📄 নিজের কাজটুকুতে দক্ষ হওয়া
যে কাজগুলো আপনাকে করতেই হয় সে কাজগুলো অন্তত ভালোভাবে শিখে রাখাটা ভীষণভাবে আপনাকে সাহায্য করবে।
সাধারণত আমাদের নারীদের কিছু কাজ করতেই হয়। যেমন: রান্না করা, ঘরদোর গুছিয়ে রাখা, বিশেষ করে রান্নাঘরটা, মেহমান এলে মেহমানদারী করা আর সন্তান লালন-পালন তো আছেই। যারা চাকরি করেন তারা যে গৃহের এ কাজগুলো থেকে নিজেদের খুব একটা দূরে রাখতে পারেন, তা না।
স্বাভাবিকভাবে বাহির-ভেতর উনারাই সামলান; হ্যাঁ, ব্যতিক্রম কিছু আছে, সেটা তো থাকবেই।
আপনি যদি চাকরিজীবী হন, তাহলে আপনার চাকরির ডোমেইনে আপনি দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। চাকরিটাও সুন্দর করে করলেন। মানুষ যখন তার নিজের কাজটা সুন্দরভাবে করে, তখন আর না-নানা দায়িত্বগুলো মনের ভেতরে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে না। ভেতরে কেমন যেন আর খুঁতখুঁত করে না। ঠান্ডা মাথায় থাকা যায়।
ধরুন, আপনার নতুন বিয়ে হয়েছে। রান্নাবাড়া তেমন কিছুই পারেন না, ঘরের কাজও তেমন পারেন না। ঘরে দু-একজন মানুষও যদি দুই-একদিনের জন্য মেহমান হিসেবে আসে তখনো এসপার-ওসপার চিন্তা হয়। 'হায় আমার কী হবে!' আপনার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ে! আপনি কীভাবে মেহমানদের যত্ন-আত্তি করবেন? সারাবেলা তো আর রেস্টুরেন্ট থেকে কিনে এনে খাওয়ানো যায় না। আপনি একধরনের মানসিক চাপ অনুভব করবেন। সেই মানসিক চাপ আপনাকে ক্লান্ত করে দেবে, যতটা ক্লান্ত শারীরিক পরিশ্রমও করবে না।
দুই-তিনটা আইটেম রাঁধতেই আপনার অনেক সময় লেগে যাবে! আপনি ভাবতে থাকেন, কেন আমি কোনো সময় পাই না। আর শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ভাবতে থাকে, দুজন মানুষ, কোনো কাজকর্ম নেই, করে কী সারাদিন?
এই আপনিই যখন আপনার প্রয়োজনীয় কাজকর্মগুলো শিখে যান, তখন একহাতে সংসার, বাচ্চাকাচ্চা সামলানো, বাচ্চাদের পড়ানো, স্বামীর খেদমত, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর-সবকিছু সমান তালে করতে পারেন। নিজেই নিজেকে দেখে অবাক হয়ে যান।
দেখেন না, আমাদের দেশে মেয়েদের যখন প্রথম সন্তান হয়, সে পারে না বাচ্চাকে কোলে নিতে, পারে না গোসল করাতে, পারে না কাপড়চোপড় পরাতে। সবকিছুতেই তার বড় একজনের সাহায্য লাগে। সন্তান জন্মের পর পুনরায় আবার স্বাভাবিক সংসারের কাজে ফিরে আসতে মেয়েটার বেশ সময় লেগে যায়। এ মেয়েটিই যখন দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেন, তার এই পরনির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যায়। যখন তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেন তখন সে একাই সব পারে। নারীরা এমনই।
আপনি মনে করলেন, এখন শুয়ে থাকব, কোনো কাজ করব না। কিন্তু আপনার অনেকগুলো জরুরি কাজ পড়ে আছে, করা দরকার। সকালের নাস্তা বানানোর সময় মনে হলো, থাক একটু পরে বানাই। কিছুক্ষণ ঘুমাই। আপনি কিছুক্ষণ গড়িমসি করতে করতে শুয়ে থাকলেন। বিছানা থেকে উঠে দেখলেন, হায় হায়, দেরি হয়ে গেছে। বাচ্চাদের টিফিন রেডি করতে হবে, মাদরাসায় নিয়ে যেতে হবে, খাওয়াতে হবে। অনেক কাজ দেখে সাথে সাথে মাথাটা আমার গরম হয়ে যায়।
