📄 রোমান্সের একটি জায়গা থাকবে
[৩২৯] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেন—জান্নাতীদের (বিনোদনের জন্য) একটি মনোমুগ্ধকর জায়গা থাকবে। সেই জায়গাটি একটি তাঁবু দ্বারা বেষ্টিত থাকবে। প্রতিটি তাঁবুর চারটি করে দরজা থাকবে। প্রত্যেক দরজা দিয়ে সকাল-বিকাল বিভিন্ন রকমের হাদিয়া-তোহফা, খাবার-দাবার আসতে থাকবে; যা ইতিপূর্বে জান্নাতী ব্যক্তি কখনো দেখেনি। সেখানে কোনো হৈচৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি থাকবে না। চারদিকে থাকবে নিলুয়া বাতাস। হিমেল হাওয়া। জান্নাতের বাতাসে শান্ত হবে জান্নাতীদের মন-অন্তর। খুব কাছে থাকবে হুরেইন। যারা হবে অনেক সুন্দর। যেন তারা লুকায়িত কোনো মনিমুক্তা।
[৩৩০] মাসরুক রাহিমাহুল্লাহু বলেন, আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন-জান্নাতের শ্রেষ্ঠ জায়গাতে একটি খিমা থাকবে। প্রত্যেক খিমায় চারটি করে দরজা থাকবে। প্রত্যেক দরজা দিয়ে সকাল-বিকাল হাদিয়া-তোহফা আসতে থাকবে। যা ইতিপূর্বে কখনো জান্নাতীরা দেখেনি। সেখানে কোনো অহমিকা, দূর্গন্ধ, দুর্যোগ থাকবে না। সেখানে থাকবে ডাগর-ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হুর। যেন তারা সুরক্ষিত ডিম।
[৩৩১] আল্লাহ তাআলার বাণী: كَأَنَّهُنَّ بَيْضٌ مَكْنُونٌ যেন তারা সুরক্ষিত ডিম। (সুরা সাফফাত : ৪৯) এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে সাঈদ ইবনু জুবাইর রাহিমাহুল্লাহু বলেন, হুরেইনরা ডিমের কুসুমের মত স্বচ্ছ এবং পরিস্কার হবে।
[৩৩২] আল্লাহ তাআলার বাণী: كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ (জান্নাতে থাকবে) প্রবাল ও পদ্মরাগ সদৃশ রমণীগণ। হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে বলেন-হুরেইনরা ইয়াকুত মুক্তার মত স্বচ্ছ হবে এবং মারজানা মুক্তার মত শুভ্র হবে।
[৩৩৩] হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেন-ছোট জান্নাতীদের জন্য লুলুয়ূ মনিমুক্তার মতো হুর হবে। আর বড় জান্নাতীদের জন্য মারজান মনিমুক্তার মতো হুর হবে।
টিকাঃ
[৩০০] হাদিউল আরওয়াহ, ইবনুল কায়্যিম জাওযি: ১৭২।
[৩০১] হাদিউল আরওয়াহ, ইবনুল কায়্যিম জাওযি: ১৬৪।
[৩০২] সুরা আর রহমান: ৫৮। তাফসিরে তাবারি: ২৭/১৫২।
📄 জান্নাতীদের খিমা
[৩৩৪] আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فِي الْجَنَّةِ خَيْمَةٌ مِنْ لُؤْلُؤًةٍ مُجَوَّفَةٍ عَرْضُهَا سِتُونَ مِيْلًا فِي كُلِّ زَاوِيَةٍ مِنْهَا أَهْلُ مَا يَرَوْنَ الْآخَرِينَ يَطُوفُ عَلَيْهِمُ الْمُؤْمِنُ . জান্নাতে উজ্জ্বল মুক্তার তৈরি এমন তাঁবু থাকবে-যার প্রস্থ হবে ষাট মাইল, তার চারদিকে মুমিনের পরিবার থাকবে, যারা অন্যদেরকে দেখতে পারবে না। মুমিন তাদের কাছ দিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
আরেক বর্ণনায় আছে-তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের তাঁবুগুলো মণি-মুক্তার তৈরি হবে। এর দৈর্ঘ্য হবে ঊর্ধ্বাকাশের দিকে ষাট মাইল। এর প্রত্যেক কোণে মুমিনদের সহধর্মিণীগণ থাকবে। তবে পরস্পর একে অপরকে দেখতে পাবে না।
