📄 সেই সুখ থাকবে জনম জনম
[৯] আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-দুনিয়াতে যারা মহান রবকে ভয় করত, আখিরাতে তাদেরকে দলে-দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা জান্নাতের প্রথম দরজার নিকটে পৌঁছে সেখানে একটি বৃক্ষ দেখতে পাবে, যার তলদেশ দিয়ে দু'টি ঝর্ণা বয়ে চলেছে। তারা দু'টির একটির দিকে যাবে, যেন তাদেরকে এর প্রতি আদেশ করা হয়েছে। জান্নাতীরা সেখান থেকে পান করবে যা তাদের অভ্যন্তরীণ অপরিচ্ছন্নতা, সবধরনের ভয় কষ্ট অপসারিত করে দিবে।
অতঃপর তারা অপরটির দিকে গিয়ে পরিশুদ্ধ হবে; ফলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা তাদেরকে ঘিরে নিবে, এতে তাদের ত্বক কখনো পরিবর্তিত হবে না। চুলগুলোও কখনো এলোমেলো হবে না। মনে হবে যেন তেল দ্বারা চুলে তৈলাক্ত করা হয়েছে। সেসময় নিজেদেরকে অনেক সুখী মনে হবে। অতঃপর তারা জান্নাতের রক্ষীদের নিকট পৌঁছলে তারা তাদেরকে এ বলে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলতে থাকবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাকো, অতঃপর সদাসর্বদা বসবাসের জন্যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর।
জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশকালে তাদের চারদিকে চির কিশোরেরা ঘোরাফেরা করবে, যেভাবে দুনিয়াতে কিশোরেরা অন্তরঙ্গ প্রিয়দের কাছে ঘুরাফেরা করে থাকে। কিশোর-কিশোরীরা মনের আনন্দে বলতে থাকবে, আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য যেসব সম্মান প্রস্তুত করে রেখেছেন তার জন্য তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো।
অতঃপর সেসব কিশোরদের থেকে একজন তার আনতলোচনা স্ত্রী হুরের নিকট যেয়ে বলবে-এক ব্যক্তি এসেছে, যাকে দুনিয়াতে এ নামে ডাকা হত। সে বলবে, তুমি কি তাকে নিজ চোখে দেখেছো? সে বলবে, আমি নিজ চোখে দেখেছি-এই তো সে আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আসছে। তাদের একজন আনন্দে লুকিয়ে দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াবে।
অতঃপর মাথা নিচু করে তার (হুর রমণী) স্ত্রীদের দিকে তাকাবে। সেখানে থাকবে সংরক্ষিত পানপাত্র এবং সারি সারি গালিচা ও বিস্তৃত বিছানো কার্পেট। সে ঐসব নিয়ামাহগুলো লক্ষ্য করতে থাকবে ও হেলান দিয়ে বসে বলবে, الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ আল্লাহর শোকর, যিনি আমাদেরকে এ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা কখনও পথ পেতাম না যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন।১২
জান্নাতীদেরকে ডেকে-ডেকে বলা হবে—তোমরা এখানে সুখের সাথে জীবন-যাপন করবে, তোমাদের এই সুখ জনম জনম থাকবে। তোমরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা এখানেই বসবাস করবে, কখনো প্রস্থান করবে না। তোমরা এখানে সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা সুখী হবে, কখনো দুঃখী হবে না।১৩
টিকাঃ
[১২] সুরা আরাফ: ৪৩।
[*] সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআইম: ২৮০; তাফসিরে তাবারি: ১০/ ৩৪। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তির মাঝে তিন বিষয়ের কোনো একটি থাকবে তার সঙ্গে জান্নাতের হুর বিবাহ দেওয়া হবে, সে যেভাবে ইচ্ছা করবে।
১. যে ব্যক্তির কাছে গোপন আগ্রহের কোনো বস্তু আমানত রাখার পর সে আল্লাহর ভয়ে তা যথাযথভাবে আদায় করবে।
২. যে ব্যক্তি (কিয়ামতের দিন) তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিবে।
৩. যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর ১০ বার সুরা ইখলাস পড়বে। ২২
📄 তোমরা এখানে সুখে থাকো
[১০] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, জান্নাতীদেরকে ডেকে বলা হবে-তোমরা এখানে সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা এখানে অনেক সুখে থাকবে। তোমরা সর্বদা পরিতৃপ্ত থাকবে, কখনো ক্ষুধার্ত হবে না। তোমরা চিরযৌবনা হয়ে বসবাস করবে, কখনো বয়োবৃদ্ধ হবে না। তোমাদের কেশগুচ্ছ কখনো এলোমেলো হবে না; সবসময় সিঁথি করা থাকবে। তোমাদের শরীরের অবকাঠামো সর্বদা সুন্দর থাকবে, কখনো চামড়াগুলোও পরিবর্তন হবে না। তোমরা সারাজীবন সুখে থাকবে, কখনো দুঃখ তোমাদের স্পর্শ করবে না।১৪
