📄 রওয়ানা কোন দিকে?
জাবির ইবনে জাইদ রহ.-কে তার মৃত্যুর পূর্বে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তুমি কী চাও?' তিনি বললেন,
'আমি হাসানকে এক পলক দেখতে চাই।' হাসান বসরি রহ. তার কাছে এলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'এই তো হাসান তোমার নিকটে।' তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে ভাই, এটিই সে সময়। এটি সে মুহূর্ত। আমি তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে রওয়ানা করছি, হয়তো জান্নাতের দিকে নয়তো জাহান্নামের দিকে।'
مَا هِيَ إِلَّا جَنَّةٌ وَنَارٌ * أَفْلَحَ مَن كَانَ لَهُ اعْتِبَارٌ
'জান্নাতে যাওয়ার উপায় কী? জাহান্নামে পতিত হওয়ার কারণই বা কী? দুটোর মাঝে এই তো পার্থক্য— যে শিক্ষা নিয়েছে সে-ই পেয়েছে সাফল্য।'
হ্যাঁ, এটাই সত্য কথা। আখিরাতে দুটি রাস্তা আছে। একটি চলে গেছে জান্নাতের দিকে, আরেকটি জাহান্নামের দিকে। যাদের গন্তব্য জান্নাত, আর যাদের গন্তব্য জাহান্নাম—তারা পরস্পর সমান নয়। কারণ,
﴿أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُونَ ﴾
'জান্নাতের অধিবাসীরাই সফল।' ৭৬
মুজানি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'ইমাম শাফি রহ. অসুস্থ হলে আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। এটাই ছিল তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সে রোগেই তিনি ইনতেকাল করেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেমন আছেন?” তিনি বললেন,
“দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে আখিরাতের দিকে রওয়ানা হচ্ছি। মৃত্যুর পেয়ালা পান করছি। আমি অচিরেই আমার খারাপ আমলগুলো দেখতে পাব। আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট পেশ করা হবে। আমি জানি না, আমার আত্মা জান্নাতে যাবে? যদি জান্নাতে যায়, তাহলে তাকে অভিনন্দন। নাকি আমার আত্মা জাহান্নামের দিকে যাবে? যদি তা জাহান্নামের দিকে যায়, তাহলে তার জন্য ক্রন্দন করছি।” অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন।' ৭৭
অন্তিম মুহূর্তে নাফি' রহ. কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি সা'দ রা.-কে স্মরণ করছি। কবরের চাপের কথা স্মরণ করছি।'
অর্থাৎ, আমি এ হাদিসের কথা স্মরণ করছি-আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ لِلْقَبْرِ ضَغْطَةٌ وَلَوْ كَانَ أَحَدٌ نَاجِيًا مِنْهَا نَجَا مِنْهَا سَعْدُ بْنُ مُعَادٍ
'কবরের চাপ রয়েছে। যদি কেউ তা থেকে মুক্তি পেত, তাহলে সা'দ ইবনে মুআজ মুক্তি পেত।'৭৮
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. আমাদেরকে আমাদের পরিণাম, গন্তব্য ও এই দুনিয়া থেকে আমাদের পৃথক হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন,
'তোমরা কি দেখছ না, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা কাউকে না কাউকে তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে বিদায় জানাচ্ছ। তোমরা তাকে মাটির ফাটলে রেখে আসছ। সে মাটিকে বিছানা বানিয়েছে। প্রিয়জনদের রেখে গেছে। পৃথক হয়ে গেছে ধন-সম্পদ থেকে।'৭৯
আব্দুল্লাহ ইবনে আলি রহ.। মৃত্যুক্ষণ ঘনিয়ে এলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি কাঁদছি পেছনের দিনগুলোতে আমার অপরাধের কারণে। সুউচ্চ জান্নাতের জন্য আমার পাথেয় কম থাকার কারণে। কোন জিনিস আমাকে উত্তপ্ত জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে, তা ভেবে কাঁদছি আমি।'৮০
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা এতটা মূল্যায়ন করার পর, সময়কে এত সুন্দর করে আমলে ব্যাপৃত রাখার পরও সারাক্ষণ কতটা ভয়ের মধ্যে থাকতেন। আর আমরা?
