📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা

📄 সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা


১০. সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা
বাচ্চার হাতেখড়ি শেখার জন্য বাসার কাছে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছিলাম। বিকেল ঠিক না, দুপুরের পর সাড়ে তিনটার দিকে ওদের নিয়ে যেতাম। বেশ কয়েকটা বাচ্চা মায়েদের হাত ধরে পড়তে আসত। ওদের সাথে আরও দুইটা বাচ্চা পড়ত। ওদের দাদি ওদের কোচিংয়ে আনা-নেয়া করত। উনার বয়স ৬০ থেকে ৬৫ হবে। কোনো একদিন উনাকে বলেছিলাম, নাতি-নাতনিদের আপনি অনেক আদর করেন, দুপুরের পর বিশ্রাম না নিয়ে প্রতিদিন ওদের নিয়ে আসেন।
সাধারণত দাদা-দাদি বা নানা-নানি যদি নাতি-নাতনিদের স্কুলে নিয়ে যায় আর কেউ তাদের কেয়ারিং grandparents হিসেবে বাহবা দেয়, তবে উনারা খুব খুশি হন, চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক দেয়, এরপর পাঁচ থেকে দশ মিনিট ধরে নাতির গুণগান বা দুষ্টুমির বর্ণনা দেন। কিন্তু উনি বড় এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, আর আরাম! দেড় বছর থেকে ওদের সব দেখাশোনাই তো আমি করি। ওর মা গেছে পিএইচডি করতে বেলজিয়ামে। এক বছর পর ১৫ দিনের জন্য একবার এসেছিল। আবার কবে আসবে জানি না। তবে প্রতিদিন ওর মা বাচ্চাদের সাথে কথা বলে। এদিকে ওর বাবার ট্রান্সফার হয়েছে অন্য এক জেলায়। প্রতিসপ্তাহে এক দিনের ছুটিতে আসে ঢাকায়। ছুটি শেষ হলে আবার চলে যায়। আমি আর এদের কোথায় ফেলে যাব।
ওইদিন কথা ওই পর্যন্তই।
আরও দেড় বছর আমার বাচ্চা ওই কোচিংয়ে পড়েছিল, ওই বাচ্চাগুলোও পড়ত। শেষের দিকে শুনেছিলাম সংসারটা আর টেকেনি।
আমার এক আত্মীয় আছেন। অনেক আমল করেন। ফজরের পর থেকে কোনো দিকে না তাকিয়ে সারা দিনের সমস্ত নফল আমল শেষ করে সকাল সাড়ে আটটা-নয়টার দিকে ওঠেন। উনার ছোট ছোট বাচ্চা আছে, স্বামী অফিসে চলে যান আটটায়। প্রায় দিনে বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বাঁধে এই নিয়ে যে, স্বামী বলে, কুরআন তিলাওয়াতটা আমি অফিসে চলে গেলেও করতে পারো, নাস্তা গুছিয়ে রেখে ফ্রি হয়ে আমলে বসতে পারো। স্ত্রী বলে, কেমন মানুষ তুমি! কুরআন তিলাওয়াতের মতো নেক আমল করতে বাধা দাও! দ্বীন আগে না দুনিয়া আগে?
দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্যই আমি আমার ক্যারিয়ারের একবিন্দু কম্প্রোমাইজ করব না। এই তুচ্ছ সংসারের জন্য আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করব—হতেই পারে না। সংসার ছাড়তে পারব, চাকরি ছাড়তে পারব না।
আসলে কি, গুরুত্বের দিক দিয়ে কাজকে ভাগ করা— কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে কোনটি আগে করব আর কোনটি পরে করব সেই সিদ্ধান্ত নেয়া খুব জরুরি একটি বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও পরিবারের মাঝে সুসংঘটিত সমন্বয় না করা বিবাহিতার একটি ভুল।
ব্যক্তিগত উন্নয়নের দিকে নজর দেয়া হয় সাধারণত পরিবারকে উন্নত করার জন্য। পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়; কারণ তারা পরিবারের মাঝে পারিবারিক ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে পারে। একার শক্তি সব সময়ই নাজুক। একা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। নিজেকে কেন একা রাখবেন? আর দিনশেষে আপনি একা থাকতেও পারবেন না। আপনার মানুষ লাগবে, মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক লাগবে।
যখন আপনার আরেকটু বয়স হবে, তখন যে জিনিসটি আপনাকে সবচেয়ে খুশি রাখবে তা হলো, মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক। আপনি একা থাকতে পারেন কি না, একা থাকা সুখের কি না! চিন্তা করুন। একা একা এগিয়ে যাবেন নাকি সবাইকে নিয়ে একসাথে এগোবেন?
দেখুন, আপনার ব্যক্তিগত উন্নয়নের হেতু যদি পরিবারকেই বোঝাতে না পারেন, তবে কাকে বোঝাতে পারবেন? যদিও সবাই বুঝবে না, অনেকে বুঝলেও মুখে স্বীকার করবে না। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা তো করতে হবে।
পরিবারকে ছেড়ে ব্যক্তিগত উন্নয়নের পেছনে না পড়ে বরং পরিবারকে সাথে নিয়ে সবাই একসাথে উন্নত হওয়া যায় কি না?
সময় বা পরিস্থিতিসাপেক্ষে কাজের গুরুত্ব যে পরিবর্তন হয়, তা বুঝতে না পারা আমাদের একটা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন?

