📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 দায়িত্বশীল না হয়ে অধিকার আদায়ের পেছনে ছোটা

📄 দায়িত্বশীল না হয়ে অধিকার আদায়ের পেছনে ছোটা


- আমি এই বাড়ির ছেলের বউ, ভবিষ্যতের কর্ত্রী। এটা আমার প্রাপ্য আমার অধিকার। প্রথম দিন থেকেই এই অধিকার আমাকে আদায় করে নিতে হবে! যা করার প্রথম থেকেই শুরু করতে হবে।
- আমার বাবা অমুক, আমার ভাই অমুক আর আমি শ্বশুরবাড়িতে এসে কাজ করব!
- আমি এই বাড়ির একজন সদস্য, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমার একটা জায়গা অবশ্যই থাকতে হবে।
- আমার মর্যাদা আমাকেই আদায় করে নিতে হবে। যত ছাড় দেব ততই সবাই পেয়ে বসবে! এ বাড়িতে পা দিয়েই আমার বোঝা হয়ে গেছে, কীভাবে কাকে বাগে আনতে হয়!
শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না-দিতেই কিছু কিছু বিবাহিতার মনের মধ্যে এসব ভুলভাল চাহিদা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ চাহিদাগুলোর উৎপত্তি যে শুধু বিবাহিতার চিন্তার মাধ্যমেই ঘটে তা না; বরং তৃতীয় পক্ষও বড় একটি ইন্ধন জোগায়।
নিঃসন্দেহে এটা বিবাহিতার চিন্তার একটি ভুল ধারা। শ্বশুরবাড়ি এসে অধিকার আদায়ে খুব বেশি তাড়াহুড়া করলেই কি তাড়াতাড়ি এই অধিকার পাওয়া যায়? অধিকার তো এভাবে আসে না।
আপনার শ্বশুরবাড়ির সমস্ত জিনিসপত্রের ওপর সে বাড়ির সদস্যদের একটা অধিকার আছে। এ অধিকার তারাও দুয়েকদিনে পায়নি। আপনি এ বাড়িতে যেখানে যা কিছু দেখছেন কোনো কিছু কিন্তু দুয়েকদিনে হয়ে যায়নি। এ-বাড়ির মানুষগুলোর অনেক চেষ্টা-মেহনত এর সাথে জড়িয়ে আছে। এই চেষ্টা-মেহনতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বাড়ির সদস্যদের অধিকার। যে বেশি দায়িত্ব নিয়েছে, সে বেশি অধিকার পেয়েছে। দায়িত্বশীল না হয়ে অধিকার আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা বিবাহিতার বড় একটি ভুল।
দেখুন, আপনার আশেপাশে এমন অনেকেই আছে, সংসারে তার কী প্রাপ্য, কোন কোন জিনিস থেকে তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে শতভাগ তার জানা; কিন্তু কী কী দায়িত্ব তার আছে সে সম্পর্কে জ্ঞান খুব ভাসাভাসা। এমনকি সংসার ভাঙ্গার ঘটনাগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়ের অভিযোগ ‘তার অধিকার আদায় করা হচ্ছে না!’ এদিকে আমাদের দেশের নারীবাদী সংগঠনগুলোও নারী-অধিকার নিয়ে যতটা সোচ্চার, দায়িত্ব নিয়ে ততটা নয়।
ধরুন, আপনার ঘরের কাজে সাহায্যর জন্য আপনি একজন মানুষ রাখলেন। সেই কাজের মেয়েটা এসে কথায় কথায় বলে, অমুক ফ্ল্যাটের বুয়া এই এই সুবিধা পায়, ওই এলাকার কাজের বুয়াদের সবাই খুব সমীহ করে, অমুক আপা বেশি বেতন দেয়, অমুক বাড়িতে ছুঁদে অনেক বকশিস পাওয়া যায়। তাহলে আপনার কেমন লাগবে? হয়তো তাকে সতর্ক করে বলবেন কথা কম বলে তোমার যা কাজ আছে সেটা ভালো করে করো। অনেকে বিরক্ত হয়ে এমন কাজের মানুষ বাদ দিয়ে দেবেন। ঠিক কি না? অতিরিক্ত অধিকার সচেতনতা আমাদের কারোরই ভালো লাগে না।
আর আসলে আপনার অধিকার নিয়ে কে ভাবে? আপনি যত দায়িত্ব পালন করবেন, তত বেশি অধিকার আদায়ের জগতে প্রবেশ করবেন—এটা সত্যি।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 আগে জানলে কখনো বিয়েই করতাম না

