📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 নিজের প্রতি ভালোবাসা বা আত্মানুরাগ (Self-Love)

📄 নিজের প্রতি ভালোবাসা বা আত্মানুরাগ (Self-Love)


যখন আশপাশ, কাছের মানুষজন, দুর্ভাগ্য কোনোটাকেই বদলাতে পারছি না তখন যে জিনিসটি তাৎক্ষণিক আঁকড়ে ধরা দরকার তা হলো 'আত্মানুরাগ'। আপনি যদি আত্মানুরাগ বাড়াতে চান, তবে আপনাকে শারীরিক ও মানসিক যত্নের পথ ধরেই এগোতে হবে। শরীরের যত্ন বলতে পরিমিত খাওয়া, পরিমিত ঘুম ও নিয়মিত শরীরচর্চা। আর মানসিক যত্ন বলতে চিন্তার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কিছু সংযোজন-বিয়োজন। এই দুই ধরনের যত্ন আমাদের নিজেদের প্রতি ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণসহ কিছু আলোচনা করা যাক :
৪. অমুক আপা ছেলে-বউমা নিয়ে কত সুখে আছে আর আমি? অন্যের সাথে তুলনা করে নিজের মান বিচার করা আমাদের একটা প্রকৃতি। তুলনা করে কখনো হতাশ হই, কখনো অহংকারে ধরাকে সরা জ্ঞান করি। কিন্তু এই পৃথিবীতে একজন মানুষও নেই, যে ঠিক আপনার মতো। আপনার তুলনা কেবল আপনিই হতে পারেন। তুলনা যদি করতেই হয়, আপনার আজকের সাথে আপনার গতকালের বা আপনার আগামীকালের তুলনা করতে পারেন। আজ একটা ভালো কাজ করেছি, আগামীকাল দুইটা ভালো কাজ করব। অন্যের সাথে তুলনা করতে যে শক্তি খরচ হয়, সেটুকু বরং আপনার নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যয় করুন। এতে নিজের প্রতি ভালোবাসা বাড়বে।
৫. রান্না করার সময় কেউ যদি মনে করে, আমি রান্নায় তেমন অভিজ্ঞ না, রান্না করলে স্বাদ কেমন হবে না-হবে সেই ভয়ে 'থাক রান্না করব না, নতুন কোনো রেসিপি করব না, ভুল করা যাবে না, সব সময় পারফেক্ট হতেই হবে' ওভার পারফেকশনের এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে 'ভুল করব, ভুল থেকে শিখব, এক ভুল বারবার করব না' এই চিন্তা মাথায় ঢোকানো ভালো। আপনার চিন্তার ধারাকে এই ছাঁচে ঢালা যায় কি না? হাদীস থেকে আমরা জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءُ وَخَيْرُ الخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
'আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী। আর তাদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা তওবাকারী।'²⁵
ভুল আমাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। ভুলের ভয়ে উদ্যোগ নেয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।
৬. কেউ যখন তার পোশাকের চাকচিক্য, বাহ্যিক সাজসজ্জা ও শারীরিক সৌন্দর্যকে প্রভাব তৈরির বা মূল্যায়ন পাওয়ার একমাত্র মানদণ্ড মনে করে, তখন তার জন্য কথা-কাজকে সুন্দর করা একটি গৌণ বিষয় হয়ে যায়। তার কস্টিউম, ফিগার, চেহারা যদি আকর্ষণীয় না হয়, তবে নিজেকে ভালোবাসা তার জন্য কঠিন। আর এগুলোই যদি মূল্যায়নের মানদণ্ড হতো, তবে কবরে যাওয়ার পর এভাবে পচে-গলে যেত না! তাই ইসলাম আমাদের বারবার সতর্ক করেছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের পেছনে না পড়ে ভেতরের সৌন্দর্য অর্জনে সচেষ্ট হতে। ভেতরে সৌন্দর্য আত্মানুরাগ বাড়ায়। হাদীসে এসেছে,
إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ তারাই, যাদের আচার-আচরণ ভালো।' ২৬
৭. একটা বাচ্চা হয়ে গেলেই মায়েদের আর নিজের শরীরের যত্নের কথা মনে থাকে না। সারাক্ষণ ছেলেমেয়ে, স্বামী, ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, রান্না, সংসার ইত্যাদি নিয়ে এত ব্যস্ততা যে, এক কাপ কফিও আয়েশ করে বসে খাওয়া হয় না। দেখা গেল, মা তার বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে হাতে মেহেদি দিতে বসেছে, হঠাৎ বাচ্চা উঠে পড়ল, সাথে সাথে হাত ধুয়ে ছটফট করে বাচ্চার কাছে ছুটে গেল মা। এত তাড়াহুড়ার দরকার কী? বাচ্চা দু-এক মিনিট কাঁদলে এসপার- ওসপার হয়ে যাবে না! হাতে মেহেদি দিয়েও বাচ্চা সামলানো যাবে। বাচ্চা আছে বলে নিজের কোনো শখ পুরা করা যাবে না, এটা কেমন কথা, সাজগোজ তো দূরের কথা! অনেকে তো আছে রান্নার পর বড় বড় মাছ-গোশতের টুকরাগুলো অন্যের জন্য রেখে দিয়ে নিজের জন্য রাখে কিছু ছোট টুকরা, সাথে ঝোল একটু বেশি। সন্তান, স্বামী-সংসারের এত যত্ন করে যে, নিজের খাওয়া-ঘুম এর কী হলো সেদিকে কোনো খেয়ালই থাকে না।
এভাবে আপনি কতদিন বাঁচবেন? আপনি অসুস্থ হয়ে গেলে আপনার সংসার, স্বামী, সন্তানের যত্ন কে করবে? পরিবারকে ভালো রাখতে হলে আগে আপনাকে ভালো থাকতে হবে। আয়েশ করে বসে এক কাপ কফি খেতে হবে। বাগানের শখ থাকলে বাগান করতে হবে, বই পড়ে আনন্দ পেলে পড়তে হবে। মোটকথা, আপনার আনন্দের উপকরণ আপনাকেই ম্যানেজ করতে হবে।
৮. সংসারে মাঝে মাঝে এমন অনেক পরিস্থিতি আসে যখন ভীষণ মন খারাপ হয় বা ভীষণ আনন্দ হয়। দুঃখ বা সুখ যে ধরনের আবেগ-অনুভূতিই আপনার মনে আসুক না কেন, তা প্রকাশ করতে কোনো লজ্জা করা যাবে না। কান্না আটকে রাখা বা হাসি চেপে রাখা খুব একটা ভালো বৈশিষ্ট্য না। কান্না পাচ্ছে, হাউমাউ করে কাঁদুন। সংকোচ কিসের? সবকিছুতে বেড়া দিতে যাবেন না। তবে যেকোনো আচরণে ভারসাম্যের কথাটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
