📄 একজন সাহাবির অন্তরের আহ্বান শোনো
প্রিয় ভাই,
আবু দারদা রা.-এর অন্তরের সত্য অভিব্যক্তিগুলো শোনো। শোনো তাঁর অন্তরের আহ্বান। তিনি অন্তিম মুহূর্তের সে সময়টিতে বলতে শুরু করলেন,
'কোনো লোক কি নেই, যে আমার মতো এমন পতনের সময়ের জন্য আমল করবে? কেউ কি নেই, যে আমার এই সময়ের মতো সময়ের জন্য আমল করবে? কেউ কি নেই, যে এই দিনের মতো দিনের জন্য আমল করবে? এ বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি কাঁদছেন? অথচ আপনি রাসুলুল্লাহ-এর সাহাবি!” উত্তরে তিনি বললেন, “আমি কেন কাঁদব না? আমি তো জানি না যে, আমার গুনাহের কারণে আমাকে কোথায় নিক্ষেপ করা হবে?"'
এমন নিষ্ঠাপূর্ণ আহ্বানের সাড়া কোথায়, যা মুমিনের অন্তরকে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা? এমন নিষ্ঠাপূর্ণ আহ্বানের সাড়া কোথায়, যা প্রত্যেক মানুষের নিকট আগুয়ান একটি মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়? নিশ্চয় তা এমন মুহূর্ত, উদাসীনতা যাকে আড়াল করে রেখেছে। কালক্ষেপণ যার ওপর পর্দা টেনে দিয়েছে। ফলে আশা অনেক দীর্ঘ হয়েছে। আর আমল অনেক কমে গেছে। দূরবর্তী হয়ে গেছে তাওবার সকাল।
টিকাঃ
৫২. আস-সিয়ার: ২/৩৬৮
📄 আল্লাহর ভয়েই তারা এমনটি ভাবতেন
আবু সুলাইমান আদ-দারানি রহ. বলেন, 'আমি আবিদা উম্মে হারুনকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি মৃত্যুকে পছন্দ করেন?” তিনি বললেন, “না।” আমি বললাম, “কেন?” তিনি উত্তর করলেন, “আল্লাহর শপথ, আমি যদি কোনো মাখলুকের অবাধ্য হই, তবে তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করি।...তাহলে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে কীভাবে সাক্ষাতের সাহস করতে পারি?””৫৩
শুমাইত ইবনে আজলান বলেন, 'এ পৃথিবীতে মানুষ দুপ্রকার, এক. দুনিয়া থেকে পাথেয় সংগ্রহকারী। দুই. দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত বা দুনিয়াঅর্জনকারী। সুতরাং ভেবে দেখো, তুমি এ দুপ্রকারের কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত? আমি তো দেখছি, তুমি দুনিয়াতে দীর্ঘ দিন থাকতে চাও। কেন তোমার এমন চাওয়া? তুমি কি আল্লাহর আনুগত্য পালন, ভালোভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করা এবং নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এটা চাও? যদি তোমার চাওয়া এ উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে, তবে তোমার জন্য সুসংবাদ। না তুমি খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, আনন্দ-ফূর্তি আর স্ত্রী-সন্তানদের সাথে উপভোগের জন্য, দুনিয়া কামানোর জন্য দীর্ঘ সময় দুনিয়াতে থাকতে চাও? তবে তো তোমার এই দীর্ঘায়ু কামনা কতই না নিকৃষ্ট।'
হে ভাই, আমাদের তো ওই দুনিয়াবিমুখের কথার মতো হওয়া উচিত, যিনি বলেছেন,
টিকাঃ
৫৩. আল-আকিবাহ: ৩০
📄 আমলনামা খোলা থাকতেই আমল করে নাও
'প্রতিটি মৃত ব্যক্তির অবস্থার মধ্যে আমাদের জন্য নসিহত রয়েছে। আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে চিন্তা-ভাবনায়।'৫৪
হামিদ আত-তাবিল রহ. দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করলেন, লোকেরা তাঁর অবস্থা ইবনে আওন রহ.-কে বলল। ইবনে আওন বললেন, 'হামিদ ভবিষ্যতের জন্য যা পাঠিয়েছে তার মুখাপেক্ষী সে।'৫৫
আবুস সাওর হাসান ইবনে হারিস রহ. এই আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন,
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ
"আমি প্রত্যেক লোকের ভাগ্য তার কাঁধেই ঝুলিয়ে রেখেছি (অর্থাৎ তার ভাগ্যের ভালো-মন্দের কারণ তার নিজের মধ্যেই নিহিত আছে)।”৫৬
তা দু'বার খোলা হবে এবং একবার ভাঁজ করে গুটিয়ে রাখা হবে। হে আদম সন্তান, তুমি যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন তোমার আমলনামা খোলা থাকবে। তুমি চিন্তা করে দেখো, তুমি কী করবে? যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে, তখন তা আবার গুটিয়ে রাখা হবে। এরপর কিয়ামতের দিন তা আবার খোলা হবে।'৫৭
মানুষের আমলনামা তার মৃত্যু পর্যন্ত লেখা হয়। মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমলনামা হিসেবের জন্য গুটিয়ে রাখা হয়। সুতরাং আমাদের আমলনামা এখন খোলা। তাতে আমল লেখা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কী লেখা হচ্ছে? সেখানে কি নেক আমল, মাকবুল ইবাদত লেখা হচ্ছে? না লেখা হচ্ছে অন্য কিছু? আমাদের কেউ যদি খাতা-কলম নিয়ে নিজের একটি ঘণ্টার সমস্ত কথা ও কাজ লিপিবদ্ধ করে রাখে, তারপর সেটা আবার পড়ে দেখে; তবে সে তার অবস্থা জানতে পারবে এবং জীবিত অবস্থায় নিজের আমলনামা দেখতে পাবে!
