📄 আমরা কেমন সংবাদ পাবার আশা রাখি
মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির তাঁর মৃত্যুর সময় অনেক কাঁদছিলেন। এ সময় তাঁকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, নিষেধ করেছেন, কিন্তু আমি অবাধ্য হয়েছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন; তাহলে আপনি আমার ওপর দয়া করলেন। আর যদি আমাকে শাস্তি দেন; তাহলে আপনি কোনো জুলুমকারী নন।'৪৭
সায়িদ ইবনে মুসায়্যিবকে প্রশ্ন করা হলো, 'এ সকালে কেমন বোধ করছেন?' তিনি বললেন,
'আমি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।'৪৮
মৃত্যু কখন এসে পড়ে, যারা এর খবর জানে না, তাদের প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব হলো, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। কেউ যেন তার যৌবন আর সুস্থতার মাধ্যমে প্রতারিত না হয়। কেননা, বৃদ্ধ মানুষ খুব কমই মারা যায়। যুবকদের মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি। বরং অতি বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করাটা তো একটা বিরল ঘটনার মতো।
কেউ কি এটা জানে যে, মৃত্যু কখন তার ওপর এসে পড়বে? কখন মৃত্যু এসে তার জীবনের ওপর ভয়ংকর থাবা বসাবে? অবশ্যই এর উত্তর হবে, না। তাহলে তুমি প্রস্তুত হও সে সময়ের জন্য, যখন তোমার রক্ত চলাচল থেমে যাবে। তোমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আর তুমি এই পৃথিবী থেকে আখিরাতের দিকে যাত্রা শুরু করবে।
ইমরান আল খাইয়াত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবারহিম নাখয়িকে দেখতে আমরা তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তখন তিনি কাঁদছিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, “আপনি কাঁদছেন কেন?” তিনি বললেন,
“আমি মালাকুল মাওতের অপেক্ষা করছি, কিন্তু আমি জানি না যে, আমাকে কি জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হবে না জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেওয়া হবে!”৪৯
হ্যাঁ, তিনি সত্যিই বলেছেন। এই দুনিয়ার পর হয়তো জান্নাত, নয়তো জাহান্নাম। কিন্তু আমরা কি একবারও এটা চিন্তা করেছি যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? কোন পথে চলছি? আমাদের ওপর তো ভর করেছে কালক্ষেপণ, অমনোযোগিতা, মিথ্যে আশা আর আলস্যে ভরা ঘুম। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে জাগিয়ে তুলুন। আমাদের অন্তরকে পরিপূর্ণ ইমানে সজ্জিত করুন। আমাদের সুস্থ বিবেচনা শক্তি দান করুন।
প্রিয় ভাই, তুমি সতর্ক হও।
অপেক্ষা করো, সামনেই মৃত্যুর যন্ত্রণা অপেক্ষা করছে। শত হাজার দক্ষ ডাক্তার এসেও চিকিৎসা করতে পারবে না এ যন্ত্রণার।
টিকাঃ
৪৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯১
৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৮৩
৪৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৮৯
📄 আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি
প্রিয় ভাই,
জনৈক সালাফের মৃত্যুক্ষণ ঘনিয়ে এল। তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাকে বলা হলো, হে অমুক, তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও? তখন তিনি বললেন, 'হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়া অনেক কঠিন!'
আল্লাহু আকবার! দুনিয়ার কোনো মানুষের সামনে যাওয়ার আগে আমরা শত হিসেব-নিকেশ করে তারপর যাই। একটু সময় নিয়ে নিজেদের বেশভূষা পরিবর্তন করে, ভালোভাবে সেজেগুজে তারপর তাদের সামনে উপস্থিত হই। অথচ, তারা তো আমাদের মতোই মানুষ। তাদের সামনে উপস্থিত হতে আমাদের এমন প্রস্তুতি হলে, বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে যাওয়ার জন্য কীরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত? অন্যদিকে আমরা যে কত ভুল আর পদস্খলনের মধ্যে আছি, কতটা গুনাহ আর অবাধ্যতার মধ্যে ডুবে আছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এর হিসেব একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
হে ভাই, তোমার কী অভিমত? আমরা দুনিয়ার সামান্য পরীক্ষার জন্য কত প্রস্তুতি গ্রহণ করি। মূল্যবান-অমূল্যবান সবকিছুই এর পেছনে ব্যয় করি। ত্যাগ করি এর জন্য জীবনের মূল্যবান অনেক কিছুই। কিন্তু আখিরাতের প্রশ্নকে আমরা কিছুই মনে করি না! অথচ, আল্লাহর শপথ, সেটাই হলো আমাদের মহা সফলতা কিংবা চিরক্ষতির সূচনা।
আবু মাসউদ আল-আনসারি রা.-কে প্রশ্ন করা হলো, 'হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. মৃত্যুর সময় কী বলেছিলেন?'
