📄 মনঃকষ্ট বা যেকোনো সমস্যা শেয়ারের জন্য সঠিক মানুষ নির্বাচন
দুঃসম্পর্কের কারও সাথে তেমন একটা সমস্যা আমাদের হয় না, দুঃখ পাওয়ার মতো তেমন কিছু ঘটে না। কিন্তু কাছের মানুষদের সাথে একসাথে চলতে মাঝে মাঝে ঠকাঠকি বাঁধে। মনে হয়, ও আমার এত আপনজন, কাছের মানুষ, তারপরও এ রকম সমস্যা হচ্ছে? অথচ কাছের মানুষ বলেই তো হচ্ছে। দূরের কেউ হলে তো সে আপনার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকত।
বউ-মা এবং শাশুড়ি-মা খুব কাছাকাছি সম্পর্কের দুজন নারী। যেকোনো পুরুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্র। দুইটি চরিত্রই এত গুরুত্বপূর্ণ যে, গুরুত্ব আর গুরুত্ব একে অন্যকে অনবরত ধাক্কাতে থাকে। এই ধাক্কাধাক্কিতে কখনো বউ-মা আহত হয়, কখনো শাশুড়ি-মা আহত হয়। ঘা শুকিয়ে গেলে সব আবার ঠিকঠাক হয়। কিন্তু এ ঘা শুকাতে কার কত বেগ পেতে হয় তা সেই মানুষটাই বোঝে।
যেকোনো সম্পর্ক থেকে কেউ যখন হাঁপিয়ে ওঠে তখন তার একটি বিষয় ভীষণভাবে প্রয়োজন হয়—তা হলো ভেন্টিলেশন বা দুঃখ-কষ্ট শেয়ারিং।
দুঃখ, আনন্দ, ভয় বিভিন্ন ধরনের আবেগ নিয়ে আমরা চলি। আনন্দিত মুহূর্তগুলো সবার সাথে শেয়ার করতে যেমন ভালো লাগে, তেমনই দুঃখের কথাগুলো সবার সাথে শেয়ার করতে ভালো লাগে। ভাগাভাগিতে আনন্দ যেমন বাড়ে, দুঃখ তেমনই কমে। আমরা সবাই কমবেশি এ ধরনের ভাগাভাগি করি। সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের সাথে দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করলে একদিকে যেমন সেটা কমে, আরেক দিকে এই সমস্যা থেকে সমাধানের একটি পথ বের হয়। যখন মানুষ বেশি ঝামেলায় থাকে তখন তার মাথা কাজ করে না, আবেগগুলো ঠিক ভারসাম্যপূর্ণ হয় না। তখন তৃতীয় আরেকজনের প্রয়োজন হয়, যে তাকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সহায়তা করবে। কিছু সান্ত্বনার প্রয়োজন হয়, উৎসাহের প্রয়োজন হয়। মাথার ওপর নির্ভরতার হাতের প্রয়োজন হয়।
এ ক্ষেত্রে কিছু মানুষ বাইরের সবার সাথে ঢালাওভাবে সব ধরনের কথা শেয়ার করেন। কিছু মানুষ আছেন শুধু আনন্দের কথাগুলোকে ঢালাওভাবে শেয়ার করেন। আবার কিছু মানুষ আছেন আনন্দ বা যেকোনো প্রাপ্তির কথাগুলোকে চেপে রেখে শুধু দুঃখ-কষ্টের কথাগুলোকে শেয়ার করেন। কিছু মানুষ আছেন খুব মেপে মেপে কিছু শেয়ার করেন, আবার কিছু গোপন রাখেন।
কিছু মানুষ আছেন কোনো কথা কারও সাথে শেয়ার করেন না। না আনন্দের অনুভূতি, না দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি। এ ধরনের মানুষ যে খুব ইন্ট্রোভার্ট হয় এমন না। কিন্তু উনারা রাগ বা ক্ষোভগুলোকে ভেতরে পুষে রাখতে পছন্দ করেন। একসময় যেটা অ্যাটম বোমার মতো বিস্ফোরিত। ১০ বছর, ১৫ বছর পর সেটা অসহনীয় বিরক্তিতে পৌঁছায়। বিরোধগুলো তখন আর মেটানো যায় না।
তবে শেয়ারিং সব সময় উপকারী নাও হতে পারে। যেমন ধরুন, আপনি আপনার শাশুড়ির কোনো আচরণে কষ্ট পেয়েছেন। প্রতিবেশী কারও সাথে সেটা শেয়ার করলেন। এখন এই প্রতিবেশী নির্বুদ্ধিতার কারণেই হোক, শত্রুতার কারণেই হোক আর উসকানি দিতেই হোক, আপনার শাশুড়িকে বোঝানো শুরু করল— আপা, বউ-মার সাথে তো এমন আচরণ করতে হয় না। আপনি বাইরে সবার সাথে এত ভালো আচরণ করেন আর ছেলের বউয়ের সাথে এত খারাপ আচরণ! এটা তো ঠিক না আপা!
