📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control)

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control)


Self love উপাদানটির যত্ন নেয়ার স্বার্থে আপনি মনে করলেন, যা করতে ভালো তা-ই করব। মোবাইলে গেম খেলতে ভালো লাগছে, আনন্দ লাগছে, গেম খেলতেই থাকব। কাচ্চি খেতে মজা লাগছে, ব্যস, সপ্তাহে সাত দিনে চার দিন শুধু কাচ্চিই খাব। আমার ভালো লাগছে তো। আমি তো Self care করছি। যা করলে মন ভালো লাগছে তা-ই করছি।
আমাদের Self এর যে চারটি উপাদান সম্পর্কে বলা হয়েছে, অর্থাৎ Self love, Self responsibility, Self accontiblity, Self attachment - এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি খুবই সচেতন, কিন্তু আমি জানি না এই সচেতনতা কতদূর পর্যন্ত আমার জন্য ভালো। কীভাবে Self love অনুশীলন করলে আমি স্বার্থপর মানুষে পরিণত হব না, কীভাবে দায়িত্ব পালন করলে আমি কখনো হাঁপিয়ে উঠব না; কোন ধরনের দায়বদ্ধতা আমার জন্য ভালো, কতটুকু সংশ্লিষ্টতা আমার জন্য নিরাপদ - এই সমস্ত দুশ্চিন্তা থেকে বের হতে যে উপাদানটি আমাদের সাহায্য করবে তা হলো 'আত্মনিয়ন্ত্রণ'।
মুখে বলা সহজ হলেও আত্মনিয়ন্ত্রণ এত সহজ বিষয় না। তাকওয়া, পরহেজগারীর মৌলিক বৈশিষ্ট্য এটি। ইমাম সুফিয়ান সাওরী রহ. বলেন, 'কোনো কিছুকে সংশোধন করতে আমার এত বেশি সংগ্রাম করতে হয়নি, আমার আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমার যত বেশি কঠিন লেগেছে; কখনো আমি জয়ী হই, কখনো হই পরাজিত।'³⁷
আশপাশের সব ভালো মানুষদের মধ্যে অন্যতম অসাধারণ একটা গুণ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ। হয়তো ভালো কোনো কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে Self control এই উপাদানটি নেই। জীবনের সব জায়গায় একটা Pause বাটন থাকে। সচেতন মানুষরা জানেন কখন এই Pause বাটনে ক্লিক করতে হয়। আমাদের চিন্তা-চেতনায় অসংখ্য চাওয়ার ভিড়ে তলিয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে self এর যে উপাদানটির যত্ন বিশেষভাবে নিতে হবে তা হলো 'self control'।
কোথায় নেই? আত্মনিয়ন্ত্রণ আসলে কোথায় নেই? ভালো কাজ করতে যাবেন সেখানেও আত্মনিয়ন্ত্রণ, যেন তা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে না যায়; আবার কোনো খারাপ কাজ করার আগে সেখানেও আত্মনিয়ন্ত্রণ।
পরিবারের মধ্যে ভালো ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে হলে, ভালো বাবা, ভালো মা, ভালো ভাই-বোন, ভালো ছেলে-মেয়ে, ভালো শ্বশুর-শাশুড়ি হতে চাইলে, আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রাচীর ততটাই জোরদার করতে হবে।
বউ-মা অপরাধ করেছে, তাকে যা ইচ্ছে তা-ই বলে বকাঝকা করছি; এভাবে বলা উচিত হচ্ছে কি হচ্ছে না সেসব চিন্তা করারও পরিস্থিতি থাকছে না। ছোট কেউ অন্যায় করেছে, অবশ্যই বড় তাকে শাসন করবেন, তবে সামনে Self control উপাদানটি ঝোলানো থাকবে। তাহলে শাশুড়ি-মা সহজেই বুঝতে পারবেন, এই বকাঝকা বউ-মার সংশোধনের নিমিত্তে হচ্ছে নাকি মনের ভেতরের রাগ, রেষারেষি থেকে হচ্ছে। এইসব বকাঝকাগুলো তখন আর মনের অজান্তে হবে না।
আবার এসব কথাবার্তা শুনে বউ-মাও যে কী বলতে কী বলছে তার কোনো হিসাব থাকছে না। রাগের মাথায় কিছু একটা বলছে, পরে আবার সেটা নিয়ে আফসোসও করছে। কী করব, রাগের সময় মাথা যে ঠিক থাকে না!
এদিকে বউ-মা যখন শাশুড়ির সম্পর্কে কথা বলেন, সেই কথোপকথন কি ভেন্টিলেশন বা শেয়ারিংয়ের জন্য হচ্ছে নাকি পরনিন্দা-পরচর্চার খাতিরে হচ্ছে? অন্যের দোষকে সামনে রেখে নিজের দোষ ঢাকতে ভালো লাগে, তাই বলে কি অন্যের ঘাড়ে দোষ দিয়েই যাচ্ছি? আবার এই যে দেখুন, আমাদের বাচ্চারা যখন দুষ্টামি করে, আমরা মায়েরা শাসন করছি; অপরাধ করেছে দুই আনা, মারধর বকাঝকা করছি দশ আনার। অথবা অপরাধ করেছে দশ আনার, শাসন করছি এক আনার। যথাযথ থাকছে কিছুটা আর অনিয়ন্ত্রিত আবেগের হাতে থাকছে কিছুটা। এ ধরনের ঘটনা আমাদের ঘরগুলোতে ঘটে।