📄 আগে জানলে কখনো বিয়েই করতাম না


বউ নতুন হোক বা পুরোনো হোক, অনেক বউ-মার মুখেই শোনা যায়—‘বিয়ে-শাদিতে এত সমস্যা! আমি বলি এই সংসার করে গেলাম, অন্য কেউ হলে কবে ছেড়ে-ছুঁড়ে চলে যেত!’
বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনেকে অভাবে বলেন, ‘আগে জানলে সংসারই করতাম না।’
না! আমি আর এদের থেকে কোনো কিছু আশা করি না! এদের কোনো পরিবর্তন হবে না! বিয়ে যখন হয়ে গেছে কিছু তো আর করার নেই, থাক, যেমন চলছে চলুক!'
এই আপনাকেই যদি বলা হয়—এভাবে থাকার দরকার কী? চলে যান। তখন অনেকেই আবার বলেন, চলে যাওয়া কি মুখের কথা? সংসার ভাঙা কি এতই সহজ?
ধরুন, আপনি সব ছেড়ে-ছুড়ে স্বাধীন হয়ে গেলেন। এখন কি আপনার কোনো সমস্যা থাকবে না? আপনাকে যদি হিসাব করতে বলা হয়, বিয়েটা হয়ে ভালো হয়েছে, নাকি না হলে ভালো হতো? তাহলে আপনি হিসাব করে কী পান?
যদি আপনার হিসাব বলে, বিয়ে করে কিছুটা হলেও ভালো হয়েছে, তবে কেন বারবার মুখে বলেন—আগে জানলে বিয়েই করতাম না?
আর যদি আপনার হিসাব বলে, বিয়ে করে ভীষণ ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে, তবে ভিন্ন পদক্ষেপ না নিয়ে কেন নিজেকে ক্ষতির সম্মুখীন করছেন?
অনেকে এমন আছেন, যারা জানেন-বোঝেন, বিয়ের পরে তারা তুলনামূলক ভালো আছেন; তারপরও তাদের মুখ বিয়ে সম্পর্কিত হতাশা, নেতিবাচক কথাবার্তা আর অভিযোগে সিক্ত থাকে। এসবে লাভ কী, পরিবেশ উত্তপ্ত হওয়া ছাড়া? আপনার এ ধরনের কথাবার্তা যদি আপনার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন শোনে, তখন তাদের কতটুকু ভালো লাগবে? এতে আপনার প্রতি তাদের মহব্বত বাড়বে না কমবে?
তবে হ্যাঁ, বিয়ের পর থেকে নিত্য-নতুন হরেক রকমের সমস্যা একেকজনের জীবনে আসে। আজ এক সমস্যার সমাধান হয়, কাল আরেক সমস্যার সূত্রপাত হয়। এটাই কি স্বাভাবিক না? সমস্যা আসলে সমাধান করতে হবে, এক পথে সমাধান না হলে আরেক পথ খুঁজতে হবে। সমাধান আসবে না মনে করা বা সমাধান আসবে না ভেবে সমাধানের সমস্ত পথকে সিসা ঢেলে বন্ধ করে দেয়া কতটুকু উপকারী? সমস্যা দেখলে হতাশার কথাবার্তা যারা বেশি বলে, তাদের জন্য সমাধান টেনে বের করা কঠিন হয়ে যায়।
বিবাহিত নারীদের সংসারে এ ধরনের হাল ছাড়া কিসিমের কথাবার্তা খুব একটা উপকার বয়ে আনে না। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন না?
কুরআনের একটি সূরার নাম সূরা লাইল। লাইল মানে রাত। এটি কুরআনের ৯২ নম্বর সূরা। এর পরের সূরার নাম সূরা দুহা। দুহা মানে পূর্বাহ্ন-দিন। এটি কুরআনের ৯৩ নম্বর সূরা। এর সহজ অর্থ হলো রাতের পরই দিন। হ্যাঁ, রাত যত গভীর হয়, প্রভাত তত কাছে। যার পেছনে যত অন্ধকার, তার সামনে তত আলো। এ তো গেল তাত্ত্বিক কথাবার্তা। কুরআনে দুঃখের পরই সুখের উল্লেখ রয়েছে। রয়েছে কঠিন পথের শেষে সহজ-সুন্দরের বার্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا )
‘নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।”¹ রাতের অন্ধকার পেরিয়ে প্রভাতেই রক্তিম সূর্যোদয় হয়। এমন কোন রাত আছে, যে রাতের পর সুপ্রভাত হয়নি? মহান মালিকের সতর্কবাণী : قَالُوا لَا تَوْجَلْ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلِمٍ عَلِيمٍ قَالَ أَبَشِّرْ تُمُونِي عَلَى أَنْ مَسَّنِيَ الْكِبَرُ فَبِمَ تُبَشِّرُونَ قَالُوا بَشَّرْنَكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَكُنْ مِّنَ الْقُنِطِينَ قَالَ وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَّحْمَةِ رَبِّةٍ إِلَّا الضَّالُوْنَ )
‘তারা (ফেরেশতারা ইবরাহীম আ.-কে) বলল, ভয় করবেন না। আমরা আপনাকে একজন জ্ঞানবান পুত্র-সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি। তিনি বললেন, তোমরা কি আমাকে এমতাবস্থায় সুসংবাদ দিচ্ছ, যখন আমি বার্ধক্যে পৌঁছে গেছি? তারা বলল, আমরা আপনাকে সত্য সুসংবাদ দিচ্ছি! অতএব আপনি নিরাশ হবেন না। তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?’²
হযরত ইয়াকুব আ. দীর্ঘ অপেক্ষার পরও আশাবাদী ছিলেন। সে আশার বাণী কুরআনে বিবৃত হয়েছে। তিনি তাঁর সন্তানদের বলেছেন,

