📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়তের দার্শনিক ভিত্তি

📄 আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়তের দার্শনিক ভিত্তি


আল্লাহ্ তা'আলা সমগ্র বিশ্বলোকের স্রষ্টা। এই বিশ্বলোক পরিচালনার জন্য তাঁর যেমন নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে, তেমনি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি নিরংকুশ সার্বভৌম শক্তিরও অধিকারী। দুনিয়ার মানুষ মহান আল্লাহ্র এক বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ সৃষ্টি। তিনি চান—দুনিয়ায় মানুষ আল্লাহ্ নিয়ামতসমূহ প্রয়োজনমত পেয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন-যাপন করুক এবং পরকালে অধিকারী হোক আল্লাহর নির্ধারিত স্থায়ী ও চিরন্তন কল্যাণের। কিন্তু তা একটি শর্তের উপর নির্ভরশীল।

আল্লাহ্ দেওয়া ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সার্বিক সুখ ও শান্তি নির্ভর করে এই দুনিয়ায় আল্লাহ্র অনুগত হয়ে সার্বিক জীবন-যাপনের উপর। আর আল্লাহ্র আনুগত্যভিত্তিক সার্বিক জীবন-যাপনের লক্ষ্যেই তিনি নাযিল করেছেন পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এই পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের যে অংশ (রাষ্ট্রশক্তির সক্রিয় সহযোগিতায়) আইন হিসাবে কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট, তা-ই হচ্ছে শরীয়ত। এই দুনিয়ার বুকে মানুষের বসতি শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই আল্লাহ্র নিকট থেকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান নাযিল হওয়া শুরু হয়েছে, মানুষ সর্বকালেই আল্লাহ্র নিকট থেকে লাভ করেছে জীবন পরিচালন ও সমাজ শাসনের জন্য শরীয়তের ব্যবস্থা। আল্লাহর নাযিল করা শরীয়ত অত্যন্ত মহান ও পবিত্র এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তিভিত্তিক ও কল্যাণকর।

আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ শরীয়তের পরম লক্ষ্য হচ্ছে—মানব সমাজের সংশোধন ও মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন, ব্যক্তি ও সমষ্টিকে কল্যাণ ও পরম সাফল্যের দিকে অগ্রসর করা এবং সর্বপ্রকারের অন্যায়, যুলুম, দুষ্কৃতি ও পাপ কাজ থেকে তাদের মুক্ত ও বিরত রাখা। বস্তুত ইসলামী শরীয়ত মহান আল্লাহ্ তা'আলার অবতীর্ণ এক তুলনাহীন ব্যবস্থা। এর লক্ষ্য সার্বিকভাবে সমস্ত মানবতার এবং বিশেষভাবে ইসলামে বিশ্বাসী জনগণের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত কল্যাণ সাধন এবং মানবজীবনের স্বাভাবিক বিকাশ ও অগ্রগতির সহিত পূর্ণ মাত্রায় সামঞ্জস্য বিধান। পূর্বের শরীয়তসমূহ বিশেষ সময়ের বিশেষ স্থানের লোকদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। ইসলামের শরীয়ত এই 'বিশেষ'-এর বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তা অবতীর্ণ হওয়ার সময় থেকে কিয়ামত পর্যন্তকার দেশ-বংশ-ভাষা-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য।

ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহ ইজমালী বা মোটামুটি ধরনের এবং মৌল নীতির পর্যায়ের। তাই গোটা ব্যাপারের ভিত্তি রচনা করে। উপরন্তু ইসলাম যেমন দীন-বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, তেমনি তা রাষ্ট্র-ও। তা ব্যক্তি ও সমষ্টির যাবতীয় কার্যকলাপে পরিব্যাপ্ত, তার বিধানাবলী স্থিতিস্থাপকতাসম্পন্ন (Elastic-Flexible) উৎস থেকে নিঃসৃত। সেই সাথে আল্লাহ্ আমাদের দিয়েছেন ইজতিহাদ করার অধিকার—পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নবতর প্রয়োজন পূরণের একটি সার্থক হাতিয়ার হিসাবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন এক নৈতিক সংস্থা বিশেষ। সর্বপ্রকারের কল্যাণময় মূল্যমানের ব্যাপকতা সাধন এবং নীচতা-হীনতা-নিকৃষ্টতা-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা জঘন্যতাকে নির্মূলকরণের উপর তা সংস্থাপিত। মুসলমান যদি বাস্তবিকভাবেই দীনের সহিত সম্পর্কিত ও তার অনুসারী হয়, নিজদিগকে দীনের বিধানাবলীর অধীন ও অনুগত বানাতে সচেষ্ট হয়, তাহলে মানুষের জীবন উক্ত রূপ সর্বদিক দিয়ে পূর্ণতা লাভ করতে পারে। বাস্তবে আল্লাহর বিধান পালিত হলে কর্মের সহিত আকীদা-বিশ্বাস ও কথার সামঞ্জস্য স্থাপিত হতে পারে, অকাট্য প্রমাণ হতে পারে তার সত্যতার।

অপরাধ প্রতিরোধে আসমানী ধর্মসমূহের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সর্বশেষে সেসব ধর্মের সত্যতা প্রমাণকারী হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে ইসলাম। ইসলামে এই পর্যায়ে যে বিপুল জ্ঞানতত্ত্ব ও আইন সম্পদ রয়েছে, তার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তা সর্বপ্রকারের অপরাধ প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট। তা অপরাধীকে বিরত রাখে অপরাধ করা থেকে। তা অপরাধ প্রবণতা ও অপরাধের পৌনপুনিকতা নির্মূল করতে সর্বতোভাবে সক্ষম। অথচ সেজন্য খুব মারাত্মক ধরনের কোন শাস্তির প্রয়োজন পড়ে না। ইসলামের পেশকৃত এসব উপায় ও পন্থার মধ্যে মানুষের মন ও বিবেককে সুস্থ, কল্যাণময় ও পবিত্র ভাবধারা সম্পন্ন করে গড়ে তোলা এবং অন্যায় অপরাধ ও পাপ কার্যের প্রতি ব্যক্তির মন-মানসে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করে দেওয়া অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

প্রথম: শরীয়তের মৌল নীতি
এই মৌল নীতির তাৎপর্য হচ্ছে মানুষ যে কাজ-ই করবে, অপরাধ আইনের চোখে তা মুবাহ্ (দোষমুক্ত কাজ) তবে যে কাজটিকে নিষিদ্ধ করে আইনে কোন ধারা উদ্ধৃত হয়েছে, কেবল মাত্র সেই কাজটি করাই অপরাধ গণ্য হবে। সেই অপরাধের একটা শাস্তিও সুনির্দিষ্ট হতে হবে, যা সে অপরাধকারীর উপর ধার্য করা হবে। যে স্থানে এবং যে সময়ে সে কাজটি করা হবে, সেখানে এবং সেই সময়ে সেই কাজটির নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও সর্বজনবিদিত হতে হবে।

দ্বিতীয়: ফৌজদারী অপরাধের দায়িত্বশীলতার মৌল নীতি
ফৌজদারী অপরাধ কাজের দায়িত্বশীলতা প্রমাণের জন্য জরুরী হচ্ছে, কাজটি ও অপরাধীর মধ্যকার সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ। এই সম্পর্কটি দু'টি দিক দিয়ে বিবেচ্য: ১. বাস্তবতার দৃষ্টিতে অপরাধী ও শাস্তিযোগ্য ঘটনার মধ্যকার বস্তুগত সম্পর্ক। ২. ভাবগত বা তাৎপর্যগত সম্পর্ক। অপরাধীর তাৎপর্যগত তৎপরতা ও মূল ঘটনাটির মধ্যকার সম্পর্ক। তাৎপর্যগত তৎপরতা বলতে বোঝায় অপরাধীর ভুল ও গুনাহ্। ইসলামী শরীয়ত এবং প্রধান অপরাধ আইনসমূহ বস্তুগত সম্পর্কের পাশাপাশি তাৎপর্যগত সম্পর্কের ব্যাপারটিও বিবেচনা করার পক্ষপাতী।

