📄 সকালের নরম বাতাসের উৎস
[৩২] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তাআলা 'জান্নাতু আদন'-কে নিজ হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কোনো একদিন তিনি তাতে দৃষ্টি দিবেন এবং বলবেন, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গিয়েছে।৩৪
অতঃপর জান্নাতু আদন-কে তালাবদ্ধ করে দেয়া হবে; আল্লাহ তাআলা যাকে চান, সে ব্যতীত অন্য কেউ তাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জান্নাতু আদন প্রতিদিন সকাল বেলায় খোলা হয়। আর দুনিয়াতে আমরা ভোরের যে বাতাস এবং মিষ্টান্নতা দেখতে পাই, তা সেই জান্নাত থেকে আসে।
টিকাঃ
[*] সুরা আল মুমিনুন: ১।
📄 জান্নাতু আদনের স্থান
[৩৩] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতে আদনের স্থান হল-অন্যান্য জান্নাতের একেবারে গভীরে। নিঝুম নীরব কোনো এক জায়গাতে।
টিকাঃ
[*] আদ দুররুল মানসুর, ইমাম সুয়ূতী: ৫/২।
📄 আখিরাতের অবস্থা এবং সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি
[৩৪] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-আখিরাতে আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। সেখানে তারা চল্লিশ বৎসর অবস্থান করবে। তারা আসমানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মেঘের আড়াল থেকে তাদের সামনে অবতরণ করবেন। এরপরে আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে-হে লোকসকল, তোমরা কি তোমাদের রবের প্রতি সন্তুষ্ট (!) যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন? যিনি তোমাদেরকে রিযিক দিয়েছেন ও তোমাদেরকে তাঁর ইবাদত করতে আদেশ করেছেন। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করতে নিষেধ করেছেন?.. শুনে রাখো, দুনিয়াতে যে যার উপাসনা করেছে; আজ সেই তার অভিভাবক হবে। এটা কি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুষম ও ন্যায্য বিচার নয়? তারা বলবে-হ্যাঁ অবশ্যই, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। তারা যেসব বস্তুর ইবাদত করত, তার আকৃতি স্থাপন করা হবে। অতঃপর প্রত্যেকে নিজ নিজ পূজনীয় বস্তুর দিকে ফিরে যাবে; তাদের মাঝে কেউ সূর্যের দিকে যাবে, কেউ চন্দ্রের দিকে যাবে, কেউ পাথরের মূর্তির দিকে যাবে। তথা ক্রুশের পূজারীরা ক্রুশের দিকে যাবে।
তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতগণ দাঁড়িয়ে থাকবে। সে সময় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন-কি হয়েছে তোমাদের (!) তোমরা ঐ সকল লোকদের মত তোমাদের রবের দিকে যাচ্ছো না কেন (!) তারা বলবে-আমাদের একজন ইলাহ রয়েছে, যাকে আমরা ইতিপূর্বে কখনো দেখিনি। তিনি বলবেন, যদি তোমরা তাকে দেখো তবে কি তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, আমাদের ও তার মাঝে একটি নিদর্শন রয়েছে, আমরা সে নিদর্শন দেখে তাকে চিনতে পারব। তিনি বলবেন, সে নিদর্শন কি? তারা বলবে, পায়ের নলা। তখন তিনি পায়ের নলা উম্মোচিত করে দিবেন।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যাদের পিঠ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তারা সকলেই সিজদায় লুটে পড়বে। কিন্তু একটি দল থাকবে যাদের পিঠ হবে ষাঁড়ের শিংয়ের ন্যায় (অর্থাৎ মেরুদন্ড কাঠের ন্যায় শক্ত হয়ে যাবে)। তারা সেজদা করতে চাইবে কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। অথচ যখন তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল, তখন তাদেরকে সেজদা করতে আহ্বান জানানো হত। অতঃপর তিনি বলবেন, তোমরা তোমাদের মাথা উত্তোলন করো, তারা তাদের মাথা উঠাবে। তিনি তাদের আমল অনুপাতে প্রত্যেককে নূরে আলোকিত করবেন। তাদের মাঝে কারো নূর পাহাড়ের ন্যায় বড় হবে। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। তাদের মাঝে কারো নূর হবে তার চেয়ে কম। কারো নূর হবে তার চেয়েও কম এমনকি তাদের শেষ ব্যক্তির নূর হবে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ন্যায়। যা একবার আলো দিবে একবার নিভতে থাকবে। যখন তার পা আলো দিবে, তখন সে চলবে। আবার যখন নিভে যাবে, তখন পুলসিরাতে দাঁড়িয়ে থাকবে।
বর্ণনাকারী বলেন-তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সামনে থাকবে। তারা ধারালো তরবারির ন্যায় তীক্ষ্ণ দুর্গম পিচ্ছিল পুলসিরাতের পথ অতিক্রম করতে থাকবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন—তোমরা অতিক্রম করো, তারা তাদের নূর অনুপাতে অতিক্রম করবে। তাদের মাঝে কেউ অতিক্রম করবে চোখের পলকের ন্যায়, কেউ পার হবে বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ পার হবে মেঘের ন্যায়, কেউ বাতাসের ন্যায়, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার ন্যায়, কেউ পার হবে ব্যক্তির চলার ন্যায়, এমনকি যার নূর হবে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ন্যায়-সেও উভয় হাত-পা ও মুখ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে হেঁচড়িয়ে যাবে; একহাতে ঝুলে থাকবে এক হাতে টেনে নিবে। এক পা ঝুলে থাকবে, আরেক পা টেনে-টেনে যাবে। জাহান্নামের আগুন তাদের খুব কাছাকাছি চলে আসবে। কিন্তু তাদেরকে স্পর্শ করবে না। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিস্কৃতি দিবেন। তারা নিষ্কৃতি পেয়ে সেখানেই অবস্থান করবে এবং বলবে—'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাকে জাহান্নামের বীভৎস ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখার পরও মুক্তি দিয়েছেন। অবশ্যই তিনি আমাদেরকে এমন সুখ দান করেছেন, যা অন্য কাউকে তিনি দান করেননি।'