৯. হাদীসে আছে, মানুষের যদি দুইটি ধনভান্ডার থাকে তবুও সে তৃতীয়টির জন্য লালায়িত হবে।²⁷ আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার প্রতিযোগিতা লাগামহীন। যত পাই তত চাই। কিছু একটা পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছি, যখন সেটা পাচ্ছি সাথে সাথে তা মলিন হয়ে যাচ্ছে। নতুন আরও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগছে। এভাবেই চলছে চাওয়া-পাওয়ার খেলা। মজার ব্যাপার হলো, এই পাওয়ার অনুভূতি আমাদের সুখ দেয় না। সুখ দেয় যা পেয়েছি তা নিয়ে শুকরিয়া করলে, কৃতজ্ঞ হলে। শোকরগুজার অন্তর প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ থাকে। আমাদের চারপাশের প্রত্যেকটা মানুষ, প্রতিটা সম্পর্ক, প্রতিটা দিন—সবকিছুতেই অন্তত একটি হলেও মালিকের শুকরিয়া করার মতো বিষয় থাকে। আশেপাশে তাকালে দেখবেন, এমন একটি জিনিসও নেই যেখানে মাবুদের প্রশংসা করার মতো কোনো বিষয় থাকে না। এগুলো যেন আমার নজর এড়িয়ে না যায়।
নাস্তিকদের খুব সাধারণ একটা বুলি-তোমাদের আল্লাহর এত কৃতজ্ঞতার প্রয়োজন হয় কেন? ইসলাম বলে, তুমি কৃতজ্ঞ হলে তোমার মালিকের কোনো লাভ হয় না, এতে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হয়। আজ থেকে আপনি কোনো কোনো বিষয়ের কৃতজ্ঞতা নিয়মিত নোট করলে দেখবেন, দুনিয়াতে থেকেও জান্নাতের সুখ পাচ্ছেন।
১০. অতীতের বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট, অপ্রাপ্তি থেকে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সবকিছুতেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে, সাহসে কুলায় না। কিন্তু 'সাহস' জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্য না। অনেকটা মাংসপেশির মতো, যত অনুশীলন করবেন তত বাড়বে। হীনম্মন্যতায় ভোগার কারণে বউ-মা সহজে সংসারে সংযুক্ত হতে পারে না আর শাশুড়ি-মায়েরাও সহজে বউকে আপন করতে পারে না। শাশুড়ি-মায়ের মনে ভয় হয়, সংসারে বউ-মা এসে নায়িকার চরিত্রে থাকবে নাকি খল-নায়িকার চরিত্রে থাকবে? সংসার বুঝি হাত করে নেবে? বউ-মার মনে ভয় হয়, এটা করলে, এভাবে করলে, এভাবে চললে শাশুড়ি-মা আবার কী মনে করবে? বকাঝকা করবে কি না? মেনে নেবে কি না? শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মানুষদের এসব আজেবাজে ভয় থাকে না। চেষ্টা করতে হবে সৎসাহসের শরীয়তসম্মত সঠিক ব্যবহার শিখতে।
আরেকটি চিন্তা আমাদের জ্বালিয়ে মারে, তা হলো ‘কুধারণা’। ‘ও মুখে এটা বলছে, কিন্তু মনের ভেতরটা ঠিকই হিংসায় ভরা!’ সবাই যেন অন্তর্যামী হয়ে বসে আছে! কিছু দেখে তা থেকে আরও কিছু আন্দাজ করা, ধারণা করা আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এটা আমাদের সতর্কতা নাকি কুধারণা?
আমাদের সবার জীবনে এ ধরনের কিছু না কিছু ঘটনা থাকে। শাশুড়ি বউ-মার সম্পর্কে কুধারণা করে, বউ-মা শাশুড়ি সম্পর্কে কুধারণা করে। বউ-মা সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠলে শাশুড়ি ধারণা করে, সংসার উচ্ছন্নে যাবে, শেষকালে হয়তো আমার ছেলেকে দিয়েই নাস্তা বানিয়ে খাবে। মেয়ে সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠলে ওই একই শাশুড়ি-মা ধারণা করেন, রাতে হয়তো ঘুম হয়নি, এখন ঘুমাচ্ছে, একটু ঘুমাক, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। বউ-মার ক্ষেত্রে ধারণা একরকম, মেয়ের ক্ষেত্রে ধারণা করছে আরেক রকম। এসব ধারণার ক্ষেত্রে আপনি কি সতর্ক থাকতে পারছেন? নাকি যা মন চাচ্ছে তা-ই ধারণা করছেন? আপনার ধারণা কি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য? এই ধারণার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকছে?
মদ খেলে মানুষ যেমন মাতাল হয়, তেমনই কুধারণা করতে করতেও মানুষ মাতাল হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কয়েকজন একসাথে হলেই অন্যের সম্পর্কে বাজে চিন্তা না করে থাকতেই পারে না। সংসারের প্রতিটা কোণকে বিষাক্ত করে তোলে এই ‘কেনি-ভূত’। যখন মনের মধ্যে শতবার কুধারণা হয়, একবার হয়তো তা প্রকাশ পায় পরনিন্দা, পরচর্চা বা গীবতের আকৃতিতে। প্রথমেই কেউ কারও গীবত করে না, প্রথমে করে কুধারণা। তারপর তা শব্দে প্রকাশ পায়। এই কাজটা আপনাকে দুনিয়াতে থেকেই দোযখের স্বাদ দেবে।
সূরা হুজরাতের মহান মালিক সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱجْتَنِبُوا۟ كَثِيرًا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ ٱلظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا۟ وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَّعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা অতিরিক্ত ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু ধারণা গোনাহ। এবং (অন্যের) গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।' ২৮
ধারণা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে আচরণ করেন। আপনি যদি মনে করেন শাশুড়ি আপনাকে অনেক ভালোবাসে, তবে আপনি শাশুড়ির সব কাজের মধ্যে আপনার প্রতি ভালোবাসা দেখতে পাবেন। শাশুড়ি-মা যদি মনে করেন তার বউ-মা খুব পরিশ্রমী, তবে তিনি তাকে সেভাবেই দেখতে পাবেন। অথবা শাশুড়ি-মায়ের ভালো ধারণার কারণে একসময় বউ-মা বাস্তবিকই পরিশ্রমী হয়ে যাবে। আপনি যখন Self love (আত্মপ্রেম) অনুশীলন করবেন, তখন মানসিক যত্নের স্বার্থে এ ধরনের চিন্তা চেতনাকে আগলে রাখে।

