📄 বউকে কড়া শাসনে না রাখলে মাথায় চড়ে বসবে
ছেলের বউ ঘরে পা দেয়ার সাথে সাথে কিছু কিছু শাশুড়ি-মায়ের মাথার মধ্যে একধরনের অদ্ভুত চিন্তা খেলে যায়। আর তা হলো, যেকোনো উপায়েই হোক বউ-মাকে হাতের মধ্যে রাখতে হবে। তাদের মনে একধরনের আশঙ্কা হয়— এখন যদি বউ-মাকে হাতের মধ্যে না রাখতে পারি, তাহলে বউ-মা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার দুঃসাহস দেখাবে! তাকে হাতের মধ্যে নেয়ার এটাই মোক্ষম সময়। বউ হাতে থাকা মানে ছেলেও হাতে থাকা। আর বউকে করতলগত করার সহজ উপায় হলো তাকে কড়া শাসনের মধ্যে রাখা। হয়তো এই শাশুড়ির যিনি শাশুড়ি ছিলেন তিনিও তাকে এই উপায়েই হাতের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছিলেন!
সুযোগ দিলে মাথায় চড়ে বসবে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে শাশুড়ি তার পুত্রবধূকে কড়া শাসনের মধ্যে রাখতে চান। কিন্তু ব্যাপারটা সব সময় এভাবে কাজ করে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো দমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিণতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নতুন সংসারে সে একেবারে আনাড়ি, আস্তে আস্তে তার শক্তি বাড়তে থাকবে, সন্তান-সন্ততি হওয়ার মাধ্যমে জনবল বাড়বে, তখন সুযোগ পেলেই তার এই চাপা ক্ষোভ বিদ্রোহে পরিণত হতে পারে।
বিয়ের পর বউ-মা যখন শ্বশুরবাড়িতে আসে, তখন সে তার মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচার-আচরণ সবকিছু সঙ্গে নিয়ে আসে। শাশুড়ি যদি বউ-মাকে বোঝাতে পারে যে, শাশুড়ির আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা, আচরণ অনেক বেশি কুরআন-সুন্নাহর কাছাকাছি এবং বউ-মার জন্য উপকারী, তাহলে বউ-মা ধীরে ধীরে এই বিষয়গুলোর সাথে আপনা-আপনি খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। শাশুড়ির ভালো ব্যবহার, আন্তরিক আচরণ থেকে যে বউ-মা শাশুড়ির প্রতি আনুগত্য করা শেখে না, তাকে কড়া শাসনের মধ্যে রেখেও আনুগত্য শেখানো যায় না। ড্যামকেয়ার টাইপের বউ-মা আছে, তাদের ছেড়ে দেয়াই ভালো; তারা একসময় ঠেকে শিখবে।
কিন্তু ড্যামকেয়ার বউ-মা এবং যারা অনুগত বউ-মা তাদের উভয়কে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেই শাশুড়ি যদি কড়া শাসনের উপায়গুলো বেছে নেন, তবে এটা শাশুড়ির একটা ভুল। কাউকে ইশারায় শেখানো যায় আবার কাউকে মেরে বকেও শেখানো যায় না। সব ধরনের মানুষকে শেখানোর পদ্ধতি এক না; বরং ভিন্ন ভিন্ন।
আমরা ইসলামের শিক্ষা থেকে জেনেছি, আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খেদমতে থাকা আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দশ বছরের মধ্যে কোনোদিনও বকা দেননি, কোনোদিনও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কোনো কথা বলেননি।১৩ তারপরও আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনের ওপর কর্তৃত্ব করেছিলেন আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। শুধু আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু না, সকল সাহাবায়ে কেরামের কলিজার মধ্যে ছিলেন আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
