📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 সম্পর্কের আখাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা

📄 সম্পর্কের আখাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা


পরের কাছে আমরা যা আশা করি তা প্রত্যাশা। প্রত্যাশা যত বেশি হবে কষ্ট পাবার আশঙ্কাও তত বেশি। প্রত্যাশা কম, কষ্টও কম। কথায় আছে, 'প্রত্যাশাহীন জীবন স্বর্গের মতন'। এর মানে কি একেবারেই প্রত্যাশা করা উচিত নয়?
আমাদের সম্পর্কগুলো সব সময়ই প্রত্যাশার চাদরে মোড়া থাকে। দুনিয়াতে সম্পর্কগুলো সফলভাবে বছরের পর বছর টিকে থাকার পেছনে বড় একটি কারণ প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার কারণেই স্বামী-স্ত্রীর, শ্বশুর-শাশুড়ি, বউ-মা-জামাই, ননদ-ভাবি, ভাই-বোন সবার মধ্যে পারস্পরিক অধীনতা তৈরি হয়। শুধু পরিবারের ভেতরেই না, পরিবারের বাইরেও একধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়। আমরা পরিষ্কার থাকতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ওপর নির্ভর করি, ঘরের কাজে সাহায্য নেয়ার জন্য কাজের মানুষের ওপর নির্ভর করি। আমরা চাইলেও খুব একটা স্বাধীন হতে পারি না। ইন্ডিপেন্ডেন্স নিয়ে ভালোভাবে বাঁচা যায় না, ভালোভাবে বাঁচতে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি লাগে। তখন আমরা একধরনের প্রত্যাশার জালে আটকে যাই।
আবার ধরুন আমি আমার হাজব্যান্ডের কাছে প্রত্যাশা করতে পারি—উনি হালাল রিযিকের জন্য চেষ্টা-মেহনত করবেন। কারণ এটা উনার দায়িত্ব। আবার আমার হাজব্যান্ড আমার কাছে প্রত্যাশা করতে পারেন, আমি দায়িত্বশীলতা ও মিতব্যায়িতার সাথে ঘরকন্না করব, বাচ্চাদের দেখভাল করব। কারণ, এটা আমার দায়িত্ব। যার যে দায়িত্ব থাকে সেই দায়িত্বের জায়গাটুকুকে তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।
যেটুকু দায়িত্ব না, কিন্তু দয়া, অনুগ্রহ ও উপকারী বিষয়ের মধ্যে পড়ে, সেটাও প্রত্যাশা করা যেতে পারে। যেমন: শাশুড়ি তার বউ-মার কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, কিছু খেদমত প্রত্যাশা করতেই পারেন। বউ-মাও শাশুড়ির কাছ থেকে আদর-স্নেহ প্রত্যাশা করতেই পারেন।
ভালো ধারণাকে সামনে রেখেই আমরা প্রত্যাশা শুরু করি। কিন্তু অসচেতনতার কারণেই হোক, আর নার্সিং না করার কারণেই হোক, কখন যে 'প্রত্যাশা' হ্যাপিনেস-কিলার হয়ে ওঠে, নিজেরাও টের পাই না। বুঝে উঠতে পারি না, কোন ফাঁকে প্রত্যাশাগুলো এত মোটাসোটা হয়ে গেছে। এই মোটাসোটা প্রত্যাশার কাছে বারবার পরাজিত হতে থাকে আপনার আত্মসম্মানবোধ, পারস্পরিক সম্পর্ক, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি।
সুখের সম্পর্কগুলোকে নিমেষেই অসহনীয় করে দিতে পারে এই লাগামছাড়া প্রত্যাশা। এ শুধু আপনার অনুভূতিতে আঘাত হেনেই ক্ষান্ত হবে না। আপনি দুনিয়ায় যে শান্তি পেতে চান সেই শান্তির গলায় সব সময় কাঁটার মতো বিঁধে থাকবে। সম্পর্ককে খারাপ করার জন্য এই একটা জিনিসই যথেষ্ট— এলোপাতাড়ি চাওয়া, অশেষ প্রত্যাশা।
বেসামাল প্রত্যাশার একটা উদাহরণ দিই।
ধরুন, আপনি বাবার বাড়িতে খুব স্বাধীনচেতা হয়ে বড় হয়েছেন। কোনো কাজে বিশেষ বাধা-নিষেধ নেই। সেখানে কারও ব্যক্তিগত কাজে তেমন কেউ হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু বিয়ের পরে দেখলেন শ্বশুরবাড়িতে অতটা স্বাধীনতা নেই, শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে একজন খুবই কড়া। সব বিষয় মোটামুটি উনাদের নখদর্পণে। এখন এই রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়িতে এসে যদি বাবার বাড়ির মতো ফ্রিডম প্রত্যাশা করেন, তখন আপনার এই প্রত্যাশাগুলো হয়ে যাবে বেসামাল প্রত্যাশা। পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনি যদি প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তবে নিঃসন্দেহে এই 'বিষময় প্রত্যাশার' অন্যায় আকুতি আপনাকে বেসামাল করে দেবে।
আবার অনেক ছেলের মায়েরা আছেন যারা ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে বিভিন্ন উপহার-উপঢৌকন প্রত্যাশা করে থাকেন। উনারা এটাকে যৌতুক বলেন না, বলেন 'উপহার'। 'আমাদের কোনো ডিমান্ড নেই, কিন্তু মেয়েকে খুশি হয়েও তো কিছু দেয়া যায়!' এগুলো এলোপাতাড়ি প্রত্যাশা। এসব প্রত্যাশা যখন পূরণ হয় না তখন আস্তে আস্তে মনোমালিন্য শুরু হয়, শুরু হয় সম্পর্কে টানাপড়েন।
আমাদের প্রত্যাশা বা চাওয়াগুলো এলোপাতাড়ি হওয়ার পেছনে শুধু আমাদের লোভ বা প্রবৃত্তি দায়ী না। অনেকাংশে আমরা জানি না প্রত্যাশাগুলো কেমন হওয়া উচিত। অনেক সময় সমাজের স্রোতে ভেসে যাই। আর দশজন যেভাবে চায় আমরাও সেভাবেই চাইতে থাকি। আলাদা করে ভাবার সময় হয় না—সামনের জনের কাছ থেকে আমি আসলে কী চাই বা চাওয়াগুলো কেমন হতে পারে? অনিশ্চয়তা বা একা হয়ে যাবার ভয়ে সমাজের গতানুগতিক বিতর্কিত ভালো-মন্দ সব ধরনের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই আপন করে নেয়া হয়। যেমন: বউ-মার প্রতি শাশুড়ি-মা বা শাশুড়ি-মায়ের প্রতি বউ-মার প্রচলিত প্রত্যাশাগুলো উনারা নিজেদের জন্য নিরাপদ মনে করেন। অনেক প্রচলন আছে যেগুলো সব সময় শাশুড়ি বা বউ-মার ব্যক্তিত্বের সাথে মিলে যায় না। তখনই খটকা বাঁধে। যেমন সমাজে প্রচলিত আছে, বউ-মা আসার পর শ্বশুরবাড়ির মোটামুটি সব কাজকর্ম সে করবে। নতুন বউ, সব কাজ ঠিকঠাক নাও করতে পারে। তখন একটা খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়—ও, বাপ-মা কিছুই শেখায়নি!
ঘরে প্রত্যাশার আবেগ থাকবেই। এটাকে সমূলে নির্মূল করা যায় না। শুধু আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে, কোন কোন প্রত্যাশাগুলো আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলছে বা মন খারাপের মূলে আছে। খুব একটা মানানসই না বা মনে গোলযোগ সৃষ্টি করে সেসব প্রত্যাশাগুলো আগে চিনে আলাদা করা দরকার। এ ক্ষেত্রে একেকজনের ভারসাম্যহীন প্রত্যাশা একেক রকম হতে পারে। সঠিক প্রত্যাশা চেনার সহজ উপায় হলো, শুধু দায়িত্বটুকু প্রত্যাশা করা, এর অতিরিক্ত নয়।
লাগামহীন আশা-প্রত্যাশার স্বরূপ
প্রথমত : মহব্বত হোক, সব ঠিক হয়ে যাবে, কিছুই করা লাগবে না
নতুন বিয়ের পর বউ-মা যখন বাবার বাড়ির মানুষজনের কাছে শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে এ সমস্যা সে সমস্যা নিয়ে কথা বলে, তখন বাবার বাড়ির মানুষজন এভাবে সান্ত্বনা দেন-সবে বিয়ে হয়েছে, যখন মহব্বত হয়ে যাবে তখন সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। এ কথা শোনার পর বউ-মার মনে হয়, ঠিক আছে, তাহলে এই সম্পর্ককে সুস্থ, সুখময় রাখার জন্য আর কোনো প্রচেষ্টার দরকার নেই। আপনি-আপনিই সব ঠিক হয়ে যাবে। সময়ের ব্যবধান মাত্র। আসলেই কি আপনা-আপনি ঠিক হয়? নাকি সচেতন প্রচেষ্টা লাগে? নাকি অপছন্দনীয় বিষয়গুলো অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়?
