📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 অমুক ভাবির এটা আছে, অমুক ভাবির ওটা নেই

📄 অমুক ভাবির এটা আছে, অমুক ভাবির ওটা নেই


৭. অমুক ভাবির এটা আছে, অমুক ভাবির এটা নেই
বিয়ের পর অনেকের মধ্যে কিছু কিছু চাহিদা প্রবল হয়ে ওঠে! অমুক ভাবির বাসায় গিয়েছিলাম, তাদের অমুক জিনিসটা আছে, আমার ওইটা লাগবে। এটা ছাড়া আমার চলবেই না, সেটা আমার চাই। তাদের সেই জিনিসটা আছে, আর আমার থাকবে না তা কি হয়!
আবার অমুক ভাবির এই জিনিসটা নেই, তার মানে এই জিনিসটা আমার লাগবে। এই জিনিস যদি আমার থাকে, তাহলে আমি ভাবির চেয়ে এগিয়ে যাব। আরেকজনের থেকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার এটা একটা সহজ পথ—তার যা নেই তা আমার থাকতে হবে! চিন্তা করা যায় কী অসুস্থ প্রতিযোগিতা!
বলুন তো, বিভিন্ন জিনিসের প্রতি চাহিদা তৈরির পেছনের কারণ কী—লোক-দেখানো, রুচিশীল প্রয়োজন নাকি অসুস্থ প্রতিযোগিতা? কী কারণে আমরা কোনো জিনিস কিনি? আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তালিকা কি অন্য ভাবির 'জিনিসপত্র' নির্ধারণ করে দিচ্ছে?
অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, এই ধরনের চাহিদা পূরণ না হলেও আমাদের ভীষণ মন খারাপ হয়, নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, সংসারের কোনো কাজে মন বসে না, আরও কত কী!
অনেকেই নতুন সংসার শুরু করার পর যা যা প্রয়োজন সেটা অন্যান্য ভাবিদের হাতে ছেড়ে দেন! মাপকাঠি বানান ভাবিদের জিনিসপত্রকে! নিজের রুচিবোধ, ব্যক্তিত্ব, আয়, প্রয়োজন ইত্যাদিকে সামনে রেখে চাহিদা বা পছন্দ নির্ধারণ করছি কি না? আপনি পরামর্শ নিতে পারেন, তাই বলে ওই রঙের, ওই ব্র্যান্ডের, ওই জিনিসই আপনার লাগবে! এসব কি প্রতিযোগিতা করার মতো কোনো বস্তু? জুলুম হয়ে যায় না?

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 বাচ্চার দেখাশোনার জন্য শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা

📄 বাচ্চার দেখাশোনার জন্য শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা


৮. বাচ্চার দেখাশোনার জন্য শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা
অনেকেরই আফসোস, আমার শাশুড়ি যদি আমার ছেলেমেয়েদের একটু দেখত, তাহলে ক্যারিয়ারটা আমার এমন হতো না!
সংসারের কাজের চাপে বাচ্চার খাওয়ানোর সুযোগ পাচ্ছি না, একটু খাইয়ে দেবে না!
অনেকে আবার শাশুড়ির কাছে বাচ্চা রেখে নিজের কাজে যান। ফিরে এসে যখন দেখেন, বাচ্চার যত্নে কোনো কমবেশি হয়েছে, তখন রাগে বিরক্তিতে গজগজ করতে থাকেন।
আপনার বাচ্চা পালনের দায়িত্ব কি আপনার শাশুড়ির?
উনার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, উনি তো সবকিছু করেই এ পর্যায়ে এসেছেন; বরং উনার পরিমিত বিশ্রাম হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে আপনার খেয়াল রাখা উচিত। উনারা সুস্থ থাকলে আপনারই মঙ্গল।
আপনি এখন আছেন আপনার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়ে। এ সময়ে বাচ্চা সামলানো, সংসার, আত্মীয়-স্বজন, ব্যক্তিগত কাজকর্ম সবকিছু সমানতালে এগিয়ে নেয়া আপনার জন্য কোনো ব্যাপারই না। কেন মনে করছেন আপনার শাশুড়ি সাহায্য না করলে আপনি সামনে এগোতে পারবেন না? সব মানুষ তো এক রকম না!
ঠিক, আশেপাশে মানুষের সাহায্য-সহায়তা থাকলে কাজ করা সহজ হয়। কিন্তু এসব সহায়তা না থাকলে আপনি দমে যাবেন? আপনি কি আপনার স্বপ্ন পূরণে অন্যের মুখাপেক্ষী?

