📄 অবস্থান যেমনই হোক, মৃত্যুর সাক্ষাৎ অনিবার্য
মৃত্যু চিরসত্য। এ ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সকলে সমান। মৃত্যু যেমন ছোট ঘরেও প্রবেশ করবে, তেমনি বড় রাজ অট্টালিকাও মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। যারা সারা দুনিয়ার রাজত্ব করে মৃত্যু তাদেরও ঘায়েল করবে। আবার যারা দুনিয়ার কিছুরই মালিক নয়, মৃত্যু তাদেরও পাকড়াও করবে। কিন্তু মানুষ গাফিলতির মধ্যে থাকে আর মৃত্যুর চাকা তাদের পিষতে থাকে।
বড় বড় প্রাসাদ ও অট্টালিকার মালিকগণ আর পদ-পদবির অধিকারীরা, যাদের দেখে তাদের এই নিয়ামতের ওপর অনেক দুনিয়াদাররা ঈর্ষা করে, আমরা যেন তাদের মৃত্যুর অবস্থার প্রতি লক্ষ করি। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজি যে, তারা কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়? কীভাবে তারা মৃত্যুকে স্বাগত জানায়? তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ধন-সম্পদ কি মৃত্যুর সময় তাদের সাথে বাকি থাকে? না তাদের আমল ব্যতীত সবকিছুই দুনিয়াতে পড়ে রয়?
মুহাম্মাদ ইবনে মানসুর আল-বাগদাদি রহ. বলেন,
'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে তাহিরকে তার অন্তিম মুহূর্তে দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে সালাম দিয়ে বললাম, “হে আমির, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” তখন তিনি বললেন, "তুমি আমাকে আমির বলো না; বরং আমাকে বন্দী বলো।"'
মৃত্যুর পূর্বে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান বলছিল,
'আল্লাহর শপথ, আমার জন্য এটাই প্রিয় ছিল যে, আমি তিহামার এক লোকের গোলাম হতাম। আমি যার ছাগল চরাতাম, তিহামার পাহাড়গুলোতে তার বকরিগুলো নিয়ে যেতাম। আর আমি যদি শাসক না হতাম।'৮৯
মৃত্যুর আগে খলিফা মানসুর বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছিল, তখন লোকেরা তাকে বলল, 'কোনো সমস্যা নেই, হে আমিরুল মুমিনিন।' তখন তিনি বললেন, 'কিছুই হবে না আমার। তবে শুধু এটা হবে যে, আমার দুনিয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে, এবার আমি আখিরাতের সম্মুখীন হবো।'৯০
দুনিয়ায় জীবনযাপনের এই পার্থক্য। অবধারিত মৃত্যুকে কেউ আটকাতে পারবে না। মৃত্যু সকলের সাথেই সমান আচরণ করবে। কারণ, সে তো আল্লাহর আদেশ মাত্র। আল্লাহর আদেশে সকল শক্তিকে সে ধ্বংস করবে। সকল পরাশক্তির রাষ্ট্রকে সে নিঃশেষ করবে। তাই তোমরা মৃত্যু আসার আগেই দ্রুত নেক আমল করো। দ্রুত তাওবা করো। শাকিক ইবনে ইবরাহিম রহ. বলেন,
'তুমি এমনভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করো, যাতে মৃত্যুর পর আর তোমাকে ফিরে আসার প্রার্থনা করতে না হয়।'৯১
প্রিয় ভাই, মৃত্যুর পর তোমাকে আর ফেরত পাঠানো হবে না। কারণ, প্রতিটি বিষয়ই নির্ধারিত। নির্ধারিত তার সময়।
সুতরাং তুমি এখন থেকেই মৃত্যুর প্রস্তুতিস্বরূপ নেক আমল করো। অন্তর এই কথা বলার আগেই তুমি তাওবা করো যে, হায় আমার জন্য আফসোস, আমি তো আল্লাহর ব্যাপারে কমতি করে ফেলেছি!