তিনি বলেন, 'যখন সাহরির সময় হলো, তিনি বললেন,
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের তাঁর সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দান করুন। মৃত্যুর জন্য, তার কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য যারা প্রস্তুতি নেন, তাদের মতো হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের সালাফে সালেহিনের মতো হওয়ার তাওফিক দান করুন। জুনাইদ রহ. মৃত্যুকাতর অবস্থাতেও কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন, সালাত আদায় করছিলেন। এমনকি তিনি সে অবস্থাতেই কুরআন খতম করলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'হে আবু আলি, এ অবস্থাতেও আপনি এত ইবাদত করছেন?' তিনি বললেন, 'আমার চেয়ে এর উপযুক্ত আর কে আছে? এই তো কিছু সময় পর আমার আমলনামা বন্ধ হয়ে যাবে।' অতঃপর তিনি তাকবির দিলেন। এর পরেই মৃত্যুর পেয়ালা পান করলেন।৫০
মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসি' রহ.। মৃত্যুসজ্জায় তিনি। এ সময় বললেন,
'হে আমার ভাইয়েরা, তোমরা কি জানো, আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? সেই আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আমাকে হয়তো জাহান্নামের দিকে নেওয়া হবে অথবা আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।' ৫১
টিকাঃ
৫০. আল-আকিবাহ: ১৩৩
৫১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/২৭২
📄 একজন সাহাবির অন্তরের আহ্বান শোনো
প্রিয় ভাই,
আবু দারদা রা.-এর অন্তরের সত্য অভিব্যক্তিগুলো শোনো। শোনো তাঁর অন্তরের আহ্বান। তিনি অন্তিম মুহূর্তের সে সময়টিতে বলতে শুরু করলেন,
'কোনো লোক কি নেই, যে আমার মতো এমন পতনের সময়ের জন্য আমল করবে? কেউ কি নেই, যে আমার এই সময়ের মতো সময়ের জন্য আমল করবে? কেউ কি নেই, যে এই দিনের মতো দিনের জন্য আমল করবে? এ বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি কাঁদছেন? অথচ আপনি রাসুলুল্লাহ-এর সাহাবি!” উত্তরে তিনি বললেন, “আমি কেন কাঁদব না? আমি তো জানি না যে, আমার গুনাহের কারণে আমাকে কোথায় নিক্ষেপ করা হবে?"'
এমন নিষ্ঠাপূর্ণ আহ্বানের সাড়া কোথায়, যা মুমিনের অন্তরকে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা? এমন নিষ্ঠাপূর্ণ আহ্বানের সাড়া কোথায়, যা প্রত্যেক মানুষের নিকট আগুয়ান একটি মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়? নিশ্চয় তা এমন মুহূর্ত, উদাসীনতা যাকে আড়াল করে রেখেছে। কালক্ষেপণ যার ওপর পর্দা টেনে দিয়েছে। ফলে আশা অনেক দীর্ঘ হয়েছে। আর আমল অনেক কমে গেছে। দূরবর্তী হয়ে গেছে তাওবার সকাল।
টিকাঃ
৫২. আস-সিয়ার: ২/৩৬৮
📄 আল্লাহর ভয়েই তারা এমনটি ভাবতেন
আবু সুলাইমান আদ-দারানি রহ. বলেন, 'আমি আবিদা উম্মে হারুনকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি মৃত্যুকে পছন্দ করেন?” তিনি বললেন, “না।” আমি বললাম, “কেন?” তিনি উত্তর করলেন, “আল্লাহর শপথ, আমি যদি কোনো মাখলুকের অবাধ্য হই, তবে তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করি।...তাহলে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে কীভাবে সাক্ষাতের সাহস করতে পারি?””৫৩
শুমাইত ইবনে আজলান বলেন, 'এ পৃথিবীতে মানুষ দুপ্রকার, এক. দুনিয়া থেকে পাথেয় সংগ্রহকারী। দুই. দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত বা দুনিয়াঅর্জনকারী। সুতরাং ভেবে দেখো, তুমি এ দুপ্রকারের কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত? আমি তো দেখছি, তুমি দুনিয়াতে দীর্ঘ দিন থাকতে চাও। কেন তোমার এমন চাওয়া? তুমি কি আল্লাহর আনুগত্য পালন, ভালোভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করা এবং নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এটা চাও? যদি তোমার চাওয়া এ উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে, তবে তোমার জন্য সুসংবাদ। না তুমি খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, আনন্দ-ফূর্তি আর স্ত্রী-সন্তানদের সাথে উপভোগের জন্য, দুনিয়া কামানোর জন্য দীর্ঘ সময় দুনিয়াতে থাকতে চাও? তবে তো তোমার এই দীর্ঘায়ু কামনা কতই না নিকৃষ্ট।'
হে ভাই, আমাদের তো ওই দুনিয়াবিমুখের কথার মতো হওয়া উচিত, যিনি বলেছেন,
টিকাঃ
৫৩. আল-আকিবাহ: ৩০