নিঃসন্দেহে সারাদিন আমাদের চারপাশে হাজারো ঘটনা ঘটে। কোনোটাতে আমাদের ভালো লাগে, কোনোটাতে খারাপ লাগে, দুঃখ বাড়ে বা রাগ হয়। কখনো অভিমান করি, হতাশ হই। যেমন ধরুন, কেউ একজন আপনাকে বকা দিল বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কিছু বলল, আপনার প্রিয় কেউ আপনাকে কষ্ট দিল, এখন আপনি কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? আপনার অভিব্যক্তি কেমন হবে? প্রথমে যেটা মাথায় আসে তা হলো, বাইরে থেকে যেমন ক্রিয়া এসেছে প্রতিক্রিয়া সেই আদলেই হবে। আপনিও পাল্টা বকা দিতে পারেন, রেগে চিল্লাচিল্লি করতে পারেন। রাগের প্রতিক্রিয়ায় রাগ, বকার প্রতিক্রিয়ায় বকা, পিটানোর প্রতিক্রিয়ায় পিটিয়ে সোজা করা ইত্যাদি।
আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, আমাদের সব রিঅ্যাকশন বাইরের সকল অ্যাকশন দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত। তাই আমাদের রিঅ্যাকশনগুলো খারাপ হলে আমরা অজুহাত দেখাই আমাদের সামনে থাকা অ্যাকশনগুলোর।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাইরে থেকে যত রকমের 'ক্রিয়া' আমার সামনে আসুক না কেন, আমার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা শুধু আমার দখলে। আমি চাইলে রাগঝাল করে বা অভিমান করে সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারি। আবার চাইলে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলে সঠিক অপশনটা বেছে নিতে পারি। এই বেছে নেয়ার ওপর আমাদের পুরো জীবনের ভালো-মন্দ নির্ভর করে। বাইরের ক্রিয়া ও আমার প্রতিক্রিয়ার মাঝখানের সময়টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে আমি কেমন আচরণ করছি। এ ক্ষেত্রে আপনার রিঅ্যাকশন কি আপনার মায়ের মতো হচ্ছে? নাকি আপনার বাবা যেভাবে রিঅ্যাক্ট করেন সেভাবে হচ্ছে? আপনার বংশের মানুষরা যেভাবে রিঅ্যাক্ট করে সেভাবে হচ্ছে? নাকি আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মতো প্রতিক্রিয়া আপনি দেখাচ্ছেন? ঠিক কার মতো?
এভাবে চিন্তা করে আপনার সমস্ত প্রতিক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে আপনার আচরণকে অসাধারণ বানাতে পারেন। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো মেরামতের দক্ষ কারিগর হতে যে জিনিসটি আপনার খুবই দরকার হবে তা হলো—ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝে বুদ্ধিমত্তার সাথে সর্বোত্তম চয়েস বাছাই করা। এই চয়েস বাছাইয়ের সচেতনতাই আত্মনিয়ন্ত্রণ।
অধিকন্তু, এই self control অনুশীলনের জন্য আমাদের একটা Grounding value system আঁকড়ে ধরা দরকার। Grounding value system বলতে বোঝায় নীতি বা আদর্শ, যা সময়-স্থান-কাল-পাত্রভেদে বদলায় না; বরং সব সময়, সর্বত্র, সর্বাবস্থায় এক ও অভিন্ন। একেকজন একেকভাবে ভ্যালু সিস্টেমকে ব্যাখ্যা করতে পারে। এই ভ্যালু বা মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে আপনি যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন সেই মূল্যবোধের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এসব দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থেকে আপনা-আপনিই self control এর অনুশীলন হয়ে যায়। self এর অন্যান্য উপাদানগুলোর (self love, self responsibility, self accontiblity, self attachment) সঠিক ব্যবহার self control এর প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
এই পাঁচটি উপাদান একত্রে আপনার লাইফ এনার্জি বা self কে শক্তিশালী করবে।

টিকাঃ
৩৭. হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৭/৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00