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 বাবার বাড়ির গল্পে মুখরিত থাকা

📄 বাবার বাড়ির গল্পে মুখরিত থাকা


৯. বাবার বাড়ির গল্পে মুখরিত থাকা
বাবার বাড়ি নিয়ে মুখরিত বউ-মাদের কয়েকটা ক্যাটাগরি দেখা যায়:
বাবার বাড়ির অতীত ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ এবং তারা এ কারণে গর্বিত, আত্মতৃপ্ত, কিছুটা অহংকারী।
আরেক ক্যাটাগরি, তাদের বাবার বাড়ির অতীতটা ততও সমৃদ্ধ না, কিন্তু ভবিষ্যতে হবে সেই দিবা-স্বপ্ন দেখেই আত্মতৃপ্ত ও অহংকারী।
আরেক ক্যাটাগরি, অতীত যেমনই হোক তাদের বাবার বাড়ির বর্তমান অবস্থা ভালো, ভাই-বোন, মা-বাবা পরিশ্রমী এবং সেই গর্বেই বোন আত্মতৃপ্ত, অহংকারী।
আরেক ক্যাটাগরি, এত ভাবাভাবি বোঝাবুঝির সময় নেই, যা বলতে ইচ্ছা করছে বলছি, জানি তাই বলছি! অহংকার করছি নাকি তৃপ্তি পাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না! যেহেতু বাবার বাড়িতে এতদিন থেকেছি, এ সম্পর্কে অনেক কিছু জানি, এ নিয়ে একটু বেশিই বলছি! অনেকে তো আছে, শ্বশুরবাড়িতে এসে তার বাবার বাড়ির মানুষদের সম্পর্কে জানানোর জন্য প্রায় প্রতিটা প্যারাতেই বাবার বাড়ি সম্পর্কে দু-একটা বাক্য বলেন।
ভাবিদের আড্ডায়, গল্পে বাবার বাড়ির গুণগানে মুখরিত থাকে! যাদের কথাবার্তায় বারবার আমি আমার আমাদের এই শব্দগুলো আসে; যারা নিজেদের নিয়ে অতিমাত্রায় তৃপ্ত, তাদের অধিকাংশই সাধারণত অহংকারী, কিছু অংশ নির্বোধ টাইপেরও হয়। কথার মধ্যে বারবার ভেসে আসে, আমার বাবার প্রভাব এত, আমার ভাইয়েরা এই, আমার স্ট্যাটাস ওই, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সত্যি কি জানেন, আপনার গল্প কে শুনতে চায়? কেউ তো অন্যের গল্প শুনতে চায় না। আগ বাড়িয়ে নিজের গুণকীর্তন করে অন্যের বিরক্তির কারণ কেন হবেন? জমিনের চারাগাছ যখন মহিরুহে পরিণত হয়, লোকে আপনি তা দেখতে পায়।
বাবার বাড়ির ঐতিহ্য, বংশের গৌরব গল্প করে বলতে যাবেন কেন? বংশীয় বাড়ির মেয়ের মতো দেখিয়ে দিন-শৃঙ্খলা আর ভালো অভ্যাস কীভাবে আপনার পূর্বপুরুষকে সমৃদ্ধ করেছে। যেসব কাজ আপনাদের অতীতকে সফল করেছে, তা দৃঢ়তা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে আপনিও বয়ে বেড়াচ্ছেন, তা দেখিয়ে দিন।
হিসেবে খাতা খুলে চোখ বড় বড় করে আরেকবার তাকিয়ে দেখা যাক— অতীতের সফলতার গল্প আপনাকে ধোয়াচ্ছন্ন করে ফেলেছে কি না? ব্যর্থতার কারণ আপনার সাফল্য না তো?