ঠিক এমনটি শাশুড়ি-মায়ের ক্ষেত্রেও ঘটে।
আবার ধরুন বউ-মা ও শাশুড়ি একে অপরকে সত্যিকার অর্থে মহব্বত করে। তার মানে কি এই, তাদের কোনো সমস্যা বা মনোমালিন্য হবে না। ছোটবেলা থেকে ঠাকুরমার ঝুলি রূপকথার গল্পে 'অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করা শুরু করল' শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেলেও বাস্তবে তা ঘটে না। এটা স্পষ্টত অবাস্তব।
আপনি যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, কিছু কিছু সমস্যা আপনার সাথে জোঁকের মতো লেগে থাকবে। একটা সমস্যা শেষ হবে, তারপর আরেকটা সমস্যা শুরু হবে।
তাই 'যখন মহব্বত হয়ে যাবে তখন সব ঠিক হয়ে যাবে' সম্পর্ক ঠিক করার পেছনে যত্নবান না হয়ে এই ধরনের নীতি অনুসরণ করলে সেটাকেই বলে ভুল প্রত্যাশার পেছনে ছোটা। এ ধরনের প্রত্যাশা মন থেকে মুছে ফেলতে হবে।
দ্বিতীয়ত: 'বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়' তা তো তার জানা উচিত।
এত পড়াশোনা করেছ আর শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর, ননদ নিয়ে কীভাবে থাকতে হয় তা জানো না!
এত ধর্ম মানো আর জানো না কীভাবে সংসারধর্ম করতে হয়!
এটা-সেটা সেলাই করতে পারো আর ঘর গোছাতে পারো না!
এত নামাজ-কালাম পড়ে আর ছেলের বউয়ের সাথে একটু ভালো আচরণ করতে পারে না!
একটা কাজে ভালো বলেই যে আরেকটা কাজেও সে দক্ষ হয়ে যাবে—কী মানে আছে?
অনেকে ধরেই নেয় যে, সে কেন জানবে না? কেন বুঝবে না? এটা না বোঝারই-বা কী আছে আর না জানারই-বা কী আছে? মনে হয় যেন, আরও একটা জন্ম সে শাশুড়ি-মা বা বউ-মা হিসেবে পার করে এসেছে!
সংসারে আসার পর শত শত নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এক এক পরিস্থিতি সামলানোর জন্য একেক রকমের যোগ্যতা লাগে। এই ধরনের যোগ্যতা যে সব শাশুড়ি-মায়ের থাকবে অথবা সব বউ-মার থাকবে, সেটা প্রত্যাশা করা অযৌক্তিক না?
তৃতীয়ত: তার তো আমার পাশে থাকা উচিত, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন!
আমি যা-ই করি না কেন, আমার ছেলে-মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি, বউ-মা, জামাই পরিবারের সবাই আমার পক্ষেই থাকবে। কারণ আমি তাদের পরিবারের একজন। নিঃসন্দেহে আমি তাদের কাছে মহব্বতের দাবিদার।
কিন্তু আমার কোনো বিতর্কিত আচরণে আমার কাছের মানুষটাও আমার ওপর প্রশ্ন তুলতেই পারে। ভুল ধরিয়ে দেয়া মানেই তো ভালোবাসা কমে যাওয়া না।
ধরুন, বউ-মা সত্যি সত্যি কোনো ভুল করলেন। শ্বশুরবাড়ির মানুষজন ভুলটা ধরিয়ে দিল। শ্বশুরবাড়ির অন্যান্যদের সাথে স্বামীও ভুলটা নিয়ে কথা বলল। তখন অনেক বউ-মা মনে করেন, আমার স্বামী কেন আমার পক্ষে থাকল না! কেন অন্যদের হয়ে কথা বলল? ব্যস, শুরু হয়ে গেল স্নায়ুযুদ্ধ।
আবার ধরুন, বউ-মার সাথে শাশুড়ির কথা কাটাকাটি চলছে। শাশুড়ি চাচ্ছেন উনার স্বামী, ছেলে-মেয়েরাও তার হয়ে কিছু বলুক। কারণ তিনি এতদিন ধরে পরিবারের সবার সেবা-শুশ্রূষা করে এসেছেন, এখন কেন পরের বাড়ির মেয়ের পক্ষ নেবে?
এটা প্রত্যাশার একটা ভুল দিক। প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও মতামতের অধিকারী। এমন অনেক সময় আসবে, যখন একই পরিবারের মানুষগুলো একসাথে একই লাইনে দাঁড়াবে না। কে কার পাশে থাকছে এটা বড় কথা না। কথা হলো, কে অন্যায়কে ছুড়ে ফেলে ন্যায়কে আঁকড়ে ধরেছে।
চতুর্থত: সম্পর্কে আন্তরিকতা যদি থাকে, তবে অন্তরের কথা কেন বুঝবে না।
রূপকথার গল্পে বা নাটক-সিনেমায় এই ধরনের অনেক মাইন্ডরিডার থাকে। কিন্তু বাস্তবে 'মাইন্ডরিডার'রা কোথায় আছে কে জানে!
আমি কী বলতে চাই সবাই সেটা দেবদূতের মতো বুঝে যাবে! যাই হোক না কেন আমার সাথে একমত হবে! আমি যেভাবে স্বপ্ন দেখতে চাই সেও ঠিক সেভাবেই স্বপ্ন দেখবে। আমি যেভাবে বলছি সামনের জন্য সেভাবেই বুঝবে। যেন সবাই 'সু মন্তর সু' বলে জাদু করে মনের ভেতরে ঢুকে গেছে!
আমি এভাবে চিন্তা করি বলেই যে, আরেকজনও এভাবেই চিন্তা করবে তার কী মানে আছে? সবাই স্বতন্ত্র, আলাদা আলাদা মানুষ। সবার সবলতা, দুর্বলতা ভিন্ন।
অনেকে প্রশ্ন করে, সে যদি আমার অন্তরের কথা নাই বোঝে, তাহলে সম্পর্কের আন্তরিকতা কোথায় থাকল? এই প্রশ্ন থেকেই হাজার অভিযোগের সূত্রপাত ঘটে। ও কেন এমন করল? কীভাবে করতে পারল?
নিজেকে নিয়ে যতটা না চিন্তা হয় অন্যকে নিয়ে একটু বেশি চিন্তা শুরু হয়! এটা একটা ভুল প্রত্যাশা।
পঞ্চমত: সামনের জনের কাছ থেকে সব ব্যাপারে পারফেকশন আশা করা
অনেকটা এমন যে, আমার কাজকর্ম, কথাবার্তা যেমনই হোক না কেন, তোমার কাজকর্ম কথাবার্তা সব সময় অলি-আল্লাহর মতো হতে হবে! সেখানে কোনো ধরনের ভুল থাকা যাবে না।
আমি কী বলে বকাঝকা দিলাম বা খোঁচা দিলাম সেটা ব্যাপার না, ব্যাপার হলো তোমার প্রতিক্রিয়া কতটা পারফেক্ট হচ্ছে সেটা।
ধরুন, বউ-মা শাশুড়ির কোনো দেখভাল করে না। কিন্তু শাশুড়ির কাছ থেকে সব সময় ভালো ব্যবহার আশা করে। আবার শাশুড়ি দেখা গেল বউ-মার সাথে কখনো আদর করে কথা বলে না, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, কিন্তু সব সময় বউ-মার হাসিমাখা মুখ দেখতে চায়। কারণ বউ মানুষ মুখ গোমড়া করে থাকা ঠিক না। তবে শাশুড়ি-মা শক্ত মুখে কথা বললেও তাতে সমস্যা নেই!
আমি নিজের পারফেকশনের ব্যাপারে খুবই উদাসীন, কিন্তু অন্যের পারফেকশনের ব্যাপারে খুবই সচেতন—এটা কেমন কথা?
ষষ্ঠত: জীবনে এত রকমের সমস্যা কেন হবে? এর গতি কেন সব সময় স্বাভাবিক হয় না?
এ বিপদ সে বিপদ সব আমার ঘাড়েই কেন?
অনেকে এভাবে চিন্তাভাবনা করেন, জীবন সুন্দর করার জন্য অনেক চেষ্টা-মেহনত করেছি। তারপরও এত ঝামেলা কেন পোহাতে হয়?
অনেকে আফসোস করে বলেন, কাউকে আর পরিবর্তন করতে পারলাম না, সবাই আগের মতোই রয়ে গেল!
অমুক এটা পেল তাহলে আমি কেন পেলাম না। ওই ভাবির শাশুড়ি এত ভালো, বড় ভাইয়ের বউ-মা এত ভালো, তবে আমার ক্ষেত্রেই এমন কেন হয়?
অমুকের ছেলের বউ কত কেয়ারিং আর আমাদেরটা?
আমার ভাগ্যেই কেন এমন হলো?
নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া যেকোনো অপছন্দনীয় বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে ঘাবড়ে যাওয়া, যা পাওয়া যায়নি সেটা না পাওয়ার কারণে মুষড়ে পড়া প্রত্যাশার একটি ভুল দিক।
আপনি সারাজীবন সমস্ত ভালো আচরণ করে এসেছেন বলে যে আপনার সাথে খারাপ কোনো বিষয় ঘটবে না, এর কী নিশ্চয়তা আছে?
