📄 মৃত্যুর স্মরণ
প্রিয় ভাই, মৃত্যু চিরসত্য। মৃত্যুর কথা শুনলে অন্তর কেঁপে ওঠে। আত্মা শুকিয়ে যায়। আমরা চাই, মৃত্যুর আলোচনা কম হোক। আলোচনা শুরু হলে দ্রুত বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু হে মৃত্যু-পথের পথিক, হে একই গন্তব্যের সফরসঙ্গী, মৃত্যুকে অবহেলা করো না। তোমার সামনে মাত্র অল্প কয়েকটি পদক্ষেপই বাকি। এসো, আমরা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের দিকে লক্ষ করি, তিনি বলেছেন, 'আমার অন্তর থেকে মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর স্মরণ পৃথক হলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। '৬৯
আশ্চর্য! সত্যিই আমাদের জন্য এটা বড় আশ্চর্যের। তাঁরা উম্মাহর সে অংশ, যাদের অন্তর জীবন্ত, যাদের কর্ণ সদা জাগ্রত। আল্লাহই আমাদের সহায়। মৃত্যুর স্মরণ তাদের অন্তর থেকে মুহূর্তের জন্যও পৃথক হতো না। অথচ, আমরা এক মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর আলোচনা শুনতে প্রস্তুত নই। কখনো তো এমনও হয় যে, যখন মজলিসে মৃত্যুর আলোচনা হয়, অন্তিম মুহূর্ত নিয়ে কথা হয়, তখন আমাদের অনেকে সেখান থেকে উঠে যায়। এর কারণ কেবলই আখিরাত সম্পর্কে উদাসীনতা, দুনিয়া ও দুনিয়ার অস্থায়ী সুখ-শান্তির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। এটা হয়ে থাকে আখিরাতের আলোচনা থেকে দূরে থেকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাস নিয়ে মত্ত থাকার কারণে। এমনটা হয়ে থাকে আমাদের ওপরে প্রবৃত্তি বিজয়ী থাকলে। আখিরাত থেকে, আখিরাতের আলোচনা থেকে, আখিরাতের স্মরণ থেকে দূরে থাকার ফলে।
মাহদি ইবনে মাইমুন রহ. বলেন,
'আমি হাসসান ইবনে সুফইয়ানকে তার মৃত্যুর সময় দেখলাম, তাকে বলা হলো, “আপনার কেমন লাগছে?” তিনি বললেন, "যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারি, তাহলে তো ভালো।” অতঃপর তাকে বলা হলো, “আপনি কী চান?” তিনি বললেন, “এমন দীর্ঘ একটি রাত, যার শুরু-শেষের মধ্যে অনেক ব্যবধান। আর আমি এর সকল সময়টুকু আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে কাটিয়ে তা জীবিত করতে পারি।"'৬০
তারা মৃত্যুর জন্য সর্বদা এমন প্রস্তুত হয়ে থাকতেন, ঠিক যেমন পথিমধ্যে যানবাহনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী প্রস্তুত হয়ে থাকে। গাড়ির জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী জানে না, কখন তার গাড়ি আসবে; তাই সে গাড়ির অপেক্ষায় থাকে। তারা অনর্থক কাজে সময়ক্ষেপণ করে না। সময় বেশি লাগলেও সেখানে প্রতীক্ষারত থাকে।
মুআজা আল-আদবিয়্যা রহ.। যখন সকাল হতো, তখন তিনি বলতেন, 'এই তো আজকের দিনেই আমি মৃত্যুবরণ করব।' এ বলে তিনি ইবাদতে রত হতেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত আর ঘুমাতেন না। আবার যখন সন্ধ্যা হতো, তখন তিনি বলতেন, 'এই তো আজকের রাতেই আমি মৃত্যুবরণ করব।' এরপর ইবাদতে রত হতেন সকাল পর্যন্ত আর ঘুমাতেন না।৬১
আবুল মুনজির ইসমায়িল ইবনে উমর রহ. বলেন,
'ওয়ারকা ইবনে উমর ইবনে কুলাইব রহ.-এর মৃত্যুর সময় আমরা তার নিকট গেলাম। তখন তিনি কালিমা পড়ছিলেন, তাকবির দিচ্ছিলেন এবং আল্লাহর জিকির করছিলেন। অতঃপর মানুষের ভিড় যখন বেড়ে গেল, তখন তিনি তার ছেলেকে বললেন, “তুমি আমার পক্ষ থেকে মানুষের সালামের উত্তর দিয়ে দিয়ো, যাতে তারা আমাকে আমার রবের স্মরণে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।”'৬২
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. তাঁর অন্তিম মুহূর্তে। মৃত্যুর পূর্বের এ সময়ে তিনি বলেন,
'আমার প্রিয় আমার কাছে এসেছে আমার এ দরিদ্র অবস্থায়। আজকের পূর্বে আমি তোমাকে ভয় পেতাম, অথচ আজ আমি তোমাকে কামনা করি।'৬৩