মৃত্যু তো এমন চলে যাওয়া। যার পর ফেরার কোনো উপায় নেই। সেটা এমন লজ্জার কারণ হবে, যা কোনো অশ্রুবর্ষণেও আর কাজে আসবে না। সেটা দুনিয়া থেকে আখিরাতের দিকে সফর, এরপর আর দুনিয়াতে আসা যাবে না। এটাই দুনিয়ার শেষ। এটাই জমিনের ওপর থেকে জমিনের নিচের দিকে সফর। আরাম-আয়েশের প্রাসাদ থেকে সংকীর্ণ অন্ধকার এক কবরে এ যাত্রা। এ সফর প্রশ্ন-উত্তরের, হিসাব-নিকাশের।
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.-এর যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি বললেন, 'তোমরা আমাকে বসাও।' তখন লোকেরা তাকে বসালো। অতঃপর তিনি বললেন,
'হে আল্লাহ, আমি তো এমন ব্যক্তি, আপনি আমাকে যে আদেশ দিয়েছেন, আমি তা পালনে কমতি করেছি। আর আপনি আমাকে যা নিষেধ করেছেন, আমি তার অবাধ্য হয়েছি। কিন্তু আমি এটা স্বীকার করছি যে, لا إله إلا الله (আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই)।' অতঃপর তিনি তার মাথা উঁচু করলেন। এবার তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। লোকেরা তাকে বলল, 'আপনি তো কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।' তখন তিনি বললেন, 'আমি এখানে এমন কতকের উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি, যারা মানুষও নয় আবার জিনও নয়।' অতঃপর তিনি ইনতেকাল করলেন। ৯২
আমিরুল মুমিনিন মামুনুর রশিদের যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি ঘোড়ার জিন খোলার আদেশ করলেন। তার জন্য সে জিন বিছানো হলো। তিনি তাতে শুয়ে পড়লেন। তার মাথার ওপর ছাই রেখে বললেন, 'হে এমন বাদশাহ, যার বাদশাহি কখনো ধ্বংস হবে না! এমন ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যার বাদশাহি ধ্বংস-প্রাপ্ত।' ৯৩
আমিরুল মুমিনিন আবু জাফর মানসুরের যখন মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি রাবিকে বললেন, 'হে রাবি, তিনিই আসল সুলতান।... যে মৃত্যুবরণ করবে, সে আবার কিসের সুলতান?' ৯৪
প্রতিটি জীবেরই শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু। তা থেকে কেউই পলায়ন করতে পারবে না। মৃত্যু কাউকে ফেলে সামনেও চলে যাবে না যে, ভুলে কেউ রয়ে যাবে।
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের যখন এই বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, তার মৃত্যু এসে গেছে, তখন তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার আশা, আমি যদি জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত বোঝা বহনকারী কুলি হয়ে থাকতে পারতাম।'৯৫
আবু দারদা রা. বলেন,
'তুমি যখন মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ করো, তখন তুমি নিজেকে তাদেরই একজন মনে করো।'৯৬
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে তার মৃত্যুসজ্জায় জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার কেমন লাগছে?' তখন তিনি বললেন,
'যেরকম আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿ وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَتَرَكْتُمْ مَا خَوَّلْنَاكُمْ وَرَاءَ ظُهُورِكُمْ ﴾
“তোমরা আমার কাছে নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছ, যেভাবে আমি প্রথমবার তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তোমাদের যা দিয়েছিলাম, তা পশ্চাতেই রেখে এসেছ।”৯৭
দুনিয়ার রাজত্ব ও তার চাকচিক্য চলে যাবে। সকলকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে আল্লাহ তাআলার দিকে।
জীবন হলো সামান্য কিছু সময়ের নাম। যা স্বপ্নের মতো দ্রুত চলে যায়। অথচ, মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন মনে করে, তার কোনো শেষ নেই! মানুষের আশা তাকে, আখিরাত থেকে ফিরিয়ে রাখে। আর এ কারণেই মৃত্যুর সময় মুতাসিম বলেছিলেন, 'আমি যদি জানতাম যে, আমার জীবন এত ছোট, তাহলে যা আমি করেছি, তার কিছুই করতাম না।’৯৮
আমাদের সকলের জীবনই খুব ক্ষণিকের। আমাদের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আমাদের জীবন আটকে আছে নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্বাসেই। যে জীবন আমাদের অতিবাহিত হচ্ছে, তা যেন স্বপ্নের ঘোরের মতো। আল্লাহর কসম, তা দিনের একটি মুহূর্তের মতোই ছোট। কিন্তু ভয় হলো জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুনের। ভয় এমন গর্তের, যেখানে হাঁড়গুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে।
আমরা আমিরুল মুমিনিন হারুনুর রশিদের কর্ম নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখি, তিনি তার কাফনের কাপড় নিজ হাতে বাছাই করে রেখেছেন। তিনি কাফনের দিকে তাকাতেন আর বলতেন,
﴿مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ * هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ ﴾
'আমার সম্পদ আমার কোনো কাজেই আসবে না। আমার এই রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। '৯৯
আমরা কেউ কি নিজ হাতে কাফনের কাপড় বাছাই করে নিজের কামরায় রেখে দিয়েছি? বরং কেউ কেউ তো বাড়িতে কাফনের কাপড়ের মতো কিছু দেখলে, তা বাড়ি থেকেই দূরে রাখে। যেন তার কোনো অনুভূতি নেই। সে মনে করে মৃত্যু কি এতই নিকটে যে, তার জন্য এখনিই প্রস্তুতি নিতে হবে?
