📄 উপদেশ - উপদেশ নাকি সম্পদ
অষ্টম পদক্ষেপ
উপদেশ
মাঝে মাঝে মানুষ হীনম্মন্যতার অভিযোগ করে। অতঃপর বন্ধুর কাছ থেকে উত্তম কথার সঙ্গ পেলে তার আশা প্রাণ ফিরে পায়। সংকল্পের বীজ থেকে নতুনভাবে চারা গজায়। এই কাজটা হয় বক্তব্য, দরস কিংবা উপদেশের কল্যাণে। সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে আপনি যদি এধরনের নসিহত তালাশে ব্রতী হোন।
আপনার হীনম্মন্যতা তীব্র হলে অলসতার বাতাস আপনার গায়ে লাগবেই।
তখন আপনি বন্ধুর কাছে যান। তার সাথে পরামর্শ করেন। তার কাছে নসিহতের আবদার করেন।
ব্যাধি নিরাময়কারী কথাগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। যেন আপনার মনের সকল নির্লজ্জ উদাসীনতাকে বিতাড়িত করতে পারেন।
সাহাবীদের পদাংক অনুসরণ করেন। প্রিয় নবীজির অসংখ্য নসিহত থেকে এখানে আপনার জন্য তিনটি নসিহত তুলে ধরছি। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির নসিহতের তালাশে কতটা আগ্রহী থাকতেন লক্ষ্য করেন-
• মুয়াজ ইবনু জাবাল রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে নসিহত করেন!
তিনি বললেন-
* এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাকে দেখছ।
* নিজেকে মৃতদের মাঝে গণনা করতে শুরু করো।
* পাথর কিংবা গাছের আড়ালে-যেখানেই থাকো, আল্লাহকে স্মরণে রেখো।
* তুমি কোনো পাপ করে ফেললে এর পাশাপাশি পুণ্যও করে নিও। গোপন পাপের বিনিময়ে গোপন নেকী, আর প্রকাশ্য নেকীর বিনিময়ে প্রকাশ্য নেকী। ১২৪
* আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে নসিহত করেন, তিনি বললেন-
* কোনো পাপ করে ফেললে এর পাশাপাশি আরেকটি ভালো কাজ করে ফেলো। এতে পূণ্য পাপকে মুছে দেবে।' আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কি পুণ্যের কাজ? তিনি বললেন-
* এ-তো সবচেয়ে উত্তম পুণ্যের কাজ। ১২৫
* আসওয়াদ ইবনু আসরাম রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে নসিহত করেন। তিনি বললেন-
* তোমার হাতের অধিকারী হও! আমি বললাম, আমি নিজের হাতের অধিকারী না হতে পারলে আর কীসের অধিকারী হবো?
* তোমার জবানের মালিক হও।
আমি বললাম, আমি আমার জবানের মালিক না হতে পারলে আর কীসের মালিক হবো?
ও তোমার হাতকে কেবল ভালো কাজের দিকেই সম্প্রসারিত করো। জবান দিয়ে ভালো কথা ছাড়া আর কিছুই বলো না। ১২৬
উপদেশ নাকি সম্পদ
সৎকর্মশীলগণ উপদেশ-নসীহতের মূল্য ভালো করেই জানেন। কেনই বা জানবেন না! এ-যে অর্থ কড়ির চেয়েও নেহায়েত দামী। উমর ইবনু আব্দুল আজিজ তাঁর কোনো এক শুভাকাঙ্খীর কাছে পাঠানো পত্রে লেখেন—
আমার কাছে তোমার উপদেশমূলক পত্রটি এসে পৌছেছে। তুমি আমার করণীয় এবং তোমার প্রাপ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। এর মাধ্যমে তুমি বিশাল বড়ো সওয়াবের কাজ করেছ। কেননা, উপদেশ হলো সদকার মতো; বরং এর চেয়েও বেশি সওয়াবের, অধিকতর স্থায়ী, উত্তম ভান্ডার এবং মুমিনের আবশ্যকীয় প্রাপ্য। সঠিক পথ লাভের আশায় করা উপদেশবাণী অতিপ্রয়োজনীয় সদকার চেয়েও উত্তম। তোমার হিদায়াতি নসিহতে তোমার ভাই যা লাভ করবে, তা তোমার সম্পদ সদকা থেকে দুনিয়াবি উপকার লাভের চেয়েও উত্তম। তোমার নসিহতে একজন ধ্বংস থেকে বেঁচে যাওয়া দারিদ্রের কষাঘাত থেকে সদকার মাধ্যমে বাঁচানোর চেয়ে উত্তম। ১২৭
টিকাঃ
১২৪ হাদিসের মান : সহিহ, তবরানী, মুজামুল কাবির`আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩/৪৬২