অন্যের সাথে তুলনা করে বা নিজের ভালো আচরণের সাথে তুলনা করে প্রাপ্তিকে যাচাই করাও প্রত্যাশার একটি ভুল দিক।
লাগামহীন প্রত্যাশাকে সামলানো
আপনি যখন প্রত্যাশাগুলোকে ঠিকঠাক পরিচালনা করতে পারবেন তখন আপনা-আপনিই হতাশা কমে যাবে। হুটহাট মন খারাপ হবে না। লাগামহীন প্রত্যাশাগুলোকে কীভাবে সামলে রাখা যায় সে সম্পর্কেই কিছু কথা এখানে থাকবে। যেমন:
* আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কিছু চাই বা আশা করি। সব সময় যে খুব হিসাব-নিকাশ করেই চাই এমনটা হয় না।
প্রত্যাশার খারাপ দিকগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, অবাস্তব ও বাস্তবসম্মত প্রত্যাশাগুলো আলাদা করা। অর্থাৎ আপনার সাথে কোন ধরনের প্রত্যাশা খাপ খায় আর কোনটা যায় না, কোনটা বাস্তবসম্মত, কোনটা অবাস্তব সেটা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। আবার আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনোটা যদি সামঞ্জস্যহীন হয়, তবে সেটাকে কীভাবে বাস্তবসম্মত আকাঙ্ক্ষায় স্থানান্তরিত করা যায় সে বিষয়েও চেষ্টা থাকা চাই।
যেমন ধরুন, মনে কোনো আকাঙ্ক্ষা জাগল, তখন আপনি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন, কেন আমি এভাবে প্রত্যাশা করছি? এটা আমার জন্য কতটুকু উপকারী? যার কাছে প্রত্যাশা করছি তার জন্য এটা কতটা সম্ভব?
অনেক শাশুড়ি আছেন বউ-মার কাছে প্রত্যাশা করেন, বউ-মা তার অতীতের সমস্ত ভুল সংশোধন করবে। কেন পারবে না, চেষ্টা করলে তো সব পারা যায়।
এখন বউ-মার জন্য একবারে সব ভুল সংশোধন করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। তাই শাশুড়ি যদি সময় নিয়ে অল্প অল্প করে প্রত্যাশা করেন, তাহলে ওনাকে তুলনামূলক কম হতাশার কষ্ট পেতে হবে। এটাই বাস্তবসম্মত প্রত্যাশার একটা লাভ। মানসিক স্থিরতা দেয়, সাথে সাথে শান্তিও পাওয়া যায়।
এ ক্ষেত্রে আপনি আরেকটি কাজ করতে পারেন। আর তা হলো, আপনি নিজে আপনার বউ-মার কাছে বা আপনার শাশুড়ির কাছ থেকে কী কী বিষয় প্রত্যাশা করেন, সেগুলোর একটি সুস্পষ্ট তালিকা তৈরি করতে পারেন। এর মধ্যে যেগুলো আপনার সাথে খাপ খায় সেগুলোতে টিক দিলেন, যেগুলো খাপ খায় না সেগুলোতে ক্রস দিলেন। এভাবে আপনি আপনার প্রত্যাশাগুলোকে সীমানা ঘেরা এক প্রাচীরে আটকে দিলেন। এবার আপনি জানেন কী চাওয়া উচিত আর কী চাওয়া উচিত না।
আমরা চাই বা আমাদের পেতে ইচ্ছা করে, কারণ আমাদের কিছু শূন্যতা আছে, কিছু অপূর্ণতা আছে, কিছু অপ্রাপ্তি আছে। যা পাইনি আগে তা পেতে চাই।
সব সময় কেউ যদি মনে করে আমি এটা পাইনি, সেটা পাইনি, তাহলে না-পাওয়ার দুঃখে সব সময়ই মনের ভেতরটা খাঁ-খাঁ করতে থাকবে।
মজার ব্যাপার হলো, হিসাব করলে দেখতে পাব, যা এখনো পাওয়া হয়নি তারচেয়ে যা পেয়েছি তা অনেক বেশি।
প্রাপ্তিগুলো নিয়ে যখন চিন্তা-ভাবনা করা হয় তখন অন্তরে শুকরিয়া আসে। প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বড় একটা উপায় শুকরিয়া করা। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ঠিক ঠিক প্রশংসা করতে পারলে চাহিদার ক্ষেত্র থেকে সহজেই কৃতজ্ঞতার রাজ্যে প্রবেশ করা যেত।
আপনার শাশুড়ির যে ভালো বিষয়গুলো আছে সেগুলো নিয়ে যদি আপনি চিন্তা-ভাবনা করেন বা উনার প্রশংসা করেন, তাহলে উনার যেমন ভালো লাগবে, তেমনই তিনি প্রশংসনীয় বিষয়গুলো আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। অপরজনের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত গুণগুলো বাড়তে থাকবে। বউ-মার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। বউ-মার ভালো বিষয়গুলো নিয়ে যদি শাশুড়ি বউ-মার প্রশংসা করেন, বাহবা দেন, উৎসাহ দেন, তবে ভালো গুণগুলো বউ-মা আরও বেশি আঁকড়ে ধরতে চাইবে।
হয়তো আপনি আপত্তি করতে পারেন, ওর মধ্যে কোনো ভালো গুণই নেই! কিসের প্রশংসা করব?
এমন মনে হলে, আপনার উচিত হবে আরেকবার নজর করে দেখা। আপনি কিছু-না-কিছু গুণ পাবেনই।
• আমাদের নিজেদের ক্যারিয়ার, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার পেছনে ছোটাছুটি, ভবিষ্যতের সঞ্চয়, গাড়ি-বাড়ির চিন্তা, সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখা ইত্যাদিতে আমরা এতটাই ব্যস্ত যে, পরিবারের সবাই একসাথে গল্প করতে করতে চা-নাস্তা খাওয়া, বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে চাওয়া বা ভোরে উঠে ছাদে হাওয়া-খাওয়া, এসব আর হয়ে ওঠে না।
কিন্তু ছোট ছোট এই কাজগুলো আমাদের ভীষণ ভালো রাখে। একসাথে করা এ কাজগুলো যে শুধু বিনোদনমুখরিত হতে হবে তা না। যেকোনো ভারী কাজও হতে পারে। যেমন সবাই মিলে ঘরবাড়ি আসবাবপত্র Deep clean এর মতো কোনো কাজ হতে পারে। একসাথে আনন্দঘন যেকোনো কিছু। কখনো বসে যদি আপনি স্মৃতি হাতরান তবে এ ধরনের কাজের স্মৃতিগুলো খুব চকচকে দেখতে পাবেন।
আমাদের আকাঙ্ক্ষায় তখন হাহাকার ওঠে যখন স্মৃতির পাতায় এসব চকচকে বিষয়গুলো মলিন হয়ে যায়। যেকোনো ধরনের মধুরস্মৃতি সম্পর্কে সন্তুষ্টি জায়গা তৈরি করে, সে যে সম্পর্কই হোক না কেন। আনন্দঘন কিছু কাজ যেন আপনার স্মৃতির পাতায় থাকে, যা আপনার কৃতজ্ঞতার খোরাক জোগায়। যেমন ধরুন বউ-মা ও শাশুড়ি-মায়ের একসাথে শীতকালের পিঠা বানানো, চাঁদরাতে মজার মজার রান্না করা, ঈদের দিন বিকেলে ঘুরতে যাওয়া, বাগানে গাছের পরিচর্যা করা ইত্যাদি যেকোনো ধরনের কাজের স্মৃতি লাগামহীন প্রত্যাশাকে সংকুচিত করে।
ভুল প্রত্যাশায় বলা হয়েছে, আমরা মাঝে মাঝে তুলনা করেই আমাদের প্রত্যাশাকে ফিক্স করে ফেলি। অমুকের বউ-মা এমন, তার মানে আমারও এমন বউই চাই। অমুকের শাশুড়ি এটা করেছে, ওটা বলেছে। তার মানে আমার শাশুড়িও এভাবে বলবে, ওভাবে করবে।
একের পর এক তুলনার জন্য বাইরের দিকে তাকানো আমাদের বিভ্রান্ত করে। তখন বিভিন্ন মানুষের আদর্শের জোয়ারে আমাদের আন্তরিক চাওয়াগুলো খেই হারিয়ে ফেলে। একবার বান্ধবীর শাশুড়ির মতো শাশুড়ি-মা চাই, আরেকবার বোনের শাশুড়ির মতো শাশুড়ি চাই। কখনো চাচ্ছি আমার বউ-মা আমার ভাইয়ের বউ-মার মতো হোক, কখনো চাচ্ছি বান্ধবীর বউ-মার মতো হোক। খেতে বসে অন্যের প্লেটের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে নিজের প্লেটের খাবারটা উপভোগ করা যায় না।
তুলনা করে অবাস্তব প্রত্যাশার দীর্ঘ একটি লিস্ট আপনি তৈরি করে ফেললেন। এর মানে হলো, আপনি নিজেকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছেন। আপনি আপনার শক্তি, ক্ষমতাকে না দেখে যা ধরাছোঁয়ার বাইরে তা নিয়েই পড়ে আছেন। আপনার শক্তি বা দুর্বলতা খুঁজে বের করুন। দুর্বলতাকে সবলতায় কনভার্ট করতে নিজের কাছে আশা করুন।
মানুষ যখন নিজের কাছে চায় তখন চারপাশের সকলের কাছ থেকে তার প্রত্যাশা কমে যায়। নিজের ওপর আস্থা রাখুন, যাতে উপভোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করতে বউ-মা বা শাশুড়ি-মা বা অবাস্তব কোনো প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করতে না হয়।
তাই আশেপাশের মানুষের প্রাপ্তির সাথে নিজের প্রাপ্তিকে তুলনা না করে, আমি কে, আমার জন্য কোনটা ভালো, সেসব নিয়ে চিন্তা করা উপকারী। অর্থাৎ তুলনা না করে নিজের অথেন্টিক জায়গাটাকে মূল্যায়ন করে এই প্রত্যাশাগুলো ঠিক করা উচিত। একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, প্রত্যেকটা মানুষ অনন্য। সবার একটা নিজস্ব গল্প আছে।
• যেকোনো সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রী বলুন, বউ-শাশুড়ি বলুন, মা-মেয়ে বলুন, শিক্ষক-ছাত্রই বলেন আর মনিব-ভৃত্যই বলুন, এ ধরনের সম্পর্কের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে অকপট, স্বচ্ছ ও সৎ কথাবার্তার ওপর। অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা আর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যখন খোলা মনে সম্পর্কের সামনের প্রান্তের আরেকজনের সাথে শেয়ার করা হয়, তখন বন্ধন আরও দৃঢ় হয়, একতাবদ্ধ হয়।
আপনি যদি লাগামহীন প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তবে আপনার বউ শাশুড়ির সাথে বসে খোলামেলাভাবে প্রত্যাশাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। একসাথে বসতে দোমনা, দোটানা বা ভয়কে জায়গা দেবেন না। পৃথিবীর লাখো লাখো মানুষের মধ্যে আপনারা একে অন্যের অনেক আপনজন। বউ-মা যেমন সব ছেড়ে শাশুড়ির কাছে আসে, তেমনই শাশুড়িও তার সারাজীবনের একটু একটু করে সাজানো সংসারকে একসময় বউ-মার হাতেই ছেড়ে যান। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে: A Mother gives her daughter birth, A Mother in law gives her daughter in law her life.
পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে সমুন্নত রেখে খোলা মনে আপনি কী চান আরেকজনের কাছে তা আলোচনা করে পরিষ্কার করতে পারেন। একে অপরকে প্রত্যাশিত বিষয়গুলো কোনো প্যাঁচ বা ভাব দেখানো বা জটিলতা ছাড়া একদম অকপট বলতে পারলে, প্রত্যাশা পূরণ হোক বা না হোক, আকাঙ্ক্ষার গল্পগুলো অন্তত একে-অন্যের জানা থাকত। তখন আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের ওপর প্রকাশ করার জন্য সহজ হয়ে যেত।
তবে এসব আলোচনায় কেউ যদি মনে করে, কেন জানবে না, এসব আবার বলে দিতে হয় নাকি! তখন সে যা চায় তা খুব ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলে! যেমন : 'এতদিন হলো বিয়ে হয়েছে এখন জিজ্ঞেস করছে শাশুড়ি কী চায়?' কথায় এ ধরনের কপটতা থাকলে তো সামনেরজন আপনার সাথে কথা বলতেই ভয় পাবে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, তাই না?
ইগোটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে, প্রত্যাশাগুলো ঠিক ঠিকভাবে একে অন্যের সাথে শেয়ার করে বাস্তবে তা প্রাপ্তির পথকে উপভোগ করুন।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 রাগের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

📄 রাগের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া


রাগ চেনে না বা রাগ করতে দেখেনি এমন কেউ আছে? কেউ যদি নিজে রাগ নাও করে, তবে অন্যের রাগান্বিত চেহারা সে নিশ্চয়ই দেখেছে। রাগ নিয়ে আলোচনা করার আগে আমিরে মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।
একবার এক সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এলেন অত্যন্ত রাগান্বিত অবস্থায় এবং বললেন, অমুক আমার দাঁত ভেঙে দিয়েছে। আমি কিসাস নেব এবং তারও দাঁত ভেঙে দেব। হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বোঝালেন, ওই লোকের দাঁত ভেঙে তোমার কী লাভ হবে? তারচেয়ে বরং অর্থদণ্ড আরোপ করি এবং এর মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাক। কিন্তু তিনি অনড়, না আমি আপস করব না। আমিও তার দাঁত ভেঙে দেব।
মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, ঠিক আছে তোমার এই অধিকার আছে। ওই সাহাবী যখন এই উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তখন সম্ভবত হযরত আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, তুমি তার দাঁত ভাঙতে চলেছ, কিন্তু একটা কথা শুনে যাও। তিনি বললেন, কী কথা?
আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এখন পর্যন্ত তুমি বোঝো না সে তোমার দাঁত ভেঙেছে, কিন্তু তুমি যদি তার দাঁত ভাঙতে গিয়ে তার চেয়ে বেশি জোরে আঘাত করো, তখন তুমি হবে জালিম এবং আল্লাহর দরবারে অপরাধী। আর যদি তুমি তাকে মাফ করে দাও, তাহলে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারও অত্যাচার ক্ষমা করে, আল্লাহ তাআলা তাকে কেয়ামতের দিন ক্ষমা করবেন, যেদিন তার ক্ষমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে।
সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি নিজে তাঁর (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) কাছ থেকে শুনেছেন? আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হ্যাঁ, আমি নিজেই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি।
সাহাবী বললেন, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।⁵⁵
উল্লেখ্য, সাহাবীর রাগ হয়েছে এবং রাগটা কতটা নিয়ন্ত্রণে যে, উনার দাঁত ফেলে দেয়ার পরে উনি নিজেই সাথে সাথে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারতেন। তখনই অপরজনের দাঁতও ফেলে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে আমীরের কাছে বিচার চেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে আমীরের কথা মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমাদের রাগের বহিঃপ্রকাশকে যদি এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে রাগ হলেও এর বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ায় আর আফসোস করতে হবে না, ইনশাআল্লাহ।
বউ-মা ও শাশুড়ির যৌথ পদক্ষেপের মধ্যে এবারে রাগ সম্পর্কিত সচেতনতা নিয়ে আলোচনা করা হবে। সত্যি বলতে এই চ্যাপ্টারটা শুধু বউ-মা বা শাশুড়ি-মার জন্যই না। মোটামুটি আমাদের সবার জন্যই, কারও জন্য তেমন নির্দিষ্ট না।
রাগ আমাদের কোনো অভ্যাস না; ভালোবাসা, ঘৃণা যেমন একটি আবেগ তেমন রাগও একটি আবেগ। মনোবিজ্ঞানী স্পিলবার্গের মতে রাগ একটি মানসিক অবস্থা, যার তীব্রতা, হালকা ইরিটেশন থেকে Intense Furry and Rage এ পরিবর্তিত হয়। অন্যান্য আবেগের মতো রাগও শরীর-মনে পরিবর্তন আনে।
আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, রাগ একটা স্বভাবগত বিষয়। এটা সৃষ্টি হওয়া মানুষের এখতিয়ারের বিষয় নয়। এ জন্য শুধু ক্রোধ সৃষ্টি হওয়াতে দোষ নেই। তবে ক্রুদ্ধ হওয়ার পর যে কাজগুলো করতে ইচ্ছা হয় তা করে ফেলা, যদি তা বৈধ মাত্রা অতিক্রম করে, নিন্দনীয়।⁵⁶
রাগ নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো, তাতে মনের ভেতরে আবেগের একটি অংশ হিসেবে রাগ আসতেই পারে। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ঘটনার কারণেই রাগ হতে পারে। বাইরের কোনো মানুষের কাজ বা কথাবার্তা থেকে রাগ হতে পারে। আবার ব্যক্তিগত কোনো ব্যর্থতা বা সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন-উদ্বেগের কারণেও রাগ হতে পারে। কোনো ক্ষোভের স্মৃতি থেকেও রাগ হতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, বিপদ থেকে নিজেকে আত্মরক্ষার সময়, কারও যেকোনো ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করার সময় (যেমন যুদ্ধের মাঠে), যেকোনো হুমকির মুখে যে আবেগ আমাদের পদক্ষেপকে শক্তিশালী করে, তা হলো রাগ। আমাদের টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ রাগ প্রয়োজন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাগান্বিত হওয়ার অনুমতি শরীয়তে রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে রাগ করা জায়েয ও মুবাহ। যেমন: ন্যায়সংগতভাবে বদলা নেয়া।⁵⁷
আমরা সবাই বিশ্বাস করি, রাগ খারাপ, ক্ষতিকর। তাই চিন্তার মধ্যে কখনো রাগকে জায়গা দিতে চাই না। তাই রাগকে সমূলে উৎপাটন করতে চাই। যখন এটা করতে পারি না তখন এইটা মনে করে আবার রাগ করি যে, কেন আমি রাগ নির্মূল করতে পারছি না! যখন রাগকে আমাদের একটা অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া হয়, তখন এটাকে ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়।
রাগ করা বা রেগে যাওয়া কোনো সমস্যা না। সমস্যা হলো ওই রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমরা যা যা করি-হয়তো বাজে কথা বলি, হয়তো চিৎকার করি, ভাঙচুর করি, মারধর করি-সমস্যা আসলে এগুলোতে।
বুদ্ধিমান মানুষজন রাগের বহিঃপ্রকাশে ক্ষিপ্ত হয় না। যার রাগের প্রকাশ মানুষ কম দেখে, তাকে আর রাগী মানুষ বলে না।
যেমন ধরুন দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে আছে। যে কারণেই হোক, তাদের মাঝে কোনো রাগের ইস্যু তৈরি হয়েছে। একজন চরম চিল্লাচিল্লি শুরু করলেন, লাথি দিয়ে চেয়ার উল্টে ফেললেন। আরেকজনও চরম রেগে গেছেন; কিন্তু চুপচাপ আছেন। মানুষ দেখলে মনে করবে, প্রথমজন বেশি রাগী। হয়তো হিসাব করলে দেখা যাবে দুজনের রাগের তীব্রতা প্রায় একই। এ রকম অহরহ ঘটে। রাগের হাজার হাজার নজির আপনি আমি জানি।
রাগের সময় চিন্তার কয়েকটা দিক
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, রাগ সম্পর্কিত 'আবেগ' ও 'আচরণের' সাথে আরেকটি শব্দ সমান গুরুত্ব পাবে, তা হলো 'চিন্তা'; রাগের সময় যে চিন্তাগুলো হয়।
রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যে আচরণগুলো আসে তার ওপর যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ আনতে চাই, তবে সবার আগে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে-কী কী চিন্তা ওই সময় আমার মাথার মধ্যে এল। যার ফলে রাগের মতো একটি অনুভূতি তৈরি হলো, আমি রেগে গেলাম, বাজে কথা বলে দিলাম।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে রেগে যাই। কিন্তু খুব ভালো করে লক্ষ করলে বুঝে আসে, একেক পরিস্থিতিতে একেক রকম চিন্তা আমাদের মাথায় খেলা করে। এই চিন্তাগুলো আমাদের রাগিয়ে দেয়।
দেখা গেল কারও কাছে কিছু চাই, কিন্তু সেটা পাচ্ছি না। কিছু বোঝাতে চাচ্ছি, কিন্তু বোঝাতে পারছি না। মন চাচ্ছে একরকম, হচ্ছে আরেক রকম। এসব চিন্তাগুলো থেকে তখন বিভিন্ন রাগের এক্সপ্রেশন চলে আসে। এ সময় একমুখী চিন্তায় ফোকাস না করে, ভিন্ন কোনো চিন্তাকে বেছে নেয়া যায় কি না? তখন যেকোনো পরিস্থিতিতে রাগ না; বরং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়।
আমরা যখন রেগে যাই, তখন অনেকগুলো প্যাটার্নে চিন্তাগুলো হতে থাকে :
* চাহিদা
