📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 মৃত্যু কেমন?

📄 মৃত্যু কেমন?


মৃত্যু ও তার জ্বালা-যন্ত্রণা কিছুটা অনুমান করার জন্য আমরা এখন সালাফের অন্তিম মুহূর্তের কিছু চিত্র অবলোকন করব। আমর ইবনুল আস রা. মৃত্যুক্ষণে উপস্থিত হলেন। ছেলে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, 'মৃত্যুযন্ত্রণা কেমন?' তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ, আমার পিঠকে যেন একটি শক্ত তখতার ওপর রাখা হয়েছে। আর আমি সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে শ্বাস নিচ্ছি। অপরদিকে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটি কাঁটাযুক্ত ডাল টেনে হেঁচড়ে নেওয়া হচ্ছে।'১৮
উমর রা. কা'ব রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন,
'আমাকে মৃত্যুর কষ্ট সম্পর্কে কিছু বলুন।'
কা'ব রা. তখন বললেন,
'হে আমিরুল মুমিনিন, মৃত্যু হচ্ছে বনি আদমের পেটে ঘন কাঁটাবিশিষ্ট একটি শুকনো গাছ। যার কোনো শিকড় নেই, জোড়া-গ্রন্থিও নেই। আর মৃত্যুদূত হচ্ছে শক্ত বাহুবিশিষ্ট এক বিশাল মানব। সে এসে অনেক চেষ্টা-সাধনা করে সেই গাছকে উপড়ে ফেলছে।'১৯
এ বিবরণ শুনে উমর রা. কেঁদে ফেললেন। এই হলো মৃত্যু। এই হলো তার যন্ত্রণা। সেই সময় আরেকটি ভাবনা তোমায় ছিঁড়ে খুবলে খাবে। তুমি কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, জান্নাত নাকি জাহান্নাম—কোনটি তোমার আবাস হবে?
প্রিয় ভাই,
নিশ্চয় মৃত্যু এক ভয়াবহ ঘটনা, কদাকার অবস্থা। যার স্বাদ খুব বিরক্তিকর, খুবই বিস্বাদ। যা সমস্ত স্বাদ-বিনষ্টকারী। সকল আরাম-আয়েশ দূরকারী। এবং সব ধরনের কষ্ট আনয়নকারী। সে তো তোমার সকল শিরা-উপশিরাকে বিচ্ছিন্ন করে ছাড়বে। তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিক্ষিপ্ত করে ফেলবে এবং তোমাকে বিধ্বস্ত করে দেবে একেবারে সমূলে। নিশ্চয় তা একটি ভয়ংকর ব্যাপার। তার দিনটাও হবে এক ভীষণ ভয়ংকর দিন।
হে প্রিয়,
তুমি জেনে রেখো, যদি অসহায় বান্দার সামনে মৃত্যুযন্ত্রণা ছাড়া ভয়ভীতি ও দুঃখ-কষ্টের কিছুই না থাকত, তবে এতেই তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত; আনন্দ হয়ে দাঁড়াত বিরক্তির কারণ; দূর হয়ে যেত তার সকল অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা। তখন সে শুধু মৃত্যু-চিন্তায় ডুবে থাকত। এবং এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই তার প্রধান ও বড় কাজ হয়ে দাঁড়াত।
কেনই বা এমন হবে না! আমরা তো জানি, মৃত্যুর পরেই রয়েছে কবর ও তার অন্ধকার। পুলসিরাত ও তার সূক্ষ্মতা। হিসাব ও তার কঠোরতা। এ সবই তো শুধু ভয় আর ভয়। এক বিপদের পর অন্য বিপদ। ভয়াবহতার এক ভীষণ ধারাবাহিকতা। এটি এমন এক সফর, যা সকলকে নিয়ে একটি স্টেশনে গিয়ে থামবে। এ স্টেশন শেষ স্টেশন। এরপরে আর কোনো স্টেশন নেই। সে স্টেশন হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম!
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন,