تنام ولم تنم عنك المنايا * تنبه للمنية يا نؤوم
'তুমি তো আছ ঘুমিয়ে, কিন্তু মৃত্যু তো নেই ঘুমিয়ে। হে ঘুমকাতুরে, একটু ওঠো, মৃত্যু তোমার অতি নিকটে।'
প্রিয় ভাই, তুমি পড়া থামিয়ে দিও না; পড়তে থাকো। কারণ, সময় তো চলেই যাচ্ছে। তুমি পূর্ববর্তীদের অবস্থার দিকে লক্ষ করো। শিক্ষা গ্রহণ করো তাদের অবস্থা জেনে। এভাবে তোমার পরে যারা আসবে, তারাও তোমার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
টিকাঃ
৮৯. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ৮৮
৯০. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯২
৯১. ইমাম বায়হাকি কৃত আজ-জুহদ: ২৩৯
৯২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩২৫
৯৩. আল-আকিবাহ: ১৩০
৯৪. আল-আকিবাহ: ১২৮
৯৫. তারিখুল খুলাফা: ২০৫
৯৬. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮০
৯৭. সুরা আনআম: ৯৪
৯৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৯/৭৪
৯৯. সুরা হাক্কাহ: ২৮, ২৯
📄 কাফনের কাপড় নিয়ে সালাফের ভাবনা
আব্দুর রহমান ইবনে আসওয়াদ মৃত্যুসজ্জায় কাঁদছিলেন, তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমার আফসোস হচ্ছে যে, আমি আর সালাত ও সাওম পালন করতে পারব না। অতঃপর তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে ইনতেকাল করলেন। '১০০
ভাই আমার, এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কাফন আর নেক আমল ছাড়া তোমার সাথে আর কিছুই যাবে না। তোমাকে কাফনের কাপড়ে প্যাঁচিয়ে একা কবরে রেখে আসা হবে। আর তোমার পেছনে তোমার প্রাসাদ, তোমার ঘরবাড়ি ও জাগতিক সকল সম্পদ রয়ে যাবে। সেগুলো ভোগ করবে তোমার স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবরা।
এসব কিছুই আজ তোমার। কিন্তু কবরে যাওয়ার সময় তোমার সাথে শুধু কাফনের দু'টুকরা কাপড়ই যাবে। একটু লক্ষ করে দেখো, দুনিয়া কতটা তুচ্ছ এবং তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ?
উমর ইবনে খাত্তাব রা. তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন,
'তোমরা আমার কাফনের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা অবলম্বন কোরো। কারণ, আল্লাহ তাআলার নিকট যদি আমার কল্যাণের ফয়সলা হয়ে থাকে, তাহলে তিনি আমাকে এর চেয়ে উত্তম কাপড়ের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করে দেবেন। আর যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে এটাও খুব দ্রুতই আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন। তোমরা আমার কবর খোঁড়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন কোরো, বেশি বড় করে খনন কোরো না। কারণ, যদি আল্লাহ তাআলার নিকট আমার কল্যাণের ফয়সলা হয়, আমার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত তিনি তা প্রশস্ত করে দেবেন। আর যদি আমি এর বিপরীত অবস্থায় থাকি, তাহলে আমার ওপর তা এতটাই সংকীর্ণ হয়ে যাবে যে, আমার এক পাশের হাঁড় অন্য পাশের হাঁড়ের মধ্যে ঢুকে যাবে।'১০১
সায়িদ ইবনে মারওয়ান রহ.-এর যখন মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি বললেন,
'হায়, আমি যদি কিছুই না হতাম! হায়, আমি যদি এই প্রবহমান পানির মতো হতাম!' এরপর তিনি বললেন, 'তোমরা আমার কাফনের কাপড়টি নিয়ে আসো।' কাফন এনে তাঁর হাতে দেওয়া হলে তিনি বললেন, 'আহ, তুমি এত খাটো! এত ছোট! এত কম তোমার পরিমাণ!'১০২
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তার মৃত্যুসজ্জায় বললেন, 'তোমরা আমাকে উঠাও।' তখন লোকেরা তাকে এতটুকু পরিমাণ উঠাল যে, তিনি বাতাসের ঘ্রাণ নিলেন। তারপর বললেন,
'হে দুনিয়া, তোমার ঘ্রাণ কতই না উত্তম! কিন্তু তোমার দৈর্ঘ্য কতই না কম। তোমার প্রাচুর্য কতই না স্বল্প। অথচ আমরা তোমাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তোমার ধোঁকায় ঘুরপাক খেয়েছিলাম।'১০৩
হে ভাই, তোমরা নেকি অর্জনের ক্ষেত্রে পরিশ্রম করো। কারণ, সেগুলোই তোমাদের সামনে কাজে আসবে। তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। কারণ, মুত্যু তোমাদের সাথে এসে মিলিত হবে। তোমরা লক্ষ করো, কোন প্রবঞ্চনার সাথে তোমরা সম্পৃক্ত আছ। তোমাদের যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তা থেকে কখনো গাফিল হয়ো না। কত দিন চলে গেছে, অথচ তুমি আল্লাহর আনুগত্য করোনি। তোমাদের কত গুনাহ লেখা হয়েছে, অথচ তোমরা সেদিকে মনোযোগ দাওনি। তোমরা সত্যবাদীদের সাথে ছিলে, তারা তোমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তোমরা সম্পর্ক ছিন্ন করলে। এই ধিক্কারের উপযুক্ত কি তোমরা ব্যতীত অন্য কেউ? এর পরেও কি তোমরা শুনবে না?
