📄 পাখির ভূনা গোস্ত
[৩৪৩] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতে তুমি একটি পাখি দেখবে, দেখার সাথে সাথে তা খাওয়ার জন্য তোমার ইচ্ছা হয়ে যাবে, ফলে তা তোমার সামনে ভূনা হয়ে চলে আসবে। তুমি সেখান থেকে ইচ্ছামত ভক্ষণ করতে পারবে।
[৩৪৪] আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন-একদিন জিবরিল তার হাতে শুভ্র আয়নার ন্যায় একটি সাদা আয়না নিয়ে আমার নিকট এসেছিল, তাতে কালো একটি ফোটা ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার হাতে এটা কি? সে বলল, জুমআ। আমি বললাম, জুমআ কি? সে বলল, তাতে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে। আমি বললাম, তাতে আমাদের কি কল্যাণ রয়েছে? সে বলল, এটা আপনার জন্য ঈদের দিন এবং আপনার পরবর্তীতে আপনার উম্মতের জন্যও ঈদের দিন। ইহুদি নাসারাগণও আপনার অনুগত হবে। (অর্থাৎ ইহুদি খ্রিষ্টানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন আপনার ঈদের দিনের পরে) তোমাদের জন্য তাতে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে সে সময়ে বান্দা আল্লাহ তাআলার নিকট যে কোন কল্যাণ প্রার্থনা করবে, তবে অবশ্যই তিনি তা দান করবেন। এর মাধ্যমে যে পানাহ চাবে, যে অনিষ্ট তার ভাগ্যে লিখা রয়েছে তার চেয়েও বড় অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে তিনি তাকে নিষ্কৃতি দান করবেন। তিনি বললেন, এ দিনটি আমাদের নিকট সকল দিনের সরদার; আমরা তার নাম রেখেছি, ইয়াওমুল মাযিদ ও ইয়াওমুল কিয়ামাহ।
তিনি বলেন, (ইয়াওমুল মাযিদ) এটি কেন জানো? কেননা পবিত্র ও মহিমান্বিত রব জান্নাতে একটি উপত্যকা বানিয়েছেন। (অর্থাৎ প্রশস্ত ময়দান তৈরী করেছেন) সেখানে তিনি সাদা মশকের স্তুপ রেখেছেন, যখন জুমআর দিন হয়, তিনি তাঁর কুরসী অথবা ইল্লিয়্যিন থেকে তাঁর কুরসীতে অবতরণ করেন। কুরসীটিকে স্বর্ণের মিম্বার দিয়ে বেষ্টন করে দেয়া হয়, যাতে মণিমুক্তা খচিত থাকে। সেখানে নবিদের জন্যও স্বর্ণের মিম্বার রাখা হবে তারা এসে সেখানে উপবেশন করবেন, তাদের আসনগুলোও নূর দিয়ে বেষ্টন করে দেয়া হবে। এরপরে সিদ্দিক ও শহিদগণও এসে তাদের আসনে উপবেশন করবেন। অতঃপর বালাখানার অধিবাসীগণও মিশকের স্তুপের উপর আসন গ্রহণ করবেন।
এর কিছুক্ষণ পর তাদের সামনে নিজের নূরের তাজাল্লি প্রকাশ করে বলবেন-আমিই সেই যে তোমাদের প্রতি দেয়া অঙ্গিকার সত্যে পরিণত করেছি ও তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিয়েছি। এটা আমার মহানুভবতার স্থান সুতরাং তোমাদের যা ইচ্ছা আমার কাছে চাও। তারা আল্লাহর কাছে তাঁর সন্তুষ্ট চাইবে। তিনি তাদেরকে সাক্ষ্য রেখে বলবেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর তারা তাদের সবকিছু চেয়ে ফেলবে; চাওয়ার মত আর কোন জিনিস খুঁজে পাবে না। এরপরে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জান্নাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছে, তাদেরকে তা দেখাবেন। জান্নাতের সুখ এবং বিভিন্ন রকম শান্তি দেখে তারা অবাক হয়ে যাবে। জান্নাত তো এমন, যা কোন মানুষের কল্পনাতে আসেনি, কোন কানও শ্রবণ করেনি, কোন চোখও তার দর্শন লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের মনকে খুশি করার পর তাঁর কুরসী থেকে উঠবেন এবং তাঁর সাথে নবিগণ সিদ্দিকগণ ও শহীদগণও উঠবেন। বালাখানার অধিবাসীরাও তাদের বালাখানায় ফিরে যাবে।
