📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ > 📄 মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কথা - দরজায় দাঁড়ানো অতিথি

📄 মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কথা - দরজায় দাঁড়ানো অতিথি


পরিশ্রমীদের মতো চেষ্টা করেন। ছুঁড়ে ফেলে দিন ঘৃণ্য অলসতার পোশাক। আসল বাড়িতে যাওয়ার আগেই যথাসম্ভব তা প্রস্তুত করে নেন। যেন সেখানে যাওয়ার পর তা মনোরম অবস্থাতেই দেখতে পান। এমনটি করতে পারলে সুসংবাদ গ্রহণ করেন সেই কল্যাণের, যা আপনার চক্ষু কখনো দেখেনি। যেমন বিশর ইবনু হারেস বলেছেন—
আল্লাহর অনুগত ব্যক্তির জন্য কবরের বাড়ী কতই না উত্তম! ১১৬
প্রিয় ভাই, আপনি যদি কোনোদিন মন দিয়ে কোনো বাণী পাঠ করেন, তবে তা যেন হয় এই বাণীটি—
কবরে বসবাসের আগেই তা আবাদ করেন। কারণ, সেই বাড়িতে আপনার বসবাস কল্পনাতীত দীর্ঘ।
আর যারা অবাধ্য হয়েছে (অবাধ্যের জন্য ধ্বংস অনিবার্য) এবং প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা ভুলে গিয়ে পরিশেষে নিজেদের উপহার দিয়েছে লাঞ্ছনা। অলসতাই ছিল যাদের জীবনের শুরু এবং শেষ। তাদের মৃত্যু হলে তারা প্রত্যেক মুমিনের সহানুভূতি এবং প্রত্যেক বুদ্ধিমানের অশ্রু প্রাপ্য হবে।
এমন বুদ্ধিমান মুমিনদের একজন ফজল আর-রুকাশি, তিনি একদিন কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন—
হায়! আফসোস তাদের জন্য, যাদের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে নানা বাহানা ছিল। তারা যদি উত্তম প্রতিদান সম্পর্কে জানার পর আমলের পথ খুঁজে পেত; তবে তারা এই কবরে খুব তাড়াতাড়ি আসতে চাইত!
অতঃপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন—
প্রিয় ভাইয়েরা, আজ তোমাদের কামনা আর তোমাদের মাঝে কেবলই শূন্যতা ছেয়ে আছে। তাই শূন্যতাই তোমাদের সঙ্গী হয়ে আছে। (জীবিতরা) শোনো, মৃত্যু ও তোমাদের আমলের . . .
বিচ্ছিন্নতার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নাও। কেননা, তোমরা কেউই জানো না, রাতে বা দিনে কখন তার সাথে দেখা হয়ে যাবে। ১১৭
প্রিয় ভাই, জানাজার দৃশ্যের মাধ্যমে আপনার চক্ষুকে তৃপ্তি দেন। মৃতের সাথে হেঁটে যান তাঁর কবর পর্যন্ত। এতে করে আপনার অন্তরে উচ্চ মনোবলের বীজ রোপণ করতে পারবেন; যা প্রতি মুহূর্তে আপনার তুচ্ছতার কথা মনে করিয়ে দেবে এবং সময়কে মূল্যায়ন করতে শেখাবে। সুতরাং নেক আমল অগ্রবর্তী করতে থাকেন। এতে আপনার দাড়িপাল্লা ভারী হবে এবং শয়তান অপমাণিত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে শিক্ষা নেন। তিনি এক জানাজায় গিয়ে জনৈক গাফেলকে অবিস্মরণীয় এক শিক্ষা দিয়েছিলেন।
সেই ব্যক্তি জানাজায় তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। মৃত্যুর শোকে যখন চারপাশ ছেয়ে আছে, এমতাবস্থায় লোকটি সে তাঁকে এক গুরুত্বহীন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে বসল। তখন তিনি তাকে বললেন—
ওহে নির্বোধ, তাসবীহ পড়ো! কেননা, খাটিয়ায় থাকা লোকটি চাইলেও আর তাসবীহ পড়তে পারবে না। ১১৮
আজকের পর থেকে একটি মুহূর্তকেও ছোট করে দেখবেন না। হতে পারে এই মুহূর্তটিই আপনার নাজাতের উসিলা হয়ে যাবে। তাই সেই মুহূর্তটি কাজে লাগিয়ে স্থায়ী সফলতা লাভ করেন। ইবনুল জাওজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
আপনার প্রতিটি মুহূর্তই হীরকখণ্ড। এর মাধ্যমে আপনি একক সত্তার পাশে স্থায়ী বাড়ি কিনতে পারবেন।
মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কথা
কোনো এক সালাফ কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন—
আমরা যেসবে আগ্রহী, তারা সেসব থেকে উদাসীন হয়ে গেছে। ১১৯
নশ্বর দুনিয়ার তুচ্ছ খড়কুটো থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করে মৃতরা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায়; কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর তাদের এই বিলম্বিত দুনিয়াবিমুখতা কি কোনো কাজে আসবে? হায়! আল্লাহর কসম, আপনি যদি নিজ চোখে আপনার মৃত প্রতিবেশীদের পরিণতি দেখতে পেতেন, তাহলে আপনার উদাসীনতার কথা চিন্তা করে নিশ্চিত জ্ঞান হারাতেন।
দরজায় দাঁড়ানো অতিথি
তাছাড়া মৃত্যু আমাদের জুতার ফিতার চেয়েও বেশি কাছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে আমাদের হিসাবকে কাছে এনে দিয়েছেন এবং আমল ও তাঁর মাঝে সংযোগ স্থাপন করে বলেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ.
ঈমানদারগণ, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে আগামীকালের জন্য কী পাঠাচ্ছে। ১২০
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতকে সবসময় কাছেই রাখছেন। এমনকি তা আগামীকালের মতো করে রেখেছেন। ১২১