তোমার মতো কত মানুষ এই দুনিয়াতে বসবাস করেছে। মৃত্যু যাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করেছে। চক্কর দিয়েছে। এরপর তাদের সাথে ঝগড়া করে তাদের প্রতিবেশীকে ছিনিয়ে নিয়েছে। যে ব্যক্তি তার ওপর মৃত্যু পতিত হওয়ার আগেই সতর্ক হয়েছে, সে যথার্থ করেছে। এ জীবন! এ জীবন খুবই ছোট। তার বেশির ভাগই তো কত কারণে চলে গেল। আর বাকি সময়টুকুকে তুমি বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে, ওজর দিয়ে দিয়ে নষ্ট করছ? অথচ মেহমানকে বিদায় জানানোর সময় হয়ে গেছে। ১০৪
টিকাঃ
১০০. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯২
১০১. আস-সিয়ার: ৫/১১২
১০২. তারিখুল খুলাফা: ১৩৬
১০৩. আস-সিয়ার: ৪/২৫০
📄 অন্তিম মুহূর্তে আমরা যেন সাফল্যের দেখা পাই
আব্দুল্লাহ ইবনে শারমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আমির আশ-শাবির সাথে এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়েছিলাম। তার অবস্থা দেখে আমরা খুবই কষ্ট পেলাম। এক লোক তাকে কালিমার তালকিন করছে এবং তাকে বলছে, “তুমি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলো।” সে এ কথাটা বারবার বলছিল। তখন শাবি রহ. তাকে বললেন, “তুমি এর সাথে কোমল ব্যবহার করো।" তখন রোগীটি মুখ খুলে বললেন, “সে আমাকে তালকিন করুক বা না করুক; আমি কালিমা বলা ছাড়ব না।” অতঃপর তিনি এই আয়াত পড়লেন,
﴿ وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَى وَكَانُوا أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَا ﴾
“আর তিনি তাদের তাকওয়ার বাক্যে সুদৃঢ় করলেন এবং তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত।”১০৫
তখন শাবি রহ. বললেন, “সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের এই সাথিকে মুক্তি দিয়েছেন।””১০৬
কা'কা' ইবনে হাকিম বলেন, 'ত্রিশ বছর যাবৎ আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবার মৃত্যু যদি আমার কাছে আসে, তাহলে আমি আমার ইবাদতের তালিকার ক্ষেত্রে কোনোটাকে আগে-পিছে করতে পছন্দ করব না।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, যখন তার মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এরপর বললেন,
﴿ لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ ﴾
'এ রকম সাফল্যের জন্যই আমলকারীদের আমল করা উচিত।' ১০৭ [১০৮]
জনৈক সালাফের অন্তিম মুহূর্তে তার স্ত্রী কাঁদছিলেন, তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন,
'তুমি কাঁদছ কেন?' স্ত্রী বললেন, 'আমি তোমার জন্য কাঁদছি।' তিনি বললেন, 'যদি কাঁদতে হয়, তাহলে তুমি নিজের জন্য কাঁদো। কারণ, আমি এই দিনের জন্য চল্লিশ বছর ধরে কেঁদেছি।' ১০৯
মুহাম্মাদ ইবনুল কাসিম রহ. বলেন,
'ইবনে আসলামের মৃত্যুর চার দিন আগে নিশাপুরে আমি তার সাথে দেখা করতে গেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন,
“হে আবু আব্দুল্লাহ, এসো, আমি তোমাকে ওই কল্যাণের সুসংবাদ দিই, যা আল্লাহ তোমার ভাইকে দান করেছেন। আমার ওপর মৃত্যু নেমে এসেছে। আল্লাহ আমার ওপর দয়া করেছেন যে, আমার একটি দিরহামও নেই, যার জন্য তিনি আমার হিসেব নেবেন।” অতঃপর তিনি বলেন, “তোমরা দরজা বন্ধ করে দাও। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাউকেই প্রবেশের অনুমতি দিও না। এবং তোমরা আমার কিতাবগুলো দাফন করে দাও। জেনে রেখো, আমি দুনিয়া থেকে এমন অবস্থায় বিদায় নিচ্ছি যে, আমার পোশাক, বসার জিন, অজুর পাত্র এবং এই কিতাবগুলো ব্যতীত অন্য কিছুই মিরাস হিসেবে রেখে যাচ্ছি না। সুতরাং সামগ্রী নিয়ে তোমরা মানুষের সামনে ভান কোরো না।"
তার একটি থলে ছিল। যার মধ্যে ত্রিশ দিরহাম ছিল। তিনি বললেন, "এটা আমার ছেলের। তার এক নিকটাত্মীয় তাকে হাদিয়া দিয়েছে। আমি আমার জন্য এর চেয়ে হালাল জিনিস আর কিছু মনে করি না। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَنْتَ، وَمَالُكَ لِأَبِيكَ “তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার।”১১০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, إِنَّ أَطْيَبَ مَا أَكَلَ الرَّجُلُ مِنْ كَسْبِهِ، وَإِنَّ وَلَدَهُ مِنْ كَسْبِهِ “মানুষের উপার্জিত খাবার হচ্ছে সবচেয়ে পবিত্র খাবার। আর তার সন্তানের উপার্জনও তার উপার্জিত জিনিসের অন্তর্ভুক্ত।”১১১
সুতরাং তোমরা আমাকে এ থেকে খরচ করে কাফন দিয়ো। তোমরা যদি দশ দিরহাম দিয়ে আমার সতর ঢাকার পরিমাণ কাপড় কিনতে পারো, তাহলে পনেরো দিরহাম খরচ করে কাপড় কিনতে যেও না। তোমরা আমার জানাজার ওপর আমার জিনটি বিছিয়ে দিয়ো। তার ওপর আমার কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ো। আর আমার এই পাত্রটা কোনো মিসকিনকে দান করে দিয়ো।"১১২
কান্নানি রহ.-এর মৃত্যুর সময় তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনি কী আমল করতেন?' তিনি বলেন,
'আমার মৃত্যু যদি নিকটবর্তী না হতো, তাহলে আমি তোমাদের তা জানাতাম না। আমি চল্লিশ বছর ধরে আমার হৃদয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে পাহারা দিয়েছি। যখনই সেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে চেয়েছে, তখনই আমি তার সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছি।'১১৩
হে ভাই, এটা দেখার জন্য আমরা কয়দিন আমাদের হৃদয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়েছি? সেটা কি দিনের একটা মুহূর্তেরও সমান হবে? আমাদের আমলনামায় কী আছে, আমরা কি জানি? রাতেদিনে কী আমল আমরা করি?
