📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 ভেবে দেখো, কেমন ছিল সালাফের অন্তিম মুহূর্তের ভাবনাগুলো

📄 ভেবে দেখো, কেমন ছিল সালাফের অন্তিম মুহূর্তের ভাবনাগুলো


হামিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
'একবার হাসান বসরি রহ. মসজিদে অনেক জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি এমনভাবে কাঁদলেন যে, তার দুকাঁধ কাঁপতে লাগল। অতঃপর তিনি বললেন, “তোমাদের অন্তর যদি জীবিত থাকত, মানুষের অন্তরে যদি কল্যাণ থাকত, তাহলে তা তোমাদের এমন রাতের ব্যাপারে ক্রন্দন করাতো; যার সকাল হলো কিয়ামতের দিন। সেটা এমন এক রাত, যা তার সকাল দিয়ে অন্তরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। যে সকাল দিয়ে এমন দিনের শুরু হবে সৃষ্টিকুল তার কথা কখনো শোনেনি। সেদিন সবচেয়ে বেশি গোপন কথা ফাঁস হবে। সেদিন সবার চোখই থাকবে ক্রন্দনরত।””৫৮
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর মৃত্যুর সময় তাঁর গোলাম নাসরকে বললেন, 'আমার মাথাটা মাটির ওপর রাখো।' তখন নাসর কেঁদে ফেলল। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' সে বলল, 'আমি স্মরণ করছি যে, আপনি সারা জীবন কত প্রাচুর্যের মধ্যে কাটালেন! আর এখন এখানে অপরিচিত দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছেন!' তখন তিনি বললেন, 'চুপ করো! আমি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করেছি যে, তিনি যেন আমাকে সমৃদ্ধদের মতো জীবন দান করেন এবং দরিদ্রদের মতো মৃত্যুবরণ করান।' অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা আমাকে কালিমার তালকিন দাও, তোমরা এখন আমার ওপর বাড়াবাড়ি করো না, তাহলে আমি আবার অন্য কথা বলে ফেলব।' ৫৯
আল্লাহু আকবার! তাদের চিন্তা-চেতনার পুরোটা জুড়েই ছিল আখিরাত।
দুনিয়াকে আখিরাতের বাহন, নেকি অর্জনের খেত এবং উচ্চ মর্যাদায় আরোহণের মাধ্যম মনে করতেন তারা। আর এ কারণেই তারা তাদের সময়কে কাজে লাগিয়ে তার থেকে সর্বোচ্চ ফল সংগ্রহ করেছেন। সর্বক্ষণ তারা আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থেকেছেন। তাদের জীবনটা শুধু কল্যাণই কল্যাণময় হয়েছে। তাদের দীর্ঘ জীবনের পুরোটাই আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর অনুগত্যের মধ্যে কেটেছে।

টিকাঃ
৫৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৪৩
৫৯. আল-আকিবাহ: ১৪৫