অতঃপর জান্নাতের দরজার নিকট নহরে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তারা স্বচ্ছ পানি দিয়ে গোসল করবে। এমন সময় তাদের নিকট জান্নাতবাসীদের সুঘ্রাণ আসতে থাকবে। জান্নাতী ব্যক্তি যখন জান্নাতে ছড়িয়ে থাকা রং-বেরঙের বস্তুসমূহ এবং জান্নাতের দরজা দিয়ে জান্নাতের অভ্যন্তরীণ সুখ-শান্তি, অনাবিল সৌন্দর্য ও আনন্দঘন পরিবেশ সবকিছু দেখবে, তখন বলতে থাকবে—হে রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি জান্নাত চাচ্ছো অথচ আমি তোমাকে স্ববেমাত্র জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছি। হে আল্লাহ! আমার ও জাহান্নামের মাঝে আবরণ সৃষ্টি করে দিন; যেন আমি তার ক্ষীণতম শব্দও না শুনতে পাই। অতঃপর (একসময়) তাকে জান্নাত দেখানো হবে। তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে ঐ বিশ্রামস্থল দান করুন।
আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে এটি দান করলে হয়ত তুমি অন্যটিরও আবেদন করবে। সে বলবে, কখনো না, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি (এটি ব্যতীত) অন্যটির আবেদন করবো না; আর এ গৃহের চেয়ে উত্তম আর কোন গৃহ হতে পারে (!) সুতরাং তা তাকে দেওয়া হবে; সে তাতে অবস্থান করবে। এরই সামনে উঁচু করে আরেকটি বাসস্থান তাকে দেখানো হবে, সেটির আকাঙ্খা করে সে আবার বলবে-হে আল্লাহ! অমুক বাসস্থানটি আমাকে দান করুন। আল্লাহ তাআলা বলবেন-আমি তো তোমাকে সেটি দিলে তুমি আবার আবেদন করবে(!) সে বলবে, না, আপনার ইজ্জতের শপথ! এরপর আমি আর আবেদন করবো না; এটা থেকে উত্তম বাসস্থান আর কোনটি হতে পারে (!) অতঃপর এটিও তাকে দান করা হবে। সে সেখানে অবতরণ করবে।
বর্ণনাকারী বলেন-সে তার সামনে আরেকটি সৌন্দর্যময় বাসস্থান দেখে বলবে, হে রব! আমাকে সে বাসস্থানটি দান করুন। আল্লাহ তাআলা বলবেন-আমি যদি এটা তোমাকে দান করি তবে তুমি আরেকটিরও আবেদন করবে। সে বলবে, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি আর আবেদন করবো না; তার থেকে উত্তম বাসস্থান আর কোনটি হতে পারে (!) অতঃপর তাকে এটি দান করা হবে সে তাতে অবতরণ করে চুপ করে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমার কি হয়েছে, তুমি যে আর আবেদন করছো না। সে বলবে, হে রব! আমি বার বার আবেদন ও শপথ ভঙ্গ করে এখন আপনার সামনে আমি লজ্জিত। আল্লাহ তাআলা বলবেন—তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে, দুনিয়া সৃষ্টির শুরুলগ্ন থেকে শেষলগ্ন পর্যন্ত দশগুণ তোমাকে দান করি? সে বলবে, আপনি সকল সৃষ্টিজগতের রব হয়েও কি আমার সাথে উপহাস করছেন?
বর্ণনাকারী বলেন, তার এ কথা শোনে আল্লাহ তাআলা হাসবেন। রাবী বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম তিনি হাদিস শুনিয়ে এ স্থানে এসে তিনিও হেসে দিলেন। একজন বলল, ইয়া আবা আব্দির রহমান! (আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের উপনাম) আমি এ হাদিস আপনার থেকে কয়েকবার শুনেছি আপনি প্রতিবারই এ স্থানে এসে হেসে দেন কেন? ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি এ হাদিস প্রিয়তম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কয়েকবার শুনেছি, তিনিও প্রতিবার এ স্থানে এসে এমনভাবে হেসে উঠলেন যে, তাঁর সম্মুখের দাঁত মুবারক পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে যেত।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, এর উপর আমি ক্ষমতাবান। সে বলবে, হে রব! আমাকে মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দাও। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মানুষের সাথে মিলিত হও। অতঃপর সে চলতে শুরু করবে ও জান্নাতে প্রবেশ করবে। যখন সে মানুষের নিকটে পৌঁছবে একটি গুণসম্পন্ন মোতির প্রাসাদ তার জন্য উঁচু করা হবে, এই আল্লাহর বান্দা সেটি দেখে সিজদায় লুটে পড়বে। তাকে বলা হবে, তোমার মাথা উঠাও; কি হয়েছে তোমার? সে বলবে, হে রব! আপনি আমাকে এত কিছু দেখিয়েছেন (!) তখন তাকে বলা হবে, এটা তো তোমার প্রাসাদসমূহ থেকে কেবল একটি প্রাসাদ মাত্র।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর এই জান্নাতীর সাথে লোকের সাক্ষাত হবে। লোকটি তার সামনে নত হতে শুরু করবে। এমন সময় সে বলবে, থামুন! কি করছেন! কি হয়েছে আপনার? সে বলবে, আমার নিকট মনে হচ্ছে আপনি ফেরেশতাসমূহ থেকে একজন সম্মানিত ফেরেশতা। সে বলবে, আমি তো আপনার প্রহরী বা সেবকসমূহ থেকে একজন প্রহরী বা সেবক মাত্র। আমার অধীনে এক হাজার গৃহ-পরিচালক রয়েছে। সে সামনে চলতে থাকবে। অনেকখানি চলার পরে প্রাসাদের নিকট পৌঁছবে। অতঃপর তার জন্য প্রাসাদের দরজা খোলা হবে। সে প্রাসাদটির ছাদ দরজা তালা ও চাবিসমূহও হবে খাঁটি মুক্তার। তার সামনের অংশ সবুজ মণি যা রক্তিমবর্ণ দিয়ে আচ্ছাদিত থাকবে। প্রতিটি মণিই অন্য মণির দিকে ঝুঁকে থাকবে ও প্রতিটি মণির রঙও হবে রং-বেরঙের।