'জনৈক বাদশা ভ্রমণে বের হবার ইচ্ছে করল। তাই পরিধানের কাপড় চাইল। তাকে যে কাপড় দেওয়া হলো সেটা তার পছন্দ হলো না। সে আবারও আদেশ করল কাপড় আনার জন্য। এভাবে কয়েক বার বাছাই করার পর তার পছন্দসই সুন্দর কাপড়টি পরিধান করল। এবার সে আরোহণের পশু চাইল। আগের মতো খুব দেখেশুনে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ঘোড়ায় চেপে বসল। এরপর ইবলিস এসে ফুঁ দিল তার নাকের ছিদ্রে। তার ভেতরে অহংকার ঢুকিয়ে দিল। এবার সে তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে রওয়ানা হলো। আর অহংকার এতটাই তাকে পেয়ে বসল যে, এ কারণে সে মানুষের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না।
পথিমধ্যে এক জীর্ণশীর্ণ লোক এসে তাকে সালাম দিল। সে সালামের কোনো উত্তরই দিল না। আগন্তুক তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল। তখন সে বলল, “ঘোড়ার লাগাম ছাড়ো। তুমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছ।” আগন্তুক বলল, “তোমার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে।” সে বলল, “আমাকে নামতে দাও।” আগন্তুক বলল, “না, এখনই।” এবং তার লাগام ধরে তাকে ধমক দিল। এবার বাদশা বলল, "আচ্ছা বলো।” আগন্তুক বলল, "এটি গোপন কথা।" বাদশা মাথা এগিয়ে দিল। আগন্তুক তার কানে কানে বলল, "আমি মালাকুল মাওত!” মুহূর্তেই বাদশার মুখের রং বিবর্ণ হয়ে গেল। তার জিহ্বা কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আমাকে সামান্য সুযোগ দিন। আমি পরিবারের নিকট ফিরে গিয়ে আমার প্রয়োজন পূরণ করে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি।" মালাকুল মাওত বলল, "না। আল্লাহর শপথ, তুমি কিছুতেই তোমার পরিবার ও ধন-সম্পদ দেখতে পাবে না। আর কখনো দেখতে পাবে না।" এরপর তার জান কবজ করা হলো আর দেহ নিথর হয়ে পড়ে গেল।
এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা সেখান থেকে এক মুমিন বান্দার কাছে গেল এবং তাকে সালাম দিল। সে তার সালামের জওয়াব দিল। ফেরেশতা তাকে বলল, “আপনার কাছে আমার একটা প্রয়োজন আছে, আর বিষয়টা আপনার কানে কানে বলব।” সে বলল, “আসুন।” মৃত্যুর ফেরেশতা তার কানে কানে বলল, “আমি মৃত্যুর ফেরেশতা!” তখন সে বলল, “স্বাগতম, আপনার আগমন শুভ হোক। আমি দীর্ঘ দিন থেকে আপনার অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর শপথ, পৃথিবীতে আপনার সাক্ষাতের চেয়ে অন্য কারও সাক্ষাৎ আমার কাছে এত প্রিয় ছিল না।” তখন মালাকুল মাওত বলল, “আপনি যে প্রয়োজনে বের হয়েছেন, তা পুরা করে আসুন।” সে বলল, “আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাতের চেয়ে বড় ও প্রিয় কোনো প্রয়োজন আমার নেই।” মৃত্যুর ফেরেশতা বলল, “আপনি একটি পছন্দমতো অবস্থা বেছে নিন, যে অবস্থায় আমি আপনার জান কবজ করব।” এ কথা শুনে সে বলল, “আপনি কি এটা করতে পারবেন?” মালাকুল মাওত বলল, “হ্যাঁ, আমি এভাবেই আদিষ্ট হয়েছি।” ওই মুমিন বলল, “তাহলে আমাকে সুযোগ দিন, আমি অজু করে সালাত আদায় করব আর আপনি সিজদারত অবস্থায় আমার জান কবজ করবেন।” অতঃপর সিজদারত অবস্থায় তার জান কবজ করা হলো।'২০
সাবধান, আল্লাহর শপথ করে বলছি। একদিন এমন আসবে, যেদিন অন্যদেরও এসেছে। তাদের ওপর দিয়ে যেমন অবস্থা গত হয়েছে, তোমার ওপরও অনুরূপ আসবে। তাই শিক্ষা নাও।