ব্যস, আপা তো আরও রেগে গেল। এই বউয়ের জন্য পাড়ার মানুষের কাছ থেকেও অপমানিত হতে হচ্ছে! এখন শাশুড়ির রাগ আরও দশ গুণ বেড়ে বউ-মার ওপর পড়বে, তাই না? তখন আপনি মাথা চাপড়াতে থাকবেন—‘কেন উনাকে বলতে গেলাম?’
ঠিক এ রকম ঘটনা কিন্তু শাশুড়ির ক্ষেত্রেও ঘটে। তখন একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।
আবার ধরুন, বউ-মা মনে করলেন বাবার বাড়ির কারও সাথে, যেমন: মা, খালা, ফুপু, খালাতো, মামাতো, চাচাতো বোনের সাথে তার কষ্টের কথাগুলো শেয়ার করবেন। মেয়ে কষ্টে আছে বা বোন কষ্টে আছে শুনে তাদের তো মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। অত্যধিক মহব্বতের কারণে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টা দেখা তাদের জন্য কষ্টকর হয়। বোনেরা রেগে বলে, এমন সংসার কেন করিস? মা-খালারা বলে, হায় আল্লাহ! ওরা এত খারাপ! বাইরে দেখে আসলে ভেতর বোঝা যায় না।
আবার ধরুন, শাশুড়ি-মা তার কোনো আত্মীয়ের সাথে বউ-মা সম্পর্কে কোনো কষ্টকর কথা আলাপ করলেন। এসব কথা শুনে আত্মীয় জবাব দিলেন, এমন বউ নিয়ে সংসার করার দরকার কী? মেয়ের কি অভাব হইছে? ছেলেটার যোগ্যতা আছে, আবার ভালো দেখে বিয়ে দেয়া যাবে!
বউ-মার কোনো আচরণে হয়তো শাশুড়ি কষ্ট পেয়েছেন। নিজের মেয়ের সাথে যখন শেয়ার করেন, মেয়ে হয়তো এভাবে বলে, এত বড় সাহস! আমার মায়ের সাথে এভাবে আচরণ করেছে? হ্যাঁ, বউ-মার আচরণ হয়তো সত্যিই খারাপ ছিল। সেই আচরণে কষ্টের একটা আগুন শাশুড়ির বুকের মধ্যে চলছিল। দেখা গেল, শাশুড়ি-মা নিজের জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য মেয়ের সাথে বললেন। আর মেয়েটা তাতে পানি না দিয়ে ঘি ঢেলে দিল।
আবার আরেক ধরনের সমস্যা দেখা যায়। আপনি কারও সাথে আপনার কোনো সমস্যার কথা শেয়ার করে রাখলেন। পরবর্তী সময়ে কোনো কারণে তার সাথে আপনার শত্রুতা শুরু হলো। বা বোঝাপড়া হচ্ছে না এ ধরনের একটা বিরোধপূর্ণ অবস্থা তৈরি হলো। তখন সে আপনার সমস্যাগুলোকে বা দুর্বলতার জায়গাগুলোকে পুঁজি করে আপনাকে নাজেহাল করবে।
ভুল জায়গায় ভেন্টিলেশন কতটা ভয়াবহ হতে পারে এসবে বোঝা যায়। আমার এই ছোট অভিজ্ঞতায় এমন অনেক মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, যাদের সংসার ভাঙার মূল কারণ ভুল জায়গায় সমস্যা শেয়ার করা। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে ভুলে উসকে দিয়েছে। সংসারটা ভেঙে গেছে। বা না ভাঙলেও কুরুক্ষেত্র হয়ে গেছে।
