📄 জান্নাতের প্রাঙ্গণে মাটির বিবরণ
[৬] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-জান্নাতের মাটি জাফরান ও ওয়ারসের (এক প্রকার সুগন্ধিযুক্ত ঘাস) হবে।
[৭] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতের প্রাঙ্গণ সমতল হবে। সজ্জিত হবে দাগবিহীন চাদরের ন্যায়। চারদিক ঝকঝক করতে থাকবে। জান্নাতীরা এমন প্রাঙ্গণ দেখলে মন খুশিতে পাগলপারা হয়ে যাবে।
টিকাঃ
[*] আস সুনান, ইমাম তিরমিযি: ২৫২৬; আল মুসনাদ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল: ২/৩০৫।
[*] সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআইম: ১৫২।
📄 ওপারেতে সর্বসুখ
[৮] আল্লাহ তাআলার বাণী: يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا সেদিন দয়াময় রবের কাছে মুত্তাকীনদেরকে অতিথিরূপে সমবেত করব।
আলি ইবনু আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বললাম-ইয়া রাসুলুল্লাহ! তাদের সকলকে কি পায়দল হেঁটে সমবেত করা হবে?
জবাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন তারা কবর থেকে উত্থিত হবে, তাদেরকে শুভ্র উট দিয়ে অভিবাদন জানানো হবে। তাদেরকে শুভ্র উটের উপর আরোহন করিয়ে সমবেত করা হবে। উটের অনেকগুলো ডানা থাকবে। ডানাগুলো হবে স্বর্ণের। সেগুলোর পায়ের নল থেকে আলো ঝলমল করে বিচ্ছুরিত হবে। তার প্রতি কদমের দূরত্ব হবে দৃষ্টিসীমার শেষ পরিধি পর্যন্ত। তাদেরকে জান্নাতের দরজায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে (সিদরাতুল মুনতাহা) তার গোড়া থেকে দুটি ঝর্ণা প্রবাহিত হবে। যখন তারা দুটির একটি থেকে পান করবে তাদের চেহারায় স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা প্রকাশ পাবে। অপরটি থেকে যখন অজু করবে, তখন তাদের কেশগুচ্ছ কখনো এলোমেলো হবে না। অতঃপর তারা দরজা খোলার জন্য কড়া নাড়বে। হে আলি! যদি তুমি কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে! প্রত্যেক হুরের নিকট সংবাদ পৌঁছবে যে, তার স্বামী এসে পড়েছে। (তার সাথে সাক্ষাতের জন্য) দ্রুতপ্রবণতা ও আনন্দ লুকিয়ে রাখবে।
(হুর স্ত্রী) সে তার দায়িত্বে নিয়োজিত খাদিমদেরকে তার স্বামীর জন্য দরজা খুলে দেওয়ার জন্য পাঠাবে। যদি আল্লাহ তাআলা তার সাথে তার পরিচয় না করিয়ে দেন তবে সে অবশ্যই তার আলো ও জ্যোতি দেখে তার সামনেই সিজদায় লুটে পড়বে। সে বলবে, আমি আপনার সেবক। আমাকে আপনার সেবার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। খাদেম জান্নাতী ব্যক্তিকে হুরের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য চলতে থাকবে। সেও তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে তার পিছে পিছে চলতে থাকবে। ঐ দিকে জান্নাতী ব্যক্তি জন্য হুর রমণী পথপানে তাকিয়ে থাকবে। হুর রমণীর কাছাকাছি চলে আসলে সে তাঁবু থেকে বের হবে এবং তাকে ধরে আলিঙ্গন করবে আর বলতে থাকবে,
তুমি আমার ভালবাসা, তুমি আমার প্রেম। তুমি আমার মনের মানুষ। আমি তোমার ভালবাসা। আমি চির সন্তুষ্ট; আমি কখনো অসন্তুষ্ট হব না। আমি তো তোমার আনন্দ-উল্লাসের জন্যই; আমার আর দুঃখ-কষ্ট নেই। আমি চিরদিনের জন্য, আমার আমার প্রস্থান নেই।
অতঃপর একটি ঘরে প্রবেশ করবে যার ভিত্তি থেকে ছাদ পর্যন্ত এক লক্ষ গজ দূরত্ব হবে। এবং তার নির্মাণ মণি-মুক্তার পাথর দ্বারা হবে। তার রাস্তা হবে (তিন বর্ণের) রক্তিম বর্ণের, সবুজ শ্যামল ও স্বর্ণ বা হলদে বর্ণের। সেখানকার রাস্তাগুলো একটি অপরটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ থাকবে না।
