📄 প্রিয় নবিজির অন্তিম মুহূর্তের বাণী
আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নবি-রাসুলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তিনি। সকল সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম ও সম্মানিত। কিন্তু মৃত্যুযন্ত্রণা তাঁকেও ভোগ করতে হয়েছিল।
ইনতেকালের পূর্ব সময়ে। অন্তিম মুহূর্তে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার পানির পাত্রে হাত দিয়ে নিজের চেহারা মুছে নিচ্ছিলেন। আর বলছিলেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ
'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই। নিশ্চয় মৃত্যুর যন্ত্রণা অনেক কঠিন।' ২৪
ফাতিমা রা. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে। এ কষ্ট ও যন্ত্রণা দেখে তিনি বললেন, 'হায়, আমার বাবার কত কষ্ট হচ্ছে!' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَيْسَ عَلَى أَبِيكِ كَرْبُ بَعْدَ اليَوْمِ
'আজকের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট নেই।' ২৫
ভাই! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব, সৃষ্টিজীবের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত মানবের অন্তিম মুহূর্তের অবস্থার বর্ণনা এটি। যার আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। এ বর্ণনা তাঁর অন্তিম মুহূর্তের।
টিকাঃ
২৪. সহিহ বুখারি: ৪৪৪৯, ৬/১৩
২৫. সহিহ বুখারি: ৪৪৬২, ৬/১৫
📄 কতিপয় সাহাবির অন্তিম মুহূর্তের কথা
আবু বকর রা.। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খলিফা। জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। আয়িশা রা. তাঁকে এই কবিতার মাধ্যমে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন,
أَعَاذِلُ مَا يُغْنِي الْحَذَارُ عَنِ الْفَتَى إِذَا حَشْرَجَتْ يَوْمًا وَضَاقَ بِهَا الصَّدْرُ
'যখন শ্বাস কন্ঠনালিতে চলে আসে। যখন বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে যায়।
তখন এমন মানুষের জন্য তিরস্কারকারীর সতর্কবার্তার আর কী প্রয়োজন হয়!'
তখন আবু বকর রা. বললেন, 'হে মেয়ে, বিষয়টি এমন নয়। বরং তুমি বলো, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ
“মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। যা থেকে তুমি টালবাহানা করতে।”২৬
অতঃপর তিনি বললেন, 'আমার এই যে কাপড়গুলো তোমরা দেখছ। এগুলো ধুয়ে নাও। এগুলো দিয়েই আমার কাফন দিও। কারণ, মৃতদের চেয়ে জীবিতরাই নতুন কাপড়ের বেশি মুখাপেক্ষী।'২৭
উমর রা.। যার উপাধি ফারুক। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণায়ক। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। খুলাফায়ে রাশিদার দ্বিতীয়জন। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের অন্যতম। অন্তিম মুহূর্তে তাঁর অবস্থা। মৃত্যুর পূর্বে মাটির সাথে মাথা ঠেকিয়ে বলেন, 'হায়, উমরের দুর্ভাগ্য! দুর্ভাগ্য তার মায়ের! হায়, যদি সে আল্লাহর সাথে সীমালঙ্ঘন না করত!'
আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা. বলেন,
'যেদিন উমর রা. আহত হলেন, সেদিনের মতো কষ্ট আমি আমার বুঝ হওয়ার পর আর কখনো পাইনি। তিনি আমাদের নিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করলেন। মানুষকে উত্তম অবস্থায় রেখে গেলেন তিনি। কিন্তু ফজরের সালাতে আমরা অপরিচিত কারও তাকবির শুনতে পেলাম। তিনি ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা.। অতঃপর যখন আমাদের সালাত শেষ হলো, বলা হলো, আমিরুল মুমিনিন আক্রান্ত হয়েছেন। যখন মানুষজন সালাত শেষ করল, তিনি তখন রক্তাক্ত অবস্থায় ছিলেন। ফজরের সালাত তখনও আদায় করেননি। আমি তাঁকে বললাম, “হে আমিরুল মুমিনিন, সালাত, সালাত।” এ শুনে তিনি বললেন, “আল্লাহর শপথ, কোনো বুদ্ধিমান মুসলিম সালাত ত্যাগ করতে পারে না।" তিনি সালাতের জন্য লাফ দিয়ে উঠতে চাইলেন, কিন্তু এতে তার ক্ষতস্থান থেকে পুনরায় রক্ত ঝরা শুরু করে।'
তিনি বললেন,
“হে মানবসকল, এ আঘাত কি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ করেছ?”