ইতিহাস থেকে আমরা জানি, উহুদের যুদ্ধে যখন প্রিয় রাসূলের দাঁত মোবারক শহীদ হয় তখন নবীজী আবু আমের আর রাহিবের করা একটি গর্তে পড়ে যান, তাঁর মাথা ফেটে যায়। এতে তার শিরস্ত্রাণের দুইটি কড়া চেহারায় ঢুকে যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কড়া দুইটি বের করার জন্য সামনে অগ্রসর হলে হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি. তাকে কসম দিয়ে বলেন, আল্লাহর জন্য এই খেদমত আমাকে করার সুযোগ দিন।
এই বলে তিনি হাতের পরিবর্তে নিজের মুখ দিয়ে সজোরে টান দিতেই কড়া বের হয়ে আসে। সাথে সাথে টানের তীব্রতায় আবু উবাইদা রাযি.-এর একটি দাঁত উপড়ে যায়। দ্বিতীয় কড়াটিও মুখ দ্বারা টান দিলে আরেকটি দাঁত উপড়ে যায়।১৪
এই যুদ্ধে কাফেরদের কাছ থেকে উড়ে আসা তির থেকে নবীজীকে রক্ষা করার জন্য নিজেকে ঢাল হিসেবে পেতে দিয়েছিলেন আবু দুজানা রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।১৫ হযরত আবু তালহা রাযি. একটি ঢাল হাতে নবীজীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যুদ্ধ শেষে দেখা যায় তার শরীরে ৭০ এর বেশি জায়গায় আঘাতের চিহ্ন।১৬
এমন কত ঘটনা রয়েছে নবী-প্রেমের! এত ভালোবাসা, এতগুলো মনকে কীভাবে জয় করেছিলেন একজন মানুষ? প্রশ্ন জাগে। এক ছেলের বউয়ের মনের ওপর কর্তৃত্ব করতে আমরা কতশত চিন্তা করছি! বরং ভালো হতো না— ভুলভাল চিরাচরিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে সেসব কার্যকর পদ্ধতিগুলো জেনে নেয়া, যে পদ্ধতি আজাদ মানুষদের গোলামে পরিণত করে? সেসব উপায় জেনে নিলে ভালো হতো না, যেভাবে কড়া শাসন ছাড়াই বউ-মার আন্তরিক শ্রদ্ধা পাওয়া যাবে?
টিকাঃ
১৩. আনাস ইবনু মালিক রাযি. বলেন, "আমি দশ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি কখনো আমাকে উহ শব্দও বলেননি এবং কোনো সময় আমাকে 'এটা কেন করলে, ওটা কেন করোনি' তাও বলেননি।"-সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩০৯
১৪. মুসতাদরাকু হাকিম, হাদীস নং ৫১৫৯। ইমাম হাকিমের মতে সনদ সহীহ। তবে ইমাম জাহাবী সনদে কিছুটা আপত্তি করেছেন। তবে এই ঘটনা সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত।
১৫. ইমাম বুখারী, তারীখুল কাবীর, ৮/৩১৪। সনদ হাসান।
১৬. মুসতাদরাকু হাকিম, হাদীস নং ৪৩১৩। সনদ সহীহ।
📄 মা-ছেলের ভালোবাসায় ভাগ বসাতে এসেছে বউ
'ছেলের বিয়ে দিতে হবে' এই ভাবনার পরের চিন্তাগুলো অনেক সময় এমন হয়— 'ছেলে আর আমার থাকল না', 'এত কষ্টে বড় করলাম, কিন্তু এখন পর হয়ে যাবে', 'বাইরের কাজ সেরে বাসায় এসে আর আমাকে সময় দেবে না', 'ওর যা দরকার, তা আমাকে না বললেও চলবে'। এমন হাজারো আশঙ্কা আসে হবু শাশুড়ির মনে। পাড়া-প্রতিবেশী, পাশের বাসার আপাও হবু শাশুড়িকে সতর্ক করেন—'আপা ভালো মেয়ে দেখে ছেলের বিয়ে দিয়েন, অমুকের বউ- মা ভালো বংশের মেয়ে, কিন্তু কী যে দজ্জাল, সাক্ষাৎ ডাইনি! শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে-না-দিতেই ছেলেকে আলাদা করে ফেলেছে!'
