📄 শহিদগণের মর্যাদা
[২৫৬] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরিল আলাইহিস সালামকে
فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّমَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ
(শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে) ফলে আসমান এবং জমিনে যারা আছে, সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন। (সুরা যুমার: ৬৮)
এই আয়াত সম্পকে জিজ্ঞাসা করেন-হে জিবরিল, তারা কারা যারা আল্লাহর ইচ্ছায় কিয়ামতের বেহুশ হবে না? জবাবে জিবরিল আলাইহিস সালাম বললেন, তারা হলো শহিদগণ। যারা কিয়ামতের দিন তরবারি ঝুলন্ত অবস্থায় আরশের চারপাশে অবস্থান করবে। এই শহিদগণের সাথে হাশরের ময়দানে মুক্তাতুল্য ফেরেশতারা ঘোড়া নিয়ে সাক্ষাত করবে। যার দাত হবে শুভ্র এবং জীন হবে স্বর্ণের। হাওদা হবে রেশমের। তার লাগাম হবে রেশমের থেকেও অনেক নরম। তার লাগাম হবে চোখের দৃষ্টি পরিমান লম্বা।
অতঃপর (শহিদরা) জান্নাতে ঘোড়ার উপর আনন্দ-ফূর্তিতে ঘুড়তে থাকবে। তারা একসময় বলবে, আমাদেরকে আমাদের রবের কাছে নিয়ে চলো। আমরা আল্লাহর বিচার কার্য দেখবো। আল্লাহ তাদের (শহিদদের) দিকে দেখে হেসে দিবেন। তখন তাদের আর কোনো হিসেব-নিকাশ হবে না।
📄 উড়ন্ত ঘোড়া
[২৫৭] হুসাইন ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন-জান্নাতে একটি গাছ থাকবে, যার উপর থেকে জোড়ায়-জোড়ায় বিভিন্ন রকমের কাপড় বের হবে। এবং তার (গাছের) নিচ থেকে স্বর্ণের অনেক ঘোড়া বের হবে। যার জীন এবং লাগাম হবে ইয়াকুত পাথরের। ঘোড়াগুলো কোনো রকম পেশাব-পায়খানা করবে না। তার থাকবে অনেক সুন্দর ডানা। চলার গতি হবে-চোখের দৃষ্টি সমপরিমান।
জান্নাতীরা সেই ঘোড়াতে আরোহন করবে। ঘোড়াগুলো তাদেরকে নিয়ে জান্নাতের বিভিন্ন জায়গায় উড়তে থাকবে। তখন নিম্নস্তরের জান্নাতী ব্যক্তিরা আল্লাহ তাআলাকে প্রশ্ন করবে-হে আমার রব, আমার ঐ ভাইয়েরা অত মহান মর্যাদা পেল কীভাবে? তখন তাদেরকে বলা হবে-তারা দুনিয়াতে আল্লাহকে বেশী স্মরণ করেছে। তোমরা যখন নিদ্রাতে মগ্ন ছিল, তারা সালাত আদায়রত ছিল। আর তোমরা যখন আহারে মগ্ন ছিলে, তারা তখন রোজাদার ছিল। তারা যখন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছিল, তখন তোমরা কৃপণতা করেছিলে। আর তারা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিল, তখন তোমরা কাপুরুষতা দেখিয়েছিলে।
টিকাঃ
২৪১ [*] যয়িফ। হাদিউল আরওয়াহ, ইবনুল কায়্যিম: ১৯০।
📄 জান্নাতে ঘোড়াও থাকবে
[২৫৮] বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে ঘোড়া আছে কী? জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
إِنِ اللَّهُ أَدْخَلَكَ الْجَنَّةَ فَلَا تَشَاءُ أَنْ تُحْمَلَ فِيهَا عَلَى فَرَسٍ مِنْ يَاقُوتَةٍ حَمْرَاءَ يَطِيرُ بِكَ فِي الْجَنَّةِ حَيْثُ شِئْتَ إِلَّا فَعَلْتَ. قَالَ وَسَأَلَهُ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ فِي الْجَنَّةِ مِنْ إِبِلٍ قَالَ فَلَمْ يَقُلْ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِصَاحِبِهِ قَالَ إِنْ يُدْخِلْكَ اللَّهُ الْجَنَّةَ يَكُنْ لَكَ فِيهَا مَا اشْتَهَتْ نَفْسُكَ وَلَذَّতْ عَيْنُكَ
আল্লাহ তাআলা (যদি) তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং তুমি তাতে লাল পদ্মরাগ মনির ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হতে চাও আর তুমি জান্নাতের যেদিকে যেতে ইচ্ছা কর, সেদিকেই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তিনি (রাবী) বলেন, আরেক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে উটও আছে কি? তিনি তার সাথীকে যে উত্তর দিয়েছিলেন তাকেও এরকম উত্তর না দিয়ে বলেন, আল্লাহ তাআলা যদি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তাহলে তোমার মন যা চাবে এবং চোখে যা ভালো লাগবে সবই পাবে।
[২৫৯] ইবনু সাবেত রাহিমাহুল্লাহু বলেন—এক ব্যক্তি নবিজির দরবারে এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে কি ঘোড়া থাকবে? আমার তো ঘোড়া অনেক পছন্দ। জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা যদি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তাহলে তুমি জান্নাতে যা চাইবে তাই পাবে। (তোমার যদি ঘোড়ায় আরোহন করতে মন চায়, তাহলে সেখানে) ইয়াকুত পাথরের ঘোড়ায় আরোহন করতে পারবে, সেই ঘোড়ার দু'টি ডানা আছে। ঘোড়াটি তোমাকে জান্নাতে নীল বাগানে নিয়ে ঘুরবে। তখন আরেকজন আরাবী ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে কি উট আছে? জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতে সব আছে। যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তাহলে সেখানে তোমার মন যা চাইবে, তুমি তা-ই পাবে।
[২৬০] আবদুল মুমিন ইবনু উবাইদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহু বলেন—এক ব্যক্তি হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহুকে জিজ্ঞাসা করল, হে হাসান বসরি, জান্নাতে কি ঘোড়া আছে? আমার ঘোড়াতে আরোহন করা খুব সখ? উত্তরে হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বললেন, হ্যাঁ, সবকিছু আছে। তোমার মন যা চাইবে, সেখানে তুমি তা-ই পাবে। আর তোমার চোখ যা কামনা করবে, সেখানে তুমি তা-ই পাবে।
[২৬১] আবু আইয়ুব আল আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-জনৈক বেদুঈন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তো ঘোড়া পছন্দ করি। বেহেশতে ঘোড়া আছে কি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-তোমাকে যদি বেহেশতে প্রবেশ করানো হয় তাহলে মনি-মুক্তার একটি ঘোড়া তোমাকে দেয়া হবে। এর দু'টি ডানা থাকবে এবং তোমাকে এর পিঠে সওয়ার করানো হবে। তারপর তুমি যেদিকে যেতে চাও, সেটি তোমাকে নিয়ে সেদিকে উড়ে যাবে।
[২৬২] আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-হাউযে কাওসার প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তা একটি ঝর্ণা, যা আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আমাকে প্রদান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। এতে অনেক পাখি রয়েছে, যাদের ঘাড় উটের ঘাড়ের মতো উঁচু। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাহলে তো এগুলা সতেজ হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যারা এগুলো আহার করবে, তারা আরো সুন্দর ও সুখী হবে।
টিকাঃ
[২৪২] মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৬৪২। যয়িফাহ: ১৯৮০।
[২৪৩] যয়িফ। আস সুনান, ইমাম তিরমিযি: ২৫৪৩। আবু ঈসা বলেন-এ হাদিসের সনদ তেমন শক্তিশালী নয়। আমরা কেবল উপরোক্ত সূত্রেই এটিকে আবু আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু আনহুর রিওয়ায়াত হিসাবে জানতে পেরেছি। আবু সাওরা হলেন আবু আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু আনহুর ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনি হাদিসশাস্ত্রে দুর্বল। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন তাকে অত্যন্ত দুর্বল রাবী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসামাঈলকে বলতে শুনেছি, এই আবু সাওরা মুনকার রাবী এবং আবু আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বহু মুনকার রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যার সমর্থনযোগ্য কোন রিওয়ায়াত বিদ্যমান নেই।
[২৪৪] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৪/৫৪২।
জান্নাতে চাষাবাদ
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কথা বলছিলেন, তখন তার কাছে জনৈক গ্রাম্য লোক ছিল। তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন, জান্নাতে এক ব্যক্তি তার রবের কাছে চাষাবাদ করার অনুমতি চাইবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তুমি যা চাও তা কি জান্নাতে নেই? সে বলবে, হাঁ, আছে। কিন্তু আমি চাষ করতে ভালোবাসি। সুতরাং সে বীজ বপন করবে, তা থেকে ফসল উদগত হবে, তা বড় হবে এবং কাটার উপযুক্ত হবে। পাহাড়ের মতো স্তুপকৃত ফসল হবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদমসন্তান! ঠিক আছে। কেননা, কোনো বস্তু তোমাকে তৃপ্ত করতে পারবে না। তখন গ্রাম্য লোকটি বলল-আল্লাহর কসম! সে হয়তো কোরেশি বা আনসারি হবে; কেননা, তারা চাষী, আমরা চাষী মানুষ নই। তার এমন কথায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। [সহিহ বুখারি: ২১৭৭]
[২৪৫] নোট: জান্নাতে মোট দশ প্রকার প্রাণী থাকবে। বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্ন প্রাণীর কথা বলা হয়েছে।
[২৪৬] আস সুনান, প্রাগুক্ত।