📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 ছেলে কিন্তু আগের মতো থাকবে না!

📄 ছেলে কিন্তু আগের মতো থাকবে না!


'ছেলে আর আগের মতো নেই' অনেক মা ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পরে এভাবে চিন্তা করেন। আবার অনেকে তো এই ভয়ে সময় হয়ে গেলেও ছেলের বিয়ে দিতে গড়িমসি করেন। মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক—ছেলে বুঝি আর আমার থাকল না। একজন মা যখন এভাবে চিন্তা করেন, তার তো বুকটা চিরে যাবার কথা।
কিন্তু সম্মানিতা মা, আপনি আরেকটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারেন। ছেলের বিয়ের পরও সে আগের মতোই থাকবে, এটা একটা ভুল প্রত্যাশা হয়ে যায় না? সে কীভাবে আগের মতো থাকবে? এখন তাকে নতুন একটি নারীর সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়, নতুন আরেকটি পরিবারের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। স্ত্রীর হক আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হয়। পরিবারে যখন সন্তান আসে, সেই সন্তানের অভিভাবকত্ব করতে হয়। নতুন নতুন অনেকগুলো সম্পর্কের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়। বাস্তবিকই, সে তো আর আগের মতো নেই। হাজারো দায়িত্ব তার কাঁধে।
এটা তো আনন্দের একটা বিষয় যে, আপনার ছেলে একটি মেয়ের দায়িত্ব নিতে শিখেছে। এ তো গর্ব করার মতো বিষয় যে, আমার ছেলে আরও একটি পরিবারের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে পারছে।
ছেলের এই পথচলায় আপনি একজন সাহায্যকারী হতে পারেন। বিবাহিত জীবনে ছেলের পদক্ষেপকে সাফল্যমণ্ডিত করতে আপনার উৎসাহ, উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণা নিঃসন্দেহে আপনার সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
ছেলের সংসার আনন্দঘন করতে আপনার যেকোনো পদক্ষেপ আপনাদের মা-ছেলের সম্পর্ককে আরও আন্তরিক করবে। অনেক মা দূর থেকে দাঁড়িয়ে ভাবেন, 'দেখি ছেলে কী করে!' মনে মনে চিন্তা করেন, বউ বসতে বললে বসে, উঠতে বললে ওঠে!
এসবে লাভ কী? এসব চিন্তায় না আপনার কোনো লাভ আছে, না আপনার ছেলের।
আপনি আগে যেভাবে ছেলের সাথে আচরণ করতেন, এখনো সেভাবেই করবেন। এটা আপনার মা-ছেলের চিরায়িত সম্পর্কের স্বাভাবিকতা। এই স্বাভাবিকতা নষ্ট করার অধিকার কেন অন্য কাউকে দেবেন? কেন মনে করবেন, একটি মেয়ে এসে দু-দিনেই মা-ছেলের বন্ধন ছিন্ন করে করে ফেলবে। অসম্ভব! বরং আপনার দৃষ্টিভঙ্গি, উৎসাহ, অনুপ্রেরণার ফলে আপনার পুত্র-সন্তানের সাথে আরও একটি সন্তান (পুত্রবধূ) আপনার সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।
তবে মায়ের কাছে ছেলের বা ছেলের কাছে মায়ের অনেক আরজি, আবেদন থাকে, টাকা-পয়সা লেনদেনের ব্যাপার থাকে। আমাদের মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাস্তবতা এমনই। বিয়ের পর স্বামী হিসেবে বিভিন্ন আবদার পূরণ করতে হয়, সন্তানের পিতা হওয়ার পর পিতা হিসেবে বিভিন্ন আবদার পূরণ করতে হয়, মায়ের সন্তান হিসেবে বিভিন্ন আবদার পূরণ করতে হয়।
সম্মানিতা মা, বিভিন্ন আবদার পূরণের ক্ষেত্রে আপনি আপনার ছেলের সাথে নেগোসিয়েশন করে নিতে পারেন। সবাই তো অঢেল টাকা-পয়সার মালিক হয় না। কখনো স্ত্রী তার আবদার সেক্রিফাইস করবে, কখনো মা তার আবদার সেক্রিফাইস করবে, কখনো সন্তান তার আবদার সেক্রিফাইস করবে। এই সেক্রিফাইসের মানে এই না যে, তার গুরুত্ব কমে গেছে।
শ্রদ্ধেয় মা, আপনার ছেলের এই পর্যায়ে আসতে আপনার অনেক কষ্ট-কুরবানী আছে। আপনাদের বিচক্ষণতা, ধৈর্য, পরিশ্রম, আদর, শাসন সবকিছুকে সাথে নিয়ে আপনার ছেলে নতুন বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছে। এটা আপনারই একটা অর্জন। আপনার ছেলের মধ্যে একটু পরিবর্তন এসেছে, আসাটাই স্বাভাবিক। তবে পরিবর্তনটুকুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারলে আপনারা 'মা-ছেলে' 'মা-ছেলেই' থাকবেন।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 জড়িয়ে ধরার সময় এত চাপ দেবেন না, যে বউ-মার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়