হবু শাশুড়ির মনের কোনায় ভয় ঢুকে যায়। আশঙ্কা হয়, হয়তো এমন কোনো এক ডাইনিই আসবে আমার ঘরে, কেড়ে নেবে আমার আগলে রাখা ছেলেকে। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে—ওর বাবা কী সুন্দর সারা দিন কাজের ব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরে সন্তানের আধো বোলে ছড়া শুনে খুশি হয়ে তাকে একটা চকলেট দিয়েই তৃপ্তির ঘুম দিত। অথচ ওই চার লাইনের ছড়াটা সন্তানকে শেখাতে ছেলের পেছনে দৌড়ে সারাদিন শেষ করে দিয়েছে মা। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট বাচ্চা খায় না; জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ বাচ্চাটা প্লেটের সব খাবারটুকু খেয়েছে; পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। জীবনের পুরোটাই নিয়োজিত এই সন্তানের জন্য। মায়ের পুরোটা জীবন, শারীরিক-মানসিক সকল প্রকার শ্রম বিনিয়োগ করা হয়েছে সন্তান লালন-পালনের পেছনে। সেই ছেলেকে যে কেড়ে নেবে, সে সাক্ষাৎ ডাইনি ছাড়া আর কিছুই না।
তাই মাঝে মাঝে হবু শাশুড়ির মনে হয়, থাক, বিয়ে যত দেরিতে হয় ততই ভালো। বউ ঘরে আসলেই বিপদ। বিয়ে দিলে তো বউ এমনি এমনি আসবে না, তার সমস্ত অধিকার নিয়েই সে আসবে। সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম সবকিছু তাকে অধিকার দিতে বলবে। পানির গ্লাস, থালা, বাটি, বিছানার চাদর, ঘর-সবকিছুতে অংশীদার হবে। এমনকি ছেলের ভালোবাসাতেও। হবু শাশুড়ির মনে হয়, সংসারের হাজারো সমস্যার মাঝে শুধু সন্তানের ভালোবাসাকে আগলে ধরে বেঁচে থাকি। আমি কীভাবে আমার ভালোবাসাকে হাতছাড়া করব? এই ভালোবাসার যে অংশীদার হবে, সে কীভাবে আমার আপন হতে পারে? হয়তো এ কারণেই বউ-মাকে নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গুনতে শাশুড়ির খুব কষ্ট হয়। এ কারণেই হয়তো বউ-মার গুণগুলোও দোষের মনে হয়।
আপনি হয়তো বলবেন, কিছু কিছু বউ-মা আসলেই ডাইনি টাইপের। অবশ্যই। কিন্তু ওই কিছুর কারণে তো সবাইকে ডাইনি বলা ঠিক হবে না।
তবে এখানে চিন্তা করার মতো আরও একটি বিষয় আছে। ছেলের বিয়ে দেয়ার আগে মা যখন পাশের বাসার ভাবিদের বলেন, 'ভাবি, আমার ছেলের জন্য মেয়ে দেখেন, ওর বিয়ে দেব।' তখন পাশের বাসার ভাবিরা খুব কমই বলেন, 'জানেন ভাবি, অমুকের বউ-মা যা লক্ষ্মী! ঘরে এসে শাশুড়ির কাঁধের বোঝা একেবারে হালকা করে দিয়েছে।' ভালো কথাগুলো কমই ছড়ায়।
আমরা আমাদের খারাপ দিকগুলো নিয়ে যতটা কানাকানি করি বা জটলা বাঁধি, মেতে উঠি, ভালো দিকগুলো নিয়ে ততটা কথাবার্তা বলি না। বউ-মাকে ঘরে আনার আগে শাশুড়ি-মা নিজের অভিজ্ঞতা বা পাশের বাসার ভাবির গল্প গুজব থেকে বিশ্বাস করে নেন— 'আমার বউ-মা এসেও হয়তো আমার ছেলেকে কেড়ে নেবে, আমার ছেলে তখন আর আমার সাথে হেসে গল্পগুজব করবে না।' মনের মাঝে এসব দৃশ্য তিনি আগেই একে ফেলেন। এরপর যখন ঘরে বউ আসে তখনো মনের মধ্যে আগ থেকে একে রাখার দৃশ্যপটকে সামনে রেখেই বউ-মার সাথে আচরণ করতে থাকেন। ছেলে চিন্তা করতে থাকে, মা এমন হয়ে গেল কেন? কেন আমার বউকে ভালোবাসে না? মা তো এমন ছিল না! ছেলে আর আগের মতো স্বচ্ছন্দে মায়ের সাথে হাসাহাসি, গল্প করতে পারে না। বউ-মা ভাবে, শাশুড়ি কী কড়া, কী সন্দেহপ্রবণ! আর শাশুড়ি ভাবে, ঠিক যা ভেবেছিলাম! ঠিক আমার ছেলেটাকে নিশ্চয়ই কোনো জাদুটোনা করেছে এই ডাইনিটা। তা না হলে আমার ছেলে তো এমন ছিল না!