টিকাঃ
৭৬. সুরা হাশর: ২০
৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫৮; আস সিয়ার: ১০/৭৬
৭৮. আস-সিয়ার: ৫/৯৯
৭৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮০
৮০. আল-আকিবাহ: ১৩১
📄 দুনিয়াতে ফিরে আসা বা দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা
ইবরাহিম ইবনে আবু আব্দুহু বলেন,
'আমার কাছে এমন একটা কথা পৌঁছেছে যে, মুমিন যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন আবার দুনিয়াতে ফিরে আসতে চাইবে। তার ফিরে আসার কারণটা হবে আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর তাসবিহ আদায় করা।'৮১
তারা জানতেন, তাদের দুনিয়ার জীবনের গুরুত্ব কত। আর এ কারণেই তারা তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে আখিরাতের জন্য কাজে লাগাতেন।
পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতেন। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তারা চেষ্টা করতেন তাদের একটি মুহূর্তও যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ব্যতীত অযথা নষ্ট না হয়।
বুকাইর ইবনে আমির রহ. বলেন,
'আব্দুর রহমান ইবনে আবু নুআইম রহ.-কে যদি বলা হতো, এখনই আপনার নিকট মালাকুল মাওত আসবে, তবুও অতিরিক্ত ইবাদত করার মতো তার কোনো সময়-সুযোগ বাকি ছিল না। ৮২
ইয়াজিদ আর রাকাশি রহ. নিজেকে নিজে বলতেন,
'ধিক, তোমাকে হে ইয়াজিদ... মৃত্যুর পর তোমার পক্ষ থেকে কে সালাত আদায় করবে? মৃত্যুর পর কে তোমার পক্ষ থেকে সাওম আদায় করবে? কে তোমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করবে তোমার মৃত্যুর পর?' তারপর তিনি বলতেন,
'হে মানুষসকল, তোমরা কি বাকি জীবনটা ক্রন্দন করে এবং নিজেদের জন্য আফসোস করে কাটাবে না? মৃত্যু যার অবধারিত। কবর যার ঘর। মাটি যার বিছানা। পোকামাকড় যার সঙ্গী। যার জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট ভয়ংকর এক দিন।... অবস্থা কেমন হবে তার?' এ বলে তিনি কাঁদতে থাকতেন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। ৮৩
মুআজ ইবনে জাবাল রা.-এর যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলো, তখন তিনি বললেন,
'তোমরা দেখো তো সকাল হয়েছে কি না?' তখন তাকে বলা হলো, 'না, এখনো সকাল হয়নি।' সকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবে প্রশ্ন করছিলেন। অতঃপর যখন তাকে বলা হলো, 'সকাল হয়েছে।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলার নিকট এমন রাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার সকাল জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।' অতঃপর তিনি বললেন, ‘অভিনন্দন মৃত্যুকে—যে অদৃশ্য এক সাথি। আমার দারিদ্র্য সত্ত্বেও সে আমার সাক্ষাতে এসেছে। হে আল্লাহ, আমি আপনাকে ভয় করি। আজ আমি আপনার সাক্ষাৎ কামনা করি। হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি দুনিয়াকে কখনোই ভালোবাসিনি এবং ঘুমানোর জন্য বা গাছ রোপণ করার জন্য দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চাইনি। কিন্তু আমি সাওম পালন করে আমার গলাকে তৃষ্ণার্ত করে তুলতে, শীতের রাত জেগে সালাত আদায় করতে, ইবাদতে সাধনার নিমিত্তে, আলিমদের সামনে হাঁটু গেড়ে তাদের আলোচনায় বসতে, এসবের জন্য আমি দুনিয়াতে থাকতে চেয়েছি।’৮৪
প্রিয় ভাই, তুমি কি বুঝতে পেরেছ দুনিয়ার মর্মার্থ তাদের নিকট কী ছিল? কীভাবে তারা দুনিয়াতে জীবন কাটিয়েছেন? এবং কেন তারা পৃথিবীতে থাকতে চাইতেন? আজ আমরা কোথায় আর উত্তপ্ত গরমের সে সিয়াম সাধনা কোথায়? আমরা কোথায় আর কনকনে শীতের রাতে প্রভুর ইবাদত কোথায়? আমরা কোথায় আর ইলমের সে অন্বেষণ কোথায়? আলিমদের মজলিসে আমাদের উপস্থিতি কোথায়? আমরা নিজেদের সময়কে কীসের মধ্যে জলাঞ্জলি দিচ্ছি? যেদিন হঠাৎ করে আমরা অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত হবো, সেদিন আমাদের অবস্থা ও উপলব্ধি কেমন হবে?