জান্নাতী ব্যক্তি বিছানার নিকট আসবে, তাতে শয্যার উপর শয্যা থাকবে। এভাবে সত্তরটি শয্যা থাকবে এবং সত্তরজন হুরও থাকবে। প্রত্যেক স্ত্রীর পরনে সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে; জোড়া কাপড়সমূহের ভিতর দিয়েও উভয় পায়ের নলার মগজ দেখা যাবে।
জান্নাতী ব্যক্তি হুর রমণীর সাথে রোমান্স করতে থাকবে। তাদের তলদেশ দিয়ে দূর্গন্ধহীন পঙ্কিলতামুক্ত স্বচ্ছ নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তাতে রয়েছে পরিশোধিত মধুর নহরসমূহ, যা মধুমক্ষিকার পেট থেকে নির্গত নয়। সেখানে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের নহরসমূহও রয়েছে, যা মানুষদের পা দিয়ে নিংড়িত নয়। তাতে আরো থাকবে নির্মল দুধের নহর; যার স্বাদ অপরিবর্তনীয় যা গৃহপালিত পশুর পেট থেকে নিষ্কাশিত নয়। বরং সবগুলো জান্নাত থেকে সৃষ্টি করা হবে।
যখন জান্নাতীদের খাবারের ইচ্ছা জাগবে, তখন একটি সাদা পাখি উড়ে চলে আসবে, তারা তার যে পার্শ্বসমূহ থেকে যত ইচ্ছা আহার করবে। অতঃপর সেটি যখন উড়ে যেয়ে আবার আসবে, তখন তাদের কাছে বিভিন্ন রকম ফলমূলসমূহ থাকবে। জান্নাতীরা যখন কোনো ফল আহার করার ইচ্ছা করবে, তখন ফলগুলো হাতের মুঠোয় এসে যাবে। তারা সেখান থেকে মনঃপুতভাবে— (শুয়ে, বসে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই) সেই ফলগুলোকে আহার করতে পারবে। এটাই হলো রাব্বে কারিমের ওয়াদার প্রমাণ:
وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ
উভয় উদ্যানের ফল তাদের নিকট ঝুলবে।১০
সুরক্ষিত মোতিসাদৃশ সেবকগণ তাদের সেবায় ঘুরাফেরা করবে। এইসব সেবকগণ জান্নাতীদের বিভিন্ন খিদমতে লিপ্ত থাকবে। এইসব সুখগুলোর মাধ্যমে জান্নাতীরা এপারে দুঃখগুলো ভুলে যাবে।
টিকাঃ
[১০] সূরা আর রহমান: ৫৪।
[১১] সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআইম: ২৮০-২৮১।
📄 সেই সুখ থাকবে জনম জনম
[৯] আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-দুনিয়াতে যারা মহান রবকে ভয় করত, আখিরাতে তাদেরকে দলে-দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা জান্নাতের প্রথম দরজার নিকটে পৌঁছে সেখানে একটি বৃক্ষ দেখতে পাবে, যার তলদেশ দিয়ে দু'টি ঝর্ণা বয়ে চলেছে। তারা দু'টির একটির দিকে যাবে, যেন তাদেরকে এর প্রতি আদেশ করা হয়েছে। জান্নাতীরা সেখান থেকে পান করবে যা তাদের অভ্যন্তরীণ অপরিচ্ছন্নতা, সবধরনের ভয় কষ্ট অপসারিত করে দিবে।
অতঃপর তারা অপরটির দিকে গিয়ে পরিশুদ্ধ হবে; ফলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা তাদেরকে ঘিরে নিবে, এতে তাদের ত্বক কখনো পরিবর্তিত হবে না। চুলগুলোও কখনো এলোমেলো হবে না। মনে হবে যেন তেল দ্বারা চুলে তৈলাক্ত করা হয়েছে। সেসময় নিজেদেরকে অনেক সুখী মনে হবে। অতঃপর তারা জান্নাতের রক্ষীদের নিকট পৌঁছলে তারা তাদেরকে এ বলে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলতে থাকবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাকো, অতঃপর সদাসর্বদা বসবাসের জন্যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর।
জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশকালে তাদের চারদিকে চির কিশোরেরা ঘোরাফেরা করবে, যেভাবে দুনিয়াতে কিশোরেরা অন্তরঙ্গ প্রিয়দের কাছে ঘুরাফেরা করে থাকে। কিশোর-কিশোরীরা মনের আনন্দে বলতে থাকবে, আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য যেসব সম্মান প্রস্তুত করে রেখেছেন তার জন্য তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো।
