٤ - ٢٩٦
📄 তৃতীয় : বস্তুগত স্তম্ভ
মানুষ কার্যত অপরাধ করলেই তা গণ্য হবে। মনের চিন্তা বা কল্পনা গণনার যোগ্য নয়। ইসলামী আইনের মূল কথা, মানুষের মনে যা কিছুই উদয় হয়, সেজন্য তাকে পাকড়াও করা হবে না। খোদ রাসূলে করীম (সা) বলেছেন :
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ أَوْ حَدَثَتْ بِهِ نَفْسُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ
আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মাতের জন্য তাদের মনে যে ওয়াসওয়াসা জাগে বা মনে কোন কথার উদ্রেক হয়, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন-যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যত করা বা বলা না হয়।
ইমাম কুরতুবী রাসূলের উক্ত হাদীসটির ভাষা নিম্নরূপ উদ্ধৃত করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لأُمَّتِي عَمَّا حَدَثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا أَوْ يَعْمَلُوا بِهِ -
ইমাম কুরতুবী অতঃপর লিখেছেন :
فَإِنَّا تَقُوْلُ - ذَلِكَ مَحْمُوْلٌ عَلَى أَحْكَامِ الدُّنْيَا مِثْلَ الطَّلَاقِ وَالْعِتَاقِ وَ الْبَيْعِ الَّتِي لَا يَلْزَمُه حُكْمُهَا مَا لَمْ يَتَكَلَّمُ بِه .
আমরা বলব, রাসূলে করীমের এই কথাটি দুনিয়ার প্রশাসনিক আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-তালাক, গোলাম মুক্তকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে যতক্ষণ ব্যক্তি কথা না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
অতএব শুধু চিন্তা বা সংকল্প গ্রহণ করাতেই কেউ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবে না। অপরাধের কাজ শুরু করার মুহুর্তে (এখনও কাজটা করে বসেনি এরূপ অবস্থায়) ধরা পড়লে হালকা ধরনের শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হবে। আর কাজটি সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর (ধরা পড়লে) পূর্ণ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য সাব্যস্ত হবে। নিজের মনে জেগে উঠা প্রতিরোধের দরুন বা মনে ক্রোধের সঞ্চার হওয়ার কারণে অপরাধ ঘটানো থেকে যদি ফিরে যায়, তাহলে তাকে কোন শাস্তি দেওয়া হবে না। কেননা সে তো অপরাধের ইচ্ছা করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে বিরতই থেকেছে। তবে তওবা ছাড়া অন্য কোন কারণে যদি ফিরে যায়, তাহলে সে জিজ্ঞাসিত হবে। কেননা মূলত কাজটা তো অপরাধের এবং গুনাহ্। যেমন কেউ যদি ঘরের দরজা ভাঙ্গে বা সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকবার পূর্ণ ব্যবস্থা করার পর ঘরের লোকেরা টের পেয়ে যায় অথবা পাহারাদারের চোখে পড়েছে মনে করে চুরি কর্ম থেকে ফিরে যায় তাহলেও তাই হবে। পক্ষান্তরে চুরির উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট ঘরের নিকটে লোকজন দেখতে পেয়ে অথবা পাহারাদারের টের পাওয়ার দরুন চুরি কাজ থেকে ফিরে এলে চুরকে শাস্তি দেওয়া হবে না। কেননা যতটা কাজ সে করেছে সেটা 'গুনাহ' রূপে গণ্য করা হয় না।
অপরাধীর অবস্থা এবং অবস্থা পার্থক্যের কারণে অপরাধী সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারেও ইসলামের অগ্রবর্তী ভূমিকা রয়েছে। শরীয়তদাতা ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণে বিবাহিত ও অবিবাহিতের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং এ দু'জনের অপরাধের শাস্তিও ভিন্ন ভিন্ন নির্ধারণ করেছেন। বিবাহিতের জন্য সর্বসম্মতভাবে 'রজমে'র ব্যবস্থা এবং অবিবাহিতের জন্য দোরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যদিও ইসলামের সূচনাকালে বিবাহিত ও অবিবাহিতের জন্য শুধু 'নির্যাতন'ই শাস্তি ছিল। এই নির্যাতন কার্যকর হতো তীব্র ভর্ৎসনা, তিরস্কার (Scolding), মন্দ বলা ও গালাগালের মাধ্যমে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে :
وَ لَّتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنْكُمْ فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتَ أَوْ يَجْعَلُ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً ، وَ اللَّذن يَأْتِيَانِهَا مِنْكُمْ فَادُوْهُمَا فَإِنْ تَابَا وَ أَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا .
( النسا - ১৫ - ১৬ )
তোমাদের স্ত্রীলোকদের মধ্যে যারা নির্লজ্জতার (যিনা) কাজ করবে, তোমরা তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী যোগাড় কর। তারা যদি সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তোমরা তাদের (অপরাধীদের) ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখ যতক্ষণ না মৃত্যু সংঘটিত হয়, অথবা আল্লাহ্ তাদের জন্য কোন পথ করে দেন। যে দু'জন এই কাজ করবে, তাদের নির্যাতন কর। তারা দু'জনই যদি তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে ওদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ বড়ই তওবা কবুলকারী, অতিশয় দয়াবান।
ইবনে কুদামার বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেছেন, আয়াতে 'স্ত্রীলোক' বলতে বিয়ে করা স্ত্রীলোক বুঝিয়েছে কেননা আল্লাহ্ তা'আলা দু'ধরনের শাস্তির উল্লেখ করেছেন-তার একটি অপরটির তুলনায় অত্যন্ত কঠোর। কঠোর শাস্তিটি বিবাহিতের জন্য, আর অন্যটি কুমারীদের জন্য। পরে এই শাস্তি মন্মুখ হয়ে যায়। হযরত উবাদাতা ইবনুস সামিত (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) বলেছেন:
خُذُوا عَنِّى خُذُوا عَنِّى قَدْ جَعَلَ اللهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الْيَكْرُ بِالْبَكْرِ جِلْدُ مِائَةٍ وَ تَغْرِيبُ عَامِ وَ الثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جِلْدُ مِائَةٍ وَ الرَّحْمُ -
নাও, আমার নিকট থেকে জেনে নাও। আল্লাহ্ তা'আলা ওদের জন্য পথ বের করে দিয়েছেন। কুমার-কুমারীর সহিত ব্যভিচার করলে তার শাস্তি হবে একশত দোরা এবং বছরের জন্য নির্বাসন আর বিবাহিত-বিবাহিতার সহিত ব্যভিচার করলে একশত দোরা ও 'সঙ্গেসার'।
বিবাহিত পুরুষ কিংবা স্ত্রীলোক যিনা করলে তাকে 'সঙ্গেসার' করা ইসলামের অকাট্য বিধান। সমস্ত সাহাবী ও তাবিঈন, আলিম এবং সর্বকালের সকল দেশের ইসলাম বিশারদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত। খাওয়ারিজ ছাড়া ইতিহাসে আর কেউ-ই এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করেনি। খাওয়ারিজদের মতে বিবাহিত অবিবাহিতের শাস্তি এক ও অভিন্ন এবং তা হচ্ছে একশত দোরা। কেননা কুরআন মজীদে এই শাস্তিরই উল্লেখ হয়েছে। 'রজম' বা 'সঙ্গেসার' অর্থ; পাথর নিক্ষেপ করে করে হত্যা করা। রাসূলে করীম (সা) নিজে দু'জন ব্যভিচারকারী ইয়াহুদীকে এই শাস্তিই দিয়েছিলেন। আর মুসলমানদের মধ্যে মায়েজ ও আল-গামেদীয়া-এই দু'জন ব্যভিচারকারীকে এরূপ শাস্তি দেওয়ার ছিল সর্বজনবিদিত।
বিবাহিত ব্যভিচারীকে দোরা ও 'সঙ্গেসার' এই উভয় দণ্ড প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন হযরত আলী (রা)। হযরত ইবনে আব্বাস, উবাই ইবনে কা'ব এবং আবু যর গিফারী প্রমুখ সাহাবী (রা)-ও এই মত সমর্থন করেছেন। হাসান বসরী, ইসহাক, দাউদ ও ইবনুল মুনিল প্রমুখ তাবেয়ী-আলিমও তাই বলেছেন। এ পর্যায়ে অপর একটি বর্ণনা রয়েছে। তা হচ্ছে বিবাহিত ব্যভিচারীকে শুধু 'রজম'-এর দণ্ড দান, দোরা নয়। হযরত উমর ও হযরত উসমান (রা) থেকে এই বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। এই দুইজন খলীফায়ে রাশেদ কেবলমাত্র 'রজম'-এর দণ্ড দিয়েছেন, দোরার দণ্ড নয়। নয়ী, যুহরী, আওযাঈ, ইমাম মালিক, শাফিঈ ও হানাফী ফিকহবিদগণ এই রায়ই দিয়েছেন। আবু ইসহাক আল-জুরজানী ও আবূ বকর আল্-আসরাম প্রমুখ ফিকহবিদ এই মত পছন্দ করেছেন। তাঁদের সকলেরই ভিত্তি হচ্ছে হযরত জাবির (রা) বর্ণিত হাদীস। হাদীসটি হচ্ছে
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجَمَ مَا عِزًا وَ لَمْ يَجْلِدُهُ وَ رَجَمَ الْغَامِدِيَةَ وَ لَمْ يَجْلِدْهَا
নবী করীম (সা) মায়েযকে 'রজম'-এর দণ্ড দিয়েছেন, দোরা মারেন নি। গামেদীয়াকে 'রজম' দিয়েছেন, দোরা মারেননি। অথচ এ দু'জনই ছিল বিবাহিত।
অবশ্য ব্যভিচারী যদি বিবাহিত না হয়, তাহলে তার শাস্তি যে দোরা, তাতে কারুরই কোন দ্বিমত নেই। কেননা এই পর্যায়ে আল্লাহ্ তা'আলার ঘোষণা স্পষ্ট ও অকাট্য। কুরআনের আয়াত হচ্ছে:
الزَّانِيَةُ وَ الزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ - ( النور - ٢ )
ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী উভয়কে একশ'টি দোরা মার।
ইসলামের সব বিশেষজ্ঞই এ বিষয়ে একমত যে, এই দণ্ড কেবলমাত্র অবিবাহিত ব্যভিচারী নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত। তবে জমহুর আলিমগণ এই দোরা শাস্তির সাথে সাথে এক বছর কালের নির্বাসনের দণ্ড দেওয়াও অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদিন থেকেও এই মত বর্ণিত। হযরত উবাই, আবুদ দারদা, ইবনে মসউদ ও ইবনে উমর প্রমুখ সাহাবী (রা)-ও এই মতের সমর্থক। আতা, তাউস, সওরী ইবনে আবূ লায়লা ও শাফিঈ প্রমুখ ফিকহবিদেরও এই মত। ইমাম মালিক ও আওযাঈর মত হচ্ছে, নির্বাসনের দণ্ড কেবল মাত্র পুরুষ ব্যভিচারীকেই দেওয়া যেতে পারে, স্ত্রীলোককে নয়। কেননা স্ত্রীলোকের জন্য যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অপরিহার্য, নির্বাসনে তা সম্ভব নয়। বিদেশ গমনকালে তার সাথে মুহরিম পুরুষের উপস্থিতি একান্তই জরুরী। নবী করীম (সা) বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِلاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيْرَةٌ يَوْمٍ وَ لَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي رِحْمٍ -
রক্তের আত্মীয় সঙ্গী ছাড়া কোন মেয়েলোকের পক্ষে একদিন একরাত্রির দূরত্বের বিদেশ সফরে যাওয়া হালাল নয়।
এমতাবস্থায় কোন মহিলাকে যদি ব্যভিচারের শাস্তির অংশ হিসাবে নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, তাহলে এ হাদীস অনুযায়ী তার সাথে এমন এক পুরুষ ব্যক্তিকেও নির্বাসিত করতে হবে, যে ব্যভিচারের অপরাধ করেনি। করেনি নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মত কোন অপরাধ।
এই কারণেই ইমাম আবু হানীফা ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মত হচ্ছে, নির্বাসনের দণ্ড দেওয়া ওয়াজিব নয়। কেননা হযরত আলী (রা) বলেছেন: এ দু'জন লোককে অনুরূপ কাজ থেকে বিরত রাখাই যথেষ্ট। হযরত উমর (রা) এক ব্যক্তিকে শাস্তিস্বরূপ খায়বরে নির্বাসিত করেছিলেন। লোকটি তখন হেরাক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয়ে খৃস্টান হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর হযরত উমর (রা) বলছিলেন:
لَا أَغْرَبُ مُسْلِمًا بَعْدَ هَذَا أَبَدًا.