হাবিব আল আজমি রহ. তার মৃত্যুর সময় অনেক কাঁদছিলেন আর বলছিলেন,
‘আমি এমন এক সফর করতে চাচ্ছি, যেই সফর এর আগে আমি কখনো করিনি। আমি এমন এমন পথ অতিক্রম করতে যাচ্ছি, যা এর আগে কখনো অতিক্রম করিনি। আমি আমার সায়্যিদ আমার মাওলার সাক্ষাৎ করব, যাঁকে এর আগে কখনো দেখিনি। আমি এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির নিকটবর্তী হবো, এর আগে যার সম্মুখীন কখনো হইনি।’
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. বলেন,
‘এটা যদি বিদআত না হতো, তাহলে আমি কসম করতাম যে, যতক্ষণ না মৃত্যুর সময় আমার রবের দূতদের চেহারায় কী আছে, তা জানতে পারব; ততক্ষণ আমি দুনিয়ার কোনো বিষয় নিয়ে হাসব না। এবং আমি চাইতাম না যে, আমার মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক; কারণ এটাই হলো মুমিনের সর্বশেষ কাজ, যার ওপরে তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে।'৮৫
সালাফের কেউ একজন বলেছেন, 'ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, মৃত্যু সত্য; তারপরও সে হাসিখুশি থাকে! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, জাহান্নাম সত্য; তারপরও সে হাসে! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে দেখে, দুনিয়া তার অধিবাসী-সহ নিত্য পরিবর্তন হচ্ছে; তারপরও কীভাবে দুনিয়ার প্রতি নিশ্চিন্ত রয়েছে?! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, তাকদির সত্য; তারপরও দুনিয়া নিয়ে কীভাবে সে এত ব্যস্ত হয়?'৮৬
এ দুনিয়াতে আমরা আছি। কিন্তু এ দুনিয়াই আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিনতাই করে নিয়েছে। আর আমরা লক্ষ্য হারিয়ে কালক্ষেপণের সমুদ্রে সাঁতার কেটে চলছি। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে নিজের নফস, প্রবৃত্তি আর শয়তানের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আমাদের কল্পনা, আশা-আকাঙ্খা, চিন্তা- চেতনার ওপর বিজয় অর্জন করতে হলে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.- নসিহত আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. আবু হাজিম রহ.-কে বলেন, 'আমাকে উপদেশ দিন।'
আবু হাজিম বললেন, 'তুমি শুয়ে পড়ো। মনে করো, মৃত্যু তোমার শিয়রে। এরপর তুমি লক্ষ করে দেখো, সে সময় তোমার কী করতে মন চায়, সেই কাজটাই এখন করো। সে সময় তোমার কোনটি ত্যাগ করতে মন চাইবে, সেটা এখনই পরিত্যাগ করো।
টিকাঃ
৮১. শারহুস সুদুর: ০৮
৮২. আস-সিয়ার: ৫/৯২
৮৩. আল-আকিবাহ: ৪০
৮৪. মিনহাজুল কাসিদিন: ৪৩১
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩১৬
৮৬. মুকাশাফাতুল কুলুব: ১৫৭
📄 অবস্থান যেমনই হোক, মৃত্যুর সাক্ষাৎ অনিবার্য