একবার হাসান রহ. খুব করে কাঁদলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আবু সায়িদ, আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন, 'এই ভয়ে কাঁদছি যে, না জানি আমাকে আবার জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়।'৬৪
সুলাইমান আত-তাইমি রহ. বলেন,
'আমি আমার এক সাথির নিকট গেলাম। তাকে খুবই অস্থির ও উৎকণ্ঠিত দেখতে পেলাম। তার এই অস্থিরতার কারণে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। তখন আমি তাকে বললাম, “তোমার এই উস্থিরতা ও উৎকণ্ঠার কারণ কী? অথচ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তুমি তো ভালো অবস্থায় আছ!” তখন আমার সে বন্ধু বলল, “আমি কেন অস্থির ও উৎকণ্ঠিত হবো না? অস্থির ও উৎকণ্ঠিত হওয়া আমার চেয়ে অধিক আর কার জন্য যথার্থ? আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমাকে যদি ক্ষমা করেও দেওয়া হয়। তবুও আমি এই চিন্তায় লজ্জিত হচ্ছি যে, আমি কী নিয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হবো!””৬৫
আল্লাহু আকবার! তারা আল্লাহ তাআলাকে যথাযথভাবে চিনতে পেরেছিলেন। যথাযথভাবে তাঁর মূল্যায়ন করেছিলেন। তাই তো তারা নিজেদের গুনাহের কারণে লজ্জিত হতেন, পদস্খলনের কারণে লজ্জা পেতেন। তাদের চিন্তা- চেতনার পুরোটা জুড়েই ছিল আখিরাতের চিন্তা। আল্লাহ তাআলার নিকট তাদের আশাও ছিল প্রবল। তাদের হৃৎপিণ্ডের সাথে মিশে গিয়েছিল এই আয়াত,
وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا 'আর যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে, এমন লোকদের চেষ্টা-সাধনা স্বীকৃত হয়ে থাকে।'৬৬
আল্লাহকে পাওয়ার আশা তাদের আরও সামনে তাড়িয়ে নিত। তাদের অন্তরে পদস্খলনের ভয়ও বিরাজ করত।
রাবি ইবনে খুসাইম রহ.। তিনি অসুস্থ হলে লোকেরা তাকে বলল, 'আপনার জন্য কি আমরা ডাক্তার ডাকব না?' কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন,
'আদ জাতি, সামুদ জাতি ও আসহাবুর র'সরা কোথায়? তাদের মধ্যবর্তী সময়ে ও আগে-পরে কত মানুষ এসেছে, কোথায় তারা? তারা তো চলে গেছে। অথচ তাদের নিকট ওষুধও ছিল, ডাক্তারও ছিল। আমি তো কোনো চিকিৎসককেও চিরজীবী হতে দেখি না, আবার কোনো চিকিৎসা- প্রাপ্ত মানুষও সারা জীবন বেঁচে থাকে না। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট একটা সময় আসে, যখন সে চলে যায়।'৬৭
যখন মানুষের ফয়সালার সময় হয়, তখন কোনো চিকিৎসা তার কাজে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِي * وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ * وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ • وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ * إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ ﴾
'কক্ষনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। এবং বলা হবে, কে তাকে রক্ষা করবে? সে মনে করবে, দুনিয়া হতে বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে। এবং পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। সেদিন আপনার পালনকর্তার নিকট সবকিছু নীত হবে। '৬৮
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলতেন,
أَكْثِرُوا ذِكْرَ النَّارِ فَإِنَّ حَرَّهَا شَدِيدٌ، وَإِنَّ قَعْرَهَا بَعِيدُ، وَإِنَّ مَقَامِعَهَا حَدِيدٌ
'তোমরা অধিক পরিমাণে মৃত্যুর স্মরণ করো। কারণ, তার গরম প্রচণ্ড। তার গভীরতা অনেক। তার পেটানোর হাতুড়িটি হবে লোহার।'৭০
ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. অন্তিম মুহূর্তে অচেতন হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বলে উঠলেন,
'হায়, আমার সফর এত দীর্ঘ; অথচ আমার পাথেয় কত কম!'৭১
মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন,
'নিশ্চয়, এই মৃত্যু দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত মানুষদের ভোগ-বিলাস শেষ করে দেয়। সুতরাং তোমরা এমন ভোগ-বিলাস তালাশ করো, যার কোনো মৃত্যু নেই।'৭২