তবে হ্যাঁ, সব শাশুড়ি একরকম না। পাশের বাসার ভাবিদের উস্কানিতে সবাই ভেসে যান না। সবাই বাস্তবটা বুঝতে ভুল করেন না। তারা জানেন, প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর সন্তানের বিয়ে দেয়া বাবা-মায়ের বড় একটি দায়িত্ব। তারা জানেন এটা মহান প্রভুর আদেশ:
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ
'তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও।' ১৭
তারা জানেন, ভালোবাসা কোটাভিত্তিক। একজনকে ভালোবাসলে আর একজনকে উপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মায়েরা সন্তানকে ছোটবেলাতেই শিখিয়ে দেন—নানিকে ভালোবাসতে হলে দাদিকে উপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। খালাকে ভালোবাসলে ফুফুর প্রতি বিদ্বেষ রাখার প্রয়োজন পড়ে না।
সব সন্তানই জীবনের শুরুর দিকে বাবা-মায়ের ওপর চরম পর্যায়ের নির্ভরশীল থাকে। ধীরে ধীরে সে স্বাবলম্বী হয়, তার জীবনসঙ্গীর প্রয়োজন হয়। মায়ের স্নেহ ভালোবাসা এক ধরনের, স্ত্রীর ভালোবাসা আরেক ধরনের আর সন্তানের ভালোবাসা ভিন্ন ধরনের। সময়ের পরিবর্তনে মানুষের মনের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন এসব ভালোবাসার চাহিদা তৈরি হয়। এসব বাস্তবতার সাথে যে মা যত তাড়াতাড়ি নিজেকে মানিয়ে নেন, তিনি তত তাড়াতাড়ি তার নিজের, সন্তানের ও সমাজের উপকার করেন।
ভালোবাসায় কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, তা যদি কোনো মা তার সন্তানকে শিখিয়ে না দেন, তবে ঘরে বউ আনার আগেই সন্তানকে হারাবার আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কিত থাকবেন। একজনকে উপেক্ষা না করে আরেকজনকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, যত্নআত্তির ফাঁকে ফাঁকে সেই দীক্ষা ছেলেমেয়েকে দেয়া মায়েই দায়িত্ব ছিল।
তবে মজার ব্যাপার হলো, দিনশেষে সব মা তার ছেলেকে নাতি-নাতনিসহ একটি সুখী পরিবারের মাঝেই দেখতে চান। মোটাদাগে বলতে গেলে, প্রায় সব মা'ই ছেলের ভালো চান, ছেলের বউয়ের ভালো চান। তবে সকলের এই ভালো চাওয়ার পদ্ধতি এক রকম হয় না। প্রয়োজনে এই পদ্ধতির গঠনমূলক সংস্কার করার মানসিকতা থাকতে হবে। এই সংস্কারের ধারাবাহিকতায় শাশুড়ি- মা এভাবে চিন্তা করতে পারেন, বউ-মা ছেলের ভালোবাসায় ভাগ বসাতে আসে না; বরং ছেলের ভালোবাসার শূন্যতা পূরণ করতে আসে।
টিকাঃ
১৭. সূরা নূর, (২৪) : ৩২
📄 ছেলে-বউমার সব সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা
আমরা বাঙালিরা জাতিগতভাবে অন্যের ব্যাপারে বেশ উৎসাহী বা আগ্রহী বা কৌতূহলী। কেন যেন নিজের চেয়ে অন্যের প্রতি আগ্রহের পরিমাণটা আমাদের অনেক বেশি। আগে গ্রাম এলাকাগুলোতে বেড়ার ঘর ছিল বা উঠানে পাশের বাড়ির সীমানায় বাঁশের বেড়া দেয়া থাকত। বেড়ার ঘরের দেয়ালে বা দুই বাড়ির সীমানা দেয়ালে বিশেষ কায়দায় অপর মানুষদের দেখার কিছু গোপন ছিদ্র থাকত। পাশের বাড়ির মানুষজন কী করছে, কীভাবে উঠানে হাঁটাহাঁটি করছে, তা দেখার কেমন যেন এক প্রবল ইচ্ছা কাজ করত! বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গল্প-উপন্যাসের প্লট তৈরি হয়েছে এই কৌতূহল থেকে।
অন্যের হাঁড়ির খবর জানতে দারুণ লাগে! আর বেড়ার গোপন ছিদ্র দিয়ে কিছু দেখার পরে অন্যান্য মানুষদের কাছে তা প্রকাশ না করা পর্যন্ত তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করত। সবাইকে একইভাবে বলা হতো—আরে ভাবি শুনছেন... খবরদার কাউকে যেন বলবেন না... অমুক তো...।
এখন কাঁচা বেড়ার ঘরের জায়গায় উঠেছে পাকা দালান। বেড়ার গোপন ছিদ্রে 'একটা চোখগুলো' ডিজিটাল হয়েছে। কানাঘুষার জায়গা দখল করেছে চ্যাটবক্স, কমেন্ট সেকশন। অপরের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রবল জানার আগ্রহের ধারাবাহিকতায় কিছু কিছু শাশুড়ি তাদের আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। বউ- মার কবে বাচ্চা পেটে আসবে সেটাও তাকে জানতে হবে! সবকিছু তার জানা চাই চাই। এত তাড়াতাড়ি কেন বাচ্চা হবে বা এত দেরিতে কেন বাচ্চা হবে? সবকিছুর মধ্যে তাদের অবশ্যই নাক গলাতে হবে।
এই ধরনের শাশুড়িরা নাক গলানোর পেছনে কিছু যুক্তি খাড়া করে রেখেছেন। যেমন : 'আমার ছেলের বয়স আর কত-ই বা! ও কী বোঝে! ওর কি আর বিয়ের বয়স হয়েছে, ওর গায়ে ফুলের টোকাও লাগতে দিইনি! ও কীভাবে বুঝবে কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কী করতে হবে না হবে!' ছেলের ক্ষেত্রে এসব মনে আসে ভালোবাসার মোড়কে আর বউ-মার ক্ষেত্রে এসব মনে আসে অবহেলার মোড়কে! আর এই যে বউ-মা, তুমি কোথাকার কে! তোমার এত বড় সাহস আমার পরিবারের মধ্যে কথা বলতে আসো! তোমার ডিপার্টমেন্ট রান্নাঘর সেখানে যাও! মনে মনে শাশুড়ি বলতে থাকে, ওই মেয়ে সাংঘাতিক! আমার সংসার হাত করতে এসেছে! কী চালাক! বয়সে ছেলের চেয়ে ছোট হলে কী হবে, খুব চালাক! খুব ধুরন্ধর! কোনো কিছু এদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না। কী হতে কী হবে আল্লাহ মালুম!