তৃতীয় : বস্তুগত স্তম্ভ
মানুষ কার্যত অপরাধ করলেই তা গণ্য হবে। মনের চিন্তা বা কল্পনা গণনার যোগ্য নয়। ইসলামী আইনের মূল কথা, মানুষের মনে যা কিছুই উদয় হয়, সেজন্য তাকে পাকড়াও করা হবে না। খোদ রাসূলে করীম (সা) বলেছেন : আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মাতের জন্য তাদের মনে যে ওয়াসওয়াসা জাগে বা মনে কোন কথার উদ্রেক হয়, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন—যতক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যত করা বা বলা না হয়।

পরিশিষ্ট
প্রকৃত অপরাধ ও তা'যীরী অপরাধের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। আমানতে খিয়ানত, ধোঁকা-প্রতারণা, ওযনে-মাপে কম দেওয়া, ভালো জিনিসের মূল্য নিয়ে মন্দ বা ত্রুটিপূর্ণ জিনিস দেওয়া, ঘুষ-রিশওয়াত ইত্যাদি এই পর্যায়ের অপরাধের মধ্যে গণ্য। তা'যীরী অপরাধসমূহের জন্য শক্ত নিয়ম-কানুনের মধ্য থেকে শাস্তি নির্ধারিত হবে এবং তাতে শরীয়তের অকাট্য দলীলের বিরোধিতা করা হবে না, সমস্ত আইন 'ইসলামী আইন' রূপে বিবেচিত হবে।

টিকাঃ
১. 'রজম' দণ্ডটির উল্লেখ কুরআনের পরিবর্তে 'মুতাওয়াতির' হাদীসে বিধৃত। রাসূলে করীম (সা) ও গোটা মুসলিম উম্মাত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত—ইজমা।
১. ইমাম কুরতুবী লিখেছেন: হাদীসটির সনদ সহীহ না হলেও এর তাৎপর্য ও প্রতিপাদ্য সর্বসম্মতভাবে সহীহ্।
২. আ'লামুল মুয়াক্কিঈন জ - ২ পৃ. ২১৪ - ২৯৬

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 অপরাধ প্রতিরোধে ঈমানের ভূমিকা

📄 অপরাধ প্রতিরোধে ঈমানের ভূমিকা


ইসলামে ঈমানের স্থান সর্বপ্রথম। তার পরই ইসলাম। ঈমান বীজ সদৃশ আর ইসলাম হচ্ছে সেই বীজ থেকে অংকুরিত বৃক্ষ। বীজ না হলে যেমন বৃক্ষের অস্তিত্ব অসম্ভব, তেমনি ঈমান ব্যতীত ইসলাম অবাস্তব। ইসলাম একটা দেহ সংস্থা, ঈমান তার মধ্যে অবস্থিত প্রাণ-সদৃশ। প্রাণহীন দেহ মূল্যহীন। তাই দীন ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব সর্বাধিক।

ইসলাম মানুষকে সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণেরই আহ্বান জানায়। কেননা ঈমান হচ্ছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রাসাদের ভিত্তি। ঈমান দানা বেঁধে উঠলে ইসলাম তথা ইসলামী বিধান কার্যত অনুসৃত হবে বলে প্রত্যয় জন্মে। ঈমান হলে ইসলাম পালিত হওয়ার যেমন সম্ভাবনা থাকে, তেমনি ঈমানবিহীন ইসলাম আল্লাহর আনুগত্যের ব্যবস্থা হিসাবে তাঁর নিকট গৃহীত হয় না।

মূলত 'ঈমান' শব্দের অর্থ হচ্ছে সত্য বলে মেনে নেওয়া, সত্য বলে স্বীকার করা। কেউ কোন বিষয়ে কাউকে কোন সংবাদ দিলে সেই সংবাদকে সত্য বলে মেনে নেওয়া বা স্বীকার করাই হচ্ছে ঈমান। সে 'ঈমানে' শুধু মৌখিক স্বীকৃতির কথা নেই, তা মানতে প্রস্তুত হওয়ার কথাটিও শামিল রয়েছে এবং খবরদাতার দেওয়া শুধু খবরটুকুকে সত্য বলে মেনে নেওয়াই ঈমানের জন্য যথেষ্ট নয়, সেই সাথে খবরদাতাকে সাচ্চা বা সত্যবাদী-সত্য সংবাদদাতা বলে বিশ্বাস করাও তার অন্তর্ভুক্ত।

সংশয়মুক্ত ঈমান:
সংশয়মুক্ত ঈমানই ইসলামে কাম্য; বরং সত্যি কথা, সংশয়হীন বিশ্বাসই ইসলামে ঈমান নামে পরিচিত ও অভিহিত। যে ঈমান সংশয়মুক্ত নয়, তা মানুষকে প্রকৃত মু'মিন বানায় না। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: প্রকৃত মু'মিন তারাই যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। অতঃপর কোনরূপ সংশয়াচ্ছন্ন হয়নি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তাদের জান-মাল দিয়ে। তারাই সত্যিকার ঈমানদার।

ঈমান ও কুফর:
বিশ্বাসের চরম বলিষ্ঠতা না থাকলে কারো পক্ষেই চরম মাত্রার আত্মত্যাগে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব হয় না। যে লোক কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, সে তার মন-মেজাজ ও যাবতীয় তৎপরতা সেই অনুরূপই গড়ে তুলবে। আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি চরম মাত্রার শত্রুতা মনের মধ্যে স্থান দেবে। পক্ষান্তরে যে লোক ঈমান আনবে সে হবে আল্লাহ্ ও রাসূলের একনিষ্ঠ অনুগত।

ঈমান ও আমল:
ঈমানের পরে পরেই এবং সাথে সাথেই তদনুযায়ী আমল একান্তই জরুরী। অন্যথায় ঈমানের যথার্থতাই অপ্রমাণিত থেকে যায়। আর ঈমান অনুযায়ী আমল হচ্ছে, আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং সেইসব কাজ করা, যা তিনি ফরয বা কর্তব্যরূপে ঘোষণা করেছেন।

ঈমান ও রাষ্ট্র:
ঈমানদার লোকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন কাফির লোকদের আনুগত্য ও অনুসরণ না করে। ঈমানই মানুষকে সমাজ-বিরোধী ও সাধারণভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখে। ঈমানদার লোকেরা কেবলমাত্র আল্লাহ্ ও রাসূলের দেওয়া আইন বিধানভিত্তিক বিচার-ফয়সালা ও প্রশাসন বিনাশর্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানতে রাযি হয়।

ঈমান ও সামাজিক রীতিনীতি:
ঈমানদার লোকদের সমাজ হবে নিয়ম-শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ। এখানে স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম-বিধির অমান্যতা এবং নেতৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা চলতে পারে না। কেননা, তা ঈমানেরই পরিপন্থী।

ঈমান ও অর্থ ব্যবস্থা:
ঈমানের ঘোষণা হচ্ছে, এই দুনিয়ার কোন কিছুরই মালিক মানুষ নয়। সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহই হচ্ছেন সবকিছুর একমাত্র নিরংকুশ মালিক আর সব মানুষ হচ্ছে সেই আল্লাহ্ই সৃষ্ট এবং বান্দা। অতএব সবকিছুই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলবে। ঈমানই মানুষকে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস, অপচয়, লুটপাট, বঞ্চনা-গঞ্জনা থেকে বিরত রাখে।

