📄 কাকে গুরুত্ব দেব? কখন গুরুত্ব দেব?
বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আপনি শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন। এখানে আপনার সবচেয়ে আপন কে? অর্থাৎ মৌলিক সম্পর্ক কার সাথে? আপনার স্বামী, ঠিক?
স্বামী যাদের সাথে যে স্তরের সম্পৃক্ত, তারা আপনার সেই স্তরের আপন। আপনার স্বামীর সাথে আপনার শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আপনি তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ, সম্পৃক্ত।
আল্লাহ না করুক, কোনো কারণে যদি আপনার স্বামীর সাথে আপনার ছাড়াছাড়ি হয়, তবে স্বামীর মাধ্যমে যাদের সাথে সম্পর্ক হয়েছিল, সব নাজুক বা বাতিল হয়ে যাবে।
হ্যাঁ, আপনি আপনার শাশুড়ির খেদমত করেন স্বামীর সাথে আপনার সম্পর্ক সুন্দর করার জন্য। আপনি দেবর, ননদ নিয়ে মিলে থাকেন আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুন্দর করার জন্য। মূল সম্পর্কের মান যথাযথ রেখে বাকি সম্পর্কের যত্ন নেয়া মোটাদাগে সব সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। অর্থাৎ অন্য সম্পর্কের জন্য শ্রম দিলেও তা হবে মূল সম্পর্ককে ভালো রাখার জন্য।
সম্পর্কের আপন-পর বুঝতে পারাটা খুবই জরুরি। তা না হলে বাবার চেয়ে বন্ধু আপন হয়ে যায়; স্বামীর চেয়ে দেবর বেশি আপন হয়ে যায়; শাশুড়ির চেয়ে চাচি শাশুড়ি, খালা শাশুড়ি বেশি আপন হয়ে যায়।
আপনি যখন আপন-পর বুঝে আপনার কাজগুলো সাজাতে থাকবেন, তখন আপনার স্বামীর আপনার সাথে সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো হতে থাকবে। কারণ, তখন আপনি শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যের হক আদায় করবেন স্বামীর সাথে আপনার সম্পর্কের ভিত্তিতে। যেমন ধরুন, কেউ যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহ তাআলার অন্যান্য সব সৃষ্টির হক আদায় করে, তবে তার সাথে আল্লাহ তাআলার সম্পর্ক ভালো হতে থাকে।
শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য কারও সাথে এমন কোনো সম্পৃক্ততা রাখা ঠিক না যেখানে প্রধান সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হয়। আপনার স্বামী চান না আপনি অমুকের সাথে মেশেন, তাহলে আপনি কেন মিশবেন! আবার এই নতুন সম্পর্কের কারও সাথে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে হয়তো আপনার শাশুড়ি চান না, তাহলে আপনার কী দরকার? আপনার শাশুড়ি বা আপনার স্বামী উনাদের পরিবারের অন্যান্যদের সম্পর্কে আপনার চেয়ে বেশি জানেন। তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করা আপনার জন্য বেশি নিরাপদ। মোটকথা, আপনি অন্যান্য সকল সম্পর্কের যত্ন নেবেন প্রধান সম্পর্কের যত্নের স্বার্থে।
ধরুন, সবার সাথে আপনার সম্পর্ক ভালো হলো, কিন্তু স্বামীর সাথেই টানাপড়েন। তাহলে আপনার এই ভারসাম্যহীন সম্পৃক্ততা আপনাকে কতদিন ভালো রাখবে?
আর সত্যি বলতে কি, একসাথে দুই-তিন জনকে খুশি করা, মন জয় করা তুলনামূলক কঠিন, কখনো কখনো অসম্ভব। কারও অফিসে যদি একাধিক বস থাকে, তাহলে কর্মচারীদের কী দুর্ভোগটাই-না হয়! অবস্থা অনেকটা ফুটবল খেলার ফুটবলের মতো হয়ে যায়। একজন একদিক থেকে কিক করে, আরেকজন আরেক দিক থেকে।
এ ধরনের দুর্ভোগ থেকে আমাদের বাঁচাতে আল্লাহ তাআলা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা সূরা যুমার-এ বলেছেন, ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا رَّجُلًا فِيْهِ شُرَكَاءُ مُتَكِسُوْنَ وَرَجُلًا سَلَمَا لِرَّجُلٍ هَلْ يَسْتَوِيْنِ مَثَلًا 'আল্লাহ এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, একটি লোকের পরস্পর-বিরোধী কয়জন মালিক রয়েছে, আর আরেক ব্যক্তির প্রভু মাত্র একজন, তাদের উভয়ের অবস্থা কি সমান?'৭৭
যদিও আমাদের সমাজে একটা কথা বহুল-প্রচলিত আছে যে, বিয়ে একজন মানুষের সাথে না; বরং একটি পরিবারের সাথে হয়। একজন মানুষের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে স্বামী-স্ত্রী যাত্রা শুরু করে। কিন্তু সে পরিবারের সবার যদি মন জয় করতে হয়, আমি যা না তা-ই করতে হয়, তবে সেগুলো কষ্টকর। এসব ভুল ধারণা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। একজন মানুষ তো সবার মন জয় করতে পারে না। আপনি যা না তা প্রমাণ করার তো দরকার নেই। আমাদের সবারই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতাগুলো আমরা বাস্তবে মেনে নিয়ে চলতে শিখি, ভেতরে চেষ্টা রাখি সীমাবদ্ধতাকে ওভারকাম করার।
সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যখন সংসারের জন্য, সম্পর্কের জন্য করা হয়, একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়; তখন চিৎকার-চেঁচামেচি-চিল্লাচিল্লি শুরু হয়। সবাই অবাক হয়ে বলতে থাকে, সে তো এতদিন এমন ছিল না, সে এগুলো করে আসছে, আজকে কেন পারছে না? আপনার কষ্ট বা সীমাবদ্ধতাগুলো তখন কেউ দেখবে না; বরং সরাসরি দোষগুলো আবার আপনার ঘাড়ে চলে যাবে। সবাই ভাববে, ইচ্ছে করে আপনি এখন আর তাদের জন্য করছেন না।
বস্তুত সবার কাছে তো ভালো হওয়ার দরকার নেই। আর সবাই কখনো একসাথে আপনাকে ভালো বলবেও না। এ জন্য খেয়াল রাখা দরকার, নিজেরা কীভাবে ভালো থাকা যায়। নিজেরা বলতে মৌলিক সম্পর্কে সম্পৃক্তরা। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ যখন গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকে গুরুত্ব না দেয় তখন তার অধঃপতন শুরু হয়।