টিকাঃ
[৩১৮] দুর্বল। আত তারগিব: ৪/৫২৭।
[৩১৯] আল মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ২/২৫০।
📄 জান্নাতে শূণ্য ময়দান থাকবে
[৩৪৫] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন-আমি মিরাজের রাতে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আমার পক্ষ থেকে তোমার উম্মতকে সালাম জানাও এবং তাদেরকে সংবাদ দাও যে, জান্নাতের মাটি পবিত্র, সেখানকার পানি সুপিয়ো, তবে তা শূণ্য ময়দান, যার গাছ হলো সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।
[৩৪৬] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-যে ব্যক্তি বলবে 'সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি' তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপন করা হয়।
টিকাঃ
[৩২০] আস-সুনান, ইমাম তিরমিযি: ৩৩৮৪।
[৩২১] আস-সুনান, ইমাম তিরমিযি: ৩৩৮৬।
📄 রাব্বে কারিমের দিদার হলো সবচে’ বড় নিয়ামাহ
[৩৪৭] আল্লাহ তাআলার বাণী: যারা নেক কাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তার চেয়েও বেশী। (সুরা ইউনুস: ২৬) উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা রাহিমাহুল্লাহু বলেন, যখন জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা যা চাইবে তাদেরকে তা-ই দেওয়া হবে। এরপরে আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদেরকে বলবেন-জান্নাতে তোমাদের জন্য একটি নিয়ামাহ আছে যা তোমাদেরকে এখনো দেয়া হয়নি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের সামনে আসবেন। আর আল্লাহ তাআলা দিদার লাভ করার চেয়ে উত্তম আর কোনো নিয়ামাহ জান্নাতে নেই।
[৩৪৮] আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি কি জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের কথা বলে দিব? সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ, জি। আপনি আমাদেরকে বলে তা দিন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-সর্বনিম্ন জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের দরজা দিয়ে প্রবেশের সময়কালে ছোট ছোট শিশুরা বলতে থাকবে, স্বাগতম হে অতিথি, হে মুনিব। এখন আপনার সাথে সাক্ষাত করার সময় হয়ে এসেছে। অতঃপর তার জন্য চল্লিশ বছর মখমলের গালিচা বিছানো হবে। অতঃপর সে ডানে-বামে তাকিয়ে দু'টি জান্নাত দেখতে পাবে। সে বলবে-এই জান্নাত দু'টি কার জন্য? তাকে বলা হবে এগুলো তোমার জন্য। যখন সে তার শেষ প্রান্তে পৌঁছবে তখন সবুজ, ইয়াকুত ও যাবারযাদের নির্মিত বসতবাড়ি দেখতে পাবে। প্রতিটি বাড়িতে সত্তরটি করে ঘর থাকবে, প্রত্যেক ঘরে সত্তরটি করে কামরা থাকবে। প্রত্যেক কামরায় সত্তরটি করে দরজা থাকবে। তারা তাকে বলবে-তুমি উপরে উঠো। ফলে সে উপরে উঠতে থাকবে। যখন সে সর্বোচ্চ সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেই সিংহাসনটির প্রস্থ হবে দুই মাইল দূরত্ব পরিমাণ। সেখানে তার জন্য বিশেষ কামরা থাকবে। তখন তার নিকট বিভিন্ন রঙের স্বর্ণের সত্তরটি পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হবে। সে সব খাবারের স্বাদ উপভোগ করতে থাকবে। এরপর তার নিকট বিভিন্ন রঙের পাত্রে পানীয় পরিবেশন করা হবে। সে সেখান থেকে মন ভরে পান করবে। এরপরে (ফেরেশতারা) বালকদেরকে বলতে থাকব- (হে বালকরা) তোমরা তাকে (জান্নাতী)-কে এবং তার স্ত্রীকে নির্জনে রেখে এখান থেকে চলে যাও। ফলে বালকরা সেখান থেকে চলে যাবে।