অতঃপর আমি কোন মুসলমানকে কখনই নির্বাসিত করব না।
এই পর্যায়ে একটি বিষয়ে গভীর ও ব্যাপক ভিত্তিক অনুধাবনের প্রয়োজন রয়েছে। শরীয়তদাতা বিবাহিতের যিনার শাস্তি ও অবিবাহিতের যিনার শাস্তির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। যদিও উভয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট দণ্ড ঘোষিত হয়েছে। ফিকহবিদগণ মনে করেন, উক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের অবস্থা ও অবস্থানের পার্থক্য, বাহ্যিক পরিবেশ, মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ এবং বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির উপকরণসমূহের দৃষ্টিতেই এই পার্থক্যের যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। যে ব্যক্তি এখনও বিয়ে করেনি, তার যৌন উত্তেজনার পরিতৃপ্তি ও চরিতার্থতার শরীয়তসম্মত কোন পন্থা বা ব্যবস্থা তার করায়ত্ত নয়। এরূপ ব্যক্তির পক্ষে যৌন অপরাধ করা থেকে আত্মরক্ষা করে দূরে সরে থাকার ব্যাপারে অক্ষমতা ও অসহায়তার শিকার হওয়া এবং সাময়িক কাম-লালসার নিকট পরাজিত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটানো একেবারে অসম্ভব ব্যাপার নয়। এই কারণে শরীয়তদাতা উক্ত রূপ ব্যক্তির জন্য তুলনামূলকভাবে হালকা দণ্ডের ব্যবস্থা করেছেন। পক্ষান্তরে বিবাহিত ব্যক্তির অবস্থা যে ভিন্নতর তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সে তো তার যৌন কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার হালাল ও শরীয়তসম্মত ব্যবস্থার অধিকারী। আল্লাহ্ তাকে হারাম পথে অগ্রসর হওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকেও মুক্ত রেখেছেন। তার পক্ষে যিনা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া খুবই সাংঘাতিক ঘটনা। তাতে তার প্রকৃতিতেই কঠিন বিকৃতি ও বিপর্যয়ের মারাত্মক অবস্থিতি প্রমাণ করে। অতএব এই ধরনের ব্যক্তি নির্ধারিত দণ্ড ভোগের জন্য অবশ্যই উপযুক্ত। অবশ্য এ পর্যায়ে আমাদের একথাও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, ইসলামী আইন প্রণয়নে উচ্চমানের দায়, অনুগ্রহ, সহমর্মিতা ও সহৃদয়তার সংযোগ রয়েছে। এই কারণে সামান্য সন্দেহ হলেও নির্দিষ্ট শাস্তি প্রত্যাহার করার স্থায়ী বিধান দেওয়া হয়েছে। অপরাধী কি অবস্থা ও পরিবেশের মধ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বা ঘটাতে বাধ্য হয়েছে, দণ্ডের ফয়সালা দানকালে তা অবশ্যই সম্মুখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা, শাফিঈ ও আহমাদ এবং জহুর আলিমগণের এই মত বর্ণিত হয়েছে যে, কুমারী মেয়েলোককে অন্তঃসত্তা দেখেই তাকে দণ্ড দেওয়া যাবে না-যতক্ষণ সে ব্যভিচার করার স্বীকারোক্তি না দিচ্ছে। সে অপরিচিতা হোক কি পরিচিতা এবং বলাৎকারের ফলে হয়েছে কিংবা তখন সে নির্বাক ও অ-প্রতিবাদী ছিল, এই প্রশ্নও অবান্তর। অথবা সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা ব্যভিচার প্রমাণিত হবে। অন্যথায় সন্দেহের সুযোগ তাকে দিতে হবে ও 'হদ্দ' অকার্যকর থাকবে। গামেদীয়ার ঘটনায় অপরাধীর অবস্থানকে সম্মুখে রাখা হয়েছে এবং দয়ার দিকটিও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। সে গর্ভবতী হয়ে এসে যখন ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করল এবং নবী করীম (সা)-এর নিকট তার উপর 'হদ্দ' কার্যকর করার জন্য প্রার্থনা জানালো-যেন সে পবিত্রতা অর্জন করতে পারে-তখন নবী করীম (সা) গর্ভস্থ ভ্রূণের সন্তান ও তার জীবন রক্ষার লক্ষ্যে তা করতে অস্বীকার করলেন। বললেন, সন্তান প্রসবের পর উপস্থিত হবে। সন্তান প্রসবের পর উপস্থিত হলে বললেন, সন্তানকে স্তন দেওয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর যেন সে উপস্থিত হয়। আর তখন উপস্থিত সন্তানটির লালন-পালনের ভার একজন সাহাবীকে দিয়ে তার উপর 'হদ্দ' কার্যকর করার নির্দেশ দিলেন।
এই ঘটনা অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে যে, অপরাধীর অবস্থা ও অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য রেখে দণ্ড কার্যকরকরণকে বিলম্বিত করার ব্যবস্থাও ইসলামে রয়েছে এবং তা দয়াশীলতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির উপর দণ্ড কার্যকর করাকে রোগমুক্তির সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করার ব্যবস্থা এই কারণেই গৃহীত হয়েছে। আহমাদ, মুসলিম, আবূ দাউদ ও তিরমিযী হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসূলে করীমের ক্রীতদাসী ব্যভিচার করলে তাকে দোরা মারার জন্য তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু আমি তার কাছে গেলে মনে হলো সে সদ্য 'নেফাস' থেকে উঠেছে। আমি মনে করলাম, এ সময় দণ্ড কার্যকর করা হলে হয়ত ওকে হত্যা করা হবে। তাই বিরত থাকলাম। নবী করীম (সা)-কে একথা জানালে তিনি বললেন:
احْسَنْتَ أتْرُكْهَا حَتَّى تُمَائِلَ أَي تَبْرَا -
তুমি ভালই করেছ। ওকে ওর ভালো হওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দাও।
অপরাধীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের গুরুত্বের দিক দিয়ে মুক্ত-স্বাধীন ও ক্রীতদাস হওয়ার মধ্যেও পার্থক্য আছে এবং ইসলামে এই পার্থক্যের গুরুত্ব স্বীকৃত। এই কারণে কোন কোন ফিক্হবিদদের মত হচ্ছে, ক্রীতদাস ও দাসীর ব্যভিচার অপরাধের দণ্ড কেবলমাত্র দোরা, অন্য কিছু নয় এবং তা ঘোষিত 'হদ্দ' দণ্ডের অর্ধেক করতে হবে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ -
( النساء - ٢٥ )
যখন ক্রীতদাসী বিবাহিতা হবে, অতঃপর যদি কোন যিনার কাজ করে, তা'হলে তাকে স্বাধীনা বিবাহিতাদের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির অর্ধেক শাস্তি দেওয়া হবে।
তার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। ক্রীতদাসীরা সব সময় খেদমত ও শ্রমের কাজে নিয়োজিত ও ব্যতিব্যস্ত থাকে। আর খেদমত ও শ্রমের কাজে নিয়োজিত লোকদের নৈতিক পবিত্রতার সংরক্ষণ অতটা শক্তিশালী থাকা বা করা সম্ভব হয় না, যা পদস্খলন থেকে তাদের রক্ষা করতে পারে। এ কারণে এ অপরাধের জন্য ঘোষিত শাস্তির অর্ধেক এদের বেলায় কার্যকর করা ইসলামী শরীয়তের সিদ্ধান্ত।