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 শাশুড়ির স্নেহের অংশীদার হতে নিজেকে মেয়ের মতো মনে করা

📄 শাশুড়ির স্নেহের অংশীদার হতে নিজেকে মেয়ের মতো মনে করা


১১. শাশুড়ির স্নেহের অংশীদার হতে নিজেকে মেয়ের মতো মনে করা
ধরুন, মেয়ে ও বউ-মা দুজনেই সন্তানসম্ভবা। মেয়ে যখন খাবার পরে ওয়াক ওয়াক করতে করতে ওয়াশরুমে যায় তখন বাড়ির প্রায় সবাই পিছনে ছোটে! একজন পিঠে হাত রাখে, আর একজন মাথায় পানি দেয়, আরেকজন হাত ধরে এনে বিছানায় শোয়ায়, যেটা খেতে রুচি হয় সেটা খাওয়ায়! কিন্তু সন্তানসম্ভবা বউ-মা যখন বমি করে তখন সচরাচর কেউ পিঠে হাত রাখে না, পানির ঝাপটা দেয় না, বাড়ির মানুষেরা তেমন একটা উতলা হয় না, পছন্দের খাবার রেঁধে সামনে দেয়া হয় না! বরং বলা হয়, বাচ্চা পেটে আসলে একটু কষ্ট সবারই হয়!
ছেলে বা বউ-মা উভয়েরই হয়তো চিকনগুনিয়া হয়েছে! হন্তদন্ত হয়ে ছেলের কপালে হাত দিচ্ছে, আঁতকে উঠছে, দুঃখে-কষ্টে ভারাক্রান্ত হয়ে বলছে, আহারে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! বউ-মার কপালে হয়তো হাত দেয়ার সময়টা শাশুড়ির হচ্ছে না; বরং শাশুড়ি বউ-মার দিকে তাকিয়ে বলছে, ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো।
বউ-মার মনে হয় শাশুড়ি তাকে মেয়ের মতো বলে কিন্তু ছেলে-মেয়েকে সে কত ভালোবাসে। আর আমাকে? শাশুড়ি ভালোবাসতে পারে না তা না, সে আসলে আমাকে ভালোবাসে না!
কথা হলো, শাশুড়ি কেন আপনাকে সন্তানের মতো ভালোবাসবে? কীভাবে বাসবে? আপনি তো তার সন্তান না, ছেলের বউ। আপনার শাশুড়ি আপনার স্বামী, দেবর, ননদ সবাইকে যেভাবে ভালোবাসবে কখনোই আপনাকে সেভাবে ভালোবাসতে পারবে না। আপনি তার নাড়িছেঁড়া কেউ নন। তাঁর সন্তান তাঁর আনন্দের কারণ, বেঁচে থাকার অবলম্বন। আপনিও যখন আস্তে আস্তে তাঁর আনন্দের কারণ, নির্ভরশীলতার আশ্রয় হয়ে উঠবেন তখন আপনার প্রতি স্নেহ- মমতা তার আপন সন্তানের কাছাকাছি হতে পারে।
শাশুড়ির চোখে তার সন্তানসম স্নেহ খুঁজতে যাওয়া বিবাহিতার ভুলগুলোর মধ্যে একটি।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 পারিবারিক নিয়ম মানাকে পরাধীনতা মনে করা