[৩৩৫] আবদুল্লাহ ইবনু কায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতে (মুমিনদের জন্য) মাঝে ফাঁকা এরূপ মুক্তার একটি বিশাল তাঁবু থাকবে, যার বিস্তৃতি হবে ষাট মাইল। এর প্রত্যেক প্রান্তেই স্ত্রীগণ থাকবে। তারা পরস্পর একে অপরকে দেখতে পাবে না। মুমিনেরা ঘুরে ঘুরে সকল রমণীর নিকট যাবে।
[৩৩৬] আবু মুসা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন-জান্নাতে লুলুয়ূ মনিমুক্তার তাঁবু থাকবে। যার প্রতিটি কোণে থাকবে পবিত্রময় স্ত্রীগণ। যারা মুমিনদের চারদিকে ঘুরতে থাকবে।
[৩৩৭] আল্লাহ তাআলার বাণী: حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ তাঁবুতে অবস্থানকারীনি হুরগণ। এই আয়াতের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তারা থাকবে লুকায়িত মুক্তার মত।
[৩৩৮] আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতে সত্তর দরজা বিশিষ্ট লুলুয়ূ হীরার একটি খিমা (তাঁবু) আছে, যার প্রতিটি দরজা হলো মুক্তার।
[৩৩৯] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন-জান্নাতের খিমাগুলো মুক্তার হবে। যার দুরত্ব হবে এক ফারসাখ। খিমাটির চার হাজার স্বর্ণের দরজা থাকবে।
[৩৪০] আল্লাহ তাআলার বাণী: حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ তাঁবুতে অবস্থানকারিণী হুরগণ। মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহু এই আয়াতের তাফসিরে বলেন—হুরেইনরা যে তাঁবুতে অবস্থান করবে, সেটি হবে খাঁটি মুক্তার।
টিকাঃ
[৩০৬] সহিহ মুসলিম: ৫০৭১।
[৩০৭] সহিহ বুখারি: ৩০০৪; সহিহ মুসলিম: ৫০৭২।
[৩০৮] সহিহ মুসলিম: ৭০৫১।
[৩০৯] সহিহ মুসলিম: ৪/২১২২।
৩১০ [*] প্রাগুক্ত: ৮৪।
৩১১ [*] সুরা আর রহমান: ৭২।
৩১২ [*] তাফসিরে তাবারি: ২৭/১৬১।
৩১৩ [*] হাদিউল আরওয়াহ, ইবনুল কায়্যিম জাওযি: ১৫৫।
৩১৪ [*] সুরা আর রহমান: ৭২। তাফসিরে কুরতুবি: ১৭/১৯৮।
📄 জান্নাতের পাখি
[৩৪১] আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতের পাখিগুলো পশুসম্পদ বখতি উটের ন্যায় (বড় বড়) হবে।
[৩৪২] আল্লাহ তাআলার বাণী: وَلَحْمِ طَيْرٍ مِمَّا يَشْتَهُونَ (চির কিশোরেরা) তাদের রুচিমত পাখির মাংস নিয়ে (ঘোরাফেরা করবে।) হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু এই আয়াতখানা তিলাওয়াত করে বললেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেটা হলো জান্নাতের পাখি (জান্নাতে পাখির গোস্ত)। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সে পাখিটি কি নায়িমা পাখি? জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু বকর, যার হাতে আমি মুহাম্মাদের অন্তর, তার শপথ করে বলছি, আমি আশা রাখি, তুমি সেই পাখি থেকে ভক্ষণ করতে পারবে। হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেন, অবশ্যই তিনি সেই পাখি থেকে আহার করবেন। আল্লাহ তাআলা নবিজির আশাকে বাতিল করবেন না।
টিকাঃ
[৩১৫] গরিব। আল মুসনাদ, ইমাম আহমাদ: ৩/২২১।
[৩১৬] সুরা ওয়াকিয়াহ: ২১।
[৩১৭] মুরসাল। তাফসিরে ইবনু কাসির: ৭/৫২০।
📄 পাখির ভূনা গোস্ত
[৩৪৩] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতে তুমি একটি পাখি দেখবে, দেখার সাথে সাথে তা খাওয়ার জন্য তোমার ইচ্ছা হয়ে যাবে, ফলে তা তোমার সামনে ভূনা হয়ে চলে আসবে। তুমি সেখান থেকে ইচ্ছামত ভক্ষণ করতে পারবে।
[৩৪৪] আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন-একদিন জিবরিল তার হাতে শুভ্র আয়নার ন্যায় একটি সাদা আয়না নিয়ে আমার নিকট এসেছিল, তাতে কালো একটি ফোটা ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার হাতে এটা কি? সে বলল, জুমআ। আমি বললাম, জুমআ কি? সে বলল, তাতে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে। আমি বললাম, তাতে আমাদের কি কল্যাণ রয়েছে? সে বলল, এটা আপনার জন্য ঈদের দিন এবং আপনার পরবর্তীতে আপনার উম্মতের জন্যও ঈদের দিন। ইহুদি নাসারাগণও আপনার অনুগত হবে। (অর্থাৎ ইহুদি খ্রিষ্টানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন আপনার ঈদের দিনের পরে) তোমাদের জন্য তাতে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে সে সময়ে বান্দা আল্লাহ তাআলার নিকট যে কোন কল্যাণ প্রার্থনা করবে, তবে অবশ্যই তিনি তা দান করবেন। এর মাধ্যমে যে পানাহ চাবে, যে অনিষ্ট তার ভাগ্যে লিখা রয়েছে তার চেয়েও বড় অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে তিনি তাকে নিষ্কৃতি দান করবেন। তিনি বললেন, এ দিনটি আমাদের নিকট সকল দিনের সরদার; আমরা তার নাম রেখেছি, ইয়াওমুল মাযিদ ও ইয়াওমুল কিয়ামাহ।
তিনি বলেন, (ইয়াওমুল মাযিদ) এটি কেন জানো? কেননা পবিত্র ও মহিমান্বিত রব জান্নাতে একটি উপত্যকা বানিয়েছেন। (অর্থাৎ প্রশস্ত ময়দান তৈরী করেছেন) সেখানে তিনি সাদা মশকের স্তুপ রেখেছেন, যখন জুমআর দিন হয়, তিনি তাঁর কুরসী অথবা ইল্লিয়্যিন থেকে তাঁর কুরসীতে অবতরণ করেন। কুরসীটিকে স্বর্ণের মিম্বার দিয়ে বেষ্টন করে দেয়া হয়, যাতে মণিমুক্তা খচিত থাকে। সেখানে নবিদের জন্যও স্বর্ণের মিম্বার রাখা হবে তারা এসে সেখানে উপবেশন করবেন, তাদের আসনগুলোও নূর দিয়ে বেষ্টন করে দেয়া হবে। এরপরে সিদ্দিক ও শহিদগণও এসে তাদের আসনে উপবেশন করবেন। অতঃপর বালাখানার অধিবাসীগণও মিশকের স্তুপের উপর আসন গ্রহণ করবেন।
এর কিছুক্ষণ পর তাদের সামনে নিজের নূরের তাজাল্লি প্রকাশ করে বলবেন-আমিই সেই যে তোমাদের প্রতি দেয়া অঙ্গিকার সত্যে পরিণত করেছি ও তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিয়েছি। এটা আমার মহানুভবতার স্থান সুতরাং তোমাদের যা ইচ্ছা আমার কাছে চাও। তারা আল্লাহর কাছে তাঁর সন্তুষ্ট চাইবে। তিনি তাদেরকে সাক্ষ্য রেখে বলবেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছি। অতঃপর তারা তাদের সবকিছু চেয়ে ফেলবে; চাওয়ার মত আর কোন জিনিস খুঁজে পাবে না। এরপরে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জান্নাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছে, তাদেরকে তা দেখাবেন। জান্নাতের সুখ এবং বিভিন্ন রকম শান্তি দেখে তারা অবাক হয়ে যাবে। জান্নাত তো এমন, যা কোন মানুষের কল্পনাতে আসেনি, কোন কানও শ্রবণ করেনি, কোন চোখও তার দর্শন লাভ করেনি। আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের মনকে খুশি করার পর তাঁর কুরসী থেকে উঠবেন এবং তাঁর সাথে নবিগণ সিদ্দিকগণ ও শহীদগণও উঠবেন। বালাখানার অধিবাসীরাও তাদের বালাখানায় ফিরে যাবে।
টিকাঃ
[৩১৮] দুর্বল। আত তারগিব: ৪/৫২৭।
[৩১৯] আল মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ২/২৫০।