আমরা অনেক কিছুই নিজেদের মতো করে চাই বা প্রত্যাশা করি। কিন্তু সবকিছু আমাদের ইচ্ছা বা পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে না। এই বাস্তবতা বা প্যারাডক্সকে মেনে নিতেই হবে। যেমন: শাশুড়ি চাচ্ছেন বউ-মা শ্বশুরবাড়ির সব কাজ নিজের দায়িত্বে করুক; কিন্তু বউ-মা শাশুড়ির প্রত্যাশামতো কাজ করতে পারছে না। অথবা শাশুড়ির এই ইচ্ছাটা বউ-মা মানতে নারাজ। শাশুড়ি বউ-মাকে এই যে একটা কথা মানাতে ব্যর্থ হলো, এই ব্যর্থতা থেকে শাশুড়ির মনে রাগ তৈরি হতে পারে।
আবার ধরুন বউ-মা মনে করল, আমি নিজের বাড়ি ছেড়ে এখানে এসে আছি, কোথায় আমাকে যত্ন-আত্তি করবে তা না, আমাকেই সবার দেখাশোনা করতে হবে। বউ-মার এই আশা যখন পূরণ হয় না, মনে মনে তার রাগ হতে পারে।
এককথায় নিজের চাহিদাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, আপনার রাগের বাজে বহিঃপ্রকাশের পেছনে আপনার চাহিদাগুলো দায়ী কি না।
* ভুল বিশ্বাস
অনেক সময় বলি, আমি বলে এই সংসার টিকেছে, অন্য কেউ হলে এমন করে সংসার করত না! এ ধরনের বিশ্বাস থাকলে খারাপ চিন্তাগুলো চ্যালেঞ্জ করার শক্তিটা তো প্রথমেই চলে গেল। তখন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার আগেই আমরা হাঁপিয়ে উঠি। ফলে ওই হতাশা থেকে রাগ তৈরি হয়;
বরং এভাবে চিন্তা করা—মানুষের জীবনে বড় বড় অনেক সমস্যা আসে, আমিও অনেক সমস্যার সমাধা করেছি; ইনশাআল্লাহ সামনের সমস্যাও সমাধা করতে পারব।
* শব্দের মাধ্যমে বিপর্যয়
রাগের সময় অনেকে 'সব সময়' 'কখনোই' 'কোনোদিন' 'সারাজীবন' ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে। এই ধরনের শব্দগুলো পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে বানিয়ে দেয়। সাথে সাথে তখন বিশ্বাস করা হয়, শুধু আমার সাথেই এমন ঘটনা ঘটছে, সব ক্ষেত্রে আমিই ভিকটিম।
তখনই চিন্তাটাকে যদি এভাবে পরিবর্তন করা যায়, এমন শুধু আমার সাথে না, অনেকের সাথে ঘটে। আমার মতো ভুক্তভোগী অনেকেই আছে। তখন সাথে সাথেই নিজের অসহায়ত্ব কিছুটা কমে। অসহায়ত্ববোধ কমার সাথে সাথে নিজের প্রতি রাগটাও কিছুটা কমে।
* বিকৃত বিশ্বাস
আমাদের আশেপাশে অনেক রাগের ঘটনা ঘটে যেখানে একটি Distorted Believe কে নার্সিং করা হয়। অনেকে এমন একটা বিশ্বাস মনের মধ্যে পুষে রেখে রাগ করে বা কষ্ট পায়, যেটার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। সামনের পক্ষের যেকোনো আচরণেই ভিত্তিহীন রাগের জন্ম নেয়। আসলে ঘটনা কিছুই না।
যেমন কোনো বউ-মার মনে এ কথা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে যে, শাশুড়ি তাকে জাদুটোনা করেছে, আর এই কারণে তার শরীর খারাপ। এখন শাশুড়ি মনে মনে সূরা ইয়াসীন পড়ে যদি বউ-মার জন্য দুআও করে, বউ-মা তখন ভাবতে থাকে, ওই যে বুড়ি জাদুমন্ত্র পড়ছে। এবং তখন শাশুড়ির সব কথা বা কাজেই তার তীব্র রাগ হতে পারে।
* ভিলেনের মুখোমুখি
যখন আমরা কারও ওপর রাগ করি তখন তাকে একটা ভিলেন ক্যারেক্টার হিসেবে দেখি। তার সব খারাপ, তার মধ্যে ভালো কিছু নেই। সে একটা দায়িত্বহীন, অবিবেচক, আরও কত কী! একটা গ্লোবাল রেটিং করে ফেলি। মোটাদাগে সব খারাপ। কিন্তু দোষে-গুণেই তো মানুষ। মানুষের ভালো দিক যেমন আছে খারাপ দিকও আছে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
রাগের সময় আপনার মাথায় যদি এ ধরনের চিন্তাগুলো খেলে যায় তখন আপনি কয়েকটা কাজ করতে পারেন। যেগুলো সচেতনতার সাথে প্র্যাকটিস করলে, রাগের Wise Management কিছুটা হলেও সহজ হয়।
তাৎক্ষণিক রাগ নিয়ন্ত্রণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسُ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ
'যদি তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তবে তার উচিত বসে পড়া। যদি তার রাগ কমে যায়, তবে ভালো; নয়তো তার উচিত শুয়ে পড়া।'⁵⁸
অযু করতে পারেন। 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' পড়তে পারেন। প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকতে পারেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উপদেশ হিসেবে আরও বলেছেন, রাগান্বিত অবস্থায় অযু করতে, যা রাগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার একটি উত্তম পদ্ধতি।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَإِنَّ الشَّيْطَانَ خُلِقَ مِنَ النَّارِ، وَإِنَّمَا تُطْفَأُ النَّارُ بِالْمَاءِ، فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَوَضَّأُ
‘রাগ আসে শয়তানের পক্ষ থেকে; শয়তানকে তৈরি করা হয়েছে আগুন থেকে, আর একমাত্র পানির মাধ্যমেই আগুন নেভানো সম্ভব। তাই তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তার উচিত অযু করা।’⁵⁹
এ ছাড়া নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগের কথাও বলেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘আমি এমন একটি কালেমা জানি, যা পাঠ করলে ক্রোধ দূর হয়ে যায়। (আর তা হলো) ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’, অর্থাৎ আমি বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’⁶⁰
* মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জায়গা পরিবর্তন করে কিছুক্ষণ একা থাকার চেষ্টা করা। এটা ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টার মতন। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে পারেন। যেকোনো Anger Episode এ হার্ট রেট বেড়ে যায়। গভীরভাবে নিশ্বাস নিলে এটা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। রাগের সময় বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া মনটাকে এক জায়গায় আনার জন্য মাইন্ড Angchoring করতে পারেন। নিজের আঙুলগুলোতে প্রেস করতে পারেন।
* আমরা যখন ভীষণভাবে রেগে যাই তখন ছোট্ট একটা টাইম গ্যাপ নেয়া খুব জরুরি। যেমন ধরুন, শাশুড়ির কোনো একটা উপদেশ শুনে আপনি রেগে গেলেন। শাশুড়ির কোনো মতের সাথে একটা বিরোধের জায়গা তৈরি হলো। তখন আপনি মনে মনে বললেন, রেগে চিৎকার করে, ভাঙচুর করে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে যাব না; বরং প্রতিপক্ষকে বললেন, আমি রেগে গিয়েছি, ৪৫ মিনিটের আগে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। যখন আমরা রেগে যাই তখনই Sympathic nervous system over react করা শুরু করে। ব্রেইন এটাকে একটা অপছন্দনীয় বিষয় বা Threatful Object এর মতো মনে করে। শরীরে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তখন আমাদের ব্রেইন এর সামনের অংশ Frontal Cortex যা কিনা ক্রিটিক্যাল ডিসিশনগুলো নিয়ে থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়।
রাগের সময় যখন আমরা ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা টাইম গ্যাপ নিচ্ছি, তখন রাগ ইমোশনের কারণে যে সমস্ত কেমিক্যালগুলো শরীরে নিঃসারণ শুরু হয়েছিল, সেগুলো Base লাইনে আসা শুরু করে। আর তখন গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে, তা হলো, রাগের পেছনে থাকা চিন্তাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার যথেষ্ট সময় আপনি পান। রাগকে তাৎক্ষণিক দমনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ-সময় নেয়া।
• যখন কিছুটা রাগ কমবে তখন আপনি অপরজনের সাথে কথা বলতে পারেন যে, কেন আপনি কষ্ট পেয়েছেন, কেন রেগে গিয়েছেন। যাদের কমিউনিকেশন সহজ-সরল, সাবলীল হয়, তাদের তুলনামূলক এ সমস্যায় কম পড়তে হয়। আমরা অনেক রাগ-অভিমান-ক্ষোভ আমাদের ভেতর লুকিয়ে রাখি।
মনে করি, মানুষ আমাকে দেখে বুঝে নেবে। এটা ভুল প্রত্যাশা। মানুষ আপনার মতো করে আপনাকে বুঝবে, এটা মানুষের কাজ না। এটা ওপরওয়ালা পারেন। তাই আপনার কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না, পরিষ্কার বাক্যে সোজাসাপ্টা বিনয়ের সাথে সামনেরজনকে বুঝিয়ে দিতে পারেন। পজিটিভ কমিউনিকেশন ছাড়া Anger Management খুবই কঠিন। তাই রাগ যার সাথেই হোক না কেন, অবশ্যই শ্রদ্ধার সাথে খোলাখুলি আলাপ করে বিষয়টা জানাতে হবে। আপনার যেমন অনুভূতি হচ্ছে ঠিক তেমনটিই অপরপক্ষকে জানানো জরুরি। এটা লুকিয়ে চাপা দেয়ার মতো কিছু না। আবার চিল্লাচিল্লি করে মাথায় তোলার মতো কিছু না। যেকোনো মানসিক দ্বন্দ্বকে সমাধান করার এটাই সহজ উপায়-খোলামেলা আলাপ।
• রাগ হওয়ার সময় আপনি যে ছোট টাইম গ্যাপ নিচ্ছেন, তখন রাগের কারণগুলো খুঁজে বের করুন। রাগের কারণগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো লিখে ফেলুন। আপনার প্রাত্যহিক জীবনে যখন এই ট্রিগারগুলো আসবে তখন ব্রেইন আপনাকে নোটিফিকেশন পাঠাবে-সচেতন হয়ে যাও, এখন রাগের একটি ট্রিগার আসছে। রাগের কারণ সম্পর্কে সচেতন হতে এটা খুব উন্নত একটি কৌশল।
রাগকে তাৎক্ষণিক দমন করতে Avoid খুব উপকারী একটি উপায়। রাগ হয়েছে, চিন্তা করতে হবে এখানে রাগ দেখায়া লাভ কী? বাইরে গিয়েছেন, রিকশাওয়ালার সাথে কোনো ব্যাপারে রাগ হয়েছে; চিল্লাচিল্লি করলেন, মাথাটা গরম হয়ে গেল! রাগে গজগজ করতে করতে বাসায় আসলেন, বরাবরের মতো বাচ্চা কিছু একটা বলল। কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে গেল। চেইনের মতো একটার পর একটা নেগেটিভ এপিসোড ঘটতে থাকল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে Avoid না করতে পারলে এমন সব ঘটনা ঘটবে, যা আপনি কোনো লজিক দিয়ে মিলাতে পারবেন না।
মনোবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে, যেসব ব্যাপারে আমরা হতাশ সেখানে আমরা উগ্র ব্যবহার করি না। ঘটনা ঘটবে এক জায়গায়, আর আপনি রাগ দেখাবেন অন্য জায়গায়। যতক্ষণ পর্যন্ত ফ্রাস্ট্রেশন আপনি ক্যারি করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই আপনার ঝাড়ি খাবে। কেউ বুঝে উঠতে পারবে না ঘটনা কী হয়েছে, কেন ঝাড়ি দিচ্ছে? এ ক্ষেত্রেও আপনাকে Avoid প্র্যাকটিস করতে হবে। যেমন ধরুন, আপনার শাশুড়ির ওপর আপনার কোনো ক্ষেত্রে রাগ হয়ে আছে, কিন্তু আপনি তাকে কিছু বলতে পারছেন না। সেই রাগের রেশ ধরে আপনি বাসন ধুয়ে আছড়ে রাখছেন, বাচ্চাকে মারধর করছেন, সংসারের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু এসবের কোনো কিছুর ওপরে আপনার রাগ না, রাগ হয়েছে অন্য জায়গায়। হতাশাজনক ওই বিষয়গুলোকে Avoid করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে রাগ নিয়ন্ত্রণ
* প্রথমত, ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে চিন্তা করা দরকার। জোরালো গুরুত্ব দিতে হবে, আমার কোনো কাজ যেন আমার খারাপ পরিণতির কারণ না হয়। ধরুন, রাগের মতোই কিছু ঘটেছে, আমি রেগে গেছি, এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি, পরবর্তী সময়ে আমারই খারাপ লাগছে। আফসোস করছি, কেন এমন হলো? শত শত ডিভোর্সের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভয়াবহ আফসোসের ঘটনা শুনতে পাওয়া যায়। আমার কোনো কথা বা আচরণ যেন আমাকে দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মধ্যে না ফেলে।
* এই ছোট জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে। বিবাহসূত্রে, প্রতিবেশী হিসেবে, বন্ধুবান্ধব হিসেবে আমরা অনেক মানুষকে পাব। সবাই এক রকম হবে না। একেকজনের মন-মানসিকতা, কর্ম, অবদান একেক রকম। কেউ আনন্দ দেবে, কেউ কষ্ট দেবে। আনন্দ দেয়া মানেই সে শুভাকাঙ্ক্ষী আর কষ্ট দেয়া মানেই সে শত্রু এমনও না। সবার মধ্যে কিছু দোষ থাকবে, কিছু গুণ থাকবে। অন্যদের ভালো কাজ, ভালো গুণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আর খারাপ দিকগুলো দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। মাঝে মাঝে কিছু না দেখার ভান, নিজেকে ভালো রাখে। রাগের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে এই ভানের বেশ ভূমিকা আছে।
• ঠিক, আমাদের সমাজে বাস করতে হয়। তাই বলে তো সবার সাথে গলায় গলায় ভাব জমানোর দরকার নেই। সবার সাথে এত মেশারও দরকার নেই। আপনি যদি শুরুতেই ঘ্রাণ পান—ওখানে গেলে, ওর সাথে মিশলে বাজে কথা বলবে, আমাকে বিরক্ত করবে, আমি রেগে যাব, সেই রাগ নেগেটিভ Bias এর মতো বয়ে বেড়াব, তবে সেই সমস্ত জায়গাগুলো বা ঘটনাগুলো সচেতনতার সাথে এড়িয়ে চলাই ভালো। ঘটনা ঘটার আগেই ঘটনাকে বাদ দিয়ে গেলেন।
• ঠিকঠাকভাবে মনের কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারা অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর একটি গুণ। এটা যারা পারেন, তাদের রাগের মুখ খুব কমই দেখতে হয়। তারা নিজেরা খুব সহজে মানুষকে বুঝতে পারে, অন্য মানুষরাও তাদের খুব সহজে বুঝতে পারে। ঠিক ধরেছেন—যোগাযোগ দক্ষতা। এই গুণটি রাগের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করে দেয়। এই দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আপনি চেষ্টা করতে পারেন।
• একটা সুন্দর লাইফস্টাইল আপনাকে একটা ধীরস্থির, ঠান্ডা, মাটির মানুষে পরিণত করতে পারে। একটা মানুষ যখন ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করে, তখন তার নিজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। নিজের স্টকে যখন ভালোবাসা থাকে তখন অন্যকে সেটা দেখানো যায় বা দেয়া যায়। অপরদিকে এলোমেলো জীবনের একজন, নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ থাকে। তখন নিজের প্রতি ব্যর্থতা ও ব্যর্থতা থেকে রাগের সৃষ্টি হয়। এরপর আপনার স্টকে যে রাগ আছে সেটাই তখন আপনি অন্যকে দেখান বা দেন।
আরেকটি গুরুত্ব দেয়ার মতো বিষয় হলো—জীবনের শেষ থেকে জীবনটাকে দেখা। আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য দুনিয়াতে এসেছি। একসময় কেউ থাকব না। এটা খুব জরুরি একটা চিন্তা যে, আমরা আমাদের হাসি দিয়ে, সবর দিয়ে আরেকজন মানুষের জন্য কতটুকু আরাম পৌঁছাতে পেরেছি? আমরা খুব দ্রুত চলে যাব। খুব দ্রুত সবাই আমাদের ভুলে যাবে। তাই আমরা সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ চাইব না, আমি কারও জীবনে একটি কষ্টের, আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকি; বরং সুস্থ মস্তিষ্কের একজন চাইবেন, তার হাসিটুকু মানুষ মনে রাখুক, সবরটুকু স্মরণে রাখুক। যারা রাগী, তাদের ক্ষেত্রে মানুষের মনে এই অনুভূতি ঠাঁই পায় না। যদি মনে করেন রাগী না হলে সুপেরিয়র হয়ে থাকতে পারবেন না, তবে এটা ভুল। দয়ালু হলে, বিনয়ী হলে কেউ মাথায় চড়ে বসবে না। অন্তরে জায়গা দেবে।
কেউ রাগী মা চায় না, কেউ রাগী বাবা চায় না, কেউ রাগী স্বামী/স্ত্রী চায় না, কেউ রাগী বউ-মা চায় না, কেউ রাগী শ্বশুর-শাশুড়ি চায় না, কেউ রাগী জামাই চায় না, কেউ রাগী ছেলে-মেয়ে চায় না। কেউ না। তাহলে কিসের জন্য এত রাগ?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ
'সে প্রকৃত বীর নয় যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়; বরং সে-ই প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।'⁶¹
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَا أُوتِيْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَابْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (2) وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبِيرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ )
'অতএব তোমাদের যা দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগমাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী, তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের পালনকর্তার ওপর ভরসা করে। যারা বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে। '⁶²
আল্লাহর ক্ষমা পেতে হলে তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতে হবে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتُ لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكُظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ) (۱۳۳)
'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষকে ক্ষমা করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরই ভালোবাসেন।'⁶³
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ قَادِرُ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ، دَعَاهُ اللَّهُ عَلَى رُؤُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُخَيَّرَهُ فِي أَيِّ الْحُورِ شَاءَ
'যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেয়ার অধিকার দান করবেন।' ⁶⁴
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
مَا مِنْ جُرْعَةٍ أَعْظَمُ أَجْرًا عِنْدَ اللَّهِ مِنْ جُرْعَةِ غَيْظٍ، كَظَمَهَا عَبْدُ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ
'আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।' ⁶⁵

টিকাঃ
৫৫. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২৭৫৩৪। সহীহ লিগায়রিহি।
৫৬. ইসলাহী মাজালিস, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৫
৫৭. ইসলাহী মাজালিস, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫১
৫৮. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২১৩৪৮; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৭৮২। হাসান সহীহ।
৫৯. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ১৭৯৮৫; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৭৮৪। সনদ দুর্বল।
৬০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৮২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬১০
৬১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৯
৬২. সূরা শুরা, (৪২) : ৩৬-৩৭
৬৩. সূরা আলে ইমরান, (৩) : ১৩৩-১৩৪
৬৪. সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস নং ৪১৮৬। হাসান।
৬৫. সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস নং ৪১৮৯। হাসান সহীহ।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 কিছু কিছু অপছন্দনীয় বিষয় মেনে নেয়া

📄 কিছু কিছু অপছন্দনীয় বিষয় মেনে নেয়া


আপনাকে যদি বলা হয়, আপনার বউ-মার এমন পাঁচটি সত্য দোষের কথা বলুন, যা আপনি পছন্দ করেন না কিন্তু মেনে নেয়া যায়। অথবা যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, শাশুড়ির এমন কিছু খারাপ আচরণের কথা বলুন, যা পুত্রবধূ হিসেবে আপনি মেনে নিতে পারেন।
আপনি হয়তো বলবেন, আমি পছন্দ করি না তাহলে কেন মেনে নেব? এমন একটা জিনিস কেন তার মধ্যে থাকবে? কেন সে এটা থেকে বের হয়ে আসবে না?