টিকাঃ
২৩. সূরা শামস, (৯১): ১-১০
২৪. মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ২১১ ২৬; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৩৯৮৪। সহীহ।
২৫. সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৯৯। হাসান।
২৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০০৫
২৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৪৮, ১০৫০
২৮. সূরা হুজরাত, (৪৯): ১২

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 নিজস্ব দায়িত্ববোধ (Self-Responsibility)

📄 নিজস্ব দায়িত্ববোধ (Self-Responsibility)


ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক আর ব্যস্ততার কারণেই হোক, Self এর যে উপাদানটি অনেক পরিবারেই অমাবস্যার চাঁদের মতো তা হলো 'দায়িত্ববোধ'। আমাদের নিজেদের ভালো থাকার ওপরে এই দায়িত্ববোধ কীভাবে পাখা মেলে আছে সেসব নিয়েই কথা হবে এই অংশে।
আমাদের পরিবারগুলো মা-বাবা, স্ত্রী-স্বামী, সন্তানাদি, নানা-nani, দাদা-dadi নিয়ে সাজানো। এই সদস্যগুলো সবাই যখন তার নিজেদের দায়িত্বগুলো বুঝে নেয় তখন ঘরের পরিবেশ আপনা-আপনিই শান্তিময় হয়ে যায়। কিন্তু যখন এর ব্যতিক্রম ঘটে তখন?
আশেপাশে একটু তাকালেই আপনি দেখতে পাবেন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা কারও সময় নেই, সবাই নিজেকে নিয়ে মহাব্যস্ত। নিজের কাজই তো শেষ হয় না, এত শত দায়িত্ব পালনের সময় কই!
এ ছাড়া অধিকাংশ পরিবারে দায়িত্ব বণ্টনেও ভুল থাকে—কার কী দায়িত্ব, কার কতটুকু দায়িত্ব, ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালনে ভারসাম্য কেমন হবে সে বিষয়েও কিছু ভুল বোঝাবুঝি আছে ঘরগুলোতে। একজন সংসারের জন্য করে করে হাঁপিয়ে উঠছে, আরেকজন হয়তো তেমন কিছুই করছে না। আবার একজন হয়তো অনেক অবদান রাখছে, কিন্তু সংসারের কেউ তার স্বীকৃতিও দিচ্ছে না।
সংসারের মধ্যে এটা খুব কমন একটা অভিযোগ যে, 'আমি তো অনেক করলেও তারা খুশি না!' অনেক শাশুড়ি আছেন যারা শত দায়িত্ব পালন করেও বউ-মাদের খুশি করতে পারেন না, আবার অনেক বউ-মা আছেন যারা শত চেষ্টাতেও শাশুড়ির মন জয় করতে পারেন না। কিছু না করলে দোষ—কেন করোনি? কিছু করলে দোষ—এভাবে করেছ কেন? এটা করেছ তো ওইটা করোনি কেন? এইভাবে কেন করোনি? ইত্যাদি হাজারো দোষ ধরাধরি খেলা শুরু হয়!
আবার অনেকে থাকেন ভীষণ Egocentric। উনারা নিজেদের অনেক বড় মনে করেন, তাদের ইগো অনেক বেশি, সবাই তার চাওয়া-পাওয়া পূরণ করবে; কিন্তু তিনি কারও ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন না। ঘরে একজন Egocentric মানুষ থাকলেই পারস্পরিক দায়িত্ববোধ নাজুক হয়ে যায়। এর সাথে সাথে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে চরম প্রভাবিত ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা তো আছেই— মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো!
আমরা সবাই বুঝি—কী পেলাম, আমার কী পাওয়া উচিত। কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী অধিকার আমার আছে সব জানি, সব বুঝি।
কিন্তু জানতে ভালোও লাগে না, বুঝতেও ইচ্ছে করে না—কী দিলাম, আমার কী দেয়া উচিত? কোন কোন ক্ষেত্রে আমার কী কী দায়িত্ব আছে?
অধিকার খুব জানি, কিন্তু দায়িত্বগুলো ভাসাভাসা!
এ ছাড়া দায়িত্বশীলতার মজার এক স্বরূপের দেখা মেলে আমাদের সমাজে।
হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, رِضَى الرَّبِّ فِي رِضَى الوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ ‘পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’²⁹
এই বাক্য থেকে অনেক পিতা তার সন্তানাদিকে বোঝায়, খবরদার পিতাকে কখনো অসন্তুষ্ট করবে না, তাহলে কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন। তাই সবাই মিলে আমাকে সন্তুষ্ট রাখবে। আমি অসন্তুষ্ট হলেই কিন্তু শেষ, তোমার সব শেষ। পিতা মনে করে, সবাই তাকে সন্তুষ্ট করবে!
কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, ‘وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا’ (ওয়াবিল ওয়ালিদাইনি ইহসানা)। অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।³⁰
আবার অনেক মা মনে করে, তুমি যতই সদ্ব্যবহার করো না কেন, তা তোমার জন্য যথেষ্ট নয়! এক ফোঁটা দুধের দাম তো দিতে পারবা না। হাজার দিয়েও ঋণ শোধ করতে পারবা না। এ জন্য অনেকে চাইতেই থাকে চাইতেই থাকে।
অন্যদিকে স্বামী মনে মনে ভাবে, স্বামী যে স্ত্রীর ওপর সন্তুষ্ট সে জান্নাতী হবে। তাই স্বামী চায় স্ত্রী যেন তাকে সন্তুষ্ট রাখে।
আর স্ত্রী মনে করে, সে ব্যক্তি সর্বোত্তম যে পরিবার-পরিজনদের কাছে সর্বোত্তম। তাই স্ত্রী ভাবে, পুরুষ, তোমরা যদি উত্তম হতে চাও তাহলে ঘরের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করো।
ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছিল, কুরআনের আয়াত বা হাদীস থেকে আমরা যেন আমাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে অনুপ্রাণিত হই; নিঃসন্দেহে এগুলো অসাধারণ অনুপ্রেরণা। সুবহানাল্লাহ। তারপরও কতক মানুষ ইসলামের এই মহিমান্বিত শিক্ষাগুলোকে তাদের অধিকার আদায়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সামনে ইসলাম, পেছনে স্বার্থ।
নিঃসন্দেহে কোনো ছাড়াছাড়ি বা বাড়াবাড়ি ছাড়া সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করা, অধিকার প্রদান বা হক আদায়ের ব্যাপারে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা প্রশংসা করার মতো একটি বিষয়। সমাজে খুব কম মানুষই অধিকার আর দায়িত্বের হিসাবে দুয়ে দুয়ে চার মিলাতে পারেন।
অনেক বউ-মা মনে করেন, আমি তো সবাইকে খুশি রাখতে পারব না; তাই যাক, সব গোল্লায় যাক! আবার অনেক বউ-মা সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের দিকে তাকানোরই সুযোগ পান না। দেখা গেল শাশুড়ির সব হুকুম শোনায় দশে দশ; কিন্তু নিজের ছেলে-মেয়েকে শেখানো-পড়ানোর সময় নেই। বাচ্চার সাথে খেলার সময় নেই। একজনকে খুশি করতে গিয়ে আরেকজনের ওপর জুলুম।
শাশুড়ি দেখা গেল বউমাকে দায়িত্ব শেখানোর ব্যাপারে খুবই উদগ্রীব, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের দিকে খেয়ালই থাকছে না। বউ-মাকে খুব শেখাচ্ছি-শ্বশুরবাড়িতে কীভাবে থাকতে হয়! কিন্তু শাশুড়ি-মা'ই দেখা যাচ্ছে তার ননদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আমাদের নিজেদের কোনো ভুল হয়ে যাচ্ছে কি না সে ব্যাপারে খেয়ালটা অনেক বেশি থাকা দরকার। সংসারের শাশুড়ি-মায়ের কী কী দায়িত্ব আছে সে ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করা হবে! বউ-মার কী কী দায়িত্ব আছে সে ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করা হবে! প্রশ্ন এক রকম হলেও একেকজনের কাছ থেকে উত্তর আলাদা আলাদা করে নেয়া হবে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন না-তারা কি মনে করে তাদের এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে?³¹
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘মনে রেখো তোমরা সবাই দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের ওপর দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তানদের ওপর দায়িত্বশীল। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মনিবের সম্পদের ওপর দায়িত্বশীল। সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।'³²
অনেকে হয়তো বলবেন, সবকিছু তো বেশ চলছে। কেন আবার দায়িত্ব নিতে হবে? আমি কোনো দায়িত্ব নেব না। তবে সময়ের ব্যবধানে আপনি বুঝতে পারবেন, আপনি একা হতে শুরু করেছেন। সম্পর্কের সুতাগুলো আলগা হতে শুরু করেছে। নিজের প্রতি ভালোবাসা কমতে শুরু করেছে। মানুষ যখন দায়িত্ব নেয় তখন সে তার মনের গভীরে খুব ভালো থাকে। অপর পক্ষ থেকে কোনো সারা না আসলেও তার মনে অসম্ভব এক তৃপ্তি থাকে। হয়তো দায়িত্ব পালন করতে সাময়িক একটু কষ্ট হতে পারে, কিন্তু চিরজীবন ভালো থাকার অনেক উপকরণ তখন খুঁজে পাবেন।
এখানে আরও একটা মজার ব্যাপার ঘটে। অমুক আত্মীয়ের জন্য আমার কাজটা করা উচিত, কিন্তু থাক আমি করব না, ইচ্ছা করছে না বা ঝামেলা নেব না, যাই হোক। শেষে আপনার আর করা হলো না। এই কর্তব্য কাজটা নিরন্তর আপনার ভেতরে ঘেউ ঘেউ করতে থাকবে। বারবার মনে হবে, কাজটা করলেই হয়তো ভালো হতো, কেন যে করলাম না। নিজেকে অপরাধী মনে হবে, হীনম্মন্যতা ঘিরে ধরবে। ভেতরে কেমন যেন খুঁতখুঁত করে এসব না-করা করণীয় কাজগুলো। দায়িত্ব পালনের আগে যেমন যা-ই মনে হোক, ‘করা উচিত’ ভেবে করে ফেলা বেশি নিরাপদ। শাশুড়ি বা বউ-মার পরস্পরের প্রতি যেমন আচরণ করা উচিত বা যতটা দায়িত্ব পালন করা উচিত, সেটা করা সবচেয়ে নিরাপদ। এভাবেই আমরা ভালো থাকি, আনন্দে থাকি।
শাশুড়ি-মায়ের উচিত বউ-মাকে বউ-মা হিসেবে মর্যাদা দেয়া, বউ-মাকে সহজ-স্বাভাবিক একটি পরিবেশ উপহার দেয়া। আর বউমারও উচিত সহজ-স্বাভাবিক পরিবেশে নিজেকে ফুটিয়ে তোলা।
এ ক্ষেত্রে একটু সংযোগ করতে চাই। অনেক বউ-মা হয়তো বলবেন, দায়িত্ব আছে স্বামী ও তার সন্তানাদির প্রতি, শ্বশুরবাড়ির প্রতি নয়। শ্বশুরবাড়ির প্রতি যদি আমি কিছু করি, তবে সেটা 'দয়া'!
একমত, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলেমিশে থাকা, স্বামী ছাড়া অন্যান্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়; 'দয়া বা ইহসান'। কিন্তু একটু ভেবে দেখা দরকার, এই দয়া-অনুগ্রহ এই জিনিসটাকে একপাশে রেখে শুধু দায়িত্ব-অধিকার দিয়ে দুনিয়াটা চলে কি না? যেকোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান শুধু এই দায়িত্ব-অধিকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কি না? আল্লাহ তাআলার এই গুণবাচক বৈশিষ্ট্যটি ছাড়া দুনিয়াতে একমুহূর্ত নিজেকে কল্পনা করা যায় কি না?
শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী সাহেব হাফি. তার ইসলাহী মাজালিস কিতাবে উল্লেখ করেছেন, একবার শায়খ ডাক্তার আবদুল হাই সাহেব রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেন, একবার আজান হচ্ছিল, তখন একজন আলেম কথাবার্তা বলতে লাগলেন। কেউ বলল, হুজুর আজান হচ্ছে এখন কথাবার্তা না বললেই ভালো। সেই আলেম বললেন, 'হ্যাঁ জানি, আজানের জবাব দেয়া ফরজ-ওয়াজিব নয়।'³³
যেন যে কাজগুলো ফরজ-ওয়াজিব নয় তা করণীয়ও নয়। কোনো ফযীলতও নেই। এমন ইলম তো বড় নীরস ইলম, যা শুধু আইনের কাজ করায়। ইশক ও মহব্বত এবং প্রেম ও ভালোবাসারও যে একটা দাবি আছে, সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
শুধু আইন প্রণয়ন করেই যেমন অপরাধ দূর করা যায় না, তেমনই শুধু দায়িত্ব আর অধিকারের চুলচেরা হিসাব-নিকাশ করে সংসারে সম্মানের সাথে জায়গা করা যায় না। ভালোভাবে বাঁচতে মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবারই লাগে।
আমাদের প্রকাশভঙ্গিগুলো যেমনই হোক না কেন, শাশুড়ি-মা চায় বউ-মা তাকে ভালোবাসুক আর বউ-মা চায় শাশুড়ি-মা তাকে ভালোবাসুক। আমরা কামনা করি, এই দুইটি সম্পর্ক তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসাগুলো ফিরে পাক।
দুই ধরনের দায়িত্বশীলতা আমাদের ঘিরে আছে : প্রথমত, নিজের প্রতি দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, অন্যদের প্রতি দায়িত্ব।
নিজের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে Self love অংশটি পুনরায় পড়তে পারেন। আর অন্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনে কীভাবে আমরা আমাদের সচেতনতাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারি, এ সম্পর্কে নিচে কিছু বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
১. অন্যদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে চাইলে প্রথমে যে তালিকা আমার সামনে থাকা দরকার তা হলো, কার জন্য কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সরণি ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনে আমার সঙ্গী হবে।
২. আমি আমার সম্পর্কগুলোকে যেমন দেখতে চাই, সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্পর্কের মধ্যে কোনটা পাওয়ার জন্য কোনটাকে ছাড় দেব, সেই সিদ্ধান্তেও আপনাকে স্বচ্ছ হতে হবে। এই পরিকল্পনা দায়িত্বশীলতার বোঝা হালকা করে দেবে।
৩. আমাদের চারপাশে যত কাজকর্ম আছে তার মধ্যে কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আর কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে যেগুলো আছে সেগুলোর একটা তালিকা আর যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সেগুলোর আরেকটা তালিকা করা দরকার। আমাদের যত রকমের চিন্তা- জল্পনা-কল্পনা সবকিছু হবে এই নিয়ন্ত্রণের ভেতরে থাকা বিষয়গুলোকে নিয়ে।
৪. মাঝে দায়িত্বের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন থাকা খুবই জরুরি। কার কী দায়িত্ব, কার কী কী কাজ পরিষ্কারভাবে সবাই সেটা জানবে। কে কী কাজ করবে এবং কীভাবে অপরজনকে সাহায্য করবে সে সম্পর্কিত পারিবারিক নিয়ম ঘরের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্বশীলতাকে বৃদ্ধি করে।
৫. কোনো কাজ করার পর আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে।
৬. অন্যের কী করণীয়, কে তার দায়িত্ব পালন করল কি করল না সেসব নিয়ে দিগ্বিদিক চিন্তা না করে তর্জনী বা শাহাদত আঙুলি নিজের দিকে ইঙ্গিত করা ভালো।
৭. কোনো দায়িত্ব নেবার পর স্বীকৃতি বা প্রশংসা না পেলে সেই কাজে নিয়মিত থাকা নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে চাইলে ইচ্ছাশক্তি (Will Power) এর সাথে Why Power-কেও কাজে লাগাতে হবে। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, কেন দায়িত্বশীল হতে চেয়েছিলাম? দায়িত্বশীল হওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কগুলো যেভাবে মেরামত করতে চেয়েছিলাম তা কি হয়ে গেছে? সাহস করে দায়িত্ব নেয়া বা দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করা মূলত আমাদের নিজেদের প্রতি ভালোবাসাকেই বাড়ায়, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। দায়িত্বশীলতা জন্মসূত্রে পাওয়া বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো বৈশিষ্ট্য না। আপনি যত এর যত্ন নেবেন ততই শক্তিশালী হবে।