এ ক্ষেত্রে আপনার সচেতনতা আপনাকে সাহায্য করতে পারে। যাকে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য মনে হয় তার সাথে শেয়ার করতে পারেন। যারা আপনার সম্পর্কগুলোকে গুরুত্ব দেয় এবং আপনাকে অন্ধভাবে মহব্বত করে না। আপনি তাদেরকে বেছে নিতে পারেন, যারা নিরপেক্ষভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে।
আমরা সাধারণত এ ধরনের মানুষের সাথে আমাদের কথাগুলো শেয়ার করার জন্য প্ল্যান করি। মনে মনে খুঁজি। আর খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই হতাশ হই। তখন ভুলভাল জায়গায় বলতে থাকি। এখন কথা হলো, সমস্যা বললে যদি সমস্যা আরও বাড়ে, তাহলে বলার কী দরকার? তারচেয়ে বরং ক্ষোভ পুষে রাখি, জ্বলতে থাকি, একসময় ছাই হয়ে যাই!
আপনি যদি খুঁজতে থাকেন তবে একসময় আপনি আপনার সমস্যা শেয়ারের জন্য সঠিক কাউকে পেয়ে যাবেন। যে আপনার কথা শুনে আপনাকে উৎসাহ দেবে।
📄 কৃতজ্ঞতা
ধরুন, আপনি একজন বিবাহিতা। কয়েক মাস হলো বিয়ে হয়েছে। স্বামীকে বেশ মহব্বত করেন। শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কিন্তু প্রায়ই আপনার মনের মধ্যে খচখচ করে—আমার বিয়েটা এ পরিবারের না হয়ে আরও ভালো কোনো পরিবারে হতে পারত। ফ্যামিলিটা যেন কেমন! কিন্তু আপনি চিন্তাও করতে পারেন না, বিয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সম্পর্ক চুকে যাক। এমনকি আপনি এটাও চান না শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবার সাথে আপনার সম্পর্ক খারাপ থাকুক। দেখা গেল, আপনি সংসারের জন্য সবই করছেন, শ্রম দিচ্ছেন; সাথে সাথে এই আপনিই খচখচানি অনুভূতিটাকে মনের মধ্যে পেলে-পুষে রাখছেন।
এতে ঘটনাটা কী ঘটে? আপনি সবই করেন কিন্তু কোনো কিছুতেই প্রাণ থাকে না। সব কাজই বোঝা মনে হয়। সংসারের কাজকে তখন ভালোবাসা যায় না। অল্প কাজেই ক্লান্তি চলে আসে। স্বামীর আনুগত্য, শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত, দেবর-ননদকে ভালোবাসা, সন্তানের যত্ন-আত্তি, সবমিলিয়ে হিমশিম খাওয়া অবস্থা তৈরি হয়। কাজকে তখন নিছক কাজই মনে হয়, কাজের মধ্য দিয়ে আনন্দ পাওয়া আর হয়ে ওঠে না। তখন আনন্দ করার জন্য আবার ঘটা করে কক্সবাজার সি-বিচে গিয়ে বসে থাকতে হয়।
অনেক সময় শাশুড়ি-মায়েরও ওই রকম মনে হতে পারে। আমাদের বউটা এ রকম না হয়ে ওই-রকম হলে ভালো হতো; একটু মনে হয় ঠকেই গেলাম। মনের মধ্যে এ ধরনের অনুভূতি তৈরি হলে কীভাবে খোলা মনে ভালোবাসা যায়?