টিকাঃ
১. সূরা ইনশিরাহ, (৯৪): ৫-৬
২. সূরা হিজর, (১৫): ৫৩-৫৬

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 দোষারধির খেলা

📄 দোষারধির খেলা


بَنِى اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِنْ يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَايْتَسُوا مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَا يْنَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكُفِرُونَ
'হে আমার সন্তানেরা, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করো। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহর রহমত থেকে তো অবিশ্বাসী কাফের ছাড়া অন্য কেউ নিরাশ হতে পারে না।'³
৩. দোষ ধরাধরি খেলা ও খারাপ, অমুক খারাপ, তমুক খারাপ!
চারিদিকে সবাই যদি খারাপ হয়ে যায় তাহলেই তো আমি সেরা হয়ে গেলাম! সেরা হবার জন্য যা যা লাগে তা আমার মাঝে থাকুক বা না থাকুক, তাতে কী আসে যায়!
সংসারে নিজেকে ভালো প্রমাণ করার জন্য অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোকে সহজ উপায় মনে করাও অন্যতম একটা ভুল।
সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া শুধু শুধু ধারণার বশে কাউকে খারাপ মনে করা, খারাপ বলে দেয়া বা দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কাজ। পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলাও বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّnِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা অতিরিক্ত ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু ধারণা গোনাহ। এবং (অন্যের) গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।⁴
ইমাম কুরতুবী রহ. উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বেশকিছু হাদীস উল্লেখ করেছেন। যার কয়েকটি নিম্নরূপ:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ، وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ، لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ، وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ، فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعُ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ
'হে লোকসকল, যারা (অন্তত) মুখে হলেও ঈমান কবুল করেছ, অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি, তোমাদের বলছি শোনো, তোমরা মুসলমানদের গীবত কোরো না এবং তাদের দোষ অনুসন্ধান কোরো না। কেননা যে ব্যক্তি মুসলমানের দোষ অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করেন। আর আল্লাহ যার দোষ প্রকাশ করতে চান, তাকে নিজ গৃহেও লাঞ্ছিত করে দেন।⁵
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ، وَلَا تَحَسَّسُوا، وَلَا تَجَسَّسُوا، وَلَا تَنَاجَشُوا، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
'তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থেকো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারও দোষ অনুসন্ধান কোরো না, গোয়েন্দাগিরি কোরো না, একে অন্যকে ধোঁকা দিয়ো না, পরস্পর হিংসা কোরো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ কোরো না; বরং সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই-ভাই হয়ে থেকো।⁶
ওপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, إِنَّ الْأَمِيرَ إِذَا ابْتَغَى الرِّيبَةَ فِي النَّاسِ أَفْسَدَهُمْ 'বাদশাহ যদি প্রজাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়, তবে তো সে তাদের ধ্বংস করে ছাড়বে।'⁷
একবার রাতে হযরত উমর রাযি. ও হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. বের হলেন। তারা দেখতে পান, একটি গৃহে আলো দেখা যায়। তারা প্রবেশের অনুমতি চাইলে অনুমতি দেয়া হয়। অতঃপর তারা দেখতে পান, একজন পুরুষ ও একজন নারী গান গাচ্ছে। পুরুষের হাতে একটি পেয়ালা। হযরত উমর রাযি. বলেন, 'তুমি এরূপ করছ? লোকটি বলল, আপনি এরূপ করছেন, হে আমিরুল মুমিনিন! উমর রাযি. আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'এ মহিলাটি কে?' লোকটি বলল, আমার স্ত্রী। তারপর উমর রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কিসের পেয়ালা?' লোকটি বলল, পানির। হযরত উমর রাযি. মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কী গান গাইছিলে?' মহিলাটি তিনটি কবিতা আবৃত্তি করল।
তারপর লোকটি বলল, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'দোষ খোঁজ কোরো না।' হযরত উমর রাযি. বললেন, 'তুমি সত্য বলেছ।' হযরত উমর রাযি. নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ হয়ে যান।⁸
তাহলে দেখা যাচ্ছে, হযরত উমর রাযি.-এর মতো একজন খলীফার জন্যও দোষত্রুটি খোঁজা শোভনীয় নয়।
অন্যের দোষ ধরতে থাকলে সমস্যা যেটা বেশি হয় তা হলো-নিজেকে সুন্দর করার মানসিকতাটা নষ্ট হয়ে যায়। সাথে সাথে নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধির চিন্তা করার শক্তিটাও চলে যায়। অন্যকে ছোট করা 'বড়' হওয়ার কোনো উপায় না। মনে করি, একই সমান তিনটি গাছ আছে।

