📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 চোখদুটি বন্ধ করে ভাবো কিছুক্ষণ

📄 চোখদুটি বন্ধ করে ভাবো কিছুক্ষণ


হে ভাই, একটু বসো। চোখদুটি বন্ধ করে একটু ভাবো। তোমার মৃত্যুর সময় হয়েছে। মৃত্যুর ফেরেশতা তোমার দরজায় তোমার খোঁজ করছে। সে তোমার জান কবজ করবে। তোমাকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। কি ভয় হচ্ছে? পালাবার কোনো পথ পাচ্ছ না?
হ্যাঁ, মৃত্যু যখন আসবে, তখন এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি ভয় পেয়ে যাবে, সবকিছু ভুলে কেবল মৃত্যু নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর এটা তো হবে দুনিয়ার অবস্থা, মৃত্যুর পূর্বের অবস্থা। আর বিষয়টি ঘটবেই, মৃত্যু আসবেই। তোমার পূর্বে যারা ছিল, তাদের আঙিনায় মৃত্যু নেমে এসেছে। তোমার আঙিনায়ও মৃত্যু নেমে আসবে। আমাদের সকলকেই আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই দণ্ডায়মান হওয়ার ব্যাপারে তোমার মনে কোনো ধারণা আছে কি? এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছ কি? কীভাবে নিয়েছ প্রস্তুতি? আল্লাহর সামনে সেই দণ্ডায়মান হওয়াটা হবে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর। তখন তোমার প্রতিটি সময় প্রতিটি মুহূর্তের হিসেব নেওয়া হবে। হিসেব নেওয়া হবে তোমার প্রতিটি ভালো কাজ ও মন্দ কাজের। এমনভাবে হিসেব নেওয়া হবে, অণু পরিমাণ কোনো কিছুই বাদ পড়বে না। সবকিছুই হিসেবের আওতায় আসবে। কমও করা হবে না, বেশিও আনা হবে না। তোমার আমলনামায় যতটুকু আছে ঠিক ততটুকুই।
ইবনে হাজিম রহ. কে প্রশ্ন করা হলো, 'আল্লাহ তাআলার সামনে উপস্থিত হওয়ার সময় মানুষের অবস্থা কেমন হবে?' তিনি বলেন,
'আল্লাহর অনুগত বান্দার উপস্থিতিটা হবে, পরিবার থেকে দূরে থাকা এমন লোকের মতো, যার আগমনের জন্য পরিবারের সকলে আগ্রহী। আর আল্লাহর অবাধ্য বান্দার অবস্থা হবে পলায়নকারী গোলাম তার ক্রুদ্ধ মালিকের নিকট ফিরে আসার মতো।'
প্রিয় ভাই, আমাদের উচিত আলা ইবনে গাদাবি রহ.-এর নিম্নের বাণীটি নিয়ে একটু চিন্তা করা। তিনি বলেন,
'তোমরা প্রত্যেকে নিজেকে এমন ব্যক্তির অবস্থানে রাখবে, যার মৃত্যু উপস্থিত হয়েছে। সে আল্লাহ তাআলার নিকট ইবাদতের জন্য কিছু সময় চেয়েছে আর আল্লাহ তাআলাও তাকে কিছু সময়ের জন্য সুযোগ দিয়েছেন। সে সময়টুকুতে সে যেভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর কাছে নিজের কৃত ভুলের জন্য তাওবা করবে। তুমিও ঠিক তার মতোই আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করো এবং তাঁর কাছে তাওবা করো।'৪১
হে ভাই, তুমি এখন থেকেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। পরকালের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করো। তুমি সে সকল লোকের মতো হও, যারা মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুতি নিতেন, যারা পরকালের জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় করতেন।
বর্তমানে আমাদের অবস্থা হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে নিজেকে অপরাধীর নাম দিয়েছে। তাকে বলা হলো, আপনার অবস্থা কী? উত্তরে তিনি বললেন,
'সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হতে পারে, যে দীর্ঘ সফরে যেতে চায়, কিন্তু তার কোনো উপায়-উপকরণ নেই। সে কোনো সঙ্গী ছাড়াই একাকী কবরে প্রবেশ করবে। এক ন্যায়পরায়ণ বাদশার সামনে নিজের পক্ষের কোনো দলিল ছাড়াই দণ্ডায়মান হবে। '৪২
জনৈক সালাফ বলেন, 'আতা আস-সুলামি মুমূর্ষু অবস্থায়। এ রোগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সে সময় আমি তাকে দেখতে গেলাম। আমরা তাকে বললাম, “আপনার কী অবস্থা?” তিনি বললেন,
“মৃত্যু আমার কাঁধের ওপর। কবর আমার সামনে। কিয়ামত আমার থামার স্থান। জাহান্নামের ওপরে সেতু হয়ে এগিয়ে গিয়েছে আমার রাস্তা। আমি জানি না, আমার কী হবে?"
এরপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে অচেতন হয়ে গেলেন। যখন তার জ্ঞান ফিরল, তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“হে আল্লাহ, আপনি আমার ওপর দয়া করুন। মৃত্যুর ভয়াবহতা থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কবরে একাকী থাকার সময় আমার ওপর দয়া করুন। হে দয়াময়, আপনার সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার সময় আমার ওপর রহম করুন।"'
হে ভাই, জেনে রেখো। মৃত্যু সমাগত। মৃত্যুযন্ত্রণা সামনে তোমার জন্য অপেক্ষমাণ। অথচ তুমি উদাসীন রয়েছ! এখন মৃত্যু নিয়ে মানুষ কথা বলে না। মৃত্যু নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করে না। তারা এ সম্পর্কে একেবারে উদাসীন হয়ে রয়েছে। কখনো কখনো যদিও মৃত্যুর আলোচনা করেও; তবুও তা তাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে হয় না। বরং তা হয় দুনিয়ার কামনা ও ব্যস্ততার পঙ্কিলতায় ভরপুর মন নিয়ে। ফলে এ আলোচনা অন্তরের মাঝে কোনো আবেদন সৃষ্টি করে না। হৃদয়ের গভীরে কোনো প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় না। কোনো পরিবর্তন আনে না মানুষের জীবনে।
অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মৃত্যুর ভয় প্রবেশের মাধ্যম হলো, অন্তর থেকে দুনিয়ার সকল চিন্তা বের করে শুধু আখিরাত ও মৃত্যুর চিন্তা করতে হবে। মৃত্যু তো তার একেবারে সামনে। মৃত্যুর চিন্তায় সর্বদা চিন্তিত ও ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে হবে। ঠিক যেমন নির্জন ভয়ংকর প্রান্তর অতিক্রমকারী মুসাফির সর্বদা বিপদের ভয় করতে থাকে। অথবা সমুদ্রে ভ্রমণকারী লোকের মতো যে সর্বদা তার সফর নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অন্য কোনো চিন্তা তার মধ্যে প্রবেশ করে না। ৪৩
অথবা এ ক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে, হাসান বসরি রহ.-এর মতো হওয়ার মাধ্যমে। হাসান বসরি রহ. এক লোককে তার মৃত্যুসজ্জায় দেখতে গেলেন। তখন তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তিনি মৃত্যুর কষ্ট ও যন্ত্রণা কাছ থেকে দেখলেন। বাড়ি ফিরে তার অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। বাড়ি থেকে যে অবস্থায় বের হয়েছিলেন, এখন আর তিনি সে রকম নেই। তিনি খাওয়া-দাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে গেলেন। পরিবারের লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। অন্তত খাবারটুকু তো গ্রহণ করুন।' তখন তিনি বললেন, 'হে পরিবারের লোকেরা, তোমরা তোমাদের খানাপিনা নিয়ে থাকো। আল্লাহর শপথ, আমি এমন মৃত্যু দেখেছি! আমি তার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকব, যতক্ষণ না আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করি। '৪৪