অতঃপর সেসব কিশোরদের থেকে একজন তার আনতলোচনা স্ত্রী হুরের নিকট যেয়ে বলবে-এক ব্যক্তি এসেছে, যাকে দুনিয়াতে এ নামে ডাকা হত। সে বলবে, তুমি কি তাকে নিজ চোখে দেখেছো? সে বলবে, আমি নিজ চোখে দেখেছি-এই তো সে আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আসছে। তাদের একজন আনন্দে লুকিয়ে দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াবে।
অতঃপর মাথা নিচু করে তার (হুর রমণী) স্ত্রীদের দিকে তাকাবে। সেখানে থাকবে সংরক্ষিত পানপাত্র এবং সারি সারি গালিচা ও বিস্তৃত বিছানো কার্পেট। সে ঐসব নিয়ামাহগুলো লক্ষ্য করতে থাকবে ও হেলান দিয়ে বসে বলবে, الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ আল্লাহর শোকর, যিনি আমাদেরকে এ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা কখনও পথ পেতাম না যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন।১২
জান্নাতীদেরকে ডেকে-ডেকে বলা হবে—তোমরা এখানে সুখের সাথে জীবন-যাপন করবে, তোমাদের এই সুখ জনম জনম থাকবে। তোমরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা এখানেই বসবাস করবে, কখনো প্রস্থান করবে না। তোমরা এখানে সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা সুখী হবে, কখনো দুঃখী হবে না।১৩
টিকাঃ
[১২] সুরা আরাফ: ৪৩।
[*] সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআইম: ২৮০; তাফসিরে তাবারি: ১০/ ৩৪। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তির মাঝে তিন বিষয়ের কোনো একটি থাকবে তার সঙ্গে জান্নাতের হুর বিবাহ দেওয়া হবে, সে যেভাবে ইচ্ছা করবে।
১. যে ব্যক্তির কাছে গোপন আগ্রহের কোনো বস্তু আমানত রাখার পর সে আল্লাহর ভয়ে তা যথাযথভাবে আদায় করবে।
২. যে ব্যক্তি (কিয়ামতের দিন) তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিবে।
৩. যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর ১০ বার সুরা ইখলাস পড়বে। ২২
📄 তোমরা এখানে সুখে থাকো
[১০] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, জান্নাতীদেরকে ডেকে বলা হবে-তোমরা এখানে সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা এখানে অনেক সুখে থাকবে। তোমরা সর্বদা পরিতৃপ্ত থাকবে, কখনো ক্ষুধার্ত হবে না। তোমরা চিরযৌবনা হয়ে বসবাস করবে, কখনো বয়োবৃদ্ধ হবে না। তোমাদের কেশগুচ্ছ কখনো এলোমেলো হবে না; সবসময় সিঁথি করা থাকবে। তোমাদের শরীরের অবকাঠামো সর্বদা সুন্দর থাকবে, কখনো চামড়াগুলোও পরিবর্তন হবে না। তোমরা সারাজীবন সুখে থাকবে, কখনো দুঃখ তোমাদের স্পর্শ করবে না।১৪
টিকাঃ
[*] অন্য বর্ণনায় আছে-আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-কিয়ামাত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! তখন তাঁরা ঘাড় মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে। সম্বোধনকারী বলবে, তোমরা কি একে চিন? তারা বলবেন হ্যাঁ, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডেকে বলবেন, হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে, তখন সম্বোধনকারী বলবে তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে, হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটি) যবেহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন, হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে (এখানে) থাক। তোমাদের আর কোন মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী! চিরদিন (এখানে) থাক। তোমাদের আর মৃত্যু নেই। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেন- “তাদের সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে যখন সকল ফয়সালা হয়ে যাবে অথচ এখন তারা গাফিল, তারা অসতর্ক দুনিয়াবাসী-অবিশ্বাসী।” (সুরা মারইয়াম: ১৯; মুসলিম ২৮৪৯।)-অনুবাদক।