'কযফ'-যিনার মিথ্যা অভিযোগ এর জন্য নির্দিষ্ট শাস্তিটি পর্যালোচনা করা হলে দু'টি ব্যাপারের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। একটি ব্যাপারে স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ (Defamation) তোলে যে, সে যিনা করেছে, আর দ্বিতীয় ব্যাপার, স্বামী নয়-অন্য এক ব্যক্তি এইরূপ অভিযোগ তুলেছে। দ্বিতীয়োক্ত ব্যাপারে অ-স্বামীকে আশি দোরা মারা হবে তার এই মারাত্মক অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় বা সত্য প্রমাণিত না হওয়ার কারণে। আর স্বামীর ক্ষেত্রে একটা বিশেষ মাসআলার অবতারণা করা হয়েছে। তা হচ্ছে اللمان )আল-লি'আন)। কুরআন মজীদে এই কথাই ঘোষিত হয়েছে:
وَ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِارْبَعَةَ شُهَدَا فَاجْلِدُوْ هُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً - أَبَدًا وَ أُولئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ - إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَ أَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ - ( النور - ٤ - ٥ )
যেসব পুরুষ তাদের পবিত্রা স্ত্রীলোকদের উপর যিনার মিথ্যা অভিযোগ তোলে; কিন্তু তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থাপিত করে না, তাদের আশিটি দোরা মার এবং তাদের সাক্ষ্য কখনই গ্রহণ করবে না, ওরা ফাসিক লোক। তবে যারা তওবা করবে ও নিজেদের সংশোধন করে নেবে এই গুনাহ্ করার পর, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
এই বিধান নাযিল হওয়ায় স্বামীগণ খুব কঠোরতা অনুভব করল। হিলাল ইবনে মুনাব্বাহ (রা) তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে রাসূলে করীম (সা)-এর সমীপে যিনার অভিযোগ তুলেছিলেন। নবী করীম (সা) তাকে বললেনঃ
الْبَيِّنَةُ أَوْ حَدَّ فِي ظَهْرِكَ -
হয় সাক্ষী পেশ করে অভিযোগ প্রমাণ কর, নতুবা তোমার পিঠে 'হদ্দ' কার্যকর করা হবে।
হিলাল বললেনঃ হে রাসূল! যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর উপর অন্য এক পুরুষকে সওয়ার দেখতে পেল, সে যাবে প্রমাণ তালাস করতে।' তখনও নবী করীম (সা) উক্ত কথাই বলতে লাগলেন। তখন হিলাল আবার বললেন: যিনি আপনাকে সত্যতা সহকারে প্রেরণ করেছেন, তাঁর নামে শপথ করে বলছি, আমি সত্যবাদী। অতএব 'হদ্দ' থেকে আমার পিঠ বাঁচাবার জন্য যেন আল্লাহ্ আয়াত নাযিল করেন। অতঃপর লি'আনের এই আয়াত নাযিল হয়:
وَ الَّذِينَ يَرْمُونَ ازْوَاجَهُمْ وَ لَمْ يَكُنْ لَهُمْ شُهَدَا إِلَّا انْفُسَهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٌ بِاللَّهِ إِنَّه لَمِنَ الصَّادِقِينَ - وَ الْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ - وَ يَدْرَأَ عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٌ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ - وَ الْخَامِسَةُ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ .
যে সব লোক নিজেদের স্ত্রীদের উপর যিনার অভিযোগ তুলে এবং তাদের নিকট তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কোন সাক্ষী না থাকে, তা'হলে সেই একজনের সাক্ষ্য এই হবে; সে চারবার আল্লাহ্ নামে শপথ করে সাক্ষ্য দেবে যে, সে তার অভিযোগে সত্যবাদী। আর পঞ্চমবার বলবে, সে তার অভিযোগে মিথ্যাবাদী হলে তার উপর যেন আল্লাহর না'নত হয়। পক্ষান্তরে স্ত্রীলোকটি শান্তি থেকে রক্ষা পেতে পারে যদি সে চারবার আল্লাহ্র নামে কসম করে সাক্ষ্য দেয় যে, এই ব্যক্তির অভিযোগ মিথ্যা এবং পঞ্চমবারে বলবে, সে ব্যক্তির অভিযোগ সত্য হলে তার উপর যেন আল্লাহর গজব হয়।
এ আয়াতে শরীয়তদাতা স্বামী ও অন্যদের মধ্যে গুণগতভাবে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। এই পার্থক্য হুকুম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারেও স্পষ্ট। অ-স্বামীরা অনাত্মীয় ব্যক্তির মিথ্যা অভিযোগকে খুব সাংঘাতিক ও হারাম বলে অভিহিত করেছেন। পক্ষান্তরে স্ত্রীদের বিরুদ্ধে স্বামীদের এইরূপ অভিযোগ তোলাকে ততটা সাংঘাতিক বলা হয়নি। কেননা স্বামীও কখনও কখনও স্ত্রীর অনুরূপ অভিযোগের সম্মুখীন হয়ে থাকে লজ্জা প্রতিরোধের জন্য, স্ত্রীত্বের শয্যাকে নির্মল বানাবার জন্য এবং যে সন্তান সম্পর্কে স্বামী নিঃসন্দেহ, তা তার নয়, তাকে তারই বংশোদ্ভূত প্রমাণ করার জন্য।
সাধারণভাবেই ইসলামে হদ্দের দণ্ড স্থাপিত হয়েছে মানবীয় মনস্তত্ত্ব সম্পর্কীয় জ্ঞান এবং সূক্ষ্ম প্রকৃতিগত ঝোঁক-প্রবণতার উপর ভিত্তি করে। এই বিধান অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই ও সমাজ সমষ্টির কল্যাণের লক্ষ্যে কার্যকর। বস্তুত যে সব দণ্ড সমষ্টির স্বার্থে ব্যক্তিদের বিপর্যস্ত করে তা এক সাথে ব্যক্তি ও সমষ্টির কল্যাণ বিনষ্ট করে। যে আইন প্রণয়নে এক সাথে সমষ্টির কল্যাণের উপর লক্ষ্য রাখা হয়েছে, অপরাধীর উপর শাস্তি ধার্যকরণকালে অপরাধের পরিবেশ অবস্থা ও অপরাধীর মনস্তত্ত্ব কি ছিল তার উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রেখেছে। আল্লামা ইবনুল হাজার আল-হায়সামী তাঁর كتاب الز و اجر عند اقتراف الكبائر গ্রন্থে বিশেষজ্ঞদের এই মত উদ্ধৃত করেছেন:
বহু সংখ্যক অপরাধ ও গুনাহের বিবেচনা গুনাহর অবস্থার বিভিন্নতার কারণে বিভিন্ন হতে বাধ্য এই দৃষ্টিতে যে, অপরাধী কি তার অপরাধে পৌনপুনিকতার দোষে দুষ্ট; কিংবা তা নয়। অথবা তা একটা ভুল মাত্র ও ইচ্ছামূলক, সে বাধ্য হয়েছিল কিংবা বাধ্য ছিল না। সব গুনাহ্গারের অবস্থা নিশ্চয়ই অভিন্ন নয়। তা একই মাত্রায়ও হয় না।
নিম্নোদ্ধৃত ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তাবলী উক্ত কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে: দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা) দুর্ভিক্ষকালে চোরের হাত কাটার বিধান মওকুফ করে দিয়েছিলেন। কেননা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চোরকে চুরি কাজে বাধ্য করে থাকতে পারে। এটা অবস্থার বিবেচনা। এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির বাহন জন্তুটি চুরি করে ও জবাই করে খেয়ে ফেলেছিল মারাত্মক ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। ইমাম আহমাদ বলেছেন:
لَا قِطْعَ فِي الْمَجَاعَةِ .