মৃত্যু চিরসত্য। এ ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সকলে সমান। মৃত্যু যেমন ছোট ঘরেও প্রবেশ করবে, তেমনি বড় রাজ অট্টালিকাও মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। যারা সারা দুনিয়ার রাজত্ব করে মৃত্যু তাদেরও ঘায়েল করবে। আবার যারা দুনিয়ার কিছুরই মালিক নয়, মৃত্যু তাদেরও পাকড়াও করবে। কিন্তু মানুষ গাফিলতির মধ্যে থাকে আর মৃত্যুর চাকা তাদের পিষতে থাকে।
বড় বড় প্রাসাদ ও অট্টালিকার মালিকগণ আর পদ-পদবির অধিকারীরা, যাদের দেখে তাদের এই নিয়ামতের ওপর অনেক দুনিয়াদাররা ঈর্ষা করে, আমরা যেন তাদের মৃত্যুর অবস্থার প্রতি লক্ষ করি। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজি যে, তারা কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়? কীভাবে তারা মৃত্যুকে স্বাগত জানায়? তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ধন-সম্পদ কি মৃত্যুর সময় তাদের সাথে বাকি থাকে? না তাদের আমল ব্যতীত সবকিছুই দুনিয়াতে পড়ে রয়?
মুহাম্মাদ ইবনে মানসুর আল-বাগদাদি রহ. বলেন,
'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে তাহিরকে তার অন্তিম মুহূর্তে দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে সালাম দিয়ে বললাম, “হে আমির, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” তখন তিনি বললেন, "তুমি আমাকে আমির বলো না; বরং আমাকে বন্দী বলো।"'
মৃত্যুর পূর্বে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান বলছিল,
'আল্লাহর শপথ, আমার জন্য এটাই প্রিয় ছিল যে, আমি তিহামার এক লোকের গোলাম হতাম। আমি যার ছাগল চরাতাম, তিহামার পাহাড়গুলোতে তার বকরিগুলো নিয়ে যেতাম। আর আমি যদি শাসক না হতাম।'৮৯
মৃত্যুর আগে খলিফা মানসুর বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছিল, তখন লোকেরা তাকে বলল, 'কোনো সমস্যা নেই, হে আমিরুল মুমিনিন।' তখন তিনি বললেন, 'কিছুই হবে না আমার। তবে শুধু এটা হবে যে, আমার দুনিয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে, এবার আমি আখিরাতের সম্মুখীন হবো।'৯০
দুনিয়ায় জীবনযাপনের এই পার্থক্য। অবধারিত মৃত্যুকে কেউ আটকাতে পারবে না। মৃত্যু সকলের সাথেই সমান আচরণ করবে। কারণ, সে তো আল্লাহর আদেশ মাত্র। আল্লাহর আদেশে সকল শক্তিকে সে ধ্বংস করবে। সকল পরাশক্তির রাষ্ট্রকে সে নিঃশেষ করবে। তাই তোমরা মৃত্যু আসার আগেই দ্রুত নেক আমল করো। দ্রুত তাওবা করো। শাকিক ইবনে ইবরাহিম রহ. বলেন,
'তুমি এমনভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করো, যাতে মৃত্যুর পর আর তোমাকে ফিরে আসার প্রার্থনা করতে না হয়।'৯১
প্রিয় ভাই, মৃত্যুর পর তোমাকে আর ফেরত পাঠানো হবে না। কারণ, প্রতিটি বিষয়ই নির্ধারিত। নির্ধারিত তার সময়।
সুতরাং তুমি এখন থেকেই মৃত্যুর প্রস্তুতিস্বরূপ নেক আমল করো। অন্তর এই কথা বলার আগেই তুমি তাওবা করো যে, হায় আমার জন্য আফসোস, আমি তো আল্লাহর ব্যাপারে কমতি করে ফেলেছি!