সম্পর্কের গুরুত্ব মাথায় রেখে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে আপনি যখন আপনার কাজগুলো সাজাতে চাইবেন তখন প্রথমে আপনাকে আপনার কাজগুলো চিনতে হবে। কাজ কীভাবে চিনতে হয় সে সম্পর্কে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় বিভিন্ন পদ্ধতি আছে।
যেমন : প্রথমে সমস্ত কাজকে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ দুই ভাগে ভাগ করে নেয়া হয়। জরুরি বলতে বোঝায় এখনই করতে হবে, আর গুরুত্বপূর্ণ বলতে বোঝায় কাজটা খুবই করা দরকার; কিন্তু এখনই করতে হবে এমন না, পরে করলেও হবে।
কিছু কাজ থাকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জরুরি না। আবার কিছু কাজ থাকে জরুরি, কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ না। যেমন: টয়লেটে যাওয়া খুবই জরুরি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। আপনি নিজের জন্য একটি লিস্ট করে তৈরি করে ফেলতে পারেন—আপনার জন্য জরুরি কাজ কী কী এবং আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী কী।
জরুরি কাজ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রান্না করা, বাচ্চাদের খাওয়ানো, পড়ানো, কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা করা ইত্যাদি। গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতনতা, লক্ষ্যের পেছনে কাজ করা, সম্পর্ককে সুন্দর করা, আত্মোন্নয়ন ইত্যাদি। এই কাজগুলো আমাদের একে অন্যের থেকে আলাদা করে।
এর সাথে সাথে খুঁজে বের করতে হবে, কোন কাজগুলো জরুরিও না, গুরুত্বপূর্ণও না। এ ধরনের কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে সবচেয়ে বেশি বাধা দেয়। যেমন ধরুন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্যাপ করতে থাকা। কোন দিক দিয়ে সময় চলে যাবে আপনি নিজেও টের পাবেন না। এই টাইম ওয়েস্টারগুলো শনাক্ত করে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভিত্তিতে নিজের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারলে জীবনে ভালো কাজের সংখ্যা বাড়ানো কিছুটা হলেও সম্ভব।
এখন দেখি, আমাদের মুসলিমদের জন্য পরিপূর্ণ জীবনব্যবব্যবস্থা 'ইসলাম' এই কাজটাকে কীভাবে করেছে?
ইসলামী শরীয়ত প্রথমেই সমস্ত কাজকে জায়েয-নাজায়েয এর ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। গুরুত্ব অনুযায়ী সকল কাজকে ক্যাটাগরাইজ করে ফেলেছে। এমনকি দুইটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি একসাথে সামনা-সামনি চলে আসে, তাহলে কোন কাজটাকে আগে করতে হবে, মানুষ যেন সেটা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে সেই নির্দেশনাও পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে।
এমনকি সময় বা পরিস্থিতি সাপেক্ষে আমলের গুরুত্ব যে পরিবর্তিত হয়, সেটাও ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। যেমন, ইসলামের মহিমান্বিত এই জীবনব্যবব্যবস্থায় নামাজকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল বলা হয়, কিন্তু সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায় না করে যিকিরকে উৎসাহিত করা হয়। আপনি অফিসে কাজ করছেন বা সংসারের কাজে খুব ব্যস্ত, নামাজের সময় হলে অফিস বা সংসারের কাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে নামাজে দাঁড়িয়ে যাওয়া। আবার হায়েয- নেফাসের সময় নামাজ বা তিলাওয়াত না করে নিজের যত্ন, বাচ্চার যত্নকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।
আবার সালাতের মধ্যেও এই গুরুত্ব শেখানো হয়। ফরজ নামাজের গুরুত্ব এক রকম, ওয়াজিবের গুরুত্ব আরেক রকম; সুন্নাত নফল নামাজের গুরুত্ব আরেক রকম। ছোট-বড় সব কাজের গুরুত্ব সময়, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে পরিবর্তিত হতে পারে।
সংসারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার জন্য কোন কাজটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।
সময়, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে আপনার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজটিও গুরুত্ব হারাতে পারে। রমযানের সিয়াম পালন করা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। রমযানের রোজা রাখা বাধ্যতামূলক একটি আমল। ইসলামী দেশে রমযান মাসে কেউ যদি প্রকাশ্যে খাবার খায়, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সুযোগও সরকারের আছে। কিন্তু সফরে এই সিয়ামের হুকুমকেও শিথিল করা হয়েছে।
সম্পর্ক ও সম্পর্কের ফলে কাজকে গুরুত্বের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে পারলে সংসারের সময়টা খুব ভালো কাটে।
টিকাঃ
৭৭. সূরা যুমার, (৩৯) : ২৯
📄 স্বামীর আনুগত্য
আনুগত্য বলতে আমরা বুঝি, আপনি করে কথা বলা, সম্মান দিয়ে চলা। দেখা গেল, স্বামী আমার কোনো একটা কাজ পছন্দ করে না, আমি হরহামেশা সেটা করে যাচ্ছি; কিন্তু মুখে ওই যে 'আপনি' করে কথা বলছি, তার মানে আমি আনুগত্য করি। সামনে 'আপনি' করে বললেই হবে, পেছনে যদি 'তুই' করে কথা বলি বা গালিগালাজ করি বা বদনাম করি, তাতেও খুব একটা সমস্যা নেই। এই তো আমাদের আনুগত্যের ধরন!