এ ধরনের অনুভূতিগুলো তখন আসতে পারে যখন সম্পর্কে কৃতজ্ঞতার অনুশীলন উঠে যায়।
বউ-মা এবং শাশুড়ি-মা উভয়ের যৌথ একটি পদক্ষেপ—একে অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, যা আমাদের নিজেদের ভালো থাকা ও অন্যদের ভালো রাখার একটি সহজ হাতিয়ার। এ বৈশিষ্ট্যটি খুবই সহজলভ্য এবং আমাদের নাগালের ভেতরেই।
এই পদক্ষেপটাও শাশুড়ি বা বউ-মার জন্য খাস কোনো পদক্ষেপ না। আমাদের সবার ভালো থাকার জন্যই কৃতজ্ঞ থাকাটা খুব জরুরি। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার একটি চমৎকার পথ।
দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে গুণটিকে ব্যাখ্যা করা হবে। আধুনিক গবেষণার আলোকে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কুরআন-হাদীসের আলোকে।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো কৃতজ্ঞতা। এ সম্পর্কিত শত শত গবেষণা আছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে পজিটিভ সাইকোলজির কেন্দ্রবিন্দুতে যে বৈশিষ্ট্যটি আলোকিত হয়ে আছে সেটাই কৃতজ্ঞতা। এগুলো অনুশীলনের অসংখ্য উপকারিতা আছে।
অ্যামি কোলেটের মতে, কৃতজ্ঞতা সুখে থাকার একটি শক্তিশালী ক্যাটালিস্ট। এটা সেই স্ফুলিঙ্গ যেটা আপনার অন্তরের মধ্যে আনন্দের আগুন জ্বালায়।
মেলোডি বিটির মতে, কৃতজ্ঞতা আমাদের যা আছে সেগুলোকে যথেষ্ট করে। সাথে সাথে জীবনের অপরিণত বিষয়গুলোকে পরিণত করে। এটি অস্বীকৃতিকে গ্রহণযোগ্যতায়, বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় এবং বিভ্রান্তিকে স্বচ্ছতায় পরিণত করে। অতীতকে বুঝতে সাহায্য করে, আজকের জন্য শান্তি নিয়ে আসে এবং আগামীকালের জন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
গবেষণাগুলো বলে, কৃতজ্ঞ মানুষজন অন্যান্যদের তুলনায় তুলনামূলক বেশি হাসিখুশি এবং কম বিষন্নতায় ভোগে। এ কারণে হয়তো বিষণ্ণতার চিকিৎসায় মনোবিজ্ঞানীরা প্রথম যে পয়েন্ট নিয়ে রোগীকে চিন্তা করতে বলেন, সেটাও ওই কৃতজ্ঞতা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটি কৃতজ্ঞতার উপলব্ধি তাৎক্ষণিকভাবে ১০ শতাংশ সুখ বাড়িয়ে তোলে এবং ৩৫ শতাংশ হতাশা হ্রাস করে।
হয়তো এ কারণেই কৃতজ্ঞতার অনুভূতি যখন মনের মধ্যে জায়গা শুরু করে তখন হিংসা-বিদ্বেষ-রেষারেষি ইত্যাদি আবেগগুলো সেখানে তেমন একটা জায়গা করতে পারে না। আনন্দ-উৎসাহ-সহানুভূতি বেড়ে যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা বেশি কৃতজ্ঞ থাকে তাদের মস্তিষ্কের মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বেশি সক্রিয় থাকে। মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স যেকোনো কিছু শেখা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে জড়িত। মস্তিষ্কের এই সক্রিয়তা এক মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কৃতজ্ঞতা এভাবে মস্তিষ্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে।