টিকাঃ
৩. সূরা ইউসুফ, (১২) : ৮৭
৪. সূরা হুজরাত, (৪৯): ১২
৫. তাফসীরু কুরতুবী, ১৬/৩৩৩; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৮৮০। সহীহ লিগায়রিহি।
৬. তাফসীরু কুরতুবী, ১৬/৩৩১; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০৬৬
৭. তাফসীরু কুরতুবী, ১৬/৩৩৩; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৮৮৯। হাসান।
৮. তাফসীরু কুরতুবী, ১৬/৩৩৪; মুসতাদরাকু হাকিম, হাদীস নং ৮১৩৬। ইমাম হাকিমের সনদ সহীহ।

📘 অন্দরমহল বউ শাশুড়ির সম্পর্কের সমীকরণ > 📄 চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেয়েছেন?

📄 চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেয়েছেন?


দুইটি গাছের অর্ধেক কেটে ফেললে একটি গাছকে উঁচু দেখাবে। অনুরূপভাবে, অনেকে মনে করে, আশেপাশের মানুষের দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তাদের ছোট করতে পারলেই আমি বড় হয়ে যাব।
নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যোগ্যতা, অবদান, কথা ও কাজকে সুন্দর করার পরিবর্তে অন্যকে ছোট করা, অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো সত্যিই বিবাহিতার বড় একটি ভুল।
৪. চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেয়েছেন?
এক গৃহস্থের সমস্ত বাসনপত্র চোর চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। চোরের ওপর রাগ করে সেই গৃহস্থ সিদ্ধান্ত নিল যে, আর কোনোদিন বাসনপত্রই কিনবে না, বাকি জীবন মাটিতেই ভাত খাবে। গৃহস্থের এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা কেমন হলো? ওই গৃহস্থের মতো আমরাও অনেকেই এভাবে মাটিতে ভাত খাই।
আমার এক আত্মীয়ের ছোট্ট একটি ঘটনা শেয়ার করতে চাই। এটা অনেক আগের কথা। ওই আত্মীয়ের নতুন বিয়ে হয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত চমৎকার একটা রীতি আছে—নতুন বিয়ের পর পরিচিত কাছের মানুষেরা দাওয়াত করে নবদম্পতিকে খাওয়ায়, অভ্যর্থনা জানায়।
তেমনি কোনো এক দাওয়াতে যাওয়ার জন্য সেই আত্মীয় বা নতুন বউ নিজেকে তৈরি করছিলেন, চুল বাঁধছিলেন। এমন সময় শাশুড়ি মুখ বাঁকিয়ে নতুন বউকে বলেছিলেন, ‘যে না চুলের শ্রী তার ওপর আবার বেণি করা!’ এ কথা শোনার পর থেকে ওই বউ-মা পণ করেছিলেন—‘জীবনে কোনো দিন আর পরিপাটি হবেন না, এলোমেলো অগোছালো হয়ে থাকবেন!’
সেই শাশুড়ি-মা হয়তো বছর পরে সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বউ-মা সারাজীবন কষ্টের এই অনুভূতিটুকু লালন করে গিয়েছেন সযত্নে। নতুন বউ-মাও বার্ধক্যে উপনীত হয়ে অনেকদিন হলো দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু কোনোদিন আর নিজেকে পরিপাটি করেননি।
আপনি আপনার আশেপাশে এমন অনেককে হয়তো দেখতে পাবেন, যারা একজনের কাছ থেকে কষ্ট পেয়ে সেটাকে ভেতরে পেলে-পুষে বড় করছেন, রাতের ঘুম নষ্ট করছেন। ওদিকে কষ্টদাতা দিব্যি বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আপনাকে জাগিয়ে রেখে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।