ঈমান ও পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা:
কুরআন-পরিকল্পিত সমাজে পারস্পরিক চুক্তি ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক। সমাজে ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার সুসম্পর্ক এরই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আর তার মূলে ঈমানের ভূমিকা সদা কার্যকর।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 অপরাধ দমনে ইবাদাতের প্রভাব

📄 অপরাধ দমনে ইবাদাতের প্রভাব


অপরাধ দমনে বা প্রতিরোধে ইবাদাতের প্রভাব বুঝবার জন্য শুরুতেই ইবাদাতের অর্থ এবং ইসলামে তার সাধারণ, ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যের আলোচনা করা আবশ্যক। আরবী অভিধান অনুযায়ী 'ইবাদাত' অর্থ আনুগত্য, বিনয় ও বাধ্যতা। ইবাদাত এমন এক ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আনুগত্য, যা জীবন, বুঝ-সমঝ, শ্রবণ-দৃষ্টি ইত্যাদির দাতা ছাড়া আর কেউ পাওয়ার অধিকারী নয়।

ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্য:
ইসলামে ইবাদাতের তাৎপর্যে সম্পূর্ণ ‘দীন’ই অন্তর্ভুক্ত। যে কথা, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যে কাজই আল্লাহ পছন্দ করেন, যা'তে তিনি খুশি ও সন্তুষ্ট হন, যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, সত্য কথা বলা, আমানতের সংরক্ষণ, ওয়াদাপূরণ, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ—এই সবকিছুই ইবাদাতরূপে গণ্য।

অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক তাৎপর্যসম্পন্ন ইবাদাতের প্রভাব:
সাধারণ ও বিস্তৃত তাৎপর্যের দৃষ্টিতে আদেশ-নিষেধ সমন্বিত আল্লাহ্ গোটা দীন পালন করাই ইবাদাত। ইসলাম নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সকল প্রকার পাপ, সীমালংঘন ও যুলুম হারাম করে দিয়েছে। গণমানুষের মৌলিক ও সর্বপ্রকারের অধিকারকে ইসলাম পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষিত করেছে। এই অধিকার হরণ বা তার উপর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বড় গুনাহ্।

মানুষের চরিত্রে ও আচার-আচরণে ইবাদাতের প্রভাব:
সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্জ—এর প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপিত করেছে। সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে। সিয়াম মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির উপর শক্ত লাগাম লাগিয়ে দেয়। যাকাত লোভ-লালসা, কার্পণ্য ও হিংসা থেকে মানব মনকে পবিত্র করে। হজ্জ মুসলিম ব্যক্তিকে সকল প্রকার পাপ ও অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার আত্মিক শক্তি জোগায়।

ঈমান ভিত্তিক ইবাদাত:
অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের যে ভূমিকার বিবরণ উপরে প্রদত্ত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান। ঈমান মানুষের জীবন ও বাহ্যিক আচার-আচরণকেও সুন্দর করে গড়ে তোলে। একনিষ্ঠ ঈমানই মানুষের মান-মর্যাদা সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরী। ঈমানদার ব্যক্তির জীবন্ত অন্তরই হয় ইসলামী আইন প্রণয়নের আসল দিগদর্শন।

টিকাঃ
১. বুখারী, মুসলিম।

📘 অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম 📄 অপরাধ দমনে ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব

📄 অপরাধ দমনে ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব


ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ বিধান। এই বিধানের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব এবং বিরাটত্বের কারণ হচ্ছে, তা জীবনের প্রত্যেক বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় পরিব্যাপ্ত। মানুষ যে পরিবেশে বসবাস ও জীবন ধারণ করে, অপরাধ এবং অপরাধের শাস্তি সেই পরিবেশের সহিত গভীরভাবে সম্পৃক্ত ব্যাপার। সেক্ষেত্রে ইসলামের অবদান পূর্ণমাত্রায় অনুধাবনীয়।

সম্ভবত মানুষের জানা-পরিচিত জীবন বিধানের মধ্যে ইসলামই একক ও অতুলনীয়, যা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ করে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার শাস্তি বিধান করেই ক্ষান্ত হয় না। অবশ্য দুনিয়ার অপরাপর মানবীয় বিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার শাস্তির ব্যবস্থা করা মাত্র।

এই কারণেই কুরআনে সেই অপরাপর বিধানসমূহের নামকরণ হয়েছে 'জাহিলিয়ত'- অজ্ঞতা ও বর্বরতাই তার আসল পরিচিতি। বলা হয়েছে: "ওরা কি জাহিলিয়তের বিধান ও প্রশাসন চায়? আসলে দৃঢ় প্রত্যয়শীল লোকদের জন্য আল্লাহর চাইতে উত্তম বিধানদাতা ও প্রশাসক আর কে-ই বা হতে পারে।" এ আয়াতের দৃষ্টিতে আইন-বিধান ও শাসন-প্রশাসন দু'ভাবে বিভক্ত ধরা যায়। একটি হচ্ছে আল্লাহর বিধান ও প্রশাসন এবং দ্বিতীয় হচ্ছে জাহিলিয়তের বিধান ও প্রশাসন।

মানুষ আল্লাহ্ নাযিল করা বিধান-পদ্ধতি বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে যে সব আইন-বিধান ও প্রশাসন পদ্ধতি রচনা করে, কুরআনে তার নামকরণ হয়েছে জাহিলিয়তের বিধান বা প্রশাসন-সংস্থা। এই প্রশাসন সংস্থা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যত না প্রতিরোধ ও নিষেধমূলক বিধি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তার চাইতে অনেক বেশি করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা হিসাবে। ইসলামও শাস্তির ব্যবস্থা করেছে বটে; কিন্তু আসলে ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তা সংঘটিত না হওয়া বা সংঘটিত হতে না দেওয়ার উপর কিংবা তার ক্ষেত্রকে সংকীর্ণতর করে দেওয়ার উপর। আর সে জন্য ইসলাম বহু প্রকারের উপায় অবলম্বন করেছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান ব্যাপকতরকরণ ইসলাম অবলম্বিত উপায়-পন্থাসমূহের মধ্যে সর্বাধিক প্রাধান্যের অধিকারী।