আপনি মেনে নেবেন। কারণ আপনি যেমন নির্ভুল, নিষ্পাপ, পারফেক্ট না; কোনো বউ-মাও নির্ভুল না, কোনো শাশুড়িও নির্ভুল না। আপনি আশেপাশে যাদের দেখছেন-আপনার ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা, ভাই-বোন-কেউ নিখুঁত না। আপনার অন্ধ মহব্বতের কারণে হয়তো কারও কারও দোষ আপনার চোখে পড়ছে না। বাস্তবে তাদের মধ্যেও অসংখ্য দোষ আছে, যা আপনি মেনেই নিয়েছেন। জানা, না-জানা অসংখ্য দোষ-গুণ সাথে নিয়েই আমাদের বছরের পর বছর একসাথে কাটাতে হয়।
অবশ্য, ধর্মীয়-সামাজিক কোনো আইনেই বৈধ না এমন বিষয়গুলোকে কেউই মেনে নেবেন না। এসব মেনে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে না। সীমার ভেতরের বিষয়গুলো কমবেশি মেনে নেয়া যায়। যেসব পরিবারে এই মেনে নেয়াটা কম, সে ঘরগুলোতে একবার ঢুকলে মনে হয় না আর কোনোদিন ঢুকি। সারাক্ষণ ঝগড়া-ঝাঁটি, গালাগালি অবিরাম।
অন্যের ভুল মেনে নেয়ার মানসিকতা না থাকলে ভুলগুলোকে খুব স্পষ্ট, চকচকে মনে হয়। তা ছাড়া তখন খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, হঠাৎ করেই যেন ভুলগুলো বেড়ে যাচ্ছে। ভুল খোঁজা হলে ভুল বাড়তেই থাকবে। ভুলগুলো যখন খুঁটিয়ে দেখা শুরু করবেন তখন অবাক হয়ে লক্ষ করবেন, আরে তার তো এটা ভুল, ওটাও তো ভুল। হায় হায় আচরণে এত সমস্যা!
যেমন ধরুন, শাশুড়ি-মা মনে করছেন, আমার বউ-মা চটপট কাজ করতে পারে না। কেন গুছিয়ে কথা বলে না, কেন ঘর গুছিয়ে রাখে না? এই বয়সে এত অলস কেন হবে! আবার ধরুন, বউ-মা মনে করছেন, আমার শাশুড়ি কেন এমন না? কেন চিল্লাচিল্লি করে? কেন নরমভাবে কথা বলে না? একটা আছে তো আরেকটা নেই কেন? এটা এমন তো ওটা অমন কেন?
বাস্তবে সমস্যা তো থাকবেই। মানুষ তো। নবী-রাসূল তো না। তার মধ্যে তো দোষ-ভুল থাকবেই। এ আর নতুন কী? ভুল থাকা খুবই স্বাভাবিক। আপাতদৃষ্টিতে সমস্যাগুলোকে খুব হালকা মনে হলেও, অনেকে এই সমস্যাগুলোকে এত বড় করে দেখেন-পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে! মনোবিজ্ঞানীদের বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের গবেষণাতে এমনটাই দেখা যায়।
এখন একটি প্রশ্ন এখানে আসতেই পারে। সব সময় যদি দুর্বলতাকে মেনে নেয়া হয়, তাহলে ঘরে দুর্বল দিকগুলো বেড়ে যাবে না? তাহলে দোষের সয়লাব হবে। কীভাবে নিজেদের ইমপ্রুভমেন্ট হবে?
আসলে মেনে নেয়া বলতে বোঝায় সাময়িকভাবে তর্কে না জড়ানো। তর্ক করলে শুধু সম্পর্কটাই নষ্ট হয়, তেমন কোনো বেনিফিট পাওয়া যায় না। তর্কে জিতে কয়জন লাভবান হয়?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে মেনে নেয়া হলো ইমপ্রুভমেন্টের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। আপনি ইমপ্রুভমেন্ট চান, অবশ্যই আপনাকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়ার শুরু হয় মেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে। সমস্যাটাকে মেনে নিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য আপনি তার সাথে Aline হয়ে গেলেন। আপনার বিরোধের জায়গাটা অন্তত কমে গেল। সমস্যাটাকে মিটাবার করার জন্য এবার আপনি একটি Space পাবেন।
ধরুন, আপনার বউ-মা কিছুটা আরামপ্রিয়। ঘরদোর তেমন একটা গুছিয়ে রাখতে পারে না, বউ-মার এদিকটা শাশুড়ি পছন্দ করেন না। তিনি দেখতে পান, এ রকম অগোছালো-এলোমেলো কোনো মেয়ের হাতে আমার সংসারটা পরলে এই সাজানো সংসারটা একসময় আর এমন থাকবে না! এই নেতিবাচক কল্পনার সাথে সাথে শাশুড়ির আচরণ নেতিবাচক হওয়া শুরু করবে। এখন শাশুড়ি, বউ-মার এই বিষয়টিকে সংশোধনের নিয়তে কিছুদিনের জন্য মেনে নিয়ে সময় দিতে পারেন। এতে সম্পর্ক নষ্ট হলো না। সম্পর্ক ভালো থাকলে ইমপ্রুভমেন্টের জন্য কাজ করা সহজ হয়। এ সময়ের মধ্যে এলোমেলো-অগোছালো থাকার ক্ষতিকর দিকগুলো বউ-মার সামনে তুলে ধরতে পারেন। বউ-মার যদি শেখার ইচ্ছে থাকে তবে এই প্রক্রিয়ায় সে শিখে যাবে। আর শেখার ইচ্ছে যদি না থাকে, আপনি অনেক ভালো ভালো পদ্ধতি প্রয়োগ করেও উপকার পাবেন না।
এখন আপনি মনে করলেন, আপনি দোষ মেনে নেবেন এবং সাথে সাথে দুর্বলতাগুলোকে ধীরে ধীরে সবলতায় পরিবর্তন করবেন, তাহলে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে; তা হলো-ধারণা, সুধারণা। অর্থাৎ একে অন্যের প্রতি ভালো ধারণা রাখা।
অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে মানুষ যখন নেতিবাচক চোখে কোনো কিছু দেখে, তখন সবকিছুতেই বিপদের গন্ধ পায়; এমনকি তখন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়া অনুভব করে। যখন শুকরিয়ার চোখে দেখে, তখন এই নজরটাই আমাদের তৃপ্তি দেয়।
আপনি যদি কারও ক্ষেত্রে মনে করেন, সে আপনাকে পছন্দ করে না; এটা মনে করার সাথে সাথে আপনার আচরণগুলোও অপছন্দনীয় আচরণে পরিবর্তন হয়ে যায়। নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে বোঝা যায়, অপছন্দনীয় কারও সামনে মানুষ এমন-সব আচরণ করে, যা পছন্দ করার মতো না। আপনি যদি মনে করেন, আপনার শাশুড়ি আপনাকে ভালোবাসে না, তাহলে আপনার শাশুড়ির সামনে আপনার আচরণগুলো এমন হয়ে যাবে, যার দ্বারা ভালোবাসা পাওয়া যায় না। বউ-মা বা শাশুড়ি যদি একে অন্যের প্রতি সুধারণা রাখতে পারে, তবে কথা বলার আগেই অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 আত্মমগ্নতা বা ডজন ডজন সম্পর্কিত সচেতনতা

📄 আত্মমগ্নতা বা ডজন ডজন সম্পর্কিত সচেতনতা


বউ-মার মনে হতে পারে, শ্বশুরবাড়ির জন্য আমি যা করেছি, আমার কোনো জা, দেবর, ননদ কেউ এতটা করেনি। শাশুড়ির ভালোবাসা এমনি পাওয়া যায় না! এই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য যা করা লাগে সবই আমি করেছি। অনেক কুরবানী করে এই পরিবারে আমি জায়গা করে নিয়েছি।
পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট ভালো, কারণ আমি পাগলের মতো পড়েছি। আমার গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, কারণ আমি অনেক পরিশ্রম করে টাকা-পয়সা উপার্জন করেছি। আমার হৃদয়জুড়ানো সন্তান-সন্ততি আছে, কারণ আমার আত্মবিশ্বাস-কৌশল ভালো। আমি অমুক সমস্যা সহজে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, কারণ আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ও দূরদর্শী ছিল। আমি এখন সুন্দর করে কথা বলতে পারি, কারণ এর ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রচুর অনুশীলন আছে। এ সমস্ত অর্জন আমার প্রচেষ্টা আর পরিশ্রমের ফল।
