📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 বউ-মাকে দায়িত্ব শেখাতে অতি ব্যস্ততা

📄 বউ-মাকে দায়িত্ব শেখাতে অতি ব্যস্ততা


- বাড়ির বউ হয়েও এটা করবে না? এত পড়াশোনা করেছ আর এগুলো শেখোনি?
- তুমি ঘরের বউ, তুমি থাকতে এ কাজ কেন আমার মেয়ে করবে?
- তুমি বাড়ির বউ হয়েও এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাও! দায়িত্ব জ্ঞান নেই? দায়িত্ব জ্ঞান তো দূরের কথা, চক্ষুলজ্জা পর্যন্ত নেই।
- শ্বশুরবাড়িতে পা দিয়েছ আর জানো না কীভাবে সব সামলাতে হয়! বাপ-মা কিছুই শেখায়নি?
বিয়ের পরদিন থেকেই শুরু হয় দায়িত্ব শেখানোর জন্য উঠেপড়ে লাগা। সব শাশুড়ি বা সব শ্বশুরবাড়ি এমন না। কিছু কিছু শাশুড়ি বা শ্বশুরবাড়ির মানুষ মনে করেন, দায়িত্ব শেখানোর জন্য নতুন কালটাই একমাত্র সময়, পরে বউ-মার চোখ-কান খুলে যাবে, তখন আর কিছু শেখানো-বোঝানো যাবে না।
আবার কিছু কিছু শাশুড়ি থাকেন ভীষণ এগোসেন্ট্রিক। উনারা তাদের ইগো থেকে মনে করেন, সবাই তার প্রাপ্য ফুলফিল করবে, কিন্তু সে কারও ব্যাপারে দায়িত্ব নেবে না। এ ধরনের শাশুড়ি-মায়েরা নিজেদের অনেক বড় মনে করেন, আত্মতৃপ্তি অনেক বেশি, নিজেদের প্রতি ধারণা অনেক উঁচু, বোধশক্তি ও জ্ঞানে অনন্য। উনাদের সেলফ রেস্পন্সিবিলিটি থাকেই না বলতে গেলে। এই ধরনের শাশুড়ি-মায়েরা বউ-মাকে দায়িত্ব শেখাতে বড় তাড়াহুড়া করেন, ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
আবার অনেকে আছেন, চমৎকার উপায়ে বউ-মাকে নিজের মতো করে গড়ে নেন।
আর সত্যি বলতে কী, নতুন বউয়ের শেখার অনেক কিছু থাকে, অনেক কিছু।
নতুন সংসার, নতুন পরিবার, নতুন মানুষজন, এ সবকিছুই নতুন মেয়েটার কাছে নতুন। এই নতুনের সাথে তাকে পরিচিত হতে হয়, ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। নতুন পরিবেশের সাথে নতুন বউকে সম্পৃক্ত করতে শাশুড়ি-মায়ের অনেক বড় একটা ভূমিকা থাকে। বউ-মাকে দায়িত্ব-কর্তব্য শেখানো, কখন কীভাবে কী করতে হবে, সংসার কীভাবে সামলে নিতে হবে—এসব শেখানোর জন্য স্বামীর পরে শাশুড়ি-মা'ই সবচেয়ে নিরাপদ।
কথায় আছে না, 'A daughter in law cannot be perfect by herself, a beautiful mother in law helps her to be one.'
এখন প্রশ্ন হলো, শ্বশুরবাড়িতে বউ হিসেবে যথাযথ রোল প্লে করতে শাশুড়ি- মা কীভাবে বউ-মাকে সাহায্য করতে পারে? অথবা বউ-মার দায়িত্বশীলতা বাড়াতে শাশুড়ি-মা কী করতে পারে? অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে শাশুড়ি-মায়ের অবদান কেমন হতে পারে। এ উদ্দেশ্যে কিছু জানাশোনা বা মাথা খাটানোর অবকাশ কিন্তু শাশুড়ি-মায়ের আছে। জেনারেশন গ্যাপকে মাথায় রেখে সেকেলে গতানুগতিক উপায় ছাড়াও আরও কিছু উপায় বা পদ্ধতির প্র্যাকটিস করা যায় কি না?
সাধারণত আমাদের চাওয়া একটা আকাঙ্ক্ষা আর পাওয়া একটা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কয়েকটি বিষয় থাকে। যেমন ধরুন, আমি চাই আমার বউ-মার মধ্যে দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাক। তাহলে এই চাওয়াকে সামনে রেখে আমার উদ্দেশ্য, তারগীব (উৎসাহ) দেয়ার পদ্ধতি এবং শব্দ চয়ন হিকমার সাথে হতে হবে। উদ্দেশ্য, তারগীব দেয়ার পদ্ধতি এবং তারগীব দেয়ার নিমিত্তে শব্দ বাছাই যদি হিকমাতপূর্ণ হয়, তবে উদ্দেশ্য সফল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আবার শাশুড়ি-মা উনার চেষ্টা দিয়েই যে বউ-মাকে শতভাগ সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পারেন, এমনটি সব সময় হয় না। নিঃসন্দেহে বউ-মার আন্তরিক চেষ্টাও কাম্য। গর্ত থেকে আপনি তাকে সহজে তুলতে পারবেন, যে হাত উঁচু করে আছে।
সঠিকভাবে শেখা বউ-মার দায়িত্ব, কিন্তু সঠিক সুন্দরভাবে শেখানো শাশুড়ি-মার দায়িত্ব। দায়িত্বে সে ভুল করলে বা ত্রুটি করলে সে ভুগবে, আর দুনিয়াতে যদি ভুগতে নাও হয়, তারপরও কাল হাশরের মাঠে মালিকের সামনে জবাবদিহি করতে হবে। আপনি যদি এ সম্পর্কিত আপনার দায়িত্বটুকু সুন্দর করে পালন করেন, নিঃসন্দেহে দিনশেষে এটুকু আপনাকে তৃপ্তি দেবে। আপনার এই ভালো পদক্ষেপ সমাজে 'ভালো' ছড়াবে। সমাজকে একটু হলেও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 মুখের ওপর সত্যি কথা বলি তো, তাই আমি খারাপ