প্রত্যেক স্ত্রীর সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে। এই জামার ভিতর দিয়েও তার পায়ের অস্থিমজ্জা দেখা যাবে। হুর রমণীর কলিজা হবে তার দর্পণের মত স্বচ্ছ। যখন সে তার পাশ দিয়ে একবার অতিক্রম করবে পূর্বের চেয়ে সত্তর গুণ চোখের স্নিগ্ধতা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। জান্নাতী ব্যক্তি হুর রমণীকে বলবে- আল্লাহর শপথ, তুমি আমার চোখে সত্তরগুণ আলো বৃদ্ধি করে দিয়েছো। অতঃপর তাকে বলা হবে সামনে অগ্রসর হও, সে সামনে অগ্রসর হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমার রাজত্ব হবে একশত বছরের দূরত্ব পর্যন্ত হবে, যেখানে তোমার দৃষ্টিসীমা নিঃশেষ হয়ে যায়। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলল, হে কাব! যদি নিম্নতর জান্নাতী ব্যক্তির এ অবস্থা হয়, তবে উঁচুস্তরের জান্নাতীদের কি অবস্থা হবে? কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, জান্নাত তো এমন হবে, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোন কানও শোনেনি। আল্লাহ তাআলা একটি মহল সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাতে হুর স্ত্রীগণ ও ফলমূলসমূহ এবং বিভিন্ন রকমের পানীয় তাতে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিজীব থেকে কেউ তা আজও অবলোকন করেনি; জিবরিলও নয়, অন্য কোন ফেরেশতাও নয়। অতঃপর কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তিলাওয়াত করলেন, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুকায়িত রয়েছে। কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! কিয়ামতের দিন জাহান্নামের দীর্ঘশ্বাস রয়েছে। যত নৈকট্যশীল ও প্রেরিত নবি রয়েছেন, প্রত্যেকেই হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়ে যাবে। এমনকি রহমানের অন্তরঙ্গ বন্ধু ইবরাহিম আলাইহিস সালামও বলতে থাকবে, হে রব! আমাকে রক্ষা করো।
টিকাঃ
[] সুরা সাজদা: ১৭।
[*] আত তারগিব ওয়াত তারহিব, ইমাম ইবনুল মুনযির: ৪/৩৯১, ৫০৩।
[৩৪] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-আখিরাতে আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। সেখানে তারা চল্লিশ বৎসর অবস্থান করবে। তারা আসমানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মেঘের আড়াল থেকে তাদের সামনে অবতরণ করবেন।
এরপরে আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে-হে লোকসকল, তোমরা কি তোমাদের রবের প্রতি সন্তুষ্ট (!) যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন? যিনি তোমাদেরকে রিযিক দিয়েছেন ও তোমাদেরকে তাঁর ইবাদত করতে আদেশ করেছেন। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করতে নিষেধ করেছেন?.. শুনে রাখো, দুনিয়াতে যে যার উপাসনা করেছে; আজ সেই তার অভিভাবক হবে। এটা কি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুষম ও ন্যায্য বিচার নয়? তারা বলবে-হ্যাঁ অবশ্যই, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। তারা যেসব বস্তুর ইবাদত করত, তার আকৃতি স্থাপন করা হবে। অতঃপর প্রত্যেকে নিজ নিজ পূজনীয় বস্তুর দিকে ফিরে যাবে; তাদের মাঝে কেউ সূর্যের দিকে যাবে, কেউ চন্দ্রের দিকে যাবে, কেউ পাথরের মূর্তির দিকে যাবে। তথা ক্রুশের পূজারীরা ক্রুশের দিকে যাবে।
তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতগণ দাঁড়িয়ে থাকবে। সে সময় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন-কি হয়েছে তোমাদের (!) তোমরা ঐ সকল লোকদের মত তোমাদের রবের দিকে যাচ্ছো না কেন (!) তারা বলবে-আমাদের একজন ইলাহ রয়েছে, যাকে আমরা ইতিপূর্বে কখনো দেখিনি। তিনি বলবেন, যদি তোমরা তাকে দেখো তবে কি তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, আমাদের ও তার মাঝে একটি নিদর্শন রয়েছে, আমরা সে নিদর্শন দেখে তাকে চিনতে পারব। তিনি বলবেন, সে নিদর্শন কি? তারা বলবে, পায়ের নলা। তখন তিনি পায়ের নলা উম্মোচিত করে দিবেন।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যাদের পিঠ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তারা সকলেই সিজদায় লুটে পড়বে। কিন্তু একটি দল থাকবে যাদের পিঠ হবে ষাঁড়ের শিংয়ের ন্যায় (অর্থাৎ মেরুদন্ড কাঠের ন্যায় শক্ত হয়ে যাবে)। তারা সেজদা করতে চাইবে কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। অথচ যখন তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল, তখন তাদেরকে সেজদা করতে আহ্বান জানানো হত।
