📄 অবতরণিকা
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين. أما بعد :
সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসুলের ওপর।
আল্লাহ তাআলা এ দুনিয়াকে অবস্থানের আবাস বানাননি। দুনিয়াকে বানিয়েছেন সফর বা অতিক্রমের জায়গা। এরপরেই তিনি হিসাব নেবেন। তারপর প্রতিদান দেবেন। এ দুনিয়ায় আমাদের সর্বশেষ নিশ্বাসগুলো নেওয়ার সময়টিই আমাদের অন্তিম মুহূর্ত। অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তির ওপর নেমে আসে নানান কঠিন ও ভয়াবহ বিপদ। বস্তুত, তাকেই তো সত্যিকারের বিচক্ষণ বলা যায়, যে অন্যের অন্তিম মুহূর্তের অবস্থা দেখে নিজেকে সংশোধন করে নেয়। তো এমন কঠিন সময় মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তির প্রিয়জনদের কী করণীয় হবে? কী আমলে ব্যস্ত থাকবে, যাতে করে মুমূর্ষু ব্যক্তি নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে, প্রতীক্ষায় থাকতে পারে মৃত্যুর সাক্ষাতের?
প্রিয় পাঠকের জন্য সেসব অবস্থার বিভিন্ন দিক চয়ন করেই সাজিয়েছি এ পুস্তিকাটি। এর শুরুভাগেই রয়েছে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর অন্তিম মুহূর্তের বর্ণন। এরপর একে একে এসেছে এ সম্পর্কে সাহাবিগণ ও সালাফের বিভিন্ন ঘটনা-বিবরণ; যাতে করে পাঠক একটু সচেতন হতে পারে, দেখেশুনে কদম ফেলে, সাবধান থাকে অন্তিম মুহূর্তে। এসব ঘটনা এক একটি ভয় ও শঙ্কার চিত্র। এখানে রয়েছে উপদেশ গ্রহণকারীর জন্য উপদেশ। উদাসীনদের জন্য জাগরণী বার্তা। এ أين نحن من هؤلاء؟ - সিরিজের বারোতম বই। আমার অন্য আরেকটি বই لحظات ساكنة -এর ওপরে এ পুস্তিকাটি আধারিত।
আল্লাহর কাছে একান্ত প্রার্থনা, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' যেন হয় দুনিয়ার জীবনে আমাদের শেষ বাক্য। আপনার আনুগত্যে আমাদের অটল-অবিচল রাখুন। আমাদের সর্বশেষ দিনগুলোকে আমাদের জন্য সর্বোত্তম করুন। আমাদের সর্বশেষ আমলকে কবুল করুন সর্বাধিক উত্তম আমল হিসেবে। মৃত্যুযন্ত্রণার বিপদকে বানান আমাদের পাপ মোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমরূপে এবং জীবনের অন্তিম মুহূর্তে আমাদের আপনি আগলে রাখুন আপনার পরম মায়ায়।
- আব্দুল মালিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল কাসিম
📄 হৃদয়ের আকুতি
আমার প্রিয় ভাই,
প্রতিটি মুহূর্তই তুমি সফর করে চলছ। অন্যদের অভিজ্ঞতা যাচাই করছ। পর্যবেক্ষণ করছ পূর্ববর্তীদের পথচিহ্ন। এসো, পাঁচ কি দশ মিনিট সময় সফর করবে আমাদের সাথেও। চলো, তাহলে একটি স্টেশন দেখে আসি, যে স্টেশন তোমাকে অতিক্রম করতে হবে একান্ত একাকী। হ্যাঁ, সেখানে তোমাকে একাই অবস্থান করতে হবে। তুমি চাও বা না-ই চাও— সে স্টেশন, সে মুহূর্ত অবশ্যম্ভাবী। সে মুহূর্তটি তোমার জীবনে নিশ্চিত আসবেই।
সেটি এমন এক স্টেশন, যা মুমিন-কাফির, নেককার-পাপী, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকলকেই অতিক্রম করতে হবে। এমনকি নবি-রাসুলদেরকেও সে ভয়ানক স্টেশন ও বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে।