তবে কাজগুলো জিম্মায় না রেখে সময়মতো যদি করে ফেলা যায়, তাহলেই বরং আরামের সময়টা কিছুটা হলেও বেশি পাওয়া যায়। কাজ সেরে যখন আরাম করা হয়, আরামটা তখন খাসা আরামই হয়। মনের মধ্যে তখন আর দায়িত্ববোধ ঘেউ ঘেউ করে না।
আমাদের সব মহিলাদেরই মোটামুটি আরেকটা কাজ করতে হয়, তা হলো— ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখা। স্বামী, ছেলে-মেয়ে বা গৃহচারিকা, হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মূল দায়িত্ব আপনারই থাকে। ভাবা দরকার, এই কাজটাকে আরেকটু সহজভাবে করা যায় কি না।
যেমন ধরুন আপনি যখন ঘর গোছানো শুরু করেন, তখন সবার প্রথমে বিছানাটা ঠিক করে ফেলতে পারেন। বিছানা ঘরের মধ্যে অনেক বড় জায়গা জুড়ে থাকে। বিছানাটা গুছিয়ে ফেলতে পারলে মনের মধ্যে একটা মোটিভেশন আসে। মনে হয়, এই তো গুছিয়ে ফেললাম। আর অল্প একটু বাকি আছে, কিছুক্ষণের মধ্যে এটুকুও হয়ে যাবে।
আমাদের সবার সংসারেই অনেক জিনিসপত্র থাকে। সংসারের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এসব টুকিটাকি জিনিসের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন, মাঝে মাঝে বাসার পরিবর্তনের সময় তারা অনুভব করতে পারেন, একটা সংসারে কত ধরনের জিনিস থাকে!
যাই হোক, ঘরবাড়ি গোছানোর কাজটা সহজ করতে চাইলে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তা হলো, দরকারি ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আলাদা করে ফেলা।
আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, দরকারি জিনিস তো বুঝি, কিন্তু কোন জিনিস ভবিষ্যতে আমার দরকার লাগবে না সেটা কীভাবে বুঝব?
গবেষণা বলে, কোনো জিনিস যদি ছয় মাসের মধ্যে আপনার কোনো কাজে না লাগে, বুঝতে হবে সে জিনিসের খুব একটা প্রয়োজন নেই। ছয় মাসের মধ্যে লাগেনি এ রকম কোনো জিনিস হাতের নাগালে রাখার দরকার নেই। হ্যাঁ, আপনার যদি বাসা পরিবর্তন করতে হয়, বিভিন্ন প্যাকেজিং সিস্টেম সংরক্ষণ রাখতে হয়, সেটা হাতের নাগালে রাখা লাগে না। সবাই সাধারণত এ ধরনের প্যাকেজিংগুলো টয়লেটের ফলস ছাদে রাখে।
এ ছাড়াও আপনি অনেক ঘরেই দেখতে পাবেন, এমন অনেক জিনিস তাদের হাতের কাছে আছে, যেগুলোর তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। অনেকের রান্নাঘরেও আপনি অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘনঘটা দেখতে পাবেন।
বিশেষ করে রান্নাঘরে বেশি জিনিস থাকলে সেটা পরিষ্কার করা আরও কঠিন, আরও সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। চিমনি থাকলেও কিছুটা তেল চিটচিটে ভাব থাকেই। আর চিমনি না থাকলে তো কথাই নেই। তাই ঘরের জিনিসপত্র যতটা সংক্ষেপ করা যায়, ততই সুবিধা।
সফল মানুষদের ওপর একটি গবেষণা করে দেখা যায়, রাতে ঘুমানোর আগে তারা রান্নাঘর পরিষ্কার করে তারপর ঘুমান। এটা অনেকটা আজকের কাজ আজই সেরে ফেলার মতো।
অধিকন্তু, আমাদের কাপড়চোপড় গোছানোর একটা ব্যাপার থাকে। কাপড়চোপড় এলোমেলো হলে সাথে সাথে যদি গুছিয়ে নেয়া হয়, তাহলে আর জমে না। একসাথে বেশি কাজ তৈরি হয় না।
