📄 হৃদয়ের আকুতি
আমার প্রিয় ভাই,
প্রতিটি মুহূর্তই তুমি সফর করে চলছ। অন্যদের অভিজ্ঞতা যাচাই করছ। পর্যবেক্ষণ করছ পূর্ববর্তীদের পথচিহ্ন। এসো, পাঁচ কি দশ মিনিট সময় সফর করবে আমাদের সাথেও। চলো, তাহলে একটি স্টেশন দেখে আসি, যে স্টেশন তোমাকে অতিক্রম করতে হবে একান্ত একাকী। হ্যাঁ, সেখানে তোমাকে একাই অবস্থান করতে হবে। তুমি চাও বা না-ই চাও— সে স্টেশন, সে মুহূর্ত অবশ্যম্ভাবী। সে মুহূর্তটি তোমার জীবনে নিশ্চিত আসবেই।
সেটি এমন এক স্টেশন, যা মুমিন-কাফির, নেককার-পাপী, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকলকেই অতিক্রম করতে হবে। এমনকি নবি-রাসুলদেরকেও সে ভয়ানক স্টেশন ও বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে।
সে অন্তিম মুহূর্তটি আমার ও তোমার দিকে ক্রমেই ধেয়ে আসছে। এ স্থান, এ মুহূর্তটি আমাদের পূর্বে অনেকে অতিক্রম করেছেন। তারা স্বচক্ষে একে অবলোকন করেছেন। একে জেনেছেন তার স্বরূপে। তারা এর স্বাদ আস্বাদন করেছেন। তাদের পান করতে হয়েছে এ যন্ত্রণার পেয়ালা। এসো, আমরা আজ তাদের চোখে একে দেখি, তাদের কানে একে শুনি, সে মুহূর্তগুলো যাপন করে আসি তাদের মতোই।
📄 সামনের ঠিকানা
তুমি অবশ্য বিচক্ষণ-জ্ঞানী। চলছ অন্যদের দৃষ্টিসীমায়, তাদের অভিজ্ঞতা জানার অভিপ্রায়ে। আর বই-পুস্তক ঘাঁটাঘাঁটি করছ পূর্ববর্তীদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত হবে বলে। এসো, দেখো—তাদের জীবনের সমাপ্তি, কেমন তাদের অন্তিম মুহূর্তটি। মানি, তুমি অনেক পড়েছ, অনেক শুনেছ। তারপরও আমার দুটি কথা শোনার আশায় একটু কান পেতে দাও। আঁখিযুগল নিবদ্ধ করো। আমার সঙ্গে সফর করো কিতাবের পরতে পরতে।
📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা এবং সে মুহূর্তটি কেমন?
এখন আমাদের এ সফরে আমরা চলব নবি-রাসুল ও সালেহিনদের সাথে। দেখব, মৃত্যুর সময় তাদের অবস্থা কেমন ছিল? কেমন কষ্ট-ক্লেশ আপতিত হয়েছিল তাদের ওপর? কারণ, প্রাণ বের হওয়ার অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা! প্রাণ তো শরীর থেকে বের করা হয়। তার সঙ্গে শিরা-উপশিরা মারাত্মকভাবে টান খেয়ে যায়। কখনো মৃত ব্যক্তি দেখেছ? যখন মৃত্যু আসে, কেমন গুরুতর অবস্থা হয় তার? ব্যথার প্রচণ্ডতায় তখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে রয়, তার শত চিৎকার নীরবতার দেয়াল ভাঙতে অপারগ হয়। এটি ভীষণ এক অবস্থার স্পষ্ট বর্ণনা। এটি এমন এক স্টেশন, যা বারবার আসে না।
হ্যাঁ, এটি মৃত্যুর দৃশ্য, মৃত্যু উপস্থিত হবার মুহূর্ত, অন্তিম মুহূর্ত। প্রাণ যখন কণ্ঠনালিতে এসে পৌছবে। প্রত্যেক গ্রন্থি-জোড় আলাদা হয়ে যাবে। বক্ষ থেকে বের হবে গরগর আওয়াজ। চোখ থেকে নামবে অশ্রুর বান। তখনই, ঠিক তখনই, বিচ্ছেদ নিশ্চিত হয়ে যাবে। এই নিশ্চয়তা আসে উভয় পা গুটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এবং তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলার সময়। দুনিয়াতে পা ফেলার সম্ভাব্যতা হারানোর মাধ্যমে যেন তুমি আমল করার এ জীবনকে ছেড়ে অগ্রসর হচ্ছ হিসাব ও প্রতিদানের দিকে। মহান আল্লাহ সুন্দরভাবে এ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন।
وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاق )
'আর এক পায়ের নলা অপর পায়ের নলার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।'২
তখনই শুরু হয়ে যাবে পরকালের যাত্রা। শুরু হবে হিসাব ও প্রতিদানের সফর।
إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ )
'সেদিন সবকিছুর যাত্রা হবে তোমার প্রতিপালকের পানে।'৩
যে ব্যক্তি নিজ জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, সে যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থল সম্পর্কে চিন্তা করে দেখে। যে ব্যক্তি নিজের জীবন নিয়ে অতিষ্ঠ, সেও যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা ভাবে। যার মধ্যে হিসাবের দিনের লজ্জার ভয় আছে, সে যেন একটিবার ভেবে দেখে।
📄 যে বাস্তবতা কেউই অস্বীকার করে না
মৃত্যু এক ভয়াবহ কঠিন বাস্তবতা। মৃত্যু প্রত্যেক প্রাণীরই মুখোমুখি হবে। কেউ এটাকে ফেরাতে পারবে না। কারোই নেই তা প্রতিহত করার ক্ষমতা। মৃত্যু প্রতিটি মুহূর্তে আনাগোনা করে, কাল-পরিক্রমার পিছে পিছেই চলতে থাকে। সে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল, সুস্থ-অসুস্থ সকলের সাথেই সাক্ষাৎ করবে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ ﴾
'বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমাদের দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারীর নিকট ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর তোমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে যা তোমরা করতে।'৪
জীবনের সমাপ্তি একটিই। আর সকলেই মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ﴾ 'প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।'৫
অবশ্য এরপরে ঠিকানা হবে ভিন্ন ভিন্ন।
فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ ﴾ 'একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'৬ মহান আল্লাহ এক বিরাট ও মহান উদ্দেশ্যে জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ 'যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে উত্তম আমলকারী। তিনি মহা শক্তিধর, অতি ক্ষমাশীল।'৭
আল্লাহ তাআলা চারটি আয়াতে মৃত্যুযন্ত্রণার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন।
[এক] وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ 'মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে।'৮
[দুই] وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ. 'যদি আপনি দেখেন, যখন জালিমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় আক্রান্ত হবে।'৯
[তিন] فَلَوْلَا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ 'অতঃপর যখন কারও প্রাণ কণ্ঠাগত হয়।'১০
[চার] كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِي 'সাবধান, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে।'১১
মহান আল্লাহ এক আশ্চর্যকর বিবরণ ও ধারাবাহিক চিত্রের মাধ্যমে মৃত্যুর দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন।
كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ ، وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ * وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ . وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ * إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ.
টিকাঃ
২. সুরা কিয়ামাহ: ২৯
৩. সুরা কিয়ামাহ : ৩০
৪. সুরা জুমুআহ: ০৮
৫. সুরা আলে ইমরান: ১৮৫
৬. সুরা শুরা: ০৭
৭. সুরা মুলক: ০২
৮. সুরা কাফ: ১৯
৯. সুরা আনআম: ৯৩
১০. সুরা ওয়াকিআ : ৮৩
১১. সুরা কিয়ামাহ: ২৬