আবার অনেকে তো এমন আছে, আরেকজনের কথায় কষ্ট পেয়ে দীর্ঘদিনের ভালো অভ্যাস ছেড়ে দেয়; এমনকি নেক আমলও ছেড়ে দেয়, যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অপরাধ।
মনে করুন, বউ-মার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখল, সেখানে কেউ বারোটা-একটার আগে ঘুমায় না। সে আস্তে আস্তে সুযোগমতো তার ভালো অভ্যাসটাকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে, সারাজীবনের জন্য ভালো অভ্যাসটাকে কবর দিয়ে দিল। এটা আসলে তার জন্য কতটুকু উপকারী হলো? হয়তো কিছু ডানে-বামে করা লাগতে পারে। আজ না হয় কাল, এদিক-সেদিক করে হলেও ভালো অভ্যাসটাকে তো জিইয়ে রাখতে হবে। নয়তো আপনার মনের এই ক্ষোভ তো আপনাকেই জ্বালিয়ে মারবে। বারবার আফসোস হবে, ইস! আগে আমি এমন করতাম, ওই আমল করতাম, কিন্তু এখন আর কিছুই করি না।
আবার ধরুন, নতুন বউ-মার ইশরাকের নামাজ পড়ার অভ্যাস আছে। এ কারণে তাকে কেউ একজন খোঁটা দিয়ে বলল, নামাজ-কালাম বোধ হয় আমরা কিছুই করি না, সংসার আগে না ধর্ম আগে! এসব শুনে বউ-মা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—আর কোনোদিন এখানে নফল নামাজই পড়ব না!
হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'অহংকার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তার শিকড় মজবুত হয়ে যায়, তখন মানুষ আল্লাহ তাআলার সাথে অহংকার করতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, হয়তো সে অনুনয়-বিনয়ের সাথে দুআ করছিল, কান্নার ভান করে কাঁদছিল, হঠাৎ সামনে কোনো ব্যক্তি এসে গেল; ফলে সে কান্নাকাটি ছেড়ে দিল। যাতে ওই ব্যক্তির সামনে অসম্মান না হয়। এটা আল্লাহর সাথে অহংকার। কেননা সে অন্য মানুষের সামনে আল্লাহর জন্য অনুনয়-বিনয়, কাকুতি-মিনতি করতে অসম্মান বোধ করে। অতএব, মাখলুকের জন্য কোনো আমল বা ইবাদত ছেড়ে দেয়াটাও এক প্রকার অহংকার।”⁹
একটু নিরপেক্ষভাবে ভাবুন তো, আপনার সব আবেগ-অনুভূতির তালা-চাবি আপনার কাছেই থাকা উচিত না? নাকি বাইরের লোকজন আপনার আবেগ- অনুভূতিকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে আপনি সেভাবেই নিয়ন্ত্রিত হবেন? আপনি কি পুতুল-নাচের পুতুল? অপরের আজেবাজে কথা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের সর্বনাশ করা কি বড় একটি অপরাধ না?
আমরা ছোট্ট একটি জীবনীশক্তি নিয়ে দুনিয়াতে আসি। প্রতিশোধের ভুলভাল সংজ্ঞা বুঝে জীবনের অসীম শক্তিকে নিঃশেষ করলে কার ক্ষতি? এতে কার সম্ভাবনা নষ্ট হয়?
দয়া করে চোরের ওপর রাগ করে চোর ধরার চেষ্টা করুন। চোর যাতে কখনো আপনার কিছু না নিয়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করুন।

টিকাঃ
৯. ইসলাহী মাজালিস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00