টিকাঃ
২৯. সুনানুত তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৯৯। সহীহ।
৩০. সূরা ইসরা/বনী ইসরাঈল, (১৭): ২৩
৩১. মূল আয়াত হলো, أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُوْلُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُوْنَ 'মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা তো ঈমান এনেছি' বলেই তারা অব্যাহতি পেয়ে যাবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?' -সূরা আনকাবুত, (২৯): ২
৩২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৯
৩৩. ইসলাহী মাজালিস, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৩

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 দায়বদ্ধতা (Self-Accountibility)

📄 দায়বদ্ধতা (Self-Accountibility)


আপনি যখন আপনার নিজের বা আপনার সম্পর্কগুলোর যত্ন নেবার তাগিদে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আরেকটু ভালোর দিকে পরিবর্তন করতে চাইবেন, তখন Self এর যে উপাদানটি আপনাকে Track এ ধরে রাখতে সাহায্য করবে তা হলো 'দায়বদ্ধতা'।
জবাবদিহি বা দায়বদ্ধতার কথা যখন আসে তখন কয়েক ধরনের মনোভাব আমাদের মধ্যে দেখা যায়। যেমন: নিজেকে সমস্ত অভিযোগ বা দায় থেকে মুক্ত রাখার জন্য সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো। এই নীতিতে বিশ্বাসী কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার আজকের যে অবস্থা-শারীরিক, মানসিক পারিবারিক, অর্থনৈতিক যেমনি হোক—তার জন্য কে দায়ী? এই ধরনের প্রশ্ন শুনলে বর্তমান অবস্থায় যা যা অর্জন করতে পেরেছে তা তাদের মাথায় আসে না! প্রথমেই মাথায় আসে কী কী অর্জন করা যায়নি বা কোন কোন বাধার কারণে এমনটা ঘটেছে! জীবনের অন্ধকার দিকটা নিয়ে ভাবতে থাকে। পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার সবকিছুর দোষারোপ করে। কিছু খুঁজে না পেলে সিস্টেমের দোষ দিতে থাকে। আর সব শেষে নিজের ভাগ্যের ওপর দোষ চাপানো তো আছেই।
আবার আরেক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়, যা কিছু হয় সব আমার কারণেই হয়; অনেকটা 'ওভার ভিকটিমাইজেশান' এর মতো। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এত বেশি হীনম্মন্যতা কাজ করে যে, সে কখনো মুখ উঁচু করেই দাঁড়াতে পারে না। দায়বদ্ধতা মানে এই না যে সব দায়িত্ব নিজের করে নিতে হবে, যে যা বলবে সেটাই জি হুজুর জিহুজুর করে শুনতে হবে। দায়বদ্ধতা মানে এও না যে সংসারে খারাপ যা হয় তার সমস্ত দায় আপনার!
'কোনো দোষই নেব না বা সব দোষই কাঁধে তুলে নেব' এটা নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা না; বরং আমি যা করি বা আমার সমস্ত আচরণের মালিক আমি। হ্যাঁ, আমি চিল্লাচিল্লি করছি, বলছি অমুক আমাকে রাগিয়ে দিয়েছে, অমুকের আচরণের কারণে আমি রাগ করেছি, অমুকের কারণে আমি চিল্লাচিল্লি করছি- এভাবে না। হ্যাঁ, আমার রাগ হয়েছে, এটা আমার একটা আবেগ, এই আবেগের ফলে আমি কেমন ব্যবহার করছি সেটা আমারই নিয়ন্ত্রণে। আমার সমস্ত ব্যবহারের দায় আমার।
Self Responsibility তে আলোচনা করা হয়েছে, আমাদের প্রত্যেকটা মানুষের নিজেদের প্রতি কিছু দায়িত্ব আছে, সাথে সাথে অন্যদের প্রতিও কিছু দায়িত্ব আছে। এই সমস্ত দায়িত্বগুলো আমি যথাযথভাবে পালন করতে পারছি কি না এটা মনিটরিং করা হলো দায়বদ্ধতা। দেখা গেল আমি আগে দায়িত্ব পালনে দশে চার পেতাম, এখন চাচ্ছি কীভাবে দশে আট-নয় পাওয়া যায়। এই যে নিজেকে আরেকটু উন্নত করতে চেষ্টা করা, আরেকটু ভালোর দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং এই ভালোটুকুকে ধরে রাখার জন্য নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা দরকার। দায়বদ্ধতা অনেকটা Self এর মেন্টর-এর মতো। আপনি পা ফসকে যেতে চাইলেও আপনাকে পড়ে যেতে দেয় না। ভালো একটি অভ্যাস গঠন করার জন্য দুই দিন চেষ্টা করলাম আর তিন দিন গা-ঝাড়া দিয়ে থাকলাম-এসব গড়িমসির গর্ত থেকে হাত ধরে টেনে বের করে আনে দায়বদ্ধতা। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি আমাদের ইস্তিকামাত এর ভুবনে নিয়ে যায়।
তাযকিয়ার মেহনতে এই বিষয়টাকে বলে মুহাসাবা। সারা দিন কী করলাম না করলাম রাতের বেলা তার হিসাব লাগানো। কোন কাজটা ঠিক হয়েছে, কোনটা ভুল হয়েছে সেটা কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করা হলো মুহাসাবা। এরপর ভুল থেকে আস্তে আস্তে বের হয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া হলো মুহাসাবার হাকিকত। মুহাসাবার বৈশিষ্ট্যকে আপনার মধ্যে এনে দেবে এই দায়বদ্ধতা।
মুহাসাবাতুন নাফস তথা আত্মবিবেচনা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকওয়ামুখী মুমিনদের জীবনে মুহাসাবা এক অবশ্য-কর্ম। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আপন কিতাবে এ বিষয়ে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ " وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। আর (তোমাদের) প্রত্যেকের উচিত, আগামীকালের (আখিরাতের) জন্যে সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা (মুহাসাবা) করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।'³⁴
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উমর রাযি.-এর একটি বাণী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, 'তোমাদের ওপর (আখিরাতের) হিসাব ঘনিয়ে আসার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব নিতে শুরু করো।'³⁵

টিকাঃ
৩৪. সূরা হাশর, (৫৯): ১৮
৩৫. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক; আয-যুহদু ওয়ার রকাইক, ৩০৬

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 সংশ্লিষ্টতা (Self-Attachment)

📄 সংশ্লিষ্টতা (Self-Attachment)