তবে ইসলাম ব্যাপারটিকে সর্বদিক দিয়ে এবং সর্বাত্মকভাবে গ্রহণ করেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চৈন্তিক, আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ প্রভৃতির মধ্যে কোন একটি দিককে ইসলামেও বাদ দেওয়া হয়নি। যে যে ছিদ্র পথে অপরাধ অনুপ্রবেশ করতে পারে ও করার সুযোগ পায়, তার প্রত্যেকটিই বন্ধ করে দিতে ইসলাম আগ্রহী এবং সচেষ্ট। এই কারনেই এ ঐতিহাসিক সত্য কেউ-ই অস্বীকার করতে পারবে না যে, মানব সমাজের মধ্যে অপরাধের সর্বনিম্ন মাত্রার দিক দিয়ে এখনও- এই চরম পতন যুগেও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান হিসাবে গৃহীত ও অনুসৃত না হওয়া সত্ত্বেও-ইসলামী সমাজ অনন্য ও তুলনাহীন। আর তার কারণ হচ্ছে, ইসলাম চতুর্দিক দিয়েই এই লক্ষ্যে অগ্রসর হয় এবং অপরাধ নির্মূল কিংবা তার ক্ষেত্র সংকীর্ণতরকরণে বাস্তব কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ চুরি অপরাধের উল্লেখ করা যেতে পারে। ইসলাম সে অপরাধ থেকে লোকদের দূরে রাখার জন্য হাত কাটাকে দণ্ড হিসাবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু হাত কাটার দণ্ড তো একমাত্র বা সূচনাকালীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নয়, তা হচ্ছে চরম ব্যবস্থা। এই পর্যায়ে সূচনাকালীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা হচ্ছে, ইসলাম সর্বপ্রথম মানুষকে ইসলামী জীবন-বিধানে বিশ্বাসী ও তার বাস্তব অনুসরণকারী বানাতে চায়, যেন চৌর্য কাজটিকে মুসলিম মাত্রই অন্তর থেকে ঘৃণা করে। সেই সাথে ইসলাম যে অর্থ ব্যবস্থা কার্যকর করে, তার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে, সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। এ জন্য ইসলাম দু'টি পন্থা গ্রহণ করেছে। প্রথমত, সমাজের প্রত্যেকটি কর্মক্ষম পুরুষের জন্য হালাল পবিত্র রিযক উপার্জন করার সুষ্ঠু ব্যবস্থা এবং দ্বিতীয়, সাধারণভাবে সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (Social security system) ব্যবস্থা। এ দু'টি বাস্তব ব্যবস্থা কার্যকর হলে কোন একটি ব্যক্তির পক্ষেও চুরি কার্যে নিযুক্ত হওয়ার কোন যৌক্তিকতা বা কারণই থাকতে পারে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন লোক যদি (চারিত্রিক দোষের কারণে বা লোভের বশবর্তী হয়ে) চুরি কাজে লিপ্ত হয়, তা'হলে অপরাধের শাস্তি হিসাবে শরীয়তে নির্ধারিত দণ্ড (হাত কাটা) অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। কেননা নাগরিকদের জীবনের সাথে সাথে ধন-মালের নিরাপত্তা দানও ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

কিন্তু তা সত্বেও-চুরি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রতিবন্ধক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর ও এই অপরাধ সংঘটিত হলে খুব দ্রুততা সহকারে হস্ত কর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ ইসলামের বিচারনীতির পরিপন্থী। ইসলাম প্রত্যেকটি অপরাধকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করে। অপরাধী কেন অপরাধ করল, কোন জিনিস তাকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করেছে, তা বিস্তারিত ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনা করা অপরিহার্য হবে। এ ভাবে পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনায় এই অপরাধকরণে কোন বৈষয়িক কারণ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে 'সন্দেহ-সুবিধা' অবশ্যই দেওয়া হবে এবং দণ্ড কার্যকরকরণ থেকে তাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে।

তা ছাড়া ক্ষমা দান করে ভুল করা শাস্তি দানে ভুল করা-অর্থাৎ ভুল করে নিরপরাধীকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দণ্ডদান করা অপেক্ষা অনেক বেশি উত্তম, ইসলামের দণ্ড বিধানে এক নির্গুণ সর্বজনগৃহীত মৌলনীতি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার প্রতি ইসলামের গৃহীত এ একটি বিশেষ কর্মপদ্ধতি। ব্যভিচার সংঘটিত হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্যও ইসলাম অনেকগুলি পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। এই কারণে কন্যার পূর্ণ বয়স্কা হওয়ার সাথে সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষ উৎসাহ-বরং তাকিদ প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে একটি নীতিগত বা মতাদর্শগত দাওয়াত বানিয়েই রাখা হয়নি। সে জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিবার নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বায়তুল মালই হয়ে থাকে সে জন্য প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে তার পক্ষে কারণ বিশ্লেষণও করা হয়েছে। যুবক-যুবতীদের কোন রূপ যৌন অপরাধে জড়িত হওয়ার পূর্বেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরী। এ ভাবে শরীয়তসম্মত পন্থায় যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার সুযোগ থাকলে অন্তত যৌন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পথ অনেকখানি রুদ্ধ হয়ে যাবে, তা সহজেই বুঝতে পারা যায়। যাদের অস্বাভাবিক যৌন উত্তেজনার ধারক হওয়ার কারণে একজন মাত্র স্ত্রী যথেষ্ট হয় না, তাদের জন্য একাধিক-চারজন পর্যন্ত স্ত্রী এক সময় গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বদিক দিয়ে ব্যভিচারের পথ বন্ধ করাই এই সব ব্যবস্থার লক্ষ্য। কেননা আধুনিক ইউরোপ-আমেরিকায় একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে যতই ঘৃণা করা বা লজ্জাকর ও সামাজিকভাবে ভয়ানক আপত্তিকর মনে করা হোক, বহু সংখ্যক বিয়েহীন 'স্ত্রী'-রক্ষিতা, মেয়ে বান্ধবী গ্রহণে ও তাদের সহিত প্রকাশ্যে ও গোপনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে কোনদিক দিয়েই একবিন্দু বাধা বা অসুবিধা নেই।

কিন্তু ইসলামের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম তার তওহীদী আকীদার কারণে পবিত্র এক দীন। মানুষকেও আল্লাহর পবিত্র সৃষ্টি হিসাবে গড়ে তোলা এবং জীবন যাপনে অভ্যস্ত করাই ইসলামের লক্ষ্য। ইসলাম বিশেষ করে পুরুষদের বিভিন্ন ও বিচিত্র ধরনের স্বভাব প্রকৃতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম লক্ষ্য করেছে যে, এমন পুরুষ রয়েছে যারা একজন মাত্র স্ত্রীর দ্বারা নিজেদের যৌন তৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে না, তাদের একের অধিক স্ত্রীর প্রয়োজন। তাই এই স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে একসাথে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি তাদের দিয়েছে। কিন্তু তাকে অসীম ও বাধা-বন্ধনহীন করে দেওয়া ও পুরুষের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার দিক দিয়ে উচিত নয়। সে কারণে একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে চার পর্যন্ত সীমিত করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, এক সাথে বড়জোর চারজন স্ত্রী রাখতে পারবে, তার বেশি নয়। যেন এই চারজনের বাইরে তাদের যৌন পরিতৃপ্তির ক্ষেত্র গ্রহণ করে অপরাধী হতে না হয়। দ্বিতীয়ত সে একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়পরতা ইনসাফ ও সমান আবরণ গ্রহণের শর্ত করা হয়েছে।

এক কথায়, ইসলাম অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই সম্ভাব্য অপরাধের দ্বার রুদ্ধ করে দিতে বদ্ধ পরিকর। তারপরও যদি অপরাধ সংঘটিত হয়, এবং তা হয় কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত, তা'হলে সে জন্য অপরাধীকে কঠিন ও কঠোর শাস্তি দেওয়া ইসলামের সিদ্ধান্ত এবং তার যৌক্তিকতাও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। যে সব অপরাধের জন্য ইসলামে 'হদ্দ'-সুনির্দিষ্ট শাস্তি ঘোষিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই এই কথার সত্যতা অনস্বীকার্য। অবশ্য কোনরূপ সন্দেহ সৃষ্টি হলে অভিযুক্তকে সেই সুযোগ দিতে হবে।