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 মৃত্যুর স্মরণ

📄 মৃত্যুর স্মরণ


প্রিয় ভাই, মৃত্যু চিরসত্য। মৃত্যুর কথা শুনলে অন্তর কেঁপে ওঠে। আত্মা শুকিয়ে যায়। আমরা চাই, মৃত্যুর আলোচনা কম হোক। আলোচনা শুরু হলে দ্রুত বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু হে মৃত্যু-পথের পথিক, হে একই গন্তব্যের সফরসঙ্গী, মৃত্যুকে অবহেলা করো না। তোমার সামনে মাত্র অল্প কয়েকটি পদক্ষেপই বাকি। এসো, আমরা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের দিকে লক্ষ করি, তিনি বলেছেন, 'আমার অন্তর থেকে মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর স্মরণ পৃথক হলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। '৬৯
আশ্চর্য! সত্যিই আমাদের জন্য এটা বড় আশ্চর্যের। তাঁরা উম্মাহর সে অংশ, যাদের অন্তর জীবন্ত, যাদের কর্ণ সদা জাগ্রত। আল্লাহই আমাদের সহায়। মৃত্যুর স্মরণ তাদের অন্তর থেকে মুহূর্তের জন্যও পৃথক হতো না। অথচ, আমরা এক মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর আলোচনা শুনতে প্রস্তুত নই। কখনো তো এমনও হয় যে, যখন মজলিসে মৃত্যুর আলোচনা হয়, অন্তিম মুহূর্ত নিয়ে কথা হয়, তখন আমাদের অনেকে সেখান থেকে উঠে যায়। এর কারণ কেবলই আখিরাত সম্পর্কে উদাসীনতা, দুনিয়া ও দুনিয়ার অস্থায়ী সুখ-শান্তির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। এটা হয়ে থাকে আখিরাতের আলোচনা থেকে দূরে থেকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাস নিয়ে মত্ত থাকার কারণে। এমনটা হয়ে থাকে আমাদের ওপরে প্রবৃত্তি বিজয়ী থাকলে। আখিরাত থেকে, আখিরাতের আলোচনা থেকে, আখিরাতের স্মরণ থেকে দূরে থাকার ফলে।
মাহদি ইবনে মাইমুন রহ. বলেন,
'আমি হাসসান ইবনে সুফইয়ানকে তার মৃত্যুর সময় দেখলাম, তাকে বলা হলো, “আপনার কেমন লাগছে?” তিনি বললেন, "যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারি, তাহলে তো ভালো।” অতঃপর তাকে বলা হলো, “আপনি কী চান?” তিনি বললেন, “এমন দীর্ঘ একটি রাত, যার শুরু-শেষের মধ্যে অনেক ব্যবধান। আর আমি এর সকল সময়টুকু আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে কাটিয়ে তা জীবিত করতে পারি।"'৬০
তারা মৃত্যুর জন্য সর্বদা এমন প্রস্তুত হয়ে থাকতেন, ঠিক যেমন পথিমধ্যে যানবাহনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী প্রস্তুত হয়ে থাকে। গাড়ির জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী জানে না, কখন তার গাড়ি আসবে; তাই সে গাড়ির অপেক্ষায় থাকে। তারা অনর্থক কাজে সময়ক্ষেপণ করে না। সময় বেশি লাগলেও সেখানে প্রতীক্ষারত থাকে।
মুআজা আল-আদবিয়্যা রহ.। যখন সকাল হতো, তখন তিনি বলতেন, 'এই তো আজকের দিনেই আমি মৃত্যুবরণ করব।' এ বলে তিনি ইবাদতে রত হতেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত আর ঘুমাতেন না। আবার যখন সন্ধ্যা হতো, তখন তিনি বলতেন, 'এই তো আজকের রাতেই আমি মৃত্যুবরণ করব।' এরপর ইবাদতে রত হতেন সকাল পর্যন্ত আর ঘুমাতেন না।৬১
আবুল মুনজির ইসমায়িল ইবনে উমর রহ. বলেন,
'ওয়ারকা ইবনে উমর ইবনে কুলাইব রহ.-এর মৃত্যুর সময় আমরা তার নিকট গেলাম। তখন তিনি কালিমা পড়ছিলেন, তাকবির দিচ্ছিলেন এবং আল্লাহর জিকির করছিলেন। অতঃপর মানুষের ভিড় যখন বেড়ে গেল, তখন তিনি তার ছেলেকে বললেন, “তুমি আমার পক্ষ থেকে মানুষের সালামের উত্তর দিয়ে দিয়ো, যাতে তারা আমাকে আমার রবের স্মরণে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।”'৬২
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. তাঁর অন্তিম মুহূর্তে। মৃত্যুর পূর্বের এ সময়ে তিনি বলেন,
'আমার প্রিয় আমার কাছে এসেছে আমার এ দরিদ্র অবস্থায়। আজকের পূর্বে আমি তোমাকে ভয় পেতাম, অথচ আজ আমি তোমাকে কামনা করি।'৬৩
একবার হাসান রহ. খুব করে কাঁদলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আবু সায়িদ, আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন, 'এই ভয়ে কাঁদছি যে, না জানি আমাকে আবার জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়।'৬৪
সুলাইমান আত-তাইমি রহ. বলেন,
'আমি আমার এক সাথির নিকট গেলাম। তাকে খুবই অস্থির ও উৎকণ্ঠিত দেখতে পেলাম। তার এই অস্থিরতার কারণে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। তখন আমি তাকে বললাম, “তোমার এই উস্থিরতা ও উৎকণ্ঠার কারণ কী? অথচ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তুমি তো ভালো অবস্থায় আছ!” তখন আমার সে বন্ধু বলল, “আমি কেন অস্থির ও উৎকণ্ঠিত হবো না? অস্থির ও উৎকণ্ঠিত হওয়া আমার চেয়ে অধিক আর কার জন্য যথার্থ? আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমাকে যদি ক্ষমা করেও দেওয়া হয়। তবুও আমি এই চিন্তায় লজ্জিত হচ্ছি যে, আমি কী নিয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হবো!””৬৫