টিকাঃ
৪১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/২৪৪
৪২. আল-ইহইয়া: ২/২৫১
৪৩. আল-ইহইয়া: ৪/৪৭৯
৪৪. আত-তাজকিরাহ: ১৪

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 নিজ হাতে কাফন প্রস্তুত করার ঘটনা

📄 নিজ হাতে কাফন প্রস্তুত করার ঘটনা


মুমিনগণ নেক আমলের মাধ্যমে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট আশা পোষণ করার মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই তো তারা নিজেরা নিজেদের কাফনের কাপড় নিজ হাতে ভাঁজ করে রাখেন এবং কবরের মহা যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন।
উম্মুল মুমিনিন জাইনাব বিনতে জাহশ রা.-এর যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলো, তখন তিনি বললেন, 'আমি আমার কাফন প্রস্তুত করে রেখেছি। আমিরুল মুমিনিন উমর রা. যদি আমার জন্য কাফনের কাপড় পাঠায়, তাহলে তোমরা দুটির একটি সদাকা করে দেবে। আর তোমরা যখন আমার জানাজা ওঠাবে, তখন যদি আমার অবশিষ্ট সম্পদগুলো সদাকা করে দিতে পারো; তবে তাই কোরো...।'
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আজিজ আল-উমরি রহ. তার মৃত্যুর সময় বলেন,
'আমি আমার প্রতিপালকের অনেক বড় একটা নিয়ামতের কথা বলব, আমি গাছের ছাল ও তার কাঠ কেটে সাত দিরহাম বা এরকম কিছুর মালিক হয়েছি। আমার প্রতিপালকের আরেকটি নিয়ামতের কথা বলব, যদি দুনিয়ার সকল ধন-সম্পদ আমার পায়ের নিচে এসে ভিড় করত, তবুও আমি তা থেকে আমার পা সরিয়ে নিতাম। আর যেমনটি আমি সরিয়ে নিয়েছি। '৪৫

টিকাঃ
৪৫. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ১৫৩

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 দুনিয়াতে আমাদের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী?