শাশুড়ি-মা মনে করতে পারেন, আমি যখন এ সংসারে এসেছি তখন কিছুই ছিল না, একটু একটু করে সবকিছু করে তুলেছি। দিন নেই রাত নেই কাজ করেছি। নিজে গরু পুষে দুধ বিক্রি করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছি। মানুষের মতোন মানুষ করেছি। আজ এই বাড়ি-গাড়ি, সহায়-সম্পত্তি যেখানে যা কিছু দেখছ, সব একদিনে হয়ে যায়নি, অনেক কষ্টের ফল। এমনকি কোনোদিন কারও ক্ষতি করিনি, ক্ষতি হোক এটাও কখনো চাইনি। এটা আমাদের বংশের ধারা। আমাদের বাপ-দাদারাও এই পথে হেঁটেছে, তাদের দেখে আমরাও হেঁটেছি।
কোনো নিয়ামত অর্জনের পর ভাবনায় খুব সূক্ষ্মভাবে এ ধরনের চিন্তা আসতে পারে। হ্যাঁ, খুব কষ্ট করেই সে নিয়ামত অর্জন করেছে, সফল হয়েছে। এটা না অহংকার, না রিয়া, না ইগো, না সেলফ লাভ। এটা একধরনের মুগ্ধতা, একধরনের উল্লাস। এটাই আত্মমুগ্ধতা বা 'উজব'। ভারসাম্যহীন প্রত্যাশা, অযাচিত সমালোচনা, বিদ্রুপ, অন্যকে খুব সহজে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, এমনকি অহংকারের সূত্রপাতও এই উজবের হাত ধরেই। শুধু বউ-মা, শাশুড়ি-মা'ই না, এ বিষয়টাতে আমাদের সকলের সচেতন হওয়া দরকার।
মালিক গোলামের বেপরোয়া উল্লাস পছন্দ করে না। মালিক তো জানিয়ে দিয়েছেন,
لَا تَفْرَحُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِيْنَ
'তুমি উল্লসিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ উল্লসিতদের ভালোবাসেন না। '⁶⁶
যেকোনো ভালো কাজ করতে পারা আল্লাহ তাআলার নিয়ামত। তেমনই মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারাও দয়াময় মালিকের নিয়ামত।
ওই যে আমরা পড়ি لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إلا بالله (লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ), এর অর্থই তো হচ্ছে: ভালো কাজ করার এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার তৌফিক একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে।
কেউ যখন ভাববে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানী ও করুণায় আমি একটি ভালো কাজ করতে পারলাম, তখন সে কৃতজ্ঞতার সিজদায় লুটিয়ে পড়বেই। মনে হবে না সব আমার প্রাপ্য।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন,
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا
'তুমি বলো, আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহেই তা হয়েছে। তাই তারা যেন এতে আনন্দিত হয়। '⁶⁷
এ আনন্দ শোকর আদায়ের আনন্দ। নিয়ামত পেয়ে নিয়ামতদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আনন্দ।
নিয়ামত পেয়ে বান্দা আনন্দিত হবে-দয়াময় প্রভুর নিকট এ দৃশ্য পছন্দনীয়। হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার মাঝে তাঁর দেয়া নিয়ামতের প্রভাব দেখতে ভালোবাসেন। '⁶⁸
আর বান্দা যখন নিয়ামত পেয়ে কৃতজ্ঞতায় নতশির হয় না, মনের গভীর থেকে বিনয়ের সঙ্গে তার মুখ থেকে 'আলহামদুলিল্লাহ' উচ্চারিত হয় না, তখন এ নিয়ামত তার আর নিয়ামত থাকে না।
لَبِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো তবে তোমাদের আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।'⁶⁹
আসলে এ কৃতজ্ঞতাবোধও আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একপ্রকার নিয়ামত। তাই তো পবিত্র কুরআনেই আমাদের এ দুআ শেখানো হচ্ছে,
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
'হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান করুন, যাতে আমি আপনার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন এবং যাতে আমি আপনার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদের সৎকর্মপরায়ণ করে দিন, আমি আপনার দরবারে তওবা করলাম এবং আমি আজ্ঞাবহদের (মুসলমানদের) একজন। '⁷⁰
আমাদের পাওয়া সমস্ত নিয়ামতের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা আদায়ে বড় বাধা হলো 'আত্মমুগ্ধতা'। অন্তরজুড়ে যখন নিজের প্রতি মুগ্ধতা থাকে তখন মালিকের প্রতি খুব একটা মুগ্ধ হওয়া যায় না।
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর মতে আমলকারীর করণীয় এই যে, সে নিজের যোগ্যতা মনে করবে না; বরং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ মনে করে শোকরগুজার করবে। এভাবে চিন্তা করবে যে, আল্লাহ তাআলা আমার দ্বারা কাজ করিয়েছেন, নতুবা আমার কী শক্তি ছিল! বাদশাহর কাজ করছ বলে মনে কোরো না তুমি বাদশাহর প্রতি অনুগ্রহ করছ; বরং তারই অনুগ্রহ যে তোমাকে কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে। ৭১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করেছেন,
ثَلَاثُ مُهْلِكَاتٌ : شُحٌ مُطَاعٌ، وَهَوَى مُتَّبَعُ، وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ
তিনটি বিষয় মারাত্মক ধ্বংসাত্মক : এক. অত্যধিক কৃপণতা দুই. প্রবৃত্তির অনুসরণ। তিন. নিজেকে নিয়ে মুগ্ধতা।⁷²
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি.-এর একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন,
الْهَلَكَةُ فِي اثْنَتَيْنِ: فِي الْقُنُوطِ وَالْإِعْجَابِ
মানুষ দুই কারণে ধ্বংস হয়-এক. নৈরাশ্য, দুই. নিজেকে নিয়ে মুগ্ধতা।⁷³
কারণ, মানুষের সফলতার জন্যে যে চেষ্টা অনিবার্য, সে চেষ্টা নিরাশ ও আত্মমুগ্ধ উভয়েই ছেড়ে দেয়। নিরাশ যে, সে যেমন চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ধ্বংস হয়; একইভাবে যে নিজের প্রতি মুগ্ধ সেও ভাবে, আমি তো সফল হয়েই গেছি। আমার লক্ষ্য এখন আমার হাতের মুঠোয়। এখন আমিই সেরা। এই ভাবনা তাকেও চেষ্টা ও সাধনা থেকে বিরত রাখে। একসময় সেও নিচের দিকে নামতে থাকে।
আত্মমুগ্ধতা যে কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে হুনাইন যুদ্ধের শিক্ষা থেকে আমরা জানতে পারি।
যারা ঘরের সম্পর্কগুলোকে কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ করতে চায়, যারা সমাজের জন্য কাজ করতে বা কোনো অবদান রাখতে চায়, তাদের জন্য ভয়ংকর এক হুমকি এই আত্মমুগ্ধতা। সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষটা আত্মমুগ্ধতার হাত ধরেই অহংকারের সীমানায় পৌঁছায়।
আত্মমুগ্ধতা থেকে নিজের বিশ্বাসটুকুকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে হয়তো বিনয়ী হওয়া বা আরেকটু বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া বেশ খানিকটা সহজ হয়ে যেত।

টিকাঃ
৬৬. সূরা ক্বসাস, (২৮): ৭৬
৬৭. সূরা ইউনুস, (১০): ৫৮
৬৮. সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং ২৮১৯। হাসান সহীহ।
৬৯. সূরা ইবরাহীম, (১৪) : ৭
৭০. সূরা আহকাফ, (৪৬) : ১৫
৭১. ইসলাহী মাজালিস, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৯
৭২. তাবরানী, মুজামুল আওসাত, ৫/৩২৮ [৫৪৫২]; বাইহাকী; শুআবুল ঈমান, ২/২০০ [৭৩১]। হাসান লিগায়রিহি।
৭৩. ওয়াকি ইবনুল জাররাহ; কিতাবুয-যুহদ, ৩৫২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00