১২৫ হাদিসের মান : সহিহ, আহমাদ`আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩/৩৬১
১২৬ হাদিসের মান : হাসান, ইবনু আবিদ দুনিয়া, ত্ববরানী, বাইহাকিড়সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব : ২৮৬৭
১২৭ মিফতাহুল আফকার লিত-তাআহহ্বব লি দারিল করার : ২/১৪৪, আব্দুল আযীয ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু আব্দুল মুহসিন সালমান
📄 উপদেশের সীমারেখা - উপদেশের উপযুক্ত সময় কখন
উপদেশের সীমারেখা
উপদেশ হয়তো আপনাকে খুঁজবে নয়তো আপনি তাকে খুঁজবেন। কখনো আপনি অন্যের কাছে উপদেশ চাইবেন। অন্যজন আবার চাওয়া ছাড়াই আপনাকে নসিহত করে যাবে। তবে ভালো হয়, উপদেশের সীমারেখা এবং একজন হিতাকাঙ্খী কখন তার প্রিয় মানুষকে উপদেশ দেবে তা নির্ধারণ করে নিলে। এ ব্যাপারে ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহর সূক্ষ্ম কথাগুলো শুনে নিই। তিনি বলেন-
উপদেশের সীমারেখা হলো, উপদেশ গ্রহণকারীর কাছে অন্যের জন্য ক্ষতিকর উপদেশ ভালো না লাগা। সেই ব্যক্তি তাতে সন্তুষ্ট হোক বা অসন্তুষ্ট। এবং অন্যের উপকারী বিষয় ভালো লাগা। এতে সেই ব্যক্তির ভালো লাগুক বা না লাগুক। নসিহতের ক্ষেত্রে খাঁটি বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতার সাথে সাথে এটাও এক শর্ত।১২৮
কেউ হয়তো জিজ্ঞাসা করতে পারে-
উপদেশ কীভাবে ভালোবাসার নিদর্শন হতে পারে? অথচ উপদেশের মধ্যে অপরের দোষত্রুটিগুলো তুলে ধরা হয়। এতে করে তার মনে কষ্ট আরও বাড়ে?
ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহু এর উত্তরে বলেন-
মনে কষ্ট লাগে সেই দোষ তুলে ধরলে, যা আপনার ভাই নিজে থেকেই তার দোষ হিসেবে জানে। তবে তার অজানা কোনো দোষ সম্পর্কে তাকে সতর্কীকরণ; মূলত তার প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ মাত্র। এতে বরং আরও আন্তরিকতা বাড়ার কথা। মানে বুদ্ধিমানদের অন্তরে। আর নির্বোধদের কথা আর কী বলব! তারা এসব দিকে ফিরেও দেখবে না। কেননা, আপনাকে নিন্দনীয় কোনো কাজের ব্যাপারে সতর্ক করে কিংবা নিন্দাযোগ্য সিফাতের অভ্যাসের কথা জানিয়ে দেয়, উদ্দেশ্য কেবল তোমাকে পরিশুদ্ধ করা; তবে সে তো ঐ ব্যক্তির মতো, যে আপনাকে আস্তিনের নীচে ঢুকে পড়া সাপ বা বিচ্ছুর ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছে। যে সাপ বা বিচ্ছু আপনাকে দংশন করতে চেয়েছে। এই কাজটা যদি আপনার কাছে ভালো না লাগে তবে আপনার চেয়ে নির্বোধ আর কেউ নেই।
আর নিন্দনীয় স্বভাবগুলো এই সাপ-বিচ্ছুর মতোই। পরিশেষে যেগুলো আপনাকে ঠেলে দেবে ধ্বংসের দিকে। ১২৯
উপদেশের উপযুক্ত সময় কখন
* দীর্ঘদিনের ঈমানি দুর্বলতা ও হীনম্মন্যতার সময়; যা স্থায়ী রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়ে গেছে। এক ব্যক্তি উম্মে দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন- অসুস্থকে দেখতে যাও। জানাজার পেছনে পেছনে চলো। কবরস্থানে বেশি বেশি আসা-যাওয়া করো।১৩০
* সফরের সময়, সবার অনুপস্থিতিতে, বন্ধুর সান্নিধ্যে, বান্দার ওপর শয়তানের নিয়ন্ত্রণ চলে এলে, অন্তরে অস্থিরতা চলে আসলে। এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে বিদায় দেওয়ার সময় বলতেন-
أَسْتَوْدِعُ اللَّهَ دِينَكُمْ وَأَمَانَتَكُمْ وَخَوَاتِيمَ أَعْمَالِكُمْ.