যে নিয়ামত ও ভোগ-উপভোগে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই। বলাই বাহুল্য সে নিয়ামত কেবল আখিরাতেই লাভ করা সম্ভব। আর আখিরাতের ভোগ-বিলাস তালাশ করতে হবে আল্লাহ তাআলার দিকে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করে। যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত করার মাধ্যমে। যেমনটি আলা ইবনে জিয়াদা রহ. বলেন,
'মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তি যেমনি করে দুনিয়ার সকল মায়া-মমতা ভুলে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে। ঠিক তেমনিভাবে তোমরা সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করবে। নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করেন। ক্ষমা প্রাপ্তির পর সে যেন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে। আমাদেরও এমনই হতে হবে। '৭৩
আমরা যদি আমাদের এই স্তরে রাখি। নিজেদের আমরা এই অবস্থানে দাঁড় করাই। তাহলে অবশ্যই আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে। অবশ্যই আমাদের আমল সংশোধন হবে। প্রিয় ভাই, সালাত আদায়ের পূর্বে মনে কোরো, এটাই তোমার জীবনের শেষ সালাত। মনে কোরো, মৃত্যু খুবই নিকটবর্তী। মৃত্যুর স্মরণ তোমার আমলকে সংশোধন করবে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা দূর করবে।
দুনিয়াকে তুচ্ছ করে দেখো। আখিরাতের চিন্তা-ফিকির তোমার অন্তরে গেঁথে নাও। আখিরাতের জন্যই হোক তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা।
ভয় ও আশাকে তোমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে নাও। আমল ও আস্থা অনুভব করো। কারণ, এই ভয়ের পরেই রয়েছে চিরনিরাপত্তা। এই পরিশ্রম ও ক্লান্তির পরেই রয়েছে চিরসুখ। এ আমল ও চেষ্টা-সাধনার পরই তো চিরপ্রশান্তি, যার কোনো শেষ নেই।
মুমিনের আজকের ভয় তার জন্য আগামীকালের নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। সে যদি এ ভয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, নেক আমল করে, তাহলে এটা তার জন্য আগামীকালের নিরাপত্তা ও সুখ নিয়ে আসবে।
টিকাঃ
৬০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১১৭
৬১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২২
৬২. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/২৩০
৬৩. আল-আকিবাহ: ১৪৬
৬৪. আজ জাহরুল ফায়িহ: ৯১
৬৫. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ৮৮
৬৬. সুরা ইসরা: ১৯
৬৭. আল-আকিবাহ: ১১৯
৬৮. সুরা কিয়ামাহ: ২৬-৩০
৬৯. আল-আকিবাহ: ৩৯
৭০. আল-হাসান আল-বসরি : ১০৮
৭১. আল-আকিবাহ: ১৩৩
৭২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২২৪
৭৩. আল-আকিবাহ: ৯০
📄 অন্তিম বিদায়ের পর আর ফিরে আসা যাবে না
এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর বিস্তৃত নিয়ামত দান করছেন। সকাল-সন্ধ্যা আমাদের ওপর বর্ষিত হচ্ছে তাঁর অগণিত নিয়ামত। কিন্তু আমরা আমাদের এই জীবনকে নষ্ট করে দিচ্ছি আমাদের সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যের বিপরীত করে। এভাবে উদ্দেশ্যের বিপরীত চলতে চলতে একসময় মৃত্যু আসে। তখন আমাদের কেউ কেউ চিৎকার করে করে বলবে,
رَبِّ ارْجِعُونِ ﴾
'হে আমার রব, আমাকে আবার দুনিয়াতে ফেরত পাঠান।'৭৪
কেন তোমাকে ফেরত পাঠানো হবে? কেন তুমি ফিরে আসবে? অথচ, তুমি এই দুনিয়াতে অনেক সময়ই পেয়েছ। কেন তুমি এ সময়গুলো দুনিয়া কামানোর জন্যই ব্যয় করে দিলে? তুমি কি ভুলে কোনো কিছু রেখে গেছ যে, আবার তুমি ফিরে আসবে? তোমার জীবনের এতগুলো বছর অতিবাহিত হলো। তুমি গাফিলই রয়ে গেলে। তোমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদাসীন রইলে। আর এখন চাইছ, দুনিয়াতে ফিরে আসতে? আমাদের উত্তর হবে, হ্যাঁ, আমি ফিরে আসতে চাইব। যেন...
لَعَلَّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ )
'যেন আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।'৭৫
কিন্তু আজ কোথায় তুমি? সেদিন তোমার এমন উপলব্ধি আসবে, এখন কেন আসছে না? আজ তুমি আমল থেকে দূরে কেন? তোমার হাতে এখন অনেক সময়; তবুও কেন তুমি আমল থেকে দূরে?
টিকাঃ
৭৪. সুরা মুমিনুন: ৯৯
৭৫. সুরা মুমিনুন: ১০০
📄 রওয়ানা কোন দিকে?
জাবির ইবনে জাইদ রহ.-কে তার মৃত্যুর পূর্বে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তুমি কী চাও?' তিনি বললেন,
'আমি হাসানকে এক পলক দেখতে চাই।' হাসান বসরি রহ. তার কাছে এলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'এই তো হাসান তোমার নিকটে।' তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে ভাই, এটিই সে সময়। এটি সে মুহূর্ত। আমি তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে রওয়ানা করছি, হয়তো জান্নাতের দিকে নয়তো জাহান্নামের দিকে।'
مَا هِيَ إِلَّا جَنَّةٌ وَنَارٌ * أَفْلَحَ مَن كَانَ لَهُ اعْتِبَارٌ
'জান্নাতে যাওয়ার উপায় কী? জাহান্নামে পতিত হওয়ার কারণই বা কী? দুটোর মাঝে এই তো পার্থক্য— যে শিক্ষা নিয়েছে সে-ই পেয়েছে সাফল্য।'
হ্যাঁ, এটাই সত্য কথা। আখিরাতে দুটি রাস্তা আছে। একটি চলে গেছে জান্নাতের দিকে, আরেকটি জাহান্নামের দিকে। যাদের গন্তব্য জান্নাত, আর যাদের গন্তব্য জাহান্নাম—তারা পরস্পর সমান নয়। কারণ,
﴿أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُونَ ﴾
'জান্নাতের অধিবাসীরাই সফল।' ৭৬
মুজানি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'ইমাম শাফি রহ. অসুস্থ হলে আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। এটাই ছিল তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সে রোগেই তিনি ইনতেকাল করেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেমন আছেন?” তিনি বললেন,
“দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে আখিরাতের দিকে রওয়ানা হচ্ছি। মৃত্যুর পেয়ালা পান করছি। আমি অচিরেই আমার খারাপ আমলগুলো দেখতে পাব। আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট পেশ করা হবে। আমি জানি না, আমার আত্মা জান্নাতে যাবে? যদি জান্নাতে যায়, তাহলে তাকে অভিনন্দন। নাকি আমার আত্মা জাহান্নামের দিকে যাবে? যদি তা জাহান্নামের দিকে যায়, তাহলে তার জন্য ক্রন্দন করছি।” অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন।' ৭৭
অন্তিম মুহূর্তে নাফি' রহ. কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি সা'দ রা.-কে স্মরণ করছি। কবরের চাপের কথা স্মরণ করছি।'
অর্থাৎ, আমি এ হাদিসের কথা স্মরণ করছি-আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ لِلْقَبْرِ ضَغْطَةٌ وَلَوْ كَانَ أَحَدٌ نَاجِيًا مِنْهَا نَجَا مِنْهَا سَعْدُ بْنُ مُعَادٍ
'কবরের চাপ রয়েছে। যদি কেউ তা থেকে মুক্তি পেত, তাহলে সা'দ ইবনে মুআজ মুক্তি পেত।'৭৮
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. আমাদেরকে আমাদের পরিণাম, গন্তব্য ও এই দুনিয়া থেকে আমাদের পৃথক হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন,
'তোমরা কি দেখছ না, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা কাউকে না কাউকে তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে বিদায় জানাচ্ছ। তোমরা তাকে মাটির ফাটলে রেখে আসছ। সে মাটিকে বিছানা বানিয়েছে। প্রিয়জনদের রেখে গেছে। পৃথক হয়ে গেছে ধন-সম্পদ থেকে।'৭৯
আব্দুল্লাহ ইবনে আলি রহ.। মৃত্যুক্ষণ ঘনিয়ে এলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি কাঁদছি পেছনের দিনগুলোতে আমার অপরাধের কারণে। সুউচ্চ জান্নাতের জন্য আমার পাথেয় কম থাকার কারণে। কোন জিনিস আমাকে উত্তপ্ত জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে, তা ভেবে কাঁদছি আমি।'৮০
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা এতটা মূল্যায়ন করার পর, সময়কে এত সুন্দর করে আমলে ব্যাপৃত রাখার পরও সারাক্ষণ কতটা ভয়ের মধ্যে থাকতেন। আর আমরা?