📄 মুখের ওপর সত্যি কথা বলি তো, তাই আমি খারাপ


- আড়ালে কোনো কথা বলি না, এই অভ্যাস আমার নেই, যা বলি সামনাসামনি বলি।
- সত্য কথা বলতে কারও পরোয়া করি না।
- সত্য কথা... ভয় কিসের? সত্য বললে কেউ যদি অপমানিত হয়, হবে। কারও গায়ে লাগলে লাগবে। আমার কী যায় আসে, সত্য তো সত্যই!
এসব কথাবার্তা বলেই খারাপ ব্যবহারগুলো শুরু হয়। খারাপ ব্যবহারগুলো বৈধ করার চেষ্টা করা হয়। যেমন ধরুন, বউ-মা কোনো ভুল করল বা অন্যায় কোনো কাজ করল। আপনি সাথে সাথে React (প্রতিক্রিয়া প্রকাশ) করলেন, বকাঝকা করলেন। বউ-মা সত্যিই অন্যায় করেছে এবং আপনি সত্যি বিষয়টি নিয়ে বকা দিলেন। কেউ যখন কোনো ভুল বা অন্যায় করে তখন তার মন কিছুটা দুর্বল থাকে এবং নিজের ভুলের স্বপক্ষে যুক্তি খুঁজতে থাকে। এ সময় সামনাসামনি সত্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলেও তার আত্মসম্মানে লাগে। মনে মনে আপনার ভুল বা খারাপ দিকগুলো আওড়াতে থাকে। আর আমরা তো মানুষ, ছোট-বড় সবারই কিছু না কিছু দুর্বল দিক থাকে। ইচ্ছে করলেই কাছের মানুষদের খারাপ দিকগুলো খুব সহজেই খুঁজে বের করা যায়।
আপনি যত তার বিরুদ্ধে বলতে থাকেন, সে তত তার স্বপক্ষে যুক্তি খুঁজতে থাকে। সাধারণত এরকম স্পষ্টভাষী শাশুড়ির বকাঝকা থেকে বউ-মা সংশোধন হবার চেয়ে বিগড়ায় বেশি। উপরন্তু শাশুড়ির প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব তৈরি হয়। বউ-মা হয়তো এক ভুল বারবার করে ফেলছে, সেও হয়তো চাচ্ছে এটা থেকে বের হয়ে আসতে। বউ-মার মধ্যে যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে সঠিক পদ্ধতির উপদেশ তার জন্য যথেষ্ট। আর সে যদি খুবই বদ্ধ মনের হয়, তবে তাকে বোঝানো খুবই কষ্টকর।
এখন কথা হলো, একজন মানুষ একটা খারাপ আচরণ করছে, তার সংশোধন নিমিত্তে আমার জন্যও খারাপ আচরণ বৈধ হয়ে যায় কি না? সত্য কথা মুখের ওপর কড়া ভাষায় বলে দেয়াকে ইসলাম কতটা সমর্থন করে, আপনি আপনার নির্ভরযোগ্য কারও কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন। তিক্ত সত্যকে মেনে নেয়ার মতো ক্ষমতা সবার সব সময় থাকে না; মাঝে মাঝে তিক্ত সত্য অনেকের শেষ মনোবলটুকুও ভেঙে দেয়। মুমিনদের জন্য সুন্নাতসম্মত পদ্ধতির অনুসরণই একান্ত কাম্য।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাযি.-কে তাহাজ্জুদের তাগীদ দিতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে বলেছিলেন—আবদুল্লাহ কতই-না ভালো লোক, (আরও ভালো হতো) যদি সে রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ আদায় করত!” এ নিয়ে বিস্তারিত 'সমালোচনা' অধ্যায়ে লেখা আছে।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 একাধিক পুত্রবধূকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা

📄 একাধিক পুত্রবধূকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা


শাশুড়ি-মায়ের যদি একাধিক পুত্রবধূ থাকে, তবে খুব কমসংখ্যক শাশুড়ি আছেন, যারা বউ-মাদের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে পারেন। সহজ কথায়, সব বউ-মার জন্য একই রকম আদর বা শাসনের মানদণ্ড সামনে রাখতে পারেন হাতেগোনা কয়েকজন শাশুড়ি। কোনো-না-কোনো দিকে গাড়ি হেলে যায়। দেয়া-নেয়া, আদর-মহব্বত, শাসন, তরবিয়তে একেক বউ-মার জন্য একেক রকম স্ট্যান্ডার্ড ফলো করা শাশুড়ি-মায়ের একটা বড় ভুল।
আপনি আশেপাশে এমন অনেক শাশুড়ি-মা দেখতে পাবেন যারা দাদি-নানি হয়ে গেছেন, কিন্তু সব নাতি-নাতনির মাকে এক চোখে দেখেন না। আপনি হয়তো বলবেন, সবার আচরণ তো এক রকম হয় না, কোনো বউ-মার আচরণ বেশি আন্তরিক, কোনো বউ-মার আচরণে আন্তরিকতা কম; কেউ বেশি প্রকাশ করতে পারে, আবার কারও প্রকাশ ক্ষমতা কম। ঠিক, যে বেশি আন্তরিক তার প্রতি মনটা ঝুঁকে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে যে আন্তরিক আচরণ করতে পারছে না, তাকে সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারায় কোনোভাবে বঞ্চিত করা কতটুকু যুক্তিসংগত?
অনেক পরিবারে এমন দেখা যায়, দুজন বউয়ের মধ্যে একজন তার শাশুড়ির কোনো খেদমত করছে না, তারপরও এতে শাশুড়ির মন খারাপ হচ্ছে না; বরং মনে মনে ভাবছে, ওর তো ওই সমস্যা, ও কীভাবে এটা করবে? আরেকজন অনেক কিছু করলেও তার কাজের মধ্যে ভুল ধরতে শাশুড়ি অস্থির। একজনের জন্য একধরনের প্রত্যাশা, আরেকজনের জন্য আরেক রকমের প্রত্যাশা—ব্যাপারটা কেমন না?
আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন দেখা যায়, পরিবারের মধ্যে কোনো এক ছেলে দিনরাত খেটে, পরিশ্রম করে বেশি টাকাপয়সা ইনকাম করে। আর একজন ছেলে অলসতা বা অযোগ্যতা বা যেকোনো কারণে কম টাকা-পয়সা ইনকাম করে। বউ-মা বা ছেলের দিনরাত পরিশ্রম এর দিকে না তাকিয়ে আরেক বউ-মা বা ছেলের দৈন্য অবস্থার প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল হওয়া, দুজনের অর্থনৈতিক অবস্থা এক রকম করার জন্য তুলনামূলক দুর্বলজনকে কিছুটা বেশি সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ দেয়াটা কেমন?
একেক বউ-মার প্রতি আন্তরিকতা একেক রকম হলেও তাদের প্রতি প্রত্যাশা বা তাদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা শাশুড়ি-মায়ের একটি সমস্যা। এ ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা ভীষণ জরুরি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করে নির্দেশনা দিয়েছেন, ‏اتَّقُوا اللَّهَ، وَاعْدِلُوا فِي أَوْلَادِكُمْ 'তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম করো।'²⁰ এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে এসেছে,
‏وَ إِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَ لَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَ بِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ ‏وَقَّكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ 'যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য কথা বলবে—যদিও তা স্বজনদের সম্পর্কে হয়। আর আল্লাহ-প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'²¹

টিকাঃ
১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২২২
২০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬২৩
২১. সূরা আনআম, (৬): ১৫২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00