টিকাঃ
১১৬ আল-কুবুর : ১৩০, ইবনু আবিদ দুনিয়া, দারু মাকতাবাতিল গুরাবায়িল আসারিয়্যাহ।
১১৭ আহওয়ালুল কুবুর : ৩৮
১১৮ আহওয়ালুল কুবুর: ৩৮
১১৯ আল-কুবুর : ১৪৫
১২০ হাশর : ১৮
১২১ জামিউল বায়ান ফী তাওয়ীলিল কুরআন : ২২/১৯৯, আবু জা'ফর আত-তবারী

📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ > 📄 কীভাবে - মৃত্যুর চতুর্ভুজ

📄 কীভাবে - মৃত্যুর চতুর্ভুজ


যতক্ষণ আপনার ঠিকানা অজানা, ততদিন আপনার শ্রম দিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই এবং দু চোখে ঘুম আসারও কথা নয়। কেউ একজন যথার্থই বলেছেন—
চোখ কীভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমায়
অথচ সে জানে না, দুই বাড়ীর কোনটিতে তার ঠাই হবে!’
*অসুস্থতা
বান্দার ওপর অসুস্থতা সওয়ার হয়ে তাকে মনে করিয়ে দেয় অত্যাসন্ন সফরের কথা। খুলে দেয় পরকাল নিয়ে ভাবার দরজা। কত স্বাভাবিক অসুস্থতায় মানুষ আক্রান্ত হয়! কত তীব্র অসুস্থতা বান্দাকে কবরে নিয়ে যায়! নিশ্চয়ই অসুস্থতা মৃত্যুর হুশিয়ারি। অসুস্থতা আর মৃত্যুর মাঝে সামান্য এক চুলের তফাৎ। এজন্যই কোনো এক সালাফ বলেছেন—
কোনো বান্দা দুইবার অসুস্থ হওয়ার পরও যখন তাওবা করে না, তখন মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে বলে, ওহে উদাসীন! আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে পর পর দুবার বার্তাবাহক এল। তবুও তুমি তাওবা করলে না! ১২২
কীভাবে প্রকাশ্যে ও গোপনে আমল না করে থাকেন? অথচ সবার মতো আপনার বেলাতেও দিন-রাতের কোনো আমলের সময়ই থেমে থাকছে না?
দিনের পর দিন আপনি নিজের কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, প্রতিদিনই আপনার এই ক্ষণস্থায়ী ঠিকানা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, পরকাল যতই আপনাকে কাছে টানছে কবর তত বেশি নিকটবর্তী হচ্ছে আর আপনার অলসতাও বাড়ছে
মৃত্যু নিকটবর্তী হচ্ছে আর উদ্যমতা প্রশমিত হচ্ছে
আপনার ব্যস্ততা কেবলই হিসাব আর চেক নিয়ে
আপনার মন এখনো আটকে আছে সেই টাকা আর চেকের মধ্যেই।
মৃত্যুর চতুর্ভুজ
আব্দুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত-