আল্লাহর কাছে তোমার দ্বীন, আমানত এবং পরিণামের নিরাপত্তার দুআ করি।
* গুনাহে ডুবে গেলে। যেমন: এক ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, আমি শহরের উপকণ্ঠের এক নারীর চিকিৎসা করেছি। এতে আমাকে তার গায়ে স্পর্শ করতে হয়েছে। সুতরাং, আমার ব্যাপারে যা ইচ্ছা আপনি ফায়সালা করেন! নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কোনো প্রতিউত্তর দিলেন না। লোকটি চলে যেতে চাইলে তিনি তাকে ডেকে এই আয়াত পড়ে শোনালেন—
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ.
সালাত কায়েম করো দিনের দু-প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে। निश्चयই পুণ্য পাপকে মুছে দেয়। এটি উপদেশগ্রহণকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ। ১৩১
উপস্থিত একজন বলল, এটি কি শুধু তার জন্যই নির্দিষ্ট?
তিনি বললেন, না; বরং সকল মানুষের জন্যই। ১৩২
* ফিতনা ফাসাদে নিপতিত হওয়ার আশংকা দেখলে, পাপাচারের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করলে, অসৎ সঙ্গে আপনার চারপাশ ভরে গেলে; এতে করে আপনিও তাদের মতো করেই গুণাহে জড়িয়ে পড়বেন।
* আপনার দিকে দুনিয়া ধেয়ে আসার মুহূর্তে। কারণ, সম্পদ মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে রাখে। এজন্য খলিফাগণ নিজেদের জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ দিতেন, যারা তদেরকে উপদেশ প্রদান করত এবং বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক করত। কারণ, খলিফা এবং শাসকরা ফিতনার অধিক নিকটবর্তী এবং জুলুমের অতি কাছাকাছি থাকে।
টিকাঃ
১২৮ আল আখলাক ওয়াস সিয়ার ফি মুদাওয়ামাতিন নুফুস, ৪২, ইবনু হাজম আন্দুলুসি আল-কুরতুবি আয-জাহিরি, দারুল আফাকিল জাদিদাহ, বৈরুত
১২৯ ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/১৮২
১৩০ তামবিহুল মুগতাররিন: ৪১৬
১৩১ সূরা হুদ :১১৪
১৩২ হাদিসের মান: সহিহ, ইবনু মাজাহ, আবু দাউদ—১৩৯৮
📄 কে হবে আপনার উপদেশদাতা - অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি
কে হবে আপনার উপদেশদাতা
১. অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি
উপদেশদাতার কথার পুনরাবৃত্তিতে কখনো কখনো এক কথা দশবারও শুনতে হয়। তবে ঈমানি ছোঁয়া শ্রোতাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। উপদেশদাতার কথাগুলো অন্তরের গভীর ছুঁয়ে যায়। কারণ, তার কথাগুলো বের হয় সরাসরি অন্তর থেকে। সুতরাং, জাগ্রত অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি আপনাকে অলসতার জটিলতা থেকে মুক্ত করতে পারবে। কেউ যদি দেখে যে, সে তার সাথীকে নসিহত করে যাচ্ছে; কিন্তু তার কথা কোনো প্রভাব ফেলছে না তবে সে বলে দেবে, হয়তো আমার মনে সমস্যা আছে নয়তো তোমার মনে।
হজের মৌসুমে একদিন আমি মসজিদে হারামে সালাত পড়লাম। ইমাম সাহেব সূরা ফাতেহা পড়লেন। তিনি যখন 'আমাদের সরল সঠিক পথের দিশা দেন' এই আয়াতে পৌছলেন, তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। কান্নার আওয়াজে পুরো মসজিদ ভরে উঠল। হৃদয় ও বিবেক ভীত হয়ে উঠল। তাই আমাদের এমন হৃদয়বান প্রয়োজন, যে জবানের আগে অন্তর থেকে নসিহত করবেন। এজন্যই জিলানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি গোপনে ভালো থাকো। তাহলে প্রকাশ্যে বিশুদ্ধ ও স্পষ্টভাষী হতে পারবে।'