অতঃপর তিনি বলবেন, তোমরা তোমাদের মাথা উত্তোলন করো, তারা তাদের মাথা উঠাবে। তিনি তাদের আমল অনুপাতে প্রত্যেককে নূরে আলোকিত করবেন। তাদের মাঝে কারো নূর পাহাড়ের ন্যায় বড় হবে। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। তাদের মাঝে কারো নূর হবে তার চেয়ে কম। কারো নূর হবে তার চেয়েও কম এমনকি তাদের শেষ ব্যক্তির নূর হবে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ন্যায়। যা একবার আলো দিবে একবার নিভতে থাকবে। যখন তার পা আলো দিবে, তখন সে চলবে। আবার যখন নিভে যাবে, তখন পুলসিরাতে দাঁড়িয়ে থাকবে।
বর্ণনাকারী বলেন-তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সামনে থাকবে। তারা ধারালো তরবারির ন্যায় তীক্ষ্ণ দুর্গম পিচ্ছিল পুলসিরাতের পথ অতিক্রম করতে থাকবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন—তোমরা অতিক্রম করো, তারা তাদের নূর অনুপাতে অতিক্রম করবেন। তাদের মাঝে কেউ অতিক্রম করবে চোখের পলকের ন্যায়, কেউ পার হবে বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ পার হবে মেঘের ন্যায়, কেউ বাতাসের ন্যায়, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার ন্যায়, কেউ পার হবে ব্যক্তির চলার ন্যায়, এমনকি যার নূর হবে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ন্যায়-সেও উভয় হাত-পা ও মুখ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে হেঁচড়িয়ে যাবে; একহাতে ঝুলে থাকবে এক হাতে টেনে নিবে। এক পা ঝুলে থাকবে, আরেক পা টেনে-টেনে যাবে। জাহান্নামের আগুন তাদের খুব কাছাকাছি চলে আসবে। কিন্তু তাদেরকে স্পর্শ করবে না। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিস্কৃতি দিবেন। তারা নিষ্কৃতি পেয়ে সেখানেই অবস্থান করবে এবং বলবে—'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাকে জাহান্নামের বীভৎস ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখার পরও মুক্তি দিয়েছেন। অবশ্যই তিনি আমাদেরকে এমন সুখ দান করেছেন, যা অন্য কাউকে তিনি দান করেননি।'
অতঃপর জান্নাতের দরজার নিকট নহরে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তারা স্বচ্ছ পানি দিয়ে গোসল করবে। এমন সময় তাদের নিকট জান্নাতবাসীদের সুঘ্রাণ আসতে থাকবে। জান্নাতী ব্যক্তি যখন জান্নাতে ছড়িয়ে থাকা রং-বেরঙের বস্তুসমূহ এবং জান্নাতের দরজা দিয়ে জান্নাতের অভ্যন্তরীণ সুখ-শান্তি, অনাবিল সৌন্দর্য ও আনন্দঘন পরিবেশ সবকিছু দেখবে, তখন বলতে থাকবে—হে রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি জান্নাত চাচ্ছো অথচ আমি তোমাকে স্ববেমাত্র জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছি। হে আল্লাহ! আমার ও জাহান্নামের মাঝে আবরণ সৃষ্টি করে দিন; যেন আমি তার ক্ষীণতম শব্দও না শুনতে পাই। অতঃপর (একসময়) তাকে জান্নাত দেখানো হবে। তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে ঐ বিশ্রামস্থল দান করুন।
আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে এটি দান করলে হয়ত তুমি অন্যটিরও আবেদন করবে। সে বলবে, কখনো না, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি (এটি ব্যতীত) অন্যটির আবেদন করবো না; আর এ গৃহের চেয়ে উত্তম আর কোন গৃহ হতে পারে (!) সুতরাং তা তাকে দেওয়া হবে; সে তাতে অবস্থান করবে। এরই সামনে উঁচু করে আরেকটি বাসস্থান তাকে দেখানো হবে, সেটির আকাঙ্ক্ষা করে সে আবার বলবে-হে আল্লাহ! অমুক বাসস্থানটি আমাকে দান করুন। আল্লাহ তাআলা বলবেন-আমি তো তোমাকে সেটি দিলে তুমি আবার আবেদন করবে(!) সে বলবে, না, আপনার ইজ্জতের শপথ! এরপর আমি আর আবেদন করবো না; এটা থেকে উত্তম বাসস্থান আর কোনটি হতে পারে (!) অতঃপর এটিও তাকে দান করা হবে। সে সেখানে অবতরণ করবে।
বর্ণনাকারী বলেন-সে তার সামনে আরেকটি সৌন্দর্যময় বাসস্থান দেখে বলবে, হে রব! আমাকে সে বাসস্থানটি দান করুন। আল্লাহ তাআলা বলবেন-আমি যদি এটা তোমাকে দান করি তবে তুমি আরেকটিরও আবেদন করবে। সে বলবে, আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি আর আবেদন করবো না; তার থেকে উত্তম বাসস্থান আর কোনটি হতে পারে (!) অতঃপর তাকে এটি দান করা হবে সে তাতে অবতরণ করে চুপ করে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমার কি হয়েছে, তুমি যে আর আবেদন করছো না। সে বলবে, হে রব! আমি বার বার আবেদন ও শপথ ভঙ্গ করে এখন আপনার সামনে আমি লজ্জিত। আল্লাহ তাআলা বলবেন—তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে, দুনিয়া সৃষ্টির শুরুলগ্ন থেকে শেষলগ্ন পর্যন্ত দশগুণ তোমাকে দান করি? সে বলবে, আপনি সকল সৃষ্টিজগতের রব হয়েও কি আমার সাথে উপহাস করছেন?