এ যুগে যদি আপনি আনুগত্যের কোনো জীবন্ত নজির দেখতে চান, তবে কর্পোরেট দুনিয়ায় দেখতে পাবেন। মাল্টিন্যাশনাল কোনো কোম্পানির অফিসে গেলে আনুগত্যের সংজ্ঞাকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে বসদের কীভাবে আনুগত্য করা হয়! আপনি অবাক হয়ে যাবেন, যে নারী স্বামীর কোনো হুকুম মানাকে সম্মানের হানিকর মনে করে, সেও কীভাবে বসের আনুগত্য করে। বস যদি বলে, আজ রাত দশটায় বাড়ি ফিরতে হবে, কাজ আছে।
তবে খুব কম এমপ্লয়ি প্রশ্ন তোলে, কেন আপনি সন্ধ্যা ছয়টার পরে থাকতে বলছেন? বরং সবাই তাদের অন্যান্য সিডিউল ম্যানেজ করে বসের কথাকেই মেনে নেয়। এমনকি ডে-আউট, পিকনিক বা যেকোনো অনুষ্ঠানে বস যদি কোনো গুনাহও করতে বলে, তবে সেখানেও অহরহ আনুগত্যের নজির মেলে। চিন্তা করা যায়, বসের কথার আনুগত্য করতে নর্তকীর সাথে নাচতেও রাজি হয়ে যায় নামাজী মুসলমান! হাতেগোনা দুয়েকজন ব্যতিক্রম থাকে, কিন্তু তারা আর ভালো এমপ্লয়ি হতে পারে না। কর্পোরেট জগতে অধিকার বা নিয়ম নিয়ে কথা হয় না, কথা হয় আনুগত্য নিয়ে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি শ্রম ও সময় দিয়ে সেখানে আনুগত্য করা হয়। যে বসের যত আনুগত্য করে, সে এমপ্লয়ি বসের তত প্রিয়।
রাজনীতির মাঠে বড় বড় নেতাদের মন কারা জয় করতে পারে? সেখানেও এই তালিকা যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় না; বরং আনুগত্যের ভিত্তিতে।
সামরিক শাসনেও আপনি আনুগত্যের নজির দেখতে পাবেন। কমান্ডার সেনাদেরকে যেভাবে হুকুম করে, তারা ঠিক সেইভাবে পালন করে। যদি বলে গুলি করতে, তো কোনো প্রশ্ন না করে সরাসরি গুলি করে। বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে গেলে দেখা যায়, উচ্চ পদের কাউকে কীভাবে সবাই সম্মান করে, মানে। হিটলারের সেনাবাহিনীর মধ্যেও আনুগত্যের নজির আছে। একবার কোনো একটা পাহাড়ের ওপর সৈন্যদের মার্চ করানো হচ্ছিল। এমন সময় কমান্ডার Go বলেছে, কিন্তু Stop বলেনি। পাহাড়ের ধারে চলে এসেছে, কিন্তু তারপরও সৈন্যরা মার্চ করা স্টপ করেনি। পাহাড় থেকে নিচে পড়ে অনেক সৈন্য তখন মারা যায়। হিটলার তার এই সেনাবাহিনী নিয়ে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখত।
যে দলে আনুগত্য থাকে সে দল শক্তিশালী হয়ে যায়। আমাদের পূর্বপুরুষ সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও এই গুণের এত অনুশীলন ছিল যে, তাদের দেখে কাফের মুশরিকরা ভয়ে কেঁপে উঠত, এই ভয় বদরের যুদ্ধের পর থেকে শুরু হয়নি; বরং এর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
আনুগত্যের অনেক পর্যায় আছে। স্বামীর হুকুম মানা একটা পর্যায়, স্বামী যা পছন্দ করে সেটা করা আরেকটা পর্যায়; স্বামীর পছন্দনীয় কাজ করা এবং অপছন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকা একটি পর্যায়, স্বামীর মাইন্ডসেট বা মেজাজ, চিন্তাধারা বা বিশ্বাসকে বুঝে চলা আরেকটি পর্যায়।
স্ত্রী যখন এ বিষয়টি পারে, তখন মুখ দেখেই মনের কথাগুলো বুঝে যাওয়া যায়। স্বামীর চিন্তার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করা যায়। তখন স্বামীর সুখ-দুঃখের প্রকৃত ভাগী হওয়া যায়। কম্প্রোমাইজ এর অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়া যায়। হাতে হাত রেখে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পেছনে ছুটে চলা যায়।
দীর্ঘমেয়াদে ভালো একটি সম্পর্ক তৈরি করতে আনুগত্য লাগে। এটাই প্রকৃত খেদমত, এটাই আরাম পৌঁছানো। এর মাধ্যমে স্ত্রী হয় স্বামীর নির্ভরতার জায়গা। স্বামীর চোখের শীতলতা। কোনো স্বামী যখন বলেন আমার স্ত্রী খুব ভালো, এর মানে এই না যে, তার স্ত্রীর যোগ্যতা অনেক বেশি; বরং সে অত্যন্ত অনুগত। স্বামীর আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআনে কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বহু দিকনির্দেশনা আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন নারী শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন,
مَا اسْتَفَادَ الْمُؤْمِنُ بَعْدَ تَقْوَى اللَّهِ خَيْرًا لَهُ مِنْ زَوْجَةٍ صَالِحَةٍ، إِنْ أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ، وَإِنْ نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ، وَإِنْ أَقْسَمَ عَلَيْهَا أَبَرَّتْهُ، وَإِنْ غَابَ عَنْهَا نَصَحَتْهُ فِي نَفْسِهَا وَمَالِهِ
‘কোনো মুমিনের জন্য আল্লাহর তাকওয়া অর্জনের পর নেককার স্ত্রীর চেয়ে কল্যাণকর কিছু নেই। কারণ স্বামী তাকে আদেশ করলে সে আনুগত্য করে, তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে সে (স্বামী) মুগ্ধ হয়। তাকে নিয়ে শপথ করলে সে তা (শপথকৃত কর্ম) পূরণ করে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে (অন্যায়-অপকর্ম থেকে) এবং স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করে।’ ৭৮
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা নিসার মধ্যে বলেছেন, فَالصُّلِحُتُ قُنِتُتْ ‘সতীসাধ্বী নারীগণ অনুগতা।’ ৭৯
হযরত হুসাইন ইবনু মুহসিন থেকে বর্ণিত, তাঁর এক ফুফু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কোনো প্রয়োজনে এসেছিলেন। তাঁর প্রয়োজন পূর্ণ হলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি বিবাহিতা? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি স্বামীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে থাকো? তিনি বললেন, আমি একেবারে অপারগ না হলে তার সেবা ও আনুগত্যে ত্রুটি করি না।
তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘স্বামীর সঙ্গে তোমার আচরণ কেমন তা ভেবে দেখো। কারণ, স্বামীই তোমার জান্নাত কিংবা জাহান্নام।’ ৮০