বিলাল রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুয়াজ্জিন, যখন তার মৃত্যুর সময় হলো, তখন তার স্ত্রী বললেন, 'হায়, আমাদের দুঃখ!' এ শুনে বিলাল রা. বললেন,
'বরং, হায় আমার আনন্দ! আমি আগামীকাল আমার প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হবো। আমি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সৈন্য বাহিনীর সাথে একত্রিত হবো।'১১৪
আনাস ইবনে ইয়াজ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'আমি সাফওয়ান ইবনে সুলাইমকে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত। তাহলেও কোনো আমল বৃদ্ধি করার মতো সময় বা সুযোগ তার ছিল না। সব সময়ই তিনি আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। '১১৫
একবার আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে বলা হলো, 'অমুক আনসারি ইনতেকাল করেছেন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহম করুন।' তারা বলল, 'তিনি এক লক্ষ সম্পদ ছেড়ে গেছেন।' ইবনে উমর বললেন, 'কিন্তু এ সম্পদ তাকে ছেড়ে দেয়নি এখনো।'
কীভাবে এ সম্পদ তাকে ছেড়ে দেবে? আমলনামায় যে সবকিছু লেখা-ই থাকে। সেখান থেকে না বড় কিছু ছোটে না ছোট কিছু। সবকিছুরই হিসাব করা হয়। এই দুনিয়ার হালাল বস্তুর হিসেব করে রাখা হবে আর হারাম তো সরাসরি শাস্তি আনয়নকারী।
প্রিয় ভাই, যদি তোমার অন্তরে আল্লাহভীতি প্রবেশ করে। ভয়ে তোমার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে আসে। তোমার চোখের কোণ কেঁপে কেঁপে ওঠে। চোখের পাতা ঝাপটা দিতে থাকে। এভাবে তুমি সত্যিকার তাওবার প্রতি আগ্রহী হও। নিরাপদ আশ্রয়ের অন্বেষণে তুমি যদি চেষ্টা-সাধনা করে এগিয়ে আসো। তোমার দুচোখ আখিরাত পানে নিবদ্ধ হয়। তোমার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় জান্নাতের উচ্চ এক স্থান লাভের। তুমি যদি আল্লাহর রহমতের আশা করো। তাঁর আজাবকে ভয় করো। তবে তুমি সুসংবাদ নাও। কেননা, যে ব্যক্তি গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে পলায়ন করে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত।
তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে পলায়ন করো। আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে পালিয়ে তাঁর দয়া, রহমত ও ইবাদত-বন্দেগির দিকে ফিরে আসো।
যে ব্যক্তি জান্নাত চায়, তাকে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে। যদিও মৃত্যুর মধ্যে অনেক কষ্ট, অনেক যন্ত্রণা। রয়েছে অনেক ভয় ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ইবনে আব্দু রব্বিহি রহ. মাকহুল রহ.-কে বললেন, 'তুমি কি জান্নাত ভালোবাসো?' তিনি বললেন, 'জান্নাত কে না ভালোবাসে?' ইবনে আব্দু রব্বিহি রহ. তাকে বলেন, 'তাহলে তুমি মৃত্যুকেও ভালোবেসো। কারণ, তুমি মৃত্যুর আগে কখনোই জান্নাতে যেতে পারবে না।'১১৬
বিলাল ইবনে সা'দ রহ. বলেন, 'আমাদের একজনকে প্রশ্ন করা হলো, "তুমি কি মৃত্যু চাও?” সে বলল, “না।” তখন তাকে আবার বলা হলো, “কেন?” সে বলল, “যতক্ষণ না আমি তাওবা করব এবং নেক আমল করব, তার আগে মরতে চাইব না।” তখন তাকে আবারও প্রশ্ন করা হলো, “তাহলে তুমি নেক আমল করো।” সে বলল, “আমি অচিরেই আমল করব।” সে মৃত্যুবরণও করতে চায় না আবার আমলও করতে চায় না। সে আল্লাহর ইবাদতকে পিছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু দুনিয়ার কাজকে পিছিয়ে দেয় না। '১১৭
টিকাঃ
১০৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৭৫
১০৫. সুরা ফাতহ: ২৬
১০৬. আত-তাজকিরাতু ফিল ইসতি'দাদিল ইয়াওমিল আখিরাহ : ৯১
১০৭. সুরা সাফফাত: ৬১
১০৮. আল-আকিবাহ: ১৩৬
১০৯. আল-আকিবাহ: ১৩৫
১১০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৯১
১১১. মুসনাদে আহমাদ: ২৪৯৫৭, সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪৯
১১২. আস-সিয়ার: ২/১৯৯
১১৩. আস-সিয়ার: ২/১৯৯
১১৪. আল-ইহইয়া: ৪/৫১৩
১১৫. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯৩
১১৬. আস-সিয়ার: ৫/৩৬৬
১১৭. শুারহুস সুদুর : ১৭
📄 পরকালের নাজাত-প্রত্যাশীদের জন্য মুক্তো-সম মূল্যবান কিছু নসিহত
আবু হাজিম সালামা ইবনে দিনার রহ. বলেন,
'যে সকল কাজের কারণে তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ করো, তা ছেড়ে দাও। এরপর "তুমি কখন মৃত্যুবরণ করবে?"—এমন প্রশ্ন তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'১১৮
প্রিয় ভাই, একটু লক্ষ করেছেন? কিয়াসটা কেমন ছিল?