দুর্ভিক্ষকালে চোরের হাত কাটার বিধান নেই।
অর্থাৎ ক্ষুধায় কাতর ব্যক্তি যদি খাদ্যদ্রব্য চুরি করে, তাহলে তাকে চুরির দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে না। কেননা সে চুরির অপরাধ করতে বাধ্য হয়েছিল। হযরত উমর (রা) সম্পর্কে বর্ণিত। তিনি বলেছেন:
لَا قِطْعَ فِي عَامِ الْمَجَاعَةِ -
দুর্ভিক্ষের বছর হাত কাটার আইন কার্যকর হবে না।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কসম করে বললেনঃ
لَا أَقْطَعُهُ إِذَا حَمَلَتِ الْحَاجَةُ النَّاسَ فِي شِدَّةٍ وَ مَجَاعَةٍ -
না, আমি কখনই তার হাত কাটব না। কেননা অভাব-অনটনের তীব্রতা ও দুর্ভিক্ষাবস্থা মানুষকে চুরি করতে বাধ্য করেছে।
হযরত উমর (রা) থেকে আরও বর্ণিত, হাতিব ইবনে আবু বলতায়া' (র)-এর ক্রীতদাসরা মুজানী বংশের লোকদের একটি উষ্ট্রী চুরি করে জবাই করেছিল। তখন হযরত উমর (রা) তাদের হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। পরে হযরত হাতিবকে বললেন: মনে হচ্ছে তুমি ওদের 'ভালোবাস'। অতঃপর তার এই ভালবাসার কথা মনে করে তাদের উপর 'হদ্দ' কার্যকর করার নির্দেশ প্রত্যাহার করে নিলেন।'¹
স্বামী যদি স্ত্রীর ও তার সন্তানদের ভরণ-পোষণের প্রয়োজন পরিমাণ মাল-সামগ্রী বা অর্থ না দেয় এবং এ কারণে স্ত্রী স্বামীর ধন-মাল থেকে গোপনে প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে তার হাত কাটা যাবে না। এর ভিত্তি হচ্ছে হিন্দ সংক্রান্ত হাদীস। সে নবী করীম (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করল: 'আমার স্বামী অত্যন্ত লোভী ও কৃপণ মানুষ। সে আমার ও আমার সন্তানদের প্রয়োজন পরিমাণ জীবিকা দিচ্ছে না, অথচ তার সব ধন-মাল আমারই হাতের মধ্যে। এখন আমি কি তা থেকে গ্রহণ করতে পারি? জওয়াবে রাসূলে করীম (সা) বললেনঃ
خُذِى مِنْ مَالِهِ مَا يَكْفِيكِ وَ وَلَدِكِ بِالْمَعْرُوفِ -
সাধারণ প্রচলিত মান অনুযায়ী যে পরিমাণ জীবিকা তোমার ও তোমার সন্তানদের জন্য যথেষ্ট, কেবল সেই পরিমাণই তুমি তা থেকে গ্রহণ করতে থাক।
ওয়ালীদ ইবনে উব্বা রোম অঞ্চলে প্রেরিত সেনাবাহিনীর সৈন্যাধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি তখন মদ্যপান করেছিলেন। হযরত হুযায়ফা ইবনুল য়ামান তাকে মদ্যপান অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি না দেওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
বর্ণিত হয়েছে, হযরত উমর (রা) তাঁর প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এই নির্দেশ লিখে পাঠিয়েছিলেন যে, কোন ক্ষুদ্র বাহিনী বা বড় বাহিনীর অধ্যক্ষের উপর মদ্যপানের অপরাধে কোন 'হদ্দ' কার্যকর করবে না। কেননা পথিমধ্যে সে তা টের পেয়ে গেলে ক্রুদ্ধ হয়ে ও শান্তি এড়ানোর জন্য কাফির সমাজের সাথে মিশে যেতে পারে।
এই ঘটনাবলী স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে কোন অপরাধের শাস্তি বিধানকালে অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে যে, অপরাধী ঠিক কি অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়ে অপরাধটা করেছিল। আর সব অপরাধকে একই মানদণ্ডে ওযন করাও সঠিক নয়। ইসলাম বরং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই নৈতিক শিক্ষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার মুকাবিলা করার পক্ষপাতী এবং এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নে আগ্রহী। এই লক্ষ্যেই ইসলাম লোকদের শরীয়ত পালনে অভ্যস্ত করতে ইচ্ছুক সবকিছুর আগে। দুনিয়ার মানব রচিত আইনের বিচারে এ প্রশ্নটি কোন গুরুত্বই পায়নি। অথচ ব্যক্তিগণের নৈতিক চরিত্র উত্তম হলে বা উত্তম বানানো সম্ভবপর হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অধিকতর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগণের অন্তরেই কল্যাণের ভাবধারা দৃঢ়মূল হয়ে বসতে পারে এবং মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সর্বপ্রকারের অন্যায়, পাপ ও অপরাধ থেকে বিরত থাকতে পারে।
উপরন্তু ভ্রান্ত মন-মানসিকতাকে হিদায়ত করার জন্য দয়া ও ক্ষমাশীলতা কত যে গভীর, ব্যাপক ও তীব্র প্রভাব রাখে তা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না। খোদ নবী করীম (সা) বলেছেন: إِنَّ الرِّفْقَ مَا كَانَ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَ لَا تَزْعَ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ . এই কারণেই শরীয়তদাতা অপরাধ ও আদর্শ বিচ্যুতির প্রতিরোধ এবং সংশোধন চিকিৎসার পন্থা হিসাবে নম্রতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শনের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। যেন অপরাধী অপরাধ সম্পর্কে কোন ভুল ধারণা পোষণ না করে এবং সেই কারণে অপরাধে নিমজ্জিত থাকাকেই স্থায়ী নীতি হিসাবে গ্রহণ করে না বসে। অপরাধের মধ্যেই যেন তার অগ্রগতি সাধিত হতে না থাকে। স্বয়ং নবী করীম (সা) অপরাধী বা গুনাহগার ব্যক্তিকে তার অপরাধ ও গুনাহের কারণে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করতে উৎসাহিত করেছেন। অন্যথায় তার মন-মানসিকতায় অপরাধ ও পাপের দিকে একটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে তা স্থায়ী ও দৃঢ় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে যদি জানতে পারে যে, লোকেরা তাকে ঘৃণা করে তার অমুক ত্রুটি বা চরিত্রের দরুন, তখন সে লজ্জায় মুখ ঢাকতে ও সমাজের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে সম্পূর্ণ অসামাজিক হয়েও দিনাতিপাত করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। আর যে লোক সমাজের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করবে, শয়তান তার সাথে সম্পর্ক দৃঢ়তর করে নেবে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এমন কোন কুলক্ষণা লোকই হতে পারে না যে, তার কাছে কল্যাণের কোন আশাই করা যায় না। তওবার দ্বার চিরদিনই উন্মুক্ত বলে তাতেও মহান কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ইসলাম তিনটি পন্থায় অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক সংশোধন ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের পন্থা গ্রহণ করেছে। পন্থা তিনটি এই:
১. সুপরিসিদ্ধ ও সংস্কৃত জনমত গঠন। এই কারণেই 'আমর বিল্ মারূফ ও নিহী আনিল মুন্কার-এর সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হয়েছে। 'ভালো'কে মন্দে'র জন্য দায়ী করা হয়েছে, যদি সে বাঁকা পথের পথিককে উত্তম পন্থায় সোজা ও সরল করতে অসমর্থ থাকে। এভাবে সমাজের ব্যক্তিগণ যদি পারস্পরিক নসীহত, উপদেশ, কল্যাণময় ও পরামর্শের ফলে সুসংবদ্ধ হয়ে উঠে তাহলে তারা অন্যায় ও দুষ্কৃতি প্রতিরোধে সক্ষম হবে এবং কল্যাণ ও শুভ চরিত্রের প্রতিষ্ঠা কার্যকর হবে।
২. লজ্জাশীলতা গ্রহণের দাওয়াত এবং তাকে মন-মানসিকতায় দৃঢ়স্থিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। কেননা লজ্জা-শরম সর্বতোভাবে কল্যাণের উৎস। অপরাধ প্রবণতার রোগে আক্রান্ত মন-মানসিকতায় লজ্জাশীলতার পুনর্জাগরণ এক সফল চিকিৎসা। কেননা তা অপরাধ করার পথে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। অপরাধের লজ্জা থেকে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই মনোবৃত্তি দৃঢ়ভাবে জাগ্রত করে যে, আমি এমন কাজ কখনই করব না, যার দরুন শেষ পর্যন্ত আমাকে জনসমাজে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে। এই জন্যই নবী করীম (সা) বলেছেন:
إِذَا لَمْ تَسْتَح فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ .
তোমার লজ্জাই যদি না থাকল, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা হয় করতে পার। তার অর্থ লজ্জা না থাকা সমস্ত অন্যায় ও পাপের চাবিকাঠি। যার লজ্জা নেই সে না করতে পারে-এমন কোন পাপের কল্পনাও করা যায় না।
৩. নির্লজ্জতার কার্যাবলীর প্রকাশ ও প্রচার হতে না দেওয়া। রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ
أَيُّهَا النَّاسُ مَنِ ارْتَكَبَ شَيْئً مِنْ هَذِهِ الْقَاذُورَاتِ وَ اسْتَتَرَفَهُوَ فِي سَتْرِ اللَّهِ وَ مَنْ ابْدَى لَنَا فَضَحَتَه أَقَمْنَا عَلَيْهِ الْحَدَّ -
হে মানুষ! যে লোক এইসব অন্যায় ও জঘন্যতম কার্যাবলীর কোন একটা করবে ও তা গোপন করে ফেলবে, সে আল্লাহ্ আবরণ লাভ করবে। আর যে লোক তার লজ্জাজনক কাজ আমাদের নিকট উদ্ঘাটিত করবে, আমরা তার উপর সুনির্দিষ্ট 'হদ্দ' অবশ্যই কার্যকর করব।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন:
إِذَا بَلَيْتُمْ فَاسْتَتِرُوا .
তোমরা যদি কোন দুর্ভাগ্যজনক কাজ করে বস, তাহলে তা গোপন কর।
এই কথাটি সুস্পষ্টভাবে এই তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত করে যে, অপরাধ গোপন করা হলে তার গুরুত্ব হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং তা এড়িয়ে চলতে লোকদের উদ্বুদ্ধ করে। অপরাধ গোপন করার উপর গুরুত্ব এজন্যও দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ প্রচারিত ও প্রকাশিত হওয়ায় একসাথে দু'টি অপরাধ সংঘটিত হয়। একটি হচ্ছে অপরাধ করা; আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রচার করা। রাসূলে করীম (সা) এই পর্যায়ে বলেছেন:
إِذَا خَفَيْتَ الْخَطِيئَةَ لَمْ تَضُرُّ إِلَّا صَاحِبَهَا فَإِنْ ظَهَرَتْ أَوْشَكَ أَنْ يُعَمَّ اللَّهُ الْكُلَّ بِعَذَابٍ مِّنْ عِنْدِهِ -
তুমি যদি কোন ভুল বা মন্দ কাজ লুকিয়ে ফেল, তখন তা যে করল কেবল তারই ক্ষতি করতে পারে। আর যদি তা প্রকাশিত হয়ে যায় তাহলে খুবই সম্ভব হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ্ তাঁর আযাবে সর্বসাধারণকে পরিবেষ্টিত করে ফেলবেন। আল্লাহ্ তা'আলা নিজেই ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَ الآخرة - ( النور - ১৯ )
যারা মুসলমানদের মধ্যে নির্লজ্জতার ব্যাপক প্রচার ও প্রকাশ পছন্দ করে, তাদের জন্য তীব্র পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে দুনিয়া এবং পরকাল-উভয় ক্ষেত্রেই।
অপরাধের প্রচার-প্রকাশ এড়িয়ে গিয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলার এক মহান সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবস্থা হিসাবেই এই কথার তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে।
এই তিনটি মৌলিক ব্যবস্থা অন্যায় পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে একটা তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি করার ও তার অনুকূলে জনমত গড়ে তোলার সুষ্ঠু ব্যবস্থা। মুসলিম মন-মানসিকতাকে ইসলামী শিক্ষা-প্রশিক্ষণে প্রস্তুত ও উন্নত করে তোলার জন্য তা খুবই কার্যকর। সমাজের ব্যক্তিগণকে এমন এক সুদৃঢ় বন্ধনে বন্দী করার এ এক নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, যার দ্বারা প্রত্যেকটি মানুষের মন-মানসিকতা থেকে অপরাধ প্রবণতা দূর করা যেতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির মনে পবিত্র চিন্তা ও নির্মল ভাবধারা জাগ্রত করে গোটা সমাজ-সমষ্টিকে এক মহাকল্যাণের দিকে পরিচালিত করা এভাবেই সম্ভব।
ইমাম গাযালী নীতি দার্শনিকদের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, এ ক্ষেত্রে একটা বাস্তব প্রক্রিয়াও রয়েছে, যদ্ধারা মন-মানসিকতা থেকে অন্যায় ও দুষ্কৃতির প্রবণতা দূর করা সার্থকভাবেই সম্ভব।