একদা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং তার মাঝে একটি রেখা টানলেন, যা চতুর্ভুজ অতিক্রম করে বাহিরে চলে গেছে। অতঃপর মধ্য রেখাটির উভয় পার্শ্বে অনেকগুলো ছোট ছোট রেখা টেনে বললেন, (মনে করো) মধ্য রেখাটি একটি মানুষ। আর এই চতুর্ভুজ তার বয়সের সীমানা; যা তাকে ঘিরে রেখেছে। আর ওই রেখার বাহিরের অংশটি তার আকাঙ্ক্ষা। এই ছোট রেখাগুলো তার বিপদাপদ। যদি সে একটি বিপদ থেকে রক্ষা পায় তাহলে পরবর্তী বিপদে আক্রান্ত হয়। যদি সেটা থেকেও রক্ষা পায় তবে এর পরেরটাতে আক্রান্ত হয়। ১২০
এই হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ :
• মানুষের আশা সবসময় তার জীবনের চেয়ে দীর্ঘ হয়।
• আমল কখনো দীর্ঘ হয় তবে তা স্বল্পমেয়াদী। কখনো বিস্তৃত হয় কিন্তু তা সীমিত। এমনকি অপরাধীরা কেয়ামতের মাঠে কসম করে বলবে, তারা কেবল সামান্য সময়ই দুনিয়ায় থেকেছে।
• কারণ অনেক তবে মৃত্যু একটিই। সুতরাং, মৃত্যুর ফেরেশতার সাথে আপনার সাক্ষাতের সময় আগে থেকেই নির্ধারিত। তবে মৃত্যুর পদ্ধতিতে ব্যক্তিভেদে ব্যবধান হয়।
• আশা সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতারক। কেননা, এই আশা নিশ্চিত মৃত্যুর ব্যাপারে অমনোযোগী করে রাখে।
• মৃত্যুর পাকড়াও অনিবার্য। এ থেকে পালাবার কোনো পথ নেই। সুতরাং, কবরপথে আপনার যাত্রা এক মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র।
• প্রায়ই আশাময় আয়েশের মাঝপথে মৃত্যু হানা দেয়। ফলে অধিকাংশ আশা বাস্তবায়িত না হতেই মৃত্যুর ডাক এসে যায়। যেমন কবি বলেছেন:
আমরা সকাল সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াই নিজেদের প্রয়োজন পূরণে
যেন আমরা অফুরন্ত জীবনের উপকরণ খুঁজে বেড়াচ্ছি
তবে মানুষের সাথে সাথে তার সকল প্রয়োজনগুলোরও মরণ হয়
আর ফেলে যাওয়া প্রয়োজনগুলো এভাবেই পড়ে রয়।

টিকাঃ
১২২ ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/২৮৯, আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনু মুহাম্মদ আল-গাযালী আত-তওসী, দারুল মা'রিফা, বৈরুত
১২০ হাদিসের মান: হাসান, আহমাদ, ইবনু মাজাহ্আসসিলসিলাতুস সহিহাহ: ১৭৫১ নং

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00