Self এর দুইটা উপাদান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে—নিজেকে ভালোবাসা এবং দায়িত্বশীলতা। এই দুইটি উপাদানের মাঝে ভারসাম্য আনা খুবই জরুরি।
আপনি যদি মনে করেন আমি Self Love (আত্মানুরাগ) প্র্যাকটিস করতেই থাকব, কোনো দায়িত্ব নেব না; তবে সময়ের ব্যবধানে আপনি চরম স্বার্থপর মানুষে পরিচিত হবেন। আবার আপনি এত বেশি বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন, সবার সব দায়িত্বের জায়গাটা কেড়ে নিচ্ছেন বা অন্যদের কোনো সুযোগই দিচ্ছেন না; সাথে সাথে অন্যরাও আপনাকে খুব বেশি গ্রান্টেড মনে করে ফেলছে, আর মনে করছে তাদের আর কিছু করতে হবে না—'অমুক তো আছেই'। এটাও খুব ক্ষতিকর।
এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে খুব কোমলভাবে 'না' বলাটাও শেখা দরকার।
সংসারের জন্য আমি কতটুকু সহজ-সাবলীল আন্তরিকতার সাথে দিচ্ছি বা কখন হাঁপিয়ে উঠেছি, যতটুক আমি হাঁপিয়ে গিয়ে করছি সেটা আমার আত্মানুরাগ কেড়ে নিচ্ছে কি না তা দেখা দরকার। এসব চিন্তার জায়গাগুলো আমার কাছে পরিষ্কার কি না তা আমাকেই বসে হিসাব-নিকাশ করে বের করতে হবে। সংসার শুরু করার পর নতুন কিছু কিছু বিষয়ের সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়, দুর্বলতা তৈরি হয়, এটা অস্বাভাবিক কিছু না; বরং খুবই স্বাভাবিক। আমাদের প্রত্যেকেরই কোনো-না-কোনো জিনিসের সাথে বেশি সংশ্লিষ্টতা আছে। কিন্তু সেই সংশ্লিষ্টতায় ভারসাম্যের অবস্থান কেমন বা সেখানে বাস্তবতার কোনো জায়গা আছে কি না? যে বিষয়ের সাথে Attachment সেটা যদি কেড়ে নেয়া হয়, তারপরও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব কি না?
হতাশা বলেন, বিষণ্ণতা বলেন আর আত্মহত্যাই বলেন, সবকিছুর গোড়াপত্তন এই Unhealthy attachment এর হাত ধরেই শুরু হয়। কোনো একটা জিনিসের সাথে আমি খুবই Attached, কোনোভাবে সেটা হাতছাড়া হয়ে গেল, ব্যস, এ জীবন রেখে আর কী হবে! যেমন ধরেন, কিছু কিছু মানুষ আছে ক্যারিয়ার-Attached, দুনিয়ার সবকিছু একদিকে, ক্যারিয়ার আরেক দিকে। ক্যারিয়ার ভালো করতে সে যেমন সবকিছু ছাড়তে পারে, তেমনই ক্যারিয়ার ভালো করতে সে যেকোনো কিছু ধরতেও পারে। ক্যারিয়ারকে সমুজ্জ্বল করতে সে কোনো কিছুর পরোয়া করে না।
কিছু কিছু মানুষ আছে খ্যাতি বা সম্মানে Attached। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তাদের ভাইরাল হতে হবে, খ্যাতি কুড়াতে হবে। খারাপ কিছু করেই হোক আর ভালো কিছু করেই হোক, সমাজের মাঝে পরিচিতি আনতে হবে।
কিছু কিছু মানুষ আছে সৌন্দর্যে Attached। তার কাছে সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা, স্নেহ করা বা ভালোবাসা-সবকিছুর মানদণ্ড হলো সৌন্দর্য। যার সৌন্দর্য যত বেশি সে তত বেশি পূজনীয়।
কিছু মানুষ আছে সন্তানের ব্যাপারে Attached। তাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার অস্ত্র হলো সন্তান, প্রতিযোগিতা করে আগে বাড়ার বিষয় হলো সন্তান। এ জন্য সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে তারা সন্তানের ওপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করেন।
কিছু মানুষ আছে বাড়ি, গাড়ি, প্রভাব-প্রতিপত্তি এককথায় টাকার প্রতি Attached। তাদের টাকা লাগবে, প্রচুর টাকা। টাকাটা কীভাবে এল বা কীভাবে আনব সেটা বড় বিষয় না; বড় বিষয় হলো টাকা লাগবে, অনেক টাকা।
কিছু কিছু মানুষ আছে বংশ-মর্যাদায় বা পদবিতে Attached। যার বংশ-মর্যাদা ভালো সে সম্মানিত, তার সাথে ছেলে-মেয়ে বিয়ে দেয়া যায়। যার বংশ-মর্যাদা ভালো না, তাকে ত্রিসীমানায় দেখতে চায় না।
প্রায় প্রত্যেকটি মানুষেরই এই সংশ্লিষ্টতাগুলো থাকে। তবে এর মধ্যে কিছু আছে ভালো আর কিছু খারাপ। এতক্ষণ যে সমস্ত Attachment-গুলো নিয়ে বলা হয়েছে, এগুলো কিন্তু আমাদের জীবনেরই অংশ, ওতপ্রোতভাবে আমাদের সাথে জড়িত। এই বিষয়গুলো ছাড়া সুস্থ-স্বাভাবিক সুন্দর একটি জীবন কল্পনাও করা যায় না। আমরা এই একজন মানুষই কখনো টাকার সাথে Attached, কখনো সম্পত্তির সাথে Attached, কখনো সন্তানের সাথে Attached, কখনো সৌন্দর্যের সাথে Attached। বেঁচে থাকতে এগুলো কোনোটাকেই আমরা বাদ দিতে পারি না। কিন্তু এই attachment-গুলোই কখনো কখনো ভয়ংকর রূপ নেয়। যেমন: সৌন্দর্যের সাথে আমাদের যে Attachment, সেটা যখন ভারসাম্যহীন হয়ে যায় তখন কিছু ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।
সুন্দরভাবে থাকা, সাজগোজ করা কার না পছন্দ! মানানসই পোশাক, মানানসই সাজ আত্মবিশ্বাসকে ধরে রাখতে নিঃসন্দেহে সাহায্য করে। কিন্তু চোখে কাজল না দিলে কারও সামনে যাওয়া যাবে না, ভালো কাপড় গায়ে না থাকলে চলে যাবে, ঠোঁট রাঙানো না থাকলে কথা বলতে জড়তা লাগবে, মুখে মেকআপ না থাকলে বুকে বল থাকবে না—এইসব মনোভাব খুব ভয়ংকর। যারা মনে করে, মানুষের কাছে পাত্তা পাওয়ার উপায় একমাত্র সৌন্দর্য, তাদের জন্য সৌন্দর্য হলো Unhealthy attachment। এই সৌন্দর্যের মাধ্যমেই তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। এই সৌন্দর্যই তাদের আত্মবিশ্বাস পাওয়ার একমাত্র হাতিয়ার। যেভাবেই হোক চেহারার খুঁত ঢেকে রাখতে হবে। কখনো যদি সৌন্দর্যকে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়, তবে তারা ভয়ংকর মুষড়ে পড়ে। সৌন্দর্যকে চোখের সামনে ঝুলিয়ে সমস্ত দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখা বা দুর্বলতাকে দূর করার চেষ্টা না করা তাদের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