বস্তুত সামষ্টিকতাকে অপরাধের মুকাবিলা করা-অপরাধীর মন-মানসিকতার পরিশুদ্ধি বিধান এবং তা থেকে অপরাধ প্রবণতার মূলোৎপাটন ইসলামী আইন প্রণয়নে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থিত। সংক্ষেপে তা বর্ণনা হলো:
প্রথম : অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার মুকাবিলা-প্রতিরোধ করা। তা নিম্নোক্ত কয়েকটি উপায়ে সম্ভব: ক. মানুষকে পূর্ণ ঈমান গ্রহণে প্রস্তুত করা। তাহলে তা-ই তাকে বিকৃতি ও আদর্শ-বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করবে। খ. নৈতিক চরিত্রকে দৃঢ় করে তোলা। মন-মানসিকতায় ভালো কাজের প্রবল প্রবণতা ও তার প্রতি ভালোবাসা, তীব্র আকর্ষণ ও আগ্রহ সৃষ্টি করা। গ. 'আমর বিল্ মা'রূফ' ও 'নিহী আনিল মুনকার' ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে কার্যকর করা। ঘ. সামষ্টিকভাবে দীন প্রচারের ব্যবস্থা ও ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। ঙ. পারস্পরিক সহানুভূতি-সহযোগিতা ও কল্যাণ কামনা দ্বারা সুদৃঢ় মানসিক একাত্মতা গড়ে তোলা।
দ্বিতীয় : অপরাধ গোপন-অপ্রকাশিত ও অপ্রচারিত রাখা। অন্যায়, দৃষ্কৃতির প্রচার হতে না দেওয়া। তা হলে নির্লজ্জতা ব্যাপক হয়ে উঠতে পারবে না এবং অপরাধী তার অপরাধের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকবে।
তৃতীয় : শরীয়ত নির্ধারিত 'হদ্দ'সমূহ কার্যকর করা। অবশ্য সন্দেহের সুযোগ অভিযুক্তকে দিতেই হবে। তা'যীরী শাস্তিসমূহও কার্যকর করতে হবে। অবশ্য সেই সাথে অপরাধী কি অবস্থায় পড়ে অপরাধ করতে বাধ্য হয়েছে, তার প্রতি লক্ষ্য রাখা একান্তই কর্তব্য।
চতুর্থ : কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই 'তওবার' দ্বার সদা উন্মুক্ত রাখা।
পঞ্চম : অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট না করা, তাকে তার অপরাধের জন্য লজ্জিত ও লাঞ্ছিত না করা।
ষষ্ঠ : অপরাধ ক্ষমা করার উৎসাহ দান।
সপ্তম : বিশেষ আইনের সাহায্যে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। তা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যেমন করতে হবে, তেমনি করতে হবে প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেও। ফলে প্রত্যেকটি ব্যক্তি সমাজে সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করার সুযোগ পাবে।
ইসলামের এত সব প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরও যদি কোন ব্যক্তি অপরাধ করে, তা হলে সে এক বিন্দু দয়া, অনুগ্রহ বা ক্ষমা পাওয়ার অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে। সে তা পাওয়ার সব যোগ্যতাই হারাবে। এমতাবস্থায় তার অপরাধের যথাযথ শাস্তি অবশ্যই কার্যকর হতে হবে।
এই পর্যায়ে শেষ কথা-অপরাধ যদি কারুর স্থায়ী রোগের মত হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে সে সমাজের ভিত্তিমূলে বারবার আঘাত হানতে থাকবে এবং সমাজ এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠবে, তখন ইসলামী রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক সরকারের কর্তব্য হচ্ছে কঠোর হস্তে শাস্তি ও দণ্ড কার্যকর করা।
প্রথম ইসলামী উৎস প্রথম ইসলামী সমাজের পূর্ণাঙ্গ সংশোধনে পূর্ণ মাত্রায় সফলতা পেয়েছে। এই কারণেই সেই সমাজ আল্লাহ্র নিকট সর্বোত্তম সমাজ হওয়ার অধিকারী হয়েছিল। এই সমাজকে সম্বোধন করেই আল্লাহ্ বলেছেন:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ تُؤْمِنُونَ بالله - ( ال عمران - ۱۱۰ )
তোমরাই উত্তম মানব সমষ্টি। মানুষের কল্যাণে তোমাদের নিয়োজিত করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের আদেশ কর, মন্দ কাজের নিষেধ কর এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র প্রতি ঈমানে সুদৃঢ় থাক।
ইসলামের এই সংশোধনী প্রক্রিয়াই সমাজের শেষ জনসমষ্টিকেও সঠিকরূপে সংশোধন করতে সক্ষম। এজন্য তাকে তার নির্মল প্রকৃতির ও সুপরিশুদ্ধ মনোবৃত্তির দিকে ফিরে আসতে হবে। কুরআন থেকেই আইন গ্রহণ করতে হবে, সে আইনকেই যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। আল্লাহর এই কথাটির সত্যতার প্রতি ঈমান আনতে হবে, যা তিনি বলেছিলেন তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَ لَا تَكُنْ لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا - ( النساء - ١٠٥ )
আমি তোমার প্রতি এই কিতাব সত্যতা সহকারেই নাযিল করেছি, যেন তুমি আল্লাহর দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে লোকদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করতে পার এবং তুমি খিয়ানতকারীদের পক্ষপাতী হবে না।
আল্লাহ্র বিধানকে যারা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে এবং বাতিলের নিকট বাতিল আইনের ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা পেতে আশা করে বা চেষ্টা করে, তাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَ مَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يُتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَ قَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَ يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَلا بَعِيدُ - وَ إِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلى مَا انْزَلَ اللهُ وَ إِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا - ( النساء - ٦٠ )
