📄 রাব্বে কারিমের দিদার হবে সেরা উপহার
[১১২] আবু তামিমা আল-হুজাইমী রাহিমাহুল্লাহু বলেন, আমি আবু মুসা আল-আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বসরার মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবায় এ কথা বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন-কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠাবেন। সে এসে বলবে, হে জান্নাতবাসীগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার দেয়া প্রতিশ্রুতি তিনি কি পূর্ণ করেছেন? তারা সব দিকে দৃষ্টি দিয়ে স্বর্ণ-অলংকার কাপড়-চোপড় ফলমূল ও নহরসমূহ এবং পুতপবিত্র কুমারী স্ত্রীগণ এসব পুরস্কার দেখে বলবে-হ্যাঁ, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছেন তা পূর্ণ করেছেন। পুনরায় ফেরেশতা বলবে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি কি পূর্ণ করেছেন? এভাবে তিনবার বলবে। তারা আর কোন প্রতিশ্রুতি খুঁজে না পেয়ে বলবে অবশ্যই তিনি পূর্ণ করেছেন। অতঃপর ফেরেশতা বলবে-এখনো তোমাদের জন্য বিশেষ একটি প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট রয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তারও চেয়ে বেশী। ১১০ 'হুসনা' দ্বারা জান্নাত উদ্দেশ্য। আর 'যিয়াদাহ' দ্বারা আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ উদ্দেশ্য। ১১৪
[১১৩] আল্লাহ তাআলার বাণী: لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তারও চেয়ে বেশী। ১১৫ এ আয়াত প্রসঙ্গে ইবনু আবি লায়লা রাহিমাহুল্লাহু বলেন-জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে প্রবেশের পর তাদেরকে সব রকমের পুরস্কার ও মর্যাদা দেয়া হবে। তাদেরকে ডেকে বলা হবে, হে জান্নাতবাসীগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে 'যিয়াদার' প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সুতরাং আজ তিনি নিজ নুরের তাজাল্লি প্রকাশ করবেন।
[১১৪] ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতবাসীদের মাঝে মর্যাদাগতভাবে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সেই হবে, যে প্রতিদিন দু'বার আল্লাহর দর্শন লাভ করবে।
[১১৫] জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, بَيْنَا أَهْلُ الْجَنَّةِ فِي نَعِيمِهِمْ، إِذْ سَطَعَ لَهُمْ نُورُ، فَرَفَعُوا رُءُوسَهُمْ، فَإِذَا الرَّبُّ قَدْ أَشْرَفَ عَلَيْهِمْ مِنْ فَوْقِهِمْ، فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ قَالَ: وَذَلِكَ قَوْلُ اللَّهِ: سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبِّ رَحِيمٍ، قَالَ فَيَنْظُرُ إِلَيْهِمْ، وَيَنْظُرُونَ إِلَيْهِ، فَلَا يَلْتَفِتُونَ إِلَى شَيْءٍ مِنَ النَّعِيمِ مَا دَামُوا يَنْظُرُونَ إِلَيْهِ، حَتَّى يَحْتَجِبَ عَنْهُمْ، وَيَبْقَى نُورُهُ وَبَرَكَتُهُ عَلَيْهِمْ فِي دِيَارِهِمْ জান্নাতবাসীরা তাদের ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকবে, এমতাবস্থায় তাদের সামনে একটি নূরের আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হবে। তারা তাদের মাথা তুলে দেখতে পাবে যে, তাদের মহান প্রভু তাদের উপর দিক থেকে উদ্ভাসিত হয়েছেন। তিনি বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! আসসালাম আলাইকুম (তোমাদের উপর অনন্ত শান্তি বর্ষিত হোক।) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এটাই হলো আল্লাহর বাণীর প্রমাণ। সালাম (অনন্ত শান্তি) পরম দয়ালু প্রভুর পক্ষ থেকে সম্ভাষণ। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি তাকাবেন এবং তারাও তাঁর প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকাবে। জান্নাতীরা যতক্ষণ আল্লাহর দীদারে থাকবে ততক্ষণ তারা অন্য কোন ভোগ-বিলাসের প্রতি ফিরেও তাকাবে না। অবশেষে তিনি তার দৃষ্টি থেকে অন্তর্নিহিত হবেন এবং তাঁর নূর ও বারাকাহ তাদের জন্য তাদের আবাসে অবারিত থাকবে। ১১৬