মৃত্যু তো এমন চলে যাওয়া। যার পর ফেরার কোনো উপায় নেই। সেটা এমন লজ্জার কারণ হবে, যা কোনো অশ্রুবর্ষণেও আর কাজে আসবে না। সেটা দুনিয়া থেকে আখিরাতের দিকে সফর, এরপর আর দুনিয়াতে আসা যাবে না। এটাই দুনিয়ার শেষ। এটাই জমিনের ওপর থেকে জমিনের নিচের দিকে সফর। আরাম-আয়েশের প্রাসাদ থেকে সংকীর্ণ অন্ধকার এক কবরে এ যাত্রা। এ সফর প্রশ্ন-উত্তরের, হিসাব-নিকাশের।
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.-এর যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি বললেন, 'তোমরা আমাকে বসাও।' তখন লোকেরা তাকে বসালো। অতঃপর তিনি বললেন,
'হে আল্লাহ, আমি তো এমন ব্যক্তি, আপনি আমাকে যে আদেশ দিয়েছেন, আমি তা পালনে কমতি করেছি। আর আপনি আমাকে যা নিষেধ করেছেন, আমি তার অবাধ্য হয়েছি। কিন্তু আমি এটা স্বীকার করছি যে, لا إله إلا الله (আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই)।' অতঃপর তিনি তার মাথা উঁচু করলেন। এবার তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। লোকেরা তাকে বলল, 'আপনি তো কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।' তখন তিনি বললেন, 'আমি এখানে এমন কতকের উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি, যারা মানুষও নয় আবার জিনও নয়।' অতঃপর তিনি ইনতেকাল করলেন। ৯২
আমিরুল মুমিনিন মামুনুর রশিদের যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি ঘোড়ার জিন খোলার আদেশ করলেন। তার জন্য সে জিন বিছানো হলো। তিনি তাতে শুয়ে পড়লেন। তার মাথার ওপর ছাই রেখে বললেন, 'হে এমন বাদশাহ, যার বাদশাহি কখনো ধ্বংস হবে না! এমন ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যার বাদশাহি ধ্বংস-প্রাপ্ত।' ৯৩
আমিরুল মুমিনিন আবু জাফর মানসুরের যখন মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি রাবিকে বললেন, 'হে রাবি, তিনিই আসল সুলতান।... যে মৃত্যুবরণ করবে, সে আবার কিসের সুলতান?' ৯৪
প্রতিটি জীবেরই শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু। তা থেকে কেউই পলায়ন করতে পারবে না। মৃত্যু কাউকে ফেলে সামনেও চলে যাবে না যে, ভুলে কেউ রয়ে যাবে।
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের যখন এই বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, তার মৃত্যু এসে গেছে, তখন তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার আশা, আমি যদি জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত বোঝা বহনকারী কুলি হয়ে থাকতে পারতাম।'৯৫
আবু দারদা রা. বলেন,
'তুমি যখন মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ করো, তখন তুমি নিজেকে তাদেরই একজন মনে করো।'৯৬
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে তার মৃত্যুসজ্জায় জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার কেমন লাগছে?' তখন তিনি বললেন,
'যেরকম আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿ وَلَقَدْ جِئْتُمُونَا فُرَادَى كَمَا خَلَقْنَاكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَتَرَكْتُمْ مَا خَوَّلْنَاكُمْ وَرَاءَ ظُهُورِكُمْ ﴾
“তোমরা আমার কাছে নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছ, যেভাবে আমি প্রথমবার তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তোমাদের যা দিয়েছিলাম, তা পশ্চাতেই রেখে এসেছ।”৯৭
দুনিয়ার রাজত্ব ও তার চাকচিক্য চলে যাবে। সকলকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে আল্লাহ তাআলার দিকে।