এই প্রেক্ষিতেই অপরাধ দমনে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রভাব কি, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। এই পর্যায়ে আমাদের প্রথম কথা হচ্ছে, ইসলাম মূলতই একটি শিক্ষা প্রশিক্ষণমূলক দীন। ইসলামের মৌল ভাবধারা-ঈমান, আকীদা, মূল্যমান ও জীবন-বিধানের ব্যাপক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সেই অনুযায়ী সমাজ-ব্যক্তিদের তৈরি করা ইসলামের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। তখন কুরআন ও সুন্নাতের উপস্থাপিত জীবন বিধানই হয় তাদের জীবনের অনুসরণীয় একমাত্র বিধান। কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে যা সত্য, যা কল্যাণকর, তা-ই হয় তাদের নিজ নিজ জীবনে একমাত্র সত্য ও কল্যাণকর। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে যা মিথ্যা, বাতিল, অন্যায় ও পাপ, তাদের মন-মানসিকতা ও জীবনের কর্মতৎপরতায় তা-ই হয় সম্পূর্ণরূপে বর্জিত ও প্রত্যাখ্যাত। এ ভাবে তৈরি করা লোকেরা প্রথমোক্ত জিনিসকে অগ্রাহ্য করতে এবং শেষোক্ত কার্যাবলী গ্রহণ ও অবলম্বন করতে কখনই-কোন অবস্থাতেই প্রস্তুত হয় না। এ ভাবেই ইসলাম তার যাবতীয় মূল্যমান ও নিয়ম-বিধানসহ উক্ত ব্যক্তিদের জীবনে এবং সেই ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজের ক্ষেত্রে পুরাপুরিভাবে বাস্তবায়িত হয়।

বস্তুত ইসলামের এই বাস্তবায়ন সম্ভব হয় কেবলমাত্র শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। নবী করীম (সা) প্রথমে মক্কায় এবং পরে মদীনায় এই কাজে প্রাণপণ চেষ্টা সাধনা ও সংগ্রাম করেছেন। দিন-রাত অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁর দীনী দাওয়াত ছিল ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচার-মাধ্যমে এবং সেই অনুযায়ী সাহাবীগণকে চলতে অভ্যস্ত করে দিয়ে তিনি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পূরণ করতেন, নাযিল হওয়া মাত্রই তিনি কুরআন পাঠ করে তাদের শোনাতেন। সেই অনুযায়ী নিজে কাজ করে ও সাহাবীগণ দ্বারা তা করিয়ে তবে ক্ষান্ত হতেন। রাসূলে করীম (সা) কর্তৃক দীন-ইসলাম এভাবেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

অতএব ইসলামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান-ই ছিল ইসলামকে বাস্তবায়িত করার প্রধান ও প্রকৃষ্ট উপায়, তা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য। এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টাও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য ছিল আর্দশ চরিত্রের ব্যক্তি গড়ে তোলা, সেই আদর্শ শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রশিক্ষিত চরিত্রবান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আদর্শ সমাজ গঠন করা।

এই দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে যে, দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও জীবন বিধানের সহিত ইসলামের কোন তুলনাই করা যায় না। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও জীবন-বিধানকে জাহিলিয়ত বলে অভিহিত করেছেন। কেননা সে মনে দীন শিক্ষাকে জীবন ও চরিত্র গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়া হিসাবে গৃহীত হয়নি।

দুনিয়ার অপরাপর ধর্ম ও জীবনাদর্শের লক্ষ্য হচ্ছে 'আর্দশ নাগরিক' তৈরি করা। কিন্তু ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে 'আর্দশ মানুষ' গড়ে তোলা।

'আদর্শ নাগরিক' ও 'আদর্শ মানুষ' এ দু'য়ের মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে? উপরোক্ত কথার প্রেক্ষিতে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। কিন্তু বাহ্যত এ দুইয়ের মাঝে কোন পার্থক্য আছে বা হতে পারে-তা মনে হয় না। কেননা আদর্শ নাগরিকই তো আদর্শ মানুষ কিংবা আদর্শ মানুষই তো আদর্শ নাগরিক হতে পারে বলে স্পষ্ট মনে হয়।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা একটা ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। এর সত্যতার কোন ভিত্তিই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আধুনিককালের এবং ইতিহাসের যে কোন সময়ের জাহিলিয়তের প্রতি তীক্ষ্ণ ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠবে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে ইংরেজদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই দুনিয়ায় আদর্শ রূপে গণ্য হতো। কেননা তা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল, যা ইসলামেরও লক্ষ্য। কিন্তু সে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ আদর্শ বা দৃষ্টান্তমূলক ছিল জাহিলিয়তের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দৃষ্টিতে এবং তার লক্ষ্য ছিল উপযুক্ত আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলা। আমরা যদি সেই আদর্শ নাগরিককে ইসলামের তুলাদণ্ডে ওযন করি, তা হলে আমরা অবশ্যই দেখতে পাব যে, 'আদর্শ নাগরিক', 'আদর্শ মানুষ' থেকে অনেক-অনেক দূরে অবস্থিত। আমরা বিশেষভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বকালীন বৃটিশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কথা বলছি এ জন্য যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ইউরোপীয় সমাজের মূল গ্রন্থিকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে, তথায় নিয়ে এসেছে চরম বিপর্যয়। সেখানকার অনেক ভালো ভালো মূল্যমান ও শুভ ব্যবস্থাপনাকেও সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে দিয়েছে। ফলে অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে সেখানকার সমাজ পরিবেশ ও ব্যক্তি-চরিত্র, যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে দৃষ্টিগোচর হতো না। আমরা সেই সময়কার বৃটিশ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করছি এই কারণে যে, তখন তা বাস্তবিকই অনেক ভালো ছিল এবং তাতে যে আদর্শ নাগরিক গড়ে উঠত, তারা বিশ্বমানবতার নিকট আদর্শ ও দৃষ্টান্তরূপে গণ্য হতো। কিন্তু যখন এই গ্রেট বৃটেনের সুনাগরিকরা যখন বিশ্বের নানা দেশ দখল করে তার উপর কর্তৃত্ব করতে বের হয়ে আসত, তখন তারাই সর্বত্র চরম নির্মমতা, অমানুষিকতা ও চরিত্রহীনতার প্রত্যক্ষ পরিচয় দিত। বৃটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষ, সুদান ও মিসরে তাদের যে রূপ দেখা গিয়েছে, তা 'আদর্শ নাগরিকের' রূপ হলেও হতে পারে; কিন্তু 'সাধারণ মানুষের রূপ'-ও ছিল না। এমনকি তাদের নিজ দেশের অভ্যন্তরে আচরিত সমস্ত ভদ্রতা ও সুনাগরিকত্ব তাদের অধিকৃত ভূ-খণ্ডসমূহে চরম হিংস্র পাশবিকতার রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করত। তথায় তাদের আদর্শ নাগরিকত্ব ও বিশ্বাস পরায়ণতার নাম চিহ্ন-ও খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা তো নিজেদের দেশে উন্নত চরিত্র ও আদর্শ নাগরিক রূপেই গড়ে উঠেছিল? কিন্তু তাদের দখলিকৃত জনপদসমূহে তা কোথায় উঠে যেত? তবে তারা তথায় গিয়ে কি সম্পূর্ণ বদলে যেত? না, বদলে যেত না। আসলে তাদের সেই রূপ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়েছিল। তাদের মানবিক রীতি-নীতিতে, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারীরূপে আদপেই গড়ে তোলা হয়নি। মানুষ হিসাবে দুনিয়ায় অন্যান্য মানুষের সহিত মানবিক আচার-আচরণ গ্রহণের শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করা হয়নি।