📄 ইলম ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি - উপদেশের চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত
২. ইলম ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি
আপনাকে নসিহত ও পরামর্শ তালাশ করতে হবে সেই ব্যক্তি থেকেই, যার আছে অন্তর সংশোধন, দাওয়াত বাস্তবায়ন, ঈমানি উন্নতি সাধন, কল্যাণমূলক পরিকল্পনা, পেশাগত উন্নতি, শিক্ষাগত অগ্রগতি, চিন্তার নতুনত্ব এর যেকোনো একটি যোগ্যতা। তারা আপনার উপকারে আসবে। তারা নিজেদের সফল অভিজ্ঞতার সারনির্যাস আপনার সামনে তুলে ধরতে পারবে।
অলসতার পরিধি একদিকের নয়। তাই আপনার নানাবিধ রোগের জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তারের খোঁজ করেন। সুতরাং আহলে কুরআন হলেই সে অন্তরের রোগ সম্পর্কে জানবে না। সময় নিয়ন্ত্রক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অধিকারী হয়ে যাবে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উদ্যমী হয়ে উঠবে না। প্রত্যেকেরই কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। অতএব আপনি নিজের প্রয়োজন অনুপাতে যোগ্য লোক বেছে নেন।
আপনার পরামর্শদাতা যদি বেশি হয় এবং নসিহতকারী পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে তাহলে বুঝে নেবেন, আপনি মূল কেন্দ্রবিন্দুতেই আছেন এবং সঠিক পথেই এগোচ্ছেন। এজন্য উমর ফারুক রাজিয়াল্লাহু আনহু বলতেন-
একক অভিমত ঘর্ষণকারী একটি সুতোর মতো। দুটি মত দুটি সুতোর মতো। আর তিনটি অভিমত একত্রিত তিনটি সুতোর মতো, যা ছিড়ে যায় না। ১৩৩
উপদেশের চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত
উপদেশের সঠিক মূল্য বুঝতেন এমন কতক সালাফের দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরছি; যারা অন্যের কাছ থেকে উপদেশ লাভের তরে ছুটে বেড়াতেন-
* আবুল আতাহিয়া রাহিমাহুল্লাহ খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে এসে বললেন, আমাকে সংক্ষেপে কিছু কবিতার পংক্তির মাধ্যমে নসিহত করেন! তখন তিনি আবৃত্তি করলেন-
এক পলক কিংবা এক নিঃশ্বাসের ক্ষেত্রেও মৃত্যু থেকে নিশ্চিন্ত হয়ো না যদিও তুমি থাকোঁ কোনো বেষ্টনী কিংবা প্রহরার প্রতিরোধে,
জেনে রাখো, মৃত্যুর তীর আঘাত হানবেই প্রত্যেক বর্মপরিহিত ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরে
তুমি মুক্তির পথে না হেঁটেই মুক্তির দেখা পেতে চাও? জাহাজ তো শুকনোতে চলতে পারে না! ১৩৪
* জারির ইবনু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু আলি ইবনু হুসাইনকে বলেন-আমাকে নসিহত করেন! তিনি বললেন-
জারির, দুনিয়াকে এমন সম্পদ বানাও, যা তুমি স্বপ্নে দেখো। এরপর জেগে উঠলে তোমার কাছে কিছুই থাকে না। ১৩৫
* উমর ইবনু আব্দিল আজিজ রাহিমাহুল্লাহ খালিদ ইবনু সফওয়ান রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, 'আমাকে সংক্ষিপ্ত নসিহত করেন!' খালিদ রাহিমাহুল্লাহ বললেন—
আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা দোষ গোপন রাখার ফলে একদল মানুষ প্রবঞ্চনার শিকার হয় এবং প্রশংসা তাদেরকে ফিতনায় ডুবিয়ে রাখে। সুতরাং আপনার সম্পর্কে অন্যদের অজ্ঞতা নিজের ব্যাপারে আপনার জানার ওপর যেন প্রভাব না ফেলে! গোপন বিষয়ে ধোঁকায় পড়া এবং মানুষের প্রশংসায় উৎফুল্ল হওয়া থেকে আল্লাহ আপনাকে এবং আমাদের সবাইকে বাচিয়ে রাখেন! ১৩৬