আরেকটি গবেষণায় পাওয়া যায়, কৃতজ্ঞতা মানুষকে ভালোর দিকে অনুপ্রাণিত করে; এর হাত ধরেই সে আত্মোন্নয়নের পথে হাঁটে। এটা অনেকটা এভাবে কাজ করে, যখন আমরা কৃতজ্ঞ থাকি তখন মানসিক প্রশান্তির কারণে নিজেদের যোগ্যতা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি পাই। সাথে সাথে সহমর্মী হয়ে চিন্তা করার মতো সুযোগ আসে। নতুবা নিজের অপূর্ণতা ও অপ্রাপ্তিতে যে মানসিক কষ্ট হয়, সে কষ্টের ধকল সামলাতেই তো সব শক্তি শেষ হয়ে যায়। আমাদের আবেগ থেকে খারাপ অনুভূতিগুলো পরাভূত হলে শরীরে আপনা- আপনিই শক্তি চলে আসে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মন খারাপ হলে শরীরও খারাপ হয়ে যায়। শরীরের মধ্যে টক্সিক সিস্টেম grow করে। অপরদিকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতায় মনের সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, ব্যথা-বেদনার উপশম, সঠিক রক্তচাপ এবং গভীর ঘুমের সাথে কৃতজ্ঞতার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়াটন স্কুলের গবেষকরা দেখেছেন, যেসব পরিচালকরা খুব সচেতনতার সাথে সক্রিয়ভাবে কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেতেন, তাদের কর্মচারীরা অন্যান্যদের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি দক্ষ ছিলেন।
কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ক্ষমা করার যোগ্যতা বাড়ে। একে অন্যের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার অনুভূতি তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠানে বা অফিসে, পরিবারে বা গোষ্ঠীতে কৃতজ্ঞ মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস তৈরি হয়। ফ্রেডরিকসনের রিসার্চ থেকে জানা যায়, কৃতজ্ঞতা পারস্পরিক সম্পর্ককে বৃদ্ধি করে।
মনোবিজ্ঞানী অ্যাডাম ব্র্যান্ড এবং ফ্রান্সেস্কো গ্রিনোর গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো পারফরমেন্সের কারণে ধন্যবাদ পাওয়া টিম মেম্বারদের মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস খুব দৃঢ় থাকে।
Gratitude এর ওপর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাইন্টিফিক এক্সপার্ট রবার্ট ইমনসের মতে, জীবনকে অর্থপূর্ণ ও বেঁচে থাকার যোগ্য করে তুলতে যেসব অনুভূতি প্রয়োজন, তা আসে কৃতজ্ঞতার অনুশীলন থেকে।
কৃতজ্ঞতা হলো একটি সচেতন ইতিবাচক আবেগ। বাস্তব, অবাস্তব, আধ্যাত্মিক, জাগতিক সবকিছুর জন্যই কৃতজ্ঞতা অনুভব করা যায়। কৃতজ্ঞতা একটি অনুভূতিও। এটা জন্মগত কোনো দক্ষতা বা প্রাপ্তি না। অন্যান্য সব গুণের মতো এই গুণটিও নার্সিং করে শক্তিশালী করা যায়।
সাধারণত কারও কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার পর তার এই ভালো অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমরা জাযাকাল্লাহ বা ধন্যবাদ জানাই।
প্রতিদিন আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া ভালো ঘটনাগুলোর জন্যও আমরা ধন্যবাদ জানাই। ছোটবেলা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সামাজিক নিয়মের অংশ হিসেবে এই আচরণটা আমরা শিখি।
দিনের মধ্যে হয়তো অনেকবার ধন্যবাদ দিয়েছি, কিন্তু একবারের জন্যও কোনো আবেগ অনুভব করিনি। কৃতজ্ঞতা অনুভব করে হাসিমাখা মুখে সময় নিয়ে কয়জনকে ধন্যবাদ দিই? এ রকম ঘটে নাকি আমাদের সাথে? অনেকটা অসচেতন, অনুভূতিহীন ধন্যবাদ? মুখে বলা এই শব্দটাকে আরও আন্তরিকভাবে অনুভব করা যায় কি না?