কাপড়চোপড়ের ক্ষেত্রে যেগুলো আপনার পরতে ভালো লাগে না বা পুরোনো হয়ে গেছে বা অনেকদিন ধরে পরা হচ্ছে না, সেগুলো আপনি বাদ দিয়ে দিতে পারেন, অথবা দরিদ্র কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনার গোছগাছের আইটেম কমবে, সাথে আরেকজনের উপকার হবে। দয়া করে জমিয়ে রাখবেন না। মোটামুটি ব্যবহার উপযোগী থাকা অবস্থায় অন্য কাউকে দান করে দিলে শুধু গোছানোর কষ্ট কমবে না, দশ গুণ বেশি পাওয়ার পথ তৈরি হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ আছে,
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশ গুণ পাবে।৮৭
এ ছাড়া দুনিয়া ও আখিরাতে দানের একাধিক উপকারের সুসংবাদ কুরআন- হাদীসে পাওয়া যায়।
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ يَوْمِ يُصْبِحُ العِبَادُ فِيهِ، إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
'প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দানকারীর জন্য দুআ করে বলে, হে আল্লাহ, দানকারীর মালে বিনিময় দান করো (বিনিময় সম্পদ বৃদ্ধি করো)। আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদদুআ করে বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণের মাল ধ্বংস দাও।'৮৮
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِيْنَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنْفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمُ يَحْزَنُونَ
'যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে তা বলে বেড়ায় না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।'৮৯
আরেকটি কাজ আমাদের মায়েদের করতে হয়, তা হলো সন্তান লালন-পালন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে যথাযথ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্যারেন্টিং খুবই সহায়ক। শাশুড়ি-মা যখন দেখেন, বউ-মা তার নাতি-নাতনিদের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন, সাধারণভাবে এই বিষয়টা শাশুড়ি- মাকে প্রীত ও আশাবাদী করে। শাশুড়ি-মা এতে খুশি হন। আর যেসব শাশুড়ি- মায়েরা খুশি হয় না, তারা আসলে বউ-মার হাত আছে এমন কোনো কিছুতেই খুশি হন না। তারা সর্বদা ভয়ে থাকেন, বউ-মার কোনো কিছুতে উৎসাহ দিলে না জানি সে আবার মাথায় চড়ে বসবে কি না! তাদের কথা বাদ দিন। প্যারেন্টিং আপনার দায়িত্ব।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘মনে রেখো, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মনিবের সম্পদের ওপর দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’৯০
যেসব মায়েরা প্যারেন্টিংয়ের দায়িত্ব পালনে ধৈর্য রাখতে ব্যর্থ হন, তারা বাচ্চাদের দুষ্টামি দেখে বেশি বেশি দুষ্টামি করা শুরু করেন। চিল্লাচিল্লি, রাগঝাল, হইচই ঘরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। ঘর হয়ে যায় রীতিমতো নরক। এই ঘরের সবার মাথা থাকে গরম। স্বামী তখন বিভিন্ন অজুহাতে বাচ্চা ঘুমালে বাসায় আসার কথা ভাবেন। শ্বশুর-শাশুড়ি দেখেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে!