এরপরে সে দেখতে পাবে তার খাটে অনেক হুর স্ত্রীরা বসে আছে। তাদের পরনে সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে। যাদের কারো কাপর কারো কাপড়ের সাথে মিল থাকবে না। জামার ভিতর গোস্ত ভেদ করে অস্থিমজ্জা, হাড়, রক্ত চলাচল পর্যন্ত দেখা যাবে। জান্নাতী ব্যক্তি হুরেইনের দিকে তাকিয়ে বলবে, তুমি কে? জবাবে হুরেইন বলবে-তোমরা কি আমাদের কপালে জুটবে না? তারা সেখানে চল্লিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করবে। কোনো দিকে তাকাবে না। সেখানে অনেক সুখ এবং নিয়ামাহ থাকবে, ফলে তারা ধারণা করবে যে, এর চেয়ে আর কোনো বড় সুখ নেই। অতঃপর মহান রব তাদের সামনে প্রকাশিত হবেন। জান্নাতীরা সবাই আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন-হে জান্নাতবাসীগণ, তোমরা আমার প্রশংসা করো। ফলে তারা রহমানের প্রশংসায় মেতে উঠবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে বলবেন-হে দাউদ, তুমি দাঁড়াও এবং আমার প্রশংসা করো-যেভাবে তুমি দুনিয়াতে প্রশংসা করতে। ফলে দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহর তাআলার প্রশংসা করতে থাকবে।
[৩৪৯] মালেক ইবনু দিনার রাহিমাহুল্লাহু বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে উঁচু একটি মিম্বার তৈরী করার জন্য আদেশ করবেন। ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশ পেয়ে বিশাল উঁচু একটি মিম্বর নির্মাণ করবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে ডেকে বলবেন, হে দাউদ, তুমি এই উঁচু মিম্বারের উপর বসে তোমার নরম সুর দিয়ে আমার প্রশংসা করতে থাকো। যেভাবে তুমি দুনিয়াতে দরদ দিয়ে আমার প্রশংসা করতে। দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার আদেশ পেয়ে মিনারের উপর বসে আল্লাহর প্রশংসনীয় গান গাইতে থাকবে। তাঁর কণ্ঠ শুনে জান্নাতবাসীরা পাগলপারা হয়ে যাবে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে: وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبٍ নিশ্চয় তার জন্য আমার কাছে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা এবং উত্তম আবাসস্থল।
টিকাঃ
[**] সুরা ইউনুস: ২৬।
[***] তাফসিরে তাবারি: ১১/১০৬।
[*] যয়িফ। আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ৪/৫০৬।
[৩২৫] সুরা সাদ: ২৫।
📄 জান্নাতের গান
[৩৫০] শাহর ইবনু হাওশাব রাহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন-আমার বান্দাগুলো দুনিয়াতে গান খুব পছন্দ করত, সুরেলা কন্ঠে গান শোনার জন্য তারা তারা সুন্দর সুন্দর গায়িকাদের ডেকে আনতো। হে ফেরেশতারা, আজ তোমরা আমার বান্দাদেরকে তোমার নরম সুরে গান শুনিয়ে দাও। ফলে ফেরেশতারা অনেক মধুর কন্ঠে আল্লাহর তাসবিহ, তাহলিলের গান শোনাতে থাকবে। যে গান মানুষ ইতিপূর্বে কোনোদিন শোনেনি।
টিকাঃ
[৩২৬] হাদিউল আরওয়াহ, ইবনুল কায়্যিম জাওযি: ১৮৪।