আলি রা. তখন তাঁকে বললেন,
“আল্লাহর শপথ, আমাদের প্রাণ আপনার প্রাণের জন্য উৎসর্গিত। আমাদের রক্ত আপনার রক্তের জন্য উৎসর্গিত। আপনার আঘাতকারী সম্পর্কে আমরা এখনো জানতে পারিনি।"
তখন তিনি (উমর রা.) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর দিকে তাকালেন। তাঁকে বললেন, “তুমি বাইরে গিয়ে লোকজনকে তাদের মনের অবস্থা জিজ্ঞেস করো এবং আমার কাছে এসে সত্য ঘটনা বর্ণনা করবে।"
ইবনে আব্বাস রা. বের হলেন। পরে ফিরে এসে বললেন,
“হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর শপথ, আমি এমন কোনো নারী বা পুরুষ দেখিনি, যার চোখ আপনার জন্য অশ্রু বর্ষণ করছে না। তারা সকলেই আপনার জন্য ক্রন্দন করছে। তাদের মাতা-পিতাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করছে। আর আপনার আঘাতকারী হলো মুগিরা ইবনে শুবা রা.-এর গোলাম। আপনাকে-সহ সে আরও বারো জনকে আহত করেছে। তারা সকলেই রক্তাক্ত অবস্থায় আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা করছে। হে আমিরুল মুমিনিন, জান্নাত আপনাকে স্বাগত জানাবে।” তখন তিনি (উমর রা.) বললেন,
“হে আব্বাসের বেটা, এর মাধ্যমে আমাকে ধোঁকা না দিয়ে অন্য কাউকে গিয়ে ধোঁকা দাও।”
তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন,
“হে আমিরুল মুমিনিন, আমরা আপনার ব্যাপারে কেন এমনটি বলব না? আপনার ইসলাম গ্রহণ ছিল সম্মানের, আপনার হিজরত ছিল বিজয়ের, আপনার শাসনক্ষমতা ছিল ন্যায়পরায়ণতার আর আপনি নিহত হচ্ছেন মাজলুম অবস্থায়।” তখন উমর রা. ইবনে আব্বাস রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কি এ ব্যাপারে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সাক্ষ্য দেবে?” উমর রা. ইতস্তত করছিলেন আর নিজেকে ব্যর্থ ভাবছিলেন।
তখন আলি ইবনে আবু তালিব রা. তাঁর পাশ থেকে বললেন,
“হ্যাঁ, হে আমিরুল মুমিনিন, আমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট আপনার জন্য সাক্ষ্য দেবো।"
অতঃপর তিনি ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হে আমার ছেলে, তুমি আমার মাথা আর গাল মাটিতে রাখো।” আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন,
"আমি এ কথার অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে অচেতন অবস্থায় এমনটি বলছেন। তিনি আমাকে আবারও বললেন, “হে আমার ছেলে, তুমি আমার মাথা মাটিতে রাখো।” আমি এবারও এমনটি করিনি। তখন তিনি তৃতীয় বার আমাকে বললেন, “তোমার মা ধ্বংস হোক! তুমি আমার মাথা মাটিতে রাখো।” আমি তখন বুঝতে পারলাম, তিনি এখন সচেতন অবস্থাতেই আছেন। আহত হওয়ার কারণে নিজে পারছেন না বলেই আমাকে বলছেন। এরপর আমি তাঁর মাথা মাটিতে রাখলাম। আমি দেখলাম, তার দাড়ি মাটির সাথে লেগে আছে। তিনি এত পরিমাণে কাঁদছিলেন যে, চোখের পানিতে মাটি ভিজে গেছে। তিনি কী বলেন, তা শোনার জন্য আমার দু'কান পেতে রাখলাম। তিনি তখন বলছিলেন,
“হায়, উমরের দুর্ভাগ্য! দুর্ভাগ্য তার মায়ের! হায়, যদি সে আল্লাহর সাথে সীমালঙ্ঘন না করত।” ২৮
فلو كان هول الموت لا شيء لهان علينا الأمر واحتقر الأمر ولكنه حشر، ونشر، وجنة * ونار وما قد يستطيل به الخبر