মহান আল্লাহর বান্দা হিসাবে জীবন যাপনেরও কোন শিক্ষা তাদের দেওয়া হয়নি। আসলে তাদের তৈরি করা হয়েছিল 'গ্রেট বৃটেন' নামক দেবতার পূজারীরূপে। তারা দেশের অভ্যন্তরে সেই দেবতার কল্যাণে যা কিছু ভালো, তারই অনুসরণ করত। আর যখন তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত দেশসমূহ শাসনের দায়িত্ব নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসত, তখনও সেই দেবতার কল্যাণই হতো তাদের একমাত্র কাম্য। যদিও পদ্ধতি হতো ভিন্নতর। তখন ব্যাপক লুটতরাজ, চুরি-ডাকাতি, অপহরণ, নিরীহ অক্ষম মানুষের রক্তের বন্যা প্রবাহিত করা, মানুষের ইজ্জত-আবরু বিনষ্ট ও ধন-মাল আত্মসাৎ করাই হতো সেই দেবতার পূজার নৈবেদ্য। অথচ দেশের অভ্যন্তরে তারা হতো অত্যন্ত সৎ, সাধু বিশ্বাস্য, মানবতার দরদী ও নিরতিশয় ভদ্র মানুষ।

তাহলে বোঝা গেল, গ্রেট বৃটেনের বাইরে এসে তারা ঠিক বদলে যেত না। দেশে তারা যে 'আদর্শ নাগরিক', বাইরের দেশসমূহে সেই নাগরিক আদর্শত্ব কিংবা আদর্শ নাগরিকত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটত, যদিও তার রূপ ভিন্নতর। তাদের দেশের অভ্যন্তরে অনুসৃত নিয়ম-নীতি ও সাম্রাজ্যসমূহে গৃহীত আচরণে কোন স্ববিরোধিতা ছিল না। ছিল পূর্ণমাত্রায় সামঞ্জস্য। এ ছিল একই মানুষের দুই রূপ। পরিবর্তিত সাম্রাজ্যের রূপ নয়। এই কথাটির আরও ব্যাখ্যার জন্য আমি এখানে দুইটি দৃষ্টান্ত দিতে চাই। তাতে জাহিলিয়তের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বৈশিষ্ট্য বিশেষত্ব এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে আশা করি।

প্রথম ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল সাহারা মরুভূমিতে বৃটিশ বা মিত্রবাহিনী এবং আলমানীয়দের মধ্যে। এ এক দীর্ঘ প্রাণান্তকর যুদ্ধ ছিল। তবরুকে অবস্থিত রোমানদের উপর মন্টোগোমারীর বিজয় লাভে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল। আলমানীয়রা তবরককের চতুর্দিকে অবস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রে ডিনামাইট বসিয়ে সুরক্ষিত করে রেখেছিল। একবার সাময়িকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল আলমানীয়দের তবরক ত্যাগ করে চলে যাওয়ার এবং বৃটিশদের তথায় প্রবেশ করার ফলে। কিন্তু শেষবারে আলমানীয়দের তবরক ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পূর্বে তারা চতুর্দিকে ডিনামাইট বসিয়ে রেখে চলে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, তবরক দখলকারীরা যেন তা দখলে আনবার সময়ে ভীষণ-ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মরু অঞ্চলে সাধারণত প্রথমে উট ও গাধা পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যেন ওদের পায়ের আঘাতে ডিনামাইট ফেটে যায় এবং মানুষের ক্ষয়-ক্ষতি খুব সামান্যই হয়। কিন্তু বৃটিশ সেনাবাহিনীর চরম নির্মমতা এই দেখা গেল যে, তারা উট ও গাধার পরিবর্তে বৃটিশ সাম্রাজ্যাধীন ভারতীয় বাহিনীকে সেই ডিনামাইট বসানো প্রান্তরে প্রবেশ করার নির্দেশ দিল। তারা সামরিক বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী সেনাধ্যক্ষের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। তারা জানত যে, এ প্রান্তরটি ডিনামাইটে ভরে আছে এবং তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার অর্থ নির্ঘাত মৃত্যু। তা সত্ত্বেও গোটা বাহিনী তাতে প্রবেশ করে ডিনামাইট ফাটিয়ে নিজেরা ধ্বংস হয়ে গিয়ে বৃটিশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার পথ বিপদমুক্ত করে দিল। এর পরই মিত্রবাহিনী তথায় প্রবেশ করে এবং পরের দিন সামরিক ইশতেহারে তবরক দখল ও যুদ্ধ জয়ের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, এ যুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতি খুব সামান্যই হয়েছে।

এ-ই হচ্ছে বৃটিশের আদর্শ নাগরিকদের বিশেষ চরিত্রের নমুনা। আসলে ওদের তৈরিই করা হয়েছিল গ্রেট বৃটেন দেবতার উপযুক্ত পূজারী রূপে এবং জন্তু-জানোয়ারের পরিবর্তে মানুষকে নিরীহ অক্ষম মানুষকে ধ্বংস করে গ্রেট বৃটেনের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল পৃথিবী ব্যাপী। ভেতরে অত্যন্ত উদার মানবিক চরিত্র এবং বাইরে নিতান্ত হীন মানব দুশমন চরিত্রের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে তারা খুবই দক্ষ ও পারঙ্গম।

দ্বিতীয় ঘটনাটি জনৈক বৃটিশ সামরিক ব্যক্তির ভারতবর্ষে অবস্থানকালীন একটি আলোকচিত্র। চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে, সে তার জন্য নির্দিষ্ট অশ্বের পৃষ্ঠে জিনের (Saddle) সাহায্যে আরোহণ করছে না, আরোহণ করছে তারই মত একজন ভারতবর্ষীয় মানুষের কাঁধের উপর পা রেখে। এইরূপ আচরণ যে আদৌ মানবিক নয় এবং যে মানুষকে মানুষ মনে করে, জন্তু-জানোয়ার নয়, এমন কোন লোকের পক্ষে এরূপ আচরণ করা সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য।

এখানে বৃটেনের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আদর্শ নাগরিকের যে জঘন্য ও বীভৎস ঘটনাদ্বয়ের উল্লেখ করা হলো, 'আদর্শ নাগরিক' ও আদর্শ মানুষের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য প্রকট করার জন্য তা সর্বতোভাবে যথেষ্ট। ইসলাম মানুষকে শুধু আদর্শ নাগরিক রূপেই বিবেচনা করে না, গড়ে তুলতেও চেষ্টা চালায় না, বরং আদর্শ মানুষ বা প্রকৃত মানুষের আওতায় তার লালন পালন করতে বদ্ধপরিকর। মানুষের সাথে ইসলামের আচরণ মানুষ হিসাবে। ইসলাম চায়, মানুষ তার সেই আসল প্রকৃতি ও চরিত্রে প্রতিভাত হোক, যে প্রকৃতি ও চরিত্রে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন: "আমরা মানুষকে অতীব উত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করেছি। পরে আমরা তাকে উল্টা ফিরিয়ে সর্বনিম্নে পৌঁছে দিয়েছি-সেই লোকদের ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে।"

এই ঈমান-ই মানুষকে তার সেই আসল রূপে ও গুণে বিভূষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, যাতে মহান আল্লাহ তা'আলা তাকে মূলতই সৃষ্টি করেছেন। আর তা-ই হচ্ছে আদর্শ মানুষ, 'শুভ মানুষ'-ইনসানে সালেহ্'। এই আদর্শ মানুষ গড়াই ইসলামের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের লক্ষ্য।