হ্যাঁ, আমরা অনেক ব্যস্ত। ব্যস্ততার জীবনের নানামুখী চাপের মধ্যে কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করা, সময় নিয়ে সচেতনভাবে তা প্রকাশ করা চাট্টিখানি কথা না। রুটিন করে কৃতজ্ঞতা আদায় করতে কয়জন পারে? তবে এও ঠিক, আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় আশেপাশের বিভিন্ন সমস্যার ওপর ফোকাস করে শরীর-মনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তার মানে এই না, যে বিষয়গুলো রীতিমতো ঠিকঠাক চলছে সেগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া যাবে না।
প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্র্যাক্টিস করতে পারেন? এ ক্ষেত্রেও নানাজনের নানা মত আছে, নানা পদ্ধতি আছে। যেমন ধরুন :
• প্রতিদিন কিছু সময় নিয়ে বর্তমানে আমাদের জীবনের ভালো সব বিষয়গুলোকে কল্পনায় দেখতে উৎসাহিত করেছেন। একবারের জন্য হলেও যদি আমরা আমাদের বর্তমানের সৌন্দর্যমণ্ডিত দিকগুলোকে খুঁজে বের করতে পারি, তখন আশেপাশের ভালো দিকগুলোও খুঁজে পাওয়া, স্বীকার করা, অনুভব করা সহজ হয়ে যায়। আমাদের ছোট জীবনে অন্যান্যদের ভূমিকা, অবদানগুলো তখন পরিষ্কার দেখা যায়। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব একে অপরের সাথে আমরা কতটা আন্তঃনির্ভরশীল, সেটা তখন বুঝে আসে।
• প্রতিদিন অন্ততপক্ষে তিনটি জিনিস সম্পর্কে চিন্তা করুন, যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। এই চিন্তাটাকে দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ মনে করলে, আস্তে আস্তে এই চিন্তাটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। এতে মেজাজ-মর্জি ভালো থাকবে, ঘুমের গুণগত মান বেড়ে যাবে। সব সময় প্র্যাকটিস করে কৃতজ্ঞতার আবেগকে অভ্যাসে পরিণত করা সম্ভব হলে জীবনের জোয়ার হয়তো ঘুরে যেত।
থেরাপিস্টরা বিষণ্ণতার চিকিৎসার শুরুতে যে ব্যায়ামটি করতে পরামর্শ দেন তা হলো, কৃতজ্ঞ চিন্তার চর্চা। উনারা সাধারণত ব্যায়ামটা এভাবে করতে বলেন, ১০ মিনিট ধরে ভালো দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করে সেটাকে লিখে ফেলতে হবে। এটা অনেকটা গ্রাটিটিউড জার্নালের মতো। এতে আপনি যা কিছু পেয়েছেন, যা কিছু উপভোগ করেছেন বা করছেন, সব অনুগ্রহ, সুযোগ-সুবিধা, ভালো ঘটনা, মূল্যবান ব্যক্তিদের সাথে কৃতজ্ঞতার মুহূর্তগুলো-সব থাকবে। এমনকি আপনার ব্যক্তিগত গুণাবলিও থাকবে। সাত দিন পরপর আগের সব লেখাগুলো পড়তে হবে। এতে হতাশার উপকরণগুলো ভুলে ভালো থাকার উপকরণগুলোকে সহজে আঁকড়ে ধরা যায়। ড. রবার্ট এমনস এবং মাইকেল ই ম্যাককুলের গবেষণা অনুসারে, যারা প্রতি সপ্তাহে কৃতজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি বাক্য লেখে, তারা জীবন নিয়ে খুব আশাবাদী থাকে।
প্রতি সপ্তাহে নতুন একজনকে ধন্যবাদ দেয়া যায় কি না! ন্যূনতম একজন হলেও। নতুন একজন করে যদি ধন্যবাদ দেয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ানো যায়, তবে আপনার চারপাশে কৃতজ্ঞ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তবে ধন্যবাদকে একটু সচেতনতার সাথে অর্থপূর্ণ ও প্রাণবন্ত করা যায় কি না? সচেতন আবেগ, চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার ঝিলিক, মুখে হাসি, কণ্ঠে ধন্যবাদ।
• সবার জীবনেই দুর্দিন আসে, কঠিন সময় আসে। আবার চলে যায়। জীবনের ভালো সময়ে দাঁড়িয়ে পার করে আসা দুর্দশাগুলো মনে করে কৃতজ্ঞতা অনুভব করা যায়। তখন আপনি চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাবেন, জীবন কত কঠিন ছিল! কতদূর পার করে এসেছি! আপনার এই অনুভূতিটা কৃতজ্ঞতার জন্য কিছুটা হলেও উর্বর জমিন দেবে।