এখানে আরও একটি নসিহত পেশ করছি—মায়মুন ইবনে মিহরান রহ. বলেন,
'যে ব্যক্তি আখিরাতে আল্লাহ তাআলার নিকট তার অবস্থান সম্পর্কে অবগত হতে চায়, সে যেন তার আমলের দিকে তাকায়। কেননা, সে তার আমলের ওপর ভিত্তি করে গঠিত ব্যক্তিত্ব নিয়েই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।'১১৯
উক্ত নসিহতটি আল্লাহ তাআলার একটি আয়াতের সারমর্ম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴾
'হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকের ভেবে দেখা উচিত, আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত, তোমরা যা কিছু করছ।'১২০
আবু আইয়াশ আল-কাত্তান রহ. বলেন,
'বসরায় ইবাদতকারিণী এক মহিলা ছিলেন। নাম তার মুনাইবা। তার একটি মেয়ে ছিল, যে তার চেয়ে বেশি ইবাদতগুজার ছিল। এত ছোট বয়সে তার এমন ইবাদত দেখে হাসান বসরি রহ. খুবই আশ্চর্য হলেন। হাসান রহ. একবার এক মজলিসে বসা ছিলেন, এমতাবস্থায় তার কাছে এক লোক এসে বলল, "আপনি কি জানেন, সেই মেয়েটি এখন অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুর অপেক্ষায়?” এ শুনে হাসান রহ. তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে দেখতে গেলেন। হাসান রহ. মেয়েটির নিকট আসলেন। মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল। তখন হাসান রহ. তাকে বললেন, “কাঁদছ কেন?” মেয়েটি বলল, "হে আবু সায়িদ, মাটি আমার তারুণ্যকে ঢেকে দেবে; অথচ আমি এখনো আল্লাহর ইবাদত করে তৃপ্ত হইনি। হে আবু সাইদ, আপনি আমার মাকে দেখেন, তিনি আমার বাবাকে বলছেন, আমার মেয়ের জন্য প্রশস্ত কবর খুঁড়বেন এবং তাকে সুন্দর কাপড়ে কাফন দেবেন। আল্লাহর শপথ, আমাকে যদি মক্কায় প্রেরণ করা হতো, তাহলেও আমার ক্রন্দন অনেক দীর্ঘ হতো। তাহলে আমি কীভাবে এমন অন্ধকার নির্জন কবরের দিকে রওয়ানা করব, যা অন্ধকার আর পোকামাকড়ের ঘর?”১২১
আমরা মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসি' রহ.-এর নসিহত নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করি। মৃত্যুর সময় তিনি এ নসিহত করেছিলেন। এ নসিহত তিনি সত্য অন্তরে, বিশুদ্ধ হৃদয়ে করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন,
'মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসি' রহ.-এর মৃত্যুর আগে আমরা তার নিকট গেলাম। তখন তিনি বলেন, “হে আমার ভাইয়েরা, আমরা সকলে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রত্যাবর্তন চেয়েছিলাম। অতঃপর তিনি তোমাদের তা দিয়েছেন আর আমাকে তা দেননি। সুতরাং তোমরা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত কোরো না।”১২২
হ্যাঁ, আমি, তুমি, আমরা সকলেই আল্লাহ তাআলার নিকট প্রত্যাবর্তন চেয়েছি।
আমরা তো এখন আমলের ঘরে রয়েছি। সুতরাং এসো, দ্রুত স্বচ্ছ ও সত্য দিলে আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা করি। এখন থেকেই দ্রুত নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করি। কারণ, সময় বয়েই চলেছে। আমাদের নিশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমলের ঘরে থাকব, ততক্ষণ তা বয়েই চলবে।
জনৈক সালাফ প্রতিদিন মদিনার দেওয়ালের ওপর উঠে চিৎকার করতেন, الرحيل.. الرحيل.. 'বিদায়। বিদায়।'
একদিন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। আমিরুল মুমিনিন তার আওয়াজ আর শুনতে না পেয়ে তার সম্পর্কে মানুষদের জিজ্ঞেস করলেন। তাঁকে বলা হলো, সে তো ইনতেকাল করেছে। তখন তিনি বলেন,
ما زال يلهج بالرحيل وذكره • حتى أناخ ببابه الجمال فأصابه متيقظا مُتشمرًا • ذا أُهبة لم تُلهه الآمال
'সর্বদা সে বিদায় ধ্বনির আভাস দিয়ে যেত। তার সে স্মরণের ফটকে মনের লাগাম টেনে ধরত। বিদায় বেলা সে ছিল সতর্ককারী, সাবধানকারী, বৃথা-আশা তাকে ধোঁকা দিতে পারেনি, বরং তার যে ছিল সুন্দর প্রস্তুতি।'১২৩
বলা হয়ে থাকে, ইয়াকুব আ. আজরায়িল আ. কে বললেন, 'আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব?'