সে অন্তিম মুহূর্তটি আমার ও তোমার দিকে ক্রমেই ধেয়ে আসছে। এ স্থান, এ মুহূর্তটি আমাদের পূর্বে অনেকে অতিক্রম করেছেন। তারা স্বচক্ষে একে অবলোকন করেছেন। একে জেনেছেন তার স্বরূপে। তারা এর স্বাদ আস্বাদন করেছেন। তাদের পান করতে হয়েছে এ যন্ত্রণার পেয়ালা। এসো, আমরা আজ তাদের চোখে একে দেখি, তাদের কানে একে শুনি, সে মুহূর্তগুলো যাপন করে আসি তাদের মতোই।
📄 সামনের ঠিকানা
তুমি অবশ্য বিচক্ষণ-জ্ঞানী। চলছ অন্যদের দৃষ্টিসীমায়, তাদের অভিজ্ঞতা জানার অভিপ্রায়ে। আর বই-পুস্তক ঘাঁটাঘাঁটি করছ পূর্ববর্তীদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত হবে বলে। এসো, দেখো—তাদের জীবনের সমাপ্তি, কেমন তাদের অন্তিম মুহূর্তটি। মানি, তুমি অনেক পড়েছ, অনেক শুনেছ। তারপরও আমার দুটি কথা শোনার আশায় একটু কান পেতে দাও। আঁখিযুগল নিবদ্ধ করো। আমার সঙ্গে সফর করো কিতাবের পরতে পরতে।
📄 মৃত্যুর যন্ত্রণা এবং সে মুহূর্তটি কেমন?
এখন আমাদের এ সফরে আমরা চলব নবি-রাসুল ও সালেহিনদের সাথে। দেখব, মৃত্যুর সময় তাদের অবস্থা কেমন ছিল? কেমন কষ্ট-ক্লেশ আপতিত হয়েছিল তাদের ওপর? কারণ, প্রাণ বের হওয়ার অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা! প্রাণ তো শরীর থেকে বের করা হয়। তার সঙ্গে শিরা-উপশিরা মারাত্মকভাবে টান খেয়ে যায়। কখনো মৃত ব্যক্তি দেখেছ? যখন মৃত্যু আসে, কেমন গুরুতর অবস্থা হয় তার? ব্যথার প্রচণ্ডতায় তখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে রয়, তার শত চিৎকার নীরবতার দেয়াল ভাঙতে অপারগ হয়। এটি ভীষণ এক অবস্থার স্পষ্ট বর্ণনা। এটি এমন এক স্টেশন, যা বারবার আসে না।
হ্যাঁ, এটি মৃত্যুর দৃশ্য, মৃত্যু উপস্থিত হবার মুহূর্ত, অন্তিম মুহূর্ত। প্রাণ যখন কণ্ঠনালিতে এসে পৌছবে। প্রত্যেক গ্রন্থি-জোড় আলাদা হয়ে যাবে। বক্ষ থেকে বের হবে গরগর আওয়াজ। চোখ থেকে নামবে অশ্রুর বান। তখনই, ঠিক তখনই, বিচ্ছেদ নিশ্চিত হয়ে যাবে। এই নিশ্চয়তা আসে উভয় পা গুটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এবং তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলার সময়। দুনিয়াতে পা ফেলার সম্ভাব্যতা হারানোর মাধ্যমে যেন তুমি আমল করার এ জীবনকে ছেড়ে অগ্রসর হচ্ছ হিসাব ও প্রতিদানের দিকে। মহান আল্লাহ সুন্দরভাবে এ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন।
وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاق )
'আর এক পায়ের নলা অপর পায়ের নলার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।'২
তখনই শুরু হয়ে যাবে পরকালের যাত্রা। শুরু হবে হিসাব ও প্রতিদানের সফর।
إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ )
'সেদিন সবকিছুর যাত্রা হবে তোমার প্রতিপালকের পানে।'৩
যে ব্যক্তি নিজ জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, সে যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থল সম্পর্কে চিন্তা করে দেখে। যে ব্যক্তি নিজের জীবন নিয়ে অতিষ্ঠ, সেও যেন নিজের প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা ভাবে। যার মধ্যে হিসাবের দিনের লজ্জার ভয় আছে, সে যেন একটিবার ভেবে দেখে।