📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা এবং সে মুহূর্তটি কেমন?

📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা এবং সে মুহূর্তটি কেমন?


এখন আমাদের এ সফরে আমরা চলব নবি-রাসুল ও সালেহিনদের সাথে। দেখব, মৃত্যুর সময় তাদের অবস্থা কেমন ছিল? কেমন কষ্ট-ক্লেশ আপতিত হয়েছিল তাদের ওপর? কারণ, প্রাণ বের হওয়ার অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা! প্রাণ তো শরীর থেকে বের করা হয়। তার সঙ্গে শিরা-উপশিরা মারাত্মকভাবে টান খেয়ে যায়। কখনো মৃত ব্যক্তি দেখেছ? যখন মৃত্যু আসে, কেমন গুরুতর অবস্থা হয় তার? ব্যথার প্রচণ্ডতায় তখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে রয়, তার শত চিৎকার নীরবতার দেয়াল ভাঙতে অপারগ হয়। এটি ভীষণ এক অবস্থার স্পষ্ট বর্ণনা। এটি এমন এক স্টেশন, যা বারবার আসে না।
হ্যাঁ, এটি মৃত্যুর দৃশ্য, মৃত্যু উপস্থিত হবার মুহূর্ত, অন্তিম মুহূর্ত। প্রাণ যখন কণ্ঠনালিতে এসে পৌছবে। প্রত্যেক গ্রন্থি-জোড় আলাদা হয়ে যাবে। বক্ষ থেকে বের হবে গরগর আওয়াজ। চোখ থেকে নামবে অশ্রুর বান। তখনই, ঠিক তখনই, বিচ্ছেদ নিশ্চিত হয়ে যাবে। এই নিশ্চয়তা আসে উভয় পা গুটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এবং তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলার সময়। দুনিয়াতে পা ফেলার সম্ভাব্যতা হারানোর মাধ্যমে যেন তুমি আমল করার এ জীবনকে ছেড়ে অগ্রসর হচ্ছ হিসাব ও প্রতিদানের দিকে। মহান আল্লাহ সুন্দরভাবে এ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন।
وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاق )
'আর এক পায়ের নলা অপর পায়ের নলার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।'২
তখনই শুরু হয়ে যাবে পরকালের যাত্রা। শুরু হবে হিসাব ও প্রতিদানের সফর।
إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ )
'সেদিন সবকিছুর যাত্রা হবে তোমার প্রতিপালকের পানে।'৩
যে ব্যক্তি নিজ জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, সে যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থল সম্পর্কে চিন্তা করে দেখে। যে ব্যক্তি নিজের জীবন নিয়ে অতিষ্ঠ, সেও যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা ভাবে। যার মধ্যে হিসাবের দিনের লজ্জার ভয় আছে, সে যেন একটিবার ভেবে দেখে।

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 যে বাস্তবতা কেউই অস্বীকার করে না

📄 যে বাস্তবতা কেউই অস্বীকার করে না


মৃত্যু এক ভয়াবহ কঠিন বাস্তবতা। মৃত্যু প্রত্যেক প্রাণীরই মুখোমুখি হবে। কেউ এটাকে ফেরাতে পারবে না। কারোই নেই তা প্রতিহত করার ক্ষমতা। মৃত্যু প্রতিটি মুহূর্তে আনাগোনা করে, কাল-পরিক্রমার পিছে পিছেই চলতে থাকে। সে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল, সুস্থ-অসুস্থ সকলের সাথেই সাক্ষাৎ করবে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ ﴾
'বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমাদের দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারীর নিকট ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর তোমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে যা তোমরা করতে।'৪
জীবনের সমাপ্তি একটিই। আর সকলেই মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ﴾ 'প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।'৫
অবশ্য এরপরে ঠিকানা হবে ভিন্ন ভিন্ন।
فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ ﴾ 'একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'৬ মহান আল্লাহ এক বিরাট ও মহান উদ্দেশ্যে জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ 'যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে উত্তম আমলকারী। তিনি মহা শক্তিধর, অতি ক্ষমাশীল।'৭
আল্লাহ তাআলা চারটি আয়াতে মৃত্যুযন্ত্রণার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন।
[এক] وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ 'মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে।'৮
[দুই] وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ. 'যদি আপনি দেখেন, যখন জালিমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় আক্রান্ত হবে।'৯
[তিন] فَلَوْلَا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ 'অতঃপর যখন কারও প্রাণ কণ্ঠাগত হয়।'১০
[চার] كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِي 'সাবধান, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে।'১১
মহান আল্লাহ এক আশ্চর্যকর বিবরণ ও ধারাবাহিক চিত্রের মাধ্যমে মৃত্যুর দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন।
كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ ، وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ * وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ . وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ * إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ.