📄 দুনিয়াতে আমাদের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী?


মুগিরা ইবনে হাবিব রহ. বলেন,
'আমরা মালিক ইবনে দিনার রহ.-কে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে গেলাম। তিনি বালিশ থেকে মাথা উঠিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি এই দুনিয়াতে পেট আর লজ্জাস্থানের চাহিদা মেটাবার জন্য বেঁচে থাকতে চাই না।””৪৬
আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন। আমাদের আর তাঁদের মধ্যে কত বিশাল পার্থক্য! তাঁরা দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে চাইতেন, আরও বেশি আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর আনুগত্য করার জন্য। আর বর্তমানে আমরা কীসের জন্য বেঁচে থাকতে চাই?
এটা এমন প্রশ্ন, যার উত্তরের প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের দুরবস্থাই এ প্রশ্নের উত্তর। পরিস্থিতিই সাক্ষ্য দেয় যে, দুনিয়া বর্তমানে পরিপূর্ণ উদ্ধত হয়েছে। দুনিয়া তার প্রেমিকদের ও দুনিয়াদারকে নিজের গোলাম বানিয়ে নিয়েছে। ... দুনিয়ার মরীচিকা এই তো দেখা যাচ্ছে। আর মানুষ তাকে পাবার জন্য তার পেছন পেছন ছুটছে। তার দরজায় হর-হামেশা দস্তক দিয়ে চলছে। যেন সে এখানে থাকবে চিরকাল।
হে আল্লাহ, তুমি সাহায্য করো।

টিকাঃ
৪৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/৩৬১

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 আমরা কেমন সংবাদ পাবার আশা রাখি

📄 আমরা কেমন সংবাদ পাবার আশা রাখি


মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির তাঁর মৃত্যুর সময় অনেক কাঁদছিলেন। এ সময় তাঁকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, নিষেধ করেছেন, কিন্তু আমি অবাধ্য হয়েছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন; তাহলে আপনি আমার ওপর দয়া করলেন। আর যদি আমাকে শাস্তি দেন; তাহলে আপনি কোনো জুলুমকারী নন।'৪৭
সায়িদ ইবনে মুসায়্যিবকে প্রশ্ন করা হলো, 'এ সকালে কেমন বোধ করছেন?' তিনি বললেন,
'আমি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।'৪৮
মৃত্যু কখন এসে পড়ে, যারা এর খবর জানে না, তাদের প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব হলো, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। কেউ যেন তার যৌবন আর সুস্থতার মাধ্যমে প্রতারিত না হয়। কেননা, বৃদ্ধ মানুষ খুব কমই মারা যায়। যুবকদের মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি। বরং অতি বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করাটা তো একটা বিরল ঘটনার মতো।
কেউ কি এটা জানে যে, মৃত্যু কখন তার ওপর এসে পড়বে? কখন মৃত্যু এসে তার জীবনের ওপর ভয়ংকর থাবা বসাবে? অবশ্যই এর উত্তর হবে, না। তাহলে তুমি প্রস্তুত হও সে সময়ের জন্য, যখন তোমার রক্ত চলাচল থেমে যাবে। তোমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আর তুমি এই পৃথিবী থেকে আখিরাতের দিকে যাত্রা শুরু করবে।
ইমরান আল খাইয়াত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবারহিম নাখয়িকে দেখতে আমরা তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তখন তিনি কাঁদছিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, “আপনি কাঁদছেন কেন?” তিনি বললেন,
“আমি মালাকুল মাওতের অপেক্ষা করছি, কিন্তু আমি জানি না যে, আমাকে কি জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হবে না জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেওয়া হবে!”৪৯
হ্যাঁ, তিনি সত্যিই বলেছেন। এই দুনিয়ার পর হয়তো জান্নাত, নয়তো জাহান্নাম। কিন্তু আমরা কি একবারও এটা চিন্তা করেছি যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? কোন পথে চলছি? আমাদের ওপর তো ভর করেছে কালক্ষেপণ, অমনোযোগিতা, মিথ্যে আশা আর আলস্যে ভরা ঘুম। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে জাগিয়ে তুলুন। আমাদের অন্তরকে পরিপূর্ণ ইমানে সজ্জিত করুন। আমাদের সুস্থ বিবেচনা শক্তি দান করুন।
প্রিয় ভাই, তুমি সতর্ক হও।
অপেক্ষা করো, সামনেই মৃত্যুর যন্ত্রণা অপেক্ষা করছে। শত হাজার দক্ষ ডাক্তার এসেও চিকিৎসা করতে পারবে না এ যন্ত্রণার।

টিকাঃ
৪৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯১
৪৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৮৩
৪৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৮৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00