জীবন হলো সামান্য কিছু সময়ের নাম। যা স্বপ্নের মতো দ্রুত চলে যায়। অথচ, মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন মনে করে, তার কোনো শেষ নেই! মানুষের আশা তাকে, আখিরাত থেকে ফিরিয়ে রাখে। আর এ কারণেই মৃত্যুর সময় মুতাসিম বলেছিলেন, 'আমি যদি জানতাম যে, আমার জীবন এত ছোট, তাহলে যা আমি করেছি, তার কিছুই করতাম না।’৯৮
আমাদের সকলের জীবনই খুব ক্ষণিকের। আমাদের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আমাদের জীবন আটকে আছে নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্বাসেই। যে জীবন আমাদের অতিবাহিত হচ্ছে, তা যেন স্বপ্নের ঘোরের মতো। আল্লাহর কসম, তা দিনের একটি মুহূর্তের মতোই ছোট। কিন্তু ভয় হলো জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুনের। ভয় এমন গর্তের, যেখানে হাঁড়গুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে।
আমরা আমিরুল মুমিনিন হারুনুর রশিদের কর্ম নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখি, তিনি তার কাফনের কাপড় নিজ হাতে বাছাই করে রেখেছেন। তিনি কাফনের দিকে তাকাতেন আর বলতেন,
﴿مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ * هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهُ ﴾
'আমার সম্পদ আমার কোনো কাজেই আসবে না। আমার এই রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। '৯৯
আমরা কেউ কি নিজ হাতে কাফনের কাপড় বাছাই করে নিজের কামরায় রেখে দিয়েছি? বরং কেউ কেউ তো বাড়িতে কাফনের কাপড়ের মতো কিছু দেখলে, তা বাড়ি থেকেই দূরে রাখে। যেন তার কোনো অনুভূতি নেই। সে মনে করে মৃত্যু কি এতই নিকটে যে, তার জন্য এখনিই প্রস্তুতি নিতে হবে?
تنام ولم تنم عنك المنايا * تنبه للمنية يا نؤوم
'তুমি তো আছ ঘুমিয়ে, কিন্তু মৃত্যু তো নেই ঘুমিয়ে। হে ঘুমকাতুরে, একটু ওঠো, মৃত্যু তোমার অতি নিকটে।'
প্রিয় ভাই, তুমি পড়া থামিয়ে দিও না; পড়তে থাকো। কারণ, সময় তো চলেই যাচ্ছে। তুমি পূর্ববর্তীদের অবস্থার দিকে লক্ষ করো। শিক্ষা গ্রহণ করো তাদের অবস্থা জেনে। এভাবে তোমার পরে যারা আসবে, তারাও তোমার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
টিকাঃ
৮৯. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ৮৮
৯০. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯২
৯১. ইমাম বায়হাকি কৃত আজ-জুহদ: ২৩৯
৯২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩২৫
৯৩. আল-আকিবাহ: ১৩০
৯৪. আল-আকিবাহ: ১২৮
৯৫. তারিখুল খুলাফা: ২০৫
৯৬. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮০
৯৭. সুরা আনআম: ৯৪
৯৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৯/৭৪
৯৯. সুরা হাক্কাহ: ২৮, ২৯
📄 কাফনের কাপড় নিয়ে সালাফের ভাবনা
আব্দুর রহমান ইবনে আসওয়াদ মৃত্যুসজ্জায় কাঁদছিলেন, তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমার আফসোস হচ্ছে যে, আমি আর সালাত ও সাওম পালন করতে পারব না। অতঃপর তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে ইনতেকাল করলেন। '১০০
ভাই আমার, এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কাফন আর নেক আমল ছাড়া তোমার সাথে আর কিছুই যাবে না। তোমাকে কাফনের কাপড়ে প্যাঁচিয়ে একা কবরে রেখে আসা হবে। আর তোমার পেছনে তোমার প্রাসাদ, তোমার ঘরবাড়ি ও জাগতিক সকল সম্পদ রয়ে যাবে। সেগুলো ভোগ করবে তোমার স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবরা।
এসব কিছুই আজ তোমার। কিন্তু কবরে যাওয়ার সময় তোমার সাথে শুধু কাফনের দু'টুকরা কাপড়ই যাবে। একটু লক্ষ করে দেখো, দুনিয়া কতটা তুচ্ছ এবং তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ?