তখন আসলে সন্তান আপনাদের সকলের মাঝে আলাদা আলাদা দেয়াল তৈরি করতে থাকে। সন্তান তখন থাকে না আর সেতুবন্ধন।
আপনাকে অবশ্যই প্যারেন্টিং সম্পর্কে জানতে হবে, জানার চেষ্টায় থাকতে হবে। এটা আপনার খুব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। মানুষ তৈরি করার চিরন্তন প্রক্রিয়া মনে করে প্যারেন্টিং সম্পর্কে সচেতনতার সাথে জানাটা যেমন দায়িত্ব, তেমনই মানাটাও দায়িত্ব। প্যারেন্টিংয়ের এই কঠিন কাজটা কীভাবে সহজে করা যায় সে বিষয়ে কিছু চিন্তা-ফিকির করতে পারেন। কিতাবাদি পড়তে পারেন।⁹¹
এসবের বাইরেও আমাদের অনেকেরই অনেক কিছু করতে হয়। একেকজনের কাজের ক্ষেত্র একেক রকম। সাথে সাথে একেকজনের একেক রকমের দক্ষতা আছে। আমাদের আসলে শিখে নিতে হবে, যে বিষয়গুলোতে কমতি আছে সেগুলো কীভাবে আরেকটু ভালো করা যায়।
আপনার শৈল্পিক ঘরকন্না আপনার টাইম ম্যানেজমেন্টে যেমন সহায়ক হবে, তেমনই সমাজের জন্য নতুন কিছু করতে উৎসাহিত করবে। আপনি সময় নিয়ে চিন্তা করার সুযোগটুকু অন্তত পাবেন।
টিকাঃ
৮৭. সূরা আনআম, (৬): ১৬০
৮৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১০
৮৯. সূরা বাকারা, (২): ২৬২
৯০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৯
৯১. এ বিষয়ে উমেদ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখিকার 'ভালো মা-বাবার দুষ্টু বাচ্চা' বইটা সাহায্য করতে পারে।
📄 আকর্ষণীয় নারী হতে কোন ব্র্যান্ডের মেকআপ প্রয়োজন?
সাজগোজ, সৌন্দর্য নারীদের একটি দুর্বল দিক। কারণে-অকারণে সে সাজতে ভালোবাসে এবং সেই সৌন্দর্য আরেকজনকে দেখাতে পছন্দ করে।
'এই সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে' সেই ভয় দেখিয়ে ফেমিনিস্টরা আমাদের সতর্ক করে-সংসারের ঘানি মাথায় নিয়ো না, সন্তান ধারণের দরকার কী? ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়বে; তারচেয়ে নিজেকে সুন্দর রাখো, আকর্ষণীয় হও, নজর কাড়ো।
আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য নারীরা যত সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে, মেকআপ ইন্ডাস্ট্রিগুলো তত শক্তিশালী হচ্ছে। মার্কেট রিসার্চ থেকে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী Beauty Industry (সৌন্দর্য শিল্প) দিনের পর দিন শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২০ সালের ৪৮৩ বিলিয়ন ডলারের এই মার্কেট ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ৫১১ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা নাকি ৭১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ব্যক্তিগত বিউটি প্রোডাক্টগুলোর ব্যবহার যেমন দিন দিন বাড়ছে, অলিতে- গলিতে গড়ে ওঠা পার্লারগুলোতেও এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সবকিছুর পেছনে আছে নারীর আকর্ষণীয় হবার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।
ধরুন দশজন একসাথে বসে আছেন, গল্পগুজব করছেন। এই দশজনের মধ্যে দু-একজন এমন থাকবে, যাদের প্রতি অন্যান্যরা একধরনের টান বা আকর্ষণ অনুভব করবে। প্রশ্ন হলো, তাদের কোন বিষয়টা অন্যদের আকৃষ্ট করছে? তাদের সাজগোজ, পোশাক-আশাক, কালার ম্যাচিং করা জুতা-ঘড়ি-চশমা, অলংকারাদি-কোনটা?
নাকি তাদের কথা বলার ধরন, তাদের আত্মবিশ্বাস, কণ্ঠের দৃঢ়তা, তাদের সহানুভূতি, তাদের সহমর্মিতা, তাদের বিচক্ষণতা? অর্থাৎ ভেতরের সৌন্দর্য নাকি বাইরের সৌন্দর্য? কোন জিনিসটা আপনাকে আকৃষ্ট করে? বাইরের সৌন্দর্য হয়তো নজর কাড়ে, কিন্তু আন্তরিকভাবে আকৃষ্ট করে কোনটি?
আপনার আশেপাশে যত পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের সবাইকে কিন্তু আপনার একই রকম ভালো লাগে না। কাউকে বেশি ভালো লাগে, কাউকে কম। আপনার কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে আপনি বেশি টান অনুভব করেন, সেগুলো কী কী?