টিকাঃ
[*] অন্য বর্ণনায় আছে-আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-কিয়ামাত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! তখন তাঁরা ঘাড় মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে। সম্বোধনকারী বলবে, তোমরা কি একে চিন? তারা বলবেন হ্যাঁ, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডেকে বলবেন, হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে, তখন সম্বোধনকারী বলবে তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটি) যবেহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন, হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে (এখানে) থাক। তোমাদের আর কোন মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী! চিরদিন (এখানে) থাক। তোমাদের আর মৃত্যু নেই। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেন- “তাদের সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে যখন সকল ফয়সালা হয়ে যাবে অথচ এখন তারা গাফিল, তারা অসতর্ক দুনিয়াবাসী-অবিশ্বাসী।” (সুরা মারইয়াম: ১৯; মুসলিম ২৮৪৯।)-অনুবাদক।
📄 জান্নাতে কোনো দুঃখ নেই
[১১] আবু বকর রাহিমাহুল্লাহু জান্নাতীদের ব্যাপারে বলেন-হে জান্নাতের অধিবাসীগণ, তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। পূর্ণ যৌবনের অধিকারী হবে, কখনো বয়োবৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো কষ্ট অনুভব করবে না। আর এটিই হল আল্লাহর এ বাণীর মর্ম, যেখানে মহান রব বলেছেন, وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تعلمون
এটি জান্নাত। তোমরা এর উত্তরাধিকারী হলে তোমাদের কর্মের প্রতিদানে।
টিকাঃ
["] সুরা আল আরাফ: ৪৩।
📄 জান্নাতে কোনো কষ্ট নেই
[১২] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-যে আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে, জান্নাতে) সে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। জান্নাতে অনেক আরামে জীবন-যাপন করবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। পরনের পোষাকও পুরাতন হবে না, যৌবনকালও কখনো শেষ হবে না (সে হবে অনন্তযৌবনা)।
[১৩] ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জান্নাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-যে জান্নাতে প্রবেশ করবে সে সেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন-যাপন করবে, মৃত্যুবরণ করবে না। সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। না তার পরনের কাপড় ময়লা হবে আর না তার যৌবনকাল শেষ হবে (সে হবে অনন্তযৌবনা)। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, জান্নাতকে কোন বস্তু দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে? জবাবে তিনি বললেন-সোনা-রুপার ইটের গাঁথুনি দিয়ে জান্নাতকে নির্মাণ করা হয়েছে। একটি রুপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট, এভাবে গাঁথা হয়েছে। এর গাঁথুনির উপকরণ হল, সুগন্ধিযুক্ত মৃগনাভি এবং কঙ্করসমূহ মণি-মুক্তার আর মাটি হল জাফরানের।
[১৪] আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-কোন আহ্বানকারী জান্নাতী লোকদেরকে আহ্বান করে বলবে, এখানে সর্বদা তোমরা সুস্থ থাকবে, কক্ষনো অসুস্থ হবে না। তোমরা স্থায়ী জীবন লাভ করবে, কখনো তোমরা মরবে না। তোমরা যুবক থাকবে, কক্ষনো তোমরা বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কক্ষনো আর তোমরা কষ্ট-ক্লেশে পতিত হবে না। এটাই মহামহিম আল্লাহর বাণী: আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যে আমল করতে তারই বিনিময়ে তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে। (সুরা আরাফ: ৪৩) এর ব্যাখ্যা।
টিকাঃ
[] সহিহ মুসলিম: ৪/২১৮১; আস সুনান, তিরমিযি: ২৫২৬।
[*] সহিহ মুসলিম: ৪/৫২৮; আল মুসনাদ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল: ২/২৭০।
[*] সহিহ মুসলিম : ৭০৪৯।