টিকাঃ
৭৬. সুরা হাশর: ২০
৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫৮; আস সিয়ার: ১০/৭৬
৭৮. আস-সিয়ার: ৫/৯৯
৭৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮০
৮০. আল-আকিবাহ: ১৩১
📄 দুনিয়াতে ফিরে আসা বা দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা
ইবরাহিম ইবনে আবু আব্দুহু বলেন,
'আমার কাছে এমন একটা কথা পৌঁছেছে যে, মুমিন যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন আবার দুনিয়াতে ফিরে আসতে চাইবে। তার ফিরে আসার কারণটা হবে আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর তাসবিহ আদায় করা।'৮১
তারা জানতেন, তাদের দুনিয়ার জীবনের গুরুত্ব কত। আর এ কারণেই তারা তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে আখিরাতের জন্য কাজে লাগাতেন।
পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতেন। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতেন। তারা চেষ্টা করতেন তাদের একটি মুহূর্তও যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ব্যতীত অযথা নষ্ট না হয়।
বুকাইর ইবনে আমির রহ. বলেন,
'আব্দুর রহমান ইবনে আবু নুআইম রহ.-কে যদি বলা হতো, এখনই আপনার নিকট মালাকুল মাওত আসবে, তবুও অতিরিক্ত ইবাদত করার মতো তার কোনো সময়-সুযোগ বাকি ছিল না। ৮২
ইয়াজিদ আর রাকাশি রহ. নিজেকে নিজে বলতেন,
'ধিক, তোমাকে হে ইয়াজিদ... মৃত্যুর পর তোমার পক্ষ থেকে কে সালাত আদায় করবে? মৃত্যুর পর কে তোমার পক্ষ থেকে সাওম আদায় করবে? কে তোমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করবে তোমার মৃত্যুর পর?' তারপর তিনি বলতেন,
'হে মানুষসকল, তোমরা কি বাকি জীবনটা ক্রন্দন করে এবং নিজেদের জন্য আফসোস করে কাটাবে না? মৃত্যু যার অবধারিত। কবর যার ঘর। মাটি যার বিছানা। পোকামাকড় যার সঙ্গী। যার জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট ভয়ংকর এক দিন।... অবস্থা কেমন হবে তার?' এ বলে তিনি কাঁদতে থাকতেন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। ৮৩
মুআজ ইবনে জাবাল রা.-এর যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলো, তখন তিনি বললেন,
'তোমরা দেখো তো সকাল হয়েছে কি না?' তখন তাকে বলা হলো, 'না, এখনো সকাল হয়নি।' সকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবে প্রশ্ন করছিলেন। অতঃপর যখন তাকে বলা হলো, 'সকাল হয়েছে।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলার নিকট এমন রাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার সকাল জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।' অতঃপর তিনি বললেন, ‘অভিনন্দন মৃত্যুকে—যে অদৃশ্য এক সাথি। আমার দারিদ্র্য সত্ত্বেও সে আমার সাক্ষাতে এসেছে। হে আল্লাহ, আমি আপনাকে ভয় করি। আজ আমি আপনার সাক্ষাৎ কামনা করি। হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি দুনিয়াকে কখনোই ভালোবাসিনি এবং ঘুমানোর জন্য বা গাছ রোপণ করার জন্য দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চাইনি। কিন্তু আমি সাওম পালন করে আমার গলাকে তৃষ্ণার্ত করে তুলতে, শীতের রাত জেগে সালাত আদায় করতে, ইবাদতে সাধনার নিমিত্তে, আলিমদের সামনে হাঁটু গেড়ে তাদের আলোচনায় বসতে, এসবের জন্য আমি দুনিয়াতে থাকতে চেয়েছি।’৮৪
প্রিয় ভাই, তুমি কি বুঝতে পেরেছ দুনিয়ার মর্মার্থ তাদের নিকট কী ছিল? কীভাবে তারা দুনিয়াতে জীবন কাটিয়েছেন? এবং কেন তারা পৃথিবীতে থাকতে চাইতেন? আজ আমরা কোথায় আর উত্তপ্ত গরমের সে সিয়াম সাধনা কোথায়? আমরা কোথায় আর কনকনে শীতের রাতে প্রভুর ইবাদত কোথায়? আমরা কোথায় আর ইলমের সে অন্বেষণ কোথায়? আলিমদের মজলিসে আমাদের উপস্থিতি কোথায়? আমরা নিজেদের সময়কে কীসের মধ্যে জলাঞ্জলি দিচ্ছি? যেদিন হঠাৎ করে আমরা অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত হবো, সেদিন আমাদের অবস্থা ও উপলব্ধি কেমন হবে?