তুমি কি তাদের ব্যাপারটা বিবেচনা করেছ, যারা মনে করে যে, তারা তোমার প্রতি ও তোমার পূর্বে যা কিছু নাযিল হয়েছে, তার প্রতি ঈমান এনেছে, তা সত্ত্বেও তারা তাগূতের নিকট বিচার চাইবার ইচ্ছা করছে। অথচ তাগূতকে অস্বীকার ও অমান্য করারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাদের। আসলে শয়তান তাদের গুমরাহ করে বহু দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এই লোকদের যখন বলা হয় যে, আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা এবং রাসূলের দিকে আস, তখন তুমি মুনাফিকদের দেখবে যে, তারা পাশ কাটিয়ে দূর থেকে চলে যাচ্ছে।
সারকথা দু'টি জিনিসই চাওয়া হচ্ছে : ১. আল্লাহ্ যে বিধান নাযিল করেছেন, তার প্রতি পূর্ণ ও একনিষ্ঠ ঈমান। ২. সেই বিধানসমূহকে ব্যক্তি ও সমষ্টির উপর পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়ন, কেননা প্রকৃতপক্ষে ‘ঈমানে কামিল’- পূর্ণাঙ্গ ঈমান হচ্ছে মনে-হৃদয়ে তাকে সুদৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাস্তব কাজ দ্বারা সে ঈমানের সত্যতা প্রমাণ করে দেওয়া। এই বিষয় দু'টির প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব সহকারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা আমাদের সকলেরই একান্ত কর্তব্য।
বস্তুত দুনিয়ার যেখানেই শরীয়তের বিধান পুরোপুরি ও যথাযথভাবে কার্যকর হয়েছে, সেখানেই পূর্ণমাত্রায় শান্তি ও নিরাপত্তা বাস্তাবয়িত হয়েছে, প্রত্যেকটি নাগরিকই তথায় নিজের জান-প্রাণ ও ধন-মালের নিরাপত্তা লাভ করেছে এবং পূর্ণ নিশ্চিন্ততা ও নিরুদ্বিগ্নতা সহকারেই জীবন যাপন করার নির্ভরযোগ্য সুযোগ পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান দুনিয়ার ইসলামী জনসমষ্টি স্বভাবত ইসলামী আইন-বিধানের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য পুরোমাত্রায় সচেতন হয়ে উঠেছে। আর সত্য কথা, তা যখনই এবং যেখানেই করা হবে, সেখানেই তা হবে মহান আল্লাহ্ প্রতি ঐকান্তিক আনুগত্যের পবিত্র ভাবধারার সার্থক হওয়ার।
আজ আল্লাহ্র প্রতি এবং তাঁর বিধান কুরআনের প্রতি প্রত্যাবর্তনের সময় এসেছে। সর্বশেষে উল্লেখ করছি কুরআনের আয়াত:
وَ أَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَ لَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَ صَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ - ( الانعام - ١٥٣ )
এ-ই হচ্ছে আমার অবলম্বিত সঠিক ঋজু সুদৃঢ় পথ। অতএব তোমরা তারই অনুসরণ কর। এ ছাড়া অন্যান্য যেসব পথ রয়েছে, তা অনুসরণ করবে না। করলে তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে ভিন্নতর পথে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যাবে। আল্লাহ্ তোমাদের এরই উপদেশ দিয়েছেন। আশা করা যায়, তোমরা বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে পারবে।
টিকাঃ
১. আলমুগনী - জ ৮ পৃ ২৭৮ : ৫
📄 পরিশিষ্ট
উপরোক্ত দীর্ঘ আলোচনায় বলা হয়েছে ইসলামী শরীয়তের আইন প্রণয়নকে দু'টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:
১. প্রকৃত অপরাধ, এগুলি বড় বড় অপরাধ
২. তা'যীরী অপরাধ
কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, এ পর্যায়ের অপরাধসমূহ বুঝি প্রকৃত অপরাধ নয়। আসলে বক্তব্য হচ্ছে, কতগুলি অপরাধের শাস্তি শরীয়তদাতা আল্লাহ্ নিজেই নির্ধারিত করে দিয়েছেন, অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে তা মওজুদ আছে। আর অনেকগুলি অপরাধেরই শাস্তি শরীয়তদাতা নিজে নির্ধারিত করেন নি এবং তা শরীয়তের অকাট্য দলীল পাওয়াও যায় না। এ পর্যায়ের অপরাধের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট।
এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দলীল-প্রমাণ সীমিত, আর অপরাধ ও অপরাধ পর্যায়ের ঘটনাবলী তো অশেষ। তা গুণে শেষ করা তো সম্ভব নয়। কেননা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও মন-মানসিকতা যখন বিকৃত ও বিপথগামী হয়ে পড়ে, তখন তা নিত্য নতুন ও রকমারি অপরাধ উদ্ভাবন করে। কোন একটি বিন্দুতে এসে তা শেষ হয় না, থেমেও যায় না। ইসলামী শরীয়ত এ অবস্থার বাস্তবতা ও গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়া তা'যীরী পর্যায়ের অপরাধের কয়েক শ্রেণীর উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন: যে সমস্ত অপরাধের 'হদ্দ' নেই, সেগুলিরও শাস্তি রয়েছে, তার কোন বিকল্প নেই। আমানতে খিয়ানত, ধোঁকা-প্রতারণা (Cheat-deceive), ওযনে-মাপে কম দেওয়া, ভালো জিনিসের মূল্য নিয়ে মন্দ বা ত্রুটিপূর্ণ জিনিস দেওয়া, ঘুষ-রিশওয়াত ইত্যাদি এই পর্যায়ের অপরাধের মধ্যে গণ্য।
এ পর্যায়ের অপরাধসমূহের শাস্তি আগে থেকেই নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি, যদিও এগুলি বড় বড় তা'যীরী অপরাধ। তার কারণ, সমাজ সমষ্টির কল্যাণের দৃষ্টিতে তাৎক্ষণিক অবস্থা ও পরিবেশে অপরাধসমূহের মাত্রায় যেমন পার্থক্য হতে পারে, তেমনি গুরুত্বেও পার্থক্য হতে পারে। তাই সেসবের প্রতি কড়া দৃষ্টি রেখে তাৎক্ষণিকভাবে এসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের (মজলিস শুরার) উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে কোন ব্যক্তি বা সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের যে কোন অপরাধে যে কোন শাস্তি নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়নি। সে জন্য কতগুলি শক্ত নিয়ম-নীতি ও শর্ত ধার্য করা হয়েছে, অপরাধ ও শাস্তির মধ্যকার আনুপাতিকতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং শরীয়তের অকাট্য দলীল ও তার সাধারণ মৌল নীতির বিরোধীতা করার কোন অধিকারই কাউকে দেওয়া হয়নি।
তা'যীরী অপরাধসমূহের জন্য এসব শক্ত নিয়ম-কানুনের মধ্য থেকে শাস্তি নির্ধারিত হবে এবং তাতে শরীয়তের অকাট্য দলীলের বিরোধিতা করা হবে না, সমস্ত আইন 'ইসলামী আইন' রূপে বিবেচিত হবে।