উমর ইবনে খাত্তাব রা. তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন,
'তোমরা আমার কাফনের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা অবলম্বন কোরো। কারণ, আল্লাহ তাআলার নিকট যদি আমার কল্যাণের ফয়সলা হয়ে থাকে, তাহলে তিনি আমাকে এর চেয়ে উত্তম কাপড়ের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করে দেবেন। আর যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে এটাও খুব দ্রুতই আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবেন। তোমরা আমার কবর খোঁড়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন কোরো, বেশি বড় করে খনন কোরো না। কারণ, যদি আল্লাহ তাআলার নিকট আমার কল্যাণের ফয়সলা হয়, আমার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত তিনি তা প্রশস্ত করে দেবেন। আর যদি আমি এর বিপরীত অবস্থায় থাকি, তাহলে আমার ওপর তা এতটাই সংকীর্ণ হয়ে যাবে যে, আমার এক পাশের হাঁড় অন্য পাশের হাঁড়ের মধ্যে ঢুকে যাবে।'১০১
সায়িদ ইবনে মারওয়ান রহ.-এর যখন মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি বললেন,
'হায়, আমি যদি কিছুই না হতাম! হায়, আমি যদি এই প্রবহমান পানির মতো হতাম!' এরপর তিনি বললেন, 'তোমরা আমার কাফনের কাপড়টি নিয়ে আসো।' কাফন এনে তাঁর হাতে দেওয়া হলে তিনি বললেন, 'আহ, তুমি এত খাটো! এত ছোট! এত কম তোমার পরিমাণ!'১০২
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তার মৃত্যুসজ্জায় বললেন, 'তোমরা আমাকে উঠাও।' তখন লোকেরা তাকে এতটুকু পরিমাণ উঠাল যে, তিনি বাতাসের ঘ্রাণ নিলেন। তারপর বললেন,
'হে দুনিয়া, তোমার ঘ্রাণ কতই না উত্তম! কিন্তু তোমার দৈর্ঘ্য কতই না কম। তোমার প্রাচুর্য কতই না স্বল্প। অথচ আমরা তোমাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। তোমার ধোঁকায় ঘুরপাক খেয়েছিলাম।'১০৩
হে ভাই, তোমরা নেকি অর্জনের ক্ষেত্রে পরিশ্রম করো। কারণ, সেগুলোই তোমাদের সামনে কাজে আসবে। তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। কারণ, মুত্যু তোমাদের সাথে এসে মিলিত হবে। তোমরা লক্ষ করো, কোন প্রবঞ্চনার সাথে তোমরা সম্পৃক্ত আছ। তোমাদের যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তা থেকে কখনো গাফিল হয়ো না। কত দিন চলে গেছে, অথচ তুমি আল্লাহর আনুগত্য করোনি। তোমাদের কত গুনাহ লেখা হয়েছে, অথচ তোমরা সেদিকে মনোযোগ দাওনি। তোমরা সত্যবাদীদের সাথে ছিলে, তারা তোমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তোমরা সম্পর্ক ছিন্ন করলে। এই ধিক্কারের উপযুক্ত কি তোমরা ব্যতীত অন্য কেউ? এর পরেও কি তোমরা শুনবে না?
তোমার মতো কত মানুষ এই দুনিয়াতে বসবাস করেছে। মৃত্যু যাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করেছে। চক্কর দিয়েছে। এরপর তাদের সাথে ঝগড়া করে তাদের প্রতিবেশীকে ছিনিয়ে নিয়েছে। যে ব্যক্তি তার ওপর মৃত্যু পতিত হওয়ার আগেই সতর্ক হয়েছে, সে যথার্থ করেছে। এ জীবন! এ জীবন খুবই ছোট। তার বেশির ভাগই তো কত কারণে চলে গেল। আর বাকি সময়টুকুকে তুমি বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে, ওজর দিয়ে দিয়ে নষ্ট করছ? অথচ মেহমানকে বিদায় জানানোর সময় হয়ে গেছে। ১০৪
টিকাঃ
১০০. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯২
১০১. আস-সিয়ার: ৫/১১২
১০২. তারিখুল খুলাফা: ১৩৬
১০৩. আস-সিয়ার: ৪/২৫০