ইসলাম যে 'ইনসানে সালেহ্'-আদর্শ-উন্নত মানুষ' তৈরি করে, তা কোন কৃত্রিম মানুষ নয়, নয় বিশেষ বিন্দুতে ও নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের মধ্যে উন্নত চরিত্রের অধিকারী বা আদর্শ মানুষ। সে তো পৃথিবীর সর্বত্র যেখানেই তার পদধূলি পড়বে, মুসলিম সমাজের মধ্যে কিংবা তার বাইরে-সকল ক্ষেত্রেই তার উন্নত মানবিক চরিত্রের সংরক্ষক। তার সম্পর্ক ও যোগাযোগ কেবল মুসলিমদের সাথেই নয়, অমুসলিম যিম্মীদের সাথে তার যোগাযোগ থাকবে। অর্থাৎ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষেরই সাথে তাঁর যোগাযোগ সম্পর্ক ও আদান-প্রদান থাকবে। এই সত্যেকে সমুদ্ভাসিত করে তোলার জন্য এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা যাচ্ছে।

ইসলাম আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ সীমারেখা বরাবর অর্থাৎ মধ্য আফ্রিফার সম্পূর্ণ অঞ্চল এবং এশিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমের সর্বত্র কোনরূপ যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত ব্যতীতই ব্যাপক প্রচার লাভ করে। কিন্তু তা কিভাবে প্রচারিত হলো, কে প্রচার করল?..... বলা হয়, মুসলিম প্রচারকগণই তা করেছেন। .....এ কথা অসত্য নয়। ইসলামের প্রচারকদের খুব বড় এবং বেশি তৎপরতা ছিল এই বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী ইসলামের ব্যাপক প্রচার লাভের মূলে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু আসলে এ ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যবসায়ীদের ভূমিকাই ছিল সর্বাধিক প্রবল। আর তাদের অধিকাংশ ছিল আরব উপদ্বীপের অধিবাসী হাদরামী বংশের লোক। তাঁরা পৃথিবীর দিকে দিকে সফর করেছেন-দীনের দাওয়াত প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে নয়, শুধু ব্যবসায়ের লক্ষ্যে। কিন্তু নিছক ব্যবসায়ী অভিযাত্রীদের দ্বারা ইসলাম কি করে এতটা প্রসারতা লাভ করতে পারলো, অথচ তারা ইসলাম প্রচারের জন্য এই বিদেশ যাত্রা করেন নি?.....তা কি করে সম্ভব হলো, সে একটা বড় প্রশ্ন বটে।

এ সব এলাকার অধিবাসীরা যখন আরব মুসলিম ব্যবসায়ীদের অতীব উত্তম চরিত্র দেখতে পেয়েছিল, যখন দেখল ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ফলে এই লোকগুলির চরিত্র কত উন্নত, মধুর ও মানবিক; প্রত্যক্ষ করলো তাদের নৈতিক পরিচ্ছন্নতা, পরি শুদ্ধতা, আনুভূতিক, আত্মিক, নৈতিক, পারস্পরিক লেনদেন ও সম্পর্ক-সমবন্ধ সংক্রান্ত যাবতীয় আচার-আচরণের পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও নিষ্কলুষতা, তখনই তারা ইসলামের সত্যতার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠলো। তারা বলল, এ-ই যদি ইসলাম হয়, তা হলে সে ইসলামের জন্যই আমরা প্রতি মুহুর্তে অপেক্ষা করছি এবং পাওয়া মাত্রই তারা তা গ্রহণ করে নিল। কেননা যে দীন এরূপ আদর্শ মানুষ তৈরি করতে পারে, তার মত আর দীন হতে পারে না। তা অবশ্যই সত্য ও অনন্য হতে বাধ্য। তা হলে বলা যায়, আরব-মুসলিম ব্যবসায়ীদের আচার-আচরণই ইসলামের ব্যাপক প্রচারের জন্য প্রধানত দায়ী এবং এটা তাদেরই বিশেষ অবদান, সন্দেহ নেই।

আর ইসলাম মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালিয়েছে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ভিত্তিতে। তা সেই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, যার সাক্ষ্য ও ঘোষণা স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) দিয়েছেন। তা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত। আমরা মুখে যতটা উচ্চারণ করি, কালেমা আসলে ঠিক ততটাই নয়। মূলত তা এক বিরাট বিপ্লব। উপরন্ত মুখে কালেমার শব্দসমূহ উচ্চারণ করার নাম-ই ইসলাম নয়। ইসলাম হচ্ছে এই কালেমাকে বাস্তবায়িত করা, কালেমা অনুযায়ী যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা। ইসলাম এই কালেমার ভিত্তিতেই মানুষকে তৈরি করেছে, তৈরি করতে চাচ্ছে, কেননা এই কালেমাই তো ঈমান, ঈমানের মর্মবাণী। ইসলামে যে ঈমান, তার কতিপয় শর্ত ও লক্ষ্য রয়েছে, রয়েছে কতগুলি নৈতিক দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য। নিম্নোদৃত আয়াতটি লক্ষ্যণীয়:

"মু'মিনরা কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু মু'মিন কারা, তাদের গুণ-পরিচিতি কি? কোন্ সব গুণের কারণে তারা মু'মিন নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছে? তার পরিচয়: মু'মিন তারা, যারা তাদের সালাতে বিনয়ী-বিনম্র-অবনত মন, যারা বেহুদা ও অর্থহীন কাজ থেকে বিরত, যারা যাকাতের কাজ সম্পন্নকারী বা নিজেদের চরিত্র পরিশুদ্ধ পরিবর্ধিতকারী, যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের সংরক্ষণকারী (নিজেদের স্ত্রী বা ক্রীতদাসী ছাড়া-তাতে তারা তিরস্কৃত নয়, যারা এর বাইরে নিজেদের স্পৃহা চরিতার্থ করতে চাইবে, তারা সীমালংঘনকারী) আর যারা তাদের আমানত ও ওয়াদা সমূহ পরিপূরণকারী, যারা নিজেদের নামাযের হিফাজতকারী-তারাই উত্তরাধিকারী, যারা ফিরদাউস জান্নাতের উত্তরাধিকারী হবে এবং তথায় চিরদিন থাকবে।"

অর্থাৎ শুধু কালেমার প্রতি বিশ্বাসী বা মুখের দাবিদার হওয়ার কারণেই মু'মিন নামে অভিহিত হতে পারে না। সেই ঈমান অনুযায়ী তাদের জীবন যাপন করতে হবে, এরই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে, তা-ই হবে তাদের বাস্তব জীবনের কর্মধারা। এই সঙ্গেই কুরআনের আরও একটি আয়াত বিবেচ্য। আয়াতটি এই: যারা জানলো যে, তোমার নিকট যা নাযিল হয়েছে তা বরহক, তারা কি তার মত যে অন্ধ। সেই বুদ্ধিমানরাই নসীহত কবুল করে, যারা আল্লাহর ওয়াদা পূরণ করে এবং পাকা-পোস্ত করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। আর যারা সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষা করে, যা স্থাপন ও রক্ষা করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন এবং ভয় পায় তাদের রবকে, ভয় করে অত্যন্ত খারাপ হিসাব লওয়াকে। আর যারা ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার লক্ষ্যে এবং নামায কায়েম করে ও ব্যয় করে তা থেকে যা আমরা তাদের দিয়েছি রিযিক হিসাবে গোপনে ও প্রকাশ্যে এবং অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করে, তাদের জন্যই রয়েছে পরিণতির ঘর হিসাবে সদাপ্রস্তুত জান্নাত।

আল্লাহর নিকট থেকে রাসূলে করীম (সা)-এর প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা যারা জানতে পারে এবং এই জানার ফলশ্রুতিতে তাদের আচরণ এই হবে যে, আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করবে, আল্লাহ্ যা পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন তা পূরণ করবে, নামায কায়েম করবে, অর্থদান করবে, অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করবে, বস্তুত কুরআনের দৃষ্টিতে তারাই মু'মিন। তার অর্থ কালেমা'র একটা পূর্ণাঙ্গ নৈতিক বিধান রয়েছে, শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের মন-মগজেও এই কালেমা প্রতিষ্ঠিত হবে সুদৃঢ়ভাবে।