• সারাদিনের ব্যস্ততার ফাঁকে কিছু সময় বের করে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন-আমি কী পেয়েছি? আমি কী দিয়েছি? আমি কী কী সমস্যা- অসুবিধা সৃষ্টি করেছি।
আমাদের শরীরের মাঝে পরম করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা যা কিছু দিয়েছেন তার অলৌকিকত্ব অনুভব করে কৃতজ্ঞ হতে পারি। স্পর্শ করা, ঘ্রাণ নেয়া, স্বাদ আস্বাদন, শোনার ক্ষমতা, এত প্রতিকূলতার মাঝেও ঠিকঠাকমতো বেঁচে থাকা মহান মালিকের অবিশ্বাস্য উপহার। এই উপহারের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞ হতে পারি।
সমাজে যেসব মানুষকে আমরা কৃতজ্ঞ বলে জানি তাদের একটি বিশেষ ভাষাশৈলী আছে। কেউ উপকার পৌঁছালে তারা তাদের সেই বিশেষ প্রাচুর্যপূর্ণ ভাষাশৈলী ব্যবহার করে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য কার ক্ষেত্রে কোন ভাষা প্রয়োগ করলে, শব্দচয়ন কেমন হলে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হয়, সেটা আপনি প্র্যাকটিস করে বের করতে পারেন। তবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথায় আপনি কতটা ভালো অবদান রেখেছেন সেদিকে ফোকাস না করে অন্যরা আপনার জন্য যে ভালো বিষয়গুলো করেছে, সেদিকে ফোকাস করুন।
তবে মুসলিমদের জন্য এতশত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, যুক্তি-প্রমাণ লাগে না। তাদের জন্য তো আল্লাহ তাআলার একটি হুকুমই যথেষ্ট। তাদের জন্য কুরআনের একটি আয়াতই যথেষ্ট। তাদের জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকনির্দেশনাই যথেষ্ট।
কৃতজ্ঞতা আদায় শুধু ভদ্রতা বা শখের বিষয় না; বরং বাধ্যতামূলক একটি কাজ। এই গুণের প্র্যাকটিস না করলে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ভয়ংকর আজাবের হুমকি।
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
'যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো তবে তোমাদের আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। '⁷⁴
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَنَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ وَمَنْ يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ
'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয় সে তো কেবল স্বীয় কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর সে অকৃতজ্ঞ হলে তো আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। '⁷⁵
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তার বিনিময়ে তাদেরকে তাঁর স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرُكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
'সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখব এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো ও অকৃতজ্ঞ হয়ো না।'⁷⁶
শাশুড়ি-মা ও পুত্রবধূ, একটু কষ্ট করে একবারের জন্য হলেও চেষ্টা করে দেখুন, একে অন্যের প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞ হওয়া যায় কি না। দয়া করে বলবেন না, আমার বউ-মা বা শাশুড়ি-মায়ের মধ্যে কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো কোনো বৈশিষ্ট্য তো খুঁজে পাওয়া যায় না। কারও মধ্যে কৃতজ্ঞ হবার মতো কোনো বৈশিষ্ট্য না থাকলে আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে রাখবেন কেন?
টিকাঃ
৭৪. সূরা ইবরাহীম, (১৪) : ৭
৭৫. সূরা লুকমান, (৩১): ১২
৭৬. সূরা বাকারা, (২): ১৫২