হাবিব আল আজমি রহ. তার মৃত্যুর সময় অনেক কাঁদছিলেন আর বলছিলেন,
‘আমি এমন এক সফর করতে চাচ্ছি, যেই সফর এর আগে আমি কখনো করিনি। আমি এমন এমন পথ অতিক্রম করতে যাচ্ছি, যা এর আগে কখনো অতিক্রম করিনি। আমি আমার সায়্যিদ আমার মাওলার সাক্ষাৎ করব, যাঁকে এর আগে কখনো দেখিনি। আমি এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির নিকটবর্তী হবো, এর আগে যার সম্মুখীন কখনো হইনি।’
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. বলেন,
‘এটা যদি বিদআত না হতো, তাহলে আমি কসম করতাম যে, যতক্ষণ না মৃত্যুর সময় আমার রবের দূতদের চেহারায় কী আছে, তা জানতে পারব; ততক্ষণ আমি দুনিয়ার কোনো বিষয় নিয়ে হাসব না। এবং আমি চাইতাম না যে, আমার মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক; কারণ এটাই হলো মুমিনের সর্বশেষ কাজ, যার ওপরে তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে।'৮৫
সালাফের কেউ একজন বলেছেন, 'ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, মৃত্যু সত্য; তারপরও সে হাসিখুশি থাকে! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, জাহান্নাম সত্য; তারপরও সে হাসে! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে দেখে, দুনিয়া তার অধিবাসী-সহ নিত্য পরিবর্তন হচ্ছে; তারপরও কীভাবে দুনিয়ার প্রতি নিশ্চিন্ত রয়েছে?! ওই ব্যক্তির বিষয়টা আশ্চর্যজনক, যে জানে, তাকদির সত্য; তারপরও দুনিয়া নিয়ে কীভাবে সে এত ব্যস্ত হয়?'৮৬
এ দুনিয়াতে আমরা আছি। কিন্তু এ দুনিয়াই আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিনতাই করে নিয়েছে। আর আমরা লক্ষ্য হারিয়ে কালক্ষেপণের সমুদ্রে সাঁতার কেটে চলছি। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে নিজের নফস, প্রবৃত্তি আর শয়তানের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আমাদের কল্পনা, আশা-আকাঙ্খা, চিন্তা- চেতনার ওপর বিজয় অর্জন করতে হলে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.- নসিহত আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. আবু হাজিম রহ.-কে বলেন, 'আমাকে উপদেশ দিন।'
আবু হাজিম বললেন, 'তুমি শুয়ে পড়ো। মনে করো, মৃত্যু তোমার শিয়রে। এরপর তুমি লক্ষ করে দেখো, সে সময় তোমার কী করতে মন চায়, সেই কাজটাই এখন করো। সে সময় তোমার কোনটি ত্যাগ করতে মন চাইবে, সেটা এখনই পরিত্যাগ করো।
টিকাঃ
৮১. শারহুস সুদুর: ০৮
৮২. আস-সিয়ার: ৫/৯২
৮৩. আল-আকিবাহ: ৪০
৮৪. মিনহাজুল কাসিদিন: ৪৩১
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/৩১৬
৮৬. মুকাশাফাতুল কুলুব: ১৫৭