টিকাঃ
২. সুরা কিয়ামাহ: ২৯
৩. সুরা কিয়ামাহ : ৩০
৪. সুরা জুমুআহ: ০৮
৫. সুরা আলে ইমরান: ১৮৫
৬. সুরা শুরা: ০৭
৭. সুরা মুলক: ০২
৮. সুরা কাফ: ১৯
৯. সুরা আনআম: ৯৩
১০. সুরা ওয়াকিআ : ৮৩
১১. সুরা কিয়ামাহ: ২৬

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 হয়তো পুরস্কার, নয়তো কঠিন শাস্তি

📄 হয়তো পুরস্কার, নয়তো কঠিন শাস্তি


মৃত্যুর সাক্ষাৎ ব্যথা-বেদনাভরা এক ভয়ানক সময়। এরপরে আছে হয়তো পুরস্কার, নয়তো কঠিন শাস্তি। যদি তুমি সুখ-শান্তি ও সচ্ছলতায় থেকেও মৃত্যুর আগমন নিয়ে ভাবতে, তবে তোমার দুনিয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত। দুনিয়া তোমার কাছে নগণ্য মনে হতো। তুচ্ছ হয়ে যেত তার বিশালতা। তোমার আনন্দ পরিণত হতো বেদনায়। সুখ-শান্তি হয়ে উঠত অশান্তিময়। কেনই বা হবে না? তুমি যে ধন-সম্পদ, পরিবার পরিজন ও প্রিয়জন সবাইকে ছেড়ে হিসাব ও প্রতিদানের দেশে পাড়ি জমাচ্ছ। এ এমন বিপদ, যার সামনে দুনিয়ার সব ভয়ানক বিপদও অতি ক্ষুদ্র, একেবারেই তুচ্ছ। অবশেষে দীর্ঘ কঠিন এক সফরের মধ্য দিয়ে মানুষ দুদলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাদের এ সফরের সমাপ্তি ঘটবে।
فَرِيقُ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقُ فِي السَّعِيرِ )
'একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'১৪
হাকিম ইবনে নুহ রহ. তার জনৈক সঙ্গীকে বলেন,
'আমরা তখন সমুদ্র ভ্রমণে। মালিক ইবনে দিনার রহ. পুরো একটি রাত হেলান দিয়ে বসে বসে কাটালেন। সে রাতে না তিনি কোনো নামাজ-কালাম পড়লেন; না কোনো দুআ-দুরুদ পড়লেন। সকাল হলে তাকে বললাম, “হে মালিক, রাত তো অনেক দীর্ঘ ছিল। কিন্তু আপনি কোনো নামাজও পড়লেন না, দুআও করলেন না?” এ শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। অতঃপর বললেন, “যদি সৃষ্টিজীব জানত, ভবিষ্যতে সে কীসের মুখোমুখি হবে, তাহলে কখনো সে জীবনযাপনে স্বাদ অনুভব করত না। আল্লাহর শপথ, আমি যখন রাতের ভয়াবহতা ও তার প্রচণ্ড অন্ধকার লক্ষ করলাম, তখন আমার কবরে অবস্থানের কথা এবং কিয়ামতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ হলো। সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। পিতা পুত্রের কোনো কাজে আসবে না। পুত্রও পিতার কোনো উপকার করতে পারবে না।” এরপর তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছে করলেন, ততক্ষণ কাঁপতে থাকলেন। অতঃপর শান্ত হলেন। আমার সাথিরা জাহাজের মধ্যেই আমাকে দোষারোপ করে বলল, “আপনি জানেন, তিনি পরকালের কথা সহ্য করতে পারেন না; কি জন্য তাকে এসব বলে অস্থির করতে গেলেন?" তিনি বলেন, "এরপর থেকে আমার মনে পড়ে না, আমি কখনো তাকে কোনো কিছু স্মরণ করে দিয়েছি।"'১৫

টিকাঃ
১২. সুরা কিয়ামাহ: ২৬-৩০
১৩. সুরা কাফ: ১৯-২০
১৪. সুরা শুরা: ০৭
১৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/১৮

📘 অন্তিম মুহূর্ত > 📄 আমাদের তামাশা আর অট্টহাসি বন্ধ হবে কি?

📄 আমাদের তামাশা আর অট্টহাসি বন্ধ হবে কি?


হাসান বসরি রহ. যাওয়ার পথে। এক লোককে হাসতে দেখে তাকে প্রশ্ন করলেন, 'ভাতিজা, তুমি কি পুলসিরাত পার হয়েছ?' - 'না।' : ‘তবে তুমি কি জেনে ফেলেছ, জান্নাতে যাবে না জাহান্নামে?' - 'না।'
হাসান রহ. এরপর বললেন, 'তাহলে এত হাসি কী কারণে? ব্যাপারটি খুবই ভয়াবহ। আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে রাখুন।' এরপরে লোকটিকে মৃত্যু অবধি আর হাসতে দেখা যায়নি।১৬
প্রিয় ভাই,
আর কোন সফর আছে, যা এই সফরের চেয়ে দীর্ঘ? তুমি কি জানো, এ সফরে কোন পাথেয়ের প্রতি তুমি সর্বাধিক মুখাপেক্ষী হবে? নিশ্চয়, হে প্রিয়, সে পাথেয় পরকালের পাথেয়।

টিকাঃ
১৬. আল-হাসান আল-বসরি: ৬৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00