📄 জড়িয়ে ধরার সময় এত চাপ দেবেন না, যে বউ-মার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়


অনেক শাশুড়ি-মা আছেন, আদরের আদলে বউ-মাকে এত বেশি নির্দেশনা দেন যে, বউ-মার মতামত প্রকাশের কোনো জায়গাই থাকে না। এমনকি অনেকে তো বউ-মা কোন কাপড়চোপড় পরবে সেটাও বলে দেয়, বাচ্চাকে কোন জামাকাপড় পরানো হবে সেটাও বলে দেয়। 'হয়তো পারবে না, পারলেও হবে না' এ আশঙ্কায় মায়েরা সবকিছু বলে দেন।
'সবকিছু তোমার ভালোর জন্যই করছি। শেখো শেখো, কাজে লাগবে; ওখানে যেয়ো না, এর সাথে কথা বোলো না, ওর সাথে কখনো মিশবে না।'
নিঃসন্দেহে শাশুড়িরা ভালোর জন্যই বলেন। তবে ভালো করতে গিয়ে যেন হিতে বিপরীত না হয়। আদর করার সঠিক উপায়টা তো আপনাকে খেয়াল করতে হবে। জেনারেশন গ্যাপকে মাথায় রাখতে হবে। আপনার রুচি, পছন্দ, আদর্শ অনেক সময়ই আপনার চেয়ে ২০, ২৫ বছরের ছোট বউ-মার মতো হবে না। কিছু মতের অমিল তো থাকতেই পারে।
তার রেসপনসিবিলিটির জায়গাগুলো আপনি তাকে বুঝিয়ে দিতে পারেন। বউ-মাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে পারলে তো আপনি একটু বিশ্রাম নিতে পারেন। সবকিছু শিখিয়ে পড়িয়ে বলে বলে করানোর চেয়ে আপনি তাকে দায়িত্ব দিয়ে ছেড়ে রাখতে পারেন। একটু ভুল করে, হোঁচট খেয়ে, ভেঙে-গড়ে আপনার চোখের সামনে আপনার জীবদ্দশাতেই আপনার বউ-মা ঘরকন্নার কাজগুলো শিখে গেল।
আপনার ছেলের চিরদিনের সঙ্গীকে সারাদিন নির্দেশনার মাঝে না রেখে উনাকেও একটি স্পেস দিলেন।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 উপদেশের ঝনঝনানি থেকে বিরত থাকা

📄 উপদেশের ঝনঝনানি থেকে বিরত থাকা


উপদেশ চাওয়ার আগেই উপদেশ দেয়া থেকে বিরত থাকুন।
অনেক শাশুড়ি-মা সাবানের বুদ্বুদের মতো উপদেশ ছাড়েন। উপদেশের যেন বন্যা বয়ে যায়। দেখা গেল, বউ-মা আপনার কাছে উপদেশ চাচ্ছে না, কিন্তু আপনি উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন, তখন এই উপদেশের গ্রহণযোগ্যতা কেমন হবে?
অনেক শাশুড়ি-মায়ের তো উপদেশগুলো নিছক উপদেশই থাকে না, এর ফাঁকে ফাঁকে থাকে অসংখ্য খোঁচাখুঁচি, বাঁকা কথা, কটুকথা। এমনকি অনেকে উপদেশ দেয়ার সময় সুনির্দিষ্টভাবেও কিছু বলেন না। বউ-মা ডানে গেলে চিল্লাচিল্লি শুরু করেন, কেন ডানে গেলে! বউ-মা বামে গেলে চিল্লাচিল্লি শুরু করেন, কেন বামে গেলে! কিন্তু পরিষ্কার করে বলেন না-বামে যাও বা ডানে যাও। অনেকে ধরে নেন, সব বলে দিতে হবে কেন?
অনেক শাশুড়ি-মা মোটাদাগে বলেন, আমি যেভাবে সংসার করেছি তুমিও সেভাবেই করবে। এটা মেনে চলবে, এটা মেনে চলবে; বউ মানুষ এটা করতে হয়, না করলে লোকে কী বলে!
তবে এভাবে উপদেশ দিলে সেই উপদেশ থেকে ফিল্টার করে করণীয় কাজগুলো আলাদা করতে সব বউ পারে না। সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না পেলে অনেকেই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তাই নির্দেশনা দেয়ার সময় পরিষ্কার, স্পষ্ট এবং জিহ্বার নরম সিফাতের স্মরণ অন্তত থাকা উচিত।
আরেকটি কথা, উপদেশ দেয়ার আগে পাত্র তৈরি করে তারপর উপদেশ দিলে আপনার কথার ভার থাকবে।
আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, আমার শাশুড়ির কাছে বউ-মা হিসেবে আমি যেমন ছিলাম আমার বউ-মাও সে রকমই হোক?
কোনো শাশুড়ি-মা যদি এভাবে বলতে পারেন, উনার শাশুড়ির জন্য উনি যা করেছেন তার বউ-মাও তার জন্য তা-ই করুক, তবে নিঃসন্দেহে উনি খুব চমৎকার উপায়ে তার বউ-মাকে শেখাতে পারবেন। আর তার শেখানোর মধ্যে বউ-মা একধরনের প্রভাব অনুভব করবে। কারণ সেই শাশুড়ি-মা ইতিমধ্যে জানেন, কীভাবে সুন্দরভাবে বউ-মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
আপনি কীভাবে আপনার শ্বশুরবাড়ির মানুষকে সম্মান করেন, এটা দেখে আপনার বউ-মা উপলব্ধি করতে পারবে আপনি কেমন বউ-মা চান। আপনি যেমন বউ-মা চান আপনি তেমন হয়ে দেখান। আপনার উপদেশবাণী শুনে আপনার বউ-মা হয়তো বদলাবে না, কিন্তু আপনাকে দেখে সহজে বদলে যাবে। আপনি হয়ে যেতে পারেন আপনার বউ-মার জন্য একজন আদর্শ বউ-মার রোল মডেল।
সম্মানিতা শাশুড়ি-মা, হয়তো আপনার শাশুড়ি-মা দুনিয়াতে নাও থাকতে পারেন, কিন্তু তার প্রতি আপনার শ্রদ্ধা, সম্মান বা অনুভূতি কেমন সেটা কাছের মানুষেরা সহজেই আঁচ করতে পারে।
শ্রদ্ধেয় মা, একটু সময় নিয়ে চিন্তা করুন, আপনি বউ-মা হিসেবে কেমন ছিলেন আর আপনি ঠিক কেমন বউ-মা চান?