হযরত আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাযি. বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ ‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমযান মাসের রোজা রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং স্বামীর অনুগত থাকে, তাকে বলা হবে, তুমি যে দরজা দিয়ে চাও জান্নাতে প্রবেশ করো।’ ৮১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اطَّلَعْتُ فِي النَّارِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম যে, এর অধিকাংশ অধিবাসী হলো নারী।'৮২
এর কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল ও তাদের স্বামীদের প্রতি তাদের আনুগত্যের মাত্রা হলো অত্যন্ত কম; এবং তারা অধিক পরিমাণে তাবাররুজ (খোলামেলা অবাধ মেলামেশা) করে থাকে। তাবাররুজ করার মানে হলো নারীদের বাইরে যাবার উদ্দেশ্যে গৌরবমণ্ডিত দামি পোশাক পরিধান করা, সৌন্দর্য চর্চা ও সাজসজ্জা গ্রহণ করা, প্রসাধনী দ্রব্য ব্যবহার করা এবং অন্যদের আকর্ষিত করার জন্য বেরিয়ে পড়া। যদিও সে নিরাপদে ফিরে আসে, কিন্তু সে মানুষকে নিরাপদে থাকতে দেয় না।
আওফ আশ-শায়বানী রহ.-এর মেয়ের বিয়ে হলে স্বামীর হাতে মেয়েকে তুলে দেয়ার মুহূর্তে মা উমামা বিনতে হারেস রহ. মেয়েকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, 'মেয়ে আমার, যে ঘরে তুমি বেড়ে উঠেছ, খুশি ও আনন্দে যাকে ভরে রেখেছ, সে ঘর ছেড়ে অপরিচিত ঘরে অপরিচিত একজন মানুষের কাছে তুমি যাচ্ছ। জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার কয়টি নসীহত মনে রেখো। এগুলো তোমার সুখী দাম্পত্য-জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। (তার অনেক নসীহতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নসীহত ছিল) সে তোমাকে কোনো আদেশ করলে কখনো তা অমান্য করবে না। এবং তার ব্যক্তিগত কোনো কথা অন্য কারও কাছে প্রকাশ করবে না। মনে রাখবে, নিজের চাওয়া ও চাহিদার ওপর স্বামীর চাওয়া ও চাহিদাকে প্রাধান্য না দেয়া পর্যন্ত তুমি কখনো তার মন জয় করতে পারবে না। তুমি যদি তার দাসী হও, তাহলে সে তোমার দাস হবে।'৮৩
মুসলিমাদের জন্য এই দিকনির্দেশনাগুলোর ওপরে আর কোনো অনুপ্রেরণা নেই। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের হুকুম আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তবে এটাও ঠিক, সব স্বামী এক রকম হয় না; কেউ কেউ থাকে অস্বাভাবিক বিকৃত রুচির, ঘরে তার আচরণ পশুর চেয়ে কোনো অংশে কম না। আল্লাহ তাআলা এ ধরনের স্বামীদের থেকে নারীদের হেফাজত করুন। এসব জালিম স্বামীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীরা তাদের সমস্যা নিয়ে কোনো হক্কানী মুরুব্বির সাথে আলোচনা করতে পারেন বা কোনো মেন্টর বা কাউন্সিলরের সাথে কথা বলতে পারেন। ভেঙে পড়বেন না, সাহস হারাবেন না। আপনার সমস্যা সমাধানের পথ আপনাকেই বের করতে হবে। কিন্তু সাধারণভাবে স্বামীগণ নারীদের জন্য অভিভাবক। তবে সে যদি আল্লাহ তাআলার নাফরমানীসূচক কোনো কাজে হুকুম করে, তবে অবশ্যই সে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ 'আল্লাহর নাফরমানীতে কোনো আনুগত্য হতে পারে না। আনুগত্য শুধুই ন্যায়সংগত বিষয়ে।'৮৪
এখন আপনার মনে হতে পারে, এতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো হবে। বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক ভালো করতে এগুলো কীভাবে সহায়ক?
সহায়ক হবে। পরিবারের মধ্যে যেকোনো একটা ভালো সম্পর্ক আরও একটি সম্পর্ককে ভালো হতে প্রভাবিত করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুন্দর, বাবা-মার সাথে সন্তানের সম্পর্ক সুন্দর হয়, শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক সুন্দর হয়। তবে এটা ঠিক, অনেক শাশুড়ি আছে ছেলে-বউয়ের সুন্দর সম্পর্ক সহ্যই করতে পারে না! যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো নাও হয়, তারপরও আপনি আঁকড়ে ধরে বাঁচার একটা শক্ত অবলম্বন নিশ্চয়ই পাবেন। আপনার স্বামীকে আপনার পাশে পাবেন। এটাই-বা কম কিসে?
সবশেষে দুজন মহীয়সী নারীর আনুগত্যের ছোট্ট দুটি নজির দিয়ে আনুগত্যের পয়েন্টটা সম্পন্ন করতে চাই। তাঁদের মধ্যে একজন আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী। অপরজন দ্বিতীয় উমর খ্যাত খলীফা উমর ইবনু আবদুল আযীয রহিমাহুল্লাহর স্ত্রী।
উনাদের আনুগত্যের দৃষ্টান্ত শুধু স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় বিদ্যমান ছিল তা না; বরং স্বামীর মৃত্যুর পরও মহীয়সী নারীগণ দেখিয়েছেন স্বামীর প্রতি আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা।
হযরত আসমা বিনতু উমাইস রাযি. হযরত আবু বকর রাযি.-এর স্ত্রী। মৃত্যুর সময় আমীরুল মুমিনীন স্ত্রীকে ওসীয়ত করে বলেছিলেন, আমি ইনতিকাল করলে তুমিই আমাকে গোসল দেবে।
আসমা রাযি. সেদিন রোজা রেখেছিলেন। রোজা রেখে গোসল দেয়া ও মৃত্যু-পরবর্তী শোকপরিস্থিতি সামলানো কষ্ট হবে ভেবে আবু বকর রাযি. তাকে সে সময় রোজা ভাঙতে বলেছিলেন। কেমন যত্নবান স্বামী ছিলেন তিনি, মৃত্যুর সময়ও স্ত্রীর প্রতি খেয়াল কোনো অংশে কমেনি। আমাদের পূর্বপুরুষ, আমাদের আদর্শ এমনই অসাধারণ।
আবু বকর রাযি. ইনতিকাল করলে তিনিই তাকে গোসল দেন। তবে মৃত্যু-পরবর্তী শোকের পরিবেশ ও বিভিন্ন ব্যস্ততায় রোজা ভাঙার কথা ভুলে যান।
আবু বকর রাযি.-এর দাফনের পর দিনের শেষে মনে পড়ে এ কথা। তখন দোদুল্যমান হয়ে পড়েন আসমা রাযি.। দিন প্রায় শেষ। ইফতারের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। একটু পড়েই আজান হবে। এ অল্প সময়ের জন্য রোজা ভেঙে ফেলবেন? কিন্তু রোজা না ভাঙলে তো স্বামীর কথাও মানা হবে না। স্বামীর আনুগত্য করা হবে না। তাই স্বামীর কথামতো দিন শেষ হয়ে এলেও রোজা ভেঙে ফেলেন তিনি। ৮৫
কেমন ব্যক্তিত্ব! কেমন স্ত্রী! কেমন স্বামী!
পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম সৌভাগ্যের অধিকারিণী আরেকজন নারী। তার বাবাও ছিলেন খলীফা, স্বামীও ছিলেন খলীফা, চার ভাইও ছিলেন খলীফা। হযরত ফাতিমা বিনতু আবদুল মালিক বিন মারওয়ান।
তিনি উমর ইবনু আবদুল আযীযের স্ত্রী। তার চার ভাইও একের পর এক খলীফা হয়েছেন। পরম আদর-যত্নে লালিত-পালিত এ মহিলার বিয়েও হয়েছে মহা ধুমধামের সাথে। বাবা তৎকালীন খলীফা আবদুল মালিক সোনা-গয়না, হিরে-জহরতের 'ভার' যেন উজাড় করে দিয়েছিলেন মেয়ের বিয়েতে। তবে উমর বিন আবদুল আযীয যখন খলীফা হন স্ত্রীকে সমুদয় গহনা বাইতুল মালে জমা দিতে বলেন। ফাতিমা রহ.-ও স্বামীর কথামতো সবকিছু বাইতুল মালে দিয়ে দেন। খেলাফতের দুই বছরের মাথায় উমর বিন আবদুল আযীয রহ. যখন মারা যান, স্ত্রী-সন্তান-সন্ততির জন্য ওয়ারাসাত হিসেবে কোনো সম্পদ ছিল না।
ফাতিমা রহ.-এর ভাই ইয়াযিদ ইবনু আবদুল মালিক যখন উমর ইবনু আবদুল আযীযের মৃত্যুর পর খলীফা হন, তখন বোনকে বাইতুল মাল থেকে তার সমুদয় সোনা-গহনা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন।
তিনি তখন বললেন, এসব তো আমীরুল মুমিনের কথামতো বাইতুল মালে দান করে দিয়েছি,
مَا كُنْتُ لِأُطِيعَهُ حَيّاً، وَأَعْصِيَهُ مَيِّتاً
'আমি জীবিতাবস্থায় তার আনুগত্য করে মৃত্যুর পর তার অবাধ্য হতে পারব না।'৮৬
স্বামীর আনুগত্য করতে পারাটা লজ্জার কিছু না; বরং এই আনুগত্য আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। যারা এই আনুগত্যকে সম্মান ও ব্যক্তিত্বের হানিকররূপে আমাদের সামনে তুলে ধরে, তাদের না আছে সংসার, না আছে স্বামী, না আছে স্ত্রী, না আছে কোনো শান্তি। দেখেছেন না, কীভাবে সুইসাইড করে ধুমধাম মরে যায়।
টিকাঃ
৭৮. সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস নং ১৮৫৭। হাসান গরীব।
৭৯. সূরা নিসা, (৪) : ৩৪
৮০. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৯০০৩। হাসান।
৮১. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৬৬১। হাসান লিগায়রিহি।
৮২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৪১, ৫১৯৮, ৬৪৪৯, ৬৫৪৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৭
৮৩. আবু হাতিম সাজিসতানী (মৃত্যু ২৪৮ হি.); আল-মুআমমারূনা ওয়াল ওয়াসায়া, ৩৬-৩৭। (মাসিক আল কাউসার হতে গৃহীত)
৮৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪০
৮৫. তবাকাতু ইবনি সাআদ, ৮/২৮৪। (মাসিক আল কাউসার হতে গৃহীত)
৮৬. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ১৬০৩। (মাসিক আল কাউসার হতে গৃহীত)
📄 নিজের কাজটুকুতে দক্ষ হওয়া
যে কাজগুলো আপনাকে করতেই হয় সে কাজগুলো অন্তত ভালোভাবে শিখে রাখাটা ভীষণভাবে আপনাকে সাহায্য করবে।
সাধারণত আমাদের নারীদের কিছু কাজ করতেই হয়। যেমন: রান্না করা, ঘরদোর গুছিয়ে রাখা, বিশেষ করে রান্নাঘরটা, মেহমান এলে মেহমানদারী করা আর সন্তান লালন-পালন তো আছেই। যারা চাকরি করেন তারা যে গৃহের এ কাজগুলো থেকে নিজেদের খুব একটা দূরে রাখতে পারেন, তা না।
স্বাভাবিকভাবে বাহির-ভেতর উনারাই সামলান; হ্যাঁ, ব্যতিক্রম কিছু আছে, সেটা তো থাকবেই।
আপনি যদি চাকরিজীবী হন, তাহলে আপনার চাকরির ডোমেইনে আপনি দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। চাকরিটাও সুন্দর করে করলেন। মানুষ যখন তার নিজের কাজটা সুন্দরভাবে করে, তখন আর না-নানা দায়িত্বগুলো মনের ভেতরে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে না। ভেতরে কেমন যেন আর খুঁতখুঁত করে না। ঠান্ডা মাথায় থাকা যায়।
ধরুন, আপনার নতুন বিয়ে হয়েছে। রান্নাবাড়া তেমন কিছুই পারেন না, ঘরের কাজও তেমন পারেন না। ঘরে দু-একজন মানুষও যদি দুই-একদিনের জন্য মেহমান হিসেবে আসে তখনো এসপার-ওসপার চিন্তা হয়। 'হায় আমার কী হবে!' আপনার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ে! আপনি কীভাবে মেহমানদের যত্ন-আত্তি করবেন? সারাবেলা তো আর রেস্টুরেন্ট থেকে কিনে এনে খাওয়ানো যায় না। আপনি একধরনের মানসিক চাপ অনুভব করবেন। সেই মানসিক চাপ আপনাকে ক্লান্ত করে দেবে, যতটা ক্লান্ত শারীরিক পরিশ্রমও করবে না।
দুই-তিনটা আইটেম রাঁধতেই আপনার অনেক সময় লেগে যাবে! আপনি ভাবতে থাকেন, কেন আমি কোনো সময় পাই না। আর শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ভাবতে থাকে, দুজন মানুষ, কোনো কাজকর্ম নেই, করে কী সারাদিন?