আপনি হয়তো বলবেন, আমার অমুক আপুকে খুব ভালো লাগে। কারণ তিনি খুব হাসিখুশি। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকে। হতাশার কোনো কথা আপুর মুখে কোনো দিন শুনিনি। দুঃখ-কষ্ট আমাদের সবার জীবনেই আছে, কিন্তু কারও সাথে মুখ ভার করে ব্যর্থতা, অপূর্ণতার গল্প করতে শুনিনি; বরং চোখের দিকে তাকিয়ে, হাত নেড়ে আপুকে বলতে শুনি, 'সমস্যা আজ আছে কাল নেই, একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।' নিজে যেমন আশা নিয়ে বাঁচেন, তেমনই অন্যের মনের মধ্যেও আশা জাগাতে পারেন। একটা মানুষ হাসিমুখে সবকিছু কীভাবে ম্যানেজ করেন উনাকে না দেখলে বোঝা যায় না। কাজকাম তো আমরা সবাই করি, কিন্তু হাসিমুখে কাজ করা বা আনন্দের সাথে কাজ কয়জন করতে পারে।
আবার বলবেন, অমুক খালাকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ, এই মানুষটার মধ্যে তার আবেগ-অনুভূতি বা আচরণ নিয়ন্ত্রণের চমৎকার ক্ষমতা আছে। উনার সাথে যে যেমন ইচ্ছা আচরণই করুক না কেন, উনার সেই আদরমাখা প্রতিক্রিয়ার কোনো অন্যথা হবে না। কখনো রাগের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কিন্তু দেখিনি-উনি পাল্টা রাগঝাল করে পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলেছেন। পারিপার্শ্বিকতা যেমনই হোক না কেন, প্রতিক্রিয়া যেন একদম উনার হাতের মুঠোয়।
আপনার দাদিকে খুব ভালো লাগে, কারণ তিনি খুবই রসিক। উনার সাথে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়। ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পেলেই মনে হয়, ওই মানুষটার সাথে কিছুটা সময় কাটাই। সাধারণত আমাদের দেশের রসিকতাগুলো অন্য কাউকে ছোট করা, অপমানিত করা হয়, অশ্লীলতা ও মিথ্যা নিয়েই বেশি সাজানো। কিন্তু মুসলমানের রসিকতাও যে কতটা সত্য ও শালীন হতে পারে, তা উনার রসিকতা থেকে বোঝা যায়। এ ব্যাপারে উনার হিকমত এতটা বেশি যে, রসিকতার সময়ও পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সামনের জনের মানসিক-শারীরিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখেন। অনেকেই করতে পারে, কিন্তু উনারটা অন্যরকম।
আবার আপনি হয়তো বলবেন, অমুক ভাবিকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ, সে কখনো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলে না। আচরণের মধ্যে একধরনের স্বচ্ছতা আছে। মনের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ, রাগ, হিংসা পুষে রাখে না। কোনো কিছুতে আমাদের থেকে কষ্ট পেলেও স্পষ্টভাবে বিনয়ের সাথে জানিয়ে দেন। কথা বলার সময় কিছু গোপন করা বা কাটছাঁট করে বলা উনার সাথে যায় না।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা মতে, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষদের মধ্যে ঠিক এই ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলোই দেখা যায়। তাদের গবেষণায় আরও পাওয়া যায়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ খুব বিনয়ের সাথে না বলতে পারেন। কম গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন কাজগুলোকে হঠাৎ নাকচ করতে পারেন বা এড়িয়ে চলেন। যাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিপূর্ণ ফোকাস করতে সমস্যা না হয়। সাময়িকভাবে অনেকে তাদের খারাপ ভাবলেও পরবর্তী সময়ে ভালোবাসে।
আমি হলফ করে বলতে পারি, মানুষের ব্যক্তিত্বের এইসব বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মুগ্ধ করে, ভীষণভাবে টানে।
আসুন, আকর্ষণীয় হতে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির নামকরা সব ব্র্যান্ডের দিকে না ঝুঁকে নিজের ভেতরের জগৎটাকে আরেকবার খুঁটিয়ে দেখি। না জানি কত মণি-মুক্তা সেখানে অবহেলায় পড়ে আছে।