বর্ণনাকারী বলেন, তার এ কথা শোনে আল্লাহ তাআলা হাসবেন। রাবী বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম তিনি হাদিস শুনিয়ে এ স্থানে এসে তিনিও হেসে দিলেন। একজন বলল, ইয়া আবা আব্দির রহমান! (আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের উপনাম) আমি এ হাদিস আপনার থেকে কয়েকবার শুনেছি আপনি প্রতিবারই এ স্থানে এসে হেসে দেন কেন? ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি এ হাদিস প্রিয়তম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কয়েকবার শুনেছি, তিনিও প্রতিবার এ স্থানে এসে এমনভাবে হেসে উঠলেন যে, তাঁর সম্মুখের দাঁত মুবারক পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে যেত।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, এর উপর আমি ক্ষমতাবান। সে বলবে, হে রব! আমাকে মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দাও। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মানুষের সাথে মিলিত হও। অতঃপর সে চলতে শুরু করবে ও জান্নাতে প্রবেশ করবে। যখন সে মানুষের নিকটে পৌঁছবে একটি গুণসম্পন্ন মোতির প্রাসাদ তার জন্য উঁচু করা হবে, এই আল্লাহর বান্দা সেটি দেখে সিজদায় লুটে পড়বে। তাকে বলা হবে, তোমার মাথা উঠাও; কি হয়েছে তোমার? সে বলবে, হে রব! আপনি আমাকে এত কিছু দেখিয়েছেন (!) তখন তাকে বলা হবে, এটা তো তোমার প্রাসাদসমূহ থেকে কেবল একটি প্রাসাদ মাত্র।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর এই জান্নাতীর সাথে লোকের সাক্ষাত হবে। লোকটি তার সামনে নত হতে শুরু করবে। এমন সময় সে বলবে, থামুন! কি করছেন! কি হয়েছে আপনার? সে বলবে, আমার নিকট মনে হচ্ছে আপনি ফেরেশতাসমূহ থেকে একজন সম্মানিত ফেরেশতা। সে বলবে, আমি তো আপনার প্রহরী বা সেবকসমূহ থেকে একজন প্রহরী বা সেবক মাত্র। আমার অধীনে এক হাজার গৃহ-পরিচালক রয়েছে।
সে সামনে চলতে থাকবে। অনেকখানি চলার পরে প্রাসাদের নিকট পৌঁছবে। অতঃপর তার জন্য প্রাসাদের দরজা খোলা হবে। সে প্রাসাদটির ছাদ দরজা তালা ও চাবিসমূহও হবে খাঁটি মুক্তার। তার সামনের অংশ সবুজ মণি যা রক্তিমবর্ণ দিয়ে আচ্ছাদিত থাকবে। প্রতিটি মণিই অন্য মণির দিকে ঝুঁকে থাকবে ও প্রতিটি মণির রঙও হবে রং-বেরঙের।
প্রত্যেক স্ত্রীর সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে। এই জামার ভিতর দিয়েও তার পায়ের অস্থিমজ্জা দেখা যাবে। হুর রমণীর কলিজা হবে তার দর্পণের মত স্বচ্ছ। যখন সে তার পাশ দিয়ে একবার অতিক্রম করবে পূর্বের চেয়ে সত্তর গুণ চোখের স্নিগ্ধতা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। জান্নাতী ব্যক্তি হুর রমণীকে বলবে- আল্লাহর শপথ, তুমি আমার চোখে সত্তরগুণ আলো বৃদ্ধি করে দিয়েছো। অতঃপর তাকে বলা হবে সামনে অগ্রসর হও, সে সামনে অগ্রসর হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমার রাজত্ব হবে একশত বছরের দূরত্ব পর্যন্ত হবে, যেখানে তোমার দৃষ্টিসীমা নিঃশেষ হয়ে যায়।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলল, হে কাব! যদি নিম্নতর জান্নাতী ব্যক্তির এ অবস্থা হয়, তবে উঁচুস্তরের জান্নাতীদের কি অবস্থা হবে? কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, জান্নাত তো এমন হবে, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোন কানও শোনেনি। আল্লাহ তাআলা একটি মহল সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাতে হুর স্ত্রীগণ ও ফলমূলসমূহ এবং বিভিন্ন রকমের পানীয় তাতে রেখেছেন। অতঃপর তিনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিজীব থেকে কেউ তা আজও অবলোকন করেনি; জিবরিলও নয়, অন্য কোন ফেরেশতাও নয়। অতঃপর কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তিলাওয়াত করলেন, ফَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুকায়িত রয়েছে। কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! কিয়ামতের দিন জাহান্নামের দীর্ঘশ্বাস রয়েছে। যত নৈকট্যশীল ও প্রেরিত নবি রয়েছেন, প্রত্যেকেই হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়ে যাবে। এমনকি রহমানের অন্তরঙ্গ বন্ধু ইবরাহিম আলাইহিস সালামও বলতে থাকবে, হে রব! আমাকে রক্ষা করো।
টিকাঃ
[*] আদ দুররুল মানসুর, ইমাম সুয়ূতী: ৫/২।
[°] সুরা সাজদা: ১৭।
[*] আত তারগিব ওয়াত তারহিব, ইমাম ইবনুল মুনযির: ৪/৩৯১, ৫০৩।
📄 সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি
[৩৫] ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে (তার অবস্থা হবে এমন)-একবার হাঁটবে, একবার পড়বে, আরেকবার আগুন তাকে ঝলসে দেবে। যখন সে জাহান্নাম পার হয়ে যাবে, তখন সেদিকে তাকিয়ে বলবে—সেই সত্তা কত বরকতময়, যিনি আমাকে তোমার থেকে মুক্ত করেছেন। তিনি আমাকে এমন কিছু দিয়েছেন-যা পূর্বাপর আর কাউকেই দেননি।
তখন তার সামনে একটি বৃক্ষ উদগত হবে। (গাছটি দেখে) সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে এই গাছটির নিকটবর্তী করুন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদম সন্তান! যদি গাছটি আমি তোমাকে দিয়ে দিই, তাহলে আমার কাছে অন্যকিছু চাইবে? সে বলবে, হে আমার রব, আর কিছু চাইব না।