আল্লাহু আকবার! তারা আল্লাহ তাআলাকে যথাযথভাবে চিনতে পেরেছিলেন। যথাযথভাবে তাঁর মূল্যায়ন করেছিলেন। তাই তো তারা নিজেদের গুনাহের কারণে লজ্জিত হতেন, পদস্খলনের কারণে লজ্জা পেতেন। তাদের চিন্তা- চেতনার পুরোটা জুড়েই ছিল আখিরাতের চিন্তা। আল্লাহ তাআলার নিকট তাদের আশাও ছিল প্রবল। তাদের হৃৎপিণ্ডের সাথে মিশে গিয়েছিল এই আয়াত,
وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا 'আর যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে, এমন লোকদের চেষ্টা-সাধনা স্বীকৃত হয়ে থাকে।'৬৬
আল্লাহকে পাওয়ার আশা তাদের আরও সামনে তাড়িয়ে নিত। তাদের অন্তরে পদস্খলনের ভয়ও বিরাজ করত।
রাবি ইবনে খুসাইম রহ.। তিনি অসুস্থ হলে লোকেরা তাকে বলল, 'আপনার জন্য কি আমরা ডাক্তার ডাকব না?' কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন,
'আদ জাতি, সামুদ জাতি ও আসহাবুর র'সরা কোথায়? তাদের মধ্যবর্তী সময়ে ও আগে-পরে কত মানুষ এসেছে, কোথায় তারা? তারা তো চলে গেছে। অথচ তাদের নিকট ওষুধও ছিল, ডাক্তারও ছিল। আমি তো কোনো চিকিৎসককেও চিরজীবী হতে দেখি না, আবার কোনো চিকিৎসা- প্রাপ্ত মানুষও সারা জীবন বেঁচে থাকে না। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট একটা সময় আসে, যখন সে চলে যায়।'৬৭
যখন মানুষের ফয়সালার সময় হয়, তখন কোনো চিকিৎসা তার কাজে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِي * وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ * وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ • وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ * إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ ﴾
'কক্ষনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। এবং বলা হবে, কে তাকে রক্ষা করবে? সে মনে করবে, দুনিয়া হতে বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে। এবং পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। সেদিন আপনার পালনকর্তার নিকট সবকিছু নীত হবে। '৬৮
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলতেন,
أَكْثِرُوا ذِكْرَ النَّارِ فَإِنَّ حَرَّهَا شَدِيدٌ، وَإِنَّ قَعْرَهَا بَعِيدُ، وَإِنَّ مَقَامِعَهَا حَدِيدٌ
'তোমরা অধিক পরিমাণে মৃত্যুর স্মরণ করো। কারণ, তার গরম প্রচণ্ড। তার গভীরতা অনেক। তার পেটানোর হাতুড়িটি হবে লোহার।'৭০
ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. অন্তিম মুহূর্তে অচেতন হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বলে উঠলেন,
'হায়, আমার সফর এত দীর্ঘ; অথচ আমার পাথেয় কত কম!'৭১
মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন,
'নিশ্চয়, এই মৃত্যু দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত মানুষদের ভোগ-বিলাস শেষ করে দেয়। সুতরাং তোমরা এমন ভোগ-বিলাস তালাশ করো, যার কোনো মৃত্যু নেই।'৭২
যে নিয়ামত ও ভোগ-উপভোগে মৃত্যুর কোনো ভয় নেই। বলাই বাহুল্য সে নিয়ামত কেবল আখিরাতেই লাভ করা সম্ভব। আর আখিরাতের ভোগ-বিলাস তালাশ করতে হবে আল্লাহ তাআলার দিকে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করে। যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত করার মাধ্যমে। যেমনটি আলা ইবনে জিয়াদা রহ. বলেন,
'মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তি যেমনি করে দুনিয়ার সকল মায়া-মমতা ভুলে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে। ঠিক তেমনিভাবে তোমরা সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করবে। নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করেন। ক্ষমা প্রাপ্তির পর সে যেন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে। আমাদেরও এমনই হতে হবে। '৭৩
আমরা যদি আমাদের এই স্তরে রাখি। নিজেদের আমরা এই অবস্থানে দাঁড় করাই। তাহলে অবশ্যই আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে। অবশ্যই আমাদের আমল সংশোধন হবে। প্রিয় ভাই, সালাত আদায়ের পূর্বে মনে কোরো, এটাই তোমার জীবনের শেষ সালাত। মনে কোরো, মৃত্যু খুবই নিকটবর্তী। মৃত্যুর স্মরণ তোমার আমলকে সংশোধন করবে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা দূর করবে।
দুনিয়াকে তুচ্ছ করে দেখো। আখিরাতের চিন্তা-ফিকির তোমার অন্তরে গেঁথে নাও। আখিরাতের জন্যই হোক তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা।
ভয় ও আশাকে তোমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে নাও। আমল ও আস্থা অনুভব করো। কারণ, এই ভয়ের পরেই রয়েছে চিরনিরাপত্তা। এই পরিশ্রম ও ক্লান্তির পরেই রয়েছে চিরসুখ। এ আমল ও চেষ্টা-সাধনার পরই তো চিরপ্রশান্তি, যার কোনো শেষ নেই।
মুমিনের আজকের ভয় তার জন্য আগামীকালের নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। সে যদি এ ভয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, নেক আমল করে, তাহলে এটা তার জন্য আগামীকালের নিরাপত্তা ও সুখ নিয়ে আসবে।