'যদি মৃত্যুর বিপদ বলে কিছু না থাকত তবে সবকিছুই সহজ হতো, সবকিছুই স্বাভাবিক হতো। কিন্তু কেবল যে মৃত্যুতেই শেষ নয়, মৃত্যুর সামনেও আছে অনেক কিছু। হাশর আছে, নশর আছে, জান্নাত আছে। আছে জাহান্নাম, আছে কত কিছু তার বর্ণনাও অনেক দীর্ঘ।'
উসমান ইবনে আফফান রা.। অন্তিম মুহূর্ত আজ তাঁর। শরীরের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে অবিরত। আর তিনি বলছেন,
لا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ، اللهُمَّ إِنِّي أَسْتَعِيْنُكَ بِكَ عَلَى أُمُوْرِي وَأَسْأَلُكَ الصَّبْرَ عَلَى بَلَائِي
'হে আল্লাহ, আপনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র। আর আমি তো জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। হে আল্লাহ, আমি আমার সকল বিষয়ে আপনার সাহায্য প্রার্থনা করি। বিপদে ধৈর্যধারণের তাওফিক কামনা করি।'
নবি-রাসুলগণ (আলাইহিমুস সালাম), রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গী-সাথি—খুলাফায়ে রাশেদিন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিগণ, অন্য সকল সাহাবি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)—প্রত্যেককেই মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। তাহলে তোমার কী মনে হয়? যখন আমাদের ওপর মৃত্যু নেমে আসবে, তখন আমাদের অবস্থা কী হবে? হে আল্লাহ, আপনি সাহায্যকারী।
মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান রা. মৃত্যুর সময় বললেন,
'তোমরা আমাকে বসাও, অতঃপর তাঁকে যখন বসানো হলো। তখন তিনি আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করলেন, তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করলেন। এরপর অধিক পরিমাণে কাঁদলেন এবং বললেন, “হে মুআবিয়া, তুমি এই বৃদ্ধ বয়স আর জীবনের পড়ন্ত বেলায় তোমার রবকে স্মরণ করছ! কেন এটা তোমার পূর্ণ যৌবনে হলো না?” এরপর তিনি জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন আর বললেন, “হে আমার রব, কঠিন হৃদয়ের অধিকারী এই অবাধ্য বৃদ্ধের ওপর রহম করুন। তার গুনাহ মাফ করুন, অপরাধগুলো ক্ষমা করুন। এমন এক বান্দার প্রতি আপনি দয়া করুন, যে আপনাকে ব্যতীত অন্য কারও নিকট কোনো কিছু আশা করে না এবং আপনি ব্যতীত অন্য কারও ওপর ভরসা করে না।”২৯
আবু হুরাইরা রা. মৃত্যুর সময় কাঁদছিলেন, তখন তাঁকে বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আমি তোমাদের এই দুনিয়ার জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি, আমার সফর অনেক দীর্ঘ হওয়া নিয়ে। কাঁদছি আমার নিকট পাথেয় অনেক কম থাকার কারণে। আমি এমন এক স্থানের ওপর রয়েছি, যার একদিকে জান্নাত একদিকে জাহান্নাম। আমি জানি না, আমাকে কোথায় নেওয়া হবে; তাই আমি কাঁদছি।'৩০
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.-এর স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান বলেন, 'মৃত্যু-পূর্ব রোগের সময়ে, অন্তিম সে মুহূর্তে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ বলতেন,
“হে আল্লাহ, নির্জনে মানুষদের কোলাহল থেকে দূরে আমার মৃত্যু দিয়ো। এমনকি আমার মৃত্যু যদি দিনেও হয়, তবুও।”
এরপর যেদিন তার মৃত্যু হলো, সেদিন আমি তাঁর কামরা থেকে পাশের কামরায় গেলাম। আমাদের দু'কামরার মাঝখানে শুধু একটা দরজার ব্যবধান ছিল। তিনি তাকিয়ার ওপর শুয়ে ছিলেন। তখন আমি শুনতে পেলাম, তিনি তিলাওয়াত করছেন,