এ ধরনের মানুষগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, যখন তাদের বয়স বাড়ে, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়তে থাকে, লাবণ্য নষ্ট হতে শুরু করে, তখন উনাদের মধ্যে একধরনের বিষণ্ণতা শুরু হয়। এ কারণেই ফিমেইল সেলিব্রিটিদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার বেশি হয়, উনারা স্বাভাবিকভাবেই চেহারা কুঁচকে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি ভীত থাকতেন। কারণ চেহারার লাবণ্য চলে গেলে এসব সেলিব্রিটিদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয়! শ্রদ্ধা, সম্মান এ বিষয়গুলো খুব কমই দেখা যায়। এক শ'তে বিশ জন হয়তো সেই শ্রদ্ধা পায়। এসব নিয়ে শত শত সুইসাইডের ঘটনা ঘটে। কারণ সৌন্দর্যের সাথে ছিল তার Unhealthy attachmentl
Unhealthy attachment এর আরও অনেক নজির আছে। এই যেমন ধরুন টাকা। আজ আছে তো কাল নেই। যার এই টাকার প্রতি অস্বাভাবিক সংশ্লিষ্টতা আছে, তার কাছ থেকে যদি কোনোভাবে টাকা চলে যায়, তবে সে কেমন যেন পাগলের মতো হয়ে যায়। কেউ থাকে ক্যারিয়ারে attached। ক্যারিয়ারে কোনো Fall হলেই তার অন্যান্য বিষয়গুলোও খারাপ হতে শুরু করে। ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী সব সম্পর্কগুলো খারাপ হতে শুরু করে।
একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একজন ইসলামিক স্কলারের লেকচার থেকে শুনেছিলাম। উনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ৭০ বছরের বৃদ্ধ একজন লোক ঘোরাঘুরি করত। বৃদ্ধের মাথায় কিছু সমস্যা ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের ধরে ধরে বলত, এই খবরদার তোমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমাদের কোনো পেপার সাবমিট করবে না; ওরা খুব খারাপ, তোমাদের সব থিসিস-গবেষণা ওরা রেখে দেবে। তোমাকে ধোঁকা দেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই বৃদ্ধের ঘটনা কী। উনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। পাঁচ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে তার থিসিস পেপার রেডি করেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পেপারটি হারিয়ে ফেলে। এটার আর অন্য কোনো কপিও ছিল না। পরে লোকটি পাগল হয়ে যায়। এই থিসিস পেপারটির সাথে তার Unhealthy attachment ছিল। তাই পেপারটি হারিয়ে সে আর বেঁচে থাকার মতো কোনো কিছু আঁকড়ে ধরতে পারেনি।
আমাদের চারপাশে যে জিনিসগুলো আছে, যেগুলো নিয়ে আমরা বাঁচি, এগুলোর মধ্যে কোনো একটা বিষয়ের সাথে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা আশেপাশের অন্যান্য বিষয়গুলোকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। যেমন: আমি চাকরি করছি, ব্যস্ত, তাই ছেলে-মেয়েকে সময় দিতে পারছি না। আমি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, তাই কারও জন্য কিছু করতে পারছি না। আমি ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছি, তাই আত্মীয়-স্বজনের জন্য খরচ করতে পারছি না। কোনো একটা বিষয়ের সাথে unhealthy attachment থাকলে এটা দায়িত্বশীল হওয়ার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। যেটা সময়ের ব্যবধানে আপনার Self love কমিয়ে দেয়। জীবনের বড় একটা দিক এলোমেলো হয়ে যায়। হয়তো এই জন্যই অনেক ধনী মানুষের মৃত্যুর আগের কিছু আফসোস এরকম হয়-ইস, টাকার পেছনে এতটা না ছুটে যদি ছেলে-মেয়ের সাথে আরেকটু বেশি সময় কাটাতে পারতাম, ওদের নিয়ে যদি ঘুরতে যেতে পারতাম!
যেকোনো খারাপ সংশ্লিষ্টতা আমাদেরকে দায়িত্বশীল হতে বাধা দেয়; দায়িত্বে অবহেলা আমাদের নিজেদের অপরাধবোধ বাড়িয়ে তোলে, তখন নিজেকে ভালোবাসা কঠিন হয়। আমাদের আশেপাশে যে বিষয়গুলো আছে, যেগুলো নিয়ে আমরা চলি, সেগুলোর কোনোটাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা, ব্যাকুল হয়ে সেখানেই নিজেকে আটকে রাখা যাবে না। জীবনের কোন ধাপে কখন কোনটা করা দরকার গুরুত্ব বুঝে, গুরুত্বের ক্রমানুসারে একসাথে সবকিছু চালিয়ে যাওয়াই ভালো। তাহলে পরে আফসোসের কারণ কম ঘটে।
সত্যি বলতে কি, আমরা যে সমস্ত জিনিসের সাথে সংশ্লিষ্ট, সবকিছুই খুব দুর্বল। আমরা যা চাই তাও খুব দুর্বল, যা পেয়েছি সেগুলোও খুব দুর্বল, যা হারাই সেগুলোও খুব দুর্বল, খুব নশ্বর, খুব ভঙ্গুর, খুব নাজুক। এর জন্য কিছু পেলে খুব বেশি আনন্দেরও কিছু নেই, আবার কিছু হারালে খুব বেশি কষ্টেরও কিছু নেই। এই পৃথিবীর সবকিছুই এ রকমই ক্ষণস্থায়ী।
তাদের আসলে অনেক বুদ্ধি, যারা চিরস্থায়ী জিনিসের সাথে সংশ্লিষ্টতা তৈরি করে। চরম শক্তিশালী কিছুর সাথে সংশ্লিষ্টতা তৈরি করে, যা কখনো হারিয়ে যায় না। তারা কার্যত বিশ্বাস করেন,
إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।'³⁶

টিকাঃ
৩৬. সূরা বাকারা, (২): ২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00