এতে করে হয়তো সে তার পদস্খলনগুলো ঠিক করতে পারবে। ফিরে আসতে পারবে তার ভ্রষ্টতা থেকে। এবং তাওবা করে উত্তমরূপে নেক আমল করতে পারবে।
টিকাঃ
৫৪. আল-আকিবাহ: ৪৩
৫৫. তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/১৫২
৫৬. সুরা ইসরা: ১৩
৫৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৩০
📄 ভেবে দেখো, কেমন ছিল সালাফের অন্তিম মুহূর্তের ভাবনাগুলো
হামিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
'একবার হাসান বসরি রহ. মসজিদে অনেক জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি এমনভাবে কাঁদলেন যে, তার দুকাঁধ কাঁপতে লাগল। অতঃপর তিনি বললেন, “তোমাদের অন্তর যদি জীবিত থাকত, মানুষের অন্তরে যদি কল্যাণ থাকত, তাহলে তা তোমাদের এমন রাতের ব্যাপারে ক্রন্দন করাতো; যার সকাল হলো কিয়ামতের দিন। সেটা এমন এক রাত, যা তার সকাল দিয়ে অন্তরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। যে সকাল দিয়ে এমন দিনের শুরু হবে সৃষ্টিকুল তার কথা কখনো শোনেনি। সেদিন সবচেয়ে বেশি গোপন কথা ফাঁস হবে। সেদিন সবার চোখই থাকবে ক্রন্দনরত।””৫৮
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর মৃত্যুর সময় তাঁর গোলাম নাসরকে বললেন, 'আমার মাথাটা মাটির ওপর রাখো।' তখন নাসর কেঁদে ফেলল। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' সে বলল, 'আমি স্মরণ করছি যে, আপনি সারা জীবন কত প্রাচুর্যের মধ্যে কাটালেন! আর এখন এখানে অপরিচিত দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছেন!' তখন তিনি বললেন, 'চুপ করো! আমি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করেছি যে, তিনি যেন আমাকে সমৃদ্ধদের মতো জীবন দান করেন এবং দরিদ্রদের মতো মৃত্যুবরণ করান।' অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা আমাকে কালিমার তালকিন দাও, তোমরা এখন আমার ওপর বাড়াবাড়ি করো না, তাহলে আমি আবার অন্য কথা বলে ফেলব।' ৫৯
আল্লাহু আকবার! তাদের চিন্তা-চেতনার পুরোটা জুড়েই ছিল আখিরাত।
দুনিয়াকে আখিরাতের বাহন, নেকি অর্জনের খেত এবং উচ্চ মর্যাদায় আরোহণের মাধ্যম মনে করতেন তারা। আর এ কারণেই তারা তাদের সময়কে কাজে লাগিয়ে তার থেকে সর্বোচ্চ ফল সংগ্রহ করেছেন। সর্বক্ষণ তারা আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থেকেছেন। তাদের জীবনটা শুধু কল্যাণই কল্যাণময় হয়েছে। তাদের দীর্ঘ জীবনের পুরোটাই আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর অনুগত্যের মধ্যে কেটেছে।
টিকাঃ
৫৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৪৩
৫৯. আল-আকিবাহ: ১৪৫