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা

📄 সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা


১০. সংসার ও ব্যক্তিগত কাজের মাঝে গুরুত্ব নির্ণয় করতে না পারা
বাচ্চার হাতেখড়ি শেখার জন্য বাসার কাছে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছিলাম। বিকেল ঠিক না, দুপুরের পর সাড়ে তিনটার দিকে ওদের নিয়ে যেতাম। বেশ কয়েকটা বাচ্চা মায়েদের হাত ধরে পড়তে আসত। ওদের সাথে আরও দুইটা বাচ্চা পড়ত। ওদের দাদি ওদের কোচিংয়ে আনা-নেয়া করত। উনার বয়স ৬০ থেকে ৬৫ হবে। কোনো একদিন উনাকে বলেছিলাম, নাতি-নাতনিদের আপনি অনেক আদর করেন, দুপুরের পর বিশ্রাম না নিয়ে প্রতিদিন ওদের নিয়ে আসেন।
সাধারণত দাদা-দাদি বা নানা-নানি যদি নাতি-নাতনিদের স্কুলে নিয়ে যায় আর কেউ তাদের কেয়ারিং grandparents হিসেবে বাহবা দেয়, তবে উনারা খুব খুশি হন, চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক দেয়, এরপর পাঁচ থেকে দশ মিনিট ধরে নাতির গুণগান বা দুষ্টুমির বর্ণনা দেন। কিন্তু উনি বড় এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, আর আরাম! দেড় বছর থেকে ওদের সব দেখাশোনাই তো আমি করি। ওর মা গেছে পিএইচডি করতে বেলজিয়ামে। এক বছর পর ১৫ দিনের জন্য একবার এসেছিল। আবার কবে আসবে জানি না। তবে প্রতিদিন ওর মা বাচ্চাদের সাথে কথা বলে। এদিকে ওর বাবার ট্রান্সফার হয়েছে অন্য এক জেলায়। প্রতিসপ্তাহে এক দিনের ছুটিতে আসে ঢাকায়। ছুটি শেষ হলে আবার চলে যায়। আমি আর এদের কোথায় ফেলে যাব।
ওইদিন কথা ওই পর্যন্তই।
আরও দেড় বছর আমার বাচ্চা ওই কোচিংয়ে পড়েছিল, ওই বাচ্চাগুলোও পড়ত। শেষের দিকে শুনেছিলাম সংসারটা আর টেকেনি।
আমার এক আত্মীয় আছেন। অনেক আমল করেন। ফজরের পর থেকে কোনো দিকে না তাকিয়ে সারা দিনের সমস্ত নফল আমল শেষ করে সকাল সাড়ে আটটা-নয়টার দিকে ওঠেন। উনার ছোট ছোট বাচ্চা আছে, স্বামী অফিসে চলে যান আটটায়। প্রায় দিনে বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বাঁধে এই নিয়ে যে, স্বামী বলে, কুরআন তিলাওয়াতটা আমি অফিসে চলে গেলেও করতে পারো, নাস্তা গুছিয়ে রেখে ফ্রি হয়ে আমলে বসতে পারো। স্ত্রী বলে, কেমন মানুষ তুমি! কুরআন তিলাওয়াতের মতো নেক আমল করতে বাধা দাও! দ্বীন আগে না দুনিয়া আগে?
দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্যই আমি আমার ক্যারিয়ারের একবিন্দু কম্প্রোমাইজ করব না। এই তুচ্ছ সংসারের জন্য আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করব—হতেই পারে না। সংসার ছাড়তে পারব, চাকরি ছাড়তে পারব না।
আসলে কি, গুরুত্বের দিক দিয়ে কাজকে ভাগ করা— কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে কোনটি আগে করব আর কোনটি পরে করব সেই সিদ্ধান্ত নেয়া খুব জরুরি একটি বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও পরিবারের মাঝে সুসংঘটিত সমন্বয় না করা বিবাহিতার একটি ভুল।
ব্যক্তিগত উন্নয়নের দিকে নজর দেয়া হয় সাধারণত পরিবারকে উন্নত করার জন্য। পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়; কারণ তারা পরিবারের মাঝে পারিবারিক ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে পারে। একার শক্তি সব সময়ই নাজুক। একা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। নিজেকে কেন একা রাখবেন? আর দিনশেষে আপনি একা থাকতেও পারবেন না। আপনার মানুষ লাগবে, মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক লাগবে।
যখন আপনার আরেকটু বয়স হবে, তখন যে জিনিসটি আপনাকে সবচেয়ে খুশি রাখবে তা হলো, মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক। আপনি একা থাকতে পারেন কি না, একা থাকা সুখের কি না! চিন্তা করুন। একা একা এগিয়ে যাবেন নাকি সবাইকে নিয়ে একসাথে এগোবেন?
দেখুন, আপনার ব্যক্তিগত উন্নয়নের হেতু যদি পরিবারকেই বোঝাতে না পারেন, তবে কাকে বোঝাতে পারবেন? যদিও সবাই বুঝবে না, অনেকে বুঝলেও মুখে স্বীকার করবে না। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা তো করতে হবে।
পরিবারকে ছেড়ে ব্যক্তিগত উন্নয়নের পেছনে না পড়ে বরং পরিবারকে সাথে নিয়ে সবাই একসাথে উন্নত হওয়া যায় কি না?
সময় বা পরিস্থিতিসাপেক্ষে কাজের গুরুত্ব যে পরিবর্তন হয়, তা বুঝতে না পারা আমাদের একটা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00