যৌথ পরিবারেই না, একক পরিবারেও ছেলে-বউ এর সব খুঁটিনাটিতে কিছু কিছু শাশুড়ির নাক গলানোর প্রবণতা থাকে চরমে। কী কিনলে, কোথায় গেলে, কোথায় খেলে, এই লোশন কে দিল, কানের ওই দুল কে দিল, কবে দিল, কোথায় পেলে? বিছানার চাদর এভাবে বিছিয়েছ কেন? ঘরে খাট এভাবে রেখেছ? কেন তরকারিতে লবণ-ঝালের এই দশা? এমন হাজারো জবাবদিহি।
কিছু বাঁকা-ত্যাড়া, গোঁড়ামিপনায় ভরা বউ-মা ছাড়া গড়পড়তা অন্যান্য সব বউ- মাদের পছন্দ, সিদ্ধান্ত বা কাজগুলো কেন আলাদা হচ্ছে সেই কারণগুলো নিয়ে ওইসব শাশুড়িরা তেমন একটা ভাবতে চান না। ওই যে নাক গলানোর অভ্যাস! সন্তানকে সংসারী-স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে নিজেদের হুকুম তামিল করানোতেই উনাদের উৎসাহ বেশি! এই হুকুম চাপানোর সাথে সাথে সম্মান বা মর্যাদা পাওয়ার বিষয়গুলোকেও বউ-মার শাশুড়িটা কেমন যেন গুলিয়ে ফেলেন। এটা শাশুড়ি-মায়ের একটা ছোট্ট ভুল।
সম্মানিতা শাশুড়ি-মা!
আপনার মর্যাদা, সম্মান সঠিকভাবে হেফাজত করুন। সব জায়গায় কেন নিজেকে জড়াবেন? বউমার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করা যায় কি? চোখের সামনে কল্পনা করা যায় কিনা—সময়, পরিবার, পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা, সংস্কৃতির পার্থক্য, জেনারেশন গ্যাপ সব একসাথে কীভাবে রুচিবোধ, পছন্দ, কাজকে আলাদা করে দিয়েছে? সম্পর্ককে নিরাপদ রেখে ছেলে-বউয়ের সিদ্ধান্তে বা কাজে কীভাবে মতামত দিতে হয় সে সম্পর্কে আরেকটু জানাশোনা বাড়ানো যায় কি না?
জানি, আপনি ছেলে ও বউ-মার ভালো চান। তাই সব ক্ষেত্রে বলতে থাকেন, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। মানি, আপনি তাদের কোনো ক্ষতি চান না। তাই তাদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও স্পেস দেন না। যদি সমস্যা হয়, সব সিদ্ধান্তে মতামতকে চাপানোর চেষ্টা করেন।
তবে ভালো হতো না, আপনার ছেলে-বউ-মা আপনার জীবদ্দশাতেই আপনারই চোখের সামনে ভুল করে ঠেকে, শিখে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করত? মায়ের হয়তো ছেলের কষ্ট দেখতেও কষ্ট হবে, তারপরও সোনার খাদ দূর করতে হলে তাকে তো আগুনেই রাখতে হয়।
📄 ভুল সংশোধনের নিমিত্তে ভুল পদ্ধতি
• ছেলে বাইরে থেকে বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই—'জানিস, তোর বউ আজ কী করেছে!' ব্যস শুরু হয়ে গেল এক ঘণ্টার ...।
• সামান্য ঘরটা ঝাড়ু দিতে পারে না, অপয়া একটা!
• তরকারিতে লবণ কম বা বেশি হলে—কী যে রাঁধে, মুখে তোলা যায় না! আর নিচে পুড়ে গেলে তো কথাই নেই! সব ধ্বংস করে ফেলবে, সংসারটা উচ্ছন্নে যাবে!
• বাপ-মা কিছুই শেখায়নি নাকি? আনকালচার্ড!