আজরায়িল বললেন, 'বলুন?'
ইয়াকুব আ. বললেন, 'আমার যখন জান কবজ করার সময় হবে। আপনি যখন আমার জান কবজ করতে চাইবেন। এর আগে আমাকে জানাবেন।'
আজরায়িল বললেন, 'ঠিক আছে, তাই হবে। আমি আপনার নিকট দু'তিনজন দূত প্রেরণ করব।'
একসময় ইয়াকুব আ.-এর হায়াত ফুরিয়ে এল। আজরায়িল আ. তাঁর নিকট আসলেন। ইয়াকুব আ. তাঁকে বললেন, 'আপনি কি আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন না আমার জান কবজ করতে এসেছেন?' আজরায়িল বললেন, 'জান কবজ করতে।'
ইয়াকুব আ. বললেন, 'আপনি তো আমাকে বলেছিলেন, আপনি আমার কাছে দু'তিনজন সংবাদদাতা পাঠাবেন?'
আজরায়িল বললেন, 'আমি তো এরকম করেছিও। আপনার কালো চুল সাদা হয়ে যাওয়া, আপনার শক্ত-সমর্থ শরীর দুর্বল হয়ে পড়া, আপনার সোজা-সুঠাম দেহ বাঁকা হয়ে যাওয়া—এগুলোই হলো মৃত্যুর আগে বনি আদমের কাছে আমার পাঠানো বার্তাবাহক।'১২৪
ভাই আমার সতর্ক হোন। এ সকল সংবাদদাতা আসার আগেই সতর্ক হোন। আর এটাও তো চূড়ান্ত বিষয় নয় যে, সবার নিকট এ বার্তাবাহক আসবেই। বরং কত মানুষ তো শিশু বয়সে, দুধ ছাড়ানোর আগেই মারা যায়! কত যুবক পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে সুঠাম দেহের অধিকারী হয়ে ইনতেকাল করে। বরং আমরা তো দেখতে পাই যে, কবরের অধিবাসীদের মধ্যে দুগ্ধপায়ী শিশু, বাচ্চা ও যুবকরাই বেশি। এতেই তো রয়েছে উপদেশ প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যারা চিরস্থায়ী জান্নাতে নিজের ঘর নির্মাণ করতে চায়।
হে প্রিয় ভাই, সামনের নসিহত নিয়ে একটু চিন্তা করুন। এটি তো স্বর্ণাক্ষরে লিখে অন্তরের গহীনে রেখে দেওয়ার মতো একটা নসিহত।
এক লোক জুহাইর ইবনে নায়িমকে বলল, 'হে আবু আব্দুর রহমান, আমাকে কোনো কিছুর অসিয়ত করুন না!' তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি সতর্ক হও, তোমার উদাসীনতার মধ্যেই যেন আল্লাহ তোমাকে উঠিয়ে না নেন।'১২৫
এ যে খুবই মূল্যবান একটি নসিহত। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি উৎসাহিতকরণ। রয়েছে তাঁর আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ। রয়েছে হারাম বিষয়গুলো পরিহারের নির্দেশনা। রয়েছে আখিরাতের স্মরণ ও তার প্রস্তুতি গ্রহণের প্রতি উত্তম উপদেশ।
উবাইদ ইবনে উমাইর রহ. বলেন,
'একজন মানুষের তিনজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাদের একজনের চেয়ে অপরজন তার কাছে আরও বেশি প্রিয়, আরও বেশি অন্তরঙ্গ। একদিন লোকটির ওপর নেমে এল এক মহাবিপদ। তখন সে সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটির কাছে গেল এবং তাকে বলল, “হে বন্ধু, তুমিই তো আমার সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাই আমার এই বিপদে আমি তোমার সাহায্যের প্রতি আশাবাদী।” তখন বন্ধুটি বলল, "আমি তোমার কোনো সাহায্য করতে পারব না।"
এরপর সে প্রিয় হওয়ার দিক থেকে যে দ্বিতীয়তে রয়েছে, তার কাছে আসলো এবং বলল, "প্রিয় বন্ধু আমার, আমার ওপর এই বিপদ নেমে এসেছে। তাই আমি তোমার সাহায্যপ্রার্থী।" তার কথা শুনে বন্ধুটি বলল, "আমি তোমার এতটুকু উপকার করতে পারি যে, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসতে পারি। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি তোমার জন্য করতে পারব না।"
তারপর সে প্রিয় হওয়ার দিক থেকে তৃতীয় বন্ধুর নিকট গেল। তাকে বলল, “হে বন্ধু, আমি বিপদগ্রস্ত! এখন আমি তোমার সাহায্য কামনা করছি।” সে বন্ধুটি উত্তর দিল, "ঠিক আছে বন্ধু। আমি তোমাকে সাহায্য করব। তুমি যেখানে যাবে, আমি তোমার সাথে যাব। তোমার সকল বিপদাপদে তোমাকে সাহায্য করব।"
উমাইর রহ. এবার গল্পের রহস্য উন্মোচন করলেন এ বলে, “প্রথম বন্ধুটি ছিল তার সম্পদ, মৃত্যুর পর যার কিছুই সাথে যাবে না; অথচ এটাই মানুষের সবচেয়ে প্রিয়। দ্বিতীয় বন্ধুটি হলো, পরিবার; যারা মৃত্যুর পর তার কবর পর্যন্ত যাবে, তাকে কবরে একা রেখে চলে আসবে। আর তৃতীয় বন্ধুটি হলো, তার আমল; যা সর্বদা তার সাথে থাকবে। সে যেখানে যাবে, আমলও তার সাথে সাথে সেখানে যাবে।”১২৬