এই আপনিই যখন আপনার প্রয়োজনীয় কাজকর্মগুলো শিখে যান, তখন একহাতে সংসার, বাচ্চাকাচ্চা সামলানো, বাচ্চাদের পড়ানো, স্বামীর খেদমত, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর-সবকিছু সমান তালে করতে পারেন। নিজেই নিজেকে দেখে অবাক হয়ে যান।
দেখেন না, আমাদের দেশে মেয়েদের যখন প্রথম সন্তান হয়, সে পারে না বাচ্চাকে কোলে নিতে, পারে না গোসল করাতে, পারে না কাপড়চোপড় পরাতে। সবকিছুতেই তার বড় একজনের সাহায্য লাগে। সন্তান জন্মের পর পুনরায় আবার স্বাভাবিক সংসারের কাজে ফিরে আসতে মেয়েটার বেশ সময় লেগে যায়। এ মেয়েটিই যখন দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেন, তার এই পরনির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যায়। যখন তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেন তখন সে একাই সব পারে। নারীরা এমনই।
আপনি মনে করলেন, এখন শুয়ে থাকব, কোনো কাজ করব না। কিন্তু আপনার অনেকগুলো জরুরি কাজ পড়ে আছে, করা দরকার। সকালের নাস্তা বানানোর সময় মনে হলো, থাক একটু পরে বানাই। কিছুক্ষণ ঘুমাই। আপনি কিছুক্ষণ গড়িমসি করতে করতে শুয়ে থাকলেন। বিছানা থেকে উঠে দেখলেন, হায় হায়, দেরি হয়ে গেছে। বাচ্চাদের টিফিন রেডি করতে হবে, মাদরাসায় নিয়ে যেতে হবে, খাওয়াতে হবে। অনেক কাজ দেখে সাথে সাথে মাথাটা আমার গরম হয়ে যায়।
তবে কাজগুলো জিম্মায় না রেখে সময়মতো যদি করে ফেলা যায়, তাহলেই বরং আরামের সময়টা কিছুটা হলেও বেশি পাওয়া যায়। কাজ সেরে যখন আরাম করা হয়, আরামটা তখন খাসা আরামই হয়। মনের মধ্যে তখন আর দায়িত্ববোধ ঘেউ ঘেউ করে না।
আমাদের সব মহিলাদেরই মোটামুটি আরেকটা কাজ করতে হয়, তা হলো— ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখা। স্বামী, ছেলে-মেয়ে বা গৃহচারিকা, হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মূল দায়িত্ব আপনারই থাকে। ভাবা দরকার, এই কাজটাকে আরেকটু সহজভাবে করা যায় কি না।
যেমন ধরুন আপনি যখন ঘর গোছানো শুরু করেন, তখন সবার প্রথমে বিছানাটা ঠিক করে ফেলতে পারেন। বিছানা ঘরের মধ্যে অনেক বড় জায়গা জুড়ে থাকে। বিছানাটা গুছিয়ে ফেলতে পারলে মনের মধ্যে একটা মোটিভেশন আসে। মনে হয়, এই তো গুছিয়ে ফেললাম। আর অল্প একটু বাকি আছে, কিছুক্ষণের মধ্যে এটুকুও হয়ে যাবে।
আমাদের সবার সংসারেই অনেক জিনিসপত্র থাকে। সংসারের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এসব টুকিটাকি জিনিসের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন, মাঝে মাঝে বাসার পরিবর্তনের সময় তারা অনুভব করতে পারেন, একটা সংসারে কত ধরনের জিনিস থাকে!
যাই হোক, ঘরবাড়ি গোছানোর কাজটা সহজ করতে চাইলে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তা হলো, দরকারি ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আলাদা করে ফেলা।
আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, দরকারি জিনিস তো বুঝি, কিন্তু কোন জিনিস ভবিষ্যতে আমার দরকার লাগবে না সেটা কীভাবে বুঝব?
গবেষণা বলে, কোনো জিনিস যদি ছয় মাসের মধ্যে আপনার কোনো কাজে না লাগে, বুঝতে হবে সে জিনিসের খুব একটা প্রয়োজন নেই। ছয় মাসের মধ্যে লাগেনি এ রকম কোনো জিনিস হাতের নাগালে রাখার দরকার নেই। হ্যাঁ, আপনার যদি বাসা পরিবর্তন করতে হয়, বিভিন্ন প্যাকেজিং সিস্টেম সংরক্ষণ রাখতে হয়, সেটা হাতের নাগালে রাখা লাগে না। সবাই সাধারণত এ ধরনের প্যাকেজিংগুলো টয়লেটের ফলস ছাদে রাখে।
এ ছাড়াও আপনি অনেক ঘরেই দেখতে পাবেন, এমন অনেক জিনিস তাদের হাতের কাছে আছে, যেগুলোর তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। অনেকের রান্নাঘরেও আপনি অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘনঘটা দেখতে পাবেন।
বিশেষ করে রান্নাঘরে বেশি জিনিস থাকলে সেটা পরিষ্কার করা আরও কঠিন, আরও সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। চিমনি থাকলেও কিছুটা তেল চিটচিটে ভাব থাকেই। আর চিমনি না থাকলে তো কথাই নেই। তাই ঘরের জিনিসপত্র যতটা সংক্ষেপ করা যায়, ততই সুবিধা।
সফল মানুষদের ওপর একটি গবেষণা করে দেখা যায়, রাতে ঘুমানোর আগে তারা রান্নাঘর পরিষ্কার করে তারপর ঘুমান। এটা অনেকটা আজকের কাজ আজই সেরে ফেলার মতো।
অধিকন্তু, আমাদের কাপড়চোপড় গোছানোর একটা ব্যাপার থাকে। কাপড়চোপড় এলোমেলো হলে সাথে সাথে যদি গুছিয়ে নেয়া হয়, তাহলে আর জমে না। একসাথে বেশি কাজ তৈরি হয় না।
কাপড়চোপড়ের ক্ষেত্রে যেগুলো আপনার পরতে ভালো লাগে না বা পুরোনো হয়ে গেছে বা অনেকদিন ধরে পরা হচ্ছে না, সেগুলো আপনি বাদ দিয়ে দিতে পারেন, অথবা দরিদ্র কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনার গোছগাছের আইটেম কমবে, সাথে আরেকজনের উপকার হবে। দয়া করে জমিয়ে রাখবেন না। মোটামুটি ব্যবহার উপযোগী থাকা অবস্থায় অন্য কাউকে দান করে দিলে শুধু গোছানোর কষ্ট কমবে না, দশ গুণ বেশি পাওয়ার পথ তৈরি হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ আছে,
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশ গুণ পাবে।৮৭
এ ছাড়া দুনিয়া ও আখিরাতে দানের একাধিক উপকারের সুসংবাদ কুরআন- হাদীসে পাওয়া যায়।
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ يَوْمِ يُصْبِحُ العِبَادُ فِيهِ، إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
'প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দানকারীর জন্য দুআ করে বলে, হে আল্লাহ, দানকারীর মালে বিনিময় দান করো (বিনিময় সম্পদ বৃদ্ধি করো)। আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদদুআ করে বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণের মাল ধ্বংস দাও।'৮৮
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِيْنَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُوْنَ مَا أَنْفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمُ يَحْزَنُونَ
'যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করে তা বলে বেড়ায় না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।'৮৯
আরেকটি কাজ আমাদের মায়েদের করতে হয়, তা হলো সন্তান লালন-পালন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে যথাযথ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্যারেন্টিং খুবই সহায়ক। শাশুড়ি-মা যখন দেখেন, বউ-মা তার নাতি-নাতনিদের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন, সাধারণভাবে এই বিষয়টা শাশুড়ি- মাকে প্রীত ও আশাবাদী করে। শাশুড়ি-মা এতে খুশি হন। আর যেসব শাশুড়ি- মায়েরা খুশি হয় না, তারা আসলে বউ-মার হাত আছে এমন কোনো কিছুতেই খুশি হন না। তারা সর্বদা ভয়ে থাকেন, বউ-মার কোনো কিছুতে উৎসাহ দিলে না জানি সে আবার মাথায় চড়ে বসবে কি না! তাদের কথা বাদ দিন। প্যারেন্টিং আপনার দায়িত্ব।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘মনে রেখো, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মনিবের সম্পদের ওপর দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’৯০
যেসব মায়েরা প্যারেন্টিংয়ের দায়িত্ব পালনে ধৈর্য রাখতে ব্যর্থ হন, তারা বাচ্চাদের দুষ্টামি দেখে বেশি বেশি দুষ্টামি করা শুরু করেন। চিল্লাচিল্লি, রাগঝাল, হইচই ঘরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। ঘর হয়ে যায় রীতিমতো নরক। এই ঘরের সবার মাথা থাকে গরম। স্বামী তখন বিভিন্ন অজুহাতে বাচ্চা ঘুমালে বাসায় আসার কথা ভাবেন। শ্বশুর-শাশুড়ি দেখেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে!
তখন আসলে সন্তান আপনাদের সকলের মাঝে আলাদা আলাদা দেয়াল তৈরি করতে থাকে। সন্তান তখন থাকে না আর সেতুবন্ধন।
আপনাকে অবশ্যই প্যারেন্টিং সম্পর্কে জানতে হবে, জানার চেষ্টায় থাকতে হবে। এটা আপনার খুব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। মানুষ তৈরি করার চিরন্তন প্রক্রিয়া মনে করে প্যারেন্টিং সম্পর্কে সচেতনতার সাথে জানাটা যেমন দায়িত্ব, তেমনই মানাটাও দায়িত্ব। প্যারেন্টিংয়ের এই কঠিন কাজটা কীভাবে সহজে করা যায় সে বিষয়ে কিছু চিন্তা-ফিকির করতে পারেন। কিতাবাদি পড়তে পারেন।⁹¹
এসবের বাইরেও আমাদের অনেকেরই অনেক কিছু করতে হয়। একেকজনের কাজের ক্ষেত্র একেক রকম। সাথে সাথে একেকজনের একেক রকমের দক্ষতা আছে। আমাদের আসলে শিখে নিতে হবে, যে বিষয়গুলোতে কমতি আছে সেগুলো কীভাবে আরেকটু ভালো করা যায়।
আপনার শৈল্পিক ঘরকন্না আপনার টাইম ম্যানেজমেন্টে যেমন সহায়ক হবে, তেমনই সমাজের জন্য নতুন কিছু করতে উৎসাহিত করবে। আপনি সময় নিয়ে চিন্তা করার সুযোগটুকু অন্তত পাবেন।
টিকাঃ
৮৭. সূরা আনআম, (৬): ১৬০
৮৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১০
৮৯. সূরা বাকারা, (২): ২৬২
৯০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৯
৯১. এ বিষয়ে উমেদ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখিকার 'ভালো মা-বাবার দুষ্টু বাচ্চা' বইটা সাহায্য করতে পারে।
📄 আকর্ষণীয় নারী হতে কোন ব্র্যান্ডের মেকআপ প্রয়োজন?
সাজগোজ, সৌন্দর্য নারীদের একটি দুর্বল দিক। কারণে-অকারণে সে সাজতে ভালোবাসে এবং সেই সৌন্দর্য আরেকজনকে দেখাতে পছন্দ করে।
'এই সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে' সেই ভয় দেখিয়ে ফেমিনিস্টরা আমাদের সতর্ক করে-সংসারের ঘানি মাথায় নিয়ো না, সন্তান ধারণের দরকার কী? ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়বে; তারচেয়ে নিজেকে সুন্দর রাখো, আকর্ষণীয় হও, নজর কাড়ো।
আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য নারীরা যত সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে, মেকআপ ইন্ডাস্ট্রিগুলো তত শক্তিশালী হচ্ছে। মার্কেট রিসার্চ থেকে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী Beauty Industry (সৌন্দর্য শিল্প) দিনের পর দিন শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২০ সালের ৪৮৩ বিলিয়ন ডলারের এই মার্কেট ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ৫১১ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা নাকি ৭১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ব্যক্তিগত বিউটি প্রোডাক্টগুলোর ব্যবহার যেমন দিন দিন বাড়ছে, অলিতে- গলিতে গড়ে ওঠা পার্লারগুলোতেও এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সবকিছুর পেছনে আছে নারীর আকর্ষণীয় হবার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।
ধরুন দশজন একসাথে বসে আছেন, গল্পগুজব করছেন। এই দশজনের মধ্যে দু-একজন এমন থাকবে, যাদের প্রতি অন্যান্যরা একধরনের টান বা আকর্ষণ অনুভব করবে। প্রশ্ন হলো, তাদের কোন বিষয়টা অন্যদের আকৃষ্ট করছে? তাদের সাজগোজ, পোশাক-আশাক, কালার ম্যাচিং করা জুতা-ঘড়ি-চশমা, অলংকারাদি-কোনটা?
নাকি তাদের কথা বলার ধরন, তাদের আত্মবিশ্বাস, কণ্ঠের দৃঢ়তা, তাদের সহানুভূতি, তাদের সহমর্মিতা, তাদের বিচক্ষণতা? অর্থাৎ ভেতরের সৌন্দর্য নাকি বাইরের সৌন্দর্য? কোন জিনিসটা আপনাকে আকৃষ্ট করে? বাইরের সৌন্দর্য হয়তো নজর কাড়ে, কিন্তু আন্তরিকভাবে আকৃষ্ট করে কোনটি?
আপনার আশেপাশে যত পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের সবাইকে কিন্তু আপনার একই রকম ভালো লাগে না। কাউকে বেশি ভালো লাগে, কাউকে কম। আপনার কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে আপনি বেশি টান অনুভব করেন, সেগুলো কী কী?
আপনি হয়তো বলবেন, আমার অমুক আপুকে খুব ভালো লাগে। কারণ তিনি খুব হাসিখুশি। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকে। হতাশার কোনো কথা আপুর মুখে কোনো দিন শুনিনি। দুঃখ-কষ্ট আমাদের সবার জীবনেই আছে, কিন্তু কারও সাথে মুখ ভার করে ব্যর্থতা, অপূর্ণতার গল্প করতে শুনিনি; বরং চোখের দিকে তাকিয়ে, হাত নেড়ে আপুকে বলতে শুনি, 'সমস্যা আজ আছে কাল নেই, একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।' নিজে যেমন আশা নিয়ে বাঁচেন, তেমনই অন্যের মনের মধ্যেও আশা জাগাতে পারেন। একটা মানুষ হাসিমুখে সবকিছু কীভাবে ম্যানেজ করেন উনাকে না দেখলে বোঝা যায় না। কাজকাম তো আমরা সবাই করি, কিন্তু হাসিমুখে কাজ করা বা আনন্দের সাথে কাজ কয়জন করতে পারে।
আবার বলবেন, অমুক খালাকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ, এই মানুষটার মধ্যে তার আবেগ-অনুভূতি বা আচরণ নিয়ন্ত্রণের চমৎকার ক্ষমতা আছে। উনার সাথে যে যেমন ইচ্ছা আচরণই করুক না কেন, উনার সেই আদরমাখা প্রতিক্রিয়ার কোনো অন্যথা হবে না। কখনো রাগের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কিন্তু দেখিনি-উনি পাল্টা রাগঝাল করে পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলেছেন। পারিপার্শ্বিকতা যেমনই হোক না কেন, প্রতিক্রিয়া যেন একদম উনার হাতের মুঠোয়।
আপনার দাদিকে খুব ভালো লাগে, কারণ তিনি খুবই রসিক। উনার সাথে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়। ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পেলেই মনে হয়, ওই মানুষটার সাথে কিছুটা সময় কাটাই। সাধারণত আমাদের দেশের রসিকতাগুলো অন্য কাউকে ছোট করা, অপমানিত করা হয়, অশ্লীলতা ও মিথ্যা নিয়েই বেশি সাজানো। কিন্তু মুসলমানের রসিকতাও যে কতটা সত্য ও শালীন হতে পারে, তা উনার রসিকতা থেকে বোঝা যায়। এ ব্যাপারে উনার হিকমত এতটা বেশি যে, রসিকতার সময়ও পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সামনের জনের মানসিক-শারীরিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখেন। অনেকেই করতে পারে, কিন্তু উনারটা অন্যরকম।
আবার আপনি হয়তো বলবেন, অমুক ভাবিকে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ, সে কখনো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলে না। আচরণের মধ্যে একধরনের স্বচ্ছতা আছে। মনের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ, রাগ, হিংসা পুষে রাখে না। কোনো কিছুতে আমাদের থেকে কষ্ট পেলেও স্পষ্টভাবে বিনয়ের সাথে জানিয়ে দেন। কথা বলার সময় কিছু গোপন করা বা কাটছাঁট করে বলা উনার সাথে যায় না।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা মতে, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষদের মধ্যে ঠিক এই ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলোই দেখা যায়। তাদের গবেষণায় আরও পাওয়া যায়, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ খুব বিনয়ের সাথে না বলতে পারেন। কম গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন কাজগুলোকে হঠাৎ নাকচ করতে পারেন বা এড়িয়ে চলেন। যাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিপূর্ণ ফোকাস করতে সমস্যা না হয়। সাময়িকভাবে অনেকে তাদের খারাপ ভাবলেও পরবর্তী সময়ে ভালোবাসে।
আমি হলফ করে বলতে পারি, মানুষের ব্যক্তিত্বের এইসব বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মুগ্ধ করে, ভীষণভাবে টানে।
আসুন, আকর্ষণীয় হতে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির নামকরা সব ব্র্যান্ডের দিকে না ঝুঁকে নিজের ভেতরের জগৎটাকে আরেকবার খুঁটিয়ে দেখি। না জানি কত মণি-মুক্তা সেখানে অবহেলায় পড়ে আছে।