সুতরাং সে আল্লাহর কাছে আর কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা করবে। আল্লাহ তাআলাকে মাজুর সাব্যস্ত করবেন। কারণ, সে এমন কিছু দেখেছে, যার ওপর ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করে দেবেন। অতঃপর সে গাছের ছায়া গ্রহণ করবে এবং তার রস পান করবে। তারপর তার সামনে আরেকটি বৃক্ষ উদগত হবে। (গাছটি দেখে) সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে এই গাছটির নিকটবর্তী করুন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদমসন্তান! যদি গাছটি আমি তোমাকে দিয়ে দিই, তাহলে আমার কাছে অন্যকিছু চাইবে? সে বলবে, হে আমার রব, আর কিছু চাইব না। সুতরাং সে আল্লাহর কাছে আর কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা করবে। আল্লাহ তাআলাকে মাজুর সাব্যস্ত করবেন, কারণ, সে এমন কিছু দেখেছে, যার ওপর ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করে দেবেন। হঠাৎ তখন জান্নাতের দরজার কাছে পূর্বের দুটির চেয়ে আরও বেশি সুন্দর বৃক্ষ উদগত হবে। গাছটি দেখে সে পূর্বেই মতোই বলবে। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করা হবে। গাছের নিকট গিয়েই সে জান্নাতীদের আওয়াজ শুনতে পাবে। তখন বলবে, হে আমার রব, আমাকে জান্নাতের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, হে আদমসন্তান! কোন বস্তু তোমাকে আমার পিছু ছাড়াবে? আমি কি তোমাকে দুনিয়া এবং তার সমান আরেকটি পৃথিবী দিলে খুশি হবে? সে বলবে, হে আমার রব, আপনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক হয়ে আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসলেন। তারপর বললেন, তোমরা কি জিজ্ঞেস করবে না, আপনি কেন হাসলেন? তারা বললেন, আপনি কেন হাসলেন? ইবনু মাসউদ বললেন, এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন হাসলেন? জবাব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলার হাসার কারণে। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, বরং আমি যা চাই তাই করতে পারি।
[৩৬] আবু সাইদ আল খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ الَّذِي لَهُ ثَمَانُونَ أَلْفَ خَادِمٍ وَاثْنَتَانِ وَسَبْعُونَ زَوْجَةٌ وَتُنْصَبُ لَهُ قُبَّةٌ مِنْ لُؤْلُوْ وَزَبَرْজَدٍ وَيَاقُوتٍ كَمَا بَيْنَ الْجَابِيَةِ إِلَى صَنْعَاءَ "অতি সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন একজন জান্নাতীরও আশি হাজার খাদিম ও বাহাত্তর জন হূর থাকবে। আর তার জন্য মণিমুক্তা, যমরূদ ও ইয়াকুতের তাঁবু নির্মাণ করা হবে। সেটা এত বড় হবে যে, তা সিরিয়ার অন্তর্গত 'জাবিয়া' হতে ইয়ামানের 'সানআ' পর্যন্ত সমান জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হবে।”
[৩৭] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতবাসীদের থেকে নিম্নস্তরের বাসস্থান ঐ ব্যক্তির হবে, যে আল্লাহর নিকট অনেক কিছু আকাঙ্ক্ষা করবে, অতঃপর তাকে বলা হবে, এসবই তোমার এবং এর সাথে আরো সমপরিমাণ দেওয়া হলো। (এমনকি তার সাথী-সঙ্গীরা স্মরণ করিয়ে দিবে, তুমি অমুক অমুক জিনিস চাও। অতঃপর তাকে বলা হবে, এসবই তোমার, এসবই তোমার এবং এর সাথে আরো সমপরিমাণও তোমার।)
[৩৮] আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-সর্বনিম্ন জান্নাতী ব্যক্তির জন্য প্রায় এক হাজার প্রাসাদ থাকবে; প্রতি দু'প্রাসাদের মাঝে এক বৎসর পরিমাণ দুরত্ব হবে। সে এই প্রাসাদগুলোর এক পার্শ্ব থেকে অপর পার্শ্বের সবকিছু একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাবে। প্রতি প্রাসাদেই ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হুর ও উত্তম স্ত্রীগণ থাকবে। সেখানে থাকবে আরো সুন্দরী কিশোরীরা। জান্নাতী ব্যক্তি যখন যা কামনা করবে, তখন তাকে তা-ই দেওয়া হবে।
[৩৯] মুগিরা ইবনু শুবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার মুসা আলাইহিস সালাম রবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জান্নাতে সবচেয়ে নিম্নস্তরের লোক কে হবে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সে হলো এমন এক ব্যক্তি, যে জান্নাতীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর আসবে। তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে, হে রব! তা কী রুপে হবে? জান্নাতীগণ তো নিজ নিজ আবাসের অধিকারী হয়ে গেছেন। তারা তাদের প্রাপ্য নিয়েছেন। তাকে বলা হবে, পৃথিবীর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্যের সমপরিমাণ সম্পদ নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট হবে? সে বলবে, হে রব! আমি এতেই সন্তুষ্ট ও সফলকাম। আল্লাহ বলবেন, তোমাকে উক্ত পরিমাণ সম্পদ দেয়া হলো। সাথে দেয়া হলো আরো এর সমপরিমাণ, আরো সমপরিমাণ, আরো সমপরিমাণ। পঞ্চমবারে সে বলে উঠবে, হে আমার রব! আমি সন্তুষ্ট, তিনি বলবেন, এটা তোমার জন্য এবং আরো দশগুণ দেয়া হলো। তা ছাড়া তোমার জন্য রয়েছে এমন জিনিস যা দ্বারা মন তৃপ্ত হয় এবং চোখ জুড়ায়। সে বলবে, হে আমার রব! আমি পরিতৃপ্ত। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, জান্নাতীদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী কে হবে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তারা ঐ সব লোক, যাদের মর্যাদা আমি চূড়ান্তভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি।' তিনি আরো বলবেন, 'ওরা তারাই যাদের জন্য আমি নিজ হস্তে তাদের মর্যাদা উন্নীত করেছি ও তার উপর মোহর মেরে দিয়েছি। এমন জিনিস তাদের জন্য রেখেছি যা কোন চক্ষু কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শুনেনি, কারো অন্তরে কখনো কল্পনায়ও উদয় হয়নি।'
[৪০] ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহু বলেন, জান্নাতীদের মাঝে সবচেয়ে নিম্নস্তরের ঐ ব্যক্তি হবে, যাকে বলা হবে, 'তুমি চাও' জান্নাতী ব্যক্তি আদেশ পেয়ে ইচ্ছামত আল্লাহর কাছে অনেক কিছু আবেদন করবে। পরিশেষে তাকে বলা হবে, এসব তোমার এবং এর সাথে আরো অনেকগুণ তোমার জন্য দেওয়া হলো। ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাকে বলা হবে, এসব কিছু তোমার এবং এর সাথে আরো দশগুণ তোমাকে বৃদ্ধি করে দেওয়া হলো। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক।
টিকাঃ