প্রিয় ভাই, জীবন একটা সফর মাত্র। অচিরেই এ সফরের অবসান ঘটবে। জীবন-সফর যেন চোখের পলকের সমান। যেন কোনো মেঘখণ্ড একটু আগে চোখের সামনে ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তা আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে। এটাই দুনিয়া। মেঘের মতো। কিছু মুহূর্ত। তারপরে নিমিষেই হাওয়া। হ্যাঁ, এটাই দুনিয়া। সামান্য কিছু মুহূর্তের সফর।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার চাটাইয়ের ওপর শোয়ার কারণে তাঁর পিঠে দাগ পড়ে গেল। তখন আমরা তাঁকে বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনার জন্য একটি বিছানা আনতে চাই।" তখন তিনি বলেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا؟ مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبِ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا
“দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কী?! নিশ্চয় আমার ও দুনিয়ার উপমা হচ্ছে এক মুসাফিরের ন্যায়, যে সামান্য সময়ের জন্য কোনো গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেয়, তারপর সে স্থান ত্যাগ করে গন্তব্যের দিকে চলে যায়।”১২৭
প্রিয় ভাই, এতক্ষণ তুমি এ কিতাবের সাথে থাকার কারণে তোমার মধ্যে মৃত্যুর প্রতি অনেক ভয় সৃষ্টি হয়েছে। দুনিয়ার প্রতি উদ্রেক হয়েছে এক ধরনের অনীহা। কিন্তু এখন তো তুমি এই কিতাব থেকে তোমার চোখ উঠিয়ে নেবে, তখন কি তুমি ওপরের সব নসিহত ভুলে যাবে?
ভাই আমার, তোমাকে তাকওয়া অবলম্বনের নসিহত করছি। নিজেকে তুমি দুনিয়ার এই ময়লা-আবর্জনা থেকে দূরে সরিয়ে নাও। তোমার ওপর থেকে অলসতার চাদর উঠিয়ে ফেলো। নফসের মুজাহাদার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করো। এই কিতাবের শেষ অক্ষরকেই তোমার তাওবার সূচনা বানাও। তুমি আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে, কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করো। তাওবা করো তোমার কৃত ভুলের জন্য। এতে তোমার অন্তর উন্মুক্ত হবে। আল্লাহকে ভয় করো। গ্রহণ করো আল্লাহর দেওয়া প্রতিশ্রুত দুটি জান্নাতের সুসংবাদ। আর আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ হয় না। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন,
﴿ وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ ﴾
‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হওয়া ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।’১২৮
প্রিয় ভাই, কিতাবটি রেখে দেওয়ার পর আমরা একাকিত্ব অনুভব করব। কিন্তু আমাদের জন্য রয়েছে রক্ষাকবচ। আমরা তা অবলম্বন করব। হাদিসের মধ্যে রয়েছে নির্দেশিকা। আমরা সে অনুযায়ী চলব। সালেহিনের মজলিসে রয়েছে ঘনিষ্ঠতা ও প্রশান্তির উপকরণ। আমরা তা গ্রহণ করব। আর প্রতিশ্রুত দিনের জন্য এগুলো কতই না উত্তম পাথেয়।
প্রিয় ভাই, আল্লাহ তাআলা আমাকে ও তোমাকে জান্নাতে একত্রিত করুন। আমাদের মৃত্যুযন্ত্রণা হালকা করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের অটল রাখুন হকের ওপর। কবরে আমাদের একাকিত্ব দূর করুন। কিয়ামতের দিন সহজভাবে পুলসিরাত পার করে দিন। আমাদের মা-বাবাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন। আমাদের তাদের সাথে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদার স্থানে, সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহর নিকটে একত্রিত করুন।
الحمد لله رب العالمين
عَنْ تَمِيمِ الدَّارِيِّ - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ - أَنَّ النَّبِيَّ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - : قَالَ : الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا : لِمَنْ ؟ قَالَ : لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
তামীম দারী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সা. বলেছেন, “দ্বীন হল কল্যাণ কামনা করার নাম।" আমরা বললাম, 'কার জন্য?' তিনি বললেন, “আল্লাহর জন্য, তার কিতাবের জন্য, তার রাসুলের জন্য, মুসলিমদের শাসকদের জন্য এবং মুসলিম জনসাধারণের জন্য।” - মুসলিম
টিকাঃ
১১৮. আল-আকিবাহ: ৯১
১১৯. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৩
১২০. সুরা হাশর: ১৮
১২১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২৭
১২২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৭1
১২৩. কুরতুবি রহ. কৃত আত-তাজকিরাহ : ৪০
১২৪. ইরশাদুল ইবাদ: ০৭
১২৫. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৪/৯
১২৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৩/২৬৯
১২৭. সুনানে তিরমিজি: ২৩৭৭
১২৮. সুরা আর-রহমান : ৪৬