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ﴾
"যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না, এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি। আর মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম।"৩১
এরপর সব নীরব হয়ে গেল। আমি আর কোনো আওয়াজ শুনতে পাইনি, এমনকি তাঁর নড়াচড়ার আওয়াজও না। আমি তাঁর খাদেমকে বললাম, দেখো তো। তিনি ঘুমিয়ে গেলেন কি না? সে ঘরে প্রবেশ করেই চিৎকার করে উঠল। আমি দ্রুত সেখানে ছুটে গেলাম এবং দেখলাম তাঁর ইনতেকাল হয়ে গেছে।'৩২
আল্লাহু আকবার, মৃত্যু কত দ্রুত আমাদের নিকট চলে আসে! অথচ আমরা উদাসীন, মৃত্যুর জন্য আমাদের কোনো ভাবনা নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই!
﴿ قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ ﴾
'বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবেই।' ৩৩
হ্যাঁ। আমরা যেদিকেই যাই। যেখানেই আত্মগোপন করি না কেন। মৃত্যু একদিন আমাদের কাছে আসবেই। আমাদের পাকড়াও করবেই। যদি আমাদের এ কথা বলা হয় যে, কয়েক শত বছর পর তোমাদের মৃত্যু হবে। তবুও তো একটি দিন চলে গেলে একটি রাত অতিবাহিত হলে আমাদের চিন্তিত হওয়া দরকার এবং প্রতিনিয়ত আমাদের চিন্তা ও পেরেশানি আরও বৃদ্ধি পাওয়া দরকার। কারণ, এই রাত-দিনের প্রস্থানই তো ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। কিন্তু আমাদের জীবন তো আরও ছোট, আমাদের হায়াত তো আরও অনেক কম। সাধারণত ষাট-সত্তর বছরের। বরং আমাদের কারও মৃত্যু তো এরও আগে হয়ে যায়। বার্ধক্যে পৌঁছার আগেই, যুবক বয়সে বা তারও আগে। কিন্তু মৃত্যুর জন্য আমাদের সেই চিন্তা কোথায়? মৃত্যুর জন্য আমাদের সেই প্রস্তুতি কোথায়?
আমরা কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত? আমরা কি সেই দীর্ঘ সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করছি? মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য কি আমরা প্রস্তুত আছি? আল্লাহর শপথ, মৃত্যুর পর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সংকীর্ণ কবর ও তার প্রশ্ন-উত্তর। এরপর কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা। তারপর হয়তো জান্নাত, নয়তো জাহান্নাম।
টিকাঃ
২৬. সুরা কাফ: ১৯
২৭. ইমাম আহমাদ রহ. কৃত আজ-জুহদ, পৃষ্ঠা নং ৯০, হাদিস নং ৫৬৩
২৮. তারিখু উমার: ২৪৫
২৯. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৮৯
৩০. আল-আকিবাহ: ১৩৫
৩১. সুরা কাসাস: ৮৩
৩২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২৮৩
৩৩. সুরা জুমুআ : ০৮
📄 মৃত্যুযন্ত্রণার সে সময় অটল থাকা বড়ই কঠিন
সাফওয়ান ইবনে সুলাইম রহ. বলেন,
'মৃত্যু হলো মুমিনের জন্য দুনিয়ার ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তির মাধ্যম। মৃত্যুকে পার করেই দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তি; যদিও মৃত্যুর রয়েছে অনেক কষ্ট, অনেক যন্ত্রণা। এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন।'৩৪
মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা মৃত্যুর কষ্ট ও তার যন্ত্রণাকে হালকা করে। বিশেষ করে যখন মৃত্যুযন্ত্রণার কষ্ট দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনায় ফেলে দেয়, যখন মৃত্যুযন্ত্রণার কারণে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফিতনার আশঙ্কা করা হয়, তখন এ চিন্তা-ভাবনা কাজে আসে। সুফইয়ান সাওরি রহ. বলেন,
'মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে কঠিন অন্য কিছু আমার কাছে নেই। আমার ভয় হয় যে, না জানি আমার মৃত্যুযন্ত্রণা অনেক কঠিন হয়, অতঃপর আমি তা সহজের জন্য দুআ করব, কিন্তু আমার দুআ কবুল না হলে তো তখন আমি ফিতনায় পড়ে যাব।'৩৫
সুফইয়ান রহ. সারা রাত কাঁদলেন। সকাল হলে লোকেরা তাকে প্রশ্ন করল, 'এসবই কি গুনাহের কারণে?' তখন তিনি মাটির একটি ঢিলা নিলেন আর বললেন, 'গুনাহ তো এর চেয়ে হালকা। বরং আমি কাঁদছি খারাপ পরিণতি বা শেষটা মন্দ হওয়ার ভয়ে।'
এই বুঝটাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় বুঝ। এটি মানুষের সবচেয়ে বড় বুদ্ধির পরিচয়। মানুষ সর্বদা এই ভয়ে থাকবে যে, না জানি মৃত্যুর সময় তার পাপকাজগুলো তাকে না আবার ধোঁকা দেয়। তার মাঝে ও তার উত্তম সমাপ্তির মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইমাম আহমাদ রহ. আবু দারদা রা.-এর সম্পর্কে বর্ণনা করেন,
আবু দারদা রা. মৃত্যুর পূর্বে অচেতন হয়ে পড়লেন। চেতনা ফিরে আসার পর তিনি এই আয়াত পড়লেন,
﴿وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ ﴾
'আমি ঘুরিয়ে দেবো তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে। যেমন তারা এর প্রতি প্রথমবার বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্ত করে ছেড়ে দেবো।'৩৬
এ কারণেই সালাফ গুনাহের ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকতেন। এই ভয় করতেন যে, না জানি তা আবার তার মাঝে ও তার উত্তম পরিসমাপ্তির মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন,
'জেনে রেখো, যার গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়গুলো সঠিক রয়েছে, তার মন্দ পরিসমাপ্তি হবে না। যে লোক দেখানোর জন্য কোনো আমল করে না। বরং অন্তর থেকেই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভের আশায় সকল আমল করে। মন্দ পরিসমাপ্তি তো এমন ব্যক্তির হবে, যার ভেতর-বাইর সমান নয়, যার আকিদা সঠিক নয়, যে অবিরত কবিরা গুনাহ করতে থাকে, বড় বড় গুনাহ সর্বদা তাকে পরাজিত করে রাখে, ভালো কাজের ওপরে সে একেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। একসময় এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু এসে যাবে। তাওবা করার কোনো সুযোগ থাকবে না। সে সংশোধন হওয়ার আগেই তার মৃত্যু এসে যাবে। আল্লাহ-অভিমুখী হওয়ার আগেই তার সাথে মৃত্যুর সাক্ষাৎ হবে। ফলে শয়তান তার শেষ সময়ে তার ওপর সফল হবে এবং সেই ভয়াবহ সময়ে তার ইমান কেড়ে নেবে। আমরা এ অবস্থা থেকে আল্লাহর পানাহ চাই।'৩৭
টিকাঃ
৩৪. আস-সিয়ার: ৫/৩৬৬
৩৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১৪৮
৩৬. সুরা আনআম: ১১০
৩৭. আল-জাওয়াবুল কাফি: ২৪৫
📄 শিক্ষা গ্রহণ করা চাই অপরের মৃত্যু দেখে
প্রিয় ভাই,