[*] আস সুনান, তিরমিযি: ৪৪৮২; সহিহ মুসলিম: ১/১৭৪, ১৭৫। অন্য বর্ণনায় আছে—আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لأَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا وَآخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دُخُولًا الْجَنَّةَ... আমি খুব ভালোভাবেই জানি সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে মুক্ত এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট ব্যক্তি কে হবে। একজন মানুষ জাহান্নাম থেকে উবু হয়ে বের হবে। তখন আল্লাহ বলবেন-জান্নাতে যাও। জান্নাতে প্রবেশ করে সে ভাববে, হয়তো তার সাথে উপহাস করা হচ্ছে। যার কারণে সে ফিরে আল্লাহর কাছে এসে বলবে-ইয়া রব, আমার সাথে উপহাস করা হচ্ছে! আল্লাহ বলবেন-যাও জান্নাতে প্রবেশ করো। সে জান্নাতে প্রবেশ করে আবার মনে করবে, তার সাথে উপহাস করা হচ্ছে। সুতরাং সে আল্লাহর কাছে ফিরে এসে বলবে, ইয়া রব, আমার সাথে উপহাস করা হচ্ছে! আল্লাহ বলবেন-যাও জান্নাতে প্রবেশ করো। কেননা, তোমার জন্য বরাদ্দ দুনিয়াসম এবং দুনিয়ার দশগুন জান্নাত, অথবা তোমার জন্য বরাদ্দ দুনিয়ার দশগুণ জান্নাত। তখন সে আল্লাহকে বলবে-আপনি কি মালিক হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তার মাড়ির দাঁত বের হয়ে গেছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-এটাই হবে সর্বনিম্ন জান্নাতীর মর্যাদা। (সহিহ মুসলিম: ২৭২।)
অন্য বর্ণনায় আছে-আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-সর্বশেষ জান্নাতে প্রবিষ্ট এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি হয়ে বের হবে। তখন তার রব তাকে বলবেন-জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলবে-আমার রব, জান্নাত তো পরিপূর্ণ। কথাটি আল্লাহ তাআলা তিনবার বলবেন, সেও তিনবারই বলবে-আমার রব, জান্নাত তো পরিপূর্ণ। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন-তোমার জন্য দুনিয়ার দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। (সহিহ বুখারি : হাদিস : ৬৯৫৭।)-অনুবাদক।
[°] মিশকাত: ৫৬৪৮; যয়িফ জামি সগির: ২৬৬।
[°] আল মুসনাদ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল: ২/৪৫০।
[৪১] সহিহ মুসলিম: ১৮৯।
[৩৫] ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে (তার অবস্থা হবে এমন)-একবার হাঁটবে, একবার পড়বে, আরেকবার আগুন তাকে ঝলসে দেবে। যখন সে জাহান্নাম পার হয়ে যাবে, তখন সেদিকে তাকিয়ে বলবে—সেই সত্তা কত বরকতময়, যিনি আমাকে তোমার থেকে মুক্ত করেছেন। তিনি আমাকে এমন কিছু দিয়েছেন-যা পূর্বাপর আর কাউকেই দেননি।
তখন তার সামনে একটি বৃক্ষ উদগত হবে। (গাছটি দেখে) সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে এই গাছটির নিকটবর্তী করুন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদম সন্তান! যদি গাছটি আমি তোমাকে দিয়ে দিই, তাহলে আমার কাছে অন্যকিছু চাইবে? সে বলবে, হে আমার রব, আর কিছু চাইব না। সুতরাং সে আল্লাহর কাছে আর কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা করবে। আল্লাহ তাআলাকে মাজুর সাব্যস্ত করবেন। কারণ, সে এমন কিছু দেখেছে, যার ওপর ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করে দেবেন। অতঃপর সে গাছের ছায়া গ্রহণ করবে এবং তার রস পান করবে।
তারপর তার সামনে আরেকটি বৃক্ষ উদগত হবে। (গাছটি দেখে) সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে এই গাছটির নিকটবর্তী করুন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদমসন্তান! যদি গাছটি আমি তোমাকে দিয়ে দিই, তাহলে আমার কাছে অন্যকিছু চাইবে? সে বলবে, হে আমার রব, আর কিছু চাইব না। সুতরাং সে আল্লাহর কাছে আর কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা করবে। আল্লাহ তাআলাকে মাজুর সাব্যস্ত করবেন, কারণ, সে এমন কিছু দেখেছে, যার ওপর ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করে দেবেন। হঠাৎ তখন জান্নাতের দরজার কাছে পূর্বের দুটির চেয়ে আরও বেশি সুন্দর বৃক্ষ উদগত হবে। গাছটি দেখে সে পূর্বেই মতোই বলবে। সুতরাং তাকে গাছটির নিকটবর্তী করা হবে। গাছের নিকট গিয়েই সে জান্নাতীদের আওয়াজ শুনতে পাবে। তখন বলবে, হে আমার রব, আমাকে জান্নাতের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, হে আদমসন্তান! কোন বস্তু তোমাকে আমার পিছু ছাড়াবে? আমি কি তোমাকে দুনিয়া এবং তার সমান আরেকটি পৃথিবী দিলে খুশি হবে? সে বলবে, হে আমার রব, আপনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক হয়ে আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসলেন। তারপর বললেন, তোমরা কি জিজ্ঞেস করবে না, আপনি কেন হাসলেন? তারা বললেন, আপনি কেন হাসলেন? ইবনু মাসউদ বললেন, এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন হাসলেন? জবাব নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলার হাসার কারণে। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, বরং আমি যা চাই তাই করতে পারি।
[৩৬] আবু সাইদ আল খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ الَّذِي لَهُ ثَمَانُونَ أَلْفَ خَادِمٍ وَاثْنَتَانِ وَسَبْعُونَ زَوْجَةٌ وَتُنْصَبُ لَهُ قُبَّةٌ مِنْ لُؤْلُوْ وَزَبَرْجَدٍ وَيَاقُوتٍ كَمَا بَيْنَ الْجَابِيَةِ إِلَى صَنْعَاءَ "অতি সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন একজন জান্নাতীরও আশি হাজার খাদিম ও বাহাত্তর জন হূর থাকবে। আর তার জন্য মণিমুক্তা, যমরূদ ও ইয়াকুতের তাঁবু নির্মাণ করা হবে। সেটা এত বড় হবে যে, তা সিরিয়ার অন্তর্গত 'জাবিয়া' হতে ইয়ামানের 'সানআ' পর্যন্ত সমান জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হবে।”