টিকাঃ
৬০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১১৭
৬১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২২
৬২. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/২৩০
৬৩. আল-আকিবাহ: ১৪৬
৬৪. আজ জাহরুল ফায়িহ: ৯১
৬৫. তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ৮৮
৬৬. সুরা ইসরা: ১৯
৬৭. আল-আকিবাহ: ১১৯
৬৮. সুরা কিয়ামাহ: ২৬-৩০
৬৯. আল-আকিবাহ: ৩৯
৭০. আল-হাসান আল-বসরি : ১০৮
৭১. আল-আকিবাহ: ১৩৩
৭২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২২৪
৭৩. আল-আকিবাহ: ৯০

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 অন্তিম বিদায়ের পর আর ফিরে আসা যাবে না

📄 অন্তিম বিদায়ের পর আর ফিরে আসা যাবে না


এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর বিস্তৃত নিয়ামত দান করছেন। সকাল-সন্ধ্যা আমাদের ওপর বর্ষিত হচ্ছে তাঁর অগণিত নিয়ামত। কিন্তু আমরা আমাদের এই জীবনকে নষ্ট করে দিচ্ছি আমাদের সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যের বিপরীত করে। এভাবে উদ্দেশ্যের বিপরীত চলতে চলতে একসময় মৃত্যু আসে। তখন আমাদের কেউ কেউ চিৎকার করে করে বলবে,
رَبِّ ارْجِعُونِ ﴾
'হে আমার রব, আমাকে আবার দুনিয়াতে ফেরত পাঠান।'৭৪
কেন তোমাকে ফেরত পাঠানো হবে? কেন তুমি ফিরে আসবে? অথচ, তুমি এই দুনিয়াতে অনেক সময়ই পেয়েছ। কেন তুমি এ সময়গুলো দুনিয়া কামানোর জন্যই ব্যয় করে দিলে? তুমি কি ভুলে কোনো কিছু রেখে গেছ যে, আবার তুমি ফিরে আসবে? তোমার জীবনের এতগুলো বছর অতিবাহিত হলো। তুমি গাফিলই রয়ে গেলে। তোমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদাসীন রইলে। আর এখন চাইছ, দুনিয়াতে ফিরে আসতে? আমাদের উত্তর হবে, হ্যাঁ, আমি ফিরে আসতে চাইব। যেন...
لَعَلَّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ )
'যেন আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।'৭৫
কিন্তু আজ কোথায় তুমি? সেদিন তোমার এমন উপলব্ধি আসবে, এখন কেন আসছে না? আজ তুমি আমল থেকে দূরে কেন? তোমার হাতে এখন অনেক সময়; তবুও কেন তুমি আমল থেকে দূরে?

টিকাঃ
৭৪. সুরা মুমিনুন: ৯৯
৭৫. সুরা মুমিনুন: ১০০

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 রওয়ানা কোন দিকে?

📄 রওয়ানা কোন দিকে?