তুমি যদি একবার তোমার মৃত্যুর সময়ের অবস্থা দেখতে পেতে! তবে অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে। কিন্তু তা তো একবারই আসে। তবুও, আল্লাহ তাআলা তো তোমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন, তুমি তোমার আগে যারা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। দেখবে, তাদের শেষ অবস্থা কেমন হয়েছে, তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা কতটা কঠিন ছিল। তোমার সময় তো একেবারেই কম। তুমি অল্প সময়ই বেঁচে থাকবে। অচিরেই তোমার সে সময় আসছে। তাই তাদের অবস্থার দিকে তাকাও এবং শিক্ষা গ্রহণ করো।
সুলাইমান আত-তাইমি রহ.-এর যখন অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এল, তখন তাকে বলা হলো, 'সুসংবাদ গ্রহণ করুন, কেননা আপনি তো অনেক পরিমাণে আল্লাহর আনুগত্য করতেন।' তখন তিনি বললেন, 'তোমরা এমন বলো না। কারণ, আমি জানি না যে, আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কী ফায়সালা করা হবে।' কেননা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
﴿وَبَدَالَهُمْ مِنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ ﴾
'সেখানে আল্লাহর নিকট থেকে তারা এমন কিছুর সম্মুখীন হবে, যা তারা কখনো অনুমানও করেনি।'৩৮
কোনো এক সালাফ বলেছেন,
'তারা অনেক কাজকেই নেকির কাজ মনে করে করবে, কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা সেগুলোকে মন্দ কাজ হিসেবে দেখতে পাবে।'
উম্মে দারদা রা. বলেন,
‘কেউ যখন উত্তম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করত, তখন আবু দারদা রা. বলতেন, “অভিনন্দন তোমাকে। হায়, আমি যদি তোমার স্থানে থাকতাম!” আমি এ ব্যাপারে তাঁকে কিছু বললে তিনি বলতেন, “হে অবুঝ স্ত্রী, তুমি কি জান না, মানুষ সকালে মুমিন থাকবে আবার বিকেলে মুনাফিক হয়ে যাবে? তার থেকে ইমান কেড়ে নেওয়া হবে; অথচ সে টেরও পাবে না। এ কারণেই আমি সালাত-সিয়ামের ওপর বেঁচে থাকার চেয়ে এই লোকটির মৃত্যু দেখে ঈর্ষা করছি।'৩৯
প্রিয় ভাই,
তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই দ্বীনের ওপর অটল থাকার তাওফিক চাও। কেননা, মানুষ হিদায়াতের পথ পরিত্যাগ করে বাতিলের পথ অবলম্বন করছে, এই সংবাদ তো আমরা প্রতিনিয়তই পাচ্ছি। এমন এমন সংবাদও শুনছি, যা শরীরের লোম দাঁড় করিয়ে দেয়। চিন্তাকে বিহ্বল করে দেয়। আর সবচেয়ে কঠিন ফিতনা ও সবচেয়ে বড় মুসিবত তো এটাই যে, মানুষ হিদায়াতের পথ ছেড়ে বাতিলের পথে চলে যায়, জান্নাতের পথ পরিত্যাগ করে জাহান্নামের পথ অবলম্বন করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এ অবস্থা থেকে হিফাজত করুন এবং মুসলিম অবস্থায় জীবিত রেখে মুমিন অবস্থায় মৃত্যু দান করুন।
ইবনে মুনকাদির রহ. মৃত্যুর সময় কাঁদতে লাগলেন, তখন লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ, আমি এমন কোনো গুনাহের কারণে কাঁদছি না, যা আমি জেনেশুনে করেছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমি এমন কোনো কাজ করেছি, যা আমার কাছে ভালোই মনে হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট তা গুরুতর অপরাধ। '৪০
টিকাঃ
৩৮. সুরা জুমার: ৪৭
৩৯. শারহুস সুদুর: ১১
৪০. আস-সুবাত ইনদাল মামাত: ৯৪