এই ধরনের বাঁকা কথাগুলো শাশুড়িরা যে শুধু খোঁচা দেয়ার জন্যই বলেন তা না; বরং তারা চান তার জীবদ্দশাতেই বউ-মা যেন সংসারের সবকিছু ঠিকঠাক মতো বুঝে নিতে পারে। ভুলগুলো যেন শুধরে নিতে পারে। কারণ ভবিষ্যতে এই সংসারের হাল তো তাকে ধরতে হবে। বউ-মার যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য শাশুড়িরা তাকে নিখুঁত করার মিশনে নামেন।
নিঃসন্দেহে কোনো মানুষই নিখুঁত না, সবারই কিছু না কিছু ভুল হয়। আর অভিজ্ঞ চোখে আনাড়ির ভুল খুবই স্পষ্ট দেখা যায়। নজর করে দেখলে আনাড়ি বউ-মার অনেকগুলো ভুল চোখে আসে। আচরণের ভুলভাল দিকগুলো চোখে আসার পর শুরু হয় ভুল সংশোধন পর্ব। ভুল দেখলে সেগুলোর সংশোধন তো ভালো কথা; কিন্তু এই সংশোধনের পদ্ধতিতে যদি সমস্যা থাকে তখন ভুল দূর করা খুব কঠিন হয়ে যায়।
ভুল সংশোধনের জন্য ভুল পদ্ধতির প্রয়োগ বা পুত্রবধূর সমালোচনায় ইসলামি রীতিনীতি না জানা বা না মানা শাশুড়ি-মায়ের একটি ভুল। ভুলের বিষয়গুলো সরাসরি না বলে বাঁকা কথায় বলা, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা, আগে বউ-মাকে না বলে ছেলের কানে বউ-মার বিরুদ্ধে কথা লাগানো, কথায় কথায় 'মা-বাবা কিছুই শেখায়নি' বলা, ভুল সংশোধনের জন্য বউ-মাকে সময় না দিয়ে ভুল নিয়ে বেশি মাতামাতি করা, পরিবারের বাইরের মানুষজনের কাছে বউ-মার বদনাম করে বেড়ানো ইত্যাদি বউ-মার ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে এই সমস্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা নিঃসন্দেহে শাশুড়ি-মায়ের একটি ভুল।
অনেকে শুধু অপদস্থ করার জন্যই ভুল ধরেন, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা বউ-মার সত্যিই ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে ভুল ধরেন, তাদেরকে অবশ্যই সংশোধনের পদ্ধতির দিকে নজর দিতে হবে। পদ্ধতি হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কার্যকরী, যেন বউ-মার শাশুড়ির প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতিটুকুও অটুট থাকে এবং সে সংসারের মারপ্যাঁচগুলোও দ্রুত শিখে নিতে পারে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।
ঘরের ভেতর আরেকটি বিষয় দেখা যায়, ঘরে বউ আসার পরে ঘরের সবাই বউয়ের ভুল ধরতে উঠেপড়ে লেগে যায়। তাদের নিজেদের কী ভুল হচ্ছে সেদিকে খেয়ালটা খুব কম থাকে। নিজের ভুলগুলো না দেখে অন্যের ভুল ধরায় ব্যস্ত হয়ে ওঠা নিঃসন্দেহে ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। শাশুড়ি হিসেবে شাশুড়ি-মায়ের কোনো ভুল হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে সচেতনতা কম দেখা যায়; বরং বউ-মা হিসেবে বউ এর কী কী ভুল হচ্ছে সেটা নিয়েই জটলা বেশি হয়। 'অপরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরা' দৃষ্টিভঙ্গি বউ-মার ভুল সংশোধনে এক বড়সড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
বউ-মার ভুল সংশোধন করতে যাওয়াটা কোনো অন্যায় না; কিন্তু এই ভুল সংশোধন করতে যে সমস্ত অন্যায় পথ অনুসরণ করছি, সেগুলো অন্যায়।
তবে এক কাঠিতে ঢোল বাজে না। ভুল সংশোধনে শাশুড়ির সচেতনতার পাশাপাশি বউ-মারও সচেতনতা প্রয়োজন। ভুল সংশোধনের সঠিক পদ্ধতির প্রতি শাশুড়ির চেষ্টা-মেহনতের পাশাপাশি প্রয়োজন ভুল কাটিয়ে উঠতে বউ-মার দৃঢ় ইচ্ছা।