টিকাঃ
১৭. সুরা বাকারা: ১৯৭
১৮. জামিউল উলুম: ৪৪৯
১৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৯০
২০. আল-ইহইয়া: ৪/৪৯৬

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 দুটি ভয়ংকর দিন আর দুটি ভয়ংকর রাতের কথা

📄 দুটি ভয়ংকর দিন আর দুটি ভয়ংকর রাতের কথা


আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন,
'শুনে রাখো, আমি তোমাদের এমন ভয়ংকর দুটি দিন ও দুটি রাতের কথা বলব, এগুলোর মতো ভয়াবহ রাত ও দিনের কথা সৃষ্টিজীবের মধ্যে কেউ কখনো শোনেনি।
প্রথম দিনটি হলো, যেদিন তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার কাছে একজন সংবাদদাতা আসবে। সেদিন হয়তো সে তোমার জন্য মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সুসংবাদ নিয়ে আসবে, নয়তো নিয়ে আসবে তাঁর ক্রোধের দুঃসংবাদ।
দ্বিতীয় দিনটি হলো, যেদিন আমলনামা হাতে তোমাকে তোমার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন হয়তো আমলনামা তোমার ডান হাতে থাকবে, নয়তো থাকবে তোমার বাম হাতে।
প্রথম রাত হলো, যে রাতে প্রথম তোমাকে কবরে থাকতে হবে, ইতঃপূর্বে যেখানে তুমি কখনো রাত্রিযাপন করোনি।
দ্বিতীয় রাতটি হলো, যে রাতের পরের সকাল হবে কিয়ামতের ভয়াবহ দিন।'২১

টিকাঃ
২১. আত-তাজকিরাহ বি আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ : ৩০০

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 ঠিকই এসেছিল অন্তিম বিদায়ের আভাস

📄 ঠিকই এসেছিল অন্তিম বিদায়ের আভাস


বর্ণিত আছে,
দাউদ আ.-এর নিকট যখন মালাকুল মাওত আসলো, তখন তিনি বললেন, 'আপনি কে?' সে বলল, 'আমি এমন ব্যক্তি, যে কোনো রাজা-বাদশাহকে ভয় করে না, কোনো মজবুত দুর্গই যাকে আটকাতে পারে না এবং যে কারও কাছ থেকে কোনো ঘুষ গ্রহণ করে না।' তিনি (দাউদ আ.) বললেন, 'তাহলে আপনি মালাকুল মাওত।' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আপনি আমার কাছে চলে এসেছেন, অথচ আমার প্রস্তুতি এখনো শেষ হয়নি।' মালাকুল মাওত বলল, 'হে দাউদ আ., আপনার অমুক নিকটাত্মীয় কোথায়? আপনার অমুক প্রতিবেশী কোথায়?' তিনি বললেন, 'তারা মারা গেছে।' সে বলল, 'তাদের মৃত্যুর মধ্যে কি আপনার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য শিক্ষা ছিল না?'২২

টিকাঃ
২২. আত-তাজকিরাহ: ২০৪

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 সালাফের অন্তিম মুহূর্ত

📄 সালাফের অন্তিম মুহূর্ত


মৃত্যু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ হোক বা কাল, আমাদের সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সকলকেই পান করতে হবে মৃত্যুর পেয়ালা। আমরা এখন সালাফের মৃত্যু-পূর্ববর্তী অবস্থা নিয়ে কিছু সময় আলোচনা করব। যাতে করে তাঁদের মৃত্যু-পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা আমাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি।

তোমার জীবন একেবারে অল্প কয়েক দিনের। নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তের। হিসেব করা কয়েকটি শ্বাস-প্রশ্বাসের। তুমি যদি সারা দুনিয়ার সকল সম্পদের বিনিময়ে তোমার নির্ধারিত সময়ের বাইরে এক মুহূর্ত পরিমাণ সময় দুনিয়ায় থাকতে চাও, তোমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। তাহলে কেন তুমি আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে অযথা সময় নষ্ট করছ? কেন খেল-তামাশায় মেতে থেকে জীবনের মহা মূল্যবান সময়টুকু শেষ করে দিচ্ছ? তোমার এ মুহূর্তগুলো বড়ই মূল্যবান। এ সময়গুলোই তোমার জীবন। আবু হাজিম রহ. বিষয়টি এভাবে বলেছেন,
‘নিশ্চয় আখিরাতের পণ্যের বাজারে একেবারে মন্দা যাচ্ছে। তাতে কম-বেশি বিনিয়োগ করার মতো মানুষ খুবই কম। মানুষের মাঝে এবং তার আমলের মাঝে যখন দেয়াল তৈরি করে দেওয়া হবে, যখন তার মৃত্যু হবে, তখন আফসোস আর পরিতাপ করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। বারবার এই কামনা করা হবে, হায়, যদি আমাকে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে আমি আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করতাম! কিন্তু তার এই আফসোস ও ফিরে আসার কামনা কোনো কাজেই আসবে না। এ যে বড্ড দুরাশা!’ [২০]

টিকাঃ
২০. জামিউল উলুম: ২/৩৯০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00