📄 পারিবারিক নিয়ম মানাকে পরাধীনতা মনে করা


১২. পারিবারিক নিয়ম মানাকে পরাধীনতা মনে করা
কেন প্রতিদিন রাতে একসাথে খেতে হবে? এটা আবার কেমন হুকুম! প্রতিদিন সবাই মিলে একসাথেই খেতে হবে! আমি আমার ইচ্ছামতো যখন-তখন খেতেও পারব না?
আমার বাইরে যাওয়া দরকার, যাব। কেন বাসায় বলতে হবে? আমি তো আর অন্যায় কিছু করতে যাচ্ছি না। সব সময় এত পারমিশন নিতে পারব না।
প্রতিবারই কেন গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে হবে? ঈদের সময় কী একটা পরিস্থিতি হয় রাস্তার, এর মধ্যেও যেতেই হবে। কী ফালতু একটা পারিবারিক নিয়ম!
• শ্বশুরবাড়ির ফ্যামিলি মিটিংয়ে ছেলে-মেয়ে ছাড়া কোনো বেটার বউ থাকতে পারবে না। এটা কোন ধরনের সিস্টেম? ছেলের বউরা তো ফ্যামিলিরই সদস্য। বাড়ির বাইরের কেউ তো না।
পারিবারিক নিয়ম সম্পর্কে অনেক বউ-মা এভাবে মন্তব্য করেন। শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকার সময় যেমন এ সমস্ত নিয়ম থেকে আপনি বের হয়ে আসতে পারেন না, তেমনি একক পরিবারে থাকার সময়ও আপনি পারিবারিক নিয়মগুলো অবহেলা করতে পারেন না।
যাই হোক, আপনার আশেপাশেই এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে তাকালেই এই ধরনের কিছু ছোটখাটো নিয়ম চোখে পড়বে। এই পারিবারিক নিয়মগুলো সকলের খুব যত্নের, পরিবারের সদস্যরা এগুলোর প্রতি একধরনের মায়া বা দুর্বলতা অনুভব করে।
এখন পরিবারে নতুন বউ আসার পরে সে যদি এসব নিয়ম মানতে না চায় বা নিয়মগুলোর প্রতি অবহেলা দেখায়, তার অবহেলাপূর্ণ আচরণ পরিবারের সবার মনেই কষ্ট দেয়। মোটামুটি সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারগুলোতে এসব আচরণের ফলে মনকষাকষি খুব বেশি হয়।
আর বউ-মা এ ধরনের বিষয়গুলোকে পরাধীনতা মনে করে। মনে মনে ভাবে, বিয়ে-শ্বশুরবাড়ি তার সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। সে এখন আর আগের মতো যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে না। অনেক বউ-মা আক্ষেপ করে বলেন, এখানে ব্যক্তি-স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আগে কি সে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারত? আমরা নিজেদের স্বাধীন বলে যে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করি, আসলে আমরা কতটুকু স্বাধীন?
ধরুন, আপনার ইচ্ছা হলো রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটতে বা খোলা আকাশের নিচে সবুজ মাঠ চিরে চলে যাওয়া রেললাইনের ওপর বসে থাকতে। পারবেন না। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়েও আপনি তা পারবেন না। বাক-স্বাধীনতা আছে বলেই আপনি যখন যাকে ইচ্ছা যা খুশি তা-ই বলতে পারবেন না।
এই আপনি যখন ছাত্রী ছিলেন তখন মাদরাসা বা স্কুলের নিয়ম মানাকে পরাধীনতা মনে করতেন না, নিয়মানুবর্তিতা মনে করতেন। প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরে যেতেন, যা খুশি তা-ই পরে যেতেন না। আবার বান্ধবীদের গেট-টুগেদারে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সবাই একই রঙের শাড়ি পরবে, আপনি তখন নিজের শাড়ি না থাকলে অন্যের শাড়ি ধার করে হলেও পরেন। এটা কি পরাধীনতা? তখন মনে হয় না যে, বান্ধবীরা আপনার স্বাধীনতা নষ্ট করছে।
আপনার নিজের স্বাধীনতাগুলো উপভোগ করার জন্যই আপনি বিভিন্ন পরাধীনতাকে মেনে নেন, তাই না? তেমনি শ্বশুরবাড়ির নতুন পারিবারিক নিয়মগুলো এ রকমই। কিছু ভালো লাগবে কিছু ভালো লাগবে না। তারপরও নিজের ভালো থাকার জন্য এই নিয়মগুলো একটু আগে-পরে করে মেনে নিতে হবে।
আপনি হয়তো শ্বশুরবাড়িতে অনেক বড় বড় অবদান রাখছেন। কিন্তু আপনার এই ছোট ছোট অনীহা হয়তো বড় অবদানগুলোকে মাটি করে দিতে পারে। মাঝে মাঝে এমন হয়, কিছু বড় বড় সিদ্ধান্তে ছাড় পাওয়া গেলেও কিছু ছোট ছোট ক্ষেত্রে পরাধীনতা থেকেই যায়। এটাই স্বাভাবিক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00