যখন বলি যে, ইসলাম লোকদের প্রশিক্ষণ করে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্র ভিত্তিতে, তখন তার অর্থ এই হয় না যে, লোকদের শুধু এই কালেমার ওয়াজ শোনাতে হবে-ওয়াজ-নসীহত ও কালেমা বাস্তবায়নের একটি পন্থা সন্দেহ নেই-বরং এই কালেমা অনুযায়ী বাস্তব জীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও ব্যয় করতে হবে-এই কথাও তার অন্তর্ভুক্ত থাকে।

রাসূলে করীম (সা) ছিলেন মুসলমানদের আদর্শ নেতা, গোটা বিশ্বমানবতার অনুসরণীয় আদর্শ। বলা হয়েছে: "তোমাদের জন্য রাসূলে রয়েছে অতীব উত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও পরকালের মুক্তির আশা করে ও আল্লাহকে খুব বেশি করে স্মরণ করে।" তাঁর পরে সাহাবায়ে কিরামের স্থান ও মর্যাদা এবং তাঁদের পরে তাবেয়ীনরা প্রত্যেকটি ইসলামী সমাজের নিকট আদর্শ। এ জন্য প্রত্যক্ষ আদর্শের প্রয়োজন, আর তা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দীন ইসলাম। এই কারণেই ইসলাম ফরয করেছে যে, প্রতিটি পরিবার মুসলিম বাবা ও মা সমন্বিত হতে হবে। তারা হবে ইসলামী নৈতিকতার ধারক ও বাহক। কেননা যে পরিবার ইসলামী আদর্শ অনুসারী নয়, সে পরিবারের শিশুদের ইসলামী চরিত্রে ভূষিত হওয়া সম্ভব নয়।

এমতাবস্থায় ইসলামী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের সূচনা কেন্দ্র হচ্ছে ইসলামী পরিবার। এই পরিবারই অপরাধ প্রতিরোধ করবে-তার সীমা সংরক্ষিত করবে সূতিকাগার থেকেই। এই পরিবারে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হচ্ছে পিতা-স্বাভাবিকভাবেই যদিও তা পালন করবে বাবা ও মা মিলিতভাবে। কিন্তু কর্তা ও পরিচালক হবে পুরুষ-পিতা। কুরআনের ঘোষণাঃ "মেয়েদের উপর পুরুষরাই কর্তৃত্বশীল হবে।"

অতএব নারী ও পুরুষ সমন্বিত একটি পরিবারে পুরুষই হবে প্রথম দায়িত্বশীল। দায়িত্বশীল পরিবারের সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে, তাদের ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যাপারে।

দীন-ইসলামের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে কুরআন মজীদের আক্ষরিক পাঠও ইবাদত বলে গণ্য। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা চান যে, মুসলিম মাত্রেরই হৃদয়মন এই কিতাবের শাব্দিক ঝংকারেও মুখরিত হয়ে থাক। তার ফলে এই কিতাব তার অতীব নিকটবর্তী সাথী হবে, সে নিজেও হবে তার চিরন্তনের সঙ্গী।

এভাবে প্রথম আদর্শ রাসূলে করীম (সা)। তারপরে প্রথম মুসলিম সমাজ-সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীনের জীবন চরিত। তারপরই আমাদের সম্মুখে আসছে এই মহান কিতাব। আমাদের যাবতীয় তৎপরতা চলবে তাকেই ভিত্তি করে। আমাদের চিন্তা চরিত্র ও কর্মকাণ্ড এরই আলোকে পরিচালিত হবে। আর এভাবেই ইসলামী সমাজের প্রথম বীজ হবে মুসলিম পরিবার। এই পরিবার তার সন্তানদের ইসলামের নৈতিক বিধানের উপর গড়ে তুলবে। তাদের প্রথম শিক্ষা হবে বাস্তব আদর্শের আলোকে। তার পরে আসবে উপদেশ-নসীহত। তবে তাই একমাত্র এবং সার্বক্ষণিক ব্যাপার হবে না। কেননা অনেক ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক উপদেশ-নসীহত বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই কারণে স্বয়ং রাসূলে করীম (সা)-ও প্রতিদিনই উপদেশ-নসীহত প্রদান করতেন না। আসলে শিশু সন্তানরা মৌখিক উপদেশ নসীহতের পরিবর্তে বাস্তব আদর্শে বেশি করে অনুপ্রাণিত হয়। বিশেষ করে পিতা-মাতার নিকট সন্তানরা বাস্তবে যা দেখতে পায়, তারা তারই অনুসরণ করে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সন্তানদের উপর পিতা-মাতার একটা স্বাভাবিক কর্তৃত্বও থাকে। ফলে তাদের চারিত্রিক আদর্শ সন্তানদের মন-মগজে বেশি করে প্রতিফলিত হয়। অনুরূপভাবে শিক্ষকদের চরিত্রেরও প্রবল প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের উপর। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের নিকট থেকে বালক-বালিকা ও যুবক-যুবতীরা যা কিছুই শেখে, তা তাদের মন ও মগজে দৃঢ়মূল-বদ্ধমূল হয়ে থাকে। কাজেই পরিবারের প্রাথমিক ও সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গণের শুরু থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ বংশধরদের যদি প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও লালনে ভূষিত করা যায়, তাহলে মুসলিম সমাজে অপরাধ বলতে কোন কিছুর অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। আর মানবীয় দুর্বলতা ও শয়তানের অব্যাহত প্ররোচনার দরুন কখনও কোন কিছু সংঘটিত হলে একে তো তা হবে সাময়িক দুর্বলতার এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং চেতনার উদ্রেকের সাথে সাথে অপরাধী নিজেই তওবা করে তা থেকে বিরত হবে। এ ধরনের অপরাধ কখনই ব্যাপক ও সামাজিক ব্যাধির রূপ পরিগ্রহ করতে পারবে না。

ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ বিধান। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ করে। ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে অপরাধ সংঘটিত হতে না দেওয়ার উপর। আর সে জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান ব্যাপকতরকরণ ইসলাম অবলম্বিত উপায়-পন্থাসমূহের মধ্যে সর্বাধিক প্রাধান্যের অধিকারী।

ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান-ই ছিল ইসলামকে বাস্তবায়িত করার প্রধান ও প্রকৃষ্ট উপায়। নবী করীম (সা)-এর দীনী দাওয়াত ছিল ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচার-মাধ্যমে এবং সেই অনুযায়ী সাহাবীগণকে চলতে অভ্যস্ত করে দেওয়া। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে 'আদর্শ মানুষ' গড়ে তোলা। ইসলাম যে 'আদর্শ মানুষ' তৈরি করে, সে পৃথিবীর সর্বত্র তার উন্নত মানবিক চরিত্রের সংরক্ষণ করে।

ইসলাম মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালিয়েছে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ভিত্তিতে। এই কালেমা অনুযায়ী বাস্তব জীবন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের সূচনা কেন্দ্র হচ্ছে ইসলামী পরিবার। পরিবার তার সন্তানদের ইসলামের নৈতিক বিধানের উপর গড়ে তুলবে। পরিবারের প্রাথমিক ও সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গণের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ বংশধরদের যদি প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও লালনে ভূষিত করা যায়, তাহলে মুসলিম সমাজে অপরাধ প্রবণতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px