* হুমাইদ আত-তওয়িল রাহিমাহুল্লাহ সুলাইমান ইবনু আলি রাহিমাহুল্লাহকে বলেন, আমাকে নসিহত করেন! তিনি বললেন-
তুমি যদি নির্জনে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে মনে করো আমি এক বিশাল কাজের দুঃসাহস দেখিয়ে ফেলেছি এবং যদি মনে করো যে, তিনি তোমাকে দেখছেন না তাহলে অবশ্যই তুমি কুফুরী করে বসলে। ১৩৭
* এক ব্যক্তি বাশার ইবনু মানসুর রাহিমাহুল্লাহকে বলল, আমাকে নসিহত করেন! তিনি বললেন-
মৃত্যুর বাহিনী তোমার অপেক্ষায় আছে। ১৩৮
* মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বললেন, আমাকে নসিহত করেন! তিনি বললেন-
আমল করে যাও। মরে গেলে তো আর ফিরে আসবে না। যারা চলে গেছে তাদের দিকে তাকাও, তারা কি ফিরে এসেছে? ১৩৯
হায়! উপদেশমালারা যদি খুঁজে পেত শ্রোতা! মণি-মুক্তো পেত যদি সংগ্রহকারীর সন্ধান! মূল্যবান পণ্যের জন্য আপনি কোনো বিক্রেতা ও ক্রেতাই খুঁজে পাবেন না! এমনকি উপদেশমালার চাবুক যখন উদাসীনদের পিঠে এসে পড়ে তখন আপনি তাদের কাছ থেকে ওজর পেশকারীর আহাজারী শুনতে পাবেন!
হে উদাসীন
একদল লোক আছে, তারা যখন কোনো উপদেশ-নসিহত শোনে তখন সেই নসিহত তাদের মনের মাঝে সংকল্পের চারাগাছ রোপণ করে দেয়। ফলে তারা অন্য সকল ঘুমন্তদের জাগিয়ে তুলে। বাজপাখি কোনো শিকার দেখতে পেলে শত আরাম আয়েশ ভুলে যায়। তাই নসিহতকারী তার নসিহত মোতাবেক আমল করছে কিনা আপনি সেসব নিয়ে ভাববেন না। কবি বলেন-
উপদেশদাতার উপদেশ লুফে নাও
যদিও সে নিজে হয় ভন্ড
অনেক সময় এমন চিকিৎসকের ঔষধও কাজে আসে
যার নিজেরই ঔষধের অধিক প্রয়োজন।
হে টাকা পয়সার গোলাম, এটিই আপনার মুক্তির সময়! হে লোভ লালসার দাস, এটিই আপনার স্বাধীনতার সুযোগ! প্রত্যেক পণ্যেরই মূল্য আছে। যতক্ষণ না আপনি নিজের সম্পদ ব্যয় করবেন এবং সদকা করবেন, ততক্ষণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি নেই। শয়তানের বন্দিত্ব থেকে ততক্ষণ বেরোতে পারবেন না, যতক্ষণ আপনার নামের সাথে জুড়ে থাকবে খন্ডিত দীনের অধিকারী উপাধি। হে জ্ঞানীর কাপড়ে জড়ানো উদাসীন, আগামীকাল যখন লাঞ্চনায় পড়বেন তখন ঠিকই জানতে পারবেন, যা অগ্রে পাঠিয়েছেন তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই আপনার।
প্রিয় ভাই, পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার সময় জমানো এই পার্থিব ভান্ডার আপনার কোনো কাজেই আসবে না! আপনার সম্পদ আর সন্তান কি মৃত্যুর আক্রমণ থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারবে?
টিকাঃ
১০০ সিরাজুল মুলক, আবু বকর আত-তরতুশি: ১/৭৮
১৩৪ রওজাতুল উকালা ওয়া নুযহাতুল ফুজালা: ২৮৫, আবু হাতিম আদ-দারামি আল-বুসতি, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ
১৩৫ আজ-জুহদুল কাবির : ১৪১, আবু বকর আল-বাইহাকি, মুওয়াসসিসাতুল কুতুবিস সিকাফিয়্যাহ, বৈরুত, সংস্করণ: ৩
১৩৬ প্রাগুক্ত: ১৮৭
১৩৭ ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ৪/৩৯৮
১৩৮ সিফাতুস সফওয়া: ২/৮১
১৩৯ নাজরাতুন নাঈম ফি মাকারিমি আখলাকির রাসূলিল কারিম: ২/৩৮৭