[৩৭] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতবাসীদের থেকে নিম্নস্তরের বাসস্থান ঐ ব্যক্তির হবে, যে আল্লাহর নিকট অনেক কিছু আকাঙ্ক্ষা করবে, অতঃপর তাকে বলা হবে, এসবই তোমার এবং এর সাথে আরো সমপরিমাণ দেওয়া হলো। (এমনকি তার সাথী-সঙ্গীরা স্মরণ করিয়ে দিবে, তুমি অমুক অমুক জিনিস চাও। অতঃপর তাকে বলা হবে, এসবই তোমার, এসবই তোমার এবং এর সাথে আরো সমপরিমাণও তোমার।)
[৩৮] আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-সর্বনিম্ন জান্নাতী ব্যক্তির জন্য প্রায় এক হাজার প্রাসাদ থাকবে; প্রতি দু'প্রাসাদের মাঝে এক বৎসর পরিমাণ দুরত্ব হবে। সে এই প্রাসাদগুলোর এক পার্শ্ব থেকে অপর পার্শ্বের সবকিছু একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাবে। প্রতি প্রাসাদেই ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হুর ও উত্তম স্ত্রীগণ থাকবে। সেখানে থাকবে আরো সুন্দরী কিশোরীরা। জান্নাতী ব্যক্তি যখন যা কামনা করবে, তখন তাকে তা-ই দেওয়া হবে।
[৩৯] মুগিরা ইবনু শুবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার মুসা আলাইহিস সালাম রবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জান্নাতে সবচেয়ে নিম্নস্তরের লোক কে হবে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সে হলো এমন এক ব্যক্তি, যে জান্নাতীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর আসবে। তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে, হে রব! তা কী রুপে হবে? জান্নাতীগণ তো নিজ নিজ আবাসের অধিকারী হয়ে গেছেন। তারা তাদের প্রাপ্য নিয়েছেন। তাকে বলা হবে, পৃথিবীর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্যের সমপরিমাণ সম্পদ নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট হবে? সে বলবে, হে রব! আমি এতেই সন্তুষ্ট ও সফলকাম। আল্লাহ বলবেন, তোমাকে উক্ত পরিমাণ সম্পদ দেয়া হলো। সাথে দেয়া হলো আরো এর সমপরিমাণ, আরো সমপরিমাণ, আরো সমপরিমাণ। পঞ্চমবারে সে বলে উঠবে, হে আমার রব! আমি সন্তুষ্ট, তিনি বলবেন, এটা তোমার জন্য এবং আরো দশগুণ দেয়া হলো। তা ছাড়া তোমার জন্য রয়েছে এমন জিনিস যা দ্বারা মন তৃপ্ত হয় এবং চোখ জুড়ায়। সে বলবে, হে আমার রব! আমি পরিতৃপ্ত। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, জান্নাতীদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী কে হবে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তারা ঐ সব লোক, যাদের মর্যাদা আমি চূড়ান্তভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি।' তিনি আরো বলবেন, 'ওরা তারাই যাদের জন্য আমি নিজ হস্তে তাদের মর্যাদা উন্নীত করেছি ও তার উপর মোহর মেরে দিয়েছি। এমন জিনিস তাদের জন্য রেখেছি যা কোন চক্ষু কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শুনেনি, কারো অন্তরে কখনো কল্পনায়ও উদয় হয়নি।'
[৪০] ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহু বলেন, জান্নাতীদের মাঝে সবচেয়ে নিম্নস্তরের ঐ ব্যক্তি হবে, যাকে বলা হবে, 'তুমি চাও' জান্নাতী ব্যক্তি আদেশ পেয়ে ইচ্ছামত আল্লাহর কাছে অনেক কিছু আবেদন করবে। পরিশেষে তাকে বলা হবে, এসব তোমার এবং এর সাথে আরো অনেকগুণ তোমার জন্য দেওয়া হলো। ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাকে বলা হবে, এসব কিছু তোমার এবং এর সাথে আরো দশগুণ তোমাকে বৃদ্ধি করে দেওয়া হলো। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে আরও অধিক।
টিকাঃ
[*] আস সুনান, তিরমিযি: ৪৪৮২; সহিহ মুসলিম: ১/১৭৪, ১৭৫। অন্য বর্ণনায় আছে—আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لأَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا وَآخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دুখূلاً الْجَنَّةَ... আমি খুব ভালোভাবেই জানি সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে মুক্ত এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট ব্যক্তি কে হবে। একজন মানুষ জাহান্নাম থেকে উবু হয়ে বের হবে। তখন আল্লাহ বলবেন-জান্নাতে যাও। জান্নাতে প্রবেশ করে সে ভাববে, হয়তো তার সাথে উপহাস করা হচ্ছে। যার কারণে সে ফিরে আল্লাহর কাছে এসে বলবে-ইয়া রব, আমার সাথে উপহাস করা হচ্ছে! আল্লাহ বলবেন-যাও জান্নাতে প্রবেশ করো। সে জান্নাতে প্রবেশ করে আবার মনে করবে, তার সাথে উপহাস করা হচ্ছে। সুতরাং সে আল্লাহর কাছে ফিরে এসে বলবে, ইয়া রব, আমার সাথে উপহাস করা হচ্ছে! আল্লাহ বলবেন-যাও জান্নাতে প্রবেশ করো। কেননা, তোমার জন্য বরাদ্দ দুনিয়াসম এবং দুনিয়ার দশগুন জান্নাত, অথবা তোমার জন্য বরাদ্দ দুনিয়ার দশগুণ জান্নাত। তখন সে আল্লাহকে বলবে-আপনি কি মালিক হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তার মাড়ির দাঁত বের হয়ে গেছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-এটাই হবে সর্বনিম্ন জান্নাতীর মর্যাদা। (সহিহ মুসলিম: ২৭২।)
অন্য বর্ণনায় আছে-আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-সর্বশেষ জান্নাতে প্রবিষ্ট এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি হয়ে বের হবে। তখন তার রব তাকে বলবেন-জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলবে-আমার রব, জান্নাত তো পরিপূর্ণ। কথাটি আল্লাহ তাআলা তিনবার বলবেন, সেও তিনবারই বলবে-আমার রব, জান্নাত তো পরিপূর্ণ। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন-তোমার জন্য দুনিয়ার দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। (সহিহ বুখারি : হাদিস : ৬৯৫৭।)-অনুবাদক।
[°] মিশকাত: ৫৬৪৮; যয়িফ জামি সগির: ২৬৬।
[°] আল মুসনাদ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল: ২/৪৫০।
[৪১] সহিহ মুসলিম: ১৮৯।