জাবির ইবনে জাইদ রহ.-কে তার মৃত্যুর পূর্বে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তুমি কী চাও?' তিনি বললেন,
'আমি হাসানকে এক পলক দেখতে চাই।' হাসান বসরি রহ. তার কাছে এলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'এই তো হাসান তোমার নিকটে।' তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে ভাই, এটিই সে সময়। এটি সে মুহূর্ত। আমি তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে রওয়ানা করছি, হয়তো জান্নাতের দিকে নয়তো জাহান্নামের দিকে।'
مَا هِيَ إِلَّا جَنَّةٌ وَنَارٌ * أَفْلَحَ مَن كَانَ لَهُ اعْتِبَارٌ
'জান্নাতে যাওয়ার উপায় কী? জাহান্নামে পতিত হওয়ার কারণই বা কী? দুটোর মাঝে এই তো পার্থক্য— যে শিক্ষা নিয়েছে সে-ই পেয়েছে সাফল্য।'
হ্যাঁ, এটাই সত্য কথা। আখিরাতে দুটি রাস্তা আছে। একটি চলে গেছে জান্নাতের দিকে, আরেকটি জাহান্নামের দিকে। যাদের গন্তব্য জান্নাত, আর যাদের গন্তব্য জাহান্নাম—তারা পরস্পর সমান নয়। কারণ,
﴿أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُونَ ﴾
'জান্নাতের অধিবাসীরাই সফল।' ৭৬
মুজানি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'ইমাম শাফি রহ. অসুস্থ হলে আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। এটাই ছিল তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সে রোগেই তিনি ইনতেকাল করেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেমন আছেন?” তিনি বললেন,
“দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে আখিরাতের দিকে রওয়ানা হচ্ছি। মৃত্যুর পেয়ালা পান করছি। আমি অচিরেই আমার খারাপ আমলগুলো দেখতে পাব। আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট পেশ করা হবে। আমি জানি না, আমার আত্মা জান্নাতে যাবে? যদি জান্নাতে যায়, তাহলে তাকে অভিনন্দন। নাকি আমার আত্মা জাহান্নামের দিকে যাবে? যদি তা জাহান্নামের দিকে যায়, তাহলে তার জন্য ক্রন্দন করছি।” অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন।' ৭৭
অন্তিম মুহূর্তে নাফি' রহ. কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি সা'দ রা.-কে স্মরণ করছি। কবরের চাপের কথা স্মরণ করছি।'
অর্থাৎ, আমি এ হাদিসের কথা স্মরণ করছি-আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ لِلْقَبْرِ ضَغْطَةٌ وَلَوْ كَانَ أَحَدٌ نَاجِيًا مِنْهَا نَجَا مِنْهَا سَعْدُ بْنُ مُعَادٍ
'কবরের চাপ রয়েছে। যদি কেউ তা থেকে মুক্তি পেত, তাহলে সা'দ ইবনে মুআজ মুক্তি পেত।'৭৮
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. আমাদেরকে আমাদের পরিণাম, গন্তব্য ও এই দুনিয়া থেকে আমাদের পৃথক হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন,
'তোমরা কি দেখছ না, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা কাউকে না কাউকে তোমরা আল্লাহ তাআলার দিকে বিদায় জানাচ্ছ। তোমরা তাকে মাটির ফাটলে রেখে আসছ। সে মাটিকে বিছানা বানিয়েছে। প্রিয়জনদের রেখে গেছে। পৃথক হয়ে গেছে ধন-সম্পদ থেকে।'৭৯
আব্দুল্লাহ ইবনে আলি রহ.। মৃত্যুক্ষণ ঘনিয়ে এলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি কাঁদছি পেছনের দিনগুলোতে আমার অপরাধের কারণে। সুউচ্চ জান্নাতের জন্য আমার পাথেয় কম থাকার কারণে। কোন জিনিস আমাকে উত্তপ্ত জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে, তা ভেবে কাঁদছি আমি।'৮০
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা এতটা মূল্যায়ন করার পর, সময়কে এত সুন্দর করে আমলে ব্যাপৃত রাখার পরও সারাক্ষণ কতটা ভয়ের মধ্যে থাকতেন। আর আমরা?

টিকাঃ
৭৬. সুরা হাশর: ২০
৭৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫৮; আস সিয়ার: ১০/৭৬
৭৮. আস-সিয়ার: ৫/৯৯
৭৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮০
৮০. আল-আকিবাহ: ১৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00