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 তাড়াহুড়া করা

📄 তাড়াহুড়া করা


সংসার সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা অনেক, সে তুলনায় আপনার বউ-মা একেবারেই আনাড়ি। রান্না করতে পারে না, কাজ বোঝে না, কীভাবে মিলেমিশে থাকতে হয় সেটাও জানে না, অনেক সমস্যা। বউ-মার এমন অযোগ্যতা দেখে শাশুড়ি মনে করেন, এই মেয়ে সংসারের হাল ধরলে না জানি সংসারের কী অবস্থা হবে? সব তো উচ্ছন্নে যাবে। তাই অনেকে সংসারের হাল মজবুত করে ধরতে বা বউ-মাকে সংসারের জন্য যোগ্য করার মিশনে উঠেপড়ে লাগেন। খুব তাড়াহুড়া করেন।
সব বউ-মা এই তাড়াহুড়াটা মেনে নিতে পারে না। বিরক্ত হয়, ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। আবার আপনার গতির সাথে যদি বউ-মা তাল মিলাতে না পারে, তবে আপনিও বিরক্ত হবেন, রেগে যাবেন। তখন আপনার জন্য শেখানোটা আরও কঠিন হয়ে যায়, সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।
আবার বউ-মা যদি চেষ্টা করেও না পারে তখন তীব্র মানসিক চাপ অনুভব করবে। আর সে যদি ধৈর্য ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে আপনাকে প্রতিপক্ষ ভাববে। আপনাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করবে অথবা আপনার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। করবে। অনেকে তো আড়ালে গালিগালাজও করে, এমনকি শাশুড়ির মৃত্যুও কামনা করে (নাউযুবিল্লাহ)।
আপনার শেখানোর পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কয়জন শাশুড়ি বউকে শেখাতে চায়? নিঃসন্দেহে এদিক-ওদিক থেকে শেখার চেয়ে আপনার কাছে সংসার নামক বস্তুটা শিখে নেয়া বউ-মার জন্য বেশি নিরাপদ। অনেকটা বয়ঃসন্ধিতে বাচ্চাকে যৌনশিক্ষা দেয়ার জন্য বাবা-মা যেমন নিরাপদ, তেমনই বউ-মাকে সংসার শেখানোর জন্য শাশুড়ি নিরাপদ। সমস্ত ইগোকে একপাশে সরিয়ে আপনি যদি তাকে শেখানো শুরু করেন, তবে নিঃসন্দেহে আপনার নাসীহা বৃথা যাবে না। বাতাসে মিশে যাবে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, তাড়াহুড়া করা যাবে না।
২০-২৫ বছরের অভ্যাস কীভাবে দু-এক মাসের মধ্যে পরিবর্তন হবে? একটু সময় লাগবে। তবে বউ-মার ইচ্ছা-আগ্রহ থাকলে সে সহজেই নিজেকে সেভাবে সাজিয়ে নেবে।
এ কথা সত্যি, শাশুড়ি-মায়ের জীবন নিয়ে অভিজ্ঞতা বেশি; তিনি অনেক কিছু দেখেছেন, দেখছেন। তার মানে এই না যে, তিনি শাশুড়ি হওয়ার ব্যাপারে অভিজ্ঞ। এই প্লাটফর্মে তিনি নতুন। সারাজীবন অনেক শাশুড়িদের দেখা, গল্প শোনা আর নিজে সেটার মুখোমুখি হওয়া এক জিনিস না। শাশুড়ি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে উনারও কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হয়।
আল্লাহ তাআলা সব শাশুড়ি-মাকে বউ-মার জন্য অন্যরকম এক মাতৃছায়ায় পরিণত করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00