[১১৬] আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-বস্তুতঃ জান্নাতবাসীরা মলমূত্র ত্যাগ করবে না, নাক ঝাড়বে না, দেহ কাঠামোও বৃদ্ধি পাবে না। তারা ভোগবিলাসে লিপ্ত থাকবে, তাদের দেহ থেকে ঘাম মুক্তাদানার ন্যায় মিশকের সুগন্ধযুক্ত হয়ে ঝরবে। প্রতি জুমআয় কস্তুরীর স্তূপের উপর দু'বার আল্লাহর যিয়ারত লাভ করবে। স্বর্ণে এবং মণিমুক্তা ইয়াকুত ও যাবারযাদ দিয়ে খচিত করসীতে তারা আসন গ্রহণ করবে। তারা আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকবে। তিনিও তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। যখন তারা বালাখানার দিকে ফিরে যাবে, প্রতি বালাখানায় মণিমুক্তা ও ইয়াকুত পাথর দিয়ে খচিত সত্তর হাজার দরজা থাকবে। সেই দরজা দিয়ে তারা উঁকি মেরে তাকাবে।
[১১৭] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-জান্নাতীদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে। তাদের পর যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের মুখমণ্ডল আকাশে উদিত আলোকজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো হবে। তারা প্রস্রাব-পায়খানা করবে না, থু-থু ফেলবে না এবং নাক ঝাড়বে না। তাদের চিরুনী হবে স্বর্ণের। তাদের গায়ের ঘাম হতে মিশকের ঘ্রাণ আসবে এবং তাদের ধূপদানী হবে 'আলুওয়াহ্' নামে এক ধরণের সুগন্ধি কাষ্ঠের তৈরি। তাদের স্ত্রীগণ হবে ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট। তাদের চরিত্র হবে একই লোকের চরিত্রের মতো। আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের আকৃতি মতো হবে তাদের আকৃতি। যা ষাট হাত দীর্ঘ আকৃতি বিশিষ্ট।১৮
[১১৮] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ قَالَ: هَلْ تَشْتَاقُونَ شَيْئًا؟ قَالُوا: يَا رَبُّ فَمَا خَيْرُ مَا أَعْطَيْتَنَا؟ قَالَ: رِضْوَانِي أَكْبَرُ জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর তিনি বলবেন, তোমরা কি (আরো) কিছু কামনা করো যে, আমি তোমাদেরকে বৃদ্ধি করে দিবো (!) তারা (জান্নাতীরা) বলবে, হে রব, আমাদেরকে যা দিয়েছেন এরপরও কি কল্যাণ রয়েছে? তিনি বলবেন, আমার সন্তুষ্ট, আর আমার সন্তুষ্টই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ পুরস্কার।১১৯
টিকাঃ
[১১০] সুরা ইউনুস: ২৬।
[১১৪] আয যুহদ, ইবনুল মুবারক: ২৮২।
[১১৫] সুরা ইউনুস: ২৬।
[১১৬] যয়িফ। এ সনদে আবু আসিম আল আব্বাদানী ও ফ্যল ইবনু ঈসা তারা দু'জন যয়িফ। সহিহ বর্ণনায় হাদিস রয়েছে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, কিছু মানুষ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের রবকে দেখতে পারব? জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের সমস্যা হয়? তারা বলবে, হে আল্লাহর রাসুল! সমস্যা হয় না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের সমস্যা হয়? তার বলল-হে আল্লাহর রাসুল! না। (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন) তোমরা এভাবেই আল্লাহকে দেখবে। তিনি কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে জমায়েত করে বলবেন-যে যার ইবাদত করতে, সে তার অনুগামী হও! সুতরাং সূর্যপূজারীরা তার অনুগামী হবে, চন্দ্রপূজারীরা তার অনুগামী হবে, প্রতিমাপূজারীরা সেগুলোর অনুগামী হবে। বাকি থাকবে এই উম্মত এবং তার মুনাফিকরা। তখন আল্লাহ তাআলা তার পরিচিতরূপ ভিন্ন অন্যরূপে আসবেন এবং বলবেন-আমি তোমাদের রব। তখন তারা বলবে, তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। এটাই আমাদের অবস্থান-আমাদের রব আসা পর্যন্ত। অতঃপর যখন আমাদের রব আসবেন, আমরা তাকে চিনতে পারব। তখন আল্লাহ তাআলা পরিচিতরূপে আসবেন এবং বলবেন-আমি তোমাদের রব। তখন তারা বলবে, আপনি আমাদের রব, অতঃপর তার অনুগামী হবে। জাহান্নামের ওপর পুলসিরাত লাগানো হবে। তখন আমি এবং আমার উম্মত সর্বপ্রথম তা অতিক্রম করব। সেদিন কেবল রাসুলগণই কথা বলতে পারবে। সেদিন রাসুলগণের দুআ হবে-হে আল্লাহ! নিরাপদ রাখো, হে আল্লাহ! নিরাপদ রাখো। জাহান্নামে কাঁটাযুক্ত গাছের মতো পেরেক থাকবে। তোমরা কাঁটাযুক্ত গাছ দেখেছ? সাহাবায়ে কেরাম বললেন-ইয়া রাসুলাল্লাহ! হাঁ, দেখেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-জাহান্নামের পেরেকগুলো হবে কাঁটাযুক্ত গাছের' মতো। তবে সেগুলোর ভয়াবহতা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেগুলো মানুষের আমলের কারণে তাদেরকে খুলে নেবে। তাদের মাঝে কেউ আমলের কারণে ধ্বংস হবে, এবং কেউ অতিক্রম করে মুক্তি পাবে।
[*] আয যুহদ, ইবনুল মুবারক: ২৪২।
১৮ [*] সহিহ মুসলিম: ৭০৪১।
১১৯ [